📄 বেশ কিছু জন্মনিরন্ত্রণ পদ্ধতির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
হায়েয শুরু হওয়ার পর থেকেই একজন নারী মা হওয়ার জন্য যোগ্যতা অর্জন করে।
অর্ধশতাব্দী পূর্বেও দশের কোটায় পেরিয়েই নারীরা মা হয়েছে, সেই সাথে তারা অনেক সন্তানের অধিকারিণী হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পাশ্চাত্যের রীতি অনুসরণ করতে গিয়ে নারীরা কম বয়সে সন্তান নেওয়ার কথা ভাবতে সামান্য ইতস্ততবোধ করে। তাই নিজের ক্যারিয়ার বিল্ডাপ করতে করতে ত্রিশের চৌকাঠে পা রেখে শেষে সন্তান গ্রহণের চিন্তাভাবনা শুরু করে। অনেক নারী বিয়ের জন্য পাত্রই খুঁজতে শুরু করে ত্রিশের পর। কিন্তু প্রতিটি বিষয়ের একটি স্বর্ণমুহূর্ত রয়েছে। সেই মুহূর্তটা অতিবাহিত হয়ে গেলে মাঝে মাঝেই সম্মুখীন হতে হয় ব্যর্থতার। একজন নারীর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে ধীরে ধীরে তার মা হওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকে এবং সেই সাথে গর্ভপাতের আশঙ্কাও বাড়তে থাকে। ৩০+ বছর বয়সী নারীদের গর্ভপাত হওয়ার আশঙ্কা ২০% বৃদ্ধি পায়।
এ ছাড়া অপরিপক্ক সন্তান জন্ম নেওয়ারও সমূহ সম্ভাবনা থাকে। তাই ঝুঁকিমুক্ত থেকে যত জলদি সম্ভব সন্তান গ্রহণের পরিকল্পনা রাখা উচিত। পূর্বের আলোচনায় আমরা বেশ কিছু জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির শরঈ বিধান সম্পর্কে জেনেছি। তন্মধ্যে কিছু পদ্ধতি জায়েয, কিছু পদ্ধতি নাজায়েয। নাজায়েয পদ্ধতিগুলো পরিত্যাজ্য হওয়ার অন্যতম বিশেষ একটি কারণ এই যে, সেসব পদ্ধতি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলেই প্রমাণিত।
জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে জন্মনিয়ন্ত্রক বড়ি (Contraceptive Pill) এর প্রচলন বর্তমান সময়ে ব্যাপক। কিন্তু এর বেশ কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। এই ওষুধগুলোতে এমন কিছু হরমোনজনিত উপাদান রয়েছে (যেমন: এস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন) যা শরীরের কার্যক্ষমতা পরিবর্তন করে গর্ভধারণ থেকে বিরত রাখে। মূলত ডিম্বাশয় ও জরায়ুকে এসব ওষুধ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এসব ওষুধ ডিম্বাণু নিঃসরণকে বাধাপ্রাপ্ত করে সেই সাথে সারভিক্সের মাংসপেশিকে মোটা করে তোলে যাতে শুক্রাণু জরায়ুতে প্রবেশ করে কোনো ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করতে না পারে। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, আল্লাহ প্রদত্ত সাধারণ নিয়মকে এই পদ্ধতির মাধ্যমে অস্বাভাবিক করে তোলা হচ্ছে যা নিঃসন্দেহে অনুচিত।
বর্তমান বিশ্বে আরও একটি জনপ্রিয় জন্মনিয়ন্ত্রণের দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতি হচ্ছে আই.ইউ.ডি (IUD- Intrauterine Device)। এই প্রক্রিয়ায় জরায়ুতে ইংরেজি অক্ষর T আকৃতির একটি যন্ত্র প্রবেশ করানো হয়। এই পদ্ধতিতে ৩-১০ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময়জুড়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ রকম আরও বেশ কিছু জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি রয়েছে যেগুলো সত্যিকার অর্থেই বর্জনীয়।
এসব পদ্ধতির বেশ কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো : • অনিয়মিত মাসিক।
* মাসিকের সময় তুলনামূলক অধিক রক্তপ্রবাহ এবং মাসিকের স্থায়িত্বকাল বৃদ্ধি。
* বমি বমি ভাব হওয়া, মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরানো এবং স্তন প্রদাহ。
* হঠাৎ মেজাজ পরিবর্তন。
* IUD পদ্ধতি অবলম্বনে মাত্রাতিরিক্ত ব্রন হওয়ার আশঙ্কা থাকে。
* IUD পদ্ধতি অবলম্বনে তলপেট ও কোমড়ে ব্যথা হয়ে থাকে。
* অনেক সময় IUD জরায়ু হয়ে ভেতরে চলে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে অপারেশন করে বের করতে হয়。
আধুনিক আরেকটি পদ্ধতি হচ্ছে, ইমপ্লান্টেশন, যা বাহুতে ইঞ্জেকশনের মতো করে দেয়া হয়। এটি কয়েক বছরের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম।
ইমপ্ল্যান্টেশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো:
* কার্ডিওভাস্কুলার ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন রোগ দেখা দিতে পারে。
* পেটে মেদ জমতে পারে。
* হরমোনাল পরিবর্তনের কারণে মাসিক চক্র পরিবর্তন হয়ে অনিয়মিত মাসিক ও খুব বেশি রক্তপাত হতে পারে。
* ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় (যেহেতু এইসব হরমোন বারবার exposure হয়)।
* মাইগ্রেন তথা প্রচুর মাথাব্যথার সমস্যা দেখা দিতে পারে。
📄 জন্মনিরন্ত্রণের কিছু স্বাস্থ্যকর পদ্ধতি
জন্মনিয়ন্ত্রণের কার্যকরী ও স্বাস্থ্যকর একটি পদ্ধতি হচ্ছে কনডম ব্যবহার। এর কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই, তবে যাদের লেটেক্স এলার্জি রয়েছে তাদের জন্য এটা চুলকানি বা জ্বলনের কারণ হতে পারে। এ ছাড়াও coitus interruptus বা আযল করাও একটি কার্যকরী উপায়। যৌনমিলন শেষে যোনির বাইরে বীর্যপাত করাকে আযল বলা হয়। একে উইথ ড্র মেথডও বলা হয়। এর বৈধতা সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস রয়েছে যা আমরা পূর্বেও জেনেছি। কিন্তু এই পদ্ধতিতে উত্তেজনাবশত সঠিক সময়ে যোনির বাইরে বীর্যপাত করা বহু পুরুষের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সে ক্ষেত্রে আরও একটি পদ্ধতি হতে পারে ক্যালেন্ডার পদ্ধতি (Calender Method)। তবে এটি কিছুটা জটিল। এই পদ্ধতিতে স্ত্রীর মাসিক চক্রের দিকে লক্ষ রাখতে হয়। এই পদ্ধতি ১০০% কার্যকরী এমনটা বলা সম্ভব না। বিশেষ করে যাদের অনিয়মিত মাসিক তাদের জন্য এই পদ্ধতি অকার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
সম্ভাবনাই অধিক। যাদের মাসিক চক্র নিয়মিত হয় (২৮±২ পরপর) তাদের ক্ষেত্রে মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরের ৩ দিন গর্ভধারণের সম্ভাবনা ৪০-৬০%, এরপরের ৬ দিন গর্ভধারণের সম্ভাবনা ৮০% এবং এর পরের ৩ দিন গর্ভধারণের সম্ভাবনা আবার ৪০-৬০% এ ফিরে আসে। এরপর থেকে মাসিক শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত ৭-১৩ দিন যোনিপথের ভেতরে বীর্যপাত করলেও গর্ভধারণের সম্ভাবনা থাকে ৫% এরও কম। গর্ভধারণ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ উভয় ক্ষেত্রেই মাসিক চক্রের এই হিসাব জেনে রাখা জরুরি।
📄 দ্রুতহতা
অনিচ্ছাসত্ত্বে গর্ভে সন্তান এসে পড়লেও এ থেকে রেহাই (!) পাওয়ার পদ্ধতি রয়েছে যাকে বলা হয় Abortion। সোজা কথায় গর্ভের অপরিপক্ক কিংবা পরিপক্ক সন্তানকে নিজ সম্মতিক্রমে হত্যা করাকেই অ্যাবরশন বলা হয়। অবশ্য অনেক সময় প্রয়োজনের খাতিরে বাধ্য হয়ে অ্যাবরশন করাতে হয় বিভিন্ন জটিলতার কারণে, সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু যখন কেবল অনিচ্ছা, রিযিক নিয়ে ভয়ের মতো ঠুনকো কারণে ভ্রূণহত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। এ ছাড়া গর্ভধারণের সময়কালের ওপর নির্ভর করে এর ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
গর্ভধারণের পর তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেলে গর্ভপাত ঘটানো কিছুটা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। অধিকাংশ সময় ভেতর থেকে 'কিউরেট' করে ভ্রূণ বের করে আনতে হয়। 'কিউরেটেজ' (curettage) মানে হলো নারিকেলের মতো করে কোরানো। কত মানুষের সন্তান হয় না, আর কিছু মানুষকে আল্লাহ সন্তান দান করেন আর তারা নারিকেলের মতো করে কুরিয়ে সন্তান ফেলে দেয়। অনেক সময় বাচ্চা বেশি বড় হয়ে গেলে বিভিন্ন অঙ্গ কেটে কেটে ভেতর থেকে নিয়ে আসতে হয়। খুলিতে ছিদ্র করে মস্তিষ্ক তরল করে গলিয়ে ফেলা হয়, বাকি হাত-পা আলাদা টুকরো করে বের করে আনতে হয়। এই বীভৎস দৃশ্য কোনো মা-বাবা কীভাবে সহ্য করতে পারে! অথচ এ রকম হাজার হাজার ভ্রূণহত্যা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
ভ্রূণহত্যার অগণিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও শারীরিক কুপ্রভাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
* জ্বর, ডাইরিয়া;
* ইনফেকশন;
* ৩ সপ্তাহেরও অধিক সময় ধরে, অধিক পরিমাণে রক্তপাত;
* ঠোঁট বা চেহারা ফুলে যাওয়া;
* পেট, পিঠ, কোমরব্যথা;
* বমি বমি ভাব, ক্লান্তি;
* জরায়ু, মূত্রাশয়, অন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিসাধন;
* অসম্পূর্ণ অ্যাবরশন যা সার্জারি পর্যন্ত গড়াতে পারে;
* পরবর্তী সন্তান গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা;
* পরিপাকতন্ত্রে অস্বস্তি;
* অপ্টু হাতে ডি. এন্ড সি. (ভ্রূণ অপসারণ) এর সময় কিউরেট করতে গিয়ে জরায়ু ফুটো হয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। সে ক্ষেত্রে পেট কেটে অর্থাৎ, অ্যাবডমিনাল অপারেশন করে জরায়ু সারাতে হয়;
* ডি. এন্ড সি. এর সময় ও এর পূর্বে কিছু ওষুধ দেয়া হয় যা পরবর্তীকালে সমস্যার কারণ হতে পারে;
* অনেক সময় ভ্রূণের কিছু অংশ ভেতরে থেকে যায়, যার কারণে ইনফেকশন হতে পারে। এ থেকে মারাত্মক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে যা পুরো শরীরে ছড়িয়ে যায়। এ কারণে হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়, এমনকি রোগী মারাও যায় অনেক সময়。