📄 সিয়ামের জন্য ওষুধ সেবনের মাধ্যমে হায়েয আটকে রাখা
হায়েযগ্রস্থ নারীর জন্য উত্তম হলো নিজের স্বাভাবিক অবস্থার ওপর থাকা এবং আল্লাহ তার জন্য যেই ফয়সালা করেছেন সেটার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। মূলত এমন কিছু ব্যবহার না করাই উত্তম, যার দ্বারা হায়েযের রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। বরং হায়েয অবস্থায় রোজা ছেড়ে দেওয়া অতঃপর রোজাগুলোর কাজা আদায় করে নেয়াই উত্তম। তবে যদি কেউ ওষুধ সেবনের মাধ্যমে হায়েয বন্ধ করে, তাহলেও তার রোজা হয়ে যাবে।
কিন্তু যদি রমাদান চলে আসে, আর রক্তপ্রবাহ শুরু হয়ে যাওয়ার পর ওষুধ খেয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে হানাফী মতানুযায়ী হায়েযের সর্বনিম্ন সীমা কমপক্ষে ৩ দিন হওয়ায় হায়েয শুরুর পর থেকে ৩ দিন পর্যন্ত রোজা রাখতে পারবে না, যেহেতু তার হায়েয শুরু হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ বুঝা গেল, হায়েয শুরু হতেই ওষুধ খেয়ে বন্ধ করে ফেললেও ৩ দিন পর্যন্ত হায়েয জারি আছে বলে ধর্তব্য হবে।[৩৬] এরপর থেকে রোজা রাখা আবশ্যক।
তবে হাম্বলী মাযহাব মতে হায়েযের সর্বনিম্ন কোনো সময়সীমা নেই। তাই এ অবস্থায় ৩ দিন পর্যন্ত রোজা থেকে বিরত থাকতে হয় না।
টিকাঃ
[৩৬] কিতাবুল ফাতওয়া- ৩/৪০৫; আপকে মাসায়েল- ৩/ ২০৭; খুলাসাতুল ফাতাওয়া- ১/২৫১; হিদায়াহ- ১৬২; বাহরুর রায়েক- ১,২/১৯১,৪৪৯; রদ্দুল মুহতার- ১/৪৭৬; ফতোয়ায়ে হক্কানি- ৪/১৫৮; জামিউ আহকামিন নিসা- ১/১৯৮; ফাতাওয়া রহীমিয়া- ৮/১৩৬
📄 হায়েযরত অবস্থায় দৈহিক মিলন
এরূপ করা কাবীরা গুনাহ। কুরআন মাজীদে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَ كُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ)
আর তারা তোমার কাছে জিজ্ঞাস করে হায়েয সম্পর্কে। বলে দাও, এটা অশুচি। কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রীগমন থেকে বিরত থাক। ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হবে না, যতক্ষণ না তারা পবিত্র হয়ে যায়। যখন উত্তম রূপে পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে, তখন গমন করো তাদের কাছে, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে হুকুম দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন। [৩৭]
হাদীসে এসেছে,
مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوِ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم
যে ব্যক্তি ঋতুবর্তী স্ত্রীর সাথে সহবাস করে অথবা স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে কিংবা গণক ঠাকুরের নিকটে যায়, সে মুহাম্মাদ -এর ওপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা (কুরআন) অবিশ্বাস করলো। [৩৮]
এখানে যে কুফরের (অবিশ্বাসের) কথা এসেছে তা মূলত বাস্তবে কুফর অর্থে আসেনি। তবে হায়েযগ্রস্থ নারীর সাথে সহবাসের বিষয়টি যে কত ভয়াবহ গুনাহ তা বোঝানোর জন্য নবী কুফর শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কেউ কেউ একে কুফরে আকবার তথা বড় কুফর না বলে কুফরে আসগর তথা ছোট কুফর বলে আখ্যায়িত করেছেন। [৩৯] সুতরাং এই গুনাহ হয়ে গেলে খাস অন্তরে আল্লাহ-এর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করতে হবে।
◇ কাফফারা- হায়েযের শুরুর দিকে সহবাস হলে এক দীনার আর শেষ দিকে হলে অর্ধ দীনার সদকা করার কথা কোনো কোনো হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তাই এক্ষেত্রে তাওবা-ইস্তিগফারের পাশাপাশি উপরোক্ত নিয়মে সদকা করে কাফফারা আদায় করা জরুরি। ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত রয়েছে, নবী করীম এমন ব্যক্তি সম্পর্কে বলেন,
الَّذِي يَأْتِي امْرَأَتَهُ وَهِيَ حَابِضُ قَالَ يَتَصَدَّقُ بِدِينَارٍ أَوْ نِصْفِ دِينَارٍ
যে নিজের ঋতুবর্তী স্ত্রীর সাথে সহবাস করে ফেলে, সে যেন এক অথবা অর্ধ দীনার সদকা করে। [৪০]
কোনো কোনো আলিম হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন। কিন্তু বিশুদ্ধ মত হলো, হাদীসটির বর্ণনাকারীরা সকলেই নির্ভরযোগ্য। সুতরাং দলীল হিসেবে হাদীসটি গ্রহণ করা যাবে। প্রকাশ থাকে যে, দীনার একটি স্বর্ণমুদ্রা। যা বর্তমান হিসেবে ৪.৩৭৪ গ্রাম সমপরিমাণ স্বর্ণ।
টিকাঃ
[৩৭] সূরা বাকারা- ২২২
[৩৮] জামে তিরমিযী- ১৩৫; সুনান ইবনু মাজাহ- ৬৩৯; সুনান আবী দাউদ- ৩৯০৪, এর সনদ সহীহ।
[৩৯] তুহফাতুল আহওয়াযী'- ১/৪১৯, মাদারেজুস সালেকীন- ১/৩৩৫-৩৩৬
[৪০] সুনান আবু দাউদ- ২৬৪
📄 দৈহিক মিলনরত অবস্থায় হায়েয
দৈহিক মিলনরত অবস্থায় হায়েয শুরু হলে ঐ অবস্থাতেই মিলন থেকে বিরত হয়ে যেতে হবে। যদি পুরুষের ইনযাল তথা বীর্য নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর্যায়ে এসে পড়ে অথবা যদি যৌন চাহিদার ওপর সবর করা কঠিন হয় তাহলে ওই অবস্থায় যোনিদ্বারে সহবাস না করে গুহ্যদ্বার ব্যতীত স্ত্রী অন্য কোনো অঙ্গে ঘর্ষণ করে স্বামীর বীর্য নিক্ষেপ করে দিতে পারবে। বিশেষ করে হাঁটু থেকে নাভী পর্যন্ত অংশ বাদ দিয়ে অন্যান্য অঙ্গ দ্বারা স্বামীর যৌনস্পৃহা নিবারণ করা যাবে। যেমন: হাত, স্তন, দেহের বিভিন্ন খাঁজ ইত্যাদি।[৪১] নবী -কে আব্দুল্লাহ ইবনু সা'দ জিজ্ঞাসা করলেন (মুয়াজ ইবনু জাবাল সহ আরও বেশ কিছু সাহাবি থেকেও একই বর্ণনা রয়েছে),
ما يحل امرأتي وهي حائض؟
হায়েয অবস্থায় আমার স্ত্রীর কোন অংশ আমার জন্য (যৌন চাহিদা নিবারণের ক্ষেত্রে) হালাল?
তিনি উত্তরে বলেন,
لك ما فوق الإزار
তুমি তার ইযারের ওপরের অংশ (নাভীর ওপর) উপভোগ করতে পারবে। [৪২]
নবী আরও বলেন,
اصنعوا كل شيء إلا النكاح
(হায়েয-নিফাস অবস্থায় বিবির সাথে) সহবাস ব্যতীত সবই করতে পারো। [৪৩]
এক্ষেত্রে স্ত্রীর নাভীর নিম্নাংশে কাপড় না থাকলেও হাত অথবা অন্য কোনো অঙ্গ দ্বারা স্বামীর যৌন চাহিদা মেটানো যাবে। তবে স্বামী সরাসরি যোনিতে স্পর্শ করবে না।
টিকাঃ
[৪১] আদ্দুররুল মুখতার- ১/২৯২
[৪২] সুনান দারেমী- ১/২৪১-২৪২; মুসনাদে আহমাদ- ৪/৩৪২; সুনান আবু দাউদ- ২১২,২১৩; জামে তিরমিযী- ১/৮৯, হাদীস- ১৩৩; সুনানুল কুবরা- ১/৩১২, হাদীস- ১৩৯৪; আল মুখতারাহ, জিয়া আল মাক্কদেসী- ৯/৪১, হাদীস- ৩৯০; আবু দাউদের ব্যাখ্যাকার আবু যুর'আহ আল ইরাক্কী এর সনদকে সহীহ বলেছেন।
[৪৩] সহীহ মুসলিম- ৩০২