📄 গর্ভধারণের পদ্ধতি
সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্বে আমাদের জানতে হবে যে, গর্ভধারণ কীভাবে হয়। সোজা কথায় গর্ভধারণের জন্য প্রয়োজন পুরুষের শুক্রাণু এবং নারীর ডিম্বাণু। এই দুইয়ের নিষেকের মাধ্যমেই গর্ভধারণ হয়। তবে নারীদের ডিম্বাণু সব সময় নিঃসরণ হয় না, এজন্য নির্দিষ্ট একটি সময় রয়েছে। তাই সন্তান গ্রহণের ইচ্ছা করলে সেই নির্দিষ্ট সময়টি সম্পর্কে ধারণা থাকা উচিত। পূর্বের মেডিকেল দারসে ক্যালেন্ডার মেথড নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। এক মাসের সাধারণ হায়েযচক্রের ৮ম থেকে ১৯তম দিন অর্থাৎ হায়েয শেষ হওয়ার পর থেকে প্রায় ১২ দিন গর্ভধারণের জন্য উত্তম সময়। তবে ব্যক্তিভেদে সময় কিছুটা কমবেশি হতে পারে। এই সময়গুলোতেই দম্পতি সহবাসের মাধ্যমে চেষ্টা করবে। আল্লাহ রিযিকে লিখিত রাখলে গর্ভে সন্তান আসবে।
কারও ক্ষেত্রে একবার চেষ্টার মাধ্যমেই আল্লাহ সন্তান দেন, আবার কারও ক্ষেত্রে একাধিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। সে ক্ষেত্রে সবর করতে হবে, যখন আল্লাহ ভালো মনে করেন তখনই গর্ভধারণ হবে, এই তাকদীরে ভরসা রাখতে হবে।
📄 মায়ের গর্ভাবস্থায় বাবার করণীয়
প্রতিটি নারীর জীবনে এক অনন্য সময় হচ্ছে তার গর্ভাবস্থা। এই সময়ে নারীদের শারীরিক এবং মানসিক অবস্থার মাঝে বিরাট পরিবর্তন আসে। সন্তানের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত এই অবস্থা স্বাভাবিক হয় না। গর্ভাবস্থার কঠিন সময়গুলো মায়েদের পক্ষে একলা সামলানো কঠিন হয়ে যায়। তাই এ ক্ষেত্রে বাবাদেরও ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। একজন নারী তার গর্ভকালে আপন স্বামী, স্বামীর পরিবার এবং নিজ পরিবারের লোকদের সহযোগিতা বিশেষভাবে কামনা করে।
বাবা হয়ে সন্তানের দায়িত্ব নেয়ার পূর্বে গর্ভবতী স্ত্রীর দায়িত্বটা ঠিকঠাকমতো বুঝে নিতে হবে। গর্ভাবস্থায় মায়ের সকালের অসুস্থতা (morning sickness) কেমন হয় কিংবা পা ফুলে গেলে মায়ের কেমন লাগে, গর্ভে বেড়ে ওঠা শিশুর কারণে যখন হৃৎপিণ্ডে চাপ পড়ে বা শিশু যখন পেটের ভেতর লাথি মারে তখন গর্ভবতী মায়ের কেমন অনুভব হয় এসব বাবা হিসেবে পুরুষেরা কখনোই নিজের শরীরে অনুভব করতে পারবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু, একজন বাবা বিভিন্নভাবে গর্ভাবস্থার পুরো প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে। গর্ভাবস্থায় একজন বাবার কী কী ভূমিকা থাকতে পারে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে:
◇ ভয়কে জয় আপনি বাবা হতে যাচ্ছেন, সেটা নিয়ে ভয় কাজ করাটাই স্বাভাবিক। আপনার যদি এ নিয়ে কোনোপ্রকার চিন্তা না থাকে সেটাই বরং অস্বাভাবিক। হঠাৎ আপনার মনে এমন প্রশ্ন জাগতে পারে যে, "আমি ভালো একজন বাবা হতে পারব তো?" অথবা "জীবনের আগামী দিনগুলো কী করে আমি এই গুরুদায়িত্ব বহন করে যাব?” এ ধরনের আতঙ্ক আপনাকে কিছুটা বিচলিত করে তুলবে সন্দেহ নেই। তবুও নিজেকে আত্মবিশ্বাসী করে রাখুন। অন্যদের দেখুন, সন্তানসহ তাদের জীবন কত সুন্দর। এমন কোনো বন্ধু অথবা আত্মীয়ের সাথে কথা বলুন যিনি ইতিমধ্যে বাবা হয়েছেন এবং জানেন এই সময়ের উদ্বেগগুলো। এমনকি আপনি আপনার ভাবনা-চিন্তা-আতঙ্ক সবই ভাগ করে নিতে পারেন আপনার স্ত্রীর সাথে। তিনিও আপনাকে সমাধান দিতে পারেন, না পারলেও সান্ত্বনাটুকু তো দিতে পারবেন। সবচেয়ে বড় কথা তিনি আপনাকে প্রশংসা করবেন এবং আপনার প্রতি তার সম্মান বেড়ে যাবে এটা দেখে যে, আপনি আপনার পরিবার ও প্রজন্ম নিয়ে কতটা চিন্তা করছেন।
◇ গর্ভাবস্থা সম্পর্কে জানুন
প্রেগনেন্সি মানে শুধু বাচ্চা গর্ভে ধারণ আর প্রসব করা নয়, বরং এটি একজন গর্ভাবতী মায়ের জন্য আরও নানান ধরনের অভিজ্ঞতার সমাহার যা সে পুরো সময়টা জুড়ে তার শরীরে এবং মনে ধারণ করে। এই বিষয়টি তার জীবনসঙ্গীকে বুঝতে হবে।
একেক নারীর শরীর একেক রকম। গর্ভবতী হলে বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তনে শরীর ভিন্নভাবে সাড়া দেয়। তাই একজন নারী গর্ভবতী হলে ঠিক কী কী পরিবর্তন তার মাঝে আসতে পারে এটা আগে থেকে বলা মুশকিল। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো অবশ্যম্ভাবী।
তাই স্ত্রী গর্ভবতী হওয়ার সাথে সাথে অথবা পূর্ব থেকেই এই বিষয়ে পড়াশুনা করে জেনে নেয়া ভালো। সে ক্ষেত্রে এ সম্পর্কিত বিভিন্ন বই, আর্টিকেল ইত্যাদি থেকে সাহায্য নেয়া যেতে পারে।
◇ সবরের ১৪ সপ্তাহ
গর্ভাবস্থার প্রথম তিনটি মাস নারীদের জন্য খুব কঠিন। এই সময় অনেক বেশি বিশ্রামের প্রয়োজন। বমি-বমি ভাব, বমি হওয়া, মাথা ঘোরা, খাওয়ায় অরুচি-এসব বিষয়গুলো এই সময়টায় বেশি হয়। একেই বলা হয় Morning Sickness। এই বিষয়গুলো আগে থেকেই পরিবারের লোকদের বিশেষ করে স্বামীর জেনে রাখা জরুরি। গর্ভকালে নারীদের ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন (Mood Swing) হয়ে থাকে। অনেকেই বেশ খিটখিটে স্বভাবের হয়ে ওঠেন ও বিষণ্ণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এমন অনেক বিষয়ে স্ত্রী মেজাজ দেখাতে পারেন যা আপনার কাছে তুচ্ছ মনে হবে। এমন পরিস্থিতি খুব সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কেবল সবর, তার অবস্থা বোঝা ও ভালোবাসার মাধ্যমে। স্বামীকে অবশ্যই এই সময় ধৈর্য ধরতে হবে। স্ত্রীর বিষয়টি বুঝতে হবে যে, এই মেয়েটি আপনার সন্তানের মা হতে চলেছে, এটা ভেবে হলেও কিছু ছাড় দিতে হবে। ১৪ সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পর গর্ভবতী মায়েদের অবস্থার অনেকটাই উন্নতি হয়ে আসে।
◇ পূর্ণ মনোযোগ প্রদান এই সময় স্ত্রী তার স্বামীর পূর্ণ মনোযোগ আশা করবে। গর্ভাবস্থায় একজন মায়ের কী অনুভূতি হচ্ছে বা কী জটিলতা হচ্ছে সেটা হয়তো একজন পুরুষ বুঝবে না। কিন্তু সে যখন তার শারীরিক অবস্থাগুলো নিয়ে নালিশের মতো করে স্বামীকে শুনাতে চাইছে তখন সেটা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। যত কাজই থাকুক না কেন, একটু সময় বের করে আনতে হবে ভবিষ্যৎ সন্তানের মায়ের জন্য। অনাগত সন্তানের নাম ঠিক করা, যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও জামাকাপড় দুজনে মিলে পছন্দ করা, দুজনে মিলে কেনাকাটা করতে যাওয়া, তার পছন্দের খাবার বা ফলমূলগুলো তাকে সাথে নিয়ে কিনে নিয়ে আসা, বলার আগেই তার জিনিসপত্রগুলো এগিয়ে দেয়া, সেবা করা-এসবই গর্ভবতী নারীর মানসিক অবস্থাকে চনমনে রাখবে। এতে সন্তান সম্পর্কে বাবার ভেতরে একটা সুখকর অনুভূতি তৈরি হবে, স্ত্রীও খুশি থাকবে। জীবনের এই ছোটখাটো বিষয়গুলোকে আমরা অনেক সময়ই গুরুত্ব দিই না। কিন্তু এই তুচ্ছ বিষয়গুলোই একসময় অনেক বড় হয়ে ওঠে। মাঝে মাঝে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয় এই তুচ্ছ বিষয় থেকেই।
◇ পাশে থাকুন গর্ভাবস্থা স্ত্রীর জন্য একটি কঠিন মুহূর্ত। তার এই কঠিন মুহূর্তে তাকে সঙ্গ দিতে হবে। কখনোই যাতে সে নিজেকে একা মনে না করে। এমনকি সুযোগ থাকলে সন্তান জন্মের মূহূর্তে সকল কর্মব্যস্ততা থেকে বিরতি নিয়ে হাসপাতালে স্ত্রীর পাশে থাকার চেষ্টা করুন। জানবেন, এ সময়টাতে আপনিই আপনার স্ত্রীর একমাত্র সহায় ও আশ্রয়। সেই মুহূর্তে স্বামীর ওপরই স্ত্রী সর্বাধিক নির্ভরশীল থাকে। তা ছাড়া একজন নারীর জীবনে সন্তান জন্মদান করা একটা বিশাল ঘটনা। যে করেই হোক স্বামীর উচিত পুরো প্রক্রিয়াটার সাথে একাত্মভাবে জুড়ে থাকা, যাতে তার একটু হলেও অবদান রাখা সম্ভব হয়। গর্ভকালে কোনোমতেই স্ত্রীকে অতিরিক্ত চিন্তিত, হতাশগ্রস্ত রাখা যাবে না। কেননা, এর ফলাফল অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ নবজাতকের ওপরও কুপ্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে গর্ভের সন্তান বিকলাঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা অথবা অকাল গর্ভপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
◇ মা-সন্তান স্বাস্থ্য সচেতনতা
গর্ভাবস্থায় মায়ের নিয়মিত চেকাপ দরকার। এ ক্ষেত্রে ভালো কোনো গাইনকোলজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। চেকাপের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আলসেমি বা কৃপণতা না করাই শ্রেয়। এ ছাড়া স্ত্রীর খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে যত্ন নিতে হবে। এই সময়টিতে স্ত্রী ও সন্তান উভয়েরই পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কোনো কৃপণতা করা যাবে না। ভালো ভালো ফলমূল, শাকসবজি, আমিষ, দুধ, ডিম সবই এই সময় মায়ের খাওয়া উচিত। সন্তানের বুদ্ধি বিকাশের ক্ষেত্রে ২০% অবদান সন্তানের তারবিয়াতের ওপর নির্ভর করে। বাকি ৮০% বুদ্ধির বিকাশে অবদান রাখে খাদ্য। অথচ আমরা অনেকেই খাদ্যের দিকে অতটা নজরপাত করি না। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তার খাদ্য যেমন প্রয়োজন, গর্ভে থাকা অবস্থাতেও তা-ই। তবে অনেকেই গর্ভবতী মায়েদেরকে বলে থাকে যে, সন্তান গর্ভে থাকাকালীন ফলমূল কম খেতে। তাহলে নরমাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে সুবিধা হবে। এমনটি করা একদমই উচিত নয়। কেননা, এতে পুষ্টিহীনতার অভাবে বাচ্চা অসুস্থ এমনকি মারাও যেতে পারে।
মহিলাদের জন্য চিনি খাওয়া কমাতে পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া পেঁপে ও আনারস খাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অতিরিক্ত পরিমাণে আঙুর খাওয়া থেকেও বিরত থাকা উচিত। অপরদিকে ফলিক অ্যাসিডযুক্ত খাবার মা ও সন্তানের জন্য অধিক প্রয়োজন। এটি শিশুর স্পাইনা বিফিডা (অপরিণত মেরুদণ্ড)-এর মতো জন্মগত সমস্যাগুলোর আশঙ্কা কমিয়ে আনে। শাক, শিম, মটরশুঁটি, লেবু, কমলা, তরমুজ, কলা ইত্যাদিতে ভালো পরিমাণে ফলিক এ্যাসিড রয়েছে।
স্ত্রীর খাবারের দিকে খেয়াল রাখার পাশাপাশি তাকে নিয়ে হাঁটতে যাওয়া এবং গর্ভকালীন ব্যায়াম করার জন্য উৎসাহ দিতে হবে। সেই সাথে তার পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যাপারেও যত্নবান হতে হবে। সব সময় খেয়াল রাখতে হবে যে, মেঝেতে পানি বা পিচ্ছিল পদার্থ পরে আছে কি না। স্ত্রীকে সাবধানভাবে চলাচল করার বিষয়ে বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় পেট বড় থাকার কারণে গর্ভবতী নারী নিজের পা কোথায় ফেলছে তা দেখতে পারে না। তাই তাকে ধরে ধরে নামানো-ওঠানোর কাজটা স্বামীর করতে হবে। এসবের মাধ্যমে স্ত্রী বুঝবে যে, তার স্বামী তার প্রতি যথেষ্ট দায়িত্ববান-যা তার মানসিক প্রশান্তির কারণ হবে।
◇ নরমাল ডেলিভারির জন্য উদ্বুদ্ধকরণ
সি-সেকশন তথা সিজারের মাধ্যমে ডেলিভারির অনেকগুলো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। তাই সিজারের মাধ্যমে ডেলিভারি হলে ডেলিভারির পর নানাবিধ সমস্যা দেখা দিয়ে থাকে। সে কারণে পুরুষের উচিত স্ত্রীকে নরমাল ডেলিভারির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। তবে কিছু অবস্থা ভিন্ন যেগুলোতে সি-সেকশন ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না, এমতাবস্থাতেও একজন স্বামীর মানসিক ও আর্থিক প্রস্তুতি থাকা দরকার। যেমন : লেবার পেইন অনেকক্ষণ ধরে কিন্তু বাচ্চা উল্টো পজিশনে আছে, অক্সিজেন কমে গেছে, পানি ভাঙার অনেক পরেও পেইন না উঠা সেই সাথে পজিশন উল্টো ইত্যাদির মতো কঠিন পরিস্থিতিতে সি-সেকশন করা লাগতে পারে।
তবে নরমাল ডেলিভারির জন্য স্ত্রীকে আগে থেকেই কাউন্সিলিং করা উচিত। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দু'আ। আল্লাহর কাছে খুব দু'আ করা উচিত। স্ত্রীকে বোঝাতে হবে যে, আল্লাহ মেয়েদেরকে সামর্থ্য দিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি সাধ্যের চেয়ে অধিক বোঝা চাপান না, তাই স্ত্রীও পারবে ইন শা আল্লাহ। এটা একটা সাধারণ প্রক্রিয়া। বরং সি-সেকশনই অস্বাভাবিক যদিও তা বর্তমানে ব্যাপকহারে গ্রহণযোগ্য ও প্রচলিত। সি-সেকশন অনেক বড় একটা সার্জারি, নরমাল ডেলিভারির চেয়ে সি-সেকশনই বরং কঠিন।
তাই অস্বাভাবিক কোনো কিছুতে যাওয়ার চিন্তা মাথায় আনা যাবে না। আমাদের সার্বক্ষণিক দু'আ করা ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা উচিত। আল্লাহর ওপর ভরসা করলে তিনি এমনভাবে সহজ করে দেবেন যেটা আমরা চিন্তাও করতে পারব না।
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ডাক্তার ও হাসপাতাল বাছাই। অনেক ডাক্তার রয়েছেন যারা নরমাল ডেলিভারির জন্য বিশেষায়িত এবং নরমাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও দক্ষ। এমন কোনো ডাক্তার বাছাই করে স্ত্রীকে প্রথম থেকেই তার কাছে দেখানো উচিত। এ ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ম্যাটারনিটি ক্লিনিকের তুলনায় খরচ সামান্য অধিক হতে পারে। সামর্থ্য থাকলে কার্পণ্য করা উচিত নয়।
◇ তাকে জানান যে, আপনি তাকে ভালোবাসেন
এই সময় নারীদের শরীরে অনেক পরিবর্তন আসবে। শারীরিক সৌন্দর্য লোপ পাওয়ার সাথে সাথে চেহারার লাবণ্যও অনেকটা কমে আসতে পারে। সে নিজে এগুলো নিয়ে হতাশগ্রস্ত থাকে। হয়তো আপনার কাছেও কিছুটা অসুন্দর মনে হতে পারে। তবে বুঝতে হবে, এর পিছনে আসলে দায় আপনারই। আপনার সন্তানকে পেটে ধরেই সে তার সৌন্দর্য খুইয়েছে। তাই এই অবস্থায় তাকে আশ্বাস দিন যে, তাকে আপনি যেকোনো অবস্থায় ভালোবাসেন। তাকে আশ্বস্ত করুন যে, আপনার কাছে সে আগের মতোই আছে।
এবং আপনি বরং তাকে আগের চেয়েও অধিক ভালোবাসেন। কোনোভাবেই তার ওজন, বা বদলে যাওয়া শারীরিক অবয়ব নিয়ে ব্যঙ্গ করা বা নিজে কষ্ট পাওয়া উচিত না। কারণ এটা সাময়িক। আপনার উচিত নিজে ধৈর্যধারণ করে একজন সহায়ক সঙ্গী হিসেবে আপনার স্ত্রীকে বোঝানো যে, গর্ভাবস্থায় এটা স্বাভাবিক এবং শীঘ্রই সব ঠিক হয়ে যাবে, আগের মতো হয়ে যাবে।
এ ছাড়া স্ত্রীর হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে আপনাদের সম্পর্কের কিছু বিষয় পালটে যেতে পারে। যেমন: পিঠের ব্যথা বা সকালের অসুস্থতার কারণে আপনার সঙ্গিনীর কাছে হয়তো যৌনমিলন উপভোগ্য হবে না। সে ক্ষেত্রে কষ্ট হলেও আত্মসংবরণ করতে হবে। আবার গর্ভাবস্থায় প্রথম তিন মাস ও শেষ তিন মাস সহবাস করা থেকে বিরত থাকা উচিত। কেননা, এতে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে। তবে খুব প্রয়োজনের কারণে সহবাস করলেও অত্যন্ত সচেতনতার সাথে হালকাভাবে সহবাস করতে হবে। সন্তান জন্মের পরেও ৪২ দিন পর্যন্ত সহবাস করা থেকে বিরত থাকা উচিত। ইসলামেও এই সময়ে অর্থাৎ নিফাস চলাকালীন সহবাস করা হারাম।
তাই পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান বাড়িয়ে দিন। আপনি তাকে বোঝান যে আপনি তার কষ্ট বুঝেন, তার সাহসিকতার জন্য তাকে বাহবা দিন, তার ধৈর্যের প্রশংসা করে ইচ্ছা করেই নিজে হার মেনে যান। যৌনমিলনে মানা থাকলেও ছোট ছোট আদর ও ভালোবাসা কখনো বন্ধ করবেন না। এটি সম্পর্ক রক্ষায় সহায়ক হবে।
◇ স্ত্রীর বাড়ির কাজে সহায়তা বাড়ির কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করা একটি সুন্নাহভিত্তিক আমল। স্ত্রী যদি গর্ভবতী হয় সে ক্ষেত্রে এটা স্বামীর জন্য অবশ্যকর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। দরকার হলে বাড়ির কাজের জন্য একজন সার্বক্ষণিক লোক নিযুক্ত করতে পারেন। যেকোনো ধরনের ভারী বস্তু বহন করা এ সময় গর্ভবতী মায়েদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই এমন কোনো কাজ থেকে গর্ভবতী মাকে বিরত থাকতে হবে। তবে সাধারণ কাজগুলো করা উচিত।
এই সময়ে বিশ্রাম খুবই জরুরি। বিশেষ করে রাতের ঘুম নবজাতকের জন্য অনেক দরকার। কিন্তু আবার সারাদিন শুয়ে-বসেও কাটিয়ে দেয়া যাবে না। সাধারণভাবে তাকে কর্মঠ থাকতে হবে আবার প্রয়োজনীয় বিশ্রামও নিতে হবে। ভারী কাজ ব্যতীত ঘরের টুকিটাকি কাজ, যেমন: ঘর ঝাড়ু বা মোছা, রান্নাবান্না, তরকারি কাটা এইসব করতে পারবে।
◇ আর্থিক পরিকল্পনা সেরে নিন নিশ্চয়ই রিযিক নির্ধারিত এবং তা আল্লাহর তরফ থেকেই আসে। তবে এর মানে এই না যে, হাত গুটিয়ে বসে থাকব আর আসমান থেকে দিনার-দিরহাম, ৫০০-১০০০ টাকার কচকচে নোেট বর্ষণ হবে! আজকাল গর্ভধারণ থেকে শুরু করে সন্তান প্রসব পর্যন্ত অনেক খরচের একটি বিষয়। সন্তান ডেলিভারি থেকে শুরু করে লালন-পালন, সব ক্ষেত্রেই প্রয়োজন হয় অর্থের। সন্তান গর্ভে আসার পর থেকেই প্রয়োজনীয় সকল আর্থিক পরিকল্পনা সেরে ফেলতে হবে। সেই সাথে অর্থের জোগানও নিশ্চিত করতে হবে।
◇ যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকুন আজকাল অনেক উন্নত প্রযুক্তি বের হয়েছে। সন্তানের অসুস্থতার খবর গর্ভাবস্থাতেই অগ্রিম জানা সম্ভব। দুর্ভাগ্যবশত যদি এমন কিছু আপনাদের তাকদীরে লেখা থাকে তবুও ভেঙে পড়বেন না মোটেও। দুজনে মিলে সমস্যার মোকাবেলা করে এগিয়ে যেতে হবে। সন্তান আপনাদের, লড়াইটাও আপনাদেরকেই করতে হবে। যুগ যুগ ধরে এমনটি হয়ে এসেছে। এটাই জগতের নিয়ম। আল্লাহ যদি ওমনটি চান তাহলে আমাদের জন্যও সেই ফয়সালার ওপর ভরসা রাখাই উত্তম হবে। নিশ্চয় কষ্টের সাথেই রয়েছে সুখ!
◇ হাসপাতালের পথ চিনে রাখুন যেকোনো মুহূর্তেই হয়তো আপনার স্ত্রী বলে বসবেন, 'আমার পানি ভেঙে গেছে', আর তখনই তাকে নিয়ে আপনার দৌড়াতে হবে হাসপাতালের পথে। আগে থেকেই ঠিক করে রাখুন এ রকম অবস্থায় কোথায় যাবেন আর কোন পথে গেলে তাড়াতাড়ি হবে। বাহন ঠিক করে রাখুন যাতে যেকোনো সময় ডাকলে তা পাওয়া যায়। নিজস্ব গাড়ি হলে পেট্রোল, গ্যাস মজুদ রাখুন আগে থেকেই, যাতে সেই অন্তিম মুহূর্তটি যখনই আসুক না কেন দেরি না করেই বেরিয়ে পড়া সম্ভব হয়।
◇ স্ত্রীর প্রসবসঙ্গী হিসেবে সাথে থাকুন প্রসবের জন্য হাসপাতালে যাওয়ার সময় কী কী সাথে নিতে হবে সেটা আগে থেকে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে জেনে নিন। ইন্টারনেটে অনেক ভালো ভালো ব্লগ ও আর্টিকেল রয়েছে এই বিষয়ে, সেখান থেকে বিস্তারিত পড়াশোনা করুন। প্রসবের পর মা যথেষ্ট ক্লান্ত আর অসুস্থ থাকতে পারেন, তাই তার ও বাচ্চার প্রয়োজনীয় বস্তু কোথায় কী রাখা আছে ভালোমতো জেনে নিন যাতে ঠিক সময়ে দ্রুত আপনি প্রয়োজনীয় জিনিসটা বের করে দিতে পারেন। সম্ভব হলে আপনি নিজের হাতেই সেগুলো গুছান।
প্রসবের সময় সর্বাত্মক চেষ্টা করুন তার সাথে অবস্থান করতে। তার ঘাড়ে কেউ আলতো করে মালিশ করে দিলে হয়তো তার ভালো লাগতে পারে, তার হয়তো বরফ লাগতে পারে কিংবা ব্যথানাশক দেয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়ও তার আপনার সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে। তিনি যখন প্রসববেদনায় কাতর তখন তার হাত ধরে রাখুন, তার উৎসাহ জোগান।
অনেক হাসপাতাল ডেলিভারি রুমে বা অপারেশন থিয়েটারে বাবাদের থাকার অনুমতি দেয়। এমনটা সম্ভব হলে আপনার শিশুর পৃথিবীতে আসার মুহূর্তে উপস্থিত থাকার সুযোগ হেলায় হারাবেন না মোটেও। এমন সময় আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে, মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে আর অনেক শক্ত থাকতে হবে!
সন্তান জন্মের পর যতটুকু সম্ভব বেশি সময় কাটান স্ত্রী ও সন্তানের সাথে। যদি হাসপাতালে থাকার অনুমতি পান, তাহলে স্ত্রী-সন্তানের সাথেই থাকুন। যতদিন তারা বাসায় না ফিরছে আপনিও থেকে যান তাদের সাথে। এতে করে সন্তান এবং স্ত্রীর সাথে আপনার সম্পর্কে একটা নতুন মোড় নেবে। যেখানে ভালোবাসা ছাড়িয়ে গিয়ে পারস্পরিক সৌহার্দ্য জায়গা করে নেবে। তা ছাড়া কীভাবে সন্তানের যত্ন নিতে হয়, সেই বিষয়টাও অনেকটাই শিখে যাবেন এই সময়টাতে। আপনার স্ত্রীর চোখে আপনি নতুন রূপে তখন আবির্ভূত হবেন।
যত ব্যস্তই থাকুন না কেন, স্ত্রীর গর্ভাবস্থার জটিলতা যতই উদ্বিগ্ন করুক না কেন, এই নয়টা মাস আপনাকে একজন সত্যিকার পুরুষের মতো দায়িত্ব পালন করে যেতেই হবে। দিন শেষে কিন্তু এক সন্তানই বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় উপহার হয়ে ওঠে। আর বাবা-মাও সন্তানের সবচেয়ে বড় নির্ভরতার একটা জায়গা। সময়টাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করুন, কিছুটা বড় হয়ে উঠুন মনে-প্রাণে, পৃথিবীতে যে নতুন সত্তার আগমন ঘটতে চলেছে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবুন, নিজের মনকে তার চিন্তায় উদ্বেলিত রাখুন।
📄 গর্ভাবস্থায় যৌনমিলন
প্রথম তিন মাস ও শেষ তিন মাস সহবাস না করাই উত্তম। তবে করলে সে ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে যাতে লিঙ্গ খুব বেশি গভীরে না যায়। এতে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে। এমনটাই হতে দেখা যায় যে, যারা বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয় না তাদেরই গর্ভপাত হয়ে থাকে। তাই সম্ভব হলে একদম বিরত থাকাই শ্রেয়।
এ ছাড়া গর্ভকালে যাদের একটু একটু রক্তপাত হয় তাদের জন্য পুরা ৯ মাসই সহবাস থেকে বিরত থাকা ভালো। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো উপায়ে স্বামী তার চাহিদা পূরণ করে নেবে।
আবার অনেক ক্ষেত্রে এমন হয় যে, এই সময়টাতে স্ত্রী স্বামীর প্রতি আগ্রহ পায় না বা কোনো গন্ধও সহ্য করতে পারে না, কোমড় ব্যথা বা অন্যান্য অসুস্থতা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে স্ত্রী ওযরগ্রস্ত। তাই এটা স্বামীর মেনে নেওয়া উচিত।
📄 সন্তান জন্মের পর করণীয়
* সন্তান প্রসবের পর সন্তানকে খুব দ্রুত মায়ের কোলে দেয়া উচিত যাতে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো যায়। বিশেষত শাল দুধ শিশুর জন্য খুবই পুষ্টিকর ও নবজাতকের মস্তিষ্ক গঠনে তা সহায়তা করে。
* নবজাতক শিশু গর্ভে থাকাকালীন অনেক উষ্ণ পরিবেশের উষ্ণ তরলের মধ্যে অবস্থান করছিল। তাই অল্পতেই নবজাতকের ঠান্ডা লেগে যাওয়ার প্রবণতা থাকে যা থেকে নিউমোনিয়া পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। তাই সার্বক্ষণিক শিশুকে কাপড় বা সামান্য মোটা কাঁথা দিয়ে জড়িয়ে দেওয়া উচিত যাতে বাচ্চার ঠান্ডা না লাগে。
* গরমকালেও সরাসরি পাখা বা এসির নিচে বাচ্চাকে না রাখা। তাকে যথাযথভাবে ঢেকে রাখতে হবে。
* প্রস্রাব-পায়খানা হচ্ছে কি না, নাভি ঠিক আছে কি না এসব খেয়াল রাখতে হবে。
* চুল ফালানোতে ঠান্ডা লাগতে পারে কারণ চুল নবজাতকের তাপমাত্রা ধরে রাখে। তাই শীতকালে বাচ্চা জন্ম নিলে আর বাচ্চার অধিক সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকলে চুল না ফেলাই ভালো। এ ক্ষেত্রে দ্বীনদার কোনো ডাক্তারের কাছ থেকে পরামর্শ নেয়া যেতে পারে。
* মা যেহেতু শিশুকে দুধ পান করাবে তাই তার খাদ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হবে。
* সন্তানের জন্য মায়ের বুকের দুধই সর্বাধিক উপযোগী। বুকের দুধ অধিক ঠান্ডাও না আবার অধিক গরমও না। নবজাতক শিশুর জন্য এটাই উত্তম। জন্মের পর থেকে অন্তত ৬ মাস পর্যন্ত কেবল বুকের দুধই পান করাতে হবে, এর বাইরে অন্য কিছু খাওয়ানো যাবে না。
◇ বাচ্চাকে কৌটাজাত দুধ পান করানোর ব্যাপারে নিজেরা সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না। বাচ্চা যদি মায়ের দুধ পান না করে, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। প্যাকেট বা কৌটাজাত দুধ শিশুদের জন্য অনুত্তম। যেই শিশু একদমই বুকের দুধ পান করে না তাদের জন্য সেসব বিকল্প ব্যবস্থা。
* মায়ের চোখে আজীবনই 'বাচ্চা কিছু খায় না'। ফলে মায়েরা সন্তানের বিষয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে চাপ দেয় সাধারণ দুধ আনার জন্য। তাই বুকের দুধ ভালোমতো পান করছে কি না সেটা বাবাদেরও খেয়াল রাখা দরকার। বাচ্চা দৈনিক অন্তত ৬ বার প্রস্রাব করলে বুঝতে হবে যে, তার খাওয়া-দাওয়া ঠিকমতো হচ্ছে。