📄 বিয়ে নিয়ে ফ্যান্টাসি
একজন পুরুষের মাঝে বিয়ে নিয়ে ফ্যান্টাসি থাকবে নাকি না এ বিষয়ে আমাদের দ্বীনদার সমাজে দুইটি প্রান্তিক মত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করে থাকেন বিয়ে নিয়ে কোনো ফ্যান্টাসিই রাখা উচিত না, বিয়ের পরের জীবন অনেক কঠিন, অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ইত্যাদি। আবার অনেকে বিয়ে নিয়ে এত বেশি চিন্তা করতে থাকেন যে-উঠতে, বসতে, খেতে, শুতে তাদের মুখে কেবল 'বিয়ে' শব্দটাই লেগে থাকে।
বস্তুত বিয়ে নিয়ে ফ্যান্টাসি একদম মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে কাঠখোট্টা হয়ে পড়ে থাকা যেমন উচিত নয়, ঠিক তেমনি বিয়ে নিয়ে অতিরিক্ত ফ্যান্টাসি থেকেও নিজের নফসকে বিরত রাখতে হবে।
মানুষের আবেগ থাকে, জৈবিক চাহিদা থাকে। আর যৌবনের সময়ে সেই আকাঙ্ক্ষা আরও প্রগাঢ় হতে থাকে, বিশেষত পুরুষদের। তাই বিয়ে নিয়ে ফ্যান্টাসি থাকবেই, এটা খুবই স্বাভাবিক মানবীয় গুণ। একে পুরোপুরি অস্বীকার করা বোকামি। এতে পরবর্তীকালে দাম্পত্য জীবনের সুখ থেকে নিজেকে যেমন বঞ্চিত হতে হয় ঠিক তেমনি জীবনসঙ্গীরও হক নষ্ট হয়। আবার অধিক ফ্যান্টাসিতে ভোগাও ঠিক নয়। এতে আমল, ইবাদাতের মাঝেও বিয়ের কথা চিন্তায় আসে, ফলে আমলের স্বাদ নষ্ট হয় এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে পাপে জড়িয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। যেমন: হস্তমৈথুন, পর্নোগ্রাফি, রাস্তাঘাটে নজরের খিয়ানত, কোনো দ্বীনদার মেয়েকে দেখলেই ভালো লেগে যাওয়া, তার সাথে যোগাযোগের ইচ্ছা হওয়া ইত্যাদি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কোনো মেয়েকে এতটাই ভালো লেগে যায় যে, তার সাথে যোগাযোগ হয়ে যায়। একটা সময় শয়তানের নিখাদ প্ররোচনায় পড়ে সম্পর্ক গভীরে যেতে থাকে। অনেকেই বিয়ের জন্য আগাতে চায়। কিন্তু পরিবার মানতে চায় না। ফলে উপায়ান্তর না পেয়ে কেউ কেউ বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতেই বিয়ে করে ফেলে! পরবর্তীকালে তা অনেক ঝামেলার কারণও হয়ে দাঁড়ায়। আবার এমনও হয়ে থাকে যে, হবু উত্তম অর্ধেককে নিয়ে ভাবতে ভাবতে আর তার সাথে বিয়ের পর কীভাবে কীভাবে সময়গুলো কাটাবে এগুলো চিন্তা করতে করতে বিয়ে-পরবর্তী যেই কঠিন দায়িত্ব স্বামীর কাঁধে এসে চেপে বসে সে সম্পর্কে অনেকে একদম বেমালুম থেকে যায়। বিয়ের মাধ্যমে জীবনে কেবল একজন নতুন মানুষের আগমনই ঘটে বিষয়টা এমন নয়, বরং বিয়ের মাধ্যমে পুরো জীবনটাই বদলে যায়। দায়িত্ব বাড়ে, ঘর বদলে যায়, বদলে যায় আপন ঘরের মানুষদের আচরণও। তাই সেই দিক থেকে প্রস্তুতিরও প্রয়োজন রয়েছে।
কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রেই এই বিষয়গুলো নিয়ে তেমন একটা চিন্তাভাবনা না থাকার ফলে এবং অপ্রস্তুতির কারণে স্ত্রীর সাথে সহাবস্থানের সময় অনেকের জীবন ওলটপালট হয়ে যেতে দেখা যায়। বিষয়টা তার জন্য হয়ে যায় আকস্মিক। তাই এজন্য বলা হচ্ছে, হবু উত্তম অর্ধেককে নিয়ে সীমার মধ্যে থেকে চিন্তা করা যেতেই পারে, কিন্তু সেই সাথে জীবনে আসন্ন পরিবর্তনটাকে গ্রহণ করার মানসিকতা ও পূর্বপ্রস্তুতিও রাখা জরুরি। আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেদের আবেগের লাগাম নিজেদের হাতে রাখা এবং এসব ক্ষেত্রে আবেগের ওপর বিবেককে প্রাধান্য দেয়া।
অপরপক্ষে এটাও মাথায় রাখা জরুরি যে, নিজেকে ফ্যান্টাসি থেকে বিরত রাখতে গিয়ে অন্তর যাতে অধিক শক্তও না হয়ে যায়। বিয়ে নিয়ে অনেকের ধারণা এমন যে, বিয়ে-পরবর্তী জীবন অনেক কঠিন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় তারা তাদের কোনো নিকট আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী বা অনলাইনের পরিচিত কারও বৈবাহিক অবস্থার শোচনীয়তা দেখে এমন চিন্তা-ভাবনায় প্রভাবিত হয়েছে। অথচ আল্লাহ্ সকলের তাক্বদীর একইভাবে লিখেননি। এ রকম মানসিক অবস্থার কারণে তাদের মাঝে বিয়ে সম্পর্কে একটা বিতৃষ্ণার জন্ম নেয়। ফলে ধারণা থেকে জন্ম নেয়া সেই বিতৃষ্ণা প্রতিফলিত হয় তার নিজেরও বৈবাহিক জীবনে। এই কারণেই এ রকম চিন্তাভাবনা থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন, যদিও পুরুষদের ক্ষেত্রে এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কম থাকে।
📄 পাত্রীর সতীত্ব জিজ্ঞাসা
পাত্রী নির্বাচন কোনো ছেলেখেলা নয়। এই সিদ্ধান্তের ওপর পুরো জীবন এমনকি দ্বীনের অর্ধেক নির্ভর করছে। তাই পাত্রীর দ্বীনদারি ও অন্যান্য দিকগুলো পুরুষদের ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। এ ক্ষেত্রে এতিম, বয়সে বড় যার বিয়ে হচ্ছে না, নওমুসলিম, বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা নারী বিয়েতে বোনাস সওয়াব আছে সেটাও মাথায় রাখা যেতে পারে।
বিয়ের পর্বেই কার সাথে বিয়ে হচ্ছে, তার চিন্তাধারা কী এসব জেনে নেয়া খুব জরুরি। নাহলে বিয়ের পর মতের অমিলের কারণে সংসার ভাঙন পর্যন্ত হতে পারে। তাই পাত্রীকে ঘটকের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কিছু প্রশ্ন আগ থেকেই করে রাখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ঘটকালির কাজে নিয়োজিত পরিচিত কোনো দ্বীনি দম্পতিকে ভরসা করাই উত্তম, যারা আল্লাহকে খুশি করার উদ্দেশ্যে উভয় পক্ষের কথা ভেবেই ঘটকালি করবে-একপাক্ষিক হয়ে কোনো কিছু গোপন রাখবে না বা অতিরঞ্জিত করে উপস্থাপন করবে না।
এ ছাড়া সরাসরি পাত্রী দেখার সময় জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে যে, তিনি কীভাবে দ্বীনে ফিরলেন, দ্বীনের পথে যাত্রা কবে থেকে, কার থেকে দ্বীন শিখেছেন, কোন কোন আলেমের বই পড়ছেন বা লেকচার শুনেছেন, কোথায় ইলম অর্জন করছেন কোথাও কোর্স করছেন কি না ইত্যাদি। এসব তথ্যের মাধ্যমে পাত্রীর আক্বীদাহ-মানহাজ জেনে নেয়া সহজ হবে। এ ছাড়া দ্বীনদারির পাশাপাশি দুনিয়াবি পড়াশোনাটাও দেখা যেতে পারে। এতে তার মাধ্যমে কী কী সম্ভাবনা রয়েছে তা জেনে নেয়া যাবে। সন্তান লালনের ক্ষেত্রে মায়ের বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
আবার কিছু প্রশ্ন পাত্রীদেরকে না করাই উত্তম। যেমন: পূর্বে কোনো হারাম কাজ বা সম্পর্কে লিপ্ত ছিল কি না, এমন প্রশ্ন না করাই উত্তম যেহেতু আল্লাহ গুনাহ গোপন রাখতে বলেছেন। তবে এমন কিছু যদি একান্তই জানা উচিত বলে মনে হয় বা কারও জন্য যদি জেনে নেয়া খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে, তাহলে বিয়ের আগেই বিষয়গুলো জেনে নেয়া উচিত। যাতে বিয়ে-পরবর্তী কোনো সমস্যায় পড়তে না হয়। এ ছাড়া, বহুবিবাহের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা না করাই ভালো। অনেকেই বিয়ে একটাও না করেই মাসনা, সুলাসা, রুবায়া নিয়ে দিন-রাত চিন্তায় নিমগ্ন থাকে। নিঃসন্দেহে এটি নেতিবাচক চিন্তাধারা। একটি বিয়ে করে যদি ধকল সামলানো যায়, ওই ব্যক্তি আর্থিক, মানসিক, শারীরিক দিক থেকে সক্ষম হয় তবে ভিন্ন কথা। কিন্তু অধিকাংশ পুরুষ ফ্যান্টাসিতে ভুগে এসব চিন্তাভাবনা করে এবং একেই দ্বীনের বড়সড় কোনো মানদণ্ড মনে করে। কোনো মেয়েই এটা চাইবে না যে, তার স্বামী একাধিক বিয়ে করুক। চাইবে না তার স্বামীকে অন্য কারও সাথে ভাগাভাগি করতে। তাই বেশির ভাগ পাত্রীর থেকে নেতিবাচক উত্তর পাওয়ারই সম্ভাবনা অধিক। যদি ভাগ্যক্রমে সেই পাত্রীর সাথে বিয়ে হয়ে যায়, তাহলে পরবর্তীকালে এই প্রশ্নের জন্য স্বামীর প্রতি তার মাঝে শুধু শুধু একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়ে থাকবে। আর স্বামীর প্রতি স্বাভাবিক ঈর্ষা থাকা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এটা ঠিক যে, এই বিধানকে কেউ যদি খাটো করে দেখে, যদি নারীদের জন্য একে বোঝা মনে করে, এই সময় বা অঞ্চলের জন্য বেখাপ্পা বিধান মনে করে, তাহলে সে দ্বীন বুঝেনি, তার পর্দা কেবল কিছু কাপড়মাত্র, আর তার সালাত কিছু অঙ্গের নড়চড় ব্যতীত কিছু না।
স্বামী-স্ত্রীর পরিবার, বংশমর্যাদা, সামাজিক অবস্থানের সাম্য তথা কুফু মেলানো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এ ছাড়া দ্বীনের ব্যাপারে পাত্রীর পরিবারের অবস্থান কেমন সেটাও জেনে নেয়া জরুরি। এদিকে একপক্ষের ধারণা পাত্রী দ্বীনদার হলেই হলো, পরিবার একদমই দেখার প্রয়োজন নেই। অপরপক্ষের কথা হচ্ছে, পাত্রীর পরিবার দ্বীনদার হতেই হবে। কিন্তু আমাদেরকে এই সত্যটুক মেনে নিতে হবে যে, আমরা একটা জাহেল সমাজে বাস করি যেখানে এক পরিবারের সকলে সমান দ্বীনদার হওয়া খুবই বিরল। তবে পাত্রীর ওপর তার পরিবারের প্রভাব কেমন সেটা জেনে নেওয়া উচিত। স্ত্রী যদি বিয়ের পর স্বামীর দ্বারা অধিক প্রভাবিত হয়, তাহলে সমস্যা নেই। দ্বীনদার হলেও আনুগত্য যদি তার পরিবারের প্রতি অধিক হয়, তাহলে এটা ভবিষ্যতে বহু সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। দেনমোহর, যৌতুক, বিয়ের অনুষ্ঠান ইত্যাদি ক্ষেত্রে পাত্রী কি পরিবারের সিদ্ধান্তের ওপরে গিয়ে শরী'আতের কথা বলবে নাকি জাহালতই মেনে নেবে এসব জেনে নেয়া জরুরি। সব মিলিয়ে একজন পাত্রীকে যেসমস্ত প্রশ্ন করা যেতে পারে:
* দুরূহ অবস্থাতেও সালাত আদায় করে কি না, সার্বিক অবস্থায় পর্দা রক্ষা করে কি না ইত্যাদি। এতে দ্বীনের প্রতি তার অটলতা বোঝা যাবে。
* বিয়ের ক্ষেত্রে আক্বীদা, মাযহাবের মিল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। তাই বাড়াবাড়ি না করে এই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে। মাজহাবের ভিন্নতা অনেকের জন্য অত বড় সমস্যা তৈরি করে না। আবার অনেকের জন্য এটা অনেক বড় একটি ইস্যু। ব্যক্তিভেদে প্রশ্নের প্রতিমান নির্ভর করে। তবে এসব ক্ষেত্রে উগ্রতা না থাকাই ভালো। এ ছাড়া এও মাথায় রাখা দরকার যে, পুরুষেরা যেমন আলেমদের কাছে গিয়ে সহজেই ইলম অর্জন করতে পারে, বেদ্বীন পরিবারে বেড়েওঠা একজন নারীর ক্ষেত্রে এমনটি সাধারণত সম্ভব হয় না। সুষ্ঠু নির্দেশনার অভাবে দ্বীনের জ্ঞান আহরণের উৎস তার ক্ষেত্রে বিক্ষিপ্ত হতেই পারে। তাই এ ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেয়া উচিত。
* সব ক্ষেত্রে স্বামীর আনুগত্য করবে কি না। না করলে কোন কোন ক্ষেত্রে করবে না এবং কেন। এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ。
* পাত্রীর কাছে বিয়ের উদ্দেশ্য কী এ ব্যাপারে ধারণা নেওয়া যেতে পারে。
* 'চাকরি করতে চায় কি না' এই প্রশ্ন দরকার। কারও মাঝে যদি এই চিন্তাধারা থেকে থাকে তবে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলা যে, ক্যারিয়ার থেকে টাকা পাওয়া যায় কিন্তু পরিবার থেকে পাওয়া যায় সুখ। ক্যারিয়ার সারা জীবন থাকবে না, কিন্তু পরিবার থাকবে। অথবা, তার খেদমত বা কাজ দ্বীনি কোনো খাতে ব্যয় করা। টাকা উপার্জনের চেয়ে দ্বীনের খেদমতের ব্যাপারে তাকে আগ্রহী করে তোলা যেতে পারে। এসবে না মানলে পরিবারের হক ঠিক রেখে, পরিপূর্ণ পর্দার সাথে ঘরে থেকে অনলাইন ব্যবসার প্রতি উৎসাহ দেয়া যেতে পারে-যদি পাত্র এদিক থেকে কিছু ছাড় দিতে চায়。
* যে রান্নায় ভালো সে ঘর-সংসার সামলানোতেও ভালো। তাই রান্না পারে কি না সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে। তবে রান্না খারাপ হলেও সেটা বড় কোনো সমস্যার কারণ না। কেননা, এটি কেবল অনুশীলনের বিষয়。
* স্ত্রীর পরিবারের সামাজিক অবস্থান স্বামীর পরিবারের চেয়ে কম হলে তেমন সমস্যা নেই। কিন্তু উল্টোটা হলে সমস্যা হতে পারে। তাই অন্তত স্বামীর পরিবারের সামাজিক অবস্থা স্ত্রীর পরিবারের বরাবর হতে হবে。
* পাত্রীর বাবার বাড়ি-গাড়ি আছে কি না এটা জানা জরুরি না। কারণ, নিশ্চয় একজন দ্বীনদার আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন পুরুষ স্ত্রীর বাবার টাকায় চলতে চাইবে না。
* মোহর কত নির্ধারণ করতে চায় সে সম্পর্কে ধারণা নেয়া。
* বিভিন্ন শখের কথা জানতে চাওয়া ও নিজেরটাও বলা যেতে পারে。
* কোনো বিশেষ এলাকা বা অঞ্চলে থাকতে চায় কি না সে ব্যাপারে জানতে চাওয়া。
* আয় সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। আয়ের টাকা নিয়ে জীবনযাপন করতে পারবে কি না তা স্পষ্টভাবে জেনে নেওয়া。
* সন্তান নেবে কখন, সন্তান-লালন নিয়ে তার চিন্তাধারা কেমন。
* শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে একই ছাদের নিচে বসবাস করবে কি না。
* পাত্রীর পরিবার থেকে মোহর নিয়ে বাড়াবাড়ি, যৌতুক, বিয়ের অনুষ্ঠানে কোনোপ্রকার অনৈসলামিক কার্য সম্পাদিত হবে কি না ইত্যাদি, এ ক্ষেত্রে পাত্রী কতটুকু শক্ত থাকতে পারবে এ সম্পর্কে জানতে চাওয়া。
📄 স্ত্রীরা স্বামীদের মাঝে কী চায়?
স্ত্রী হিসেবে একজন নারী তার স্বামী থেকে কী আশা করে? কোন কোন বৈশিষ্ট্য একজন পুরুষকে স্ত্রীর কাছে উত্তম স্বামী করে তোলে? এমন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া হয়েছিল ওমেন'স সাইকোলজি সার্ভের অংশগ্রহণকারী বোনদের কাছে। এটা তাদের কাছে এজন্য জানতে চাওয়া হয়েছে যাতে পুরুষেরা দ্বীনদার নারীদের মনস্তত্ত্ব বুঝে নিজের অর্ধাঙ্গিনীর চাওয়া অনুসারে নিজেকে সেভাবে গুছিয়ে নিতে পারে। পুরুষদেরকে আমরা যখন এমন প্রশ্ন করেছিলাম তখন অধিকাংশই জানিয়েছিল যে, তাদের স্ত্রীদের মাঝে দ্বীনদারির পাশাপাশি আবেদনময়িতা, সৌন্দর্য, ডাকে সাড়া দেয়া ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য দেখতে চায়। অর্থাৎ, পুরুষদের চাওয়া-পাওয়াটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জৈবিক ও শারীরবৃত্তীয়। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ করা গিয়েছে। তাদের উত্তর ও মন্তব্যগুলোতে তারা উত্তম স্বামীর বৈশিষ্ট্য বলতে গিয়ে বহুমুখী শব্দ ব্যবহার করেছে। অনেকে একাধিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন (অনুমান-নির্ভর) সংখ্যার ভিত্তিতে গুণগুলো সাজানো হয়েছে।
১. দ্বীনদারি, ২. সুন্নাতি লেবাস, ৩. দাড়ি, ৪. ব্যক্তিত্ব বা স্ট্রং পার্সোনালিটি, ৫. ইসলামী ইলম/জ্ঞান, ৬. ম্যাচুয়ারিটি, ৭. ছোট ছোট বিষয়ে কেয়ারিং, ৮. আখলাক, ৯. আর্থিক সচ্ছলতা, ১০. সুন্দর লেখনী বা দা'ওয়াতি মনোবল, ১১. সাহস, ১২. স্ত্রীর প্রতি গাইরাত, ১৩. উচ্চতা ও ফিটনেস, ১৪. বুদ্ধিমত্তা, ১৫. চেহারা, ১৬. পরিবার/স্ট্যাটাস, ১৭. তিলাওয়াত, ১৮. সৌন্দর্য, ১৯. বাচনভঙ্গি, ২০. সর্বদা হাসিমুখ, ২১. পশুপাখির প্রতি দরদ আছে এমন; ইত্যাদি।
* অধিকাংশ দ্বীনি নারীর বিয়ের উদ্দেশ্যই থাকে দ্বীন। কাজেই তারা দ্বীনের বুঝসম্পন্ন একজন পুরুষকেই নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। সে চায় তার স্বামী তাকে দ্বীনের শিক্ষা দেবে, সকল ফিতনা থেকে তাকে আগলে রাখবে, দ্বীনের দা'ওয়াতের কাজে এবং ঈমান ও আমলের পথে একে অপরের সাথি হবে। স্ত্রীকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করাও পুরুষের এক বড় দায়িত্ব। স্ত্রীকে দ্বীন, আক্বীদা, পবিত্রতা, ইবাদাত, হারাম-হালাল, অধিকার, আখলাক প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে এবং সৎকাজ করতে আদেশ ও অসৎকাজে বাধা প্রদানের মাধ্যমে আল্লাহর আযাব থেকে রেহাই পেতে সহায়তা করবে। বিপদ-আপদ থেকে স্বামী তাকে রক্ষা করবে。
* পুরুষদের জন্য ব্যক্তিত্ব অনেক দামি একটি বৈশিষ্ট্য। ব্যক্তিত্বহীন পুরুষ পদে পদে লজ্জিত হয়, আত্মসম্মানবোধ কমে যায়। এমন পুরুষদের স্ত্রী-সন্তানেরা বেহায়া ও বেয়াদব হয়ে যায়। পরিপক্কতা, বাচনভঙ্গি, আচরণ, সাহস, গাইরাত সবই এই ব্যক্তিত্বের অন্তর্গত বিষয়। স্ত্রীর দ্বীন, দেহ, যৌবন ও মর্যাদায় ঈর্ষাবান হওয়া এবং এসবে কোনোপ্রকার কলঙ্ক লাগতে না দেওয়া স্বামীর ওপর স্ত্রীর অন্যতম অধিকার। স্ত্রী চায় তার স্বামী কাপুরুষ হবে না; সাহসী প্রতিবাদী হবে। স্ত্রী বিপদে পড়লে পলায়ন না করে বিক্রমের সাথে রক্ষা করবে। স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদেরকে রক্ষা করতে গিয়ে যদি স্বামী শত্রুর হাতে মারা পড়ে, তবে সে শহীদের মর্যাদা পাবে。[১]
পক্ষান্তরে সন্দেহপ্রবণতা পুরুষদের জন্য একটি রোগের মতোই। অনেক পুরুষ স্ত্রীদেরকে কথায় কথায় সন্দেহ করে। এটি একদমই অনুচিত। স্ত্রীর প্রতি যতটুকু সম্ভব সুধারণা রাখতে হবে। এমনকি স্ত্রীর সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমের কোনো ম্যাসেজ তার অনুমতি ছাড়া দেখারও কোনো দরকার নেই। কারণ, অন্য কোনো নারীর সাথে তার ব্যক্তিগত কথাও থাকতে পারে। যদি স্ত্রী নিজে পূর্ব থেকেই অনুমতি দিয়ে রাখে তাহলে ভিন্ন কথা। তবে যদি প্রবল ধারণা হয় যে, স্ত্রী পরকীয়া বা সন্দেহমূলক কোনো কাজ করছে, তাহলে মুরুব্বী, আলেম ও বিচক্ষণ দ্বীনি ভাইদের উপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে。
* একজন নারী চায় তার স্বামী তার কথা ভাববে, তার যত্ন নেবে, তার সাথে সাথে খুনসুটি করবে, স্ত্রীর সামনে নিজেকে আকর্ষণীয় করে রাখবে, স্ত্রীর নিকট তার মাতৃ-আলয়ের প্রশংসা করবে ইত্যাদি। স্ত্রীকে খুশি রাখার অন্যতম একটি উপায় হলো তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। তাই সংসার কিংবা অন্য যেকোনো বিষয়ে সে কোনো কথা বললে তা মন দিয়ে শুনুন। এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নারীরা কখনোই তার পরিবার বা প্রিয় মানুষদের সম্পর্কে কোনো রকম সমালোচনা সহ্য করতে পারেন না। তাই স্ত্রীর সামনে আপনজনদের সম্পর্কে সমালোচনা করবেন না। সময়মতো তাকে তার বাবার বাড়িতে যাওয়া-আসা করতে দিন। স্ত্রী ভালো খাবার তৈরি করলে, সাজগোজ করলে বা কোনো ভালো কাজ করলে তার প্রশংসা করবে স্বামী। এমনকি স্ত্রীর হৃদয়কে লুটে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ইসলাম সামান্য কৌশল করে মিথ্যা বলাকেও বৈধ করেছে। তবে যে মিথ্যা তার অধিকার হরণ করে ও তাকে ধোঁকা দেয়, সে মিথ্যা নয়। তার উপস্থিতিতে কখনো তৃতীয় ব্যক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয়া যাবে না। কোনো পুরোনো বন্ধু বা পরিচিত কেউ সামনে থাকলেও স্ত্রীর গুরুত্বের স্থানটা ঠিক রাখুন। স্ত্রীর প্রশংসা করতে হবে। স্ত্রীর সামনে অন্য কোনো নারী; যেমন: নিজের অন্য স্ত্রী, বন্ধুর স্ত্রী বা অন্য কোনো দ্বীনি বোনের প্রশংসা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ফুল ও উপহার পছন্দ করে সবাই। স্ত্রীর মন জয় করতে মাঝে মাঝে তাকে ফুল ও ছোট ছোট উপহার দেয়া যেতে পারে। এতে সে খুশি হবে。
* একজন নারী চাইবে তার স্বামী আর্থিকভাবে সচ্ছল হোক। এটা তার নিরাপত্তা এবং এমন চাওয়াটা দূষণীয় নয়। সে চায় স্বামী তার স্ত্রীর যথাযথ ভরণ-পোষণ করবে, সন্তানদের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে নাছোড়বান্দা হবে, প্রয়োজনে সর্বদা পাশে থাকবে。
* পুরুষদের সৌন্দর্য, শারীরিক গঠন একজন নারীর জন্য অতটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও একজন পুরুষের উচিত নিজেকে পরিপাটি রাখা, চেহারা ও স্বাস্থ্যের যত্ন নেয়া। দিন শেষে একজন পুরুষ তো তার স্ত্রীরই সম্পদ। পারিবারিক শান্তির জন্য স্ত্রীর মনোরঞ্জন অপরিহার্য। রাসূল আপন স্ত্রীদের সঙ্গে বিনোদনমূলক আচরণ করেছেন যা আমরা হাদীস থেকে জানতে পারি。
◇ ঘরের কাজ ও সন্তান পরিচর্যায় স্ত্রীকে সহযোগিতা করুন। সারাদিন কাজ করে এসে ঘরের কাজ করতে আপনার ইচ্ছা করবে না এটাই স্বাভাবিক। তবুও কিছু জিনিস তাকে এগিয়ে দিন, সাধারণ কাজগুলোতে একটু হাত লাগান। এটাই তার জন্য যথেষ্ট。
* স্ত্রীর নিকট সত্যবাদী হোন। কারণ, কোনো গৃহকর্ত্রী মিথ্যা বলা পছন্দ করেন না। তবে তার প্রশংসার ক্ষেত্রে বাঁধ রাখবেন না, যেহেতু সে ক্ষেত্রে কিছু মিথ্যা হলেও সমস্যা নেই。
টিকাঃ
[১] মিশকাতুল মাসাবীহ- ৩৫২৯; সুনানে আবু দাউদ- ৪৭৭২; সুনানে নাসাঈ- ৪০৯৫; সুনানে তিরমিযী- ১৪২১; মুসনাদে আহমাদ- ১৬৫২: হাদিসটির সনদ সহীহ।
📄 যে বিষয়গুলো স্ত্রীরা অপছন্দ করে
ওমেন'স সাইকোলজি সার্ভে মোতাবেক নারীরা দায়িত্বহীনতা, স্ত্রীর প্রতি গুরুত্বহীনতা, সবকিছুকে মজার ছলে নেওয়া, বদমেজাজ, স্ত্রীকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, স্ত্রীর পরিবারের প্রতি বিরূপ মানসিকতা, সাংসারিক বিভিন্ন কাজে স্ত্রীর সাথে পরামর্শ না করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া, স্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া, সাংসারিক সকল কাজ স্ত্রীকে দিয়েই করানো, স্ত্রীর প্রতি রোমান্টিক না হওয়া, নিজের স্ত্রীর সাথে অন্য নারীর তুলনা করা, সন্দেহপ্রবণতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলো একজন স্ত্রী তার স্বামীর মাঝে দেখতে চায় না।
এ ছাড়া আমরা সার্ভেটিতে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, সহবাসের সময় স্বামীর কোন কোন কাজ স্ত্রীরা অপছন্দ করে। এই প্রশ্নে বিবাহিতা বোনদের উত্তরগুলো নিয়ে আমাদের চিন্তা করা উচিত।
* অনেক দ্বীনদার পুরুষও হারামের প্রতি মোহগ্রস্ত। পূর্বের জাহিলিয়াতপূর্ণ জীবনের হাতছানি অনেকেই বিয়ের পরেও ভুলতে পারে না, এটাই প্রমাণিত হয় বোনদের উত্তর থেকে। জানা গিয়েছে, অনেকে তাদের স্ত্রীদেরকে হারাম বা অপছন্দনীয় কাজগুলো করতে জোর-জবরদস্তি করে। অধিকাংশই মুখমেহন (Oral Sex) এর কথা বলেছেন। এ ছাড়া জোর করে পায়ুপথে সহবাসের কথাও কেউ কেউ উল্লেখ করেছেন। কিছুসংখ্যক বোন হায়েয অবস্থায় উত্তেজনাবশত সহবাস হয়ে যাওয়ার কথাও জানিয়েছেন। এ সবই বর্জনীয় এবং গুনাহের কারণ হবে। এসব ক্ষেত্রে নিজের পাপের যেমন গুনাহ হয়, আরেকজনকে জোর করে হারাম কাজ করানোর গুনাহও নিজের কাঁধে আসে। তাই পুরুষদের এসব ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করা উচিত。
♦ প্রথমবার সহবাস করার সময় স্ত্রীর সার্বিক মানসিক দিক বিবেচনা না করা, সহবাসের সময় স্ত্রী ব্যথা পাচ্ছে কি না তা খেয়াল না রাখা এসব স্ত্রীদের কাছে অপছন্দনীয় এবং এর কুপ্রভাব দাম্পত্য জীবনে অনেকদিন ধরে টিকে থাকে।
◇ মানসিকভাবে উত্তেজিত না করেই সহবাস করা, বুক বা লজ্জাস্থানে সরাসরি হাত দেওয়া, শৃঙ্গার (Foreplay) করার ক্ষেত্রে সময় না দেয়া, নিজের চাহিদা শেষ হয়ে গেলেই কেটে পড়া এসব স্ত্রীদের কাছে অপছন্দনীয়। কামড় দেওয়া, খামচি দেয়া, পশুর মতো খুবলে খাওয়ার মতো আচরণ থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। তবে ব্যক্তি ও উভয়ের মানসিক অবস্থার ভিত্তিতে চাহিদা ভিন্ন ধরনের হতে পারে।
◆ স্ত্রী সাংসারিক কাজের দরুন ক্লান্ত অবস্থায় থাকলে বিশ্রামের সুযোগ না দিয়েই মিলিত হওয়া, এমন আসনে মিলিত হওয়া যেটা তার অপ্রিয়-এসব বিষয়ও নারীরা অপছন্দ করে।