📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 হায়েয, নিফাস, জুনুব থেকে পবিত্রতা অর্জন

📄 হায়েয, নিফাস, জুনুব থেকে পবিত্রতা অর্জন


প্রথমেই হায়েয, নিফাসের রক্ত বা দৈহিক মিলনজনিত নাপাকি ধুয়ে নিতে হবে। এরপর ফরয গোসলের নিয়মানুযায়ী গোসল করতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
إِذَا أَقْبَلَتِ الْحَيْضَةُ فَدَعِي الصَّلاةَ، وَإِذَا أَدْبَرَتْ فَاغْسِلِي عَنْكِ الدَّمَ وَصَلِّي
হায়েয দেখা দিলে নামায ছেড়ে দাও। আর হায়েযের সময় শেষ হয়ে গেলে (গোসলের মাধ্যমে) রক্ত ধুয়ে নাও এবং নামায আদায় কর। [১০]

টিকাঃ
[১০] সহীহ বুখারী- ৩০১

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 ফরয গোসলের সঠিক নিয়ম

📄 ফরয গোসলের সঠিক নিয়ম


■ ফরয গোসলের জন্য প্রথমত মনে মনে নিয়ত করতে হবে।
• এরপর প্রথমে দুই হাত কব্জি পর্যন্ত ৩ বার ধুয়ে নিতে হবে।
• ডানহাতে পানি নিয়ে বামহাত দিয়ে লজ্জাস্থান এবং তার আশপাশ ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। শরীরের অন্য কোনো স্থানে নাপাকি লেগে থাকলে সেটাও ধুয়ে নিতে হবে।

• এবার বাম হাতকে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।

• তারপর 'বিসমিল্লাহ' বলে ওযু শুরু করতে হবে, অর্থাৎ 'বিসমিল্লাহ' বলে ডান হাতে পানি নিয়ে উভয় হাতের কজি পর্যন্ত তিনবার ধোয়া, তিনবার কুলি করা, তিনবার নাকে পানি দিয়ে নাক ঝাড়া, কপালের শুরু হতে দুই কানের লতি ও খুঁতনির নিচ পর্যন্ত ধোয়া, প্রথমে ডান হাত ও পরে বাম হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধোয়া, আঙুলে আংটি থাকলে বা কানে-নাকে গহনা থাকলে তা নেড়ে-চেড়ে উক্ত স্থান ভিজিয়ে নেওয়া, অজু-গোসল করার সময় নাক-কানের অলংকারের ছিদ্রে পানি পৌঁছানো জরুরি। [১১] অতঃপর সম্পূর্ণ মাথা মাসেহ করা। কেবল দুই পা ধোয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

• অতঃপর প্রথমে মাথায় তিনবার (৩ অঞ্জলি) পানি ঢেলে ভালোভাবে খিলাল করে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছাতে হবে। এবার সমস্ত শরীর ধোয়ার জন্য প্রথমে ৩ বার ডানে তারপরে ৩ বার বামে পানি ঢেলে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে, যেন শরীরের কোনো অংশ বা কোনো লোমও শুকনো না থাকে। গোসল এমনভাবে করতে হবে যাতে বগল, দেহের খাঁজ, নাভী ও কানের ছিদ্র পর্যন্ত পানি দ্বারা ভিজে যায়। অতঃপর আবার সমস্ত শরীরে পানি ঢালবে।

• সবার শেষে একটু অন্য জায়গায় সরে এসে দুই পা ৩ বার ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।

মনে রাখতে হবে-
• নারীদের মাথা ভালোভাবে ভিজঁতে হবে। গোসলের সময় মেয়েদের মাথার খোপা খোলা জরুরি নয়। কেবল চুলের গোড়ায় তিনবার তিন চুল্লু পানি পৌঁছাতে হবে।
• এই নিয়মে গোসলের পর নতুন করে আর ওযুর দরকার নেই, যদি ওযু না ভাঙে। ওযুসমেত ফরয গোসল করার পর কোনো ইবাদত না করে ওযু না ভাঙা সত্ত্বেও পুনরায় ওযু করা মাকরুহ। কেননা হযরত আয়েশা বলেন, "নবী মুহাম্মাদ ফরয গোসলের পর আর ওযু করতেন না।”[১২]
• রাসূল এক মুদ্দ (৬২৫ গ্রাম) পানি দিয়ে ওযু এবং অনধিক পাঁচ মুদ্দ (৩১২৫ গ্রাম) বা প্রায় সোয়া তিন লিটার পানি দিয়ে গোসল করতেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো বস্তু অপচয় করা ঠিক নয়।
■ নারী হোক কিংবা পুরুষ, সকলকে রাসূলুল্লাহ পর্দার মধ্যে গোসল করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

■ উল্লেখ্য যে, আয়েশা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন- আসমা একবার রাসুলুল্লাহ-এর কাছে হায়েযের গোসল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, "তোমরা পানি ও বরই পাতা নিয়ে সুন্দরভাবে পবিত্র হবে। তারপর মাথায় পানি ঢেলে দিয়ে ভালোভাবে রগড়ে নেবে যাতে করে সমস্ত চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছে যায়। তারপর গায়ে পানি ঢালবে। এরপর একটি সুগন্ধিযুক্ত কাপড় নিয়ে তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করবে।"

আসমা বললেন, "তা দিয়ে কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করবে?" তিনি বললেন, "সুবহানাল্লাহ! তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করবে।" অতঃপর আয়েশা তাঁকে চুপিচুপি বলে দিলেন, "রক্ত বের হবার জায়গায় তা ঝুলিয়ে দেবে"। অতঃপর জানাবাতের (সহবাসজনিত অপবিত্রতা) গোসল সম্পর্কেও জিজ্ঞাস করা হয়। এতে তিনি বললেন, "পানি দ্বারা সুন্দরভাবে পবিত্র হবে। তারপর মাথায় পানি ঢেলে দিয়ে ভালো করে রগড়ে নেবে যাতে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছে যায়। তারপর গায়ে পানি ঢেলে দেবে।" তখন আয়েশা বলেন-"আনসারদের মহিলারা কতই না উত্তম! দ্বীনি জ্ঞানে প্রজ্ঞা অর্জনে লজ্জাবোধ তাদের জন্য বাধা হয় না।"[১৩]

■ নাপাক কাপড় পরিধান অবস্থাতেই গোসল করার ক্ষেত্রে যদি যথেষ্ট পরিমাণ পানি কাপড়ের ওপর ঢেলে কাপড় এমনভাবে কচলে ধুয়ে নেওয়া হয়, যার ফলে কাপড় থেকে নাপাকি দূর হয়ে গিয়েছে এ ব্যাপারে প্রবল ধারণা করা যায় তাহলে এর দ্বারা কাপড়টি পাক হয়ে যাবে। আর দৃশ্যমান কোনো নাপাকি থাকলে কঁচলে ধুয়ে ওই নাপাকি দূর করে নিতে হবে। উল্লেখ্য, শরীর বা কাপড়ের কোনো অংশে নাপাকি লেগে থাকলে তা গোসলের আগেই পৃথকভাবে ধুয়ে পবিত্র করে নেওয়া উচিত।[১৪]

টিকাঃ
[১১] আল মুহীতুল বুরহানী- ১/৮০
[১২] তিরমিযী- ১০৩, মিশকাত- ৪০৯
[১৩] সহীহ মুসলিম- ৩৩২
[১৪] আদ্দুররুল মুখতার- ১/৩৩৩; শরহুল মুনইয়া- ১৮৩; আলবাহরুর রায়েক- ১/২৩৮; আননাহরুল ফায়েক- ১/১৫০

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 হায়েয-নিফাসরত অবস্থায় দৈনন্দিন কাজ

📄 হায়েয-নিফাসরত অবস্থায় দৈনন্দিন কাজ


হায়েয-নিফাস নিয়ে মানুষের মাঝে নানামুখী ধারণা রয়েছে। গ্রামগঞ্জে এমনকি শহরেও অনেকের এমন ধারণা রয়েছে যে হায়েযগ্রন্থ নারীর জন্য রান্না করা, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা ইত্যাদি কাজ ঠিক নয়, হায়েযরত অবস্থায় আচার বানালে বা স্পর্শ করলে আচার নষ্ট হয়ে যায়-এমনই আরও নানা রকমের উদ্ভট চিন্তাধারা। এসব ভিত্তিহীন। হায়েযগ্রস্থ নারী উল্লিখিত সকল কাজই করতে পারবে এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে এক্ষেত্রে ওযু করে এসব কাজ করা সর্বোত্তম।[১৫] এ বিষয়ে সমাজে যা কিছু প্রচলিত রয়েছে সেগুলো কু-সংস্কার এবং হিন্দুদের কুপ্রথা বৈ কিছুই নয়। এছাড়া ইহুদিরাও মহিলাদের হায়েযগ্রস্থ অবস্থায় তাদের সাথে একত্রে পানাহার করত না এবং এক সাথে ঘুমাতও না। যেমনটি আনাস-এর একটি হাদীস থেকে বর্ণিত হয়েছে।[১৬]

এই অবস্থায় নবী এর পত্নীগণ ও অন্যান্য মহিলা সাহাবীগণ উপরোক্ত সকল কাজই করতেন, এতে কোনো বাঁধাও দেওয়া হয়নি। ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ বুখারীতে হায়েয অধ্যায়ে ২৯৫ নং হাদীস থেকে ধারাবাহিকভাবে বহু হাদীস এসকল কু-সংস্কারের অপনোদনের জন্য নিয়ে এসেছেন। রাসূলুল্লাহ হায়েযগ্রস্থ নারীর ব্যাপারে বলেন,

إِن حيضتك ليست في يدك
তোমার হায়েয তো তোমার হাতে (লেগে) নেই।[১৭]

আম্মাজান আয়েশা বলেন,
كنت أرجل رأس رسول الله - صلى الله عليه وسلم- وأنا حائض
আমি হায়েযগ্রস্থ অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাথা চিরুনী দিয়ে আঁচড়াতাম![১৮]
হায়েয অবস্থায় নবীজি তার স্ত্রীদের সহিত একসাথে খেতেন ও পান করতেন। তাঁদের ঝুটাও খেতেন ও পান করতেন। এমনকি খাদ্যের যে স্থানে হায়েযগ্রস্থ স্ত্রীর মুখ লেগেছে নবীজি সেখানেই তাঁর মুবারক মুখ লাগাতেন। এবং তিনি তাঁর হায়েযগ্রস্থ স্ত্রীর সাথে এক বিছানায় ঘুমাতেন।[১৯]

টিকাঃ
[১৫] রাদ্দুল মুহতার- ১/৪৮৬; হাশিয়ায়ে ত্বহত্ববী আলা মারাক্কিল ফালাহ- ১১৬, ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া- ১/২২২
[১৬] সুনানে নাসায়ী- ১/১৫২,১৮৭; হাদীসটির মান সহীহ।
[১৭] সহীহ মুসলিম- ১১ থেকে ১৩; আবু দাউদ- ২৬২; তিরমিযী- ১৩৪; নাসায়ী- ৩৮১ থেকে ৩৮২
[১৮] সহীহ বুখারী- ২৯৫, ২০২৯, ৫৮৮১; সহীহ মুসলিম- ৬৭১; আবু দাউদ- ২৪৬৮; তিরমিযী- ৮০৪; সুনানে নাসায়ী- ৩৮৭; ইবনে মাজাহ- ১৭৭৫; মুয়াত্ত্বা মালেক- ৬০; মুয়াত্তা মুহাম্মাদ- ৫৩
[১৯] সহীহ বুখারী- ২৯৮, ৩২২, ৩২৩, ১৯২৯; সহীহ মুসলিম- ৫, ২৯৬, ৩০০; নাসায়ী- ৩৬৯; নাসায়ী- ২৭৯, ২৮৩, ৩৭৭; সুনানুল কুবরা- ১/৩১১, হাদীস- ১৩৯০; সহীহ ইবনু খুযাইমাহ- ১/৫৮ হাদীস- ১১০; সহীহ ইবনু হিব্বান- ৪/১০৮, ১৯৪, হাদীস- ১২৯৩, ১৩৬০

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 ইস্তিহাযা এবং তার হুকুম

📄 ইস্তিহাযা এবং তার হুকুম


হায়েয ও নিফাসের নির্দিষ্ট সময় ব্যতীত অন্য সময়ে নারীর জরায়ু থেকে যেই রক্ত লাগাতার বের হতে থাকে তাকে ইস্তিহাযা বলে। ইস্তিহাযাকালীন নামায-রোজা সবকিছুই করতে পারবে। এবং এই সময়ে সহবাসেও কোনো বাধা নেই। [২০] এক্ষেত্রে মুস্তাহাযা নারী সালাত আদায়ের আগে প্রতি ওয়াক্তের জন্য পুনরায় ওযু করে নেবে। [২১]

টিকাঃ
[২০] আল মাবসূত্ব- ৩/২০৪; শরহে বিকায়া- ১/১১৩
[২১] ফতহুল ক্বদীর- ১/১৭৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00