📄 ফেমিনিজমের প্রবর্তনা এবং এর উদ্দেশ্য
চতুর্দশ শতাব্দীতে 'দ্য বুক অফ দ্য সিটি অফ লেডিস' বইটির ইতালীয়-ফরাসি লেখিকা ক্রিস্টিন ডি পাইজান সামসাময়িক নারী বৈষম্যের বিরুদ্ধে লিখেছিল। এছাড়াও প্রাথমিক সময়ের অন্যান্য আরও অনেক লেখিকা রয়েছে যারা মূলত নারীবাদী মতধারার প্রাথমিক প্রবর্তনা করে।[১] তবে এরও পূর্বে প্লেটো নারীদের রাজনৈতিক ও যৌন সাম্যতার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিল।[২]
চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে ইউরোপের অঞ্চলগুলোতে সত্যিকার অর্থেই নারীদেরকে অনেক নিচু করে দেখা হতো। ইউরোপে প্রচলিত ধর্মের দোহাই দিয়েই তারা মূলত নারীদেরকে নিচু করে দেখতো এবং তারা নারীদের অধিকারের বিষয়ে সম্পূর্ণ বেখবর ছিল। বস্তুত তাদের ধর্মীয় গ্রন্থ তথা বিকৃত বাইবেলের শিক্ষা এরকমই ছিল। যখন নারী লেখিকারা নারী অধিকারের পক্ষে কলম চালাতে শুরু করে তখন সেটা সাধারণভাবেই খ্রিস্টধর্মের বিরোধিতায় রূপ নেয়।
এভাবেই নারীবাদীদের সাথে ধর্মের একটা ঠান্ডা মাথার যুদ্ধ নারীবাদী মতবাদের শুরু থেকে আজ অব্দি চলে আসছে। যে সকল দিক থেকে সমাজে নারীদের বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে সেসবের বিরুদ্ধেই মূলত নারীবাদীরা প্রাথমিকভাবে সোচ্চার হয়ে ওঠে যা সেই সময়ের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী প্রশংসনীয় ছিল এবং অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। কিন্তু যুগের সাথে সাথে নারীবাদী মতবাদের মধ্যে অনেক নতুনত্ব এসেছে। নারীবাদী মতধারার ইতিহাসকে ৩টি সময়ে বিভক্ত করা হয়। বর্তমান সময়ে এসে পূর্বের মতধারার সাথে আরও অতিরিক্ত কিছু বিষয় বা দাবি যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো নারী-পুরুষ সমঅধিকার। পুরুষেরা যা কিছু করে ও করতে পারে তার সবই নারীরাও করবে। পুরুষেরা চাকরি-বাকরী করতে পারে তাই নারীরাও তা করবে। পুরুষেরা যেখানে-সেখানে, যখন-তখন, রাত-বিরাতে বের হতে পারে তাই নারীরাও রাত-বিরাতে রাস্তায় বের হবে। এমনকি পশ্চিমা বিশ্বে এমন আন্দোলনও হয়েছে এবং হচ্ছে যেখানে দাবি তোলা হয়- পুরুষেরা যেমন দেহের উপরিভাগের পোশাক তথা শার্ট-গেঞ্জি লোকসম্মুখে নির্দ্বিধায় খুলে ফেলতে পারে নারীদেরও সেই অধিকার থাকা দরকার। সেই জের ধরে নারীবাদী কর্মীরা নিজেদের বক্ষ উন্মুক্ত করে Free the Nipple ধ্বনিতে দাবি তুলেছিল। পরবর্তীতে আমেরিকার ৬টি রাজ্যে নারীদের জন্য দেহের উপরিভাগ অনাবৃত রেখে জনসম্মুখে চলাফেরার বৈধতা দেয়া হয়েছে। এরকম নিকৃষ্ট পর্যায়ে রয়েছে বর্তমানের নারীবাদীরা।
মূল কথা হচ্ছে নারীবাদীদের বর্তমান অবস্থান এই যে, তারা নারী বৈষম্য দূর করতে এবং নারী স্বাধীনতা কায়েম করতে গিয়ে নারীদের স্বকীয়তা হারাতে বসেছে। তারা পুরোপুরিরূপে পুরুষদের অনুকরণ করার মাধ্যমে যেন উল্টো এটাই মেনে নিচ্ছে যে পুরুষেরা অনুকরণীয়। এতে নারীবাদীদের মূল ধারার কর্মীরা নবীনদের এই বুঝের সমালোচনাও করেছে।
টিকাঃ
[১] https://en.m.wikipedia.org/wiki/History_of_feminism
[২] Women in Search of Utopia, পৃষ্ঠা- ২০৯ ও ২১১
📄 ফেমিনিস্টদের ইসলামবিরোধী অবস্থান
ইতিহাসের গোড়ার দিক থেকেই নারীবাদীরা ধর্মের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিল। সেই পরম্পরা আজও টিকে আছে। তারা ইসলামের অনেক বিধানের বিরোধিতা করে থাকে, এমনকি অনেক বিধান নিয়ে ঠাট্টাও করে থাকে। তারা ইসলাম সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান রাখে এবং এই বিষয়ে তাদের ধারণাও নেই যে, ইসলাম কীভাবে নারীদেরকে সম্মানিত করেছে। ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক তেমনই কিছু চিন্তাধারা নিম্নে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হচ্ছে-
• পর্দার বিধান নারী স্বাধীনতার পরিপন্থি
নারীবাদীরা প্রচার করে পর্দার বিধান নারীদের জন্য লজ্জাজনক এবং এটি নারী স্বাধীনতার পথে বাঁধা। তাই তারা পর্দার বিরুদ্ধে তথাকথিত সামাজিক সচেতনতামূলক অনেক কর্মসূচী হাতে নিয়ে থাকে।
পূর্বেও আমরা পর্দার বিষয়ে জেনেছি যে বর্তমান সময়ে পর্দার প্রয়োজনীয়তা কতটা বেশি। পর্দা কখনই নারী স্বাধীনতার অন্তরায় নয় বরং পর্দা নারীদেরকে নফসের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছে। পুরুষদের অনুকরণের মাঝে স্বাধীনতা না খুঁজে বরং নিজেদের স্বকীয়তাকে চেনার সুযোগ করে দিয়েছে এই পর্দার বিধান। পর্দা নারীদেরকে সে সমস্ত কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষদের থেকে আলাদা করেছে যারা নিজেদেরকে নিয়ে ভাবে না, যারা কচুরিপানার মতো ট্রেন্ডের স্রোতে গা ছেঁড়ে দিয়েছে।
• সংসার সামলানো নারীদের কাজ নয়
নারীবাদীরা বোঝাতে চায় যে, যুগ যুগ ধরে মানুষ কুসংস্কারের মাঝে ডুবে আছে। নারীরা কেবলই ঘর সামলাবে, বাচ্চা পালবে আর স্বামীর খেদমত করবে এসব কুসংস্কার, এই শিকল ভাঙতে হবে! তাদের এই যুক্তির যথেষ্ট অসারতা রয়েছে। অপরদিকে শরঈ বিধানগুলোর মাঝে যৌক্তিকতা আছে, রয়েছে সুদূরদর্শীতা। আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে তার যোগ্যতা, কার্যক্ষমতা ও অবস্থানের ভিত্তিতে দায়িত্বারোপ করেছেন। শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা, কঠিন কাজগুলো সহজে করতে পারার মতো সামর্থ্য দিয়ে পুরুষদেরকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। এছাড়া বাহিরের জগৎ মন্দ। কর্মক্ষেত্রে নানান চিন্তাধারার মানুষ একত্রিত হয়। হিংসা, অহংকার, রাগ ইত্যাদির কারণে অনেকসময়ই কলহের সৃষ্টি হয়। আর পুরুষদের আল্লাহ দিয়েছেন আত্মরক্ষার ক্ষমতা। এছাড়া ঘরের বাহিরে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার সম্ভাবনা পুরুষদের নেই বললেই চলে। ফলে বাহিরের জগৎ পুরুষদের জন্যই মানানসই। তাই পুরুষদের ওপর দায়িত্ব আরোপিত হয়েছে যে, তারা ঘর থেকে বের হয়ে রিযিক সন্ধান করবে আর তাদের ঘরের নারীদের জন্য ব্যয় করবে।
অপরদিকে নারীদেরকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ ধৈর্য্যশক্তি দিয়ে। নারীদের অন্তরে মায়া মমতাও অধিক দিয়েছেন তার সৃষ্টিকর্তা। পুরুষেরা এদিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে। ঘরের কাজগুলোতে প্রয়োজন হয় ধৈর্য্যের। যেমন: গরমের মধ্যেও অসহনীয় তাপে দাড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রান্না করা, ঘরের মানুষগুলোর সাথে ভাব রেখে চলা, গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব ও সন্তান লালন পালন ইত্যাদি ক্ষেত্রে অসামান্য ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। সন্তান লালন পালনের বিষয়টা মায়েদের সাথেই যায় কারণ এটাই নারীদের সহজাত। এমনকি সন্তানের রিযিকও নারীর শরীরেই বিদ্যময়ান রয়েছে যাতে ঘরে থেকেই নারীরা তাদের সন্তানের পরিচর্যা ও আহারের জোগান দিতে পারে। এছাড়া বাহিরের জগতের মারপ্যাঁচ নারীরা বুঝবে না, শক্তি সামর্থ্যের দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে, আত্মরক্ষার দিক থেকেও দুর্বল। সেই সাথে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ব্যাপক। তাই আল্লাহ প্রত্যেককে তার সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
(لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا)
আল্লাহ কারও ওপর এমন কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না যা তার সাধ্যাতীত। [৩] তাই পুরুষদের দায়িত্ব বাহিরের কষ্টের কাজগুলোর সম্পাদনা করা। আর নারীরা হচ্ছে সংসারের পরিচালিকা। সংসারের বিষয়ে আধিপত্য দেওয়া হয়েছে স্ত্রীরই হাতে।
একারণেই আরবদের মাঝে নারীদেরকে ربة البيت অর্থাৎ 'ঘরের প্রতিপালনকারী' বলার প্রচলন রয়েছে।
• সকল ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ সমানে সমান
ইসলাম কখনই সমতার কথা বলে না, বরং ইসলাম বলে ন্যায় ও ইনসাফের কথা। সমতা আর ইনসাফ একে অপরের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। যার যেটা প্রয়োজন তাকে সেটার যোগান দেওয়া হচ্ছে ন্যায়তা। আর কোনো একটি বস্তুর প্রয়োজন কারও একদমই নেই, আবার কারও অধিক প্রয়োজন রয়েছে; এসত্ত্বেও উভয়কেই সেই বস্তুটি সমহারে প্রদান করা হচ্ছে সমতা।
একটি উদাহরণের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি। মনে করা যাক হাতি, বানর, মাছ, পাখি—এই চারটি প্রাণীর মাঝে গাছের চূড়ায় আরোহণের প্রতিযোগিতা হলো। স্বভাবতই চার প্রাণীর মাঝে পাখি উড়াল দিয়ে সবার আগে গাছের চূড়ায় পৌঁছে যাবে, বানর লাফিয়ে লাফিয়ে গাছের চূড়ায় উঠে গিয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকবে। হাতি চেষ্টা করবে গাছে উঠতে কিন্তু কস্মিনকালেও গাছের চূড়ায় উঠতে পারবে না। আর মাছতো পানি ছেড়ে ডাঙায় এসে গাছে ওঠার চেষ্টাটুকুও করতে পারবে না। একেক প্রাণীর সামর্থ্য একেক রকম। তবুও এদেরকে একই প্রতিযোগিতা দেওয়ার বিষয়টা সমতা দেওয়ার মতোই। এখানে ন্যায়বিচার হয়নি। এমনকি, ভালোভাবে চিন্তা করলে বোঝা যাবে সমতাও হয়নি। পাখির জন্য প্রতিযোগিতায় অধিক সুবিধা ছিল, পক্ষান্তরে মাছের জন্য প্রতিযোগিতায় কোনো প্রকার সুবিধাই ছিল না যদিও সবার জন্য প্রতিযোগিতা একই ছিল।
প্রতিযোগিতাটিতে ন্যায় রক্ষা করা যেত যদি চার প্রতিযোগীর সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিযোগিতা নির্ধারণ করা হতো। যেমন: হাতির জন্য প্রতিযোগিতা- একটা গাছ সে কত তাড়াতাড়ি উপড়ে ফেলতে পারবে, পাখির জন্য প্রতিযোগিতা- নির্দিষ্ট একটি দূরত্ব সে কতটুকু সময়ের মাঝে উড়ে পাড়ি দিতে পারবে, বানরের জন্য প্রতিযোগিতা হলো কতটুকু সময়ের মাঝে সে গাছের চূড়ায় উঠে যেতে পারবে আর মাছের জন্য প্রতিযোগিতা হচ্ছে কতক্ষণের মাঝে সে নির্দিষ্ট একটি দূরত্ব সাঁতরে পাড়ি দিতে পারবে। এবারই প্রকৃতপক্ষে ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয়েছে, সেই সাথে সত্যিকার অর্থে সমতাও নিশ্চিত হয়েছে।
জীবনে চলার পথে বেশ কিছু ক্ষেত্রে পুরুষদেরকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে যা নারীদেরকে দেওয়া হয়নি। কেননা সেটা পুরুষের প্রয়োজন, নারীদের প্রয়োজন নয়। আবার অনেক ক্ষেত্রেই নারীদেরকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে যা পুরুষদেরকে দেওয়া হয়নি। কারণ সেসব ক্ষেত্রে প্রয়োজনটা নারীদের, পুরুষদের নয়।
বহুবিবাহের বিধান পুরুষদের জন্য, নারীদের জন্য নয়। কেননা সেটা পুরুষদের প্রয়োজন, নারীদের প্রয়োজন নয়। পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে পুরুষেরা স্বভাবগতভাবেই নারীদের প্রতি দুর্বল এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরুষেরা বহুগামী চিন্তাধারার হয়ে থাকে। এছাড়া পুরুষেরা অধিকাংশ সময় ঘরের বাহিরে থাকে, এতে তাদের ফিতনায় পতিত হওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়। পুরুষদের ওপর এমন অনেক কিছুই বাধ্যতামূলক যা নারীদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। যেমন পুরুষদের দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও আত্মরক্ষার তাগিদে জিহাদ করতে হয়, দ্বীনের দাওয়াতের উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্ত গমন করতে হয় ইত্যাদি। নিসঃন্দেহে এসব কষ্টসাধ্য। ফলে পুরুষদের ক্ষেত্রে জৈবিক প্রশান্তির অধিক প্রয়োজন পড়ে। তাই বিধান রয়েছে যদি তাদের দরকার হয় তাহলে স্ত্রীদের মাঝে ন্যায়প্রতিষ্ঠার শর্তে সে অনধিক চারটি বিয়ে করতে পারবে। কিন্তু নারীরা পুরুষদের মতো জৈবিক চাহিদা দমনের দিক থেকে ততটা দুর্বল হয় না এবং বহুগামী চিন্তা নারীদের কাছে অভাবনীয় এবং লজ্জাজনক। নারীদের প্রয়োজন নেই বিধায় নারীদের জন্য এই বিধান দেওয়া হয়নি।
অপরদিকে, পুরুষেরা নারীদেরকে তার উপযুক্ত মোহরানা পরিশোধ করে তারপর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কেননা এটা নারীর হক্ক ও প্রয়োজন। একজন নারী তার নিজের ঘর ছেড়ে স্বামীর সাথে ঘর বাঁধে। বিনিময়ে তাকে দেওয়া হয় এই উপহার। তুচ্ছ, তবে তা তার জন্য কিছুটা হলেও আনন্দের। অপরদিকে, যদি অমিলের কারণে তালাকের মাধ্যমে দম্পতি আলাদা হয়ে যায় তাহলে সেই মোহরানার অর্থ সেই নারীর সাময়িক জীবিকা নির্বাহের খোরাক হিসেবে কাজে দেবে। মোহরানা তাই নারীর প্রাপ্য, পুরুষের জন্য মোহরানার বিধান দেওয়া হয়নি।
এদিকে, হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, পিতার পায়ের নীচে নয় বরং মাতার পায়ের নীচেই সন্তানের জান্নাত।[৪] আবার আরেক হাদীসের মাধ্যমে জানা যায় পিতার তুলনায় মাতার মর্যাদা তিনগুণ।[৫]
একজন মা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে যেই পরিমাণ কষ্ট সহ্য করে, সন্তানকে বড় করতে যতটুকু শ্রম একজন মা দিয়ে থাকেন, সন্তানের জন্য মায়েরা যেভাবে বিসর্জন দিয়ে থাকেন; একজন পিতা তুলনামূলকভাবে এতোটা অবদান রাখতে পারেন না। তাই ইসলামে এইক্ষেত্রে পিতার তুলনায় মাতার তথা পুরুষের তুলনায় নারীর মর্যাদাটাকে বড় করে দেখা হয়েছে। কারণ নারী এই বাহবার প্রাপ্য। এখান থেকেও আমরা বুঝি যে, যদি পিতা-মাতাকে সমান মর্যাদা দেওয়া হতো তাহলে সমতা হতো কিন্তু ন্যায় হতো না। তাই সমতার চেয়ে ন্যায়তা অধিক যুক্তযুক্ত; যা ইসলাম নিশ্চিত করেছে।
টিকাঃ
[৩] সূরা বাক্করাহ- ২৮৬
[৪] সুনানুন নাসা'ই- ৩১০৪
[৫] বুখারী ও মুসলিম; রিয়াদুস স্বলেহীন- ৩১৬
📄 যেসকল অবস্থায় নারীবাদীদের ঈমান ভেঙে যায়
ফেমিনিজম তথা নারীবাদ বলতে শরীয়তে কিছু নেই। এর আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত সবই ভ্রান্তি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তদের গোমরাহ বলা গেলেও কাফির বলা যায় না। কিন্তু যদি শরী'আতের অকাট্য ও সুস্পষ্ট কোনো বিষয়কে কেউ অস্বীকার করে, অভিযোগ করে কিংবা বিদ্রূপ করে তাহলে তাদের ঈমান চলে যাবে।
এসব নারীকে বিয়ে করে থাকলে ঈমান ভেঙে যাওয়ার কারণে সাথে সাথে সেই বিয়েও ভেঙে যাবে। ঐ অবস্থায় বাচ্চা হলে তা জারজ হবে! এবং তাওবা না করলে ইসলামী রাষ্ট্রে তাকে মুরতাদ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।
* যেসব বিষয়গুলোর কারণে ঈমান চলে যায় সেসবের মাঝে অন্যতম হচ্ছে-
* সকল বিষয়ে নারী পুরুষের সমান অধিকার। তাদের মাঝে কেবল লিঙ্গ ও গঠনাকৃতির ব্যবধান রয়েছে! বাকি সব ক্ষেত্রে পুরুষ যা করতে পারবে নারীরাও তাই করতে পারবে, এতে বাধা দেওয়া ধর্মান্ধতা ও মধ্যযুগীয় কুসংস্কার- এসব বললে ঈমান চলে যাবে। আল্লাহ বলেন,
(وليس الذكر كالأنثى)
পুরুষেরা তো নারীদের মতো নয়। [৬]
ইমাম কুরতুবী ও ইবনে ইসহাক থেকে এর ব্যাখ্যায় এনেছেন-
لأن الذكر هو أقوى على ذلك من الأنثى
কেননা পুরুষেরা এই (টীকায় উল্লিখিত মানত পূরণের) ক্ষেত্রে নারীদের তুলনায় অধিক শক্তিশালী হয়। [৭]
• বোরকা পরিধান করা ও পর্দা একটি সেকেলে ও মধ্যযুগীয় প্রথা; অনুরূপ নারীদের হিজাব ও পর্দাকে ব্যাঙ্গাত্মক ও বিদ্রুপাত্মকভাবে ট্যান্ট/তাবু, ক্ষ্যাত, জঙ্গি, ঝোপঝাড়, জঙ্গল ইত্যাদি বললেও ঈমান চলে যাবে। আল্লাহ বলেন,
﴿يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاء الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَا بِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا)
হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। [৮]
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ)
আর তোমরা যখন তাদের কাছ থেকে কিছু চাইবে, তখন পর্দার পিছন থেকে চেয়ে নাও। [১]
• আল্লাহ কুরআনে উত্তরাধিকার হিসেবে পুরুষেরা নারীদের তুলনায় দ্বিগুণ পাওয়ার বিধান রেখেছেন তা বে-ইনসাফ, আল্লাহর মেয়েদের অবহেলা করেছে ইত্যাদি বললে ঈমান চলে যাবে। আল্লাহ বলেন,
يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ)
আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের মীরাস বণ্টনের ক্ষেত্রে ওসীয়ত করছেন যে, ছেলেরা মেয়েদের দ্বিগুণ পাবে। [১০]
• পুরুষেরা নারীর উপর কর্তৃত্ববান হবে কেন? কেনই বা নারী তার স্বামীর আনুগত্য করবে? নারীরা স্বাধীন থাকবে, কারো কর্তৃত্ব ও আনুগত্য মেনে নারীরা পরাধীন থাকবে না- এমন বললে ঈমান ভেঙে যাবে। আল্লাহ বলেন,
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ)
পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল কারণ আল্লাহ একের ওপর অন্যের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। [১১]
আল্লাহ আরো বলেন,
وَلِلرِّجَالِ عَلَيْهِنَّ دَرَجَةٌ
নারীদের উপর পুরুষদের একধাপ অধিক শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে। [১২]
* পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা অযৌক্তিক, অন্যায় ব্যবস্থা, ধর্মীয় গোঁড়ামি বৈ কিছুই না ইত্যাদি বলা। অর্থাৎ, পুরুষ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থা, যেমন: অভিভাবকত্ব, সংসারের দায়ভার, রাষ্ট্র পরিচালনা, ইমামতি ইত্যাদি পুরুষ কর্তৃক সম্পাদনা হওয়া অযৌক্তিক, অন্যায় ও ধর্মীয় গোঁড়ামি; এরূপ ধারণা পোষণ করলে ঈমান থাকবে না। ১৫, ১৬ ফুটনোট দ্রষ্টব্য।
* দেশ পরিচালনায় নারী নেতৃত্ব হারাম এ কথা অস্বীকার করলে ঈমান থাকবে না। হযরত আবু বাকরাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
لما هلك كسرى قال من استخلفوا؟ قالوا ابنته فقال النبي صلى الله عليه وسلم لن يفلح قوم ولو أمرهم امرأة
যখন কিসরা পদানত হলো তখন বলতে শুনেছি- "কে তার পরবর্তী খলীফা?" বলা হলো- "তার মেয়ে।” তখন রাসূল বললেন, "সে জাতি সফলকাম হয় না, যাদের প্রধান হলো নারী।" [১৩]
হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত। রাসূল বলেন,
وإذا كان أمراؤ كم شراركم وأغنياؤكم بخلاء كم و أموركم إلى نسائكم فبطن الأرض خير لكم من ظهرها
যখন তোমাদের নেতারা তোমাদের মাঝের বদলোক হয় আর তোমাদের ধনীরা হয় কৃপণ, আর তোমাদের নেত্রী হয় নারী; তখন জমিনের পেট তার পিঠের তুলনায় তোমাদের জন্য উত্তম। (অর্থাৎ জমিনের ওপরে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু তোমাদের জন্য উত্তম।) [১৪]
عن أبي بكرة - رضي الله عنه : أن النبي - صلى الله عليه وآله وسلم- أتاه بشير يبشره بظفر خيل له، ورأسه في حجر عائشة - رضي الله عنها ، فقام، فخر الله - تعالى - ساجدا. فلما انصرف، أنشأ يسأل الرسول، فحدثه، فكان فيما حدثه من أمر العدو - وكانت تليهم امرأة، فقال النبي - صلى الله عليه وآله وسلم: " هلكت الرجال حين أطاعت النساء
হযরত আবু বাকরাহ বর্ণনা করেন, রাসুলে করীম একবার কোথাও সৈন্যদল প্রেরণ করলেন। সেখান থেকে এক ব্যক্তি বিজয়ের সুসংবাদ নিয়ে এলে বিজয়ের সুসংবাদ শুনে তিনি সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। সিজদার পর তিনি সংবাদ বাহকের কাছ থেকে বিস্তারিত বিবরণ শুনছিলেন। সংবাদদাতা বিস্তারিত বর্ণনা দান করলেন। উক্ত বিবরণে শত্রুদের ঘটনাবলির মধ্যে একটি বিষয় এও ছিল যে, একজন নারী তাদের নেতৃত্ব করছিল। রাসূলুল্লাহ একথা শুনে বললেন, “পুরুষরা যখন নারীদের আনুগত্য করা শুরু করে দেবে, তখন তারা বরবাদ-ধ্বংস হয়ে যাবে”। [১৫]
ইমাম ইবনে হাযাম বলেন, সকল ওলামায়ে কেরাম এ ব্যাপারে একমত যে, কোনো নারীর জন্য 'রাষ্ট্র প্রধান' হওয়া জায়েয নেই। [১৬]
• মুখে তালাক দিলে তালাক হবে না এবং মুখে তালাক দিলে তা পতিত হয়ে যাওয়ার বিষয়টি মানবতাবিরোধী ও বর্বর-এমন মন্তব্য করলে। অনুরূপ তিন তালাক দিয়ে দেওয়ার পর স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য আর হালাল থাকে না এ বিষয় অস্বীকার করলে ঈমান চলে যাবে। কুরআনের পরিষ্কার নির্দেশ-
الطَّلَاقُ مَرَّتَانِ فَإِمْسَاكَ بِمَعْرُوفٍ أَوْ تَسْرِيحُ بِإِحْسَانٍ)
তালাক (তথা তালাকে 'রাজঈ' হলো) দুবার পর্যন্ত। তারপর হয় নিয়মানুযায়ী রাখবে, না হয় সহৃদয়তার সঙ্গে ছেড়ে দেবে। [১৭]
عن الحسن قال نا عبد الله بن عمر أنه طلق امرأته تطليقة وهي حائض ثم أراد أن يتبعها بتطليقتين أخر اوين عند القرئين فبلغ ذلك رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال: يا بن عمر ما هكذا أمرك الله إنك قد أخطأت السنة والسنة أن تستقبل الطهر فيطلق لكل قروء قال فأمرني رسول الله صلى الله عليه وسلم فراجعتها ثم قال إذا هي طهرت فطلق عند ذلك أو أمسك فقلت يا رسول الله رأيت لو أني طلقتها ثلاثا أكان يحل لي أن أراجعها قال لا كانت تبين منك وتكون معصية
হযরত হাসান বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি আপন স্ত্রীকে হায়েয অবস্থায় এক তালাক দিয়েছিলেন, অতঃপর ইচ্ছা করলেন যে, দুই তুহুরে (হায়েয থেকে পবিত্র অবস্থায়) অবশিষ্ট দুই তালাক দিয়ে দেবেন। হুজুর এই বিষয়ে অবগত হওয়ার পর বলেন, “হে ইবনে উমার! এভাবে আল্লাহ তোমাকে হুকুম দেননি। তুমি সুন্নাতের বিপরীত কাজ করেছ (হায়য অবস্থায় তালাক দিয়ে)”। তালাকের শরী'আহ সমর্থিত পদ্ধতি হলো, 'তুহুর' বা পবিত্র হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা, প্রত্যেক 'তুহুর'-এ এক তালাক দেওয়া। তারপর রাসুলুল্লাহ 'রুজু' করার নির্দেশ দিলেন। এ জন্য আমি 'রুজু' করে নিয়েছি। অতঃপর তিনি বললেন, "সে পবিত্র হওয়ার পর তোমার এখতিয়ার থাকবে। চাইলে তুমি তালাকও দিতে পারবে, বা তাকে নিজের কাছে রাখতে পারবে।” হযরত ইবনে উমার বলেন, তারপর আমি রাসুলুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করলাম, “ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি যদি তিন তালাক দিই তখনও কি 'রুজু' করার অধিকার থাকবে?” হুজুর বলেন, "না। তখন স্ত্রী তোমার কাছ থেকে পৃথক হয়ে যাবে। এবং তোমার এই কাজ (এক সাথে তিন তালাক দেওয়া) গুনাহের কাজ বলে সাব্যস্ত হবে।" [১৮]
• পুরুষেরা যেহেতু একাধিক বিয়ে করতে পারে তাই নারীদেরও একাধিক বিয়ে করার অধিকার থাকা উচিত-এরকম ভাবলে ঈমান চলে যাবে; অথচ সে জানে যে, আল্লাহ নারীদের জন্য স্বামী থাকা অবস্থায় অন্য পুরুষকে বিয়ে করা হারাম বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন,
وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ )
তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ছাড়া কোনো সতীসাধ্বী বিবাহিতা নারী তোমাদের জন্য হারাম। [১৯]
ইমাম ইবনু কাসীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,
وَحُرِّمَ عَلَيْكُمُ الْأَجْنَبِيَّاتُ الْمُحْصَنَاتُ وَهُنَّ الْمُزَوَّجَاتُ
তোমাদের জন্য হারাম হচ্ছে বেগানা সতীসাধ্বী বিবাহিতা নারী। [২০]
ইমাম ত্ববারী তার তাফসীরে ইবনে আব্বাস থেকে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেন,
كُلُّ امْرَأَةٍ لَهَا زَوْجٌ فَهِيَ عَلَيْكَ حَرَامٌ
প্রত্যেক মহিলা যার স্বামী রয়েছে সে তোমার ওপর হারাম।
আল্লামা শানক্বিতি তার ‘আদ্বওয়াউল বায়ান’-এ এর ব্যাখায় বলেন-
الْمُرَادُ بِالْمُحْصَنَاتِ الْمُتَزَوِّجَاتُ؛ وَعَلَيْهِ فَمَعْنَى الْآيَةِ: وَحُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمُتَزَوِّجَاتُ؛ لِأَنَّ ذَاتَ الزَّوْجِ لَا تَحِلُّ لِغَيْرِهِ
এখানে আল্লাহ ‘মুহস্বানাত’ দ্বারা বিবাহিত হওয়া বুঝিয়েছেন। সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো- তোমাদের ওপর বিবাহিত নারীদের হারাম করা হলো, কেননা স্বামী আছে এমন নারী অন্যের জন্যে হালাল নয়।
এই আয়াত থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে নারী স্বামী থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ে করতে পারবে না।
• পুরুষদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একাধিক বিয়ের অধিকার রয়েছে জানা সত্ত্বেও কেউ তা অস্বীকার করলে কিংবা “আল্লাহর এই আইন আমি মানি না”, “আল্লাহর এই আইন নারীদের সাথে অন্যায়”-ইত্যাদি বললে ঈমান চলে যাবে।
আল্লাহ বলেন,
وَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تُقْسِطُوا فِي الْيَتَامَىٰ فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَلَّا تَعُولُوا
আর যদি তোমরা ভয় কর যে, এতিম মেয়েদের হক যথাযথভাবে পূরণ করতে পারবে না, তবে সেসব মেয়েদের মধ্যে থেকে যাদের ভালো লাগে তাদের বিয়ে করে নাও দুই, তিন কিংবা চারটি পর্যন্ত। আর যদি এরূপ আশঙ্কা কর যে, তাদের মধ্যে ন্যায় সংগত আচরণ বজায় রাখতে পারবে না, তাহলে একটিই (বিবাহ কর) অথবা তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসীদেরকে। [২১]
তবে স্বামীর একাধিক বিয়ের বিষয়ে আল্লাহর আইন মেনে নিয়ে কোনো নারী যদি স্বভাবসুলভ আচরণ থেকে ঈর্ষা করে কিংবা স্বামীকে একাধিক বিয়ে না করতে অনুরোধ করে তাহলে তা ঈমান ভঙ্গের কারণ বলে বিবেচিত হবে না।
• কুরআনে লেনদেনের ক্ষেত্রে দুইজন নারীর সাক্ষী এবং একজন পুরুষের সাক্ষীর যেই তুলনা রয়েছে, তা যদি কেউ অস্বীকার করে বলে- "সাক্ষীর ক্ষেত্রে নারী পুরুষ এক, তাদের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই”; “এগুলো মোল্লাদের বানানো নীতি” ইত্যাদি, সেক্ষেত্রে ঈমান চলে যাবে। অনুরূপ আল্লাহ -এর এই বিধানকে অযৌক্তিক ও অনৈতিক বললেও ঈমান থাকবে না।
সব ক্ষেত্রে দুজন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান হয় না। কিন্তু উল্লিখিত বিষয়টি কুরআনে সুস্পষ্ট। আল্লাহ বলেন,
(وَاسْتَشْهِدُوا شَهِيدَيْنِ مِنْ رِجَالِكُمْ فَإِنْ لَمْ يَكُونَا رَجُلَيْنِ فَرَجُلٌ وَامْرَأَتَانِ مِمَّنْ تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاءِ أَنْ تَضِلَّ إِحْدَاهُمَا فَتُذَكَّرَ إِحْدَاهُمَا الْأُخْرَى)
অতঃপর তোমাদের নিজেদের মধ্যে দুজন পুরুষকে সাক্ষী বানাও। তখন যদি দুজন পুরুষের আয়োজন না করা যায়, তাহলে একজন পুরুষ ও যাদের সাক্ষীর ব্যাপারে তোমরা আস্থাশীল এমন দুজন নারী বেছে নাও, যাতে একজন ভুল করলে অন্যজন স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।[২২]
উপরে উল্লিখিত ১০টি বিষয় রয়েছে যা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত। এর বাহিরেও ইসলামের এধরনের অকাট্যভাবে প্রমাণিত বিষয়াবলি ও ইসলামের শি'আর তথা নির্দেশনাবলি অস্বীকার করলে অথবা তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করলে ঈমান চলে যাবে। এটিই চার মাযহাবসহ সকল উম্মাহর ঐক্যবদ্ধ মত। মহান আল্লাহ বলেন,
وَلَئِن سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ قُلْ أَبِاللهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُم بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞাস কর, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক-ঠাট্টা করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রাসুলের সাথে ঠাট্টা করছিলে? তোমাদের কোনো ওজর চলবে না, তোমরা ঈমান আনার পর কাফির হয়ে গেছ।[২৩]
ইমাম ইবনুল হুমাম আল হানাফী বলেন,
مناط التكفير هو : التكذيب أو الاستخفاف بالدين
তাকফীরের মূল উপাদানই হচ্ছে দ্বীনি কোনো বিষয় মিথ্যা প্রতিপন্ন করা অথবা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা। [২৪]
ইমাম ইবনু নুজাইম আল হানাফী বলেন,
من تكلم بكلمة الكفر هازلا ، أو لاعبا، كفر عند الكل، ولا اعتبار باعتقاده، كما صرح به قاضي خان في فتاواه بـ
কেউ কোনো কুফরি কথা ঠাট্টা করে, দুষ্টুমি কিংবা খেল তামাশার ছলে করলে সে সকলের ঐক্যমতে কুফুরি করেছে। এক্ষেত্রে তার ঈমান ও আক্বীদা ধর্তব্য হবে না। যেমনটি কাযী খান তাঁর ফাতাওয়ায় স্পষ্ট করেছেন।
জেনে-বুঝে ইচ্ছাকৃতভাবে বললে সকলের ঐকমত্যে তাকে কাফির সাব্যস্ত করা হবে। তবে কেউ যদি ভুলঃবশত কিংবা অন্তরে ঘৃণা রেখে (বাধ্য হয়ে) বলে থাকে, তাহলে সকলের ঐকমত্য এই যে, তাকে তাকফির করা হবে না। [২৫]
ইমাম ইবনু রজব আল হাম্বলী এর মতে, "মুসলিম ও ঈমানদার ব্যক্তি ইসলামের কোন একটি রুকন কে অস্বীকার করলেও ঈমানহীন হয়ে যাবে।”[২৬]
ইমাম ইবনু নুজাইম আল হানাফী এর মতে, "শরী'আতের অকাট্যভাবে প্রমাণিত কোনো হারামকে হালাল মনে করলে তাকে কাফির সাব্যস্ত করতে হবে।”[২৭]
মুল্লা আলী কারী আল হানাফী বলেন, "যখন অকাট্যভাবে কোনো গুনাহ প্রমানিত হবে চাই সেটা সগীরাহ গুনাহ হোক কিংবা কবীরাহ গুনাহ হোক, তা হালাল মনে করা এবং এমনিভাবে তা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা সুস্পষ্ট কুফুরি...” [২৮]
ইমাম ইবনুল আরাবী আল মালেকী এই প্রকৃতির ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কুফর ও রিদ্দাহ (ধর্মচ্যুত) হওয়ার হুকুম পেশ করেছেন এবং যতক্ষণ না তারা খালেস তাওবা করবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ মাফ করবেন না বলে মত দিয়েছেন এবং এ ব্যাপারে তিনি ইজমার দাবি করেছেন। [২৯] ইমাম নববী বলেন,
الردة هي قطع الإسلام بنية، أو قول كفر، أو فعل، سواء قاله استهزاء، أو عنادا، أو اعتقادا
রিদ্দাহ তথা ইসলামচ্যুত হওয়া হচ্ছে- স্বেচ্ছায় ইসলাম ত্যাগ করা, কুফুরি কথা বলা বা কুফুরি কাজ করা; যদিও মজা করে কিংবা বিদ্বেষ করে অথবা অন্তর থেকে সায় দিয়েই বলে থাকুক না কেন। [৩০]
ইমাম ইবনু কুদামাহ বলেন,
ومن سب الله تعالى كفر ، سواء كان مازحاً أو جادًا وكذلك من استهزأ بالله تعالى، أو بآياته أو برسله، أو كتبه
যে ব্যক্তি আল্লাহ কে গালি দেয়, হোক মজা করে কিংবা স্বেচ্ছায়; অনুরূপভাবে কেউ আল্লাহ, তাঁর আয়াত, তাঁর রাসূলগণ অথবা তাঁর কিতাবসমূহ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে সে কুফরি করল। [৩১]
ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ একে কুফর বলেছে,
إن الاستهزاء بالله و آياته ورسوله كفر، يكفر به صاحبه بعد إيمانه
মহান আল্লাহ, তার আয়াত ও তার রাসূলকে নিয়ে ঠাট্টা মশকারা করা (সুস্পষ্ট) কুফর। এধরনের ব্যক্তিকে ঈমান আনয়নের পরেও কাফির ঘোষণা করা হবে। [৩২]
ইমাম ক্বাযী ইয়ায আল মালেকী এ-ও অনুরূপ ফতোয়া দিয়েছেন [৩৩] এবং মালেকী মাযহাবের অন্যান্য ইমামগণও এ ব্যাপারে একমত। [৩৪]
ইমাম ইবনু কুদামা বলেন,
من اعتقد حلّ شيء أجمع على تحريمه وظهر حكمه بين المسلمين وزالت الشبهة فيه للنصوص الواردة فيه كلحم الخنزير والزنا وأشباه هذا مما لا خلاف فيه كفر
যে ব্যক্তি এমন একটি হারাম বিষয়কে হালাল করল, যার হারাম হওয়ার ব্যাপারে উম্মতের ইজমা রয়েছে ও তার বিধান সুস্পষ্ট এবং 'নস' থাকার কারণে উক্ত বিধান সন্দেহমুক্ত, যেমন: শুকরের মাংস, জিনা ইত্যাদি বিষয় যে হালাল করবে তার কুফুরির ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। [৩৫]
আল্লামা শাওকানী -ও এই বলে উল্লেখ করেছেন যে, শরী'আতে অকাট্যভাবে প্রমাণিত কোন বিষয় অস্বীকার করলে কিংবা তার হারাম হুকুমকে হালাল জ্ঞান করলে সে কাফির হয়ে যায়। [৩৬]
টিকাঃ
[৬] সূরা আলে ইমরান- ৩৬, আল্লাহ এখানে নারী ও পুরুষের মাঝে পার্থক্য করেছেন। মূলত উক্তিটি মারইয়াম ০-এর মায়ের। তিনি একটি পুত্র সন্তানের জন্য মানত করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি দেখলেন তাঁর কন্যা সন্তান হয়েছে। তখন তিনি উক্তিটি এই উদ্দেশ্যে করলেন যে, তিনি যেই মানত করেছেন তা তো কন্যা সন্তানের মাধ্যমে সম্পাদনা করা সম্ভব না। কেননা পুরুষেরা তো নারীদের মতো নয় আর নারীরা তো পুরুষদের মতো নয় উক্ত মানত পূরণ করার ক্ষেত্রে。
[৭] তাফসীরে কুরতুবী- ৬/৩৩৫
[৮] সূরা আহযাব- ৫৯
[১] সূরা আহযাব- ৫৩
[১০] সূরা নিসা- ১১
[১১] সূরা নিসা- ৩৪
[১২] সূরা বাক্বারাহ- ২২৮
[১৩] সহীহ বুখারী- ৬৬৮৬; সুনানে তিরমিযী- ২২৬২; সুনানে নাসায়ী কুবরা- ৫৯৩৭; সুনানে বায়হাকী কুবরা- ৪৯০৭
[১৪] সুনানে তিরমিযী, হাদীস- ২২৬৬
[১৫] মুসতাদরাকে হাকীম- ৪/২৯১, হাদীস ৭৮৭০; আখবারু আসবাহান ২/৩৪; মুসনাদে আহমাদ ৫/৪৫- ইমাম হাকেমের মতে এর সনদ সহীহ এবং যাহাবী একে সমর্থন করেছেন।
[১৬] মারাতিবুল ইজমা, ইবনে হাযাম, পৃষ্ঠা- ১২৬
[১৭] সূরা বাক্বারাহ- ২২১
[১৮] সুনানে দারা কুতনী- ২/৪৩৮ হাঃ৮৪; যাদুল মা'আদ- ২/২৫৭; সুনানে বায়হাকী কুবরা- ১৪৭৩২
[১৯] সূরা নিসা- ২৪
[২০] তাফসীরে ইবনু কাসীর- ১/৪২৯
[২১] সূরা নিসা- ৩
[২২] সূরা বাকারা- ২৮২
[২৩] সূরা আত তওবা- ৬৫ থেকে ৬৬
[২৪] আল মাসাঈরাহ- ৩১৮
[২৫] আল বাহরুর রায়েক- ৫/২১০
[২৬] আল জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম- ১/৩৪৪
[২৭] আল বাহরুর রায়েক- ৫/১৩২
[২৮] শারহু ফিকহিল আকবার- ১০৬
[২৯] আল জামে লি আহকামিল কুরআন, কুরত্ববী- ৮/১৯৭
[৩০] গনী আল মুহতাজ-৪/১৩৩-১৩৪
[৩১] আল মুগনী, কিতাবুল মুরতাদ- ১২/২৯৮-২৯৯
[৩২] মাজমুউল ফাতাওয়া- ৭/২৮৩, ১৫/৪৮
[৩৩] আশ শিফা- ২/১০৭৩
[৩৪] আশ শারহুস সগীর- ৬/১৪৮-১৪৯; হাশিয়াতুদ দাসুকী- ৪/৩০৪; বুলগাতুস সালেক, সাউই- ২/৪১৮; হাশিয়ায়ে খিরাশি আলা মুখতাসারিল খলীল- ৭/৬৫
[৩৫] আল মুগনী- ৮/১৩১
[৩৬] আদ দাওয়াউল আজিল ফী দফয়িল আদুউইস সয়িল- ৩৪
📄 পুরুষই কেন নারীর অভিভাবক?
মানুষ যখন থেকে সামাজিকভাবে বসবাস শুরু করেছে তখন থেকেই নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা অনূভুত হইয়েছে। কারণ, একাধিক মানুষ যখন একত্রিত হয় তখন চিন্তাধারার তারতম্যের কারণে মতের ভিন্নতা দেখা দেয়। এমতাবস্থায় নেতৃত্বস্থানে কাউকে না কাউকে বসতেই হয়, যে সমস্ত বিষয় পরিচালনা করবে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে। মানব ইতিহাস সাক্ষী; এই যাবৎ অনেক জনপদ, দেশ ও সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে নেতৃত্বের অনুপস্থিতির কারণে বা সঠিক নেতৃত্বের অভাবে। আল্লাহ বলেন,
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ)
পুরুষেরা নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ তাদের এককে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এজন্যে যে, পুরুষেরা তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে। [৩৭]
উপরোক্ত আয়াত থেকে আমরা জানতে পারি, আল্লাহ এর নির্দেশনা হচ্ছে নারীদের জন্য অভিভাবক তাদের স্বামী। কারণ হিসেবে উল্লেখ হয়েছে- তিনি এককে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। মানব জীবনের স্তরে স্তরে কেউ কখনো দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়, আবার কখনো বা সে হয় অধীনস্থ। এই রীতির অনুপস্থিতিতে মানব জীবনের গতিধারা চিন্তা করাও মুশকিল।
একটা পরিবারে দায়িত্বশীল কাউকে না কাউকে তো হতেই হবে। তাই আল্লাহ সেই দায়িত্ব আরোপ করেছেন পুরুষদেরকে আর দায়িত্বের দিক থেকে নারীর উপর পুরুষ শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছে। কেননা সে সংসারের চালিকাশক্তি। সংসার সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার পেছনে পুরুষের বড় একটা অবদান হলো এই যে, সে অর্থের জোগান দেয়। এদিকে সন্তানদের দায়িত্ব আরোপিত হয়েছে মূলত মায়েদের ওপরই। এভাবেই প্রতিটি মানুষই কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত আবার কিছু ক্ষেত্রে অধীনস্থ। কিন্তু সাধারণ এই বিষয়টিকে নারীবাদীরা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাদের কথা হচ্ছে সংসারে কেউ কারও ওপর প্রাধান্য পাবে না। দুজনই থাকবে সমানে সমানে। তাদের এই থিউরি অবলম্বন করেই আজ আমাদের সমাজে প্রতিনিয়তই শত শত দাম্পত্য জীবন কাঁচের মতো ভেঙে বিনাশ হয়ে যাচ্ছে, হু হু করে বেড়ে চলছে তালাকের সংখ্যা।
মা-বাবা আমাদের ওপর দায়িত্বপ্রাপ্ত। আমরা কি কখনও বলি যে, মা-বাবা আর সন্তান কেউ কারও ওপর দায়িত্বশীল হবে না, সবাই সমান? অথবা দেশের নেতৃত্ব স্থানীয় প্রধানকে টেনে হেঁচড়িয়ে গদি থেকে নামিয়ে কেউ কি বলবে যে, জনগণ সবাই সমান, কাউকে প্রধানমন্ত্রী হয়ে দেশের দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজন নেই! অথবা অফিসের ম্যানেজার বা চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসারের টাই ধরে চেয়ার থেকে উঠিয়ে দিয়ে কেউ কি কখনও বলেছে যে, সব কর্মকর্তা-কর্মচারী সমানভাবে কাজ করবে, কেউ কারও উপর দায়িত্বশীল থাকবে না, কেউ কারও ওপর ক্ষমতা দেখাবে না! স্যালারিও সবার সমানে সমান! এই বিষয়গুলো যেমন হাস্যকর ঠিক তেমনি, সংসারে কেউ প্রধান দায়িত্বশীল থাকবে না এমন ভাবাটাও বোকামি।
টিকাঃ
[৩৭] সূরা নিসা- ৩৪