📄 পর্দার ক্ষেত্রে নারীদের হাত-পা ঢেকে রাখার বিধান
নারীদের জন্য মূলত বাহিরে বের হওয়ার সময় দুই হাত ও দুই পায়ে মোজা পরিধান করা কিংবা দুই হাত-পা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা সর্বাবস্থায় মুস্তাহাব। কিন্তু ফিতনার আশঙ্কা থাকলে তা ওয়াজিব। এটিই ৪ মাযহাবের সিদ্ধান্ত। [৫৮] উল্লেখ্য যে, এই জামানা মোটেও ফিতনামুক্ত নয় আজ থেকে বহুকাল পূর্বে আমাদের সালাফগণ তাদের সেই জামানাকে ফিতনাময় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সেদিক বিবেচনায় এই জামানা তো তাদের তুলনায় অধিকতর ফিতনাময়। নারীর হাত-পাও তার আওরাহর অংশ। আল্লামা ইবনে কুদামাহ আল মুকনিতে ইমাম মারদাউই থেকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, "স্বাধীন নারী পুরোপুরি আওরাহ, এমনকি তার নখ এবং চুলও।” [৫৯]
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ বলেন- "সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে ইহরাম অবস্থায় নারীদের জন্য দস্তানা, মোজা ও নিকাব পরিধানের অনুমতি নেই। এটাই ইঙ্গিত বহন করে যে, ইহরামে না থাকা অবস্থায় নিকাব ও হাত-পা মোজা (পর্দার অন্তর্ভুক্ত হিসেবে) পরিধেয়। এ থেকে বোঝা যায় যে সাহাবিয়াতগণ তাদের মুখ এবং হাত ঢেকে রাখতেন।"[৬০]
সুতরাং নারীদেরকে গাইরে মাহরাম পুরুষদের সামনে নিজের হাত-পা ঢাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তবে এর অর্থ এই নয় যে তাকে হাত-পা মোজা দিয়েই ঢাকতে হবে। সে তার পোশাকের কিছু অংশ হাতের ওপর ঝুলিয়ে দিতে পারে এবং যদি তার মাঝে মাঝে মোজা পরার প্রয়োজন হয় এবং এটি তার পক্ষে কিছুটা কঠিন হয় তাহলে সে সহ্য করবে এবং এর জন্য আল্লাহ -এর নিকট প্রতিদান আশা করবে।
রাসূল এর সময়ে নারীগণ তাঁদের পোশাক এমনভাবে নিচের দিকে ঝুলিয়ে দিতেন যাতে পদযুগল প্রকাশিত না হয়ে যায়। এমনকি নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেওয়ার কারণে কাপড়ে মাটি থেকে ময়লা লেগে যেত। এক নারী সেই বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে জিজ্ঞাস করেন। তখন তিনি বলেন, "পরবর্তীতে যা (কাপড়ে) লাগে তা সেটাকে পবিত্র করে দেয়। [৬১]
টিকাঃ
[৫৮] যাদুল মুয়াসসার আলা ইলমিত তাফসীর- ৬/৩১, আল ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী- ২/৪৫১
[৫৯] আল-ইনসাফ- ১/৪৫২
[৬০] মাজম্ 'আল-ফাতাওয়া- ১৫/৩৭১-৩৭২
[৬১] তিরমিযী- ১৪৩, আবু দাউদ- ৩৮৩, ইবনু মাজাহ- ৫৩১
📄 বর্তমান ট্রেডিশনাল হিজাব
বর্তমানে আমরা দেখতে পাই যে, কাপড় বা ওড়না মাথায় কেবল উঁচু করে পেঁচিয়ে একে বলা হয় হিজাব। অথচ মুখ থাকে খোলা, হাত পা থাকে অনাবৃত, গায়ে থাকে চুমকি-পুতি খচিত ও চমকপ্রদ পোশাক যা আঁটসাঁট তাই অঙ্গের ভাজগুলো বোঝা যায়। পূর্বে প্রদত্ত মাসআলাগুলো পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, এগুলোকে হিজাব বলে না। হিজাবকে ট্রেডিশন হিসেবে নেওয়া হয়েছে কেবল। শুধু মাথার চুল ঢেকে নিলেই পর্দা হয়ে যায় এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই।
📄 নারীর মাহরাম ও বিস্তারিত মাহরাম চার্ট
﴿ وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَلْيَضْرِ بْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَى جُيُوبِهِنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا لِبُعُولَتِهِنَّ أَوْ آبَائِهِنَّ أَوْ آبَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ أَبْنَائِهِنَّ أَوْ أَبْنَاءِ بُعُولَتِهِنَّ أَوْ إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي إِخْوَانِهِنَّ أَوْ بَنِي أَخَوَاتِهِنَّ أَوْ نِسَائِهِنَّ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُنَّ أَوِ التَّابِعِينَ غَيْرِ أُولِي الْإِرْبَةِ مِنَ الرِّجَالِ أَوِ الطِّفْلِ الَّذِينَ لَمْ يَظْهَرُوا عَلَى عَوْرَاتِ النِّسَاءِ وَلَا يَضْرِ بْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِنْ زِينَتِهِنَّ وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴾
আর ঈমানদার নারীদেরকে বলে দাও তাদের দৃষ্টি অবনত রাখতে আর তাদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করতে, এবং তাদের শোভা সৌন্দর্য প্রকাশ না করতে, যা এমনিতেই প্রকাশিত হয় তা ব্যতীত। তারা যেন তাদের ঘাড় ও বুক মাথার কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভাই, ভাইয়ের ছেলে, বোনের ছেলে, নিজেদের মহিলাগণ, স্বীয় মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন কামনামুক্ত পুরুষ আর নারীদের অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ বালক ছাড়া অন্যের কাছে নিজেদের শোভা প্রকাশ না করে। আর তারা যেন নিজেদের গোপন শোভা প্রকাশ করার জন্য সজোরে পদচারণা না করে। হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। [৬২]
যাদের সামনে পর্দা করতে হবে না বা পর্দার ক্ষেত্রে শিথিলতা রয়েছে-
১. স্বামী- স্বামীকে দেখা দেওয়া, সৌন্দর্য প্রদর্শন করা, তার সাথে ঘনিষ্ঠ সময় কাটানো জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। তার সামনে কোনো প্রকার পর্দা করতে হবে না।
২. পিতা, দাদা, নানা ও তাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ- আপন পিতা, সৎ পিতা এবং দুধ পিতা মাহরাম। অন্য যেকোনো প্রকারের পিতা যেমন: ধর্মীয় পিতা, পালক পিতা ও উকিল পিতা মাহরাম নন। আর আপন দাদা বা নানা এবং দাদা-নানার ও দাদী-নানীর আপন ভাই, দুধ ভাই, সৎ ভাই মাহরাম। তেমনি দাদা-দাদী ও নানা-নানীর পিতা, তাদের নানা-দাদা... এভাবে যত উপরেই যাক, সবাই মাহরাম।
৩. শ্বশুর, আপন দাদা-নানা শ্বশুর এবং তাদের ঊর্ধ্বতন পুরুষগণ- আপন শ্বশুর ও দুধ শ্বশুর মাহরাম। তবে সৎ শ্বশুর যেমন- শাশুড়ির প্রাক্তন বা পরবর্তী স্বামী মাহরাম নন। ঠিক তেমনি আপন দাদা বা নানা শ্বশুর ও দুধ দাদা বা নানা শ্বশুর মাহরাম। সৎ দাদা বা নানা শ্বশুর, মামা শ্বশুর, চাচা শ্বশুর, খালু শ্বশুর ও ফুফা শ্বশুর কেউই মাহরাম নন।
৪. পুত্র, কন্যার স্বামী, পুত্রের পুত্র, কন্যার পুত্র- আপন পুত্র, দুধ পুত্র ও স্বামীর অন্য স্ত্রী বা পূর্বের স্ত্রীর গর্ভে স্বামীর ঔরসজাত পুত্র মাহরাম। কিন্তু পালক পুত্র, ধর্মীয় পুত্র ও সতীনের পূর্বের স্বামীর ঔরসজাত পুত্র মাহরাম নন। অপরদিকে আপন পুত্রের পুত্র বা আপন কন্যার পুত্র, সৎ পুত্রের পুত্র বা সৎ কন্যার পুত্র, দুধ পুত্রের পুত্র বা দুধ কন্যার পুত্র ও তাদের অধস্তন পুরুষরাও মাহরামভুক্ত। কিন্তু তাদের পালক পুত্র ও ধর্মীয় পুত্র মাহরাম নয়। অনুরূপ আপন কন্যার কন্যার স্বামী এবং দুধ কন্যার কন্যার স্বামী এভাবে যত নিচের দিকে যাক সবাই মাহরামভুক্ত। তবে সৎ কন্যার স্বামী, অনুরূপ অধস্তন কেউ মাহরাম নয়।
৫. ভাই- আপন ভাই, সৎ ভাই ও দুধ ভাই অর্থাৎ আপন মায়ের দুধ পুত্র, দুধ মায়ের আপন, সৎ, দুধ পুত্র মাহরাম। সৎ বাবা অথবা সৎ মায়ের অন্য ঘরের পুত্র মাহরাম না। এ ছাড়া চাচাতো, খালাতো, মামাতো, ফুফাতো ভাই, দুলাভাই, দেবর ও ভাসুর মাহরাম নয়।
৬. ভাতিজা- আপন ভাইয়ের পুত্র, সৎ ভাইয়ের পুত্র, দুধ ভাইয়ের পুত্র মাহরাম।
৭. ভাগিনা- আপন বোনের পুত্র, সৎ বোনের পুত্র, দুধ বোনের পুত্র মাহরাম।
৮. চাচা- আপন চাচা, সৎ চাচা ও দুধ চাচা অর্থাৎ আপন পিতার দুধ ভাই, দুধ পিতার আপন ভাই, আপন বাবার সৎ ভাই মাহরাম। কিন্তু ফুফা, সৎ বাবার ভাই মাহরাম না।
৯. মামা- আপন মামা, সৎ মামা ও দুধ মামা অর্থাৎ আপন মায়ের দুধ ভাই, দুধ মায়ের আপন ভাই, আপন মায়ের সৎ ভাই মাহরাম। তবে খালু, সৎ মায়ের ভাই মাহরাম নয়।
১০. নাবালক- এমন বালক যার মাঝে নারীদের প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই।
১১. অন্যান্য নারী- নারীদের সামনে নারীকে পর্দা করতে হবে না। তবে কাফির ও ফাসিক নারীদের সামনে শরীরের সৌন্দর্য প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। [৬৩]
উপরে বর্ণিত মাহরামের তালিকা ব্যতীত পৃথিবীর সকল পুরুষ নারীদের জন্য এবং সকল নারী পুরুষদের জন্য গাইরে মাহরাম।
টিকাঃ
[৬২] সূরা নুর- ৩১
[৬৩] সূরা নূর- ৩১; সহীহ বুখারী- ২৬৪৫; সুনানে তিরমিযী- ১১৪৬; সহীহ বুখারী শরহে কুসতুল্লানিসহ- ৯/১৫০; ফাতহুল বারী- ৯/১৩৮; সহীহ মুসলিম বি শারহিন নাবাবি- ১০/২২; তুহফাতুল আহওয়াযী- ৪/২৫৪; তাফসীরে রাযী- ২৩/২০৬; তাফসীরে কুরতুবী- ১২/২৩২, ২৩৩; তাফসীরে আলুসী- ১৮/১৪৩; ফাতহুল বায়ান ফি মাকাসিদ আল-কুরআন- ৬/৩৫২; আহকামুল কুরআন- ৩/৩১৭; তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন- ২/২৫৬-৩৬১; তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন- ৬/৪০১-৪০৫; তাফসীরে মাযহারী- ২/২৫৪-২৬১ ও ৬/৪৯৭-৫০২; শরহু মুসলিম, নববী- ৯/১০৫; উমদাতুল কারী- ৭/১২৮; বাদায়েউস সানায়ে- ২/৩০০; রদ্দুল মুহতার ২/৪৬৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/২১৯; তাবয়ীনুল হাকায়েক- ২/২৪৩; তাফসীরে রুহুল মাআনী- ৪/২৫২; আলবাহরুর রায়েক- ৩/৯৩
📄 নাবালক ছেলেদের সামনে পর্দা
পূর্ণ বালেগ হওয়ার আগ পর্যন্ত ছেলেদের সামনে অনেক নারীই পর্দা করে না। এমনকি তাদের সামনে শরীরের বিশেষ অঙ্গসমূহ ঢেকে রাখারও প্রয়োজন মনে করা হয় না। অথচ কুরআন মাজীদে সূরা নূরের ৩১ নং আয়াতে পর্দার হুকুম থেকে মুক্ত ব্যক্তিদের আলোচনা এসেছে, যেখানে আল্লাহ ইরশাদ করেন, "তারা যেন... যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও এমন বালক যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে।"
উক্ত আয়াতে সেসকল অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালকদের বোঝানো হয়েছে, যারা এখনো সাবালকত্বের নিকটবর্তী হয়নি সেই সাথে নারীদের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ, কমনীয়তা ও গতিবিধি সম্পর্কে সম্পূর্ণ বে-খবর; তাদেরকে পর্দার হুকুমের আওতামুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
পক্ষান্তরে যে বালক নারীদের এসব অবস্থা সম্পর্কে সচেতন, সে বয়সের দিক থেকে সাবালকত্বে না পৌঁছলেও তার সামনে নারীদের পর্দা করা ওয়াজিব। ফক্বীহগণ সাবালকত্বের এ হুকুম অবস্থাভেদে ১০ বছর থেকেও শুরু হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং বালেগ হয়নি কিংবা ১৫ বছর হয়নি বলেই এ বয়সের ছেলেদেরকে গাইরে মাহরাম নারীদের মহলে যেতে দেওয়া অন্যায়। তদ্রূপ নারীদের জন্যও এ বয়সের ছেলেদের সামনে বেপর্দা চলাফেরা করা গুনাহ। [৬৪]
টিকাঃ
[৬৪] মাআরিফুল কুরআন- ৬/৪০৫, তাফসীরে কুরতুবী- ১২/১৫৭, তাফসীরে মাজহারী- ৬/৫০১, আল মুফাসসাল ফী আহকামিন নিসা- ৩/১৭৬-১৭৭, আহসানুল ফাতাওয়া- ৩৬-৪০