📄 প্রথম রাতে বরের প্রস্তুতি
আল্লাহর ভয়ে নিজের অন্তর ও চক্ষুকে সমস্ত গুনাহ থেকে ফিরিয়ে রেখে একজন দ্বীনদার পুরুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ থাকে একজন স্ত্রীর, যে হবে মুহস্বানাত, তাবৎ দুনিয়ার সবচেয়ে দামি সম্পদ। আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেন তখন তার এই হাজারো জল্পনা-কল্পনাকে বাস্তবরূপ দান করেন। একটা সময় সেই শুভক্ষণের আবির্ভাব ঘটে তার জীবনে। তার জীবনের নব্য দিনটি বিশেষ একটা ক্ষণ হয়ে থাকে তার কাছে। এই দিনটি নিয়ে একজন পুরুষের থাকে হাজারো জল্পনা-কল্পনা। তার কল্পনাজুড়ে থাকে নানান রোমান্টিক মুহূর্তের গল্পঝুড়ি। কিন্তু এই রোমান্টিক সব কল্পনার ভিড়ে হারিয়ে যায় সেই দিনের জন্য বাস্তব প্রস্তুতিগুলো। আর এই প্রস্তুতিহীনতা বিশেষত প্রভাব ফেলে দম্পতির যৌনজীবনে। তাই এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের ভালোভাবে, খোলামেলা জেনে নেওয়া উচিত।
* পড়াশোনা বিয়ের প্রথম রাত সম্পর্কে একজন পুরুষের যথেষ্ট ধারণা রাখা উচিত। বিষয়টা তাকে বুঝতে হবে যে, আজ নতুন এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে সে। যা তার সম্পূর্ণ অজানা। অপ্রস্তুত অবস্থায় কোনো অজানার সম্মুখীন হওয়াটা অনেক বড় এক বোকামি। তাই এই সম্পর্কে সর্বপ্রথম যতদূর সম্ভব মাসআলাগত সকল বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করা বাঞ্ছনীয়। সেই সাথে যুগলবন্দি করতে হবে মেডিকেলজনিত বিষয়ও, যাতে প্রতীক্ষিত সেই দিনটি তার কাছে বৈদ্যুতিক ঝাটকা হয়ে না দাঁড়ায়。
* ভালোবাসা আস্বাদন
কুমারী নারীর যোনিপথ খুব সংকীর্ণ হয়ে থাকে। এ অবস্থায় সহবাসের সময় তাকে কিছুটা কষ্ট সহ্য করতে হয়। এ ব্যাপারে একজন পুরুষের ধারণা থাকা দরকার। প্রথম কিছুদিন সফলতা নাও আসতে পারে। এ কারণে যৌনমিলনের স্বাদও উপভোগ করা সম্ভব হয় না। বারবার ব্যর্থ হতে হতে একটা সময় সফল হওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে পুরুষের উচিত সবর করা ও তার চাহিদা স্ত্রীর মাধ্যমে অন্য কোনোভাবে মিটিয়ে নেয়া। সেই সাথে নববধূর সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করে বোঝানো যে, এমন হওয়াটা স্বাভাবিক। তাকে তাগাদা দিতে হবে সেও যাতে স্বামীকে গ্রহণের ক্ষেত্রে সবরের সাথে সচেষ্ট থাকে। এ কারনেই কুমারী নারীকে ৭ দিন-রাত সময় দেওয়ার বিষয়ে হাদীসে এসেছে। আর অকুমারীদের ক্ষেত্রে সতীচ্ছেদের বিষয় নেই বলে ৩ দিন-রাত সময় দেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে।[২] পুরুষেরা এই সময়টাতে স্ত্রীর সাথে অন্যান্য যৌনোদ্দীপনামূলক ভালোবাসা আদান-প্রদান করেও যৌনসুখ উপভোগ করতে পারে এবং একে অপরকে আরও সহজ করে নিতে পারে। তবে এ বিষয়টা সবার ক্ষেত্রে নাও ঘটতে পারে, কারণ অনেক নারীর প্রথম দিনেই খুব সহজে সতীচ্ছেদ হয়ে যায়। এটা মূলত নারীর প্রস্তুতি ও মানসিক অবস্থার ওপরই নির্ভর করে। তবে যাদের বেশি সময় লেগে যায় তাদেরও এখানে চিন্তিত হবার কোনো কারণ নেই। কেননা, কুমারীত্ব শেষ হবার পর থেকে এ সমস্যার সম্মুখীন আর হতে হয় না। সে তখন তার স্ত্রীর ভালোবাসা পরিপূর্ণভাবে আস্বাদন করতে পারে。
* স্ত্রীকে দিক-নির্দেশনা দেওয়া
একজন নারী তার নিজের শরীর সম্পর্কে নিজেই সবচেয়ে ভালো জানে। কীভাবে আগালে বিষয় টা সহজ হবে সেই দিক-নির্দেশনা তাই স্ত্রীর পক্ষ থেকেই কাম্য। তাই স্বামী তার থেকে জেনে নিতে পারে যে, কীভাবে আগালে সহজ হবে? এসব বিষয়ে লজ্জা না করে স্বামী-স্ত্রী নিজেদের মধ্যে খোলামেলাভাবে আলোচনা করবে। এমন মুহূর্তে বারবার ব্যর্থ হওয়ার দরুন যাতে স্পৃহা না হারিয়ে যায় তাই একে অপরকে অন্যপন্থায় যৌনসুখ দিয়ে উৎসাহিত করে যেতে হবে।
📄 অন্তরঙ্গতা
দুনিয়ার জীবনে স্ত্রীকে ভালোবাসাও ইবাদাত-বিশেষ। তবে শর্ত হলো, ওই ভালোবাসা যেন স্বামীকে ইবাদাত-বন্দেগি থেকে ভুলিয়ে না রাখে। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা গভীর হওয়া কাম্য। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা প্রদশর্নের ব্যাপারে ইসলাম উৎসাহিত করে।
আশরাফ আলী থানভি বলেন, “মানুষের তাকওয়া ও খোদাভীতি বৃদ্ধি পাওয়ার দ্বারা স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসাও বৃদ্ধি পায়। কেননা সে জানে যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে স্ত্রীর দায়-দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত হয়েছে। সে তা আদায় করতে বাধ্য। এই নিয়তে যখন সে তা আদায় করে তখন সওয়াবের অধিকারী হয়।”
ইসলামী শরী'আহ অনুযায়ী যদি পার্থিব কারণে মানুষ আল্লাহকে ও আখিরাতকে ভুলে যায়, তাহলে তা নিন্দনীয় ও অশুভ। তা না হলে সহায়-সম্পদের প্রাচুর্য নিন্দিত নয়। তাই তো ইসলাম সংসার-বিরাগী হওয়াকে সমর্থন করে না, ইসলাম এর অনুমতিও দেয় না। নিঃসন্দেহে একজন নেককার স্ত্রী দুনিয়ার সমগ্র সম্পদ থেকেও দামি। স্ত্রীকে ভালোবেসে কেউ যদি আখিরাতের পাথেয় গড়তে পারে তা তো অবশ্যই প্রশংসনীয়। তাই স্ত্রীর মনোরঞ্জন করা ও তার আকর্ষণ ধরে রাখা প্রতিটি পুরুষের জন্য ইবাদাতেরই অন্তর্ভুক্ত।
* নিজের শরীরের খেয়াল রাখা যৌনতার সাথে শরীরের সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি। "ভালোবাসায় বান্দরকেও সুন্দর লাগে” এই ধরনের চিন্তাভাবনা বাদ দিতে হবে। নিজের শরীরের যত্ন নিয়ে নিজেকে স্ত্রীর সামনে আকর্ষণীয় করে রাখতে হবে। সুঠাম দেহ গড়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিয়মিত হাত-পায়ের যত্ন, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ভালো সুগন্ধি ব্যবহার, চুলের যত্ন এসব স্ত্রীরা অত্যন্ত পছন্দ করে。
* চিরচেনা যৌন আচরণের বাইরে কিছু করা প্রত্যেক দম্পতির মাঝেই একান্ত পরিচিত কিছু যৌন আচরণ থাকে আর তারা সেগুলোতেই খুব অভ্যস্ত হয়ে যান। এই অভ্যস্ততা থেকে বের হয়ে মাঝে মাঝে একদম অন্য রকম কিছু আদর-সোহাগ করা যেতে পারে। এতে সম্পর্কে নতুনত্ব বজায় থাকে। নিজের স্বামীকে প্রেমিকের মতো আচরণ করতে দেখলে সকল স্ত্রীই খুশি হবে。
* নতুন কিছু করতে ভয় না পাওয়া স্ত্রীর সাথে মেলামেশার ক্ষেত্রে রোমাঞ্চকর হয়ে উঠুন। নতুন পদ্ধতি, নতুন ভঙ্গি, নতুন কৌশল চেষ্টা করে দেখতে মোটেও লজ্জা বা সংকোচ বোধ করবেন না। তবে অবশ্যই তা হালাল-হারামের গণ্ডির ভেতরে থেকে。
* সামান্য স্পর্শ ঘরের মধ্যে মাঝে মাঝে এমনিই তাকে স্পর্শ করুন। তাকে বুঝতে দিন যে, তাকে স্পর্শ না করে আপনি এক মুহূর্ত থাকতে পারেন না। রাস্তায় চলার সময় পাশে রাখুন, হাত ধরে রাখুন। তাকে বুঝতে দিন যে, আপনি তাকে হারাতে চান না। মাঝে মাঝে একসাথে সালাত আদায় করুন। সালাত শেষে তার কপালে চুমু দিন, তার আঙুলের কড়ায় তাসবীহ গুনুন। তাকে ভাবতে দিন যে, তার প্রতি আপনার ভালোবাসাটা আল্লাহর জন্য。
* উদ্দীপনামূলক কথায় ভালোবাসা প্রকাশ একান্ত মুহূর্তে স্ত্রীর প্রশংসা করতে হবে। তাকে বলতে হবে যে, তাকে নিয়ে আপনি কতটা সুখী বা তাকে কত তীব্রভাবে চান। এক মুহূর্ত তাকে ছাড়া থাকতে পারেন না। মাঝে মাঝে দুষ্টুমির ছলে কিছু কথা বলা যেতে পারে। এসবে স্ত্রীর একটা অন্য রকম আগ্রহ জন্মে স্বামীর প্রতি। কথা বলার সময় যেন আপনাকে আত্মবিশ্বাসী দেখায়। কারণ, ভীরুগোছের কাউকে নারীরা ততটা পছন্দ করে না। তারা চায় এমন সঙ্গী যার প্রতি আস্থা রাখা যায়।
📄 সহবাস
বিবাহের অন্যতম একটি মুখ্য উদ্দেশ্য হলো সহবাসে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে নিজেদের জৈবিক চাহিদা মেটানো। এটাকে খেলার মতো নিতে হবে। রাসূল স্বামী-স্ত্রী অন্তরঙ্গতাকে খেলার সাথেই তুলনা করেছেন।[৩] খেলায় যেমন ধীরে ধীরে দক্ষতা বাড়ে, সহবাসের ক্ষেত্রেও তা-ই। ধীরে ধীরে একে অপরের শরীরকে আবিষ্কার করতে করতে দুইজনের মাঝেই দক্ষতা বাড়বে। আর খেলা যেহেতু আনন্দের একটি বিষয়, তাই একেও আনন্দ হিসেবে নিতে হবে এবং পরিপূর্ণ উপভোগ করতে হবে। ইমাম গাযালী বলেন, "দুনিয়ায় যদি জান্নাতের ছিটেফোঁটাও থাকে, তাহলে তা স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার মাঝে রয়েছে।"
স্ত্রীর নিকট গমন করার ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল-এর কিছু নির্দেশনা হলো : আস্তে যাও, জ্ঞানী ও ভদ্র হয়ে যাও, বুঝেশুনে সম্পাদনা করো। সে প্রস্তুত নাও থাকতে পারে। স্ত্রীকে পরিপাটি হওয়া, সুন্দর পোশাক পরিধান, মাথার চুল আঁচড়ে নেয়া, গুপ্তাঙ্গের কেশ কেটে নেয়া ইত্যাদির জন্য সময় দিতে হবে। নিজেকেও সুগন্ধময় ও নিয়মিত নিজের গুপ্তলোম পরিষ্কার রাখা উচিত।
সহবাসের ক্ষেত্রে পুরুষদের একটা বিষয় জেনে রাখা জরুরি। নারীদেরও কামভাবজনিত উত্তেজনা হয়, তাদের ইচ্ছা হয় সুখ পেতে। কিন্তু প্রক্রিয়াটা আমাদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন। এই ভিন্নতাগুলো জানা না থাকলে স্ত্রীকে সুখী করা কঠিন হয়ে যায়।
পুরুষেরা মূলত মাইক্রোওয়েভ ওভেনের মতো, হুট করে গরম হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রয়েছে পুরুষদের। কিন্তু নারীরা উত্তেজিত হতে ও চরম মুহূর্তে পৌঁছতে সময় নেয়।
তাই চূড়ান্ত সহবাসের পূর্বে স্ত্রীকে আদর করে নেয়ার বিষয়ে হাদীসেও এসেছে। সেই সময়টাতে স্ত্রীর সাথে প্রেমমূলক ও কামদ কথা বলা, পুরো শরীর ও সংবেদনশীল অঙ্গ স্পর্শ করা, চুম্বন ও আলিঙ্গন করা ইত্যাদির মাধ্যমে তাকে উত্তেজিত করতে হবে। নারীদের জন্য এটা উপভোগ্য। স্ত্রীর কথা চিন্তা করে পুরুষদের উচিত অন্তত ১৫-২০ মিনিট এভাবে কাটানো। কিন্তু অনেকেই অলসতা অথবা নিজের অতি উত্তেজনার কারণে এই পর্বটা খুব তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে চায়। অথচ বিষয়টা উভয়ের জন্যই উপভোগ্য হতে পারতো। তবে ক্ষেত্রবিশেষে এই সময়টুকু ৩০ মিনিটও হতে পারে আবার ১ মিনিটও হতে পারে, সেটা নির্ভর করছে দম্পতির পারস্পরিক চাহিদার ওপর। বৈবাহিক জীবন উপভোগ করা উচিত। পুরুষদের ক্ষেত্রে দাম্পত্য জীবনের প্রথম দিকে অধিক ভালো লাগা কাজ করে, প্রিয়তমাকে ছাড়া এক মুহূর্ত দূরে থাকতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু ধীরে ধীরে এই আবেগটা কমে আসতে থাকে। মূলত পুরুষদের শারীরিক চাহিদা ও বহুগামী চিন্তাধারার কারণে এমনটি হয়ে থাকে এবং এটিই স্বাভাবিক। তবে মনে রাখতে হবে, স্ত্রীর জন্য অন্তর থেকে ভালোবাসার যাতে কোনো কমতি না থাকে।
দাম্পত্য জীবনে স্বার্থপরতা পরিত্যাগ করতে হবে। নিজের চাহিদা হলে স্ত্রীকে ডাকলাম, প্রয়োজন মিটিয়ে সরে পড়লাম এমন যাতে না হয়। স্ত্রীর চাহিদাও বুঝতে হবে। সহবাসের পূর্বে স্ত্রীকে যথেষ্ট সময় দিতে হবে আলিঙ্গন, স্পর্শ ও চুমু খাওয়ার মাধ্যমে। তাহলে সেই সহবাস স্ত্রীর জন্যও সুখকর হবে। শৃঙ্গারের (foreplay) অভাবে অনেক নারী সহবাসের সময় ব্যথা অনুভব করে যা পরবর্তী সময় তার মনে সহবাসের প্রতি ভীতির জন্ম দেয়।
তাই স্ত্রীর শরীর কী চায় বুঝতে হবে, তার শরীরের সংবেদনশীল স্থানগুলো জেনে নিতে হবে। এ ছাড়া স্ত্রী কখনো ডাকলে তার ডাকেও সমান তালে সাড়া দিতে হবে। বিয়ের কয়েক বছর পর অনেকেই স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়া থেকে একদমই বিরত থাকে। অথচ স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়া পুরুষের ওপর ওয়াজিব। স্ত্রীর সাথে অন্তত কত দিন পর পর মিলিত হতে হবে এ ব্যাপারে ফক্বিহগণের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেন,
يجب على الرجل أن يطأ زوجته بالمعروف، وهو من أو كد حقها عليه، أعظم من إطعامها ، والوطء الواجب قيل: إنه واجب في كل أربعة أشهر مرة ، وقيل : بقدر حاجتها وقدرته كما يطعمها بقدر حاجتها وقدرته، وهذا أصح القولين
স্ত্রীর সঙ্গে ভালোভাবে সংগমে লিপ্ত হওয়া ওয়াজিব। এটা স্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ অধিকার এবং ভরণপোষণের অন্যতম অংশ। কেউ কেউ বলেছেন, চার মাসে একবার ওয়াজিব। কারও কারও মতে এ ক্ষেত্রে ভরণপোষণের অন্যান্য বিষয়ের মতো স্ত্রীর প্রয়োজন ও স্বামীর সক্ষমতাই মূল বিবেচ্য বিষয়। আর এটাই বিশুদ্ধ মত। [৪]
একজন আরেকজনের শারীরিক চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করলে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা বাড়ে, যৌবনের আনন্দটা সম্পূর্ণরূপে ভোগ করা সম্ভব হয়। চাহিদা না মিটলে নারীদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যেতে থাকে, স্বামীর প্রতি বেখায়াল হতে থাকে। আর এটা খুবই স্বাভাবিক; কারণ তার অধিকার ঠিকমতো আদায় হচ্ছে না। তাই স্ত্রীর চাহিদা বোঝা দরকার। দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে খুনসুটি, রোমান্স, খেলা, মিলিত হওয়া, কৌতুক করা, শিশুসুলভ মজা করা ইত্যাদি থাকা দরকার। এ ছাড়া দ্বীনদার বিবাহিতদের থেকে এসব বিষয়ে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে, তবে খেয়াল রাখতে হবে, নিজের গোপনীয়তা যাতে রক্ষিত থাকে।
টিকাঃ
[৩] সহীহ বুখারী- ৫০৭৯; সহীহ মুসলিম- ১৯২৮; মুসনাদে আহমাদ- ১৩১১৭
[৪] মাজমু'উল ফাতাওয়া- ৩২/২৭১
📄 স্ত্রীর মানসিক চাহিদা পূরণ
একজন স্বামী এবং স্ত্রীর মাঝের সম্পর্কটা হয় সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। আর এই ঘনিষ্ঠতা বাড়ে অন্তরের গহিনে লুকিয়ে থাকা কথাগুলো প্রকাশের মাধ্যমে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরা অন্তরে অনেক কথা তাদের স্বামীর জন্য জমিয়ে রাখে। দম্পতির মাঝে কথাবার্তা যত বেশি হয়, মানসিক দূরত্ব ততই কমতে থাকে। এ কারণেই বিয়ের পরপরই স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকা একদমই অনুচিত। স্বামী-স্ত্রীর জন্য এই মোক্ষম সময় কোনোমতেই নষ্ট করা ঠিক হবে না। এই সময়টাতে একে অপর থেকে অনেক কিছু চাওয়া ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিষয় থাকে।
ওমেন'স সাইকোলজি সার্ভেতে নারীদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, বিবাহ তাদের জন্য প্রয়োজনীয় কি না? সেখানে যারাই বলেছেন একাকিত্ব দূরীকরণের জন্য বিয়ে করতে চায় তাদের মাঝে অধিকাংশই বলেছেন যে, তাদের কথা বলার মানুষ নেই, এই অভাবই তাদের জন্য একাকিত্বের কারণ। স্ত্রীদের অন্যতম মানসিক চাহিদা হচ্ছে তাদের স্বামীদের থেকে তারা একটা Quality Time চায়। তারা চায় স্বামীর সাথে সারাদিনের ঘটনা বলবে, পূর্বের অবিবাহিত জীবনের গল্প করবে ইত্যাদি। এসব কথাবার্তার মাঝে অনেক কথাই একজন পুরুষের কাছে অযথা বকবকানি বা 'ফাও প্যাচাল' মনে হতে পারে, অথচ তাদের কাছে এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা! নারীদের ফিতরাতই এমন যে, তারা তাদের স্বামীদের সাথে গপসপ করতে ভালোবাসে এবং এর মাধ্যমেই তারা খুব সহজে ঘনিষ্ঠ হয়। তাই স্ত্রীর জন্য একটা সময় নির্ধারণ করতে হবে, যে করেই হোক। শত ব্যস্ততা থাকলেও এটি করতে হবে তার মানসিক প্রশান্তির জন্য। এটা তার হক। আল্লাহ কুরআনে বলেন,
وَلَقَدْ اَرْسَلْنَا رُسُلًا مِّنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةٌ وَمَا كَانَ لِرَسُوْلٍ أَنْ يَأْتِيَ بِقَايَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ لِكُلِّ أَجَلٍ كِتَابُ ﴾
আর অবশ্যই তোমার পূর্বে আমি রাসূলদের প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি। আর কোনো রাসূলের জন্য এটা সম্ভব নয় যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো নিদর্শন নিয়ে আসবে। প্রতিটি সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য রয়েছে লিপিবদ্ধ বিধান।[৫]
প্রত্যেক নবী-রাসূলই বিশাল দায়িত্ব নিয়ে তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট প্রেরিত হয়েছে। আল্লাহর দেওয়া বিধিনিষেধ পালন করা ও অপরকে তা ব্যক্ত করা, দা'ওয়াতি কাজের কঠিন পথ পাড়ি দেয়া, রিসালাতের দায়িত্ব পালন করা; একজন নবীর কতই-না দায়িত্ব, কতই-না ব্যস্ততা। এতৎসত্ত্বেও আল্লাহ তাঁদেরকে স্ত্রী ও সন্তান দান করেছেন এবং তাঁরা তাঁদের স্ত্রী ও সন্তানদের হক আদায়ও করেছেন। এ ছিল আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের জন্য বার্তা যে, নবী-রাসূলগণ এত ব্যস্ততার পরেও তাদের পরিবারকে ভুলে যাননি, সেখানে আমাদের ব্যস্ততার অজুহাত খুবই দুর্বল।
রাসূল প্রতিদিন ফজরের পরে একটা সময় তাঁর সকল স্ত্রীর জন্য রাখতেন। এই সময়টা তিনি তাঁদের সাথে কথা বলতেন, বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করার ছলে শেখাতেন, তাঁদের জন্য দু'আ করতেন। কিন্তু আজকাল সকালের নাস্তা সেরেই আমরা অফিসের পানে ছুটি। আর দিন শেষে বাসায় ফিরেই সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে কে কী গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট (!) করল তা দেখতে মোবাইল বা ল্যাপটপ নিয়ে বসে যাই। সেসব পোস্টে লাইক-কমেন্ট করা যেন আমাদের এক গুরুদায়িত্ব! অথচ স্ত্রী এদিকে ছটফট করতে তাকে কয়েকটা কথা বলার জন্য। এটাকে সে নিজের প্রতি অবহেলা হিসেবে নেয়। তাই এমনটি করা মোটেও উচিত না। ফ্রি কিছু সময় রাখুন আপন স্ত্রীর জন্য। প্রয়োজনে দূরে কোথাও বেড়াতে যান, দূর্বাঘাসের ওপর বসে লম্বা গল্প করুন, দুইজনের জন্য দুইটা আইস্ক্রিম নিন, আশেপাশে নির্জন থাকলে তাকে খাইয়ে দিন; নারীরা এসব পছন্দ করে। নিজেকে খুব দামি মনে করে। মানসিক প্রশান্তির খোরাক মিলে। যখন তার সাথে কথা বলবেন তখন ফোন, ল্যাপটপ ইত্যাদি কোনো কিছুর ধারেকাছেও যাওয়া যাবে না। পূর্ণ মনোযোগ তাকে দিন। হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে আপনার, তাহলে মনে রাখতে হবে তাকে এই সময় দেয়াটাও আপনার জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এর মাধ্যমে আল্লাহ সওয়াবও প্রদান করবেন। স্ত্রীরা চায় স্বামী তার মন বুঝবে, স্ত্রীকে সুন্দর সুন্দর নামে ডাকবে, স্ত্রীর সাথে জীবনে ঘটে যাওয়া সব গল্পের ঝুড়ি মেলে ধরবে। মাঝে মাঝে নিজে বোকা সেজে স্ত্রীর হাতে কর্তৃত্ব দিতে হবে। স্ত্রীকে যে সে ভালোবাসে সেটা বিনা দ্বিধায় প্রকাশ করবে, এতে লজ্জার কিছু নেই। স্ত্রীর এঁটো খাওয়া অনেক স্বামীর নিকট অপছন্দনীয়। কিন্তু শরী'আতে তা স্বীকৃত। রাসূল পান-পাত্রের ঠিক সেই স্থানে মুখ রেখে পানি পান করতেন, যে স্থানে হযরত আয়েশা মুখ লাগিয়ে পূর্বে পান করেছেন। যে টুকরো থেকে হযরত আয়েশা গোশত ছাড়িয়ে খেতেন, সেই টুকরো নিয়েই ঠিক সেই জায়গাতেই মুখ রেখে আল্লাহর নবী গোশত ছাড়িয়ে খেতেন।[৬] ঘর থেকে বের হওয়ার সময়, ঘরে ফেরার পর এবং দিনে-রাতে মাঝে মাঝেই স্ত্রীকে আলিঙ্গন করা, আদর করা, চুমু দেয়া এসব স্ত্রীরা পছন্দ করে। স্ত্রীর দিকে তাকানো, স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে দেয়া সওয়াবের কাজ।
এ ছাড়া দ্বীনি বা দুনিয়াবী ব্যাপারে স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করা সুন্নাহ। আল্লাহর রাসূল হুদাইবিয়াহ চুক্তির সময় তাঁর স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করেছিলেন। এ ছাড়া স্ত্রীর যাবতীয় কাজে হাত লাগানো ও সন্তান পালনের প্রতি পুরুষদের মাঝে মাঝে আগ্রহ দেখানো উচিত। এতে স্ত্রীর মন স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রেমে আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে। রাসূল -ও সংসারের কাজ করতেন। স্ত্রীকে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে (যেমন: ঈদ, কুরবানী প্রভৃতিতে) ছোটখাটো উপহার দিলে স্ত্রী আনন্দিত হয়। এতে স্ত্রীর হৃদয় চিরবন্দী হয় স্বামীর হৃদয় কারাগারে। তার সাথে হাসি-তামাশা করা, সব সময় পৌরুষ মেজাজ না রেখে মাঝে মাঝে তার সাথে বৈধ খেলা করা যেতে পারে। স্বামীরও উচিত, স্ত্রীকে খুশি করার জন্য সাজগোজ করা। যাতে তার নজরও অন্য কোনো পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট না হয়।
টিকাঃ
[৫] সূরা রাদ- ৩৮
[৬] আদাবুয যিফাফ, পৃষ্ঠা- ২৭৭