📄 বিপরীত লিঙ্গের সাথে চ্যাট করা, পোস্টে কমেন্ট করা
শরঈ কোনো ওজর না থাকলে এভাবে বেগানা ছেলে-মেয়ের একে অপরের সাথে চ্যাটিং করা গুনাহের কাজ। আর শরঈ দৃষ্টিতে সিদ্ধ কোনো প্রয়োজনে কথা বলা কিংবা চ্যাটিং করার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম হচ্ছে মাহরাম সহকারে ম্যাসেঞ্জার গ্রুপ খুলে প্রয়োজনীয় কথা বলা। রাসূল ﷺ বলেছেন,
لا يخلون رجل بامرأة إلا كان ثالثهما الشيطان
কোনো পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত হলে নিঃসন্দেহে তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান। (অর্থাৎ তখন শয়তান তাদের মনে কুমন্ত্রণা দেয়)। [১৬]
আরেক বর্ণনায় এসেছে,
لا يخلون رجل بامرأة إلا ومعها ذو محرم، ولا تسافر المرأة إلا مع ذي محرم)، فقام رجل فقال: يا رسول الله، إن امرأتي خرجت حاجة، وإني اكتتبتُ في غزوة كذا وكذا، قال: (انطلق فحج مع امر أتك)؛
"মাহরাম পুরুষ ছাড়া যেন কোনো নারী কোনো পুরুষের সাথে নির্জনে মিলিত না হয় এবং মাহরাম ছাড়া কোনো নারী যেন একা সফর না করে।" এক ব্যক্তি দাড়িয়ে গিয়ে বললেন- “হে আল্লাহর রাসূল! ﷺ আমি তো অমুক অমুক যুদ্ধে নিজের নাম লিখিয়ে নিয়েছি আর আমার স্ত্রী (একা) হজ্জের সফরে বের হয়েছে।" নবী ﷺ বললেন- "এখান থেকে উঠো এবং তোমার স্ত্রীর সাথে গিয়ে হজ্জ করো। [১৭]
আ'তা ইবনু আবী রবাহ থেকে বর্ণিত,
لو انتمنت على بيت مال لكنت أميناً، ولا آمن نفسي على أمة شوهاء
যদি আমাকে বাইতুল মালের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, আমি অবশ্যই বিশ্বস্ত থাকতে পারব। কিন্তু আমি আমার নাফস তথা প্রবৃত্তিকে কোনো কুৎসিত দাসীর নিকটও নিরাপদ ও বিশ্বস্ত মনে করিনা! [১৮]
সুতরাং নির্জনে কথা-বার্তা বলার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ কেউই গুনাহ থেকে নিরাপদ নয়। অনলাইনের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মাঝে যোগাযোগ স্থাপন খুবই সহজ। এখানে মানুষের লজ্জাবোধটা একটু কম কাজ করে থাকে। এই কারণে প্রায়ই দেখা যায় নারীদের ইনবক্সে দ্বীনি দাওয়াত (!) নিয়ে পুরুষেরা হানা দিয়ে থাকে। কিছু নারী একে নিছক দ্বীনি দাওয়াত মনে করেই ম্যাসেজের রিপ্লাই দিয়ে দেয় আর এরপর থেকেই দুইয়ের মাঝে হয়তো নিয়মিত কথা চলতে থাকে। সেই কথা এতটা দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে যে তা দ্বীনিদের জন্য অভাবনীয়। একেই বলা হয় নেক সুরতে শয়তানের ধোঁকা। তাই এ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। পরবর্তী দারসে আমরা এ বিষয় নিয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পারবো ইন শা আল্লাহ।
টিকাঃ
[১৬] জামে তিরমিযী- ৪/৪৬৫, হাদীস- ২১৬৫; সুনানে নাসায়ী- ৫/৩৮৭, হাদীস- ৯২১৯; সহীহ ইবনু হিব্বান- ১০, ১৫/৪৩৬, ১২২, হাদীস- ৪৫৭৬,৬৭২৮; মুসনাদে আহমাদ- ৩/৪৪৬, হাদীস- ১৫৭৩৪; আদ দ্বিয়া ফিল আহাদীসিল মুখতারাহ- ১/১৯১-১৯২, হাদীস- ১৬
[১৭] সহীহ বুখারী- ৩/১০৯৪, হাদীস- ২৮৪৪; সহীহ মুসলিম- ২/৯৭৮, হাদীস- ১৩৪১
[১৮] সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, যাহাবী- ৯/৯৬; হিলইয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াইম তরজমা নং- ২৪৪
📄 গাইরে মাহরাম পুরুষের দিকে দৃষ্টিপাত
পুরুষের মতো নারীদেরকেও গাইরে মাহরাম পুরুষদের দিকে তাকাতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন,
وَقُل لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ
মু'মিনা নারীদের বলুন! তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। [১৯]
ইমাম ইবনু কাসীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,
أي: عما حرم الله عليهن من النظر إلى غير أزواجهن، ولهذا ذهب كثير من العلماء إلى أنه لا يجوز للمرأة أن تنظر إلى الرجال الأجانب بشهوة، ولا بغير شهوة- أصلاً
তারা যাতে তাদের স্বামী ব্যতীত অন্য কোনো পরপুরুষের দিকে দৃষ্টিপাত না করে। এই জন্যই অধিকাংশ আলিমদের মতে- কামনার সহিত হোক কিংবা কামনা-বাসনা ব্যতীত হোক, উভয় অবস্থাতেই নারীদের জন্য বেগানা পুরুষের দিকে তাকানো নাজায়েয। [২০]
এর পরিপ্রেক্ষিতে জমহুরদের দলিল হচ্ছে,
أم سلمة حدثته أنها كانت عند رسول الله صلى الله عليه وسلم وميمونة قالت فبينا نحن عنده أقبل ابن أم مكتوم فدخل عليه وذلك بعد ما أمرنا بالحجاب فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم احتجبا منه فقلت يا رسول الله أليس هو أعمى لا يبصرنا ولا يعرفنا فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم أفعميا وان أنتما ألستما تبصرانه
উম্মে সালামাহ ও মাইমুনা নবীজি-এর নিকট বসা ছিলেন এমতাবস্থায় অন্ধ সাহাবী ইবনে উম্মে মাকতুম আসলেন। নবীজি বললেন, "তোমরা তার সামনে পর্দা করো (অর্থাৎ পর্দার অন্তরালে চলে যাও, তাকে দেখো না)।” আমি (উম্মে সালামাহ) বললাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! উনি তো অন্ধ, আমাদের তো দেখছেনও না আবার আমাদের চিনেনও না।" নবী বললেন, "(সে নাহয় দেখছে না কিন্তু) তোমরা কি অন্ধ? তোমরা কি দেখো না!?" [২১]
আল্লাহ বলেন,
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ)
যখন তোমরা নারীদের নিকট প্রয়োজনীয় কোনো কিছু চাইবে তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার বিষয় [২২]
এই আয়াতে কারীমা থেকে অনেকগুলো বিষয় অনুধাবন করা যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-
◆ নারী ও পুরুষ একে অপরকে দেখবেনা, জরুরি কোন বিষয় হলে পর্দার আড়াল থেকে আদান-প্রদান হবে।
◆ আল্লাহ নারী-पुरुष একে অপরের সাথে দেখা না হওয়ার মাধ্যমে উভয়ের অন্তরকে অধিকতর পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন। এতে দৃঢ় হলো, ফিতনা না থাকলেও বেগানা পুরুষের দিকে নারীরা তাকাবে না।
অপরপক্ষে ইমাম ইবনু কাসীর অধিকাংশ আলিমদের মত উল্লেখ করার পর বলেন,
وذهب آخرون من العلماء: إلى جواز نظر هن إلى الأجانب بغير شهوة، كما ثبت في الصحيح أن رسول الله صلى الله عليه وسلم جعل ينظر إلى الحبشة وهم يلعبون بحرا بهم يوم العيد في المسجد، وعائشة أم المؤمنين تنظر إليهم من ورائه، وهو يسترها منهم حتى ملت و رجعت
তবে আরেকদল উলামাগণ কামনা-বাসনা বিহীন অবস্থায় বেগানা পুরুষের দিকে তাকানো জায়েয বলেছেন। যেমনটি রাসূলুল্লাহ থেকে সহীহ সুত্রে প্রমানিত যে, তিনি ঈদের দিন হাবশীদের খেলা দেখছিলেন সাথে আয়েশা আল্লাহর রাসূল এর পিছন থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে খেলা দেখছিলেন, আর আল্লাহর রাসূল আম্মাজানকে তাদের থেকে পর্দাবৃত করছিলেন.....। [২৩]
এই হাদীসকে অনেকেই আবার পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার আগের ঘটনা বলে দাবি করেন আবার কেউ কেউ এর খণ্ডনে বলে থাকেন এটি পর্দার বিধান নাযিল হওয়ার পরে।
মোটকথা, যারা জায়েযের পক্ষে তারা মূলত ফিতনা না হওয়ার ও কামনা-বাসনা দৃষ্টিতে না তাকানোর শর্তে জায়েয বলেছেন। এই হাদীস আম্মাজানের শানে এসেছে। এটি প্রতীয়মান যে, তিনি নিঃসন্দেহে নির্মল ও পবিত্র চরিত্রের অধিকারিণী ছিলেন, সে হিসেবে তার থেকে ফিতনা ও কামনা-বাসনার আশা করাই বোকামি। কিন্তু বর্তমান ফিতনা ও যৌনতায় রোগাক্রান্ত এই সমাজে ফিতনা ও শাহওয়াত থেকে বাঁচাটা খুব মুশকিল। আর শাহওয়াত তথা কামনা-বাসনার দৃষ্টিতে তাকালে সকল উলামার নিকটই তা অবৈধ।
টিকাঃ
[১৯] সূরা নূর- ৩১
[২০] তাফসীরে ইবনু কাসীর- ৬/৪৫
[২১] তিরমিযী- ২৭৭৮; আবু দাউদ- ৪১১২; নাসায়ী- ৯১৯৭; ইবনে রাহউইয়াহ- ৪/৮৫,১৬০; আহমাদ- ৬/২৯৬; আবু ইয়ালা- ১২/৩৫৩ হাদীস- ৬৯২২; মুশকিলুল আসার, ত্বহাবী- ১/২৬৫; ইবনে হিব্বান- ১২/৩৮৭-৩৮৯; সুনানে কুবরা, বাইহাক্বী- ৭/৯২; ইবনে আব্দিল বার- ১৯/১৫৫; খত্নীব- ৩/১৮; ইবনে আসাকির- ৫৪/৪৩৫; মিযযী- ২৯/৩১৩; মু'জামুল কাবীর, ত্ববারানী- ২৩/৩০২, হাদীস- ৬৭৮; তাফসীরে ইবনু কাসীর- ৬/৪৫, সূরা নূর- ৩১ এর তাফসীর। সনদটির সার্বিক বিবেচনায় অধিকাংশ মুহাদ্দিসই একে হাসান ও সহীহ বলেছেন। তবে কেউ কেউ সনদে উল্লিখিত নাবহানের কারণে হাদীসটির সনদকে যঈফ বলেছেন।
[২২] সূরা আহযাব- ৫৩
[২৩] তাফসীরে ইবনু কাসীর- ৬/৪৫; সহীহ বুখারী- ৪৫৪, ৫১৯০; সহীহ মুসলিম- ৮৯২; সুনানে নাসায়ী- ৪/১৯৫; মুসনাদে আহমাদ- ২৪৭৬৫
📄 পুরুষদেরকে সালাম দেওয়া বা সালামের জবাব দেওয়ার বিধান
বিনা প্রয়োজনে পর পুরুষকে সালাম দেওয়া ঠিক নয়। তবে প্রকাশ থাকে যে, পরপুরুষের সাথে কোনো বেগানা নারীর কথা বলার প্রয়োজন হলে তখন কথার শুরুতে সালাম আদান-প্রদান করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে পর্দার বিষয়ে খুব সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া পরপুরুষের সাথে কথা বলার যেই আদব কুরআন মাজীদে উল্লিখিত রয়েছে তার প্রতি লক্ষ্য রাখবে। অর্থাৎ, কোমলতা পরিহার করে স্বাভাবিকভাবে শুধু প্রয়োজনীয় কথাটুকু বলবে। [২৪] তবে শাফেয়ী মাযহাবে ফিতনার আশঙ্কা না থাকলে সালাম দেওয়াকে জায়েয বলা হয়েছে। [২৫]
টিকাঃ
[২৪] ফাতাওয়া তাতারখানিয়া- ১৮; আলমুহীতুল বুরহানী- ৮/২৩; রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ৫/৩২৬; ফাতাওয়া সিরাজিয়া- ৭২
[২৫] ফাতহুল বারী- ১১/৩৭; আওজাযুল মাসালিক- ১৭/১৮০, হাদীস- ১৭২৮; উমদাতুল কারী- ২২/৩৭৮-৩৭৯
📄 নারী ও পুরুষের সহশিক্ষার বিধান
আল্লাহ নারী-পুরুষের মাঝে সৃষ্টিগত ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হিসেবেই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি একটি বিশেষ আকর্ষণ প্রদান করেছেন। নারী ও পুরুষ জাতির মাঝে এই পারস্পরিক আকর্ষণ একদমই স্বাভাবিক। কিন্তু মহান আল্লাহ সৃষ্টির সকল জীব ও ব্যবস্থাপনার মাঝে একটি ভারসাম্য ও সীমারেখা নির্দিষ্ট করেছেন। শরী'আহসম্মত বিবাহ ও শরী'আহ নির্ধারিত মাহরাম ব্যতীত কোনো নারী-পুরুষ একে অপরের সাথে অযথা সাক্ষাৎ করা কিংবা উঠবস করা অথবা অবাধে মেলামেশা হয় এমন পরিবেশে অবস্থান করা জায়েয নেই। আল্লাহ বলেন,
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا )
তিনি ওই সত্তা, যিনি তোমাদের একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন। এবং এর মাঝ থেকেই তিনি তোমাদের একে অপরের (বৈবাহিক) জোড়া নির্ধারণ করেছেন, যাতে করে সে তার কাছে স্বস্তি পেতে পারে। [২৬]
এই আয়াতে আল্লাহ নারী ও পুরুষকে তার নির্ধারিত সীমারেখার মাঝে অবস্থানের রূপরেখা দেখিয়েছেন। সুতরাং বৈবাহিক সম্পর্ক ও আল্লাহ যাদের সাথে বিবাহ হারাম করেছেন তারা ব্যতীত বেগানা নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইসলামে নিষেধ সেটি হোক শিক্ষা ক্ষেত্রে কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রে। আল্লাহ কুরআনে পরিষ্কারভাবে বলেন,
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ
আর তোমরা তাঁর (নবী -এর) স্ত্রীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাঁদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার বিষয়। [২৭]
ইমাম কুরতুবী উক্ত আয়াতের আলোচনায় বলেন, এই আয়াতে আল্লাহ রাসূলুল্লাহ -এর স্ত্রীদের কাছে কোনো প্রয়োজনে পর্দার আড়াল থেকে কিছু চাওয়া বা কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করার অনুমতি দিয়েছেন। অন্যান্য সকল মু'মিন নারীরাও উপরোক্ত হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। [২৮] কিন্তু গুনাহে লিপ্ত হবার সম্ভাবনা থাকলে তাও জায়েয নেই। রাসূল ইরশাদ করেন,
فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ ، وَالْأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الاسْتِمَاعُ، وَالنِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ وَالْيَدُزِنَاهَا الْبَطْشُ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى ، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ
চোখের জিনা হলো—(হারام) দৃষ্টিপাত। কর্ণদ্বয়ের জিনা হলো—(গাইরে মাহরামের যৌন উদ্দীপক) কথাবার্তা মনযোগ দিয়ে শোনা। জিহ্বার জিনা হলো-(গাইরে মাহরামের সাথে সুড়সুড়িমূলক) কথোপকথন। হাতের জিনা হলো-(গাইরে মাহরামকে) ধরা বা স্পর্শকরণ। পায়ের জিনা হলো- (খারাপ উদ্দেশ্যে) চলা। অন্তর চায় এবং কামনা করে আর লজ্জাস্থান তাকে বাস্তবে রূপ দেয় (যদি জিনা করে) এবং মিথ্যায় পরিণত করে (যদি অন্তরের চাওয়া অনুপাতে জিনা না করে)। [২৯]
রাসূল আরও বলেছেন,
لا يخلون رجل بامرأة إلا كان ثالثهما الشيطان
কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে নির্জনে মিলিত না হয়। কেননা শয়তান তাদের ৩য় জন হয়! (অর্থাৎ শয়তান তাদের পরস্পরের মাঝে কুমন্ত্রণা প্রদান করে। [৩০]
আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল বলেন,
لا يخلون رجل بامرأة إلا ومعها ذو محرم، ولا تسافر المرأة إلا مع ذي محرم، فقام رجل فقال: يا رسول الله، إن امرأتي خرجت حاجة، وإني اكتُتِبْتُ في غزوة كذا وكذا، قال: انطلق فحج مع امرأتك؛
মাহরাম পুরুষ ছাড়া যেন কোনো নারী কোনো পুরুষের সাথে নির্জনে মিলিত না হয় এবং মাহরাম ছাড়া কোনো নারী যেন একা সফর না করে। এক ব্যাক্তি দাঁড়িয়ে গিয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমি তো অমুক অমুক যুদ্ধে নিজের নাম লিখিয়ে নিয়েছি আর আমার স্ত্রী (একা) হজ্জের সফরে বের হয়েছে।” নবী বললেন- "এখান থেকে উঠো এবং তোমার স্ত্রীর সাথে গিয়ে হজ্জ করো।” [৩১]
আ'তা ইবনু আবী রবাহ থেকে বর্ণিত,
لو انتمنت على بيت مال لكنت أميناً، ولا آمن نفسي على أمة شوهاء
যদি আমাকে বাইতুলমালের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, আমি অবশ্যই বিশ্বস্ত থাকতে পারব। কিন্তু আমি আমার নিজের নফসকে (প্রবৃত্তিকে) কোনো কুৎসিত দাসীর নিকটও নিরাপদ ও বিশ্বস্ত মনে করি না! [৩২]
উপরে উল্লেখিত বিষয়সমূহ উপেক্ষা করে অবাধ মেলামেশায় লিপ্ত হওয়া একেবারেই অসম্ভব। এছাড়া পুরুষের মতোই নারীদের ক্ষেত্রেও গাইরে মাহরাম পুরুষদের দিকে তাকানো জায়েয নেই, যা আমরা পূর্বেও জেনেছি। সহশিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে নারী- পুরুষের একে অপরের সাথে অবাধ মেলামেশা, দৃষ্টিপাত, কথাবার্তা ইত্যাদির মাধ্যমে শরী'আহ লঙ্ঘন কোনো না কোনোভাবে হয়েই যায়। মোদ্দাকথা হলো, সহশিক্ষার পরিবেশে শরী'আতের বিধান পালন সম্ভবপর হয় না। সুতরাং সহশিক্ষা ও নারী- পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইসলামী শরী'আহ কখনই সমর্থন করে না।
উপরন্তু আল্লাহর বিধানের বিপরীতে সমাজব্যবস্থা আজ পর্দার এমন লঙ্ঘন করছে যে, এর ফলে সমাজে যুবক-যুবতিদের মাঝে যেমন নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে তেমনি সমাজে বেড়েছে অবৈধ সন্তানের হিড়িক। আর এই বেপর্দার অভিশাপ আজকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে পোহাতে হচ্ছে। অবৈধ যৌনাচার, অশ্লীলতা, অবৈধ উপার্জন, খুন, ধর্ষণসহ বহুবিধ অপরাধের মূল কারণ হচ্ছে এই পর্দাহীনতা এবং নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা।
টিকাঃ
[২৬] সূরা আ'রাফ- ১৮৯
[২৭] সূরা আহযাব- ৫৩
[২৮] তাফসীরে কুরতুবী- ১৪/২২৭
[২৯] সহীহ মুসলিম- ২৬৫৭; মুসনাদে আহমাদ-৮৯৩২
[৩০] জামে তিরমিযী- ৪/৪৬৫, হাদীস- ২১৬৫; সুনানে নাসায়ী- ৫/৩৮৭ হাদীস- ৯২১৯; সহীহ ইবনু হিব্বান- ১০, ১৫/৪৩৬, ১২২, হাদীস- ৪৫৭৬, ৬৭২৮; মুসনাদে আহমাদ- ৩/৪৪৬, হাদীস- ১৫৭৩৪; আদ দ্বিয়া ফিল আহাদীসিল মুখতারাহ- ১/১৯১ ও ১৯২, হাদীস- ১৬
[৩১] সহীহ বুখারী- ৩/১০৯৪, হাদীস- ২৮৪৪; সহীহ মুসলিম- ২/৯৭৮, হাদীস- ১৩৪১
[৩২] সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, যাহাবী- ১/৯৬; হিলইয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াইম তরজমা- ২৪৪