📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 হায়েযরত অবস্থায় কুরআনের মুসহাফ স্পর্শ

📄 হায়েযরত অবস্থায় কুরআনের মুসহাফ স্পর্শ


হায়েযরত অবস্থায় কুরআনের মুসহাফ স্পর্শ করা যাবে না। তবে ওযু ব্যতীত, হায়েয ও জুনুবী তথা গোসল ফরয অবস্থায় কোনো আলগা কাপড় বা রুমাল দিয়ে ধরা যাবে। এই ব্যতীত গিলাফ মুড়ানো কুরআন স্পর্শ করা যাবেনা যেহেতু সেটা আলগা কাপড় নয়। [১৭] আল্লাহ বলেন,

لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُوْنَ )

“পবিত্ররা ব্যতীত কেউই এই কুরআন স্পর্শ করবে না।” [১৮]

ইমাম নববী ও ইমাম তাইমিয়া বলেন- "পবিত্র হওয়া ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে মতামত দিয়েছেন হযরত আলী, সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, সালমান, আবদুল্লাহ ইবনে উমার সহ প্রমুখ সাহাবি এবং অন্য সাহাবিদের এর বিপরীত কোনো অভিমত নেই।”[১৯] অনুরূপভাবে এ বিষয়ে রয়েছে একাধিক বিশুদ্ধ হাদীস।

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي بَكْرِ بْنِ حَزْمٍ أَنَّ فِي الْكِتَابِ الَّذِي كَتَبَهُ رَسُولُ اللَّهِ لِعَمْرِو بْنِ حَزْمٍ أَنْ لَا يَمَسَّ الْقُرْآنَ إِلَّا طَاهِرُ
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আবু বকর বিন হাযম বলেন, রাসূল আমর বিন হাযম এর কাছে এই মর্মে চিঠি লিখেছিলেন- "পবিত্র হওয়া ছাড়া কুরআন কেউ স্পর্শ করবে না”। [২০]

عن عبد الله بن عمر أن رسول الله ﷺ قال: لا يمس القرآن إلا طاهر
হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমার থেকে বর্ণিত। রাসূল ইরশাদ করেছেন- “পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ কুরআন স্পর্শ করবে না।” [২১]

টিকাঃ
[১৭] আদ্দুররুল মুখতার- ১/৩২০; তাহতাবি- ১৪৩-১৪৪; আলমুহীতুল বুরহানী- ১/৪০২; রদ্দুল মুহতার- ১/২৯৩; আলবাহরুর রায়েক- ১/২০১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/৩৯
[১৮] সূরা ওয়াকিয়াহ- ৭৯
[১৯] শরহুল মুহাজ্জাব- ২/৮০; মাজমুউল ফাতাওয়া- ২১/২৬৬
[২০] মুয়াত্তা মালিক- ৬৮০; কানযুল উম্মাল- ২৮৩০; মারেফাতুস সুনান ওয়াল আসার- ২০৯; আল মুজামুল কাবীর- ১৩২১৭; আল মুজামুস সাগীর- ১১৬২; সুনানে দারেমী- ২২৬৬
[২১] মাজমাউয যাওয়ায়েদ- ৫১২

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 হায়েযরত অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত ও কুরআনের আয়াত লেখা

📄 হায়েযরত অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত ও কুরআনের আয়াত লেখা


হায়েযরত অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত ও তার পূর্ণ কোনো আয়াত লেখা কোনোটিই জায়েয নেই।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমার থেকে বর্ণিত, রাসূল ইরশাদ করেছেন,
لا تقرأ الحائض ولا الجنب شيئا من القرآن
ঋতুবর্তী মহিলা এবং গোসল ফরয হওয়া ব্যক্তি কুরআন পড়বে না। [২২]

عن إبراهيم قال: الحائض والجنب يذكر ان الله ويسميان
ইবরাহীম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন–“হায়েয এবং গোসল ফরয হওয়া ব্যক্তি আল্লাহর জিকির করতে পারবে, এবং তাঁর নাম নিতে পারবে। [২৩]

তবে 'বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম' বা 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজি'উন' তিন কুল, সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি ইত্যাদি বা কুরআনের অন্যান্য বাক্যাংশ যা সাধারণত দু'আ হিসেবে পঠিত হয়; কেবল সেই আয়াতগুলোই জিকিরস্বরূপ (আল্লাহর স্মরণে) পড়তে পারবে।

আর একান্ত প্রয়োজনে কুরআনের আয়াত লিখতে হলে আয়াতের লিখিত অংশে হাত না লাগিয়ে লেখা যেতে পারে। [২৪]

টিকাঃ
[২২] সুনানে তিরমিযী- ১৩১; সুনানে দারেমী- ৯৯১; মুসনাদুর রাবী- ১১; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা- ১০৯০; মুসন্নাফে আব্দুর রাজ্জাক- ৩৮২৩; আল ইলাল, ইবনে আবী হাতিম- ১/৪৯
[২৩] মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা- ১৩০৫; সুনানে দারেমী- ৯৮৯
[২৪] ফাতহুল কাদীর, ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 হায়েযরত অবস্থায় হজ্জ/উমরা

📄 হায়েযরত অবস্থায় হজ্জ/উমরা


এমতাবস্থায় নফল কিংবা ফরয কোনো তাওয়াফের বিধান পালন করা যাবে না। তবে এক্ষেত্রে হজ্জ ও উমরাহর অন্যান্য বিধান ও আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে পারবে। যেমন- সাঈ করা, উকূফে আরাফাহ, উকূফে মুযদালিফা, কংকর নিক্ষেপ ইত্যাদি। এসবের জন্য পবিত্রতা শর্ত নয়। [২৫]

আম্মাজান আয়েশা বলেন,
خَرَجْنَا مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَجَّةِ الْوَدَاعِ فَقَدِمْتُ مَكَّةَ وَأَنَا حَابِضُ وَلَمْ أَطُفْ بِالْبَيْتِ وَلَا بَيْنَ الصَّفَا وَالْمَرْوَةِ، فَشَكَوْتُ ذَلِكَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: انْقُضِي رَأْسَكِ وَامْتَشِطِي وَأَهْلِي بِالْحَجِّ

বিদায় হজ্জে আমরা আল্লাহর রাসূল এর সাথে হজ্জের জন্য বের হয়েছিলাম...... মক্কায় আসার পরে আমি হায়েযগ্রস্থ ছিলাম তাই আমি বাইতুল্লাহতে তাওয়াফ করিনি এবং সাফা-মারওয়াতেও সাঈ করিনি। এব্যাপারে আমি নবীজির নিকট অভিযোগ পেশ করলাম। তিনি আমাকে বললেন-“মাথা উঠাও, চুল আঁচড়াও এবং হজ্জের অন্যান্য বিধান পালন করো (অর্থাৎ ইহরাম বাঁধো)...."

আরেক বর্ণনায় এসেছে নবীজি একথা শুনে বললেন-
افْعَلِي مَا يَفْعَلُ الْحَاجُ غَيْرَ أَنْ لَا تَطُوفِي بِالْبَيْتِ حَتَّى تَطْهُرِي
হাজিগণ যে কাজগুলো করে তুমিও তা করতে থাক। শুধু বাইতুল্লাহর তাওয়াফ পবিত্র হওয়ার আগ পর্যন্ত করবে না। [২৬]

উল্লেখ্য যে উপরোক্ত হাদীসে "সাফা ও মারওয়াহতেও সাঈ করিনি” এই বাক্যটা কি আদৌ আয়েশা-এর বর্ণিত বাক্য নাকি পরবর্তীতে কেউ সংযুক্ত করেছেন এনিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে কেননা অন্যান্য অনেক বর্ণনাতে এই বাক্যটুকু নেই। এজন্যই অনেক ফক্বীহগণ এর ওপর ফতোয়া দেননি। [২৭] এই বিষয়ে ফিক্বহে হানাফীর কিছু মাসআলা জেনে রাখা জরুরি যার অধিকাংশই ইখতিলাফবিহীন-

মাসআলা ১: হায়েযগ্রস্থ নারীর জন্য ইহরামের আগে গোসল করা মুস্তাহাব। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, কোনো নারী হায়েয বা নিফাস অবস্থায় মীকাতে পৌঁছলে গোসল করবে। এরপর ইহরাম গ্রহণ করবে। অতপর বাইতুল্লাহর তাওয়াফ ব্যতীত হজ্জের যাবতীয় কাজ করবে। [২৮]

মাসআলা ২: হায়েয শেষ হওয়ার পর গোসল করে তাওয়াফ করতে হবে। হায়েযের কারণে তাওয়াফ বিলম্বিত হলে কোনো গোনাহ হবে না। সুতরাং ওষুধ-বড়ি খেয়ে হায়েয বন্ধ রাখার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা বা মনোক্ষুণ্ণ হওয়ারও কোনো কারণ নেই। তবে হায়েয বন্ধ হওয়ার আগেই ফেরত ফ্লাইটের তারিখ হয়ে গেলে ওষুধ খেয়ে হায়েয বন্ধ করে তাওয়াফ করা যাবে। যদি শুরু থেকেই ওষুধ-বড়ি খেয়ে পিরিয়ড বন্ধ রেখে কেউ হজ্জের সমস্ত কাজ করেন, তাতেও শরি'আতের দৃষ্টিতে কোনো আপত্তি নেই। [২৯]

মাসআলা ৩: যদি কোনো নারী হায়েয বা নিফাস অবস্থায় থাকার কারণে তাওয়াফে যিয়ারত করতে না পারেন, আর তার দেশে ফেরার সময় হয়ে যায় ও কোনোভাবেই তা বাতিল বা বিলম্ব করা সম্ভব না হয় তবে এই অপারগতার কারণে সে হায়েয অবস্থাতেই তাওয়াফ করে নেবে। আর এজন্য দম হিসেবে একটি উট বা গরু জবাই করবে। সেই সাথে আল্লাহ-এর দরবারে ইস্তিগফারও করবে।

মোটকথা, কোনো অবস্থাতেই তাওয়াফে যিয়ারত না করে দেশে ফেরা যাবে না। অন্যথায় তাকে আবার ক্বাবায় ফিরে এসে তাওয়াফ করতে হবে। যতদিন সে তাওয়াফ না করবে ততদিন স্বামীর সাথে মিলামেশা করতে পারবে না।[৩০]

মাসআলা ৪: হায়েয অবস্থায় তাওয়াফ করা নিষেধ। হজ্জের ফরয তাওয়াফের সময় হায়েযগ্রস্থ হলে ফরয তাওয়াফও করতে পারবে না। যদি কোনো নারী ১২ যিলহজ্জ সূর্যাস্তের আগে এমন সময় পবিত্র হয় যখন গোসল করে তাওয়াফ করা সম্ভব, সেক্ষেত্রে তখনই গোসল করে তাওয়াফ করতে হবে।

অলসতাবশত কিংবা অন্য কোনো কারণে তাওয়াফ না করলে দম দিতে হবে। কিন্তু যদি সূর্যাস্তের পূর্বে গোসল ও তাওয়াফ করার মতো সময় না থাকে, তাহলে দেরি হওয়ার কারণে দম দিতে হবে না। [৩১]

মাসআলা ৫: হায়েয অবস্থায় থাকার কারণে বিদায়ী তাওয়াফ না করতে পারলে সমস্যা নেই। এ কারণে দমও ওয়াজিব হবে না যেহেতু বিদায়ী তাওয়াফ ওয়াজিব নয়। [৩২]

মাসআলা ৬: হায়েযগ্রস্থ ও জুনুবীর (যার উপর সহবাস বা বীর্যপাতজনিত কারণে গোসল ফরয হয়েছে) জন্য বাইতুল্লাহ শরীফসহ যেকোনো মাসজিদে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
إني لا أحل المسجد لحائض ولا جنب
কোনো ঋতুবর্তী এবং জুনুব ব্যক্তির জন্য মসজিদে অবস্থান করা আমি বৈধ করিনি [৩৩]

টিকাঃ
[২৫] আল ফাতাওয়া আত তাতারখানিয়াহ- ১/৪৮২, মাসআলাহ- ১২৮৮
[২৬] সহীহ বুখারী- ১৫৫৬; সহীহ মুসলিম- ১২১১
[২৭] ফাতহুল বারী- ৩/৫৮৯, হাদীস- ১৫৬৭; আওজাযুল মাসালেক শরহে মুয়াত্ত্বা ইমাম মালেক- ১২/৪২৭, হাদীস- ১১৬; আত তুর্কসা লিমা ফী মুয়াত্ত্বা, ইবনু আব্দিল বার- ১০৩
[২৮] সুনানে আবু দাউদ- ১/২৪৩; গুনিয়াতুন নাসিক পৃষ্ঠা- ৬৯
[২৯] ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া- ১৫/৪৯১; ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া- ১/৪৭২; ফাতহুল কাদীর- ২/৩৩৭; ফতোয়ায়ে রহিমিয়া- ৮/৮৭; কিতাবুল মাসায়েল- ৩/৪০৩
[৩০] রদ্দুল মুহতার- ২/৫১৮-৫১৯; মাআরিফুস সুনান- ৬/৩৫৭-৩৫৮
[৩১] রদ্দুল মুহতার- ২/৫১৯
[৩২] মানাসিক, পৃষ্ঠা- ২৫২
[৩৩] সুনানে আবু দাউদ- ১/৩০, হাদীস- ২৩২; সুনান ইবনু মাজাহ- ৬৪৫; তারীখুল কাবীর, বুখারী- ২,৬/৬৭,১৮৩;

📘 মুহস্বানাত (পবিত্র নারীদের পাঠশালায়) > 📄 সুফরাহ ও কুদরাহ-এর বিধান

📄 সুফরাহ ও কুদরাহ-এর বিধান


'সুফরাহ' বা হলুদ বর্ণের স্রাব হচ্ছে নারীর রেহেম (যোনি) থেকে নির্গত হওয়া পুঁজের মতো তরল পদার্থ। এতে হলুদ বর্ণ অধিক প্রতিভাত হয়। অপরদিকে 'কুদরাহ' হচ্ছে নারীর রেহেম থেকে নির্গত হওয়া মেটে বর্ণের তরল পদার্থ। ঋতুকালীন নারীর রেহেম থেকে সুফরাহ অথবা কুদরাহ যা-ই বের হোক না কেন তা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে এবং তার জন্য হায়েযের হুকুম প্রযোজ্য হবে।

এ জাতীয় পদার্থ ঋতুকালীন ব্যতীত অন্য সময় বের হয়ে আসলে তা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে না, বরং তখন সেই নারী নিজেকে পবিত্র জ্ঞান করবে এবং ওযু করে প্রতি ওয়াক্তের সালাত আদায় করবে। এটাই জমহুর ফুক্বাহাদের মত। তবে ইমাম মালেক সর্বাবস্থায় একে হায়েয হিসেবে গণ্য করেছেন। উম্মে আতিয়‍্যাহ বলেন,
كنا لا نعد الكدرة والصفرة بعد الطهر شيئا
আমরা পবিত্র হওয়ার পর 'সুফরাহ' ও 'কুদরাহ' কে কিছুই গণ্য করতাম না। [৩৪]

অর্থাৎ, হায়েয হিসেবে গণ্য করতেন না। হাদীসটি ইমাম আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির মান সহীহ। ইমাম বুখারী এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তবে তিনি (পবিত্র হওয়ার পর) বাক্যটি বর্ণনা করেন নি।

এ জাতীয় হাদীসকে মারফু' হাদীস বলা হয়। কারণ, এতে নবী-এর সমর্থন বোঝা যায়। উম্মে 'আতিয়‍্যাহ -এর কথার অর্থ হচ্ছে পবিত্র অবস্থায় সুফরাহ বা কুদরাহ দেখতে পেলেও তাকে হায়েয গণ্য করা হতো না। কিন্তু হায়েয অবস্থায় বা হায়েযের নির্দিষ্ট সময় যদি সুফরাহ বা কুদরাহ নির্গত হয় তাহলে তা হায়েয হিসেবে গণ্য হবে এবং এক্ষেত্রে হায়েযের বিধান প্রযোজ্য হবে。

টিকাঃ
[৩৪] সহীহ বুখারী- ৩২৬; উমদাতুল ক্বারী শরহে সহীহ বুখারী- ৩/৪৫৯; সুনানে আবী দাউদ- ৩০৭; সুনান ইবনু মাজাহ- ৬৪৭; সুনান নাসায়ী- ৩৬৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00