📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 যথাযথ প্রত্যাশা

📄 যথাযথ প্রত্যাশা


আমাদের নিকট ভালো স্ত্রীর সংজ্ঞা হচ্ছে, যে স্ত্রী তার স্বামীর আনুগত্য করে, স্বামী যদি রাগান্বিত হয় তাহলে সে রাগ না ভাঙা পর্যন্ত পাশেই বসে থাকে, যাকে প্রয়োজনের মুহূর্তে ডাকলে উত্তম সাড়া পাওয়া যায় এবং যাকে দেখলেই অন্তরে তুষ্টি মেলে। ইসলামে একজন আদর্শ স্ত্রীর অনেক গুণাগুণ আমরা প্রতিনিয়ত শুনেছি, পড়েছি। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে, একজন নারীর মাঝে সব গুণ থাকবে না। এটা বুঝতে হলে নিজের দিকেও দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। ইসলামের আলোকে একজন আদর্শ পুরুষের সকল গুণ কি নিজের মধ্যে বিদ্যমান আছে? যদি উত্তর 'না' হয় তাহলে একজন নারীর মাঝেও সকল গুণ খোঁজা অলীক আশা। হতে পারে স্ত্রীর সৌন্দর্যে কমতি আছে বা রান্না ভালো না। কিন্তু অন্যদিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যাবে সে আখলাক ও আনুগত্যের দিক থেকে অসাধারণ। পুরুষদের কাছে সৌন্দর্য দুইদিন পর এমনিতেই ফিকে হয়ে যায়। দাম্পত্য জীবনে বাকি থাকে ওই আখলাক আর স্ত্রীর আনুগত্যই। তাই ভালো গুণগুলো চিন্তা করে মন্দ দিকগুলো উপেক্ষা করতে হবে। আল্লাহ বলেন,

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَ يَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا

তাদের (স্ত্রী) সাথে দয়া ও সততার সঙ্গে জীবনযাপন করো। যদি তাদেরকে তোমরা পছন্দ না করো, তবে হতে পারে যে তোমরা যাকে অপছন্দ করছ বস্তুত তারই মধ্যে আল্লাহ বহু কল্যাণ দিয়ে রেখেছেন। [৭]

অর্থাৎ এমনও হতে পারে যে, ধৈর্যধারণ করে স্ত্রীদের সাথে জীবনযাপন করলে দুনিয়াতে এবং আখিরাতে আল্লাহ উত্তম কিছু এর বিনিময়ে রেখেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, "এর অর্থ হলো স্বামী স্ত্রীকে ভালোবাসবে, তারপর তাদের মধ্যে আল্লাহ সন্তান দান করবেন যে সন্তান তাদের মধ্যে প্রভূত কল্যাণ নিয়ে আসবে বা স্বামীর মনে স্ত্রীর জন্য ভালোবাসা তৈরি করে দেবে।”[৮]

এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ বলেন,

لا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةٌ إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ

মু'মিন পুরুষ কোনো মু'মিন নারীকে ঘৃণা করবে না। যদি তার চরিত্রের কোনো একটি দিক তাকে অসন্তুষ্ট করে, তবে অন্য দিক তাকে সন্তুষ্ট করবে। [৯]

স্ত্রীর মাঝে সবকিছু থাকতে হবে এরূপ চিন্তাধারা হতে পূর্ব থেকেই বিরত থাকতে হবে, নাহলে পরবর্তী সময় তা হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

স্ত্রীর মাঝে কোনো গুণের কমতি দেখলে হতাশ হওয়া বা রাগ করা যাবে না। মানুষের কথায় প্রভাবিত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেক মানুষ আপনার স্ত্রী সম্পর্কে অনেক কিছুই বলবে। বুঝে নিতে হবে এটা অকর্মণ্য ও হিংসুক মানুষদের স্বভাব, তাই এসবে কান দেয়া মানে নিজের পোশাক নোংরা করা। এ ক্ষেত্রে দাম্পত্য জীবন না ভাঙার দুটি মন্ত্র। প্রথমত, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্য। অর্থাৎ স্বামীকে পরিবার ও পরিচিতদের মাঝে সবার থেকে ওপরে রাখা, সবার মতের ওপরে স্বামীর সঠিক মতকে প্রাধান্য দেয়া। দ্বিতীয়ত, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর যত্নবান থাকা। এই দুইয়ের যুগলবন্দী হলে দাম্পত্য জীবনে কেউ আঁচড়ও ফেলতে পারবে না। এমনকি মানুষের দশ কথা ও মন্তব্য, বদনজর, জাদু, জ্বীন সবই এই দুইয়ের কাছে হার মানে।

আগে আমাদেরকে ভাবতে হবে আমরা কী কী চাই স্ত্রীর কাছ থেকে। নিজের চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি বিয়ের আগে আলোচনা করে নিতে হবে। অর্থাৎ, মূল চাহিদাগুলো নিয়ে অধিক গুরুত্বের সাথে কথা বলতে হবে। যেমন: মা-বাবার খেদমত, এক সংসারে থাকা, রান্না, তার চাকরি করা না করা ইত্যাদি। নিজের কাছে যা কিছু অধিক প্রয়োজনীয়, সেসব নিয়ে আলোচনা করে নেয়া উচিত।

সেও তার বিষয়গুলো উত্থাপন করতে পারে। সে বলতে পারে যে, সে পড়াশোনা করতে চায়, আলাদা সংসার করতে চায় ইত্যাদি। এইসব চাওয়ার কারণে তাকে ফেমিনিস্ট বা সেক্যুলার মনে করা বোকামি। বিয়ের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী হতে হবে, আদর্শবাদী (Idealistic) হওয়া যাবে না। আপনি যদি এমন চশমা পরে থাকেন যেই চশমা দিয়ে আপনি কেবল আদর্শ ফিল্টার করতে পারেন কিন্তু বাস্তব চিত্র দেখতে পারেন না, তাহলে সেই চশমা আপনার পরিবর্তন করা উচিত।

বিয়ে একটি আদর্শ প্রক্রিয়া যা মানুষের সার্বিক প্রয়োজনটাকে পূরণ করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সব উপাদান আদর্শের নীতিতে উত্তীর্ণ হয় না। তাই রাসূল ﷺ যা নির্দেশনা দিয়েছেন তা মানলেই আমরা প্রকৃতপক্ষে সফল হতে পারব। যদিও সকল নির্দেশনা মেনে চলা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না, তাও আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। অনুকূল-প্রতিকূল মেনে নিয়ে ও উপেক্ষা করে দাম্পত্য জীবন টিকে থাকে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমেই।

রাসূল -এর স্ত্রীদের মাঝে আমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। আয়েশা ছিলেন চঞ্চল প্রকৃতির। ঘরের কাজ তিনি কম পারতেন। বিয়ের আগে নবীজি তাঁর খাদেমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তাঁর সমস্যার ব্যাপারে। সে বলেছিল, "আমি তাঁর ব্যাপারে এতটুকুই খারাপ জানি যে, তিনি ময়দার কাই বানিয়ে ঘুমিয়ে যেতেন আর ছাগলে এসে তা খেয়ে নিত।” আয়েশা -এর সাংসারিক দক্ষতা কম ছিল, তবু নবীজি তাঁকে ভালোবাসতেন।

হাফসা রূপবতী ও বুদ্ধিমতী ছিলেন। কিন্তু তিনি রাগের সময় তাঁর মুখ বন্ধ রাখতে পারত না। একবার রাসূল -এর কোনো এক গোপন কথা আরেক স্ত্রীকে বলে দেওয়াতে রাসূল তাঁর থেকে অনেক দিন আলাদা থাকেন। পরে জিব্রাইল এসে বলেন, "আপনি হাফসা -কে ফিরিয়ে নিন। কারণ তিনি সালাত আদায় করে, রোজা রাখে, তাহাজ্জুদ আদায় করে, আর জান্নাতে তিনি আপনার স্ত্রী হবে।” তখন আল্লাহর রাসূল তাঁকে আবার ফিরিয়ে নেন।

কোনো মানুষই শতভাগ সঠিক হতে পারে না। নবীজির স্ত্রীদের মাঝেও এ রকম ছোটোখাটো কমতি ছিল। তাও তিনি সবার সাথে ভালো আচরণ করতেন, মন জুগিয়ে চলতেন। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে দ্বীনদার নারীটিরও এর চেয়ে অধিক কমতি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাই এক স্ত্রীর মাঝেই সব ভালোত্ব আশা করলে চলবে না। এই চিন্তাধারা বাদ দিতে হবে। বিশেষ কয়েকটি গুণ নির্বাচন করতে হবে, বাকিগুলোতে ছাড় দিতে। সব ভালোর সংমিশ্রণ জান্নাতে সম্ভব, দুনিয়াতে না।

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মানুষের কিছু না কিছু দুর্বলতা থাকে। এ ক্ষেত্রে একে অপরের দুর্বলতাগুলোর ব্যাপারে ছাড় দিতে হবে। কোনো ব্যাপারে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না। রাগের মাথায় ভুল কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পরস্পরের প্রতি সুন্দর আচরণ বজায় রাখতে হবে। রাগারাগি, কথা কাটাকাটি বা ঝগড়া ইত্যাদি হলেও স্ত্রীর প্রতি কোনোপ্রকার বিরূপ মনোভাব রাখা যাবে না।

বিবাহের পর দায়িত্ববোধের অনেক বড় একটা ভার কাঁধে এসে পড়ে। স্ত্রীর ভরণপোষণের গুরুভার দায়িত্ব তো আছেই; এর পাশাপাশি স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য দ্বীনি ও পর্দার পরিবেশ নিশ্চিত করা, পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে মানিয়ে চলা, স্ত্রীর পরিবারের সাথে সামাজিকতা বজায় রাখা আরও কত কী! এসব ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে অনেক কিছুই করতে হয়। আত্মত্যাগের গল্পও বুনতে হয় অনেক। বৈবাহিত জীবনের দায়িত্বের সাথে তিনটি বিষয় আমাদের জীবনে থাকবেই, সংক্ষিপ্তে আমরা বলতে পারি, SSS। অর্থাৎ stress, struggle, sacrifice। তাই আমাদের মেনে নিতে হবে যে, সুখ জান্নাতে, এখানে কোনো সুখ নেই।

পক্ষান্তরে কেবল অন্যকে নিয়ে ভাবলেই হবে না, নিজের কথাও ভাবতে হবে। নিজের মানসিক ও শারীরিক অবস্থার খেয়াল রাখতে হবে। ইবাদাতের জন্য এই দুইয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ ছাড়া নিজের দ্বীন, ঈমান ও আমলকেও রক্ষা করতে হবে।

বিয়ের পরপর সুখময় দিনগুলোতে আমলে কিছুটা ঘাটতি পরে। যদি সম্ভব হয়, তাহলে চেষ্টা করা পূর্বের মতোই আমল বজায় রাখা। আর তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত মাথায় রাখা যে, এ রকম অবস্থা বেশিদিন যাতে চলমান না থাকে। কারণ, আমলে ঘাটতি একটা সময় আমল-বিমুখতার দিকে ধাবিত করে যা পরিশেষে ঈমানের ওপর আঘাত হানে। সময়ানুবর্তিতার সঠিক বাস্তবায়ন না করলে এসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

টিকাঃ
[৭] সূরা নিসা- ১৯
[৮] তাফসীরে ত্ববারী
[৯] সহীহ মুসলিম- ১৪৬৯; রিয়াদুস স্বালিহীন- ২৮০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00