📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 সুফরাহ ও কুদরাহ-এর বিধান

📄 সুফরাহ ও কুদরাহ-এর বিধান


'সুফরাহ' বা হলুদ বর্ণের স্রাব হচ্ছে নারীর রেহেম (যোনি) থেকে নির্গত হওয়া পুঁজের মতো তরল পদার্থ। এতে হলুদ বর্ণ অধিক প্রতিভাত হয়। অপরদিকে 'কুদরাহ' হচ্ছে নারীর রেহেম থেকে নির্গত হওয়া মেটে বর্ণের তরল পদার্থ। ঋতুকালীন নারীর রেহেম থেকে সুফরাহ অথবা কুদরাহ যা-ই বের হোক না কেন তা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে এবং তার জন্য হায়েযের হুকুম প্রযোজ্য হবে।

এ জাতীয় পদার্থ ঋতুকালীন ব্যতীত অন্য সময় বের হয়ে আসলে তা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে না, বরং তখন সেই নারী নিজেকে পবিত্র জ্ঞান করবে এবং ওযু করে প্রতি ওয়াক্তের সালাত আদায় করবে। এটাই জমহুর ফুক্বাহাদের মত। তবে ইমাম মালেক সর্বাবস্থায় একে হায়েয হিসেবে গণ্য করেছেন। উম্মে আতিয়‍্যাহ বলেন,
كنا لا نعد الكدرة والصفرة بعد الطهر شيئا
আমরা পবিত্র হওয়ার পর 'সুফরাহ' ও 'কুদরাহ' কে কিছুই গণ্য করতাম না। [৩৪]

অর্থাৎ, হায়েয হিসেবে গণ্য করতেন না। হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির মান সহীহ। ইমাম বুখারী এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তবে তিনি (পবিত্র হওয়ার পর) বাক্যটি বর্ণনা করেন নি।

এ জাতীয় হাদীসকে মারফু' হাদীস বলা হয়। কারণ, এতে নবী-এর সমর্থন বোঝা যায়। উম্মে 'আতিয়‍্যাহ -এর কথার অর্থ হচ্ছে পবিত্র অবস্থায় সুফরাহ বা কুদরাহ দেখতে পেলেও তাকে হায়েয গণ্য করা হতো না। কিন্তু হায়েয অবস্থায় বা হায়েযের নির্দিষ্ট সময় যদি সুফরাহ বা কুদরাহ নির্গত হয় তাহলে তা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে এবং এক্ষেত্রে হায়েযের বিধান প্রযোজ্য হবে。

টিকাঃ
[৩৪] সহীহ বুখারী- ৩২৬; উমদাতুল ক্বারী শরহে সহীহ বুখারী- ৩/৪৫৯; সুনানে আবী দাউদ- ৩০৭; সুনান ইবনু মাজাহ- ৬৪৭; সুনান নাসায়ী- ৩৬৮

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 হায়েযরত অবস্থায় কাপড়, প্যাড, টেম্পন বা ডিভা কাপ ব্যবহার

📄 হায়েযরত অবস্থায় কাপড়, প্যাড, টেম্পন বা ডিভা কাপ ব্যবহার


হায়েযের রক্ত নাজাস (অপরিষ্কার) এবং এটি যদি কোনো নারীর পোশাকে লাগে, তবে সেটা ধুয়ে ফেলতে হয়। রাসূলুল্লাহ এর সময় নারীগণ হায়েয চলাকালীন বিশেষ কাপড় পরে নিতেন। উম্মে সালামাহ থেকে বর্ণিত আছে যে, "আমি যখন রাসূলুল্লাহ এর সাথে ছিলাম তখন আমার হায়েয দেখা দিলো, আমি তাঁর কাছ থেকে সরে গেলাম এবং হায়েযের সময় আমি যে কাপড় পরিধান করতাম তা পরিধান করে নিলাম..."[৩৫] অর্থাৎ, হায়েয হলে কাপড় বা প্যাড ব্যবহার করা যাবে, যেহেতু নারীদের মাঝে এগুলোর ব্যবহার নববী যুগ থেকেই চলে আসছে। কিন্তু যুগের সাথে সাথে স্যানিটারি প্যাডের পাশাপাশি আরও নিত্যনতুন পণ্য বাজারে উপস্থিত রয়েছে। এমতাবস্থায় আমাদের জেনে নেওয়া জরুরি যে টেম্পন বা ডিভা কাপ ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে কিনা; যা সাধারণত যোনিপথের ভিতরে প্রবেশ করিয়ে ব্যবহার করা হয়।

সাধারণত উপরোক্ত বস্তুগুলো ব্যবহার করা জায়েয এবং এটি অনুমোদিত নয় তা নির্দেশ করার মতো কোনো প্রমাণ নেই। সুতরাং এগুলো অনুমোদিত নয় তা বলা ঠিক হবে না। বরং এমন প্রমাণ রয়েছে যা এর জায়েয হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত দেয়। যেমন রক্তের প্রবাহ পরীক্ষা করতে যোনিপথের ভিতরে তুলো প্রবেশ করানোর অনুমতি হাদীসে রয়েছে।

হামনা বিনতে জাহশ থেকে বর্ণিত যে তিনি রাসূলুল্লাহ এর সময় হায়েযগ্রস্থ হলেন এবং রাসূলুল্লাহ-এর নিকট এসে বললেন, "আমার রক্তের শক্তিশালী ও দীর্ঘ প্রবাহ রয়েছে।" তিনি তাকে বললেন, "তুলো দিয়ে বন্ধ কর..."

টিকাঃ
[৩৫] সহীহ বুখারী- ৩১১

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 সিয়ামের জন্য ওষুধ সেবনের মাধ্যমে হায়েয আটকে রাখা

📄 সিয়ামের জন্য ওষুধ সেবনের মাধ্যমে হায়েয আটকে রাখা


হায়েযগ্রস্থ নারীর জন্য উত্তম হলো নিজের স্বাভাবিক অবস্থার ওপর থাকা এবং আল্লাহ তার জন্য যেই ফয়সালা করেছেন সেটার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। মূলত এমন কিছু ব্যবহার না করাই উত্তম, যার দ্বারা হায়েযের রক্ত বন্ধ হয়ে যায়। বরং হায়েয অবস্থায় রোজা ছেড়ে দেওয়া অতঃপর রোজাগুলোর কাজা আদায় করে নেয়াই উত্তম। তবে যদি কেউ ওষুধ সেবনের মাধ্যমে হায়েয বন্ধ করে, তাহলেও তার রোজা হয়ে যাবে।

কিন্তু যদি রমাদান চলে আসে, আর রক্তপ্রবাহ শুরু হয়ে যাওয়ার পর ওষুধ খেয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে হানাফী মতানুযায়ী হায়েযের সর্বনিম্ন সীমা কমপক্ষে ৩ দিন হওয়ায় হায়েয শুরুর পর থেকে ৩ দিন পর্যন্ত রোজা রাখতে পারবে না, যেহেতু তার হায়েয শুরু হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ বুঝা গেল, হায়েয শুরু হতেই ওষুধ খেয়ে বন্ধ করে ফেললেও ৩ দিন পর্যন্ত হায়েয জারি আছে বলে ধর্তব্য হবে।[৩৬] এরপর থেকে রোজা রাখা আবশ্যক।

তবে হাম্বলী মাযহাব মতে হায়েযের সর্বনিম্ন কোনো সময়সীমা নেই। তাই এ অবস্থায় ৩ দিন পর্যন্ত রোজা থেকে বিরত থাকতে হয় না।

টিকাঃ
[৩৬] কিতাবুল ফাতওয়া- ৩/৪০৫; আপকে মাসায়েল- ৩/ ২০৭; খুলাসাতুল ফাতাওয়া- ১/২৫১; হিদায়াহ- ১৬২; বাহরুর রায়েক- ১,২/১৯১,৪৪৯; রদ্দুল মুহতার- ১/৪৭৬; ফতোয়ায়ে হক্কানি- ৪/১৫৮; জামিউ আহকামিন নিসা- ১/১৯৮; ফাতাওয়া রহীমিয়া- ৮/১৩৬

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 হায়েযরত অবস্থায় দৈহিক মিলন

📄 হায়েযরত অবস্থায় দৈহিক মিলন


এরূপ করা কাবীরা গুনাহ। কুরআন মাজীদে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّى يَطْهُرْنَ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَ كُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ)

আর তারা তোমার কাছে জিজ্ঞাস করে হায়েয সম্পর্কে। বলে দাও, এটা অশুচি। কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রীগমন থেকে বিরত থাক। ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হবে না, যতক্ষণ না তারা পবিত্র হয়ে যায়। যখন উত্তম রূপে পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে, তখন গমন করো তাদের কাছে, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে হুকুম দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে তাদেরকে পছন্দ করেন। [৩৭]

হাদীসে এসেছে,

مَنْ أَتَى حَائِضًا أَوِ امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا أَوْ كَاهِنًا فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم

যে ব্যক্তি ঋতুবর্তী স্ত্রীর সাথে সহবাস করে অথবা স্ত্রীর গুহ্যদ্বারে সহবাস করে কিংবা গণক ঠাকুরের নিকটে যায়, সে মুহাম্মাদ -এর ওপর যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তা (কুরআন) অবিশ্বাস করলো। [৩৮]

এখানে যে কুফরের (অবিশ্বাসের) কথা এসেছে তা মূলত বাস্তবে কুফর অর্থে আসেনি। তবে হায়েযগ্রস্থ নারীর সাথে সহবাসের বিষয়টি যে কত ভয়াবহ গুনাহ তা বোঝানোর জন্য নবী কুফর শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কেউ কেউ একে কুফরে আকবার তথা বড় কুফর না বলে কুফরে আসগর তথা ছোট কুফর বলে আখ্যায়িত করেছেন। [৩৯] সুতরাং এই গুনাহ হয়ে গেলে খাস অন্তরে আল্লাহ-এর কাছে তাওবা-ইস্তিগফার করতে হবে।

◇ কাফফারা- হায়েযের শুরুর দিকে সহবাস হলে এক দীনার আর শেষ দিকে হলে অর্ধ দীনার সদকা করার কথা কোনো কোনো হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তাই এক্ষেত্রে তাওবা-ইস্তিগফারের পাশাপাশি উপরোক্ত নিয়মে সদকা করে কাফফারা আদায় করা জরুরি। ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত রয়েছে, নবী করীম এমন ব্যক্তি সম্পর্কে বলেন,

الَّذِي يَأْتِي امْرَأَتَهُ وَهِيَ حَابِضُ قَالَ يَتَصَدَّقُ بِدِينَارٍ أَوْ نِصْفِ دِينَارٍ

যে নিজের ঋতুবর্তী স্ত্রীর সাথে সহবাস করে ফেলে, সে যেন এক অথবা অর্ধ দীনার সদকা করে। [৪০]

কোনো কোনো আলিম হাদীসটিকে দুর্বল বলেছেন। কিন্তু বিশুদ্ধ মত হলো, হাদীসটির বর্ণনাকারীরা সকলেই নির্ভরযোগ্য। সুতরাং দলীল হিসেবে হাদীসটি গ্রহণ করা যাবে। প্রকাশ থাকে যে, দীনার একটি স্বর্ণমুদ্রা। যা বর্তমান হিসেবে ৪.৩৭৪ গ্রাম সমপরিমাণ স্বর্ণ।

টিকাঃ
[৩৭] সূরা বাকারা- ২২২
[৩৮] জামে তিরমিযী- ১৩৫; সুনান ইবনু মাজাহ- ৬৩৯; সুনান আবী দাউদ- ৩৯০৪, এর সনদ সহীহ।
[৩৯] তুহফাতুল আহওয়াযী'- ১/৪১৯, মাদারেজুস সালেকীন- ১/৩৩৫-৩৩৬
[৪০] সুনান আবু দাউদ- ২৬৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00