📄 তালাকের প্রকারভেদ
তালাকের চারটি প্রকারভেদ রয়েছে। সেগুলো হলো:
১. তালাকে রজঈ : 'রজঈ' (رجعي) এর শাব্দিক অর্থ হলো: ফিরিয়ে নেওয়া, প্রত্যাবর্তন করা। কিছু কিছু সময় তালাকের শব্দ বলার পরও স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া যায়। যে তালাকের পরও স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া যায়, তাকে তালাকে রজঈ বলে। অর্থাৎ, যে তালাক প্রদান করলে স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার থেকে যায় এবং স্বামী ইচ্ছা করলে স্ত্রীকে পুনরায় নিজের বন্ধনে ফিরিয়ে আনতে পারে। সে ক্ষেত্রে উক্ত স্ত্রীর সাথে ইদ্দত চলাকালীন অবস্থায় নিরিবিলি অবস্থান করা কিংবা নিরিবিলি অবস্থানের দিকে আকর্ষণকারী কার্যকলাপে লিপ্ত হওয়া অথবা যৌন উত্তেজনার সাথে স্পর্শ করা বা চুমু দেয়া কিংবা 'আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম' বলার মাধ্যমেও রজা'য়াত বা ফিরিয়ে আনা সাব্যস্ত হয়। এতে স্ত্রী সম্মত থাকুক কিংবা না থাকুক।[১৩]
উল্লেখ্য যে, 'স্বারীহ' বা সুস্পষ্ট তালাক (তালাক শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে) এভাবে বলা যে, "তুমি তালাক" কিংবা "আমি তোমাকে তালাক দিলাম।" এসকল শব্দ দ্বারা তালাক দিলে তালাকে রজঈ পতিত হয়।
২. তালাকে বায়িন : এমন তালাক যা প্রদান করলে স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার থাকে না, বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। তবে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্মতিক্রমে (হিলা ব্যতীত) নতুনভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।
উল্লেখ্য যে, তালাকের সাথে যদি কোনোপ্রকার অতিরিক্ততা বা কঠোরতার গুণ যুক্ত করা হয়, তাহলে তালাকে বায়িন হয়। যেমন: কেউ বলল, 'তোমার প্রতি তালাকে বায়িন' কিংবা 'তোমাকে অকাট্য তালাক'। তবে তিন তালাকের নিয়ত করলে তিন তালাকই পতিত হবে। অন্যথায় এক তালাকে বায়িন হবে। তালাকে বায়িন পতিত হলে পুনরায় মোহর ধার্য করে বিবাহ সম্পাদন না করলে ইদ্দত শেষে উক্ত স্ত্রী অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।[১৪]
৩. তালাকে মুগাল্লাযা: এমন তালাক যার কারণে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে ওই স্ত্রী অপর কোনো ব্যক্তির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে, অতঃপর ওই স্বামী তার সাথে নিরিবিলি অবস্থান করার পর বা সহবাস করার পর তালাক দিলে অথবা স্বামী মৃত্যুবরণ করলে পুনরায় উক্ত স্ত্রী প্রথম স্বামীর সাথে উভয়ের সম্মতিক্রমে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।
৪. তালাকে তাফউইয/তাফবীয : التفويض এর শাব্দিক অর্থ হলো- অর্পণ করা, সমর্পণ করা, দায়িত্ব প্রদান করা ইত্যাদি। আর তালাকে তাফউইযের অর্থ হলো, স্বামী কর্তৃক তালাকের দায়িত্ব ও ক্ষমতা স্ত্রীকে অর্পণ করা。
◇ খুলা তালাক : 'খুলা' শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে অপসারণ করা বা সরিয়ে দেওয়া। পারিভাষিক অর্থে, স্বামীর পক্ষ থেকে কোনো কিছুর বিনিময়ে বা শর্তে অথবা বিনা শর্তে ও বিনিময় ব্যতীত স্ত্রীর নিকট বিবাহ-বিচ্ছেদের দায়িত্ব অর্পণ করার নাম হচ্ছে খুলা。
উল্লেখ যে, যদি স্ত্রীর সীমালঙ্ঘন বা অন্যায়ের কারণে (খুলা) তালাক দিতে হয়, সে ক্ষেত্রে স্বামী তার থেকে তালাকের বিনিময় গ্রহণ করতে পারবে। উভয়ের সম্মতিক্রমে যে পরিমাণ বিনিময়ের ওপর একমত হবে, তা-ই নেওয়া বৈধ। তবে এ ক্ষেত্রেও বিনিময়টি বিয়েতে ধার্যকৃত মহরের বেশি না হওয়া উত্তম। [১৫]
সাবিত ইবনু কায়সের স্ত্রী নবী ﷺ-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, চরিত্রগত বা দ্বীনি বিষয়ে সাবিত ইবনু কায়সের ওপর আমি দোষারোপ করছি না। তবে আমি ইসলামের ভেতরে থেকে কুফরী করা অর্থাৎ স্বামীর সঙ্গে অমিল পছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, তুমি কি তার বাগানটি ফিরিয়ে দেবে? সে বলল, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ ﷺ (সাবিত ইবনু কায়সকে) বললেন, তুমি বাগানটি গ্রহণ করো এবং তোমার স্ত্রীকে এক তালাক দিয়ে দাও। [১৬]
তবে বিশেষ কোনো শরঈ কারণ ছাড়াই স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর খুলা তালাক চাওয়া উচিত নয়। হাদীসে আছে, নবী ﷺ বলেন,
الْمُخْتَلِعَاتُ هُنَّ الْمُنَافِقَاتُ
খোলা তালাক দাবিকারিণী নারীরা মুনাফিক। [১৭]
টিকাঃ
[১৩] সূরা বাকারা- ২২৮, ২৩১; আল ইখতিয়ার লি তা'লীলিল মুখতার- ৩/২০০
[১৪] ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া- ৩/৩১৫; ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়াহ- ১/৩৭৫, ১/৪৭২; বাহরুর রায়েক- ৩/৩০; রদ্দুল মুহতার- ২/৩৫৫; নাহরুল ফায়েক- ২/৩৫৫
[১৫] বাদায়েউস সানায়ে- ৪/৩৭২; ফাতহুল কাদীর- ৩/২০৩; ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়াহ- ১/৫১৫; আলবাহরুর রায়েক -৪/৮৩; আহকামুল কুরআন- ২/৮৯; রদ্দুল মুহতার- ৩/৪৪৫; আলফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু- ৯/৩৩৮; আল মাওসু'আতুল ফিকহিয়্যাতুল কুয়েতিয়া- ২৯/৬; দুররুল মুখতার- ২/৮৬০; বিদায়াতুল মুজতাহিদ- ২/৭২; মিনাহুল জালীল- ২/১৮২; মুগনীল মুহতায- ২/২৬২; হাশিয়াতুত দাসুকী- ২/৩৪৭
[১৬] সহীহ বুখারী- ৫২৭৩
[১৭] সুনানে তিরমিযী- ১১৮৬; এ হাদীসটিকে উল্লেখিত সনদসূত্রে ইমাম তিরমিযী গরীব বলেছেন। এর সনদ খুব একটা মজবুত নয়। তিনি আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ হতে আরও বর্ণিত আছে, "যেসকল নারী স্বামীর নিকট হতে কোনো বিবেচনাযোগ্য কারণ ছাড়াই খোলা তালাক গ্রহণ করে, সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না।"
📄 ইদ্দত
ইদ্দত মানে গণনা। অর্থাৎ, তালাকের নির্ধারিত দিন গণনা করা। স্ত্রী তালাকপ্রাপ্তা হলে বা তার স্বামীর মৃত্যু হলে নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য উক্ত নারীকে এক বাড়িতে অবস্থান করতে হয়, এ সময়ে সে অন্যত্র যেতে পারে না এবং অন্য কোথাও বিবাহ বসতে পারে না; এমনকি বিবাহের প্রস্তাবও গ্রহণ করতে পারে না। একেই ‘ইদ্দত’ বলে। ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়ায় (১/৫৫২) বর্ণিত রয়েছে,
هِيَ انْتِظَارُ مُدَّةٍ مَعْلُومَةٍ يَلْزَمُ الْمَرْأَةَ بَعْدَ زَوَالِ النِّكَاحِ حَقِيقَةٌ أَوْ شُبْهَةَ الْمُتَأَكِدِ بِالدُّخُولِ أَوُ الْمَوْتِ كَذَا فِي شَرْحِ النُّقَايَةِ لِلْبُرْ جُنْدِي رَجُلٌ تَزَوَّجَ امْرَأَةً نِكَاحًا جَابِرًا فَطَلَّقَهَا بَعْدَ الدُّخُولِ أَوْ بَعْدَ الْخَلْوَةِ الصَّحِيحَةِ كَانَ عَلَيْهَا الْعِدَّةُ
ইদ্দত হলো, স্বাভাবিক বিবাহ-বিচ্ছেদের পর বা খালওয়াতে সহীহার (তথা স্বামী-স্ত্রী সহবাসের নিকটবর্তী আচরণ বা নির্জনে বসবাসের) পর অথবা স্বামীর মৃত্যুর পর মহিলা কর্তৃক শরী'আত নির্ধারিত নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা (অন্য কোথাও বিয়ে না বসা)। স্ত্রীর জন্য আবশ্যক হলো ইদ্দতের সময় তিনি অন্য পুরুষের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে না। এই কারণে যে, স্বামী যদি ইদ্দতের সময় অতিবাহিত হওয়ার পূর্বে পুনরায় নিজের কাছে রাখার বা ফিরিয়ে আনার ইচ্ছাপোষণ করে, তাহলে সে রাখতে ও ফিরিয়ে আনতে পারবে। তবে ইদ্দতের সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে এই অধিকারটি বিলুপ্ত হবে।
উল্লেখ্য যে, এই বিষয়টি শুধু এক তালাক ও দুই তালাকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তিন তালাক দিয়ে ফেললে এই অধিকার আর থাকে না। এ ছাড়া, ফক্কিহদের মতে রাজঈ ও বায়িন তালাকপ্রাপ্তা মহিলা ইদ্দত পালন করা অবস্থায় স্বামীর পক্ষ থেকে ভরণপোষণ ও খোরপোশ পাবে। এর বিপরীতে সহীহ মুসলিম, সুনানে নাসাঈ ও মুসনাদে আহমাদে ফাতিমা বিনতে কায়স থেকে যে বর্ণনা পাওয়া যায় অধিকাংশ সাহাবী (তাদের মাঝে অন্যতম হচ্ছেন উমার, ইবনে মাসউদ, যাইদ ইবনে সাবেত, আয়েশা) তাবেঈ ও ফক্কিহগণ তা গ্রহণ করেননি। বরং উক্ত হাদীসের বিপরীতে তারা ভিন্ন হাদীস ও সূরা তালাকের প্রথম আয়াত দলিল হিসেবে পেশ করেছেন। তবে যে মহিলার স্বামী মৃত্যুবরণ করেছে বিধায় ইদ্দত পালন করছে এমন ইদ্দত অবস্থায় মহিলার ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর পরিবারের জন্য জরুরি নয়। [১৮]
আবু ইসহাক বলেন, كُنْتُ مَعَ الأَسْوَدِ بْنِ يَزِيدَ جَالِسًا فِي الْمَسْجِدِ الأَعْظَمِ وَمَعَنَا الشَّعْبِيُّ فَحَدَّثَ الشَّعْبِيُّ بِحَدِيثِ فَاطِمَةَ بِنْتِ قَيْسٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لَمْ يَجْعَلْ لَهَا سُكْنَى وَلَا نَفَقَةً ثُمَّ أَخَذَ الأَسْوَدُ كَفَّا مِنْ حَصًى فَحَصَبَهُ بِهِ، فَقَالَ وَيْلَكَ تُحَدِّثُ بِمِثْلِ هَذَا قَالَ عُمَرُ لَا نَتْرُكُ كِتَابَ اللَّهِ وَ سُنَّةً نَبِيِّنَا صلى الله عليه وسلم لِقَوْلِ امْرَأَةٍ لَا نَدْرِي لَعَلَّهَا حَفِظَتْ أَوْ نَسِيَتْ لَهَا السُّكْنَى وَالنَّفَقَةُ قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ (لا تُخْرِجُوهُنَّ مِنْ بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ)
আমি আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদের সঙ্গে সেখানকার বড় মসজিদে বসা ছিলাম। শা'বীও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি ফাতিমাহ বিনতু কায়স হতে বর্ণিত হাদীস প্রসঙ্গে বলেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তার জন্য বাসস্থান ও খোরপোশের সিদ্ধান্ত দেননি। তখন আসওয়াদ তার হাতে এক মুঠো কংকর নিয়ে শা'বীর দিকে নিক্ষেপ করলেন। এরপর বললেন, সর্বনাশ! তুমি এমন ধরনের হাদীস বর্ণনা করছ? (অথচ) উমার বলেছেন, আমরা আল্লাহর কিতাব এবং আমাদের নবী ﷺ-এর সুন্নাত এমন একজন মহিলার উক্তির কারণে ছেড়ে দিতে পারি না। আমরা জানি না, সে স্মরণ রাখতে পেরেছে নাকি অথবা ভুলে গিয়েছে যে তার জন্য বাসস্থান ও খোরপোশ রয়েছে। আল্লাহ বলেছেন, "তোমরা তাদেরকে তাদের বাসগৃহ থেকে বহিষ্কার করে দিও না এবং তারাও যেন ঘর থেকে বের না হয়। তবে তারা স্পষ্ট কোনো অশ্লীলতায় লিপ্ত হলে ভিন্ন কথা।"[১৯]
হাদীসে উল্লেখিত পূর্ণ আয়াতটি হলো: يَأَيُّهَا النَّبِيُّ إِذَا طَلَّقْتُمُ النِّسَاءَ فَطَلِقُوهُنَّ لِعِدَّتِهِنَّ وَأَحْصُوا الْعِدَّةَ وَاتَّقُوا اللَّهَ رَبَّكُمْ لَا تُخْرِجُوهُنَّ مِن بُيُوتِهِنَّ وَلَا يَخْرُجْنَ إِلَّا أَن يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ تُبَيِّنَةٍ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ وَمَن يَتَعَدَّ حُدُودَ اللَّهِ فَقَدْ ظَلَمَ نَفْسَهُ لَا تَدْرِي لَعَلَّ اللَّهَ يُحْدِثُ بَعْدَ ذَلِكَ أَمْرًا )
হে নবী (বলো), তোমরা যখন স্ত্রীদেরকে তালাক দেবে, তখন তাদের ইদ্দত অনুসারে তাদের তালাক দাও এবং ইদ্দত হিসাব করে রাখবে, তোমাদের রব আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা তাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বের করে দিয়ো না এবং তারাও বের হবে না। যদি না তারা কোনো স্পষ্ট অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। যে আল্লাহর (নির্ধারিত) সীমারেখাসমূহ অতিক্রম করে সে অবশ্যই তার নিজের ওপর জুলুম করে। তুমি জানো না, হয়তো সেটার পর আল্লাহ (ফিরে আসার) কোনো সমাধান দেখিয়ে দেবেন।[২০]
আয়াতটিতে ইদ্দত চলাকালীন অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে কী রকম ব্যবহার করতে হবে তা জানিয়ে দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আদেশ করা হয়েছে যে, স্ত্রীদেরকে তাদের গৃহ থেকে যাতে বহিষ্কার করা না হয়। এখানে তাদের গৃহ বলে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যে পর্যন্ত তাদের বসবাসের হক পুরুষের দায়িত্বে থাকে, সেই পর্যন্ত গৃহে তাদের অধিকার আছে। তবে মহিলা কোনো ফাহেশা ও অশ্লীল (যিনা ও ব্যভিচারের) কাজে লিপ্ত হয়ে বের হয়ে গেলে সে ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা।
টিকাঃ
[১৮] সহীহ মুসলিম- ১৪৮০; আল ইখতিয়ার লি তা'লীলিল মুখতার- ৩/২৬০; ফাতহুল কাদীর- ৩/৩৩৯; হাশিয়ায়ে ইবনে আবেদীন- ৩/৬৪০; মিরকাতুল মাফাতীহ- ৬/৪৪৭-৪৪৯; শারহুস সগীর- ১/৫২২; হাশিয়াতুদ দাসকী- ২/৫১৫; তুহফাতুল মুহতাজ-৮/২৫৯-২৬০: নিহায়াতুল মুহতাজ- ৭/১৫২-১৫৪; আল ইনসাফ (আল মুকনি ও শারহুল কবীরসহ)- ২৪/৩১২-৩১২
[১৯] সহীহ মুসলিম- ১৪৮০
[২০] সূরা তালাক- ১
📄 ইদ্দতের সময়কাল
◇ প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা ঋতুস্রাব (মাসিক) থেকে পবিত্র হওয়ার পর তালাকপ্রাপ্তা হলে তার জন্য ইদ্দতের সময়কাল হলো, সে যে পবিত্রতায় আছে তা থেকে পূর্ণ তিন মাসিক (ঋতুস্রাব) শেষ হওয়া পর্যন্ত। অতএব তার তিন ঋতু শেষ হলে সে যথেচ্ছা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। এই ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বে অন্যত্র বিবাহ করা হারাম। কুরআনে এসেছে,
وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ )
অর্থাৎ তালাকপ্রাপ্তা মহিলাগণ নিজেরা তিন কুরু (অর্থাৎ তিন মাসিক ও ঋতুস্রাব) পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। [২১]
◇ নাবালেগা অথবা কোনো অসুস্থতার কারণে ঋতুস্রাব হয় না, এমন নারী তালাকপ্রাপ্তা হলে তার ইদ্দত হলো তিন মাস। এ সময়ের মধ্যে সে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে না。
◇ স্ত্রীর বয়স যদি এত বেশি হয় যে তার মাসিক (ঋতুস্রাব) বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তাহলে তারও ইদ্দত তিন মাস। এ সময়ের মধ্যে সে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে না。
◇ স্ত্রী যদি গর্ভবতী হয় আর এমতাবস্থায় যদি সে তালাকপ্রাপ্তা হয়, তাহলে তার ইদ্দত হলো গর্ভের বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত। [২২]
উল্লেখ্য যে, গর্ভবতী স্ত্রীকে তালাক দিলে স্বামীর জন্য অপরিহার্য হলো, বাচ্চা প্রসব হওয়া পর্যন্ত স্ত্রীর যাবতীয় খরচ বহন করা যাতে বাচ্চার কোনো ক্ষতি না হয়। আর বাচ্চা প্রসব করার সাথে সাথে স্ত্রী তালাক হয়ে যায় এবং তার ভরণপোষণের দায়িত্ব আর স্বামীর ওপর থাকে না বিধায় ওই বাচ্চাকে দুধ পান করানো স্ত্রীর জন্য আবশ্যক নয়。
অতএব সেই পুরুষ তাঁর প্রাক্তন স্ত্রীকে দুধ পান করাতে বললে সেই দুধ পান করানোর পূর্ণ সময়ের ভরণ-পোষণ ও তার থাকা-খাওয়া সহ সকল ব্যবস্থা উক্ত পুরুষের করে দিতে হবে। [২৩]
* স্বামী যদি তার স্ত্রী রেখে মারা যায়, তাহলে তার ইদ্দত হলো ৪ মাস ১০ দিন। এ সময়ের মধ্যে সে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে না। [২৪]
◇ কোনো স্ত্রীর স্বামী যদি নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। অর্থাৎ বহুদিন হলো স্বামীর কোনো খোঁজখবর নেই, বেঁচে আছে না মারা গিয়েছে তাও জানা যায় না; এমন নারী তার স্বামীর জন্য ৪ বছর অপেক্ষা করবে, এর মধ্যে যদি স্বামী মারা গেছে এমন কোনো সংবাদ না পাওয়া যায় তাহলে ৪ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর চাইলে সে অন্যত্র বিবাহ করতে পারবে。
উল্লেখ্য যে, স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর স্ত্রী কত দিন অপেক্ষা করবে এই ব্যাপারে ইমামদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। ইমাম আবু হানীফা -এর মতে ৯০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। [২৫] তবে এই মাসআলায় হানাফী মাযহাবের উলামায়ে মুতাআখখিরীন ইমাম মালেক -এর মাযহাবের ওপর ফতোয়া দিয়েছেন। স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর সংবাদটি মুসলিম কাযীর নিকট গিয়ে স্ত্রী পেশ করবে। এবং তার সাধ্যানুযায়ী নিখোঁজ স্বামীকে তালাশ করার পর যদি খোঁজ না পায়, তাহলে কাযী স্ত্রীকে চার বছর অপেক্ষা করার জন্য নির্দেশ দেবে। যদি এর মধ্যে ফিরে এসে যায়, তাহলে ভালো। আর যদি ফিরে না আসে, তাহলে কাযী তার স্বামীর মৃত্যুর হুকুম দেবে。
কেননা, উমার ফারুক বলেন, নিখোঁজ স্বামীর জন্য স্ত্রী চার বৎসর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। [২৬] এছাড়া উসমান, আলী এবং অনেক তাবেয়ী থেকেও অনুরূপ ফতওয়া রয়েছে। [২৭] অতঃপর স্ত্রী ইদ্দত পালন করে দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারবে。
স্ত্রী দ্বিতীয় বিবাহ করার পর যদি হঠাৎ প্রথম স্বামী ফিরে আসে, তাহলে উক্ত নারীর জন্য দ্বিতীয় স্বামীর নিকট থাকা জায়েয হবে না। কেননা প্রথম স্বামী ফিরে আসার কারণে দ্বিতীয় বিবাহ বাতিল হয়ে যায়। অতঃপর দ্বিতীয় বিবাহ বাতিল হবার কারণে ইদ্দত পালন করতে হবে। ইদ্দত পালন করার পর উক্ত মহিলা প্রথম স্বামীর স্ত্রী হবে। [২৮]
টিকাঃ
[২১] সূরা বাক্বারাহ- ২২৮
[২২] সূরা তালাক- ৪
[২৩] সূরা তালাক- ৬
[২৪] সূরা বাকারা- ২৩৪
[২৫] আল লুবাব ফি শারহিল কিতাব
[২৬] বাইহাক্বী, হাদীস- ১৫৩৪৫; আল মুহাল্লা- ৯/৩১৬
[২৭] মুহাল্লা- ১/৩২৪
[২৮] মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক, হাদীস- ১২৩২৫; বাইহাক্বী, হাদীস- ১৫৩৪৭, ১৫৩৪৮; আহসানুল ফতোয়া- ৫/৪৬৭; ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া- ১৬/৩৪২; রাদ্দুল মুহতার- ৪/২৯৫-৯৬; হীলাতুন নাজিযাহ, আশরাফ আলী থানবী; শারহুল মিনহাজ আলা মুখতাসারিল খালিল- ২/৩৭৫; শারহুস সাগীর- ২/৬৯৪; হাশিয়ায়ে দাসুকী- ২/৪৭৯; মানারুস সাবীল- ২/৮৮
📄 ইসলামে হিলা/হিল্লার হুকুম
হিলা (حيلة) আরবী একটি শব্দ। যার শাব্দিক অর্থ হলো- কৌশল অবলম্বন করা, কোনো উপায় গ্রহণ করা, জটিল কোনো স্থানে ছল-চাতুরীর আশ্রয় গ্রহণ করা।
পরিভাষায় হিলা বলা হয়, যখন শরী'আতের কোনো বিষয়ে মানবজীবনে জটিলতা দেখা দেয় তখন শরী'আতসম্মত এমন কোনো উপায় অবলম্বন করা, যার দ্বারা শরী'আতের বিধান ঠিক থাকার সাথে সাথে মানুষ ওই জটিলতা থেকে বের হয়ে আসতে পারে। আরবী ভাষায় একে 'হিলা' বা 'হিল্লা' বলে।
তালাকের ক্ষেত্রে হিলা/হিল্লা বলা হয়, যখন কোনো স্বামী ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় অথবা রাগান্বিত হয়ে তার স্ত্রীকে তালাক দেয়, অতঃপর পরবর্তী স্বাভাবিক অবস্থায় সে তার তালাক দেয়া স্ত্রীকে নিজ অধীনে রাখতে চায়, অথচ ইসলামী আইনের কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠে না বিধায় তার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে তার নিকট ফিরিয়ে নেওয়ার যে উপায় রয়েছে, তাকে হিলা/হিল্লা বলা হয়। স্বামী স্ত্রীকে পূর্ণ তালাকের পর কেবল তখনই ফিরিয়ে নিতে পারবে যখন নিম্নের পাঁচটি কাজ সম্পাদিত হবে : (১) তিন মাস ইদ্দত অতিবাহিত করতে হবে; (২) অন্য কোনো পুরুষের সাথে বিবাহ হতে হবে; (৩) দ্বিতীয় স্বামীর সাথে শুধু নামেমাত্র বিবাহ হলে চলবে না; বরং তার সাথে যথারীতি সংসার ও সহবাস করতে হবে; (৪) দ্বিতীয় স্বামী স্বেচ্ছায় তাকে তালাক প্রদান করবে এবং এ তালাকের জন্য পুনরায় তিন মাস ইদ্দত পালন করতে হবে; (৫) পুনরায় প্রথম স্বামীর সাথে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। এমনটি হলে তা শরী'আত সমর্থন করে। যেমন আল্লাহ বলেন, فَإِنْ طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِنْ بَعْدُ حَتَّى تَنْكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ )
যদি সে (প্রথম স্বামী) তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে তার জন্য এ স্ত্রী আর জায়েয নয় যতক্ষণ না সে নারী অন্য কোনো স্বামীর সাথে বিবাহ করে (এরপর বিচ্ছেদ হয়)। [২৯]
কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শরী'আতের এই বিধানে অনেকেই ফাঁকফোকর খোঁজে। দেখা যায়, তিন তালাকের পরই স্বামী-স্ত্রী উভয়েই নানাভাবে হিলা নামের বাহানার আশ্রয় নেওয়া শুরু করে। সেটা যেমন অশালীন, তেমনি শরী'আতের দৃষ্টিতে অবৈধ ও লা'নতযোগ্য কাজ।
হিলা বলতে মানুষের মাঝে একটা কুসংস্কার রয়েছে। আর তা হলো, হিলা/হিল্লা বলা হয় কোনো পুরুষ তিন তালাকপ্রাপ্তা নারীকে এ শর্তে চুক্তি করা যে, বিয়ের পর সহবাস শেষে সেই নারীকে তালাক দিয়ে দেবে যাতে সে পূর্বের স্বামীর জন্য হালাল হয়ে যায় এবং সে তাকে পুনরায় বিবাহ করতে পারে। আবার কখনো কখনো কোনো পাগলের সাথেও বিয়ে করিয়ে বিনা সহবাসে তালাক দেওয়ার জন্যেও বাধ্য করা হয়ে থাকে। এ বিবাহ বাতিল ও অশুদ্ধ। এভাবে নারী তিন তালাক প্রদানকারী স্বামীর জন্য হালাল হয় না। বরং এমন গর্হিত কাজ করার কারণে হিলার সাথে যুক্ত সকলের ওপর আল্লাহর লা'নত পতিত হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
لَعَنَ اللَّهُ الْمُحَلَّ وَالْمُحَلَّلَ لَهُ وَالْمُحَلَّلَةَ
(হিলা-বাহানার মাধ্যমে অন্যজনের জন্য স্ত্রী) হালাল করার উদ্দেশ্যে বিবাহকারী, যার জন্য হালাল করা হয়েছে এবং যে হালাল হচ্ছে প্রত্যেকের ওপরই আল্লাহর লা'নত। [৩০]
টিকাঃ
[২৯] সূরা বাক্বারাহ- ২৩০
[৩০] সুনানে আবু দাউদ- ২০৭৬; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা- ১৭৩৬৪