📄 নারীর মাহরাম ও বিস্তারিত মাহরাম চার্ট
﴿ وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِ بْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِ بْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴾
আর ঈমানদার নারীদেরকে বলে দাও তাদের দৃষ্টি অবনত রাখতে আর তাদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করতে, এবং তাদের শোভা সৌন্দর্য প্রকাশ না করতে, যা এমনিতেই প্রকাশিত হয় তা ব্যতীত। তারা যেন তাদের ঘাড় ও বুক মাথার কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, নিজেদের মহিলাগণ, স্বীয় মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনামুক্ত পুরুষ আর নারীদের অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া অন্যের কাছে নিজেদের শোভা প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজেদের গোপন শোভা প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। [৬২]
যাদের সামনে পর্দা করতে হবে না বা পর্দার ক্ষেত্রে শিথিলতা রয়েছে-
১. স্বামী- স্বামীকে দেখা দেওয়া, সৌন্দর্য প্রদর্শন করা, তার সাথে ঘনিষ্ঠ সময় কাটানো জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। তার সামনে কোনো প্রকার পর্দা করতে হবে না।
২. পিতা, দাদা, নানা ও তাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ- আপন পিতা, সৎ পিতা এবং দুধ পিতা মাহরাম। অন্য যেকোনো প্রকারের পিতা যেমন: ধর্মীয় পিতা, পালক পিতা ও উকিল পিতা মাহরাম নন। আর আপন দাদা বা নানা এবং দাদা-নানার ও দাদী-নানীর আপন ভাই, দুধ ভাই, সৎ ভাই মাহরাম। তেমনি দাদা-দাদী ও নানা-নানীর পিতা, তাদের নানা-দাদা... এভাবে যত উপরেই যাক, সবাই মাহরাম।
৩. শ্বশুর, আপন দাদা-নানা শ্বশুর এবং তাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ- আপন শ্বশুর ও দুধ শ্বশুর মাহরাম। তবে সৎ শ্বশুর যেমন- শাশুড়ির প্রাক্তন বা পরবর্তী স্বামী মাহরাম নন। ঠিক তেমনি আপন দাদা বা নানা শ্বশুর ও দুধ দাদা বা নানা শ্বশুর মাহরাম। সৎ দাদা বা নানা শ্বশুর, মামা শ্বশুর, চাচা শ্বশুর, খালু শ্বশুর ও ফুফা শ্বশুর কেউই মাহরাম নন।
৪. পুত্র, কন্যার স্বামী, পুত্রের পুত্র, কন্যার পুত্র- আপন পুত্র, দুধ পুত্র ও স্বামীর অন্য স্ত্রী বা পূর্বের স্ত্রীর গর্ভে স্বামীর ঔরসজাত পুত্র মাহরাম। কিন্তু পালক পুত্র, ধর্মীয় পুত্র ও সতীনের পূর্বের স্বামীর ঔরসজাত পুত্র মাহরাম নন। অপরদিকে আপন পুত্রের পুত্র বা আপন কন্যার পুত্র, সৎ পুত্রের পুত্র বা সৎ কন্যার পুত্র, দুধ পুত্রের পুত্র বা দুধ কন্যার পুত্র ও তাদের অধস্তন পুরুষরাও মাহরামভুক্ত। কিন্তু তাদের পালক পুত্র ও ধর্মীয় পুত্র মাহরাম নয়। অনুরূপ আপন কন্যার কন্যার স্বামী এবং দুধ কন্যার কন্যার স্বামী এভাবে যত নিচের দিকে যাক সবাই মাহরামভুক্ত। তবে সৎ কন্যার স্বামী, অনুরূপ অধস্তন কেউ মাহরাম নয়।
৫. ভাই- আপন ভাই, সৎ ভাই ও দুধ ভাই অর্থাৎ আপন মায়ের দুধ পুত্র, দুধ মায়ের আপন, সৎ, দুধ পুত্র মাহরাম। সৎ বাবা অথবা সৎ মায়ের অন্য ঘরের পুত্র মাহরাম না। এ ছাড়া চাচাতো, খালাতো, মামাতো, ফুফাতো ভাই, দুলাভাই, দেবর ও ভাসুর মাহরাম নয়।
৬. ভাতিজা- আপন ভাইয়ের পুত্র, সৎ ভাইয়ের পুত্র, দুধ ভাইয়ের পুত্র মাহরাম।
৭. ভাগিনা- আপন বোনের পুত্র, সৎ বোনের পুত্র, দুধ বোনের পুত্র মাহরাম।
৮. চাচা- আপন চাচা, সৎ চাচা ও দুধ চাচা অর্থাৎ আপন পিতার দুধ ভাই, দুধ পিতার আপন ভাই, আপন বাবার সৎ ভাই মাহরাম। কিন্তু ফুফা, সৎ বাবার ভাই মাহরাম না।
৯. মামা- আপন মামা, সৎ মামা ও দুধ মামা অর্থাৎ আপন মায়ের দুধ ভাই, দুধ মায়ের আপন ভাই, আপন মায়ের সৎ ভাই মাহরাম। তবে খালু, সৎ মায়ের ভাই মাহরাম নয়।
১০. নাবালক- এমন বালক যার মাঝে নারীদের প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই।
১১. অন্যান্য নারী- নারীদের সামনে নারীকে পর্দা করতে হবে না। তবে কাফির ও ফাসিক নারীদের সামনে শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। [৬৩]
উপরে বর্ণিত মাহরামের তালিকা ব্যতীত পৃথিবীর সকল পুরুষ নারীদের জন্য এবং সকল নারী পুরুষদের জন্য গাইরে মাহরাম।
টিকাঃ
[৬২] সূরা নুর- ৩১
[৬৩] সূরা নূর- ৩১; সহীহ বুখারী- ২৬৪৫; সুনানে তিরমিযী- ১১৪৬; সহীহ বুখারী শরহে কুসতুল্লানিসহ- ৯/১৫০; ফাতহুল বারী- ৯/১৩৮; সহীহ মুসলিম বি শারহিন নাবাবি- ১০/২২; তুহফাতুল আহওয়াযী- ৪/২৫৪; তাফসীরে রাযী- ২৩/২০৬; তাফসীরে কুরতুবী- ১২/২৩২, ২৩৩; তাফসীরে আলুসী- ১৮/১৪৩; ফাতহুল বায়ান ফি মাকাসিদ আল-কুরআন- ৬/৩৫২; আহকামুল কুরআন- ৩/৩১৭; তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন- ২/২৫৬-৩৬১; তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন- ৬/৪০১-৪০৫; তাফসীরে মাযহারী- ২/২৫৪-২৬১ ও ৬/৪৯৭-৫০২; শরহু মুসলিম, নববী- ৯/১০৫; উমদাতুল কারী- ৭/১২৮; বাদায়েউস সানায়ে- ২/৩০০; রদ্দুল মুহতার ২/৪৬৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/২১৯; তাবয়ীনুল হাকায়েক- ২/২৪৩; তাফসীরে রুহুল মাআনী- ৪/২৫২; আলবাহরুর রায়েক- ৩/৯৩
📄 নাবালক ছেলেদের সামনে পর্দা
পূর্ণ বালেগ হওয়ার আগ পর্যন্ত ছেলেদের সামনে অনেক নারীই পর্দা করে না। এমনকি তাদের সামনে শরীরের বিশেষ অঙ্গসমূহ ঢেকে রাখারও প্রয়োজন মনে করা হয় না। অথচ কুরআন মাজীদে সূরা নূরের ৩১ নং আয়াতে পর্দার হুকুম থেকে মুক্ত ব্যক্তিদের আলোচনা এসেছে, যেখানে আল্লাহ ইরশাদ করেন, "তারা যেন... যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও এমন বালক যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।"
উক্ত আয়াতে সেসকল অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালকদের বোঝানো হয়েছে, যারা এখনো সাবালকত্বের নিকটবর্তী হয়নি সেই সাথে নারীদের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ, কমনীয়তা ও গতিবিধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ বে-খবর; তাদেরকে পর্দার হুকুমের আওতামুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
পক্ষান্তরে যে বালক নারীদের এসব অবস্থা সম্পর্কে সচেতন, সে বয়সের দিক থেকে সাবালকত্বে না পৌঁছলেও তার সামনে নারীদের পর্দা করা ওয়াজিব। ফক্বীহগণ সাবালকত্বের এ হুকুম অবস্থাভেদে ১০ বছর থেকেও শুরু হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং বালেগ হয়নি কিংবা ১৫ বছর হয়নি বলেই এ বয়সের ছেলেদেরকে গাইরে মাহরাম নারীদের মহলে যেতে দেওয়া অন্যায়। তদ্রূপ নারীদের জন্যও এ বয়সের ছেলেদের সামনে বেপর্দা চলাফেরা করা গুনাহ। [৬৪]
টিকাঃ
[৬৪] মাআরিফুল কুরআন- ৬/৪০৫, তাফসীরে কুরতুবী- ১২/১৫৭, তাফসীরে মাজহারী- ৬/৫০১, আল মুফাসসাল ফী আহকামিন নিসা- ৩/১৭৬-১৭৭, আহসানুল ফাতাওয়া- ৩৬-৪০
📄 ফাসিকা ও অমুসলিম নারীদের সামনে পর্দা
ফাসিকা (পাপিষ্ঠা) ও অমুসলিম নারীর সামনে চেহারা ঢেকে পর্দা করা জরুরি নয়। কিন্তু এই ভয় থেকে যায় যে তারা গাইরে মাহরাম পুরুষদের সামনে উক্ত নারীর শরীরের আকৃতি ও সৌন্দর্য বর্ণনা করবে। তাই তাদের সামনে শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশ করা ও শরীরের আবৃত অংশ খোলা যাবে না। হযরত উমার বলেন,
فإنه لا يحل لإمرأة تؤمن بالله واليوم الآخر أن ينظر الي عورتها إلا أهل الملة
যে নারী আল্লাহ ও আখিরাতের ওপর বিশ্বাস রাখে তার জন্য স্বজাতি ছাড়া অন্য কারো (বিধর্মী মহিলার) সম্মুখে শরীরের আবৃত অংশ প্রকাশ করা জায়েয নয়। [৬৫]
তবে জরুরত ব্যতীত অমুসলিম মেয়েদের সামনেও পর্দা করা হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী মাযহাব ও ইমাম আহমাদ থেকে সুস্পষ্ট মত রয়েছে।[৬৬]
টিকাঃ
[৬৫] সুনানে বাইহাক্কী- ৭/৯৫; তাফসীরে কুরত্ববী- ১২/২১৬; তাফসীরে ইবনে কাসীর- ৩/৪৫৫; সুনানে সায়ীদ ইবনে মানসূর-এর বরাতে。
[৬৬] ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ৫/৩২৭; রদ্দুল মুহতার ৬/৩৭১; মাজমাউল আনহুর- ২/৫৩৯; মুনতাক্কাল ইয়ান' (হাশিয়াতুস সুয়ূত্বী আলার রউদ্ব)- ৫/৩৭১; হাশিয়াতুদ দাসূকী- ১/২১৩; ফাতহুল কাদীর, শাওকানী- ৪/৩২; আসনাল মাত্বালিব- ৩/১১১; বুলগাতুস সালেক- ১/১৯২; মুগনীল মুহতাজ- ৩/১৩১; আল মুগনী- ৭/৪৬৪; তাফসীরে ইবনে কাসীর- ২/৬০১-৬০২; তাফসীরে কুরত্ববী- ১২/২১৫-২১৬; আহকামুল কুরআন, জাসসাস- ৩/৩১৮; তাফসীরে তাবারী- ১৮/৯৫; সূরা নূরের ৩১ নং আয়াতের ব্যাখ্যায়
📄 নেককার মুসলিমা ও মাহরাম পুরুষদের সামনে মহিলাদের আওরাহ
একজন মুসলিমাহ নারীর জন্য অন্যান্য দ্বীনদার মুসলিমাহ নারীদের সামনে অত্যাবশকীয় আওরাহ হচ্ছে নাভীর নিচ থেকে হাটু পর্যন্ত। এমনকি একে অপরের পিঠ ও পেট উভয়ই দেখতে পারবে। এই ব্যাপারে হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলীদের রাজেহ (প্রণিধানযোগ্য) মত এটিই।
এবং ফাসিকা (পাপিষ্ঠা), অমুসলিম নারী ও মাহরাম পুরুষদের সামনে নারীগণ সর্বোচ্চ মাথা, চেহারা, দুই হাত, দুই পা, ঘাড় ইত্যাদি উন্মুক্ত রাখতে পারবে। বাকি শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না এবং শরীরের আবৃত অংশ খুলবে না।[৬৭] বিশিষ্ট তাবে'য়ী হাসান বসরী বলেন, "নিজ ভাইয়ের সামনেও নারীদের ওড়না ছাড়া থাকা উচিত নয়।”[৬৮]
প্রখ্যাত তাবে'য়ী আতা' ইবনে আবী রাবাহ বলেন, "মাহরাম পুরুষের সামনে মেয়েদের মাথা ঢেকে রাখাই আমার কাছে অধিক পছন্দনীয়। অবশ্য মাহরাম তা দেখে ফেললে গুনাহ হবে না।”[৬১]
টিকাঃ
[৬৭] সহীহ মুসলিম- ৩৩৮; আল মাবসূত্ব, সারাখসী- ১০/১৪৮, ১০/২৫৪; বাহরুর রায়েক- ৮/২১৯; হাশিয়াতুদ দাসুকী- ১/২১৫; বুলগাতুস সালেক- ১/১৯৩; মাওয়াহেবুল খলীল- ২/১৮০; নেহায়াতুল মুহতাজ- ৬/১৯৫; আল মাজম্ শরহুল মুহাযযাব- ৩/১৬৭; রওদাতুত ত্বলেবীন- ৭/২১; আর রওদুল মুরবি'- ১/৩৩২; মুগনীল মুহতাজ- ৪/২১৪; আল ইনসাফ- ৮/২০; মাজমূ'উ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়েলে ইবনু উসাইমীন- ১২/২৬৮; আল মাওসূয়াতু ফিকহিয়্যাহ কুয়েতিয়্যাহ- ৪০/৩৫৮,৩৫৯
[৬৮] মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা- ১/৩৭৩
[৬৯] প্রাগুক্ত, কিতাবুল আসল- ৩/৪৮; বাদায়েউস সানায়ে- ৪/২৯১