📄 আলাদা সংসার
নারীরা নিজেদের আলাদা সংসার কতটুকু আশা করে? ওমেন'স সাইকোলজি সার্ভের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, ২৭% নারী স্বামীর সাথে আলাদা সংসার করতে চায়। ৩৫% নারী শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে থাকতে চায়। আর বাকি ৩৮% বিভিন্ন শর্তের কথা জানিয়েছেন। সেসব শর্ত অনুপস্থিত থাকলে আলাদা সংসারকেই অধিক প্রাধান্য দিয়েছে।
প্রতিটা নারী-পুরুষের জীবনেই বিয়েটা হলো দীর্ঘদিনের স্বপ্নবুনা এক যাত্রা। নারী-পুরুষের এই স্বপ্নগুলো চাহিদাভেদে আবার সম্পূর্ণ আলাদা। পুরুষদের দাম্পত্য জীবনের স্বপ্নগুলো হয়ে থাকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার স্ত্রী-কেন্দ্রিক। অপরদিকে নারীরা স্বপ্ন বুনে সমগ্র একটা সংসারকে নিয়ে। সেখানে স্বামী, সন্তানসহ শো-কেসে সাজানোর জন্য একটা ফুলদানি; প্রত্যেকটি বিষয়ই তার স্বপ্নজুড়ে থাকে। নারীরা সহজাতিকভাবেই সংসার-কেন্দ্রিক। তারা চায় নিজের আয়ত্তাধীন একটা সংসার হবে। তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে তার পুরো সংসার। সে হবে সেই সংসারের রানি।
একান্নবর্তী পরিবারে এই স্বপ্নপূরণ পুরোপুরিভাবে সম্ভব হয় না। কারণ, সেই সংসারটা মূলত থাকে শাশুড়ির হাতে। শাশুড়ির সেই সংসারে হস্তক্ষেপ করা শাশুড়ির নিশ্চয় পছন্দ হবে না সেটাই স্বাভাবিক। এ ছাড়াও একান্নবর্তী পরিবারে ননদ, ভাসুর, জা সকলে মিলে একসাথে বসবাস করার দরুন সেখানে বিভিন্ন রকমের সমস্যার সম্মুখীনও হতে হয়।
* পর্দা রক্ষায় সমস্যা
জয়েন্ট ফ্যামিলিতে স্ত্রীর জন্য খোলামেলাভাবে বাড়িতে হাঁটাচলা করা দুষ্কর। বাড়িভর্তি মানুষ থাকাতে সব সময় হিজাব-নিক্কাব পরে চলতে হয়। যখন তখন ভাসুর কিংবা দেবরের সামনে পরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। যার কারণে বারবার পর্দা লঙ্ঘন হয়ে যায়। আবার যেসকল বাড়িতে চাচা, মামাশ্বশুরেরাও অবস্থান করে সেই বাড়িতে পর্দা রক্ষা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর তার ওপরে যদি স্বামীর পরিবারে দ্বীনের বুঝ না থাকে, তাহলে পর্দা রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। কারণ, নতুন বউ বাড়িতে এলে সবাই নতুন বউ দেখতে চায়। চাচা-মামাশ্বশুরদের সামনে গিয়ে মুখ খুলে কথা বলতে হয়, আর তা না করলে তৈরি হয় সমস্যা。
* ব্যক্তিগত সময়ে বাধা
একান্নবর্তী পরিবারে ব্যক্তিগত সময় বলে কিছু নেই। সেখানে সকলেই চায় বাড়ির বউ তাদেরকে সময় দিক। এভাবে সকলকে সময় দিতে গিয়ে নিজের জন্য আলাদা করে সময় বের করা সম্ভব হয় না। ফলে আমলে ব্যাপক ঘাটতি পড়ে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত সময়েও পরিবারের সদস্যদের ডাক পরে যায়। যার ফলে স্বামীর সাথে কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটানোও দুরূহ হয়ে যায়। এতে দাম্পত্য জীবনে দূরত্ব বাড়ে。
◇ ঝগড়া-বিবাদ
একান্নবর্তী পরিবারগুলোতে বিভিন্ন বয়স ও চিন্তাধারার মানুষের বসবাস। সেখানে একেকজনের চাহিদা থাকে একেক রকম। অন্য একটি পরিবেশ এবং অন্য একটি পরিবার থেকে আসা মেয়েটির জন্য প্রত্যেকের চাহিদা পূরণ করে সবাইকে খুশি রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়। এভাবে স্বামীর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে মনোমালিন্য তৈরি হয়। আর তা থেকে ঝগড়া-বিবাদ, রাগারাগির শুরু হয়।
* সন্তানের তারবিয়াতে বাধা
জাতি গঠনে সন্তানের সুষ্ঠু তারবিয়াতের ভূমিকা অপরিসীম। বর্তমান প্রজন্ম চারিদিকে ফিতনা ভরা নদীতে থাকা একটি দোদুল্যমান সাঁকোর ওপরে চলছে। এই প্রজন্মকে সঠিক তারবিয়াত না দিতে পারলে সেই সাঁকো থেকে যখন তখন ছিটকে পড়ে যেতে পারে।
এজন্য প্রতিটি বাবা-মায়ের তাদের সন্তানের পিছনে অনেক মেধা এবং শ্রম প্রয়োগ করতে হয়। কিন্তু একান্নবর্তী পরিবারে থাকলে এই বিষয়টি কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ, বেশির ভাগ পরিবারগুলোতে দ্বীনের পরিপূর্ণ বুঝ থাকে না। যার দরুন তারা ইসলামিক প্যারেন্টিং-এর বিষয়গুলো বুঝে উঠতে পারে না। সচেতন বাবা-মায়েরা যেই ছোট ছোট বিষয়গুলোকেও খুব সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখতে চায় সেগুলো পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা কখনো চিন্তাই করে না। কিংবা তাদেরকে সেগুলো বোঝাতে গেলেও তারা বুঝতে তো পারেই না উল্টো ভিন্ন অর্থ দাঁড় করাতে সচেষ্ট হয়। যার ফলে সন্তানের সঠিক তারবিয়াত এখানে বাধাগ্রস্ত হয়।
অপরদিকে যদি বাবা-মায়ের সাথে থাকা দম্পতির জন্য কোনো সমস্যার কারণ না হয়, তাহলে একত্রে থাকাই শ্রেয়। আবদুল্লাহ ইবনে উমার বলেন,
رِضَا الرَّبِّ فِي رِضَا الْوَالِدِينِ، وَسَخَطُهُ فِي سَخَطِهِمَا
পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মাঝে রবের সন্তুষ্টি আর তাঁদের (বাবা-মায়ের) অসন্তুষ্টির মাঝে তাঁর (রবের) অসন্তুষ্টি। [১]
মা-বাবা যদি নিজেরাই নিজেদের দেখাশোনা করতে পারে, সে ক্ষেত্রে আলাদা থাকায় শরী'আতের দিক থেকে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তারা যদি বৃদ্ধ হয়, তাদের সাথে অবস্থান করার মতো আর কেউ না থাকে ইত্যাদি ক্ষেত্রে আলাদা থাকা কখনোই উচিত নয়। মূলত পরিস্থিতির ওপরেই বিষয়টি নির্ভর করে। এমন ক্ষেত্রে বিয়ের পূর্বেই পাত্রীকে বলে নিতে হবে এ বিষয়ে।
এক সংসারে সবাই মিলে বসবাস করলে বেশ কিছু ফায়দা রয়েছে। পরিবারকে দ্বীনের বুঝ দেয়া যায়, তাদের খেদমত করে জান্নাত হাসিল করা যায়, পরিবারের বন্ধন ভালো থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে কিছু ঝামেলা হবেই সেটা স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে স্ত্রী রেগে গেলে ধৈর্যধারণ করতে হবে। বোকার মতো কোনো আচরণ করলে সহ্য করে নিতে হবে। যেহেতু পুরুষ অপেক্ষা নারীর আবেগ ও প্রতিক্রিয়া-প্রবণতা অধিক এবং এই দিক থেকে পুরুষের তুলনায় নারীর ধৈর্য বহুলাংশে কম, সুতরাং দয়া করেই হোক অথবা ভালোবাসার খাতিরেই, তার ছোটখাটো ভুলগুলো ক্ষমা করে দেয়াই শ্রেয়। [২] স্বামীর মনে অঙ্কিত সরল পথে সম্পূর্ণভাবে সে চলতে চাইবে না। সোজা করে চালাতে গেলে বাঁকা হাড় ভেঙে যাবে, অর্থাৎ মন ভাঙার মাধ্যমে সংসারও ভেঙে যেতে পারে। [৩]
টিকাঃ
[১] আল আদাবুল মুফরাদ- ২; সুনানে তিরমিযী- ১৮২১, হাদীসটি সহীহ।
[২] মিশকাতুল মাসাবীহ- ৩২৩৮
[৩] মিশকাতুল মাসাবীহ- ৩২৩৯; সহীহ মুসলিম- ১৪৬৮; সহীহ বুখারী- ৫১৮৬
📄 পুরুষের স্বভাববাদি
প্রত্যেকেই মা-বাবার ছত্রছায়ায় শিশু থেকে মস্ত বড় মানুষে পরিণত হয়। বাবা-মা যেমন যত্ন আর পরম আদরের সাথে সন্তানের দায়িত্ব পালন করে আসে তেমনি সন্তান যখন বড় হয়ে যায় মা-বাবার প্রতি তাদের ওপরেও কিছু দায়িত্ব চলে আসে। ছেলেরা যেমন সারা জীবন ধরে এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পায়, মেয়েদের ক্ষেত্রে এই সুযোগ কিছুটা কম থাকে। কারণ, মেয়েরা বিয়ে করে শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়। তবুও মা-বাবার প্রতি দায়িত্ব পালনের চেষ্টা সর্বোচ্চ চালিয়ে যেতে হয় মেয়েদেরও। এ সময়টাতে একজন নারীর তার স্বামীর সাহায্যের প্রয়োজন পড়ে। একজন নারীর জন্য তার শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা করা যেমন ফরয না তেমনি পুরুষের ক্ষেত্রে একই। প্রত্যেকের জন্যই নিজেদের বাবা-মায়েদের খেদমত করা ফরয।
তবে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে একে অপরের দায়িত্বগুলোকে খুব সহজে ভাগাভাগি করে নিতে পারে। স্বামী সারাদিন বিভিন্ন ব্যস্ততায় দিন কাটায় ফলে নিজের বাবা-মায়ের যথেষ্ট সেবা-শুশ্রূষা করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না। অপরদিকে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে চলে আসায় নিজের বাবা-মায়ের খেদমত করতে পারে না স্ত্রী, সেই সাথে নিজের উপার্জন না থাকায় বাবা-মায়ের জন্য খরচও করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী এক ধরনের চুক্তিতে যেতে পারে; স্ত্রী তার শ্বশুর-শাশুড়ির যথাযথ সেবা করবে, এদিকে স্বামী তার শ্বশুর-শাশুড়িকে আর্থিক দিক থেকে যথাসাধ্য দেখভাল করবে। এতে উভয়েরই দায়িত্ব পালন হলো, সাথে পরিবারের বন্ধনও মজবুত রইল।
📄 বহুবিবাহ
দ্বীনদার পুরুষদের দৈনন্দিন জীবনের আড্ডায় হঠাৎ কেউ একজন বহুবিবাহ নিয়ে ঠাট্টা করে কিছু একটা বললেই আধা চাঁদ যেন মুখে নেমে আসে, দাঁতের ক্যালানি কে দেখে! ভাবতে ভালো লাগে, একের অধিক স্ত্রীর সোহবতে একজন পুরুষের যাপিত জীবন কতই-না সুখকর হতে পারে! এমন কল্পনা পুরুষের মনকে উদ্বেলিত করবে এটাই স্বাভাবিক। পুরুষেরা বহুমুখী, আর এ কারণেই জান্নাতে পুরুষদের জন্য রাখা হয়েছে একাধিক স্ত্রী। তারা পবিত্র, তারা কোমল চরিত্রের অধিকারিণী। কিন্তু দুনিয়ার নারীদের বৈশিষ্ট্য ভিন্ন। তারা স্বামীর ভাগ অন্যকে দিতে চাইবে না, মেনে নিতে কষ্ট হবে। যদিও যুগের পর যুগ মুসলিমদের মাঝে এটা সাধারণ চর্চা ছিল।
কিন্তু হঠাৎ আমাদের মস্তিষ্ক অন্যভাবে ভাবতে শুরু করেছে। বিশেষত আমাদের উপমহাদেশে ইংরেজদের রেখে যাওয়া বিষ আমরা ঢকঢকিয়ে গিলে নিয়েছি। তাই তাদের সভ্যতা আমাদের কাছে সার্বজনীন মনে হলেও ইসলামের বিধান আমাদের কাছে মাঝে মাঝেই কিছুটা তেতো মনে হয়।
ওমেন'স সাইকোলজি সার্ভেতে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, স্বামী আরেকটি বিয়ে করলে মেনে নিতে পারবে কি না। ৫৭% নারী বলেছেন তারা মেনে নিতে পারবেন না। ২১% নারী বলেছেন মেনে নিতে কষ্ট হবে। বাকিরা বলেছেন মেনে নিতে পারবেন। যেহেতু অধিকাংশ নারী আজকের সমাজে বহুবিবাহ মেনে নিতে পারবে না বলেই জানিয়েছে তাই এমন সাহস করে শুধু শুধু নিজের জীবন বিপন্ন করার মতো বোকামি পুরুষদের না করাই শ্রেয়!
তবে খুব বিশেষ প্রয়োজনে পুরুষেরা একাধিক বিয়ে করতে পারে। যেমন: বর্তমান স্ত্রী বন্ধ্যা বা চাহিদা পূরণে বেশি অক্ষম হলে, বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা নারীদের সহায় হতে ইত্যাদি। আমাদের সমাজে বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা, নওমুসলিম, আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন এমন অনেকেই আছেন যাদের বিয়ের অনেক প্রয়োজন। ইনবাতের জরিপটিতে ৫৬.৯% নারী জানিয়েছেন যে, তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা হওয়ার কারণে তাদেরকে সমাজে বা পরিবারে তাচ্ছিল্যের সম্মুখীন হতে হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পুরুষেরা এগিয়ে এলে কারও কারও জীবন সুন্দর হতে পারে। তবে বহুবিবাহ নিয়ে আমাদের সমাজে যেসব সমস্যা হয়ে থাকে সেগুলোর জন্য পুরুষেরাই সিংহভাগ দায়ী।
* নতুন বিয়ে করে পূর্বের স্ত্রীকে ভুলে যাওয়া。
* সমাজে প্রথম স্ত্রীকে স্ত্রীরূপে স্বীকৃতি দেয়া আর অন্যান্য স্ত্রীদেরকে গোপনে রাখা。
* আলাদা সংসার না দেয়ার কারণে ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকে ফলে স্ত্রীদের মানসিক প্রশান্তি ক্ষুণ্ণ হওয়া。
* একাধিক স্ত্রীর মাঝে যথাযথ ন্যায়তা রক্ষা করতে না পারা। আর্থিকভাবে দুর্বল হওয়ার কারণে একাধিক স্ত্রীর খরচ ঠিকঠাকভাবে চালাতে না পারা। বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা বিবাহ করলে তার অতীত মেনে নিতে না পারা, তার অতীত নিয়ে কথা শোনানো, তার পূর্বের সংসারের সন্তানদেরকে মেনে নিতে না পারা。
* পূর্বের স্ত্রীকে না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করা জায়েয হলেও অনুচিত। একাধিক বিয়ে করার ইচ্ছা থাকলে ইচ্ছা প্রকাশের সাহসও থাকা চাই。
এর বাইরেও আরও নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। একজন পুরুষের স্নায়ু যদি এতটা শক্তিশালী হয় যে, তার দ্বারা এসব ঝামেলা হবে না বলে মনে হয়, কেবল সে ক্ষেত্রেই একাধিক বিবাহের কথা মাথায় আনতে পারে! এর বিপরীত হলে এই স্বপ্নকে মাটি দেয়াই শ্রেয়।
📄 পিতা হিসেবে সন্তানের তারবিয়াত
সন্তান লালনের মূল দায়িত্বটা মায়েদের ওপর অর্পিত হলেও বাবাদের দায়িত্বটাও ফেলে দেয়ার মতো না। বাবা হচ্ছে সন্তানদের জন্য বটবৃক্ষের ছায়া। বাবার বুকে যেমন সন্তানের জন্য মমতা লুক্কায়িত থাকবে তেমনি বাবার চোখে চোখ রাখতে সন্তানেরা ভয় পাবে। সন্তানদের কাছে হিরো হবে তাদের বাবা। প্রতিটি শিশুর স্বপ্ন থাকে 'বড় হয়ে বাবার মতো হতে চাই'। তাই সন্তানের তারবিয়াতের ক্ষেত্রে বাবাদের প্রথম করণীয় হলো নিজেকে প্রশ্ন করা, 'আমি কি চাই যে, আমার সন্তান আমার মতো হোক?' যদি উত্তর 'না' আসে তাহলে কেন চান না সেই উত্তর খুঁজুন এবং নিজেকে সেই অনুযায়ী পরিবর্তন করুন।
সন্তান নিজেকে তার বাবা-মায়ের দর্পণে দেখতে ভালোবাসে। অর্থাৎ সন্তান মূলত তার বাবা-মায়েরই প্রতিবিম্ব। তাই সন্তানকে ছোটকাল থেকেই ইসলামের মূল্যবোধ শেখাতে হবে। এই সময়টা সন্তানেরা নরম মাটির মতো থাকে। যেভাবে খুশি গড়া যায়। পরে ধীরে ধীরে তা শক্ত হয়ে যায়। তখন চাইলেও পরিবর্তন সম্ভব হয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রে। তাই এই সময়টা কাজে লাগাতে হবে। আবার সন্তানদের বয়স হয়ে গেলে যে তাদের তারবিয়াতের আর প্রয়োজন নেই এমনটা ভাবা যাবে না। সন্তানেরা আজীবন বাবা-মায়েদের কাছ থেকে শিখবে। প্যারেন্টিং একটি সুদীর্ঘ পাঠ। যার শুরু হয় সন্তান জন্ম নেয়ারও বহু পূর্ব থেকেই।
* সন্তান জন্মের পূর্বে
তারবিয়াত শুরু হয় সন্তান প্রসবেরও অনেক পূর্ব থেকেই। এ ক্ষেত্রে প্রথম ধাপ হচ্ছে ভবিষ্যৎ সন্তানের জন্য দ্বীনদার মা খোঁজা। দুজনেরই দ্বীনের বুঝ না থাকলে সন্তানকে সঠিক দ্বীনের দিশা মেলানো কষ্টকর হয়ে যাবে。
সন্তান যখন গর্ভে থাকে তখন স্ত্রীকে সকল প্রকার হারাম পরিবেশ ও গান-বাজনা থেকে দূরে রাখতে হবে। বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত শোনাতে হবে। সন্তান প্রসব হয়ে গেলে আযান দেয়া, তাহনীক করানো, সুন্দর অর্থবহ নাম রাখা, আকীকা দেয়া ইত্যাদি বিষয় বাবার পরিকল্পনায় থাকা উচিত。
◆ শাসন
সন্তানের বয়স, আচরণ, চিন্তাধারা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করবে যে তাকে শাসন কীভাবে করতে হবে। যদি বাচ্চা শান্ত স্বভাবের হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে শাসনের খুব একটা প্রয়োজন নেই। তবে সন্তান যদি কিছুটা দুষ্টু প্রকৃতির হয়, তাহলে ভিন্ন কথা। মূলত সন্তানদেরকে ৭-৮ বছরের আগে শাসন না করাই উত্তম।
বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ঘরের কাউকে না কাউকে ভয় পাওয়া উচিত। এই স্থানটাতে বাবা থাকলেই সবচেয়ে ভালো হয়। তবে কথায় কথায় সন্তানকে বকা দেয়া, মাত্রাধিক্য শাসন করা, মার দেয়া ইত্যাদি থেকে নিঃসন্দেহে বিরত থাকতে হবে। সামান্য কিছু সময়ের জন্য কথা না বলে থাকা, অভিমান করে কথা বলা ইত্যাদির মাধ্যমে তাকে বোঝাতে হবে যে তার কাজটি ঠিক হয়নি।
* সন্তানের ব্যক্তিত্ব গঠন
সন্তানের সামনে সুন্দর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটাতে হবে। এতে তাদেরও সুন্দর ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠবে। এ ছাড়া সন্তানেরা যখন বড় হতে থাকে তখন থেকেই তাদেরকে পড়াশোনার জন্য কোথায় পাঠানো হবে তা নিয়ে ফিকির করতে হবে। ভালোমানের মাদরাসা বা ইসলামিক স্কুলের খোঁজ করতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে বুঝ হলে দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রেও যাতে অগ্রসরমান হয় সেটা নিয়েও বাবাদের তটস্থ থাকা উচিত। যেমন: সাধারণ জ্ঞান, ভৌগোলিক জ্ঞান, দা'ওয়াহ প্রদানের উপায় ও ধরন, সাঁতার, মার্শাল আর্ট ইত্যাদি শেখানো। ছোটকাল থেকেই বইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে যাতে বড় হয়ে পড়ুয়া হয়। সন্তানকে দৌড়ঝাঁপ করতে উৎসাহিত করতে হবে, হোক তা বাসায়। এতে ছোটকাল থেকেই সন্তানের মাঝে চাঞ্চল্য আসবে যা পরবর্তীতে কাজে দেবে ইন শা আল্লাহ。
◆ হতে হবে সন্তানের বন্ধু
সন্তানদের সাথে এতটুকু খোলামেলা থাকতে হবে যাতে সে তার প্রয়োজন, চাহিদা, সমস্যাগুলো আপনার কাছে নিঃসংকোচে বলতে পারে। তার বয়সের দিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং সেই অনুযায়ী তাকে দুনিয়ার অন্ধকার থেকে হেফাযত করে যেতে হবে। সময় হলে সন্তানের বিয়ে দিয়ে দেয়া উচিত। এতে বিলম্ব না করাই উত্তম। আমাদের ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষরা আমাদের সাথে যা করেছে আমরাও যাতে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সাথে তেমনটা না করি। সন্তানের অন্তরের অবস্থা বুঝতে হবে পিতাদেরকে।
* সন্তানকে উপদেশ প্রদান
সন্তান যখন পরিপূর্ণ বুঝবান হয়ে যাবে তখন সন্তানকে বিভিন্ন সৎ উপদেশ প্রদান করতে হবে, দিকনির্দেশনা দিতে হবে। পূর্ববর্তী নবীগণ তাদের সন্তানদেরকে উপদেশ দিতেন। নিজ পুত্রসন্তানকে লুকমান হাকীমের প্রদত্ত বেশ কিছু উপদেশ কুরআনেও এসেছে। এটি একটি নবীওয়ালা চর্চা। তাই এটি অনুশীলন করা উচিত。
* সন্তানের চাহিদামাফিক খরচ
সর্বোপরি পিতাদের অন্যতম মহৎ দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানদের জন্য খরচ করা। এ ব্যাপারে অযথা কিপটামো করা অনুচিত। এ ছাড়া সন্তানদের মাঝে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন যাতে নিশ্চিত হয় সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে。
* সন্তানদের মাঝে সমতা রক্ষা
একাধিক সন্তানের মাঝে বাবাদের সমতা রক্ষা করা উচিত। সন্তানদের মাঝে কারও যাতে এমন মনে না হয় যে, তাকে কম প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে。
আমাদের সন্তানেরা এক পচনশীল দুনিয়ার মুখ দেখতে যাচ্ছে। এমন দুনিয়া যেখানে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া খুব সহজ। এমতাবস্থায় সন্তান জন্ম দিয়ে ছেড়ে দিলে সন্তান হাজার হাজার রাস্তার মাঝ থেকে নিজের পছন্দমতো পথ খুঁজে নেবে। এই হাজার হাজার রাস্তার মাঝে একটিই কেবল মিলিত হয়েছে জান্নাতের সাথে, সেটাই হলো সিরাত্বাল মুস্তাক্বীম। সেই সিরাত্বাল মুস্তাক্বীম চিনিয়ে দেয়ার দায়িত্ব বাবাদের। এই ব্যাপারে অবহেলার শাস্তি তাই বাবারও পেতে হবে।