📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 নাবালক ছেলেদের সামনে পর্দা

📄 নাবালক ছেলেদের সামনে পর্দা


পূর্ণ বালেগ হওয়ার আগ পর্যন্ত ছেলেদের সামনে অনেক নারীই পর্দা করে না। এমনকি তাদের সামনে শরীরের বিশেষ অঙ্গসমূহ ঢেকে রাখারও প্রয়োজন মনে করা হয় না। অথচ কুরআন মাজীদে সূরা নূরের ৩১ নং আয়াতে পর্দার হুকুম থেকে মুক্ত ব্যক্তিদের আলোচনা এসেছে, যেখানে আল্লাহ ইরশাদ করেন, "তারা যেন... যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও এমন বালক যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।"

উক্ত আয়াতে সেসকল অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালকদের বোঝানো হয়েছে, যারা এখনো সাবালকত্বের নিকটবর্তী হয়নি সেই সাথে নারীদের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ, কমনীয়তা ও গতিবিধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ বে-খবর; তাদেরকে পর্দার হুকুমের আওতামুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

পক্ষান্তরে যে বালক নারীদের এসব অবস্থা সম্পর্কে সচেতন, সে বয়সের দিক থেকে সাবালকত্বে না পৌঁছলেও তার সামনে নারীদের পর্দা করা ওয়াজিব। ফক্বীহগণ সাবালকত্বের এ হুকুম অবস্থাভেদে ১০ বছর থেকেও শুরু হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং বালেগ হয়নি কিংবা ১৫ বছর হয়নি বলেই এ বয়সের ছেলেদেরকে গাইরে মাহরাম নারীদের মহলে যেতে দেওয়া অন্যায়। তদ্রূপ নারীদের জন্যও এ বয়সের ছেলেদের সামনে বেপর্দা চলাফেরা করা গুনাহ। [৬৪]

টিকাঃ
[৬৪] মাআরিফুল কুরআন- ৬/৪০৫, তাফসীরে কুরতুবী- ১২/১৫৭, তাফসীরে মাজহারী- ৬/৫০১, আল মুফাসসাল ফী আহকামিন নিসা- ৩/১৭৬-১৭৭, আহসানুল ফাতাওয়া- ৩৬-৪০

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 ফাসিকা ও অমুসলিম নারীদের সামনে পর্দা

📄 ফাসিকা ও অমুসলিম নারীদের সামনে পর্দা


ফাসিকা (পাপিষ্ঠা) ও অমুসলিম নারীর সামনে চেহারা ঢেকে পর্দা করা জরুরি নয়। কিন্তু এই ভয় থেকে যায় যে তারা গাইরে মাহরাম পুরুষদের সামনে উক্ত নারীর শরীরের আকৃতি ও সৌন্দর্য বর্ণনা করবে। তাই তাদের সামনে শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশ করা ও শরীরের আবৃত অংশ খোলা যাবে না। হযরত উমার বলেন,
فإنه لا يحل لإمرأة تؤمن بالله واليوم الآخر أن ينظر الي عورتها إلا أهل الملة
যে নারী আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর বিশ্বাস রাখে তার জন্য স্বজাতি ছাড়া অন্য কারো (বিধর্মী মহিলার) সম্মুখে শরীরের আবৃত অংশ প্রকাশ করা জায়েয নয়। [৬৫]

তবে জরুরত ব্যতীত অমুসলিম মেয়েদের সামনেও পর্দা করা হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী মাযহাব ও ইমাম আহমাদ থেকে সুস্পষ্ট মত রয়েছে।[৬৬]

টিকাঃ
[৬৫] সুনানে বাইহাক্কী- ৭/৯৫; তাফসীরে কুরত্ববী- ১২/২১৬; তাফসীরে ইবনে কাসীর- ৩/৪৫৫; সুনানে সায়ীদ ইবনে মানসূর-এর বরাতে。
[৬৬] ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ৫/৩২৭; রদ্দুল মুহতার ৬/৩৭১; মাজমাউল আনহুর- ২/৫৩৯; মুনতাক্কাল ইয়ান' (হাশিয়াতুস সুয়ূত্বী আলার রউদ্ব)- ৫/৩৭১; হাশিয়াতুদ দাসূকী- ১/২১৩; ফাতহুল কাদীর, শাওকানী- ৪/৩২; আসনাল মাত্বালিব- ৩/১১১; বুলগাতুস সালেক- ১/১৯২; মুগনীল মুহতাজ- ৩/১৩১; আল মুগনী- ৭/৪৬৪; তাফসীরে ইবনে কাসীর- ২/৬০১-৬০২; তাফসীরে কুরত্ববী- ১২/২১৫-২১৬; আহকামুল কুরআন, জাসসাস- ৩/৩১৮; তাফসীরে তাবারী- ১৮/৯৫; সূরা নূরের ৩১ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 নেককার মুসলিমা ও মাহরাম পুরুষদের সামনে মহিলাদের আওরাহ

📄 নেককার মুসলিমা ও মাহরাম পুরুষদের সামনে মহিলাদের আওরাহ


একজন মুসলিমাহ নারীর জন্য অন্যান্য দ্বীনদার মুসলিমাহ নারীদের সামনে অত্যাবশকীয় আওরাহ হচ্ছে নাভীর নিচ থেকে হাটু পর্যন্ত। এমনকি একে অপরের পিঠ ও পেট উভয়ই দেখতে পারবে। এই ব্যাপারে হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলীদের রাজেহ (প্রণিধানযোগ্য) মত এটিই।

এবং ফাসিকা (পাপিষ্ঠা), অমুসলিম নারী ও মাহরাম পুরুষদের সামনে নারীগণ সর্বোচ্চ মাথা, চেহারা, দুই হাত, দুই পা, ঘাড় ইত্যাদি উন্মুক্ত রাখতে পারবে। বাকি শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না এবং শরীরের আবৃত অংশ খুলবে না।[৬৭] বিশিষ্ট তাবে'য়ী হাসান বসরী বলেন, "নিজ ভাইয়ের সামনেও নারীদের ওড়না ছাড়া থাকা উচিত নয়।”[৬৮]

প্রখ্যাত তাবে'য়ী আতা' ইবনে আবী রাবাহ বলেন, "মাহরাম পুরুষের সামনে মেয়েদের মাথা ঢেকে রাখাই আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়। অবশ্য মাহরাম তা দেখে ফেললে গুনাহ হবে না।”[৬১]

টিকাঃ
[৬৭] সহীহ মুসলিম- ৩৩৮; আল মাবসূত্ব, সারাখসী- ১০/১৪৮, ১০/২৫৪; বাহরুর রায়েক- ৮/২১৯; হাশিয়াতুদ দাসুকী- ১/২১৫; বুলগাতুস সালেক- ১/১৯৩; মাওয়াহেবুল খলীল- ২/১৮০; নেহায়াতুল মুহতাজ- ৬/১৯৫; আল মাজম্ শরহুল মুহাযযাব- ৩/১৬৭; রওদাতুত ত্বলেবীন- ৭/২১; আর রওদুল মুরবি'- ১/৩৩২; মুগনীল মুহতাজ- ৪/২১৪; আল ইনসাফ- ৮/২০; মাজমূ'উ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েলে ইবনু উসাইমীন- ১২/২৬৮; আল মাওসূয়াতু ফিকহিয়্যাহ কুয়েতিয়্যাহ- ৪০/৩৫৮,৩৫৯
[৬৮] মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা- ১/৩৭৩
[৬৯] প্রাগুক্ত, কিতাবুল আসল- ৩/৪৮; বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২৯১

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 গাইরে মাহরামদের সাথে কথা বলার বিধান

📄 গাইরে মাহরামদের সাথে কথা বলার বিধান


পর্দার আড়াল থেকে বেগানা পুরুষের সাথে প্রয়োজনীয় কথা বলা জায়েয। তবে বিনা প্রয়োজনে গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে কথাবার্তা বলা যাবে না। তদ্রূপ জরুরতবশত কথা বললেও যদি গুনাহে পতিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে তবে সেক্ষেত্রেও তাদের সাথে কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। আর প্রয়োজনবশত কথা বলার ক্ষেত্রেও কোমলতা পরিহার করে কথা বলতে হবে। [৭০]

কুরআন মাজীদে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
﴿يَا نِسَاءَ النَّبِيِّ لَسْتُنَّ كَأَحَدٍ مِنَ النِّسَاءِ إِنِ اتَّقَيْتُنَّ فَلَا تَخْضَعْنَ بِالْقَوْلِ فَيَطْمَعَ الَّذِي فِي قَلْبِهِ مَرَضٌ وَقُلْنَ قَوْلًا مَعْرُوفًا )
হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা অন্যান্য নারীদের মতো নও। তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় পাও তবে আকর্ষণমূলক কোমল ভঙ্গিতে কথা বলো না। কেননা যাদের অন্তর রোগাক্রান্ত তারা তোমাদের প্রতি আকৃষ্ট হবে ও (তাদের অন্তরে) লালসা-বাসন জাগবে। বরং তোমরা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বল। [৭১]

ইমাম ত্ববারী তার তাফসীরে (২০/২৫৮) এর ব্যাখ্যায় বলেন,
فلا تلن بالقول للرجال فيما يبتغيه أهل الفاحشة منكن
পুরুষদের সাথে কোমল কন্ঠে কথা বলবে না যেভাবে কথা বললে লম্পট ও দুশ্চরিত্র প্রকৃতির পুরুষেরা তোমাদেরকে কামনা করে।

হযরত আয়েশা এর নিকট মাসআলা বা হাদীসের প্রয়োজনে অন্যান্য সাহাবিগণ আসলে, তিনি মুখের ওপর হাত রেখে কণ্ঠ বিকৃত করে পর্দার আড়ালে থেকে কথা বলতেন যেন কারো অন্তর ব্যাধিগ্রস্থ না হয়। [৭২]

ইমাম কুরতুবী তার তাফসীরে (১৪/১৭৭) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,
كانت الحال عليه في نساء العرب من مكالمة الرجال بترخيم الصوت ولينه، مثل كلام المريبات والمومسات فنها هن عن مثل هذا
পুরুষদের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে আরবের মহিলাদের অবস্থা এমন ছিল যে, তারা মিষ্টি ও নরম আওয়াজে কথা বলত যেমনটি বাজে ও বাজারী মেয়েরা বলে থাকে! তাই আল্লাহ তাদের (মুমিনাদের) এমনভাবে কথা বলতে নিষেধ করে দিয়েছেন।
একইভাবে পুরুষের জন্যও বিনা প্রয়োজনে কোনো বেগানা নারীর সাথে কথা বলা নিষেধ।

আল্লাহ বলেন,
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ)

আর তোমরা তাঁর (রাসূলুল্লাহ -এর) স্ত্রীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাঁদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্র। [৭৩]

ইমাম কুরতুবী উক্ত আয়াতের আলোচনায় বলেন,
في هذه الآية دليل على أن الله تعالى أذن في مسألتهن من وراء حجاب، في حاجة تعرض، أو مسألة يستفتين فيها، ويدخل في ذلك جميع النساء بالمعنى، وبما تضمنته أصول الشريـ من أن المرأة كلها عورة

উক্ত আয়াতে আল্লাহ রাসূলুল্লাহ -এর স্ত্রীদের কাছে কোনো প্রয়োজনে পর্দার আড়াল থেকে কিছু চাওয়া বা কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করার অনুমতি দিয়েছেন। অন্যান্য সকল মু'মিনা নারীগণও উপরোক্ত হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। [৭৪]

কিন্তু গুনাহে লিপ্ত হবার সম্ভাবনা থাকলে এটিও জায়েয নেই। রাসূল ইরশাদ করেন,
فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ ، وَالْأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الاسْتِمَاعُ، وَالنِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ وَالْيَدُزِنَاهَا الْبَطْشُ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ

চোখের জিনা হল (হারাম) দৃষ্টিপাত। কর্ণদ্বয়ের জিনা হলো, (গাইরে মাহরামের যৌন উদ্দীপক) কথাবার্তা মনোযোগ দিয়ে শোনা। জিহবার জিনা হলো, (গাইরে মাহরামের সাথে সুড়সুড়িমূলক) কথোপকথন। হাতের জিনা হলো, (গাইরে মাহরামকে) ধরা বা স্পর্শকরণ। পায়ের জিনা হলো, (খারাপ উদ্দেশ্যে) চলা। অন্তর চায় ও কামনা করে এবং লজ্জাস্থান তাকে বাস্তবে রূপ দেয় (যদি জিনা করে) অথবা মিথ্যায় পরিণত করে (যদি অন্তরের চাওয়া অনুপাতে জিনা না করে)। [৭৫]

টিকাঃ
[৭০] সূরা আহযাব- ৩২,৫৩; তাফসীরে ইবনে কাসীর- ৩/৭৬৮; সহীহ মুসলিম- ২০৩৮; আহকামুল কুরআন, জাসসাস- ৩/৩৫৯; রদ্দুল মুহতার- ১/৪০৬
[৭১] সূরা আহযাব- ৩২
[৭২] তাফসীরে কুরতুবী- ১৪/৬৫৮
[৭৩] সূরা আহযাব- ৫৩
[৭৪] তাফসীরে কুরতুবী- ১৪/২২৭
[৭৫] সহীহ মুসলিম- ২৬৫৭, মুসনাদে আহমাদ- ৮৯৩২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00