📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 স্ত্রীর মানসিক চাহিদা পূরণ

📄 স্ত্রীর মানসিক চাহিদা পূরণ


একজন স্বামী এবং স্ত্রীর মাঝের সম্পর্কটা হয় সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। আর এই ঘনিষ্ঠতা বাড়ে অন্তরের গহিনে লুকিয়ে থাকা কথাগুলো প্রকাশের মাধ্যমে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরা অন্তরে অনেক কথা তাদের স্বামীর জন্য জমিয়ে রাখে। দম্পতির মাঝে কথাবার্তা যত বেশি হয়, মানসিক দূরত্ব ততই কমতে থাকে। এ কারণেই বিয়ের পরপরই স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকা একদমই অনুচিত। স্বামী-স্ত্রীর জন্য এই মোক্ষম সময় কোনোমতেই নষ্ট করা ঠিক হবে না। এই সময়টাতে একে অপর থেকে অনেক কিছু চাওয়া ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয় থাকে।

ওমেন'স সাইকোলজি সার্ভেতে নারীদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, বিবাহ তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কি না? সেখানে যারাই বলেছেন একাকিত্ব দূরীকরণের জন্য বিয়ে করতে চায় তাদের মাঝে অধিকাংশই বলেছেন যে, তাদের কথা বলার মানুষ নেই, এই অভাবই তাদের জন্য একাকিত্বের কারণ। স্ত্রীদের অন্যতম মানসিক চাহিদা হচ্ছে তাদের স্বামীদের থেকে তারা একটা Quality Time চায়। তারা চায় স্বামীর সাথে সারাদিনের ঘটনা বলবে, পূর্বের অবিবাহিত জীবনের গল্প করবে ইত্যাদি। এসব কথাবার্তার মাঝে অনেক কথাই একজন পুরুষের কাছে অযথা বকবকানি বা 'ফাও প্যাচাল' মনে হতে পারে, অথচ তাদের কাছে এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা! নারীদের ফিতরাতই এমন যে, তারা তাদের স্বামীদের সাথে গপসপ করতে ভালোবাসে এবং এর মাধ্যমেই তারা খুব সহজে ঘনিষ্ঠ হয়। তাই স্ত্রীর জন্য একটা সময় নির্ধারণ করতে হবে, যে করেই হোক। শত ব্যস্ততা থাকলেও এটি করতে হবে তার মানসিক প্রশান্তির জন্য। এটা তার হক। আল্লাহ কুরআনে বলেন,

وَلَقَدْ اَرْسَلْنَا رُسُلًا مِّنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةٌ وَمَا كَانَ لِرَسُوْلٍ أَنْ يَأْتِيَ بِقَايَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ لِكُلِّ أَجَلٍ كِتَابُ ﴾

আর অবশ্যই তোমার পূর্বে আমি রাসূলদের প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি। আর কোনো রাসূলের জন্য এটা সম্ভব নয় যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো নিদর্শন নিয়ে আসবে। প্রতিটি সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য রয়েছে লিপিবদ্ধ বিধান।[৫]

প্রত্যেক নবী-রাসূলই বিশাল দায়িত্ব নিয়ে তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত হয়েছে। আল্লাহর দেওয়া বিধিনিষেধ পালন করা ও অপরকে তা ব্যক্ত করা, দা'ওয়াতি কাজের কঠিন পথ পাড়ি দেয়া, রিসালাতের দায়িত্ব পালন করা; একজন নবীর কতই-না দায়িত্ব, কতই-না ব্যস্ততা। এতৎসত্ত্বেও আল্লাহ তাঁদেরকে স্ত্রী ও সন্তান দান করেছেন এবং তাঁরা তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানদের হক আদায়ও করেছেন। এ ছিল আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের জন্য বার্তা যে, নবী-রাসূলগণ এত ব্যস্ততার পরেও তাদের পরিবারকে ভুলে যাননি, সেখানে আমাদের ব্যস্ততার অজুহাত খুবই দুর্বল।

রাসূল প্রতিদিন ফজরের পরে একটা সময় তাঁর সকল স্ত্রীর জন্য রাখতেন। এই সময়টা তিনি তাঁদের সাথে কথা বলতেন, বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করার ছলে শেখাতেন, তাঁদের জন্য দু'আ করতেন। কিন্তু আজকাল সকালের নাস্তা সেরেই আমরা অফিসের পানে ছুটি। আর দিন শেষে বাসায় ফিরেই সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে কে কী গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট (!) করল তা দেখতে মোবাইল বা ল্যাপটপ নিয়ে বসে যাই। সেসব পোস্টে লাইক-কমেন্ট করা যেন আমাদের এক গুরুদায়িত্ব! অথচ স্ত্রী এদিকে ছটফট করতে তাকে কয়েকটা কথা বলার জন্য। এটাকে সে নিজের প্রতি অবহেলা হিসেবে নেয়। তাই এমনটি করা মোটেও উচিত না। ফ্রি কিছু সময় রাখুন আপন স্ত্রীর জন্য। প্রয়োজনে দূরে কোথাও বেড়াতে যান, দূর্বাঘাসের ওপর বসে লম্বা গল্প করুন, দুইজনের জন্য দুইটা আইস্ক্রিম নিন, আশেপাশে নির্জন থাকলে তাকে খাইয়ে দিন; নারীরা এসব পছন্দ করে। নিজেকে খুব দামি মনে করে। মানসিক প্রশান্তির খোরাক মিলে। যখন তার সাথে কথা বলবেন তখন ফোন, ল্যাপটপ ইত্যাদি কোনো কিছুর ধারেকাছেও যাওয়া যাবে না। পূর্ণ মনোযোগ তাকে দিন। হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে আপনার, তাহলে মনে রাখতে হবে তাকে এই সময় দেয়াটাও আপনার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর মাধ্যমে আল্লাহ সওয়াবও প্রদান করবেন। স্ত্রীরা চায় স্বামী তার মন বুঝবে, স্ত্রীকে সুন্দর সুন্দর নামে ডাকবে, স্ত্রীর সাথে জীবনে ঘটে যাওয়া সব গল্পের ঝুড়ি মেলে ধরবে। মাঝে মাঝে নিজে বোকা সেজে স্ত্রীর হাতে কর্তৃত্ব দিতে হবে। স্ত্রীকে যে সে ভালোবাসে সেটা বিনা দ্বিধায় প্রকাশ করবে, এতে লজ্জার কিছু নেই। স্ত্রীর এঁটো খাওয়া অনেক স্বামীর নিকট অপছন্দনীয়। কিন্তু শরী'আতে তা স্বীকৃত। রাসূল পান-পাত্রের ঠিক সেই স্থানে মুখ রেখে পানি পান করতেন, যে স্থানে হযরত আয়েশা মুখ লাগিয়ে পূর্বে পান করেছেন। যে টুকরো থেকে হযরত আয়েশা গোশত ছাড়িয়ে খেতেন, সেই টুকরো নিয়েই ঠিক সেই জায়গাতেই মুখ রেখে আল্লাহর নবী গোশত ছাড়িয়ে খেতেন।[৬] ঘর থেকে বের হওয়ার সময়, ঘরে ফেরার পর এবং দিনে-রাতে মাঝে মাঝেই স্ত্রীকে আলিঙ্গন করা, আদর করা, চুমু দেয়া এসব স্ত্রীরা পছন্দ করে। স্ত্রীর দিকে তাকানো, স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে দেয়া সওয়াবের কাজ।

এ ছাড়া দ্বীনি বা দুনিয়াবী ব্যাপারে স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করা সুন্নাহ। আল্লাহর রাসূল হুদাইবিয়াহ চুক্তির সময় তাঁর স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করেছিলেন। এ ছাড়া স্ত্রীর যাবতীয় কাজে হাত লাগানো ও সন্তান পালনের প্রতি পুরুষদের মাঝে মাঝে আগ্রহ দেখানো উচিত। এতে স্ত্রীর মন স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রেমে আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। রাসূল -ও সংসারের কাজ করতেন। স্ত্রীকে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে (যেমন: ঈদ, কুরবানী প্রভৃতিতে) ছোটখাটো উপহার দিলে স্ত্রী আনন্দিত হয়। এতে স্ত্রীর হৃদয় চিরবন্দী হয় স্বামীর হৃদয় কারাগারে। তার সাথে হাসি-তামাশা করা, সব সময় পৌরুষ মেজাজ না রেখে মাঝে মাঝে তার সাথে বৈধ খেলা করা যেতে পারে। স্বামীরও উচিত, স্ত্রীকে খুশি করার জন্য সাজগোজ করা। যাতে তার নজরও অন্য কোনো পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট না হয়।

টিকাঃ
[৫] সূরা রাদ- ৩৮
[৬] আদাবুয যিফাফ, পৃষ্ঠা- ২৭৭

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 যথাযথ প্রত্যাশা

📄 যথাযথ প্রত্যাশা


আমাদের নিকট ভালো স্ত্রীর সংজ্ঞা হচ্ছে, যে স্ত্রী তার স্বামীর আনুগত্য করে, স্বামী যদি রাগান্বিত হয় তাহলে সে রাগ না ভাঙা পর্যন্ত পাশেই বসে থাকে, যাকে প্রয়োজনের মুহূর্তে ডাকলে উত্তম সাড়া পাওয়া যায় এবং যাকে দেখলেই অন্তরে তুষ্টি মেলে। ইসলামে একজন আদর্শ স্ত্রীর অনেক গুণাগুণ আমরা প্রতিনিয়ত শুনেছি, পড়েছি। কিন্তু বাস্তব হচ্ছে, একজন নারীর মাঝে সব গুণ থাকবে না। এটা বুঝতে হলে নিজের দিকেও দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। ইসলামের আলোকে একজন আদর্শ পুরুষের সকল গুণ কি নিজের মধ্যে বিদ্যমান আছে? যদি উত্তর 'না' হয় তাহলে একজন নারীর মাঝেও সকল গুণ খোঁজা অলীক আশা। হতে পারে স্ত্রীর সৌন্দর্যে কমতি আছে বা রান্না ভালো না। কিন্তু অন্যদিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যাবে সে আখলাক ও আনুগত্যের দিক থেকে অসাধারণ। পুরুষদের কাছে সৌন্দর্য দুইদিন পর এমনিতেই ফিকে হয়ে যায়। দাম্পত্য জীবনে বাকি থাকে ওই আখলাক আর স্ত্রীর আনুগত্যই। তাই ভালো গুণগুলো চিন্তা করে মন্দ দিকগুলো উপেক্ষা করতে হবে। আল্লাহ বলেন,

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَ يَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا

তাদের (স্ত্রী) সাথে দয়া ও সততার সঙ্গে জীবনযাপন করো। যদি তাদেরকে তোমরা পছন্দ না করো, তবে হতে পারে যে তোমরা যাকে অপছন্দ করছ বস্তুত তারই মধ্যে আল্লাহ বহু কল্যাণ দিয়ে রেখেছেন। [৭]

অর্থাৎ এমনও হতে পারে যে, ধৈর্যধারণ করে স্ত্রীদের সাথে জীবনযাপন করলে দুনিয়াতে এবং আখিরাতে আল্লাহ উত্তম কিছু এর বিনিময়ে রেখেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, "এর অর্থ হলো স্বামী স্ত্রীকে ভালোবাসবে, তারপর তাদের মধ্যে আল্লাহ সন্তান দান করবেন যে সন্তান তাদের মধ্যে প্রভূত কল্যাণ নিয়ে আসবে বা স্বামীর মনে স্ত্রীর জন্য ভালোবাসা তৈরি করে দেবে।”[৮]

এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ বলেন,

لا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةٌ إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ

মু'মিন পুরুষ কোনো মু'মিন নারীকে ঘৃণা করবে না। যদি তার চরিত্রের কোনো একটি দিক তাকে অসন্তুষ্ট করে, তবে অন্য দিক তাকে সন্তুষ্ট করবে। [৯]

স্ত্রীর মাঝে সবকিছু থাকতে হবে এরূপ চিন্তাধারা হতে পূর্ব থেকেই বিরত থাকতে হবে, নাহলে পরবর্তী সময় তা হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

স্ত্রীর মাঝে কোনো গুণের কমতি দেখলে হতাশ হওয়া বা রাগ করা যাবে না। মানুষের কথায় প্রভাবিত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অনেক মানুষ আপনার স্ত্রী সম্পর্কে অনেক কিছুই বলবে। বুঝে নিতে হবে এটা অকর্মণ্য ও হিংসুক মানুষদের স্বভাব, তাই এসবে কান দেয়া মানে নিজের পোশাক নোংরা করা। এ ক্ষেত্রে দাম্পত্য জীবন না ভাঙার দুটি মন্ত্র। প্রথমত, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্য। অর্থাৎ স্বামীকে পরিবার ও পরিচিতদের মাঝে সবার থেকে ওপরে রাখা, সবার মতের ওপরে স্বামীর সঠিক মতকে প্রাধান্য দেয়া। দ্বিতীয়ত, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর যত্নবান থাকা। এই দুইয়ের যুগলবন্দী হলে দাম্পত্য জীবনে কেউ আঁচড়ও ফেলতে পারবে না। এমনকি মানুষের দশ কথা ও মন্তব্য, বদনজর, জাদু, জ্বীন সবই এই দুইয়ের কাছে হার মানে।

আগে আমাদেরকে ভাবতে হবে আমরা কী কী চাই স্ত্রীর কাছ থেকে। নিজের চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি বিয়ের আগে আলোচনা করে নিতে হবে। অর্থাৎ, মূল চাহিদাগুলো নিয়ে অধিক গুরুত্বের সাথে কথা বলতে হবে। যেমন: মা-বাবার খেদমত, এক সংসারে থাকা, রান্না, তার চাকরি করা না করা ইত্যাদি। নিজের কাছে যা কিছু অধিক প্রয়োজনীয়, সেসব নিয়ে আলোচনা করে নেয়া উচিত।

সেও তার বিষয়গুলো উত্থাপন করতে পারে। সে বলতে পারে যে, সে পড়াশোনা করতে চায়, আলাদা সংসার করতে চায় ইত্যাদি। এইসব চাওয়ার কারণে তাকে ফেমিনিস্ট বা সেক্যুলার মনে করা বোকামি। বিয়ের ক্ষেত্রে বাস্তববাদী হতে হবে, আদর্শবাদী (Idealistic) হওয়া যাবে না। আপনি যদি এমন চশমা পরে থাকেন যেই চশমা দিয়ে আপনি কেবল আদর্শ ফিল্টার করতে পারেন কিন্তু বাস্তব চিত্র দেখতে পারেন না, তাহলে সেই চশমা আপনার পরিবর্তন করা উচিত।

বিয়ে একটি আদর্শ প্রক্রিয়া যা মানুষের সার্বিক প্রয়োজনটাকে পূরণ করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সব উপাদান আদর্শের নীতিতে উত্তীর্ণ হয় না। তাই রাসূল ﷺ যা নির্দেশনা দিয়েছেন তা মানলেই আমরা প্রকৃতপক্ষে সফল হতে পারব। যদিও সকল নির্দেশনা মেনে চলা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না, তাও আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। অনুকূল-প্রতিকূল মেনে নিয়ে ও উপেক্ষা করে দাম্পত্য জীবন টিকে থাকে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার মাধ্যমেই।

রাসূল -এর স্ত্রীদের মাঝে আমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে। আয়েশা ছিলেন চঞ্চল প্রকৃতির। ঘরের কাজ তিনি কম পারতেন। বিয়ের আগে নবীজি তাঁর খাদেমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন তাঁর সমস্যার ব্যাপারে। সে বলেছিল, "আমি তাঁর ব্যাপারে এতটুকুই খারাপ জানি যে, তিনি ময়দার কাই বানিয়ে ঘুমিয়ে যেতেন আর ছাগলে এসে তা খেয়ে নিত।” আয়েশা -এর সাংসারিক দক্ষতা কম ছিল, তবু নবীজি তাঁকে ভালোবাসতেন।

হাফসা রূপবতী ও বুদ্ধিমতী ছিলেন। কিন্তু তিনি রাগের সময় তাঁর মুখ বন্ধ রাখতে পারত না। একবার রাসূল -এর কোনো এক গোপন কথা আরেক স্ত্রীকে বলে দেওয়াতে রাসূল তাঁর থেকে অনেক দিন আলাদা থাকেন। পরে জিব্রাইল এসে বলেন, "আপনি হাফসা -কে ফিরিয়ে নিন। কারণ তিনি সালাত আদায় করে, রোজা রাখে, তাহাজ্জুদ আদায় করে, আর জান্নাতে তিনি আপনার স্ত্রী হবে।” তখন আল্লাহর রাসূল তাঁকে আবার ফিরিয়ে নেন।

কোনো মানুষই শতভাগ সঠিক হতে পারে না। নবীজির স্ত্রীদের মাঝেও এ রকম ছোটোখাটো কমতি ছিল। তাও তিনি সবার সাথে ভালো আচরণ করতেন, মন জুগিয়ে চলতেন। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে দ্বীনদার নারীটিরও এর চেয়ে অধিক কমতি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাই এক স্ত্রীর মাঝেই সব ভালোত্ব আশা করলে চলবে না। এই চিন্তাধারা বাদ দিতে হবে। বিশেষ কয়েকটি গুণ নির্বাচন করতে হবে, বাকিগুলোতে ছাড় দিতে। সব ভালোর সংমিশ্রণ জান্নাতে সম্ভব, দুনিয়াতে না।

দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মানুষের কিছু না কিছু দুর্বলতা থাকে। এ ক্ষেত্রে একে অপরের দুর্বলতাগুলোর ব্যাপারে ছাড় দিতে হবে। কোনো ব্যাপারে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না। রাগের মাথায় ভুল কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পরস্পরের প্রতি সুন্দর আচরণ বজায় রাখতে হবে। রাগারাগি, কথা কাটাকাটি বা ঝগড়া ইত্যাদি হলেও স্ত্রীর প্রতি কোনোপ্রকার বিরূপ মনোভাব রাখা যাবে না।

বিবাহের পর দায়িত্ববোধের অনেক বড় একটা ভার কাঁধে এসে পড়ে। স্ত্রীর ভরণপোষণের গুরুভার দায়িত্ব তো আছেই; এর পাশাপাশি স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য দ্বীনি ও পর্দার পরিবেশ নিশ্চিত করা, পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে মানিয়ে চলা, স্ত্রীর পরিবারের সাথে সামাজিকতা বজায় রাখা আরও কত কী! এসব ক্ষেত্রে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে অনেক কিছুই করতে হয়। আত্মত্যাগের গল্পও বুনতে হয় অনেক। বৈবাহিত জীবনের দায়িত্বের সাথে তিনটি বিষয় আমাদের জীবনে থাকবেই, সংক্ষিপ্তে আমরা বলতে পারি, SSS। অর্থাৎ stress, struggle, sacrifice। তাই আমাদের মেনে নিতে হবে যে, সুখ জান্নাতে, এখানে কোনো সুখ নেই।

পক্ষান্তরে কেবল অন্যকে নিয়ে ভাবলেই হবে না, নিজের কথাও ভাবতে হবে। নিজের মানসিক ও শারীরিক অবস্থার খেয়াল রাখতে হবে। ইবাদাতের জন্য এই দুইয়ের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ ছাড়া নিজের দ্বীন, ঈমান ও আমলকেও রক্ষা করতে হবে।

বিয়ের পরপর সুখময় দিনগুলোতে আমলে কিছুটা ঘাটতি পরে। যদি সম্ভব হয়, তাহলে চেষ্টা করা পূর্বের মতোই আমল বজায় রাখা। আর তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে অন্তত মাথায় রাখা যে, এ রকম অবস্থা বেশিদিন যাতে চলমান না থাকে। কারণ, আমলে ঘাটতি একটা সময় আমল-বিমুখতার দিকে ধাবিত করে যা পরিশেষে ঈমানের ওপর আঘাত হানে। সময়ানুবর্তিতার সঠিক বাস্তবায়ন না করলে এসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

টিকাঃ
[৭] সূরা নিসা- ১৯
[৮] তাফসীরে ত্ববারী
[৯] সহীহ মুসলিম- ১৪৬৯; রিয়াদুস স্বালিহীন- ২৮০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00