📄 শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ের পূর্বে বিয়ে নিয়ে পড়াশোনা করার গুরুত্ব
ইসলামে বিয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। মানুষের অগাধ উচ্ছৃঙ্খল চলাফেরা সত্যিকার অর্থে অভিশাপ। যেই অভিশাপ একজনকে তিলি তিলে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে পারে, তাই ইসলাম জোর তাগিদ দিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কথা বলে। শরীরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যেমন খাদ্য প্রয়োজন তেমনি মনের পবিত্রতা, চরিত্র ও সতীত্বকে বাঁচিয়ে রাখে বিয়ে। অন্যভাবে বলা যায়, ইসলামের রীতি অনুযায়ী বিবাহ বন্ধনে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে বাঁচিয়ে রাখে। ইসলাম যেমন স্বামীকে স্ত্রীর জন্য করে দিয়েছে তেমনি স্ত্রীকে করেছে স্বামীর জন্য।
শরী'আতে বিবাহ বলতে বোঝায়, নারী-পুরুষ একে অপর থেকে উপকৃত হওয়া এবং আদর্শ পরিবার ও নিরাপদ সমাজ গড়ার উদ্দেশ্যে পরস্পর চুক্তিবদ্ধ হওয়া। এ সংজ্ঞা থেকে আমরা অনুধাবন করতে পারি, বিবাহের উদ্দেশ্য কেবল সম্ভোগ নয়; বরং এর সাথে আদর্শ পরিবার ও আলোকিত সমাজ গড়ার অভিপ্রায়ও জড়িত।
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, বিবাহের গুরুত্ব ব্যাপক। সেই সাথে বিয়ের পূর্বেই বিয়ে সম্পর্কে ইসলামী বিধিমালা সুবিস্তর জেনে নেওয়া খুব জরুরি। নতুবা পরবর্তীকালে দাম্পত্য জীবন কলহময় ও জটিলতর হয়ে উঠবে। হযরত উমার বলেন,
تَفَقَّهُوا قَبْلَ أَنْ تُسَوَّدُوا
তোমরা নেতৃত্ব পাওয়ার আগেই (শরী'আতের যাবতীয়) ফিক্বহ জেনে নাও। [১৯]
যেহেতু সাংসারিক জীবনে পদার্পণ করার সাথে সাথেই নারী ও পুরুষ উভয়ের ওপর একটি বিশাল দায়িত্ব চলে আসে, দায়িত্ব আঞ্জাম করতে অবশ্যই তাদেরকে পূর্ব থেকে এ বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া জরুরি। কারণ, বিয়ের মাসআলাগত জ্ঞানের অভাবের কারণে অনেকেই বিয়ের পর অনেক হারাম কাজে জড়িয়ে যায় নিজের অজান্তেই। আবার পারিবারিক বুঝ ও প্রায়োগিক জ্ঞানের অভাবে খুব সহজেই অনেক ঘর কাচের মতো ভেঙে যায়। বিয়ের পরে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য তাই আগেভাগেই বিয়ে নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করা দরকার। পাত্র-পাত্রী দেখা সংক্রান্ত মাসআলা, বিয়ে-পরবর্তী বিভিন্ন সুন্নাহ, সহবাস, স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের হক, স্ত্রীর প্রতি কীরূপ আচরণ করতে হবে, তালাক-সংক্রান্ত মাসআলা ইত্যাদি সম্পর্কে একজন পুরুষের জানা উচিত। এ ছাড়া স্ত্রীর হায়েজ-নিফাস নিয়েও একজন স্বামীর জানা দরকার। এতে স্ত্রীরা স্বামীভক্ত হয় এই ভেবে যে, তার স্বামী তার শরীরের ব্যাপারে সচেতন, তাকে যত্ন করে।
বিয়ের ব্যাপারে সকলের ফ্যান্টাসি তো থাকে ঠিকই, কিন্তু এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পুরো প্রস্তুতি গ্রহণ না করে এ জীবনে পা বাড়ায় অনেকেই। এরপর যখন দাম্পত্য জীবনের আসল পথচলা শুরু হয় তখন তা কাঁধের ওপর বোঝার মতো মনে হতে থাকে। অথচ এ বিষয়ে আমাদের তাকওয়া অবলম্বন করা উচিত। বিয়ের খুতবার সময় সাধারণত তিনটি আয়াত পাঠ করা হয়।[২০] প্রতিটি আয়াতেই আল্লাহকে ভয় করার কথা রয়েছে। এখানে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, দাম্পত্য জীবনে অনেক মানুষই বান্দা তথা স্বামী বা স্ত্রীর হকের বিষয়ে এবং দাম্পত্য জীবনের ক্ষেত্রে শরী'আহর বেঁধে দেয়া বিধানের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে না। বান্দার হকের ব্যাপারে বেখেয়ালিপনা ও জ্ঞানের অভাব এর মূল কারণ। তাই বিয়ের পূর্বে অবশ্যই এ সম্পর্কিত জ্ঞান খুব ভালোভাবে অর্জন করতে হবে। তবে যার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে দেরি আছে এবং বর্তমানে বিবাহকেন্দ্রিক পড়াশোনা তাকে ফিতনা বা গুনাহে জর্জরিত করবে এরূপ আশঙ্কা রয়েছে তার জন্য এখনই এ নিয়ে পড়াশোনা করার কোনো প্রয়োজন নেই।
টিকাঃ
[১৯] সহীহ বুখারী- ৬৮৭
[২০] সূরা আলে ইমরান- ১০২; সূরা নিসা- ১; সূরা আহযাব- ৭০, ৭১
📄 স্ত্রীর মনোরঞ্জন
স্ত্রীই যে কেবল স্বামীর মনোরঞ্জন করে যাবে এমনটি নয়। স্ত্রীরও হক রয়েছে যে, স্বামী তার মনোরঞ্জন করবে। বিভিন্ন কথাবার্তা, হাদিয়া-উপহার ইত্যাদির মাধ্যমে স্ত্রীর মনোরঞ্জন হতে পারে। এ ছাড়া নাশীদ, কবিতা ইত্যাদিও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে, নাশীদ বা কবিতা আবৃত্তি করার সময় কোনো বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার উপস্থিত থাকতে পারবে না এবং ভাষা শালীন হতে হবে, অশ্লীল হওয়া চলবে না। এ ছাড়া অন্য গায়রে মাহরাম নারীর প্রতি ইঙ্গিতমূলক কোনো কথা সেই নাশীদ বা কবিতায় উল্লেখ থাকতে পারবে না।
স্ত্রী কোনো কারণে রাগ করলে তার রাগ না ভাঙানো সুন্নাহর খেলাফ। দম্পতির মাঝে রাগ-অভিমান হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দ্রুত সেই রাগ ভাঙাতে হবে, তাহলে সংসারের শান্তি টিকে থাকবে। রাগ ভাঙানোর পন্থা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে ব্যক্তিভেদে। সচরাচর নারীরা হাদিয়া অনেক পছন্দ করে থাকে। সে ক্ষেত্রে তার পছন্দের খাবার, ফুল ইত্যাদি প্রদানের মাধ্যমে তার মন জয় করা যেতে পারে। এ ছাড়া স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের শারীরিক চাহিদা মিটাতে বাধ্য। এই বিধান যতটুকু স্ত্রীর জন্য প্রযোজ্য ঠিক ততটুকু স্বামীর জন্যও। তবে অসুস্থ হলে ভিন্ন কথা।
স্ত্রীর সাথে খেলাধুলা করার বিষয়ে হাদীসে এসেছে, لَيْسَ مِنَ اللَّهْوِ إِلَّا ثَلَاثُ : تَأْدِيبُ الرَّجُلِ فَرَسَهُ وَ مُلَاعَبَتُهُ أَهْلَهُ وَرَمْيُهُ بِقَوْسِهِ وَنَبْلِهِ তিন ধরনের খেলাধুলা অনুমোদিত- কোনো ব্যক্তির তার ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেয়া, নিজ স্ত্রীর সাথে খেলা-স্ফূর্তি করা এবং তির-ধনুকের প্রশিক্ষণ নেয়া। [২১]
আয়েশা-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, নবীজি ঘরে প্রবেশ করে কী করতেন? তিনি জবাবে বলেন, আল্লাহর রাসূল স্ত্রীদের মনোরঞ্জন করতেন, স্ত্রীদের কাজ গুছিয়ে দিতেন, স্ত্রীদেরকে হাসাতেন, স্ত্রীদের সাথে মজা করতেন, স্ত্রীদের সাথে আলোচনা করতেন। যখন সালাতের সময় হয়ে যেত তখন তিনি সাথে সাথে বের হয়ে যেতেন মসজিদের উদ্দেশ্যে। অন্য রেওয়াতে এসেছে, বের হওয়ার সময়ে রাসূল -এর চেহারার ভাব-ভঙ্গি অন্য রকম হয়ে যেত। অর্থাৎ, চেহারায় পুনরায় গাম্ভীর্য ফিরিয়ে আনতেন।
বোঝা গেল স্ত্রীদের সাথে খুনসুটি করা সুন্নাহ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দাম্পত্য জীবনের খুনসুটি, ভালোবাসার মুহূর্তগুলো গোপন রাখা চাই। অনেকে এসব জনসম্মুখে করে থাকে অথবা সেই খুনসুটির মুহূর্তের ছবি, ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে আপলোড করেন বা লেখার মাধ্যমে এসব ফুটিয়ে তুলে অনলাইনে পোস্ট করেন—যা নিঃসন্দেহে নীচু মানের কাজ। এটি যেমন গুনাহর কারণ হয় তেমনি তা বদনজরের দরজাও খুলে দেয়। এ ছাড়া স্ত্রী বা সন্তানদেরকে অধিক সময় দিতে গিয়ে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া চলবে না। জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অধিক প্রাধান্য দিতে হবে।
টিকাঃ
[২১] সুনানে আবু দাউদ ২৫১৩
📄 পুরুষদের শরীরচর্চা
قَالَ رَسُولُ اللهِ - الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ রাসূলুল্লাহ বলেন, শক্তিশালী মু'মিন দুর্বল মু'মিনের চাইতে উত্তম এবং আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। [২২]
তিক্ত সত্য হলো, বর্তমানে আমাদের মুখের জোর অনেক আছে, কিন্তু শরীরের জোর নেই বললেই চলে। অথচ আল্লাহ শক্তিশালী মু'মিনকে দুর্বল মু'মিনের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। সাহাবাদের মাঝে কেউই দুর্বল ছিলেন না। তারা শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে বিক্রমের সাথে লড়াই করতেন। অথচ আমাদের অবস্থা বিপরীত। আমাদের না আছে পূর্ববর্তীদের মতো ঈমানী জোর আর না আছে শরীরের জোর।
কুরআনে এসেছে, وَأَعِدُّوا لَهُم مَّا اسْتَطَعْتُم مِّن قُوَّةٍ وَمِن رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللهِ وَعَدُوَّكُمْ وَآخَرِينَ مِن دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمُ اللهُ يَعْلَمُهُمْ }
আর তাদের মোকাবেলার জন্য তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত করো, তা দ্বারা তোমরা ভয় দেখাবে আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুদেরকে এবং এরা ছাড়া অন্যদেরকেও; যাদেরকে তোমরা জানো না, আল্লাহ তাদেরকে জানেন। [২৩]
মুসা -এর প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীমে এসেছে, قَالَتْ إِحْدَاهُمَا يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ ) বালিকাদ্বয়ের একজন বললেন, পিতা তাকে (মুসা -কে) কাজে নিযুক্ত করুন। কেননা, আপনার কাজের ক্ষেত্রে সে-ই উত্তম হবে, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত। [২৪]
যেহেতু মুসা -এর শক্তিশালী ও আমানতদারির কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে, কাজেই বোঝা যায় পুরুষের ক্ষেত্রে এসব প্রশংসনীয় গুণাবলি। এ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে, وَارْمُوا، وَارْكَبُوا، وَأَنْ تَرْمُوا أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ تَرْكَبُوا لَيْسَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا ثَلَاثُ: تَأْدِيبُ الرَّجُلِ فَرَسَهُ، وَمُلَا عَبَتُهُ أَهْلَهُ وَرَمْيُهُ بِقَوْسِهِ وَنَبْلِهِ
তোমরা তিরন্দাজি ও অশ্বারোহীর প্রশিক্ষণ নাও। তোমাদের অশ্বারোহীর প্রশিক্ষণের চাইতে তিরন্দাজির প্রশিক্ষণ আমার নিকট অধিক প্রিয়। তিন ধরনের খেলাধুলা অনুমোদিত-কোনো ব্যক্তির তার ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেয়া, নিজ স্ত্রীর সাথে খেলা-স্ফূর্তি করা এবং তির-ধনুকের প্রশিক্ষণ নেয়া। [২৫]
হাদীসে আরও এসেছে, কিয়ামতের দিন পাঁচটি বিষয়ে কৈফিয়ত চাওয়া হবে। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে, বান্দা কোন কাজে যৌবন অতিবাহিত করেছে। [২৬]
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে বোঝা যায়, একজন পুরুষের জন্য শক্তি-সামর্থ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে শরীরচর্চা করা দোষের কিছু তো নয়ই বরং প্রশংসনীয়। শরীরচর্চার মাধ্যমে দেহ সুস্থ থাকে, ফলে যথাযথভাবে আল্লাহর ইবাদাত করা সম্ভব হয়। এ ছাড়া যেকোনো সময় যাতে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ময়দানে বীরত্বের সাথে লড়াই করা সম্ভব হয় সেই প্রস্তুতিও রাখা উচিত। আর দৈহিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজের স্ত্রীর কাছে আকর্ষণীয় হওয়াও অন্যতম মুখ্য উদ্দেশ্য হতে পারে। স্ত্রীর নিকট উত্তম থাকা আল্লাহর নিকট উত্তম থাকারই লক্ষণ। হাদীসে এসেছে যে,
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। [২৭]
শরীরচর্চার মাধ্যমে শারীরিক শক্তি যেমন অর্জিত হয়, তেমনি মানসিক শক্তিও বৃদ্ধি পায়। ফলে মন-মেজাজ ফুরফুরে থাকে, আত্মবিশ্বাস বাড়ে। শরীর-স্বাস্থ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে স্ত্রীকে তৃপ্ত রাখা সম্ভব হয়। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু বিষয় লক্ষণীয়: * শরীরচর্চা সম্পূর্ণ পুরুষ মহলে বা একদম নির্জনে করতে হবে। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা যে স্থানে রয়েছে সেখানে অবস্থান করা যাবে না। * পর্দার খেলাফ হবে এমন পরিবেশে ব্যায়াম করা যাবে না। পুরুষদের মহলে যেন কোনোমতেই এক পুরুষের সামনে অন্য পুরুষের নাভি থেকে হাঁটুর মধ্যবর্তী আওরাহর অংশ প্রকাশিত না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
■ জিমনেশিয়ামে গিয়ে ব্যায়ামের চিন্তা করলে আগে নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে যে, সেখানে গান-বাদ্য শোনা হয় কি না। গান-বাদ্য যেই পরিবেশে রয়েছে সেখানে শরীরচর্চা করা জায়েয নেই। [২৮]
■ কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের মাধ্যমে মাংশপেশি ফোলানো যাবে না। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা পরবর্তীকালে শরীরের ক্ষতিসাধন করে।
■ নিজের শরীর নিয়ে অহংকার করা যাবে না। নিশ্চয় অহংকার শয়তানের স্বভাব।
টিকাঃ
[২২] সহীহ বুখারী- ২৬৬৪; সহীহ মুসলিম- ২৬৬৩; সুনানে ইবনে মাজাহ- ৭৯, ৪১৬৮; মুসনাদে আহমাদ- ৮৫৭৩, ৮৬১১
[২৩] সূরা আনফাল- ৬০
[২৪] সূরা আল কাসাস- ২৬
[২৫] সুনানে আবু দাউদ- ২৫১৩; সুনানে তিরমিযী- ১৬৩৭
[২৬] সুনানে তিরমিযী- ২৪১৬; মিশকাত- ৫১৯৭; সুনানে দারেমী- ১/১৪৪; মুসনাদে আবু ইয়ালা- ৭৪৩৪
[২৭] ইবন মাজাহ- ১৯৭৭; তিরমিযী- ৩৮৯৫
[২৮] আল মাজমূ', নববী- ৩/১৭৩; আল মুগনী, ইবনু কুদামাহ- ২/২৮৬; সুনানে আবু দাউদ- ৩১৪০, ৪০১৪; সুনানে ইবনু মাজাহ- ১৪৬০; মুসনাদে আহমাদ- ১৫৫০২, ২১৯৮৯; সুনানে তিরমিযী- ২৭৯৮; সুনানে দারু কুতনী- ৮৭৯; সুনানে বাইহাক্বী- ৩৩২৭; হাদিসটিকে অনেক মুহাদ্দিসগণ সহীহ বলেছেন।
📄 সাজ কি শুধু নারীর, নাকি পুরুষেরও?
পুরুষেরাও তাদের স্ত্রীদের জন্য সাজবে, যেহেতু স্ত্রীরও অধিকার আছে তার স্বামীকে আকর্ষণীয় রূপে দেখার। স্ত্রীর সামনে আমাদের পরিপাটি থাকা, সুগন্ধি ব্যবহার করে তার সামনে যাওয়া ও ভালো পোশাক পরিধান করা উচিত। অথচ আমরা করি উল্টোটা। উশকো-খুশকো চুল, ঘামের গন্ধ আর দশ-বারোটা ছিদ্রবিশিষ্ট পোশাক পরিধান করে তাদের সামনে অবস্থান না করলে যেন আমাদের ভালোই লাগে না। এমনটা নিঃসন্দেহে অপছন্দনীয়। অপরপক্ষে স্ত্রীকে বৈধ উপায়ে খুশি রাখা প্রশংসনীয়। তাই পুরুষদের উচিত সওয়াব ও স্ত্রীর হক আদায়ের উদ্দেশ্যে সব সময়ই তাদের সামনে সুদর্শন সুপুরুষ হয়ে থাকা। [২৯]
* নবীজি চুল-দাড়িতে চিরুনি করতেন এবং সুগন্ধিযুক্ত তেল ব্যবহার করতেন। উশকো-খুশকো থাকা তিনি অপছন্দ করতেন। [৩০]
* অনেক নারীই লম্বা চুল পছন্দ করেন। যেহেতু এটি রাসূল-এর সুন্নাহ থেকে প্রমাণিত তাই সর্বোচ্চ কাঁধ অবধি লম্বা চুলও রেখে দেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে চুলের যত্ন নেয়ার বিষয়ে হাদীসে এসেছে। তবে অধিক যত্ন নেয়া, প্রতিদিনই ঘন ঘন চুল আঁচড়ানো, এ নিয়ে বিলাসিতা ও অপচয় পরিহারযোগ্য। [৩১] লম্বা চুলে আল্লাহর রাসূল মাথার মাঝ বরাবর সিথি করতেন। লম্বা চুলের ক্ষেত্রে এটাই সুন্নাহ এবং সিথি না করে ছেড়ে রাখা মাকরূহ, যেহেতু তা আহলে কিতাবীদের পদ্ধতি।
♦ চুলে কালো খিজাব ব্যতীত অন্য যেকোনো বৈধ সাধারণ রং বা মেহেদি দেয়া যেতে পারে। [৩২]
♦ হাদীস থেকে জানা যায় যে, নারীদের সজ্জা সুগন্ধিবিহীন রং আর পুরুষদের সজ্জা রংবিহীন সুগন্ধি। তাই রং-জাতীয় কোনো কিছু দিয়ে সাজা থেকে বিরত থাকতে হবে।[৩৩] ইদানীং বাজারে পুরুষদের জন্য বিশেষায়িত মেকাপ সামগ্রী, লিপিস্টিক ইত্যাদি পাওয়া যায়। যা নিঃসন্দেহে বর্জনীয়।
♦ সব সময় ভালো সুগন্ধি ব্যবহার করা উচিত। আল্লাহর রাসূল দুনিয়াবী প্রতিটি বস্তুর প্রতি বিমুখ ছিলেন, তবে সুগন্ধি ব্যতীত। সুগন্ধিতে কোনো অপচয় নেই, তাই যখন তিনি আতর হাদিয়া হিসেবে পেতেন তা সাদরে গ্রহণ করতেন এবং তিনি যখন কোনো আতর খরিদ করতেন, তখন সবচেয়ে উত্তম ও দামি আতরটাই খরিদ করতেন। তাই উমার বলতেন, কেউ যদি তার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশও আতর কিনে খরচ করে ফেলে, তবু সেটা অপচয় না।
আতর আসলে সদকা হিসেবেই পরিগণিত হয়। কেননা, কেউ যখন নিজে আতর মাখেন তখন কিছু মুহূর্তের জন্য তিনি সুগন্ধ পান। কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর তা নিজের নাক থেকে বিলীন হতে থাকে। কিন্তু সেই সুগন্ধি অন্য মানুষেরা পেতেই থাকে যখনই তাদের সামনে দিয়ে গমন করা হয়। বোঝা যাচ্ছে, আতর ব্যবহারের উদ্দেশ্য নিজের জন্য নয়; বরং অপরের জন্য। এটাও তাই সদকা, অন্যকে সুগন্ধি বিলানোর মাধ্যমে। এজন্য তা অপচয় হিসেবে গণ্য হয় না।
♦ প্রচলিত বডি স্প্রে ও সেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যালকোহলযুক্ত এসব বডি স্প্রে ও সেন্ট নাপাক নয়। আবার অ্যালকোহলবিশিষ্ট সুগন্ধি ব্যবহার সরাসরি হারামও বলা যাবে না। আর এগুলোতে নেশার উদ্রেকও হয় না। উপরন্তু এসব উপাদানগুলো রিফাইন হয়ে যায় এবং শরীরে কোনোরূপ প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করে না।
তাই এগুলো ব্যবহারে আপত্তি নেই, তবে না করাই উত্তম, যেহেতু এসবে অ্যালকোহল বিদ্যমান রয়েছে। এর বিপরীতে অ্যালকোহলমুক্ত আতর ব্যবহার করা উচিত।[৩৪]
* পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে রুচিশীলতার পরিচয় দিতে হবে। স্ত্রীর পছন্দকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। তবে ঘরের বাইরের পোশাক যাতে পুরুষদের শরঈ বিধান লঙ্ঘন না করে। যেমন: * অতিরিক্ত দামি পোশাক ও বিলাসিতা পরিহার করতে হবে; * মোটা বা পাতলা রেশমের কাপড় পরিধান না করা; * টাকনুর নিচে কাপড় পরিধান না করা; * পোশাক অতিরিক্ত আঁটসাঁট না হওয়া ইত্যাদি। তবে স্ত্রীর সাথে নির্জনে অবস্থানকালে আঁটসাঁট পোশাক পরিধান করা যেতে পারে।
* পুরুষদের জন্য সাধ্যমতো ত্বকের যত্ন নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে পুরুষদের বিভিন্ন প্রসাধনী রয়েছে যা ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন: ফেইস ওয়াশ, ময়েশ্চারাইজার, লিপ বাম ইত্যাদি। তবে সেসব প্রসাধনী কী কী উপাদান থেকে তৈরি তা দেখে নেয়া উচিত।
* পুরুষদের জন্য অলংকার পরিধান জায়েয নয়। পুরুষেরা এমনিতেই সুন্দর। তবে আংটি পরিধান করা যেতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে আংটি রুপার হতে হবে। রুপার পরিমাণ হতে হবে সর্বোচ্চ এক মিসকাল (৪.৩৭৪ গ্রাম)। স্বর্ণ, লোহা, অষ্টধাতু ইত্যাদি পরিহারযোগ্য।[৩৫] আংটি অনামিকা ও কনিষ্ঠা আঙুলে পরিধান করা যাবে। পাথর ব্যবহার করলে পাথরের মাধ্যমে তাকদীর পরিবর্তন হবে এই বিশ্বাস রাখা যাবে না।[৩৬] পুরুষেরা ঘড়ি পরিধান করতে পারবে। সে ক্ষেত্রেও ঘড়িতে স্বর্ণের ব্যবহার থাকতে পারবে না এবং বিলাসিতা থেকে বিরত থাকতে হবে।
টিকাঃ
[২৯] মুসনাদে আহমাদ- ১৪৪৩৬
[৩০] সহীহ মুসলিম (আল মাকতাবাতুশ শামেলা)- ২৩৪৪; আবু দাউদ- ৪১৬৩, ৪০৬২; নাসাঈ- ৫২৩৬; মুসনাদে আহমাদ (আল মাকতাবাতুশ শামেলা)- ১৪৪৩৬; মিশকাত- ৪৩৫১
[৩১] সুনানে আবু দাউদ- ৪১৮৬, ৪১৮৯; সুনানে নাসাঈ- ৫০৫৪; সুনানে ইবনে মাজাহ- ৩৬৩৪ (আল মাকতাবাতুশ শামেলা)
[৩২] সুনানে আবু দাউদ- ৫৭৮; শরহে নববী- ২/১৯৯; ফাতওয়ায়ে শামী- ৯/৬০৪ ও ৬০৫; ফাতওয়ায়ে আলমগীরী-৫/৩৫৯
[৩৩] তারগীব- ১৬৭
[৩৪] ফাতহুল কাদীর- ৮/১৬০; ফাতওয়ায়ে আলমগীরী- ৫/৪১২; আল বাহরুর রায়েক- ৮/২১৭ ও ২১৮; ফাতওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ২৭/২১৮ ও ২১৯; তানভীরুল আবসার মা'আত দুররিল মুখতার- ২/২৫৯; তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম- ১/৩৪৮, ৩/৩৩৭; ফিকহুল বুয়ু- ১/২৯৮; নিহায়াতুল মুহতাজ লির রামালি- ৮/১২; ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া- ৫/৪১০; মাজমাউল আনহুর- ৪/২৫১; জাদীদ ফিকহি মাসাইল- ১/৩৮; আল মাবসূত্ব- ২/৯০; বাদায়েউস সানায়ে- ১/১৫; আল ইনায়াহ শরহুল হিদায়াহ- ১/১১৮; আহকামুল কুরআন, জাসসাস- ২/৫৪৩
[৩৫] আবু দাউদ- ৪১৭৭; ফাতাওয়া খানিয়া- ৩/৪১৩; আলমুহীতুল বুরহানী- ৮/৪৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ৫/৩৩৫; রদ্দুল মুস্তার- ৬/৩৬০; মাজমাউল আনহুর- ৪/১৯৭; মিরকাতুল মাফাতীহ-৮/৩৫৩
[৩৬] মুসনাদে আবী ইয়ালা, হাদীস নং- ৪১৩৫ আবু দাউদ- ৪১৭৭; ফাতাওয়া খানিয়া- ৩/৪১৩; আলমুহীতুল বুরহানী- ৮/৪৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ৫/৩৩৫; রদ্দুল মুহতার ৬/৩৬০; মাজমাউল আনহুর- ৪/১৯৭; মিরকাতুল মাফাতীহ-৮/৩৫৩