📄 হায়েয
বয়ঃসন্ধিকালে প্রবেশ করলে হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে শরীরে অনেক পরিবর্তন আসে। স্তন বড় হওয়া, অবাঞ্ছিত লোম গজানো, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন, রক্তস্রাব হওয়া সহ বিভিন্ন পরিবর্তন এসময়ে লক্ষ্য করা যায়। প্রতিটি মেয়েরই বয়ঃসন্ধিকালে মাসিক চক্র শুরু হয়। মাসিক সম্পর্কে আমাদের প্রত্যেকের স্পষ্ট ধারণা রাখা উচিত; যেন আমরা বুঝতে পারি কোনটি আমাদের শরীরে স্বাভাবিক আর কোন লক্ষণটি অস্বাভাবিক, যাতে বিচলিত না হয়ে আমরা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।
◆ হায়েয, মাসিক বা ঋতুচক্র কী?
বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছানোর পর প্রতি মাসে হরমোনের প্রভাবে মেয়েদের যোনিপথ দিয়ে যে রক্তস্রাব হয় তাকে ঋতুস্রাব বা মাসিক বলে।
◆ ঋতুচক্রের তিনটি ধাপ-
• মেন্সট্রুয়াল ফেজ: ৪-৭ দিন স্থায়ী হয়। এই ফেজে যোনিপথ দিয়ে রক্ত বের হয়। ৪-৭ দিন স্থায়ী এই রক্তপাতের সময় ভেঙ্গে যাওয়া রক্তকনিকা ছাড়াও শ্বেত কনিকা, জরায়ু-মুখের মিউকাস, জরায়ুর নিঃসৃত আবরণী, ব্যাকটেরিয়া, প্লাজমিন, প্রস্টাগ্লানডিন এবং অনিষিক্ত ডিম্বাণু মাসিকের রক্তের সাথে বের হয়ে থাকে। ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরন হরমোনের যৌথ ক্রিয়ায় এই পর্বটি ঘটে।
◇ প্রলিফারেটিভ ফেজ: ৮-১০ দিন স্থায়ী হয়। শুধু ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে এটি হয়। এই সময় জরায়ু নিষিক্ত ডিম্বাণুকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি নেয়।
• সেক্রেটরি ফেজ: ১১-১৪ দিন স্থায়ী হয়। এই ফেজ সবচেয়ে দীর্ঘ। একে প্রজেস্টেরন বা লুটিয়াল ফেজ-ও বলা হয়। এটিও ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন উভয় হরমোনের যৌথ ক্রিয়ায় হয়ে থাকে। এই সময় নিষিক্ত ডিম্বাণু বৃদ্ধির জন্য জরায়ু সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। ডিম্বাশয়ের কোনো ডিম্বাণু শুক্রাণু দ্বারা নিষিক্ত না হলে জরায়ু আবার মেন্সট্রুয়াল ফেজে চলে যায়। এভাবেই পূর্ণ বয়স্ক মেয়েদের ঋতুচক্র চলতে থাকে।
📄 স্বাভাবিক মাসিক
প্রতি মাসে মেয়েদের ডিম্বাশয় থেকে নিঃসৃত পরিণত ডিম্বাণুর দুইটি পরিণতি হতে পারে-
◆ মাসিক বা ঋতুস্রাব
◇ গর্ভধারণ
ডিম্বাণু শুক্রাণুর মাধ্যমে নিষিক্ত না হলে তা জরায়ুর স্তরসহ হায়েযের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। আর নিষিক্ত হয়ে গেলে নারী গর্ভবতী হয়।
• মাসিকের রক্তে গন্ধ থাকবে, এটা অস্বাভাবিক কিছু না。
• অভুলেশনের সময় সাধারণত ব্যথা হয়। জরায়ুর সংকোচন ও প্রসারণের কারণে হায়েযের প্রথম দু-তিন দিন সহনীয় মাত্রায় ব্যথা থাকতে পারে। কোনো কাজই করতে পারছে না এমন ব্যথা যদি না হয়, তাহলে ভাবনার কোনো কারণ নেই। এটা ভালো লক্ষণ。
• বয়ঃসন্ধিকালে মাসিকের শুরুর দিকে অনেকের ক্ষেত্রে ৪-৫ মাস অনিয়মিত থাকে, এটা স্বাভাবিক।
• মেনোপজ হচ্ছে নির্দিষ্ট একটি বয়সে নারীর মাসিক স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া ফলে গর্ভধারণের ক্ষমতা হারানো। আমাদের ভৌগলিক অবস্থান অনুযায়ী আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সের মাঝে নারীদের মেনোপজ হয়ে থাকে। মেনোপজের ১ বছর আগে থেকে অনিয়মিত মাসিক হতে পারে। এটা স্বাভাবিক তাই বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।
📄 অস্বাভাবিক হায়েয বা মাসিক চলাকালীন সমস্যা
মাসিকের সময় সামান্য যন্ত্রণা, প্রিমেনস্ট্রিয়াল সিন্ড্রোম (পিএমএস) অর্থাৎ মাসিকের পূর্ব-লক্ষণ, খিঁচ লাগা এবং শরীরের ব্যথা ব্যতীতও আরো বেশ কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন-
• মেনোরোজিয়া
মাসিক চলাকালীন সময়ে পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে যদি ভারী রক্তপাত হয় তাহলে সেটাকে মেনোরেজিয়া বলে। ইস্ট্রোজেন এবং প্রজেস্টেরনের মতো হরমোন স্তরের ভারসাম্যহীনতার কারণে মেনোরোজিয়া হয়। যোনিতে সংক্রমণ, প্রদাহযুক্ত সার্ভিক্স, হাইপোথাইরয়েডিজম, গর্ভাশয়ে ফাইব্রয়েড ইত্যাদি অবস্থার কারণেও এমনটি হতে পারে।
• আমেনোরিয়া
একে অনুপস্থিত মাসিকও বলা হয়। বিভিন্ন কারণে একজনের মাসিক বন্ধ থাকতে পারে। প্রাথমিক আমেনোরিয়া হয় যখন ১৬ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার পরও ঋতুস্রাব না হয়। এটি বয়ঃসন্ধিকাল আগমনে বিলম্ব, প্রজননতন্ত্রের জন্মগত ত্রুটি বা পিটুইটারি গ্রন্থিতে সমস্যার কারণে হতে পারে। সেকেন্ডারি আমেনোরিয়া হাইপারথাইরয়েডিজম, অ্যানোরেক্সিয়া, ডিম্বাশয়ে সংক্রামক রোগ, গর্ভাবস্থা, জন্ম নিয়ন্ত্রণ অথবা আকস্মিক ওজন লাভ বা কমার কারণে হতে পারে।
• ডেসমেনোরিয়া
গর্ভাশয় প্রসারিত এবং সংকুচিত হওয়ার কারণে স্বাভাবিক সহনীয় মাত্রায় ব্যথা অনুভূত হতে পারে। কিন্তু ব্যাথার মাত্রা যদি মাত্রাধিক্য হয় তাহলে তা ডেসমেনোরিয়ার লক্ষণ। এটি পেলভিসে ব্যথা, ফাইব্রয়েড বা এন্ডোমেট্রিওসিস (জরায়ুতে টিস্যুর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি)- এর প্রদাহের কারণে হতে পারে।
এই অস্বাভাবিক লক্ষণগুলো দেখা গেলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়াও মাসিক শুরুর ২-৩ বছর পর, বিশেষত ১৭-৩০ বছরের মধ্যে যদি তা অনিয়মিত হয় এবং সেই সাথে নিম্নের যেকোনো একটি বা সবগুলো লক্ষণ যদি দেখা যায়-
◇ ওজন বাড়া
◇ চুল পড়া
• পেটে ব্যথা
তাহলে দ্রুত একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
📄 স্যানিটারি প্যাড, টেম্পন, মেন্সট্রুয়াল/ডিভা কাপ ইত্যাদি ব্যবহার
এসব ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সংক্রমণ এবং ব্যাকটেরিয়া এড়াতে প্রতি চার ঘণ্টা অন্তর প্যাড পরিবর্তন করতে হবে। টেম্পনের ক্ষেত্রে আট ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তা ব্যবহার করলে ব্যাকটিরিয়া দ্বারা আক্রান্ত অথবা বিষক্রিয়া (টক্সিক শক সিন্ড্রোম) হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটি প্রতিরোধের জন্য আট ঘণ্টার বেশি সময় ধরে টেম্পন পরিধান করা অনুত্তম। স্পঞ্জ এবং মেনস্ট্রুয়াল কাপ আপনার প্রবাহের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে দিনে এক বা দুবার পরিবর্তন করা যেতে পারে।
◇ সতর্কতা-
বাচ্চা জন্মের পর অর্থাৎ নিফাস চলাকালীন টেম্পন ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে, কারণ তখন ইনফেকশনের ঝুঁকি বেশি থাকে।
• স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের ক্ষেত্রে লক্ষণীয়-