📄 গর্ভপাতের পর রক্তস্রাব
কারো যদি অসময়ে গর্ভপাত হয় যাতে একটি গোশতের টুকরা বের হয়েছে, কোনো অঙ্গ প্রকাশ পায়নি এক্ষেত্রে গর্ভপাত পরবর্তী রক্ত নিফাস নয়; বরং এই স্রাব শুরু হওয়ার আগে ১৫ দিন পবিত্র অবস্থায় কাটলে তা হায়েযের রক্ত হিসেবে গণ্য হবে। তবে যদি স্রাব তিনদিন পর্যন্ত দীর্ঘায়িত না হয় তাহলে তা ইস্তিহাযার রক্ত হিসাবে গণ্য হবে। এমতাবস্থায় হায়েয মনে করে ছেড়ে দেওয়া নামাযগুলো কাজা করে নিতে হবে। [৮]
টিকাঃ
[৮] আলবাহরুর রায়েক- ১/২১৯; বাদায়েউস সানায়ে- ১/১৬১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/৩৭; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া- ১/৩৯৪; রদ্দুল মুহতার- ১/৩০২; ইমদাদুল ফাতাওয়া- ১/৪৫; নাফউল মুফতী ওয়াস সায়িল ফী জাময়িল মুতাফাররিক্বাতিল মাসায়িল (ফতোয়ায়ে লাখনৌভী)- ৪১৮; কুনইয়াতুল মুনইয়াহ- ১১৬
📄 গর্ভ নষ্ট হওয়ার কারণে ডিএনসি করার পরে রক্তস্রাব
গর্ভ নষ্ট হওয়ার কারণে যখন ডিএনসি করা হয় এরপর অনেকেরই রক্তস্রাব দেখা দেয়। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে যে, সেটা কি ইস্তিহাযা নাকি নিফাস এবং এরজন্য সালাত থেকে দূরে থাকতে হবে কিনা? কারও যদি প্রতিমাসে ৮ দিন হায়েযের কারণে অপবিত্র থাকার অভ্যাস থাকে কিন্তু ডিএনসি করার পর থেকে ৮ দিনের অধিক স্রাব চলতে থাকে সেক্ষেত্রে ডিএনসির পর ৮ দিন পর্যন্ত হায়েয ধর্তব্য হবে। এরপর থেকে ইস্তিহাযা হিসেবে গণ্য হবে। তাই প্রথম ৮ দিনের পর থেকে স্রাব থাকলেও নিয়মিত নামায পড়তে হবে। প্রকাশ থাকে যে, নষ্ট ভ্রূণে কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ না হলে ডিএনসি পরবর্তী স্রাব হায়েয হিসেবে ধর্তব্য হবে। যদি নষ্ট ভ্রূণে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থাকে তাহলে এ স্রাব নিফাস হিসেবে গণ্য হবে। [৯]
টিকাঃ
[৯] নাফউল মুফতী ওয়াস সায়িল ফী জাময়িল মুতাফাররিক্বাতিল মাসায়িল (ফতোয়ায়ে লাখনৌভী)- ৪১৮; কুনইয়াতুল মুনইয়াহ- ১১৬; আলমুহীতুল বুরহানী- ১/৪৭০; আলবাহরুর রায়েক- ১/২১৯; ফাতহুল কাদীর- ১/১৬৫-১৬৬; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া- ১/৫৪২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/৩৭; আদ্দুররুল মুখতার- ১/৩০২
📄 হায়েয, নিফাস, জুনুব থেকে পবিত্রতা অর্জন
প্রথমেই হায়েয, নিফাসের রক্ত বা দৈহিক মিলনজনিত নাপাকি ধুয়ে নিতে হবে। এরপর ফরয গোসলের নিয়মানুযায়ী গোসল করতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
إِذَا أَقْبَلَتِ الْحَيْضَةُ فَدَعِي الصَّلاةَ، وَإِذَا أَدْبَرَتْ فَاغْسِلِي عَنْكِ الدَّمَ وَصَلِّي
হায়েয দেখা দিলে নামায ছেড়ে দাও। আর হায়েযের সময় শেষ হয়ে গেলে (গোসলের মাধ্যমে) রক্ত ধুয়ে নাও এবং নামায আদায় কর। [১০]
টিকাঃ
[১০] সহীহ বুখারী- ৩০১
📄 ফরয গোসলের সঠিক নিয়ম
■ ফরয গোসলের জন্য প্রথমত মনে মনে নিয়ত করতে হবে।
• এরপর প্রথমে দুই হাত কব্জি পর্যন্ত ৩ বার ধুয়ে নিতে হবে।
• ডানহাতে পানি নিয়ে বামহাত দিয়ে লজ্জাস্থান এবং তার আশপাশ ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। শরীরের অন্য কোনো স্থানে নাপাকি লেগে থাকলে সেটাও ধুয়ে নিতে হবে।
• এবার বাম হাতকে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
• তারপর 'বিসমিল্লাহ' বলে ওযু শুরু করতে হবে, অর্থাৎ 'বিসমিল্লাহ' বলে ডান হাতে পানি নিয়ে উভয় হাতের কজি পর্যন্ত তিনবার ধোয়া, তিনবার কুলি করা, তিনবার নাকে পানি দিয়ে নাক ঝাড়া, কপালের শুরু হতে দুই কানের লতি ও খুঁতনির নিচ পর্যন্ত ধোয়া, প্রথমে ডান হাত ও পরে বাম হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধোয়া, আঙুলে আংটি থাকলে বা কানে-নাকে গহনা থাকলে তা নেড়ে-চেড়ে উক্ত স্থান ভিজিয়ে নেওয়া, অজু-গোসল করার সময় নাক-কানের অলংকারের ছিদ্রে পানি পৌঁছানো জরুরি। [১১] অতঃপর সম্পূর্ণ মাথা মাসেহ করা। কেবল দুই পা ধোয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
• অতঃপর প্রথমে মাথায় তিনবার (৩ অঞ্জলি) পানি ঢেলে ভালোভাবে খিলাল করে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছাতে হবে। এবার সমস্ত শরীর ধোয়ার জন্য প্রথমে ৩ বার ডানে তারপরে ৩ বার বামে পানি ঢেলে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে, যেন শরীরের কোনো অংশ বা কোনো লোমও শুকনো না থাকে। গোসল এমনভাবে করতে হবে যাতে বগল, দেহের খাঁজ, নাভী ও কানের ছিদ্র পর্যন্ত পানি দ্বারা ভিজে যায়। অতঃপর আবার সমস্ত শরীরে পানি ঢালবে।
• সবার শেষে একটু অন্য জায়গায় সরে এসে দুই পা ৩ বার ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে-
• নারীদের মাথা ভালোভাবে ভিজঁতে হবে। গোসলের সময় মেয়েদের মাথার খোপা খোলা জরুরি নয়। কেবল চুলের গোড়ায় তিনবার তিন চুল্লু পানি পৌঁছাতে হবে।
• এই নিয়মে গোসলের পর নতুন করে আর ওযুর দরকার নেই, যদি ওযু না ভাঙে। ওযুসমেত ফরয গোসল করার পর কোনো ইবাদত না করে ওযু না ভাঙা সত্ত্বেও পুনরায় ওযু করা মাকরুহ। কেননা হযরত আয়েশা বলেন, "নবী মুহাম্মাদ ফরয গোসলের পর আর ওযু করতেন না।”[১২]
• রাসূল এক মুদ্দ (৬২৫ গ্রাম) পানি দিয়ে ওযু এবং অনধিক পাঁচ মুদ্দ (৩১২৫ গ্রাম) বা প্রায় সোয়া তিন লিটার পানি দিয়ে গোসল করতেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো বস্তু অপচয় করা ঠিক নয়।
■ নারী হোক কিংবা পুরুষ, সকলকে রাসূলুল্লাহ পর্দার মধ্যে গোসল করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
■ উল্লেখ্য যে, আয়েশা থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন- আসমা একবার রাসুলুল্লাহ-এর কাছে হায়েযের গোসল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি বললেন, "তোমরা পানি ও বরই পাতা নিয়ে সুন্দরভাবে পবিত্র হবে। তারপর মাথায় পানি ঢেলে দিয়ে ভালোভাবে রগড়ে নেবে যাতে করে সমস্ত চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছে যায়। তারপর গায়ে পানি ঢালবে। এরপর একটি সুগন্ধিযুক্ত কাপড় নিয়ে তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করবে।"
আসমা বললেন, "তা দিয়ে কীভাবে পবিত্রতা অর্জন করবে?" তিনি বললেন, "সুবহানাল্লাহ! তা দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করবে।" অতঃপর আয়েশা তাঁকে চুপিচুপি বলে দিলেন, "রক্ত বের হবার জায়গায় তা ঝুলিয়ে দেবে"। অতঃপর জানাবাতের (সহবাসজনিত অপবিত্রতা) গোসল সম্পর্কেও জিজ্ঞাস করা হয়। এতে তিনি বললেন, "পানি দ্বারা সুন্দরভাবে পবিত্র হবে। তারপর মাথায় পানি ঢেলে দিয়ে ভালো করে রগড়ে নেবে যাতে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছে যায়। তারপর গায়ে পানি ঢেলে দেবে।" তখন আয়েশা বলেন-"আনসারদের মহিলারা কতই না উত্তম! দ্বীনি জ্ঞানে প্রজ্ঞা অর্জনে লজ্জাবোধ তাদের জন্য বাধা হয় না।"[১৩]
■ নাপাক কাপড় পরিধান অবস্থাতেই গোসল করার ক্ষেত্রে যদি যথেষ্ট পরিমাণ পানি কাপড়ের ওপর ঢেলে কাপড় এমনভাবে কচলে ধুয়ে নেওয়া হয়, যার ফলে কাপড় থেকে নাপাকি দূর হয়ে গিয়েছে এ ব্যাপারে প্রবল ধারণা করা যায় তাহলে এর দ্বারা কাপড়টি পাক হয়ে যাবে। আর দৃশ্যমান কোনো নাপাকি থাকলে কঁচলে ধুয়ে ওই নাপাকি দূর করে নিতে হবে। উল্লেখ্য, শরীর বা কাপড়ের কোনো অংশে নাপাকি লেগে থাকলে তা গোসলের আগেই পৃথকভাবে ধুয়ে পবিত্র করে নেওয়া উচিত।[১৪]
টিকাঃ
[১১] আল মুহীতুল বুরহানী- ১/৮০
[১২] তিরমিযী- ১০৩, মিশকাত- ৪০৯
[১৩] সহীহ মুসলিম- ৩৩২
[১৪] আদ্দুররুল মুখতার- ১/৩৩৩; শরহুল মুনইয়া- ১৮৩; আলবাহরুর রায়েক- ১/২৩৮; আননাহরুল ফায়েক- ১/১৫০