📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় 📄 বিয়েকে ঘিরে যত কুসংস্কার

📄 বিয়েকে ঘিরে যত কুসংস্কার


আল্লাহর রাসূল ﷺ বিয়েকে সহজ করতে আদেশ দিয়েছেন। আর এটাও বলা হয়েছে যে, সেই বিয়েতেই অধিক বারাকাহ, যেই বিয়েতে খরচ কম।[৫৬] আমাদের বর্তমান সমাজে দাম্পত্য কলহ অনেক বড় একটা সমস্যা। এর পিছনের কারণটা কি টের পাওয়া যায়? যেই বিয়েতে ৭০-৮০ হাজার টাকার বেশি খরচ হওয়ার কথা ছিল না, সেখানে একটা বিয়ের পিছনে খরচ হয়ে যায় ১০-১২ লাখ। কী নেই সেইসব বিয়ের অনুষ্ঠানে! পাত্রী দেখতে যাওয়ার সময় হাজার হাজার টাকার ফলমূল আর মিষ্টি, পাত্রী পছন্দ হলে মোটা অঙ্কের সালামী, অ্যাঙ্গেজমেন্টে স্বর্ণ-হীরা-প্লাটিনামের আংটি আদান-প্রদান, বিয়ের জন্য লাখের ওপর কেনা-কাটা, সবার ম্যাচিং করে পাঞ্জাবী ও ল্যাহেঙ্গা, প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের নামে বিয়ের আগেই এক পরপুরুষের সাথে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আরেক পরপুরুষকে দিয়ে ছবি তোলানোর মতো বেহায়াপনা, ব্রাইডাল শাওয়ার, মেহেন্দী পার্টি, গায়ের হলুদ, ব্যয়বহুল কনভেনশন হলে বিয়ের অনুষ্ঠানের নামে পাত্রীপক্ষের ওপর বিশাল এক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া, অথচ তুলনামূলক ছোট করে বরপক্ষ থেকে একটা রিসিপশন (ওয়ালিমা), সবশেষে হানিমুন। আর অনুষ্ঠানগুলোতে গান-বাজনা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, মদ্যপানের মতো জঘন্য কাজ তো আছেই।

বিয়ে তো ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কিন্তু ওপরের যেই কার্যকলাপগুলো উল্লেখ করা হলো সেখানে ইসলামটা গেল কোথায়? কেবল কাজী সাহেবকে ডেকে এনে বিয়ে পড়ানো আর হাত তুলে একটা লম্বা মোনাজাত, এতটুকুই কি ইসলাম? দাম্পত্য জীবনে বারাকাহ তো এ কারণেই আসে না। যেই দম্পতির বিয়েতে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল -এর অবাধ্যতা করা হয় সেই স্ত্রী তার স্বামীর অবাধ্য হবে আর সেই স্বামী তার স্ত্রীর হকের বিষয়ে বেখবর থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক।

বিয়ে একটি ইবাদাত। পবিত্র এই ইবাদাতকে বিভিন্ন কুসংস্কার ও গুনাহের মাধ্যমে উদ্যাপন করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সম্পূর্ণ ইসলামী পদ্ধতিতে বিয়ের আয়োজন করা আয়োজনকারীদের কর্তব্য। যদি সেখানে শরী'আহ-বিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা হয়, বেপর্দা পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তাহলে সেখানে যত গুনাহ হবে তার একটি অংশ আয়োজনকারীদেরও বহন করতে হবে। জীবনের অনেক সুন্দর একটি ক্ষণ হচ্ছে বিয়ে। এই বিয়েকে কেন্দ্র করে আমরা যাতে জাহিলদের কার্যকলাপে জড়িয়ে না পড়ি সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা জরুরি। তাই বিয়ের আগেই প্রত্যেকের জেনে রাখতে হবে যে, বিয়ের সময়ে কী কী ধরনের সমস্যায় পতিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

* মোহরানা কম নির্ধারণ মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে আত্মীয় আর পাড়া-প্রতিবেশী কী বলবে সেই লোকলজ্জা থেকে পাত্রীপক্ষের অধিক মোহরানা নির্ধারণের একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা সমাজে প্রচলিত রয়েছে! অনেক পুরুষের মাঝে আবার এ ধারণাও রয়েছে যে, মোহরানা নির্ধারণ পর্যন্তই শেষ। পরিশোধ কেবল তখনই করতে হবে যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেয়। তাই অনেকে মোহরানা অধিক নির্ধারণ করে থাকে এই কারণে যাতে সেই পুরুষ তালাক দেওয়ার সাহসও না পায়। এতে মোহরানার অর্থ অধিক হওয়ায় তা কোনোকালেই আদায় হয় না, যদিও সেটা স্ত্রীর হক। বিয়ের পর স্ত্রীর হাত-পা ধরে মাফ চেয়ে নেওয়া হয়। অপরদিকে যদি দম্পতিদের মাঝে কোনো কারণে মতের অমিলও হয়ে থাকে, স্বামী চাইলেও মোহরানা পরিশোধের ভয়ে স্ত্রী থেকে আলাদা হতে পারে না। ফলে দম্পতির মাঝে তৈরি হয় মানসিক অশান্তি, এমনকি শারীরিক নির্যাতনও। তাই অসুস্থ মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা উচিত। মোহরানা কম হোক তবুও অনাদায়ি না থাকুক। নবী করিম বলেন, "সর্বোত্তম মোহর হলো, যা আদায় করতে সহজ হয়।" [৫৭] মোহর আদায়ের নিয়তবিহীন বিয়েকে হাদীসে ব্যভিচারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। সামর্থ্য অনুযায়ী মোহর ধার্য করা এবং তা যথাসম্ভব দ্রুত পরিশোধ করা ইসলামের নির্দেশ। মোহরানা কত হবে তা বিয়ের আগে নির্ধারণ করে নেওয়া এবং কবুল বলার সাথে সাথেই প্রদান করে দেয়া সবচেয়ে উত্তম; তবে কেউ স্ত্রীর অনুমতিতে নিজের সুবিধামতো আদায় করার অবকাশ রয়েছে。
* যৌতুক একসময় যৌতুকপ্রথা ছিল সামাজিক ব্যাধি, যা হিন্দু সমাজ থেকে আমাদের মাঝে এসেছিল। তবে জনসচেতনতার কারণে এখন সরাসরি যৌতুক দাবি অনেকটাই কমেছে। কিন্তু বর্তমানে বরপক্ষ থেকে “আপনাদের যা খুশি তা দিয়েন” রকমের উক্তিও আসলে যৌতুকেরই নামান্তর। যদিও গ্রাম-গঞ্জে এখনো সরাসরি যৌতুক দাবির প্রথা কিছুটা বহাল রয়েছে। যৌতুক ইনিয়ে-বিনিয়েই চাওয়া হোক আর সরাসরি দাবিই করা হোক, উভয়ই গর্হিত। কোনো দ্বীনদার পুরুষ এমন ব্যক্তিত্বহীন কাজ করতে পারে না。
* উপঢৌকন নিয়ে বাড়াবাড়ি বরপক্ষ ও কনেপক্ষের মাঝে উপঢৌকন বিনিময়ের রীতি সমাজে প্রচলিত রয়েছে। উপঢৌকন এক পক্ষ অপর পক্ষকে পাঠাতেই পারে, তবে এ নিয়ে যখন বাড়াবাড়ি হয়ে যায় তখন হয় সমস্যার কারণ। অপর পক্ষ থেকে কী পাঠাল, কী পাঠাল না, সেগুলোর মান ভালো না মন্দ, পরিমাণে কম না বেশি এসব নিয়ে ঘরের নারীদের মহল থেকে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়ে পুরুষদের মহল পর্যন্ত গড়ায়। এমনকি এসব ঠুনকো বিষয় নিয়ে বহুদিন পর্যন্ত অন্তরে একটা ক্ষোভও পুষে রাখা হয় যা পরবর্তীকালে দাম্পত্য জীবনেও প্রভাব ফেলে।

বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রধান ফটকে উপহার গ্রহণের জন্য আলাদা টিমই নিয়োজিত থাকে। কে কী দিলো, না দিলো সব লিখে রাখে। এ রকম উপহার দেয়াটা যদি বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে নিঃসন্দেহ এটি বর্জনীয় কাজ। [৫৮]

আবার বরপক্ষ কনেপক্ষকে নিয়ে আসার সময় গেট আটকে রেখে কিছুটা জোরপূর্বক বখশিশ আদায় করা হয়। যদিও এমনটি করা হয় মজার ছলে, কিন্তু অনেক সময় এগুলোর কারণে ঝগড়া লেগে গিয়ে বিয়ে পর্যন্ত ভেঙে যায়। এ ছাড়া হাদীসে এসেছে, “কোনো মুসলিমের সম্পদ তার আন্তরিক সম্মতি ছাড়া হস্তগত করলে তা হালাল হবে না।” [৫৯]

* ওয়ালিমা
ইসলামী শরী'আহ অনুযায়ী বিয়ের অনুষ্ঠান কেবল একটি আর সেটি হলো ওয়ালিমা, যা বরপক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়। অথচ আমাদের সমাজে মূল অনুষ্ঠানের দায়িত্ব থাকে কনেপক্ষের কাঁধে। সেখানে বরপক্ষ দলবেঁধে বেহায়ার মতো এসে খেয়ে যায়। এসব রীতি-রেওয়াজ থেকে বরপক্ষকে বের হয়ে আসতে হবে।[৬০] ইসলাম বিয়ের ক্ষেত্রে কনের পরিবারের জন্য সহজ করেছে। কেননা একটা পরিবার তার সবচেয়ে বড় সম্পদ কন্যাকেই অন্যের হাতে তুলে দিচ্ছে, যা নিশ্চয় কষ্টের। সেখানে তাদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া ইসলাম কোনোমতেই সমর্থন করে না। তবে বোঝা না হয়ে গেলে কনেপক্ষের তরফ থেকে মেহমানদারি করানো যেতে পারে, সেটা ভিন্ন বিষয়। অনেকে ওয়ালিমাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয় না, বা আবশ্যক মনে করে না। অথচ ইসলামী শরী'আহ অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর সমাজে ঘোষণার উদ্দেশ্যে বরপক্ষকে ওয়ালিমা করতে হয়। এ ক্ষেত্রে অনুষ্ঠানের যাবতীয় দায়িত্ব নিজে নিলেই সবচেয়ে উত্তম হয়। জাহেলিয়্যাতপূর্ণ সমাজে নিজ থেকে দৃঢ়তার সাথে নিয়ন্ত্রণ করলে অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।

◆ পর্দা লঙ্ঘন ও শরী'আহ-বহির্ভূত আচার বর্জন

পর্দার বিধান যাতে লঙ্ঘন না হয় তাই ওয়ালিমাতে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা বসার ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়। এ ছাড়া শরী'আহ-বহির্ভূত যেসব কর্মকাণ্ড রয়েছে তা থেকে বিরত থাকা তো আবশ্যক। যেমন: নাচ-গান-বাজনা, বাজি ফোটানো, মদ্যপান বা মাদক সেবন ইত্যাদি থেকে বিরত থাকতে হবে। এ ছাড়া শালিকারা মিলে বরের জুতা লুকানো, গেট আটকে ধরে বা খাওয়ার পর বরের হাত ধুইয়ে দিয়ে টাকা দাবি করা ইত্যাদি পর্দার লঙ্ঘন এবং দূষণীয়। যদিও ওয়ালিমার অনুষ্ঠানে এসব করার কোনো রাস্তা নেই যেহেতু এসব কর্মকাণ্ড সাধারণত হয়ে থাকে কনেপক্ষের তথাকথিত অনুষ্ঠানে।

সমাজে প্রচলিত সবচেয়ে জঘন্য বিষয় হচ্ছে, বড় ভাইয়ের স্ত্রীরা বরের গায়ে হলুদ দিয়ে বিয়ের গোসল দিয়ে দেয়। কীভাবে মানুষ এটিকে বৈধ মনে করে? অথচ স্বামী মারা গেলে স্ত্রীকে গোসল দিতে দেয়া হয় না। অপরদিকে নববধূকে কোলে করে বাসর ঘরে নিয়ে যায় বরের বোনজামাই, ভাই, চাচাতো ভাই, বন্ধু ইত্যাদি। এ রকম জঘন্যতম হারাম কাজে বৈধতা রয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে। এসব যে খুবই অশ্লীল ইঙ্গিতবহ কর্মকাণ্ড তা অনেকেই বুঝতে পারে না।

অনেকেই ভাবে বিয়ের পর স্ত্রী চুড়ি বা নাকফুল ইত্যাদি গয়না পরিধান না করলে স্বামীর আয়ু কমে যায়। এটি একেবারেই ভিত্তিহীন, মনগড়া একটি ধারণা; হিন্দুধর্ম থেকে আগত কৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক। কাজেই এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করা যাবে না। [৬১]

আবার বিয়ের অনুষ্ঠানে, আকদের সময় বা অ্যাঙ্গেজমেন্টের নামে বরের হাতে স্বর্ণের আংটি পরিধান করিয়ে দেয়া হয়। না পরালে যেন মানসম্মান থাকে না। অথচ পুরুষদের জন্য স্বর্ণ ব্যবহার হারাম। এসব শরী'আহ-গর্হিত কর্মকাণ্ড থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।

টিকাঃ
[৫৬] মিশকাত আল মাসাবিহ- ৩০৯৭; মুসনাদে আহমাদ- ২৪৫২৯
[৫৭] মুস্তাদরাকে হাকিম- ২৭৪২
[৫৮] সুনানে কুবরা, বাইহাক্বী- ১১৫৪৫; ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ- ৭/৫২২
[৫৯] সুনানে কুবরা, বাইহাক্বী- ১৬৭৫৬
[৬০] সুনানে বাইহাক্বী- ১১৫৪৫; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া- ৪/৩৮৩
[৬১] মাসিক আল কাউসার, বর্ষ ১২, সংখ্যা ৭

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية