📄 গাইরে মাহরামদের সাথে কথা বলার বিধান
পর্দার আড়াল থেকে বেগানা পুরুষের সাথে প্রয়োজনীয় কথা বলা জায়েয। তবে বিনা প্রয়োজনে গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে কথাবার্তা বলা যাবে না। তদ্রূপ জরুরতবশত কথা বললেও যদি গুনাহে পতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে তবে সেক্ষেত্রেও তাদের সাথে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। আর প্রয়োজনবশত কথা বলার ক্ষেত্রেও কোমলতা পরিহার করে কথা বলতে হবে। [৭০]
কুরআন মাজীদে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
﴿يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَعْرُوفًا )
হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা অন্যান্য নারীদের মতো নও। তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় পাও তবে আকর্ষণমূলক কোমল ভঙ্গিতে কথা বলো না। কেননা যাদের অন্তর রোগাক্রান্ত তারা তোমাদের প্রতি আকৃষ্ট হবে ও (তাদের অন্তরে) লালসা-বাসন জাগবে। বরং তোমরা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বল। [৭১]
ইমাম ত্ববারী তার তাফসীরে (২০/২৫৮) এর ব্যাখ্যায় বলেন,
فلا تلن بالقول للرجال فيما يبتغيه أهل الفاحشة منكن
পুরুষদের সাথে কোমল কন্ঠে কথা বলবে না যেভাবে কথা বললে লম্পট ও দুশ্চরিত্র প্রকৃতির পুরুষেরা তোমাদেরকে কামনা করে।
হযরত আয়েশা এর নিকট মাসআলা বা হাদীসের প্রয়োজনে অন্যান্য সাহাবিগণ আসলে, তিনি মুখের ওপর হাত রেখে কণ্ঠ বিকৃত করে পর্দার আড়ালে থেকে কথা বলতেন যেন কারো অন্তর ব্যাধিগ্রস্থ না হয়। [৭২]
ইমাম কুরতুবী তার তাফসীরে (১৪/১৭৭) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,
كانت الحال عليه في نساء العرب من مكالمة الرجال بترخيم الصوت ولينه، مثل كلام المريبات والمومسات فنها هن عن مثل هذا
পুরুষদের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে আরবের মহিলাদের অবস্থা এমন ছিল যে, তারা মিষ্টি ও নরম আওয়াজে কথা বলত যেমনটি বাজে ও বাজারী মেয়েরা বলে থাকে! তাই আল্লাহ তাদের (মুমিনাদের) এমনভাবে কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছেন।
একইভাবে পুরুষের জন্যও বিনা প্রয়োজনে কোনো বেগানা নারীর সাথে কথা বলা নিষেধ।
আল্লাহ বলেন,
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ)
আর তোমরা তাঁর (রাসূলুল্লাহ -এর) স্ত্রীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাঁদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র। [৭৩]
ইমাম কুরতুবী উক্ত আয়াতের আলোচনায় বলেন,
في هذه الآية دليل على أن الله تعالى أذن في مسألتهن من وراء حجاب، في حاجة تعرض، أو مسألة يستفتين فيها، ويدخل في ذلك جميع النساء بالمعنى، وبما تضمنته أصول الشريـ من أن المرأة كلها عورة
উক্ত আয়াতে আল্লাহ রাসূলুল্লাহ -এর স্ত্রীদের কাছে কোনো প্রয়োজনে পর্দার আড়াল থেকে কিছু চাওয়া বা কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করার অনুমতি দিয়েছেন। অন্যান্য সকল মু'মিনা নারীগণও উপরোক্ত হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। [৭৪]
কিন্তু গুনাহে লিপ্ত হবার সম্ভাবনা থাকলে এটিও জায়েয নেই। রাসূল ইরশাদ করেন,
فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ ، وَالْأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الاسْتِمَاعُ، وَالنِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ وَالْيَدُزِنَاهَا الْبَطْشُ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ
চোখের জিনা হল (হারাম) দৃষ্টিপাত। কর্ণদ্বয়ের জিনা হলো, (গাইরে মাহরামের যৌন উদ্দীপক) কথাবার্তা মনোযোগ দিয়ে শোনা। জিহবার জিনা হলো, (গাইরে মাহরামের সাথে সুড়সুড়িমূলক) কথোপকথন। হাতের জিনা হলো, (গাইরে মাহরামকে) ধরা বা স্পর্শকরণ। পায়ের জিনা হলো, (খারাপ উদ্দেশ্যে) চলা। অন্তর চায় ও কামনা করে এবং লজ্জাস্থান তাকে বাস্তবে রূপ দেয় (যদি জিনা করে) অথবা মিথ্যায় পরিণত করে (যদি অন্তরের চাওয়া অনুপাতে জিনা না করে)। [৭৫]
টিকাঃ
[৭০] সূরা আহযাব- ৩২,৫৩; তাফসীরে ইবনে কাসীর- ৩/৭৬৮; সহীহ মুসলিম- ২০৩৮; আহকামুল কুরআন, জাসসাস- ৩/৩৫৯; রদ্দুল মুহতার- ১/৪০৬
[৭১] সূরা আহযাব- ৩২
[৭২] তাফসীরে কুরতুবী- ১৪/৬৫৮
[৭৩] সূরা আহযাব- ৫৩
[৭৪] তাফসীরে কুরতুবী- ১৪/২২৭
[৭৫] সহীহ মুসলিম- ২৬৫৭, মুসনাদে আহমাদ- ৮৯৩২
📄 ছেলে বন্ধু, কাজিন, বিয়ের কথা চলছে/বিয়ে পাকা হয়ে গেছে
উপরের মাসআলাসমূহ থেকে আমরা জানতে পারছি যে, বিনা প্রয়োজনে বেগানা পুরুষদের সাথে কথা বলা নাজায়েয। এমনকি প্রয়োজনেও নাজায়েয যদি ফিতনার সম্ভাবনা থাকে এবং এই বিধান সুস্পষ্ট। দ্বীন সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান যে রাখে সেও এই বিষয়ে অবগত। তবুও আফসোস, অনেক পর্দানশীল বোনদের যত্রতত্র দেখা যায় গাইরে মাহরাম পুরুষদের সাথে বেশ অন্তরঙ্গতার সাথেচলাফেরা করছে।
• ফ্রি মিক্সিং-এর যুগে এসে বাবা-মাকে বুঝিয়ে বে-দ্বীনি শিক্ষার পরিবেশ থেকে সরে আসতে পারে না অনেকেই। ফলে ইচ্ছার বিরুদ্ধেই অনেককেই ভর্তি হতে হয় এমন কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কো-এডুকেশনের নামে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ করে দিয়েছে এই বিষাক্ত সমাজ। তাই এমনটা অনেক সময়ই দেখা যায় যে, কলেজ-ভার্সিটি পড়ুয়া বোনেরা পর্দাও করছে, সেই সাথে পুরুষ ক্লাসমেট/ছেলে বন্ধুদের সাথে সাধারণ কথা-বার্তাও চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই একটা সময় ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। এরপর দেখা যায় 'ছেলে বন্ধু' নির্দ্বিধায় শরীরেএর স্বাধারণ অঙ্গে হাত পর্যন্ত দিয়ে দেয়। তারপর সে হয়তো হারাম সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত বা আহ্বানও করে বসতে পারে। অনেকেই ভাবতে পারে হয়তো তার ছেলে বন্ধুটি তার মতোই সকল বিষয়ে সুধারণা রাখে, বিয়ের উদ্দেশ্যে প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছে। অথচ একজন পুরুষের চিন্তাধারা একজন নারীর মতো সহজ-সরল নয়। সেই পুরুষের মনে কি ভয়ানক চিন্তার জট বেঁধে থাকতে পারে তা অকল্পনীয়। আর সেই পুরুষ চাইবে তার কামনাকে বাস্তবে রূপ দিতে। সত্যিই যদি সেই পুরুষ তার কামনাকে বাস্তবে রূপান্তর করতে পারে তাহলে সে হয়তো সাময়িক প্রশান্তি লাভ করবে, কিন্তু একজন নারী হারাবে তার সম্ভ্রম। খেয়াল করলে বোঝা যায় ধ্বংসের শুরুগুলো হয় সেই প্রাথমিক কথা-বার্তা থেকেই। তাই এই বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে। যারা কলেজ-ভার্সিটিতে এখনো উঠেনি তারা প্রথমত চেষ্টা করবে বাবা-মাকে বোঝাতে, কো-এডুকেশন রয়েছে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে যাতে ভর্তি হতে বাধ্য না করে। এরপরও যদি বাবা-মা না বুঝে তাহলে আগ থেকেই এই বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার পর থেকে কোনোমতেই কোনো পুরুষ ক্লাসমেট যাতে কথা বলার কোনো সুযোগ না পায়। যদি কেউ প্রথমবারের মতো কথা বলতে আসে তাহলে তার কথার কোনো জবাব না দিয়ে উপেক্ষা করলেই পরবর্তীতে সে আর কথা বলার জন্য আগাবে না আশা করা যায়। খুব প্রয়োজন হলেও নারী সহপাঠিদের কাছ থেকেই সাহায্য নিতে হবে। পুরুষ সহপাঠির থেকে সাহায্য নেওয়ার কথা ভাবাও যাবে না। আর যারা পর্দা করা সত্ত্বেও ইতিমধ্যে ছেলে বন্ধুদের সাথে মিশে গিয়েছেন তাদের এই বিষয়টা গুরুত্বের সাথে ভাবা উচিত। এতে আল্লাহ নারাজ হচ্ছেন। তাই আন্তরিক তওবা করে এই পাপাচার থেকে ফিরে আসতে হবে যত কষ্টই হোক না কেন।
◆ অনেক একান্নবর্তী ঘরে অর্থাৎ জয়েন্ট ফ্যামিলিতে দেখা যায় চাচাতো-মামাতো ভাই- বোনেরা একই ছাদের নিচে বসবাস করে। এমন পরিস্থিতিতে নারী-পুরুষ ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে কাজিনদের মাঝে খুবই সখ্যতা গড়ে ওঠে। বাবা-মায়েরাও কিছু বলে না, যেহেতু তারা ভাই-বোনের মতোই! বাহির থেকে দেখে সাধারণ মানুষেরা বলতেই পারে যে, তারা আপন ভাই-বোনের চেয়েও বেশি। কিন্তু এতে আল্লাহর বিধান বিন্দু পরিমাণ পরিবর্তিত হবে না। চাচাতো, মামাতো ভাইয়েরা নারীদের জন্য গাইরে মাহরাম। একজন সাধারণ পুরুষের সাথে পর্দার যেরূপ বিধান তাদের সাথেও পর্দার একই বিধান।
• বিয়ের পূর্বে পাত্র-পাত্রী একে অপরকে দেখে নেওয়া মুস্তাহাব। মাহরামের উপস্থিতিতে কথা-বার্তার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় বিষয়াদি জানিয়ে দেওয়া বা জেনে নেওয়াও জায়েয। কিন্তু অনেক সময় শয়তান এই জায়েয বিষয়টাকে পুঁজি বানিয়ে জিনার দিকে নারী-পুরুষকে উস্কে দেয়। দেখা যায় 'এই বিষয়টা জানানো দরকার'; 'সেই বিষয়টা জানালে ভালো হয়' করতে করতে দিনকে দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে, অনলাইনে বা সরাসরি কথা হতে থাকে পাত্রীর মাহরামের অনুপস্থিতিতেই। একটা সময়ে কিছুটা আবেগময়ী কথা হতে থাকে দুজনের মাঝে। এরপর থেকে বিয়ের আগেই জিনার দরজা খুলে যায়। অনেকে আবার 'বিয়ে তো হবেই' ভেবে আরো অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায়। তারপর স্বভাবগতভাবেই হোক বা শয়তান প্ররোচনায়, যখন সেই পুরুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তখন সেই নারী নিজেকে পায় সর্বহারা অবস্থায়। তাই বিয়ের পূর্বে জিনা থেকে বেঁচে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। শয়তানের ওয়াসওয়াসা কেমন হতে পারে সে সম্পর্কে ওয়াকিফহাল থাকতে হবে।
একজন নারী যখন বোরকা, খিমার, জিলবাব ও নিকাবের মতো দামি পোশাকগুলো গায়ে জড়িয়ে নেয় তখন তার মাথায় রাখা উচিত যে, তার পরিধেয় এই পোশাকটি ইসলামকে উপস্থাপন করে। এই পোশাক পরিহিত অবস্থায় সে যখন অন্য পুরুষদের সাথে রাস্তা-ঘাটে ঘনিষ্ঠভাবে ঘুরাফেরা করে, ভার্সিটি-ক্যাম্পাসে আন্তরিকভাবে কথা- বার্তা বলে তখন সেটা আরও দশ জনের চোখে পড়ে। এরপর সেই সাধারণ মানুষগুলো 'বোরকাওয়ালীরা বেশি খারাপ' ধরণের কথাবার্তা বলতে থাকে। এতে ইসলামের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। সেই সাথে বেকায়দায় পড়তে হয় সেই বোনগুলোকেও যারা আল্লাহকে ভয় করে পরিপূর্ণ পর্দা করছে এবং এসব গুনাহর কাজ থেকে বিরত থাকছে।
সাদা কাপড়ে ময়লা যেমন বেশি লাগে ঠিক তেমনি ইসলাম মেনে চলার চেষ্টা করছে কিন্তু সামান্য বিচ্যুতি রয়েছে এমন কিছু দেখলেও সাধারণ মানুষ সেটার ওপর বেশি আলোকপাত করে। আর এই 'বোরকাওয়ালীরা বেশি খারাপ' টাইপ কথাগুলো শুনতে হয় তাদেরকেও যারা সত্যিকার অর্থে, নির্ভুলভাবে পর্দা করছে। আমার বিচ্যুতি যাতে আরেকজনের মন্দ কথা শোনার কারণ না হয়ে দাঁড়ায় অন্তত এই ভেবে ফিরে আসা উচিত।