📄 বিয়ের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব
নিয়তের ওপরই আমল নির্ভরশীল। তাই প্রতিটি বিষয়ে আমাদের নিয়ত শুদ্ধ রাখা দরকার। বিয়ের ক্ষেত্রেও নিয়তের পরিশুদ্ধতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাই নিয়ত পরিশুদ্ধ করার আগে আমাদের জেনে নিতে হবে যে, ইসলাম মোতাবেক বিয়ের উদ্দেশ্য কী। আল্লাহ বলেন,
وَمِنْ ءَايَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ ﴾
তাঁর নিদর্শনের মধ্যে অন্যতম হলো এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা তার কাছে শান্তি লাভ করতে পারো আর তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃজিত করেছেন। এর মাঝে অবশ্যই বহু নিদর্শন আছে সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে। [১]
আল্লাহ আরও বলেন,
( هُوَ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا )
তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং তার থেকে বানিয়েছেন তার সঙ্গিনীকে, যাতে সে তার নিকট প্রশান্তি লাভ করে। [২]
উপরি-উক্ত আয়াতসমূহ সামনে রেখে বিয়ের উদ্দেশ্য হলো: • মানুষ একা বাঁচতে পারে না, একাকিত্ব মানুষের কাছে দম বন্ধ হওয়া বিদঘুটে অন্ধকারের মতো। বিয়ের মাধ্যমে একজন মানুষের জীবন থেকে একাকিত্ব দূর হয়। জীবনসঙ্গী খোঁজার মাধ্যমে একাকিত্ব দূর করা মানুষের ফিতরাতগত মানসিক একটি চাহিদা। মানবজাতির আদি পিতা আদম-এর কাছে জান্নাতের এত নিয়ামতও ফিকে মনে হয়েছিল কেবল একজন সঙ্গিনীর অভাবে। তাই আল্লাহ আদম-এর একাকিত্ব দূর করতে হাওয়া-কে তাঁর স্ত্রী রূপে সৃষ্টি করেছেন। • মানুষের জৈবিক চাহিদা রয়েছে। সেই জৈবিক চাহিদা মেটানোর হালাল পন্থা হচ্ছে বিয়ে। হাদীসে এসেছে, কেউ যদি হারামকে বর্জন করে হালাল বিয়ের মাধ্যমে সঙ্গী গ্রহণ করে এবং সে যদি তার সাথে মিলনে লিপ্ত হয়, সেটাও সদকা হিসেবে গণ্য হবে। [৩] আল্লাহ বলেন,
وَخُلِقَ الْإِنسَنُ ضَعِيفًا)
এবং মানুষকে (পুরুষদেরকে) দুর্বল করে সৃষ্টি করা হয়েছে। [৪]
আল্লাহ পুরুষদেরকে নারীদের প্রতি দুর্বল করে সৃষ্টি করেছেন। নারীদের প্রতি পুরুষেরা আকৃষ্ট হবে এটাই স্বাভাবিক এবং এটাই পুরুষদের সহজাত। আর নারীদের প্রতি এই দুর্বলতাই পুরুষদের জন্য ইহজগতের অন্যতম সবচেয়ে বড় এক পরীক্ষা বলা চলে। আজ চারদিকে আমরা যত পাপাচার দেখে থাকি তার সিংহভাগই নারী- পুরুষজনিত। এমতাবস্থায় বিয়ে ব্যতীত সমাজের খুঁটিগুলোকে টিকিয়ে রাখার আর দ্বিতীয় কোনো মাধ্যম নেই। অর্থাৎ, ব্যক্তিবিশেষের জৈবিক চাহিদা নিরসন ও সমাজের নৈতিক অবক্ষয় দূরীকরণসহ বিয়ের আরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অপরদিকে বিয়ে আল্লাহর রাসূল-এর সুন্নাহ। রাসূল বলেন,
أَصُوْمُ وَأُفْطِرُ وَأُصَلِّي وَأَرْقُدُ وَ أَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي
আমি সওম পালন করি, আবার তা থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি এবং নিদ্রা যাই ও বিয়েও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তারা আমার দলভুক্ত নয়। [৫]
বিয়ের মাধ্যমে চরিত্র হেফাযত করা সহজ হয়। গোপনাঙ্গ, নজর, জবান ও অন্তরের যিনা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয় বিয়ের মাধ্যমে। এতে আমলে তুষ্টি আসে এবং রবের নৈকট্য হাসিল করা সম্ভব হয়। তাই এই নিয়ত রাখা উচিত যে, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছি যাতে এর মাধ্যমে রবের নৈকট্য অর্জন করা যায়।
* যারা আর্থিকভাবে অভাবগ্রস্ত তাদের উদ্দেশে আল্লাহ কুরআনে বলেন,
وَأَنكِحُوا الْأَيَامَى مِنكُمْ وَالصَّالِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِن يَكُونُواْ فُقَرَاء يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস-দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী। [৬]
এই আয়াতের ব্যাখ্যা হলো, যদি কেউ গরিব বা আভাবগ্রস্ত হয়ে থাকে কিন্তু আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নিজেকে বদ আমল থেকে রক্ষা করতে এবং নিজের দ্বীনকে পূর্ণ করতে বিবাহের জন্য অগ্রসর হয়, তাহলে আল্লাহই নিজ অনুগ্রহে তাকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। [৭]
সাহাবীদের থেকেও এ রকম বহু বর্ণনা পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন,
أمر الله سبحانه بالنكاح، ورغبهم فيه، وأمرهم أن يزوجوا أحرارهم وعبيدهم، ووعدهم في ذلك الغنى
আল্লাহ তাদেরকে (অভাবীদেরকে) বিয়ে দেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তিনি স্বাধীন ও দাস সবাইকে বিয়ে দেয়ার আদেশ দিয়েছেন এবং তাদেরকে স্বাবলম্বী করে দেয়ার ওয়াদা করেছেন। [৮]
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত আছে,
التمسوا الغنى في النكاح، يقول الله تعالى : ( إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ)
তোমরা বিয়ে করার মাধ্যমে সচ্ছলতা সন্ধান করো। কেননা আল্লাহ বলেছেন, “তারা যদি দরিদ্র হয়, তাহলে আল্লাহই নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছল করে দেবেন." [১]
ইমাম ইবনু কাসীর এই আয়াতের তাফসীরে বলেন,
وقد زوج رسول الله صلى الله عليه وسلم ذلك الرجل الذي لم يجد إلا إزاره، ولم يقدر على خاتم من حديد، ومع هذا فزوجه بتلك المرأة، وجعل صداقها عليه أن يعلمها ما يحفظه من القرآن والمعهود من كرم الله تعالى ولطفه أن يرزقه وإياها ما فيه كفاية له ولها
রাসূলুল্লাহ এমন পুরুষকে বিয়ে করিয়েছেন যিনি এতটাই দরিদ্র ছিলেন যে, তার কাছে একটা লুঙ্গি ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি, এমনকি একটি লোহার আংটি খরিদ করার সামর্থ্যও তার ছিল না। এতৎসত্ত্বেও তিনি ওই নারীর সাথে তার বিবাহ দিয়েছিলেন। কুরআন থেকে তিনি যা মুখস্থ করেছেন তা নিজ স্ত্রীকে শেখাবে এই মর্মে সেই নারীর মোহর ধার্য করা হয়েছিল। আর আয়াতটিতে যেই সচ্ছলতার ওয়াদা করা হয়েছে তা হচ্ছে, আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তার ও তার স্ত্রীর জন্য এমন রিযিকের ব্যবস্থা করবেন যা তাদের উভয়ের জন্য যথেষ্ট হবে। [১০]
আল্লামা ইবনু আশূর এই আয়াতের তাফসীরে বলেন,
وعد الله المتزوج من هؤلاء إن كان فقيرا أن يغنيه الله، وإغناؤه تيسير الغني إليه إن كان حرا، وتوسعة المال على مولاه إن كان عبدا
আল্লাহ এসকল বিবাহিতদের ওয়াদা দিয়েছেন যে, যদি সে আযাদ ও স্বাধীন থাকা অবস্থায় দরিদ্র হয় তাহলে আল্লাহ তাদের সচ্ছল বানিয়ে দেবেন, তবে এই সচ্ছলতা হচ্ছে সচ্ছলতার মাধ্যম সহজ করে দেবেন। আর যদি সে গোলাম ও দাস হয়, তাহলে তার মুনিবকে আল্লাহ ব্যাপক ধন-সম্পদ প্রদান করবেন (যাতে সে তার দাস ও গোলামের সাংসারিক খাতে ব্যয় করতে পারে)। [১১]
এর সাথে প্রাসঙ্গিক একটি হাদীস হলো, রাসূলুল্লাহ বলেন, ثَلَاثَةٌ حَقٌّ عَلَى اللَّهِ عَوْنُهُمْ : الْمُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، وَالْمُكَاتَبُ الَّذِي يُرِيدُ الْأَدَاءَ، وَالنَّاكِحُ الَّذِي يُرِيدُ الْعَفَافَ
তিন শ্রেণির ব্যক্তির সাহায্য করাকে আল্লাহ নিজের ওপর অত্যাবশ্যক করেছেন- আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী, এমন মুকাতাব গোলাম যে চুক্তির শর্ত পূরণের ইচ্ছা করে এবং যে ব্যক্তি নিজের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার্থে বিয়ে করতে চায়। [১২]
কাজেই বোঝা গেল, বিয়ের মূল উদ্দেশ্য মূলত তিনটি। শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিক।
তবে এর বাইরে বিয়ের আরেকটি আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য রয়েছে এবং তা হলো, নেক সন্তান জন্মদান। দ্বীনের বুঝসম্পন্ন দম্পতি পরিকল্পিত তারবিয়াতের মাধ্যমে সুসন্তান গড়ে তুলতে পারে। ফলে বিশ্বব্যাপী দ্বীনদারদের সংখ্যা বৃদ্ধি সম্ভব হয়। নেক সন্তান আখিরাতের সম্পদ। কেননা হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে তখন তার সমস্ত আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়; কেবল তিনটি আমল ব্যতীত। প্রথমটি হলো সদকায়ে জারিয়াহ। অর্থাৎ মসজিদ, মাদরাসা, ইয়াতীমখানা, রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণ, অনাবাদি জমিকে আবাদকরণ, সুপেয় পানির ব্যবস্থাকরণ, দাতব্য চিকিৎসালয় ও হাসপাতাল স্থাপন, বই ক্রয় করে বা ছাপিয়ে বিতরণ, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত, এমন ইলম যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়। যা মানুষকে নির্ভেজাল তাওহীদ ও সহীহ সুন্নাহর পথ দেখায় এবং যাবতীয় শিরক ও বিদ'আত হতে বিরত রাখে। উক্ত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে শিক্ষাদান করা, ইসলামী শিক্ষা বিস্তারে সহযোগিতা প্রদান করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, বিশুদ্ধ আক্বীদা ও আমল-সম্পন্ন বই-প্রবন্ধ লেখা, ছাপানো ও বিতরণ করা এবং এজন্য অন্যান্য স্থায়ী প্রচার-মাধ্যম স্থাপন ও পরিচালনা করা ইত্যাদি। তৃতীয়ত হচ্ছে, এমন আল্লাহভীরু সুসন্তান যে তার জন্য দু'আ করবে। এটিই একজন মৃতের জন্য সর্বোত্তম পুরস্কার। কেননা সে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে, সদকা করে, তার পক্ষ হতে হজ্জ করে ইত্যাদি। [১৩] তাই প্রত্যেকের উচিত সন্তান জন্মের মাধ্যমে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটানো। এই নিয়ত রেখে প্রত্যেকের অধিক সন্তান প্রসবের মানসিকতা ধারণ করা কাম্য। বাবা-মা যদি সঠিক দ্বীনের জ্ঞান সন্তানদেরকে দিয়ে যেতে পারেন তাহলে আশা করা যায় যে, নেক সন্তানের ধারাটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বিস্তার লাভ করবে।
টিকাঃ
[১] সূরা রুম- ২১
[২] সূরা আ'রাফ- ১৮৯; সহীহ মুসলিম- ১৬৭৪
[৩] সহীহ মুসলিম- ১৬৭৪
[৪] সূরা নিসা- ২৮
[৫] মুসলিম ১৬/১, হাদীস- ১৪০১; আহমাদ- ১৩৫৩৪
[৬] সূরা নূর- ৩২
[৭] তাফসীরে মারাগী, আহমাদ মুস্তফা আল মারাগী ১৮/১০৪; তাফসীরে ত্ববারী ১৯/১৬৬;
[৮] তাফসীরে ত্ববারী ১৯/১৬৬; আল মুদাউই লি ইলালিল জামেইস সগীর ২/২৩৪; তাফসীরে মারাগী, আহমাদ মুস্তফা আল মারাগী ১৮/১০৪
[১] তাফসীরে তবারী ১৯/১৬৬; আল মুদাউই লি ইলালিল জামেইস সগীর ওয়া শারহিল মুনাবী ২/২৩৫- দারুল কুতুব
[১০] তাফসীরে ইবনু কাসীর- ৬/৫১ ও ৫২; সহীহ বখারী- ৫০৩০; সহীহ মুসলিম- ১৪২৫
[১১] আত তাহরীর ওয়াত তানউইর- ১৮/২১৭
[১২] সুনানে তিরমিযী- ১৬৫৫; সুনানে নাসাঈ- ৬/৬১; সুনানে ইবনি মাজাহ- ২৫১৮; মুসনাদে আহমাদ- ২/২৫১; হাদীসের সনদ হাসান।
[১৩] মুসলিম- ১৬৩১; মিশকাত- ২০৩; মুসনাদ বাযযার- ৭২৮৯; বায়হাক্বী, শু'আবুল ঈমান; সহীহুল জামে- ৩৬০২
📄 পবিত্র স্ত্রী
পুরুষেরা স্বভাবগতভাবে কিছুটা অগোছালো। তার সেই অগোছালো জীবন একজন স্ত্রী ছাড়া কেউই গুছিয়ে দিতে পারে না। আর স্ত্রী যদি হয় একজন মুহসানাৎ, তাহলে সেই স্ত্রী ব্যক্তির দ্বীন-দুনিয়া উভয়ই আল্লাহর ইচ্ছায় গড়ে দেবে। আর স্ত্রী যদি হয় বানের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়া কচুরিপানা, তাহলে দ্বীনও গেল, দুনিয়াও গেল।
দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ হচ্ছে নেককার স্ত্রী। প্রিয় নবী বলেন, أربع من السَّعادَة : المرأةُ الصَّالِحَةُ وَ المسكَنُ الوَاسِعُ وَالجَارُ الصَّالِحُ وَالمَرْكَبُ الهني، وَأَربَعُ مِنَ الشَّقَاوَة: الجارُ السُّوء والمرأَةُ السُّوء والمسكنُ الضَّيِّقُ والمركب السوء
পুরুষের জন্য সুখ ও সৌভাগ্যের বিষয় হলো চারটি-সতী-সাধ্বী নারী, প্রশস্ত ঘর, সৎ প্রতিবেশী এবং সচল গাড়ি। আর দুঃখ ও দুর্ভাগ্যের বিষয়ও চারটি-অসৎ প্রতিবেশী, অসতী স্ত্রী, অচল গাড়ি এবং সংকীর্ণ ঘর। [১৪]
আরেক হাদীসে এসেছে, ثلاث من السعادة وثلاث من الشقاوة: فمن السعادة : المرأة تراها تعجبك، وتغيب فتأمنها على نفسها ومالك، والدابة تكون وطيئة فتلحقك بأصحابك، والدار تكون واسعة كثيرة المرافق، ومن الشقاوة: المرأة تراها فتسوءك، وتحمل لسانها عليك، وإن غبت عنها لم تأمنها على نفسها ومالك، والدابة تكون قطوفا فإن ضربتها أتعبتك، وإن تركتها لم تلحقك بأصحابك، والدار تكون ضيقة قليلة المرافق
সৌভাগ্যের স্ত্রী সে-ই, যাকে দেখে স্বামী মুগ্ধ হয়। সংসার ছেড়ে বাইরে গেলে স্ত্রী ও তার সম্পদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকে। আর দুর্ভাগার স্ত্রী হলো সে-ই, যাকে দেখে স্বামীর মন তিক্ত হয়, যে স্বামীর ওপর জিহ্বা লম্বা করে (মুখে মুখে তর্ক করে) এবং সংসার ছেড়ে বাইরে গেলে ওই স্ত্রী ও তার সম্পদের ব্যাপারে সে নিশ্চিন্ত হতে পারে না। [১৫]
বিয়ে হচ্ছে দ্বীনের অর্ধেক। প্রিয় নবী বলেন, إِذَا تَزَوَّجَ الْعَبْدُ فَقَدْ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الدِّيْنِ فَلْيَتَّقِ اللَّهَ فِي النِّصْفِ الْبَاقِي মুসলিম বান্দা যখন বিবাহ করে, তখন সে তার অর্ধেক ঈমান পূর্ণ করে, অতএব বাকি অর্ধেকাংশে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে। [১৬]
ব্যভিচার থেকে বাঁচার জন্য ও পবিত্র জীবন গঠনের উদ্দেশ্যে বিবাহ করলে দাম্পত্য জীবনে আল্লাহর সাহায্য আসে। [১৭] যত প্রকার মৌলিক গুনাহ রয়েছে এমন অধিকাংশ গুনাহ থেকেই বাঁচা যায় বিয়ের মাধ্যমে। আবার মৌলিক বড় বড় যেসকল নেক আমল রয়েছে সেসব আমলের রাস্তাও বিয়ের মাধ্যমেই সহজতর হয়। ইসলামে বিয়ে এতটাই ফযিলতপূর্ণ যে, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের সাথে মিলিত হলেও তা সওয়াব ও সদকা বলে গণ্য হয়। একদিন কিছু সাহাবী নবী -কে বলেন, "হে আল্লাহর রাসূল, বিত্তবান লোকেরা প্রতিফল ও সওয়াবের কাজে এগিয়ে গেছে। আমরা নামায পড়ি তারাও সে রকম নামায পড়ে, আমরা রোযা রাখি তারাও সে রকম রোযা রাখে, তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ সদকা করে।" তিনি উত্তরে বলেন, "আল্লাহ কি তোমাদের জন্য এমন জিনিস রাখেননি যে, তোমরা সদকা দিতে পারো? প্রত্যেক তাসবীহ্ (সুবহান আল্লাহ্) হচ্ছে সদকাহ, প্রত্যেক তাকবীর (আল্লাহু আকবার) হচ্ছে সদকাহ, প্রত্যেক তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ) হচ্ছে সদকাহ, প্রত্যেক তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) হচ্ছে সদকাহ, প্রত্যেক ভালো কাজের হুকুম দেয়া হচ্ছে সদকাহ এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত করা হচ্ছে সদকাহ। আর তোমাদের প্রত্যেকে আপন স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও হচ্ছে সদকah.” তারা জিজ্ঞাসা করেন, "হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের মধ্যে কেউ যখন যৌন- আকাঙ্ক্ষা সহকারে স্ত্রীর সাথে সম্ভোগ করে, তাতেও কি সওয়াব হবে?" তিনি বলেন, "তোমরা ভেবে দেখো, যখন সে হারাম পদ্ধতিতে তা করে, তখন সে গুনাহগার হয়। আর যখন ওই একই কাজ সে বৈধভাবে করে তখন এর জন্য সে প্রতিফল ও সওয়াব পাবে। "[১৮]
বিয়ে করলে আমলে পরিপূর্ণতা আসে, মন-মেজাজ ফুরফুরে থাকে। ফাতওয়ায়ে শামীর কিতাবে রয়েছে, যে ইমাম তার স্ত্রীর ওপর সন্তুষ্ট সেই ইমামের পিছনে নামাজ আদায় করা অধিক উত্তম। কারণ, ওই ইমাম স্ত্রী দ্বারা সন্তুষ্ট হওয়ার ফলে তার নামাযের মধ্যে খুশু-খুযু অধিক হবে।
এভাবে মুহস্বানাত নারী জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়ার মাধ্যমে একজন পুরুষের জীবন সুন্দর হয়। ইলম ও রিযিকে বরকত আসে, দ্বীনের ব্যাপারে পরিপক্কতা আসে।
টিকাঃ
[১৪] আস সিলসিলাতুস সহীহাহ- ২৮২
[১৫] মুস্তাদরাক আল হাকেম- ২/১৬২. হাদীস- ২৭৩১ (২৬৮৪): ফয়জুল কদীর, মনাবী- ৩/৪৪২: হাদিসটির মান হাসান।
[১৬] তালবীসুল হাবীর, আসক্বালানী- ৩/১১২০; আল কাফী আশ শাফ, আসক্বালানী- ২০১; ইলালুল মুতানাহিয়া, ইবনুল জাওযী- ২/৬১২; মুখতাসারুল মাক্বাসিদ, যুরক্বানী- ১০০৯; আল ইফসাহ আন আহাদীসিম নিকাহ, হাইতামী আল মাক্কী- ৪৯; তাখরীজুল ইহইয়া, ইরাকী- ২/৩০; আল কামেল ফিদ দুয়াফা, ইবনু আদী- ৬/৪৯৪; তাখরীজু মুশকিলিল আসার, শুয়াইব আরনাউত্ব- ৩৫৭; হাদীসটির ব্যাপারে মুহাক্কিক মুহাদ্দিসদের ফয়সালা হচ্ছে, এর সনদ যঈফ। তবে হাদীসটির মূল বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য।
[১৭] সহীহুল জামে' ওয়া যিয়াাতুহু- ৩০৫০; মিশকাতুল মাসাবীহ- ৩০৮৯; সুনানে তিরমিযী- ১৬৫৫; সুনানে ইবনে মাজাহ- ২৫১৮; মুসনাদে আহমাদ- ২/২৫১
[১৮] সহীহ মুসলিম- ১০০৬
📄 শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ের পূর্বে বিয়ে নিয়ে পড়াশোনা করার গুরুত্ব
ইসলামে বিয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। মানুষের অগাধ উচ্ছৃঙ্খল চলাফেরা সত্যিকার অর্থে অভিশাপ। যেই অভিশাপ একজনকে তিলি তিলে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে পারে, তাই ইসলাম জোর তাগিদ দিয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কথা বলে। শরীরকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যেমন খাদ্য প্রয়োজন তেমনি মনের পবিত্রতা, চরিত্র ও সতীত্বকে বাঁচিয়ে রাখে বিয়ে। অন্যভাবে বলা যায়, ইসলামের রীতি অনুযায়ী বিবাহ বন্ধনে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে বাঁচিয়ে রাখে। ইসলাম যেমন স্বামীকে স্ত্রীর জন্য করে দিয়েছে তেমনি স্ত্রীকে করেছে স্বামীর জন্য।
শরী'আতে বিবাহ বলতে বোঝায়, নারী-পুরুষ একে অপর থেকে উপকৃত হওয়া এবং আদর্শ পরিবার ও নিরাপদ সমাজ গড়ার উদ্দেশ্যে পরস্পর চুক্তিবদ্ধ হওয়া। এ সংজ্ঞা থেকে আমরা অনুধাবন করতে পারি, বিবাহের উদ্দেশ্য কেবল সম্ভোগ নয়; বরং এর সাথে আদর্শ পরিবার ও আলোকিত সমাজ গড়ার অভিপ্রায়ও জড়িত।
সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, বিবাহের গুরুত্ব ব্যাপক। সেই সাথে বিয়ের পূর্বেই বিয়ে সম্পর্কে ইসলামী বিধিমালা সুবিস্তর জেনে নেওয়া খুব জরুরি। নতুবা পরবর্তীকালে দাম্পত্য জীবন কলহময় ও জটিলতর হয়ে উঠবে। হযরত উমার বলেন,
تَفَقَّهُوا قَبْلَ أَنْ تُسَوَّدُوا
তোমরা নেতৃত্ব পাওয়ার আগেই (শরী'আতের যাবতীয়) ফিক্বহ জেনে নাও। [১৯]
যেহেতু সাংসারিক জীবনে পদার্পণ করার সাথে সাথেই নারী ও পুরুষ উভয়ের ওপর একটি বিশাল দায়িত্ব চলে আসে, দায়িত্ব আঞ্জাম করতে অবশ্যই তাদেরকে পূর্ব থেকে এ বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া জরুরি। কারণ, বিয়ের মাসআলাগত জ্ঞানের অভাবের কারণে অনেকেই বিয়ের পর অনেক হারাম কাজে জড়িয়ে যায় নিজের অজান্তেই। আবার পারিবারিক বুঝ ও প্রায়োগিক জ্ঞানের অভাবে খুব সহজেই অনেক ঘর কাচের মতো ভেঙে যায়। বিয়ের পরে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য তাই আগেভাগেই বিয়ে নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করা দরকার। পাত্র-পাত্রী দেখা সংক্রান্ত মাসআলা, বিয়ে-পরবর্তী বিভিন্ন সুন্নাহ, সহবাস, স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের হক, স্ত্রীর প্রতি কীরূপ আচরণ করতে হবে, তালাক-সংক্রান্ত মাসআলা ইত্যাদি সম্পর্কে একজন পুরুষের জানা উচিত। এ ছাড়া স্ত্রীর হায়েজ-নিফাস নিয়েও একজন স্বামীর জানা দরকার। এতে স্ত্রীরা স্বামীভক্ত হয় এই ভেবে যে, তার স্বামী তার শরীরের ব্যাপারে সচেতন, তাকে যত্ন করে।
বিয়ের ব্যাপারে সকলের ফ্যান্টাসি তো থাকে ঠিকই, কিন্তু এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পুরো প্রস্তুতি গ্রহণ না করে এ জীবনে পা বাড়ায় অনেকেই। এরপর যখন দাম্পত্য জীবনের আসল পথচলা শুরু হয় তখন তা কাঁধের ওপর বোঝার মতো মনে হতে থাকে। অথচ এ বিষয়ে আমাদের তাকওয়া অবলম্বন করা উচিত। বিয়ের খুতবার সময় সাধারণত তিনটি আয়াত পাঠ করা হয়।[২০] প্রতিটি আয়াতেই আল্লাহকে ভয় করার কথা রয়েছে। এখানে স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে যে, দাম্পত্য জীবনে অনেক মানুষই বান্দা তথা স্বামী বা স্ত্রীর হকের বিষয়ে এবং দাম্পত্য জীবনের ক্ষেত্রে শরী'আহর বেঁধে দেয়া বিধানের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করে না। বান্দার হকের ব্যাপারে বেখেয়ালিপনা ও জ্ঞানের অভাব এর মূল কারণ। তাই বিয়ের পূর্বে অবশ্যই এ সম্পর্কিত জ্ঞান খুব ভালোভাবে অর্জন করতে হবে। তবে যার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে দেরি আছে এবং বর্তমানে বিবাহকেন্দ্রিক পড়াশোনা তাকে ফিতনা বা গুনাহে জর্জরিত করবে এরূপ আশঙ্কা রয়েছে তার জন্য এখনই এ নিয়ে পড়াশোনা করার কোনো প্রয়োজন নেই।
টিকাঃ
[১৯] সহীহ বুখারী- ৬৮৭
[২০] সূরা আলে ইমরান- ১০২; সূরা নিসা- ১; সূরা আহযাব- ৭০, ৭১
📄 স্ত্রীর মনোরঞ্জন
স্ত্রীই যে কেবল স্বামীর মনোরঞ্জন করে যাবে এমনটি নয়। স্ত্রীরও হক রয়েছে যে, স্বামী তার মনোরঞ্জন করবে। বিভিন্ন কথাবার্তা, হাদিয়া-উপহার ইত্যাদির মাধ্যমে স্ত্রীর মনোরঞ্জন হতে পারে। এ ছাড়া নাশীদ, কবিতা ইত্যাদিও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে, নাশীদ বা কবিতা আবৃত্তি করার সময় কোনো বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার উপস্থিত থাকতে পারবে না এবং ভাষা শালীন হতে হবে, অশ্লীল হওয়া চলবে না। এ ছাড়া অন্য গায়রে মাহরাম নারীর প্রতি ইঙ্গিতমূলক কোনো কথা সেই নাশীদ বা কবিতায় উল্লেখ থাকতে পারবে না।
স্ত্রী কোনো কারণে রাগ করলে তার রাগ না ভাঙানো সুন্নাহর খেলাফ। দম্পতির মাঝে রাগ-অভিমান হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দ্রুত সেই রাগ ভাঙাতে হবে, তাহলে সংসারের শান্তি টিকে থাকবে। রাগ ভাঙানোর পন্থা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে ব্যক্তিভেদে। সচরাচর নারীরা হাদিয়া অনেক পছন্দ করে থাকে। সে ক্ষেত্রে তার পছন্দের খাবার, ফুল ইত্যাদি প্রদানের মাধ্যমে তার মন জয় করা যেতে পারে। এ ছাড়া স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের শারীরিক চাহিদা মিটাতে বাধ্য। এই বিধান যতটুকু স্ত্রীর জন্য প্রযোজ্য ঠিক ততটুকু স্বামীর জন্যও। তবে অসুস্থ হলে ভিন্ন কথা।
স্ত্রীর সাথে খেলাধুলা করার বিষয়ে হাদীসে এসেছে, لَيْسَ مِنَ اللَّهْوِ إِلَّا ثَلَاثُ : تَأْدِيبُ الرَّجُلِ فَرَسَهُ وَ مُلَاعَبَتُهُ أَهْلَهُ وَرَمْيُهُ بِقَوْسِهِ وَنَبْلِهِ তিন ধরনের খেলাধুলা অনুমোদিত- কোনো ব্যক্তির তার ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেয়া, নিজ স্ত্রীর সাথে খেলা-স্ফূর্তি করা এবং তির-ধনুকের প্রশিক্ষণ নেয়া। [২১]
আয়েশা-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, নবীজি ঘরে প্রবেশ করে কী করতেন? তিনি জবাবে বলেন, আল্লাহর রাসূল স্ত্রীদের মনোরঞ্জন করতেন, স্ত্রীদের কাজ গুছিয়ে দিতেন, স্ত্রীদেরকে হাসাতেন, স্ত্রীদের সাথে মজা করতেন, স্ত্রীদের সাথে আলোচনা করতেন। যখন সালাতের সময় হয়ে যেত তখন তিনি সাথে সাথে বের হয়ে যেতেন মসজিদের উদ্দেশ্যে। অন্য রেওয়াতে এসেছে, বের হওয়ার সময়ে রাসূল -এর চেহারার ভাব-ভঙ্গি অন্য রকম হয়ে যেত। অর্থাৎ, চেহারায় পুনরায় গাম্ভীর্য ফিরিয়ে আনতেন।
বোঝা গেল স্ত্রীদের সাথে খুনসুটি করা সুন্নাহ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, দাম্পত্য জীবনের খুনসুটি, ভালোবাসার মুহূর্তগুলো গোপন রাখা চাই। অনেকে এসব জনসম্মুখে করে থাকে অথবা সেই খুনসুটির মুহূর্তের ছবি, ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে আপলোড করেন বা লেখার মাধ্যমে এসব ফুটিয়ে তুলে অনলাইনে পোস্ট করেন—যা নিঃসন্দেহে নীচু মানের কাজ। এটি যেমন গুনাহর কারণ হয় তেমনি তা বদনজরের দরজাও খুলে দেয়। এ ছাড়া স্ত্রী বা সন্তানদেরকে অধিক সময় দিতে গিয়ে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া চলবে না। জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অধিক প্রাধান্য দিতে হবে।
টিকাঃ
[২১] সুনানে আবু দাউদ ২৫১৩