📄 হারাম সম্পর্ক ও নারী
নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই বয়ঃসন্ধিকালে পা দিতে না দিতে শরীরে ও মস্তিষ্কে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হতে থাকে। বয়সটা তখন নতুনত্বের আবিষ্কারের। সবকিছুই তখন ভালো লাগে, আবেগময় লাগে। আবার এই সময়টাতে মনে হয় যে, পৃথিবীর কেউ তাকে বুঝে না, বুঝতে চায় না। দুচোখ পেতে কান্না আসতে চায়। তাই একাকিত্ব ঘুচাতে প্রয়োজন হয় একজন বন্ধুর। সুখ-দুঃখ, অন্তরালের কথা বা গোপন কিছু সবই যার কাছে বলা যাবে। এভাবে শুরু হয় হারাম সম্পর্কগুলো। তারপর অপরিণত মস্তিষ্ক কিছুটা পরিপক্কতা পেলেও অভ্যাসটা ঠিকই রয়ে যায়।
আল্লাহভীতি না থাকায় খুব সহজেই এ রকম হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে যায় অনেকেই। এরপর হয়তো যিনা। আবার আল্লাহ চাইলে বিয়ের মাধ্যমে পাপমোচনের সুযোগ করে দেন তাদেরকে অথবা উভয়ের মন ভাঙে অচিরেই। আল্লাহর পথে ফিরে আসার পর পূর্বের জীবনের জন্য অনুতপ্ত হয়ে গভীর রাতে রবের সামনে দাঁড়ায় অনেকে। মুনাজাতে রিক্ত হাতে চোখের নোনাজল পড়ে ফোঁটায় ফোঁটায়। তার রব তো তাকে ক্ষমা করে দেবেই। মানুষ কি ক্ষমা করতে পারে এত সহজে?
হারাম সম্পর্কের ক্ষেত্রে পুরুষের উদ্দেশ্যটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তার দূষিত অন্তরে গোপন থাকে। অন্তত এই ভোগবাদী সমাজ পুরুষকে তা-ই শিখিয়েছে। নারীরা হয় আবেগী। খুব সস্তা কিছু কথায় গলে যায় তারা। বিপরীত লিঙ্গের মানুষটা কতটুকু যোগ্য, তার হাতে সে কতটা নিরাপদ, পরিবার মানবে কি না, সর্বোপরি আল্লাহ এরূপ কাজে খুশি কি না এসব তোয়াক্কা না করে খুব সহজেই দুর্বল হয়ে পড়ে নারীরা। আমাদের জরিপ বলে, মাত্র ৩৯.৪০% নারী দ্বীনে আসার পূর্বে কোনো হারাম সম্পর্কে জড়ায়নি। বাকি ৬০.৬০% নারী হারাম সম্পর্কে জড়িত ছিল। মোট ১৬% নারীর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ছিল। বাকি ৪৪.৬০% নারীর হারাম সম্পর্কে মোটামুটি বা সামান্য অন্তরঙ্গতা ছিল।
হারাম সম্পর্কের ক্ষেত্রে অন্তরঙ্গতা কেমন ছিল
হারাম সম্পর্কে জড়িত ছিলাম না ৩৯.৪০%
অনেক গভীর ছিল ১৬.০০%
মোটামুটি ২৩.৩০%
বেশি একটা না ২১.৩০%
এর মধ্যে দ্বীনে আসার পরও পূর্বের হারাম সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি ১০% নারী। আর দ্বীনে ফিরে আসার পরও পূর্বের কথা স্মরণ করেন প্রায় ২২%।
📄 হারাম সম্পর্ক থেকে ফিরে আসা নারীর মন বোঝা
হারাম সম্পর্ক থেকে ফিরে আসা একজন নারী যখন দ্বীনে প্রবেশ করে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে তার পূর্বের গুনাহর বিষয়ে অনুতপ্ত থাকে। পূর্বের সম্পর্কের জন্য আবেগ রয়ে যায় এমনটা নারীদের ক্ষেত্রে কমই হয়। কিন্তু হারাম সম্পর্ক থেকে পরিপূর্ণভাবে তাওবা করে ফিরে আসা একজন নারীকে মাঝে মাঝেই চরিত্র নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয় স্বামীদের থেকে যা বৈবাহিক সম্পর্কে মারাত্মক কুপ্রভাব ফেলে। তাই আমাদের জেনে রাখা উচিত যে, এসব ক্ষেত্রে একজন পুরুষের করণীয় ও বর্জনীয় কী কী।
◆ অতীত জানতে মানা : স্ত্রীর অতীত সম্পর্কে জানতে চাইবেন না। কারণ, এতে কোনো লাভ নেই। তার অতীতে যদি কোনো হারাম সম্পর্ক থেকে থাকে সে সেটার জন্য অনুতপ্ত হলে আল্লাহ তাকে মাফ করে দিয়েছেন বলে আশা করা যায়। বিষয়টি তার ও তার রবের মধ্যেই থাকতে দিন। খুঁটিয়ে পূর্বের সম্পর্কের কথা বের করতে যাবেন না। কারণ, হয়তো এ ক্ষেত্রে আপনার অন্তরে ক্ষোভ ও হিংসা জন্ম নিতে পারে。
◆ নিজ থেকে জানাতে চাইলে: অধিকাংশ নারী নিজেদের অতীত নিজ থেকেই আগ বাড়িয়ে জানাতে চায়। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের অন্তরকে ভারমুক্ত করতে চায়। কিন্তু ইসলামে নিজের পাপকর্ম গোপন রাখার বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। এমনকি স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে নিজের অতীত সম্পর্কে জানানোও ইসলামে নিষেধ। কেননা এতে লাভের কিছুই নেই, বরং ক্ষতিই হওয়ার সম্ভাবনা অধিক। তাই স্ত্রী জানাতে চাইলেও স্বামীর উচিত বাধা দেয়া। তাকে এভাবে বোঝাতে হবে যে, তার অতীত কী ছিল তা নিয়ে আপনার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। আপনি তাকে তার বর্তমানের জন্য ভালোবাসেন。
◆ জেনে গেলে স্বাভাবিক থাকা: যদি কোনো মাধ্যমে জেনেও যান, তাহলে তা জানা পর্যন্তই রাখুন, সেটা নিয়ে আর চিন্তা করবেন না। আপনার স্ত্রী আপনারই আছেন এবং শেষদিন পর্যন্ত আপনারই থাকবে আল্লাহ যদি চান। তাই এ নিয়ে বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। মানুষ ভুল করে। কিন্তু নিজের ভুল মেনে নেয় কমই। নিশ্চয় আপনার স্ত্রী তার ভুল মেনে নিয়েছে এবং রবের কাছে সে ক্ষমা চেয়েছে। তাই এ নিয়ে কষ্ট পাওয়া যাবে না, মন থেকে স্ত্রীকে আপনিও মাফ করে দিন。
◆ রাগের সময় সাবধান : স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কালে-ভদ্রে মনোমালিন্য হবে, এটাই দাম্পত্য জীবনের অংশ। কিন্তু তা যাতে এতটা খারাপ পর্যায়ে চলে না যায় যে, মুখের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। যত যা-ই হোক, রাগের মাথায় স্ত্রীকে তার অতীত নিয়ে কোনোপ্রকার কথা শোনানো যাবে না। যদি তিনি তাওবা করে থাকেন এরপরও যদি তাকে তার অতীত নিয়ে কথা শোনানো হয়, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ নারাজ হবেন। তাই এ বিষয়ে পুরুষদের আল্লাহকে ভয় করা উচিত。
◆ অতীতকে ভুলিয়ে দিন: নারীরা খুব চায় যে তার স্বামী তার প্রতি স্নেহশীল হবে। তারা চায় তাদের স্বামী তাদেরকে সময় দেবে, তাদের সাথে গল্প করবে। তাদের চাওয়াগুলো সব সময় পূরণ করুন, স্ত্রী অতীতকে পুরোপুরিভাবে ভুলে যেতে বাধ্য হবে。
◇ স্ত্রী অতীতের প্রতি দুর্বল হলে: সাধারণত দ্বীনি মেয়েরা অতীতের হারাম সম্পর্কের ব্যাপারে অনুতপ্ত থাকে। তবুও যদি ভাগ্যক্রমে এমন হয় যে স্ত্রী এখনো তার অতীত নিয়ে ভাবে, তাহলে হুটহাট চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রথমত বুঝে নিতে হবে এখানে আপনার কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কি না। কেননা, নারীরা স্বভাবগতভাবেই সুখে থাকলে দুঃখের কথা ভুলে যায়। তাই বোঝার চেষ্টা করুন যে, কী কারণে আপনার স্ত্রী দুঃখী এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিন। তবু না বুঝলে ঠান্ডা মাথায় তার সাথে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলুন。
◆ সন্দেহবাতিক রোগ দূর করুন: কথায় কথায় স্ত্রীকে সন্দেহ করবেন না। সব সময় মন্দ ধারণা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখুন, সুধারণা করুন। নিশ্চয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে মন্দ ধারণা ভুলই হয় এবং এটি গুনাহের কাজও। [১]
টিকাঃ
[১] সূরা হুজুরাত- ১২
📄 পর্নোগ্রাফি ও নারী
পর্নোগ্রাফি এমন এক মহামারি যা কাউকে ছাড়েনি। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এর সবচেয়ে বড় ভোক্তা হলেও শিশু এবং নারীরা যে এ থেকে মুক্ত এমনটি নয়। ইন্টারনেট আজ এতটাই খোলামেলা যে, কেবল কয়েকটি টাচ বা ক্লিকের ব্যবধানে যিনায় জড়ানো সম্ভব। অথচ অবস্থা এই যে, আমাদের বর্তমান জমানার 'আল্ট্রাস্মার্ট' পিতামাতাগণ খুব অল্প বয়সে বাচ্চাদের হাতে ইন্টারনেট সমেত ফোন, কম্পিউটার তুলে দিচ্ছেন। আর এর পরিণতি কেমন হতে পারে এই বিষয়ে অভিভাবকগণ থাকে সম্পূর্ণ বেখবর। পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে কর্মরত একটি বিদেশি সংস্থার মতে, পর্নোগ্রাফি ভিডিও বা পর্নোসাইট অকস্মাৎভাবে বাচ্চাদের চোখের সামনে চলে আসাই ছোটকাল থেকে পর্নাসক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। পর্ন সাইটগুলোতে বয়সের তথাকথিত সীমা ১৮ বা তার বেশি। অথচ কেবল একটি ক্লিক করেই ১৮ বছরের কম-বয়স্ক শিশুরাও সাইটগুলোতে ঢুকতে পারে। পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শে আসার গড় বয়স মাত্র ১১ বছর। ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই প্রায় ৯৩.২% ছেলে এবং ৬২.১% মেয়ের সামনে পর্নোগ্রাফি উন্মুক্ত হয়।[২]
অস্ট্রেলিয়ান ইন্সটিটিউট অফ ফ্যামিলি স্টাডি-এর এক জরিপে উঠে এসেছে আরও ভয়ানক তথ্য। সেখানে এক মাসের জন্য জরিপ চালিয়ে দেখা গিয়েছে ৪৪% শিশু যাদের বয়স সর্বনিম্ন ৯ বছর, তাদের সামনে কোনো না কোনোভাবে অশ্লীল কন্টেন্ট প্রকাশিত হয়েছে।[৩]
অনলাইন সিকিউরিটি কোম্পানি বিটডিফেন্ডার-এর নতুন গবেষণায় জানা যায় যে, পর্নোগ্রাফি সাইটে যারা প্রবেশ করে তাদের মাঝে ২২%-ই দশ বছরের কম বয়সী শিশু। সেখানে আরও বলা হয় যে, ১০ জনের মধ্যে ১ জন ১০ বছরের কম বয়সী শিশু অশ্লীল ভিডিও সাইটে প্রবেশ করে।[৪]
ইন্টারনেট ঘাঁটলে এমন আরও শত শত সার্ভে পাওয়া যাবে যেখানে এই ভয়ানক বিষয়টির সত্যতা উঠে এসেছে। পর্নোগ্রাফির এই ভয়াল ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মুক্ত নয় কোমলমতি শিশুরাও।
শিশুরা নাহয় কৌতূহল থেকে ওই জগৎ সম্পর্কে জানে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কা নারীরা তো স্বভাবগতভাবেই লাজুক। তাদেরকেও কি পর্নোগ্রাফি গ্রাস করতে পারে? উত্তর হচ্ছে 'হ্যাঁ'। অন্তত ওমেন্স সাইকোলজি সার্ভে তা-ই বলে। সার্ভেতে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে ৫৯.৬০% নারী জীবনে কখনো না কখনো পর্নোগ্রাফি দেখেছেন। এর মাঝে ২৮.৮০% নারী দ্বীনে প্রবেশের পূর্বে প্রায়ই পর্নোগ্রাফি দেখতেন। ২৭.৯০% নারী ২-৩ বারের অধিক দেখেননি। বাকি ২.৯০% নারী জানিয়েছেন তারা পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্ত ছিলেন।
দ্বীনে প্রবেশের পূর্বে আপনি কি পর্ন দেখতেন?
এডিক্টেড ছিলাম ২.৯০%
জি ২৮.৮০%
খুবই কম ২৭.৯০%
না ৪০.৩০%
পর্নোগ্রাফির প্রতি কতটুকু আসক্তি অনুভব করে এই প্রশ্নে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে ৩% নারী জানিয়েছেন যে, তারা পর্নোগ্রাফির প্রতি অনেক বেশি আসক্ত। ২৭% নারী মাঝারি আসক্ত এবং ৭০% নারী এইরূপ আসক্তি থেকে সুস্থ।
পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তি
* একেবারেই না
* মাঝারি আসক্ত
* অনেক বেশি আসক্ত
মেনস সাইকোলজি সার্ভে থেকে প্রাপ্ত সংখ্যাগুলোও বেশ উদ্বেগের কারণ। আমাদের জরিপ বলে, দ্বীনে প্রবেশের পূর্বে ৯১.৩০% পুরুষ পর্নোগ্রাফি দেখেছে। এর মাঝে ১৮.৮০% পর্নাসক্ত ছিল।
দ্বীনে প্রবেশের পূর্বে আপনি কি পর্নোগ্রাফি দেখতেন? এডিক্টেড ছিলাম ১৮.৮০% খুবই কম ২৭.৫০% -না ৮.৭০% জি ৪৫.০০%
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে দ্বীনে আসার পরও পর্নাসক্তি রয়ে গেছে ৫০.১০% পুরুষের। এর মাঝে দ্বীনে আসার পরও পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্ত হয়েছেন ৬.৩০% পুরুষ। আসক্তি থেকে সরে আসতে পেরেছেন মাত্র ৩১.৩০% পুরুষ।
দ্বীনে প্রবেশের পর কি পর্নাসক্তি থেকে সরে আসতে পেরেছেন?
দ্বীনে আসার পূর্বে এডিকশন ছিল না, দ্বীনে আসার পর এডিকশন হয়েছে
এডিকশন ছিল না, এখনো নেই আলহামদুলিল্লাহ
হাল ছেড়ে দিয়েছি
এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি
জ্বী পেরেছি আলহামদুলিল্লাহ
৬.৩০%
১৮.৮০%
৪৩.৮০%
৩১.৩০%
ওপরের পরিসংখ্যান থেকে খুব সহজেই আঁচ করা যায় যে, পুরুষদের চেয়ে নারীদের ব্রাউজিং হিস্টোরি তুলনামূলক কম নাপাক। যে পুরুষেরা পর্নোগ্রাফির অবাস্তব দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত বিচরণ করেছে সে স্বাভাবিকভাবেই তার স্ত্রীর মাঝে সেই বিষয়গুলোর উপস্থিতি কামনা করবে। অথচ অধিকাংশ নারী সেই জঘন্য দুনিয়ার সাথে ততটা পরিচিত না। ফলে পুরুষদের মাঝে নিজের স্ত্রীদের নিয়ে দেখা দেয় অতৃপ্তি যা শেষে গিয়ে সম্পর্ক-ভাঙন পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে।
সমাজ আজ নৈতিক অবক্ষয়ের পথে। নগ্নতার এই বাঁধভাঙা ঢেউ হন্যে হয়ে ধেয়ে আসছে আমাদের দিকে। কীভাবে জানা নেই, তবে যে করেই হোক একে থামাতে হবে, আমাদের পরিবার, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে।
টিকাঃ
[২] https://www.netnanny.com/blog/the-detrimental-effects-of-pornography-on-small-children/
[৩] https://aifs.gov.au/publications/effects-pornography-children-and-young-people-snapshot
[৪] https://www.netnanny.com/blog/the-detrimental-effects-of-pornography-on-small-children/
📄 নারীদের বিয়ের প্রয়োজনীয়তা
দ্বীনদার পুরুষদের বিয়ের উদ্দেশ্য মূলত চরিত্র রক্ষা, নজর ও লজ্জাস্থান হেফাযতের সাথে সম্পৃক্ত। দ্বীনদার নারীদের ক্ষেত্রে বিয়ের প্রয়োজনীয়তাটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বহুমুখী। ওমেন'স সাইকোলজি সার্ভের মাধ্যমে আমরা নারীদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, বিয়ে কেন তাদের জন্য প্রয়োজনীয়। উত্তরে অনেকে একাধিক প্রয়োজনের কথা জানিয়েছেন। এর মাঝে দ্বীন পালন, লজ্জাস্থান ও দৃষ্টি হেফাযত এবং পারিবারিক চাপ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া অনেকের জন্য বিয়ে প্রয়োজনীয় কারণ তারা চলমান হারাম সম্পর্ক থেকে সরে আসতে চায়।
বিবাহ আপনার জন্য কেন প্রয়োজনীয়
চলমান হারাম সম্পর্ক থেকে সরে আসতে ২৩.৯০%
নজর ও লজ্জাস্থানের গুনাহ থেকে বাঁচতে ৬৯.৩৫%
দ্বীন ভালোভাবে মানার জন্য ৮৫.৬০%
পরিবারের চাপ থেকে মুক্তি পেতে ৩৮.০০%
আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য ২০.৭০%
দ্বীনি নারীরা সাধারণত ঘরের ভেতরে থাকে। ফলে তারা বাইরের জগৎ সম্পর্কে একট কম অবগত থাকে। পুরুষেরা যেভাবে নানান হালাকা, মাজলিস, দ্বীনি আসর, আলিমদের সোহবতে থেকে ইলম অর্জন করতে পারে সেই সুযোগটা নারীদের থাকে না বললেই চলে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জেনারেল পড়ুয়া দ্বীনদার নারীদের পরিবারের সদস্যদের দ্বীনের বুঝ কম হয়ে থাকে। ফলে কোনো মাহরামের সাথে গিয়ে দ্বীনি হালাকায় উপস্থিত হবে এটা সম্ভব হয় না। তাই দ্বীনের ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে তার শেষ আশ্রয় হয়ে যায় একজন দ্বীনি জীবনসঙ্গী। সুতরাং ইলম অর্জনের এই সংকীর্ণতা থেকে আল্লাহর ইচ্ছায় পরিত্রাণ দিতে পারে একজন দ্বীনদার স্বামী। বিয়ের মাধ্যমে একজন দ্বীনদার নারীর ক্ষেত্রে তার স্বামীই এসব সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া বাইরে বের হলে নারীর জন্য তার স্বামীই হয় তার দেহরক্ষী। ফলে গাইরে মাহরামদের সাথে কথাবার্তা বলার প্রয়োজন হয় না, অথবা বখাটেদের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও কমে আসে।
এই ফিতনার জামানায় সবচেয়ে বহুল প্রচলিত এবং অন্যতম সহজলভ্য গুনাহ হলো অবৈধ প্রেমের সম্পর্ক। নারী এবং পুরুষদেরকে সময়মতো বিয়ে না দেওয়ার কারণে তারা জড়িয়ে যায় হারাম সম্পর্কের মতো ভয়াবহ গুনাহে। আর শয়তানের ওয়াসওয়াসার জন্য এই গুনাহ থেকে দ্বীনি নারী ও পুরুষরাও নিরাপদ নয়। তারাও পরিবারকে বিয়ের জন্য না মানাতে পেরে নিজেরাই এই গুনাহে পতিত হয়ে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বিয়ের কথা-বার্তার নামে তারা নিজেরদের মধ্যে গোপনে যোগাযোগ করে অনেক দূর পর্যন্ত এই অবৈধ সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যায়। বিবাহ-বহির্ভূত এই প্রেমের সম্পর্কে ঘটে নানান কুরুচিপূর্ণ কার্যাদি। কথাবার্তা তো চলেই, সেই সাথে অনেকে মোবাইল ফোনে নানান অশ্লীল ও গোপন ছবি, ভিডিও আদান-প্রদানও করে থাকে।
এ ছাড়া যখন একজন ব্যক্তি দ্বীনে প্রবেশ করে তখন পরিবার তথা সবচেয়ে আপন মানুষগুলোও পর হয়ে যায়। ছেলে যখন দিনরাত আড্ডাবাজি করে বেড়াত, সিগারেটে ফুঁ দিয়ে জগৎকে নোংরা করত, মেয়ে যখন এবড়ো-খেবড়ো ছেলেমানুষের সাথে বন-বাদারে ঘুরে বেড়াত তখন টু শব্দটুকু নেই। যত সমস্যা বাধল ভালোতে, যত সমস্যা বাধল দ্বীন পালনের সময়! এহেন পরিস্থিতিতে পুরুষেরা দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে শক্ত হতে পারলেও নারীদের আমল ও ঈমানের ওপর অটল থাকতে বেশ বেগ পোহাতে হয়। অনেক পরিবার থেকে চালানো হয় নির্যাতনের স্টিম রোলার। এমন পরিবার থেকে নিজেকে ও নিজের দ্বীনকে হেফাযত করতে অনেক দ্বীনি বোনের জন্য বিবাহই অন্যতম সমাধান হয়ে দাঁড়ায়। ওমেন'স সাইকোলজি সার্ভের কিছু মন্তব্য পড়লে বোঝা যায়, বিয়ে তাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
* আমি বাসা থেকে অনেক দূরের এক মেডিকেল হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করি। সেখানে এত এত ফিতনা। সেখানকার পরিবেশ আর ছেলেমেয়েরা এত আপডেটেড যে, তাদের অবস্থা দেখে হতবাক হয়ে যাই। রাতে একবার দরকারে বেরিয়েছিলাম, সন্ধ্যা না হতেই এত কাপলের ছড়াছড়ি, এত খুল্লাম খুল্লাভাবে তারা প্রেম করছে, চক্ষুলজ্জা না থাকলে মানুষ কত নীচে নেমে যায় তাদের দেখে বুঝেছি। ঢাবির কার্জনে গিয়ে আরেকদিন স্তব্ধ হয়ে যাই। এত অশালীন সেখানকার মানুষজনের অবস্থা। এক দাড়িওয়ালা ভাইকে দেখলাম এক বোনের নিকাব টেনে চুমু খেতে। দ্বীনের লেবাস পড়া ভাইবোনের এই অবস্থা হলে বেদ্বীনিদের কী অবস্থা হতে পারে! হোস্টেলে আমার রুমের ২৪ জনের মধ্যে ১৮ জনের বয়ফ্রেন্ড আছে, রুমে অনেক সময় অশালীন আলাপ হয়। আরও কতশত ফিতনার মধ্যে থেকেছি। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ করোনার উসিলায় বাসায় ফেরার তৌফিক দিলেন। বাসায় এসেও শান্তি নেই। পরিবারে ন্যূনতম সালাতেরও অভ্যাস নেই। পর্দা করতে গেলে অনেক কথা শুনতে হয়। মাকে ইনবাতের ওনলি সিস্টার্স কোর্সের আনিকা তুবা আপুর দারসও শুনিয়েছিলাম। কিছুদিন ঠিক ছিলেন, পরে আবার যেই সেই। বাসায় গাইরে মাহরামের সামনে পর্দা করে গেলে, তাদের দিকে না তাকালে, কথা না বলতে চাইলে মা অনেক রাগ করেন আর অনেক কথা শুনান আমাকে। আলহামদুলিল্লাহ, বাসায় থেকে দা'ওয়াহ দেয়ার চেষ্টা করেছি, কখনো ঝিমিয়েও গিয়েছি হতাশ হয়ে। আল্লাহ আমার পরিবারকে হিদায়ত দান করুক। সারাদিন গান-বাজনা, বেদ্বীনি পরিবেশে থেকে নিজের দ্বীনদারিও অনেকটা খুইয়েছি। বাসায় বসে ইলম অর্জন করতে পারি না, কোনো মাদরাসা বা ইসলামিক কোর্সে ভর্তির ক্ষেত্রে তেমন সহায়তা নেই, দ্বীনি বোনের সাথে ফোনে কথা বলতে পারি না। তাদের কাছে আমি খারাপ হয়ে গিয়েছি। আমার মনোবল, দ্বীনদারি সবকিছু এখন তলানিতে। এখন ইচ্ছা করে ফিতনাময় হোস্টেলে দ্বীনি বোনদের সোহবতে নিজের ঈমানি ধার বাড়াতে, দ্বীনের পথে এগিয়ে যেতে। একটা সঙ্গী চাই, যে সত্যিকার অর্থেই আমার অর্ধেক দ্বীন পূর্ণ করবে। এত এত ফিতনা থেকে আমাকে রক্ষা করবে। ইসলামের হুকুম-আহকাম পালনে আমি ঢিলেমি দেখালে কড়াভাবে আমাকে শাসন করবে শিক্ষকের মতো। যার অনেক গাইরত থাকবে আমাকে নিয়ে। যার মাধ্যমে দুনিয়াতে নেককার সন্তান রেখে যেতে পারব, আল্লাহর রাস্তায় নিজেকে, তাকে ও সন্তানদেরকে উৎসর্গ করতে পারব।
* আমার পরিবার বেদ্বীন, আমাকে অত্যাচার করে। দ্বীন পালন করা আমার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নামাজ বেশি সময় নিয়ে পড়লেও কথা শুনায়। মূলত দ্বীন সুন্দরভাবে পালনের জন্য বিয়ে প্রয়োজন।
* পরিবারের ওপর আর বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। দ্বীন ভালোভাবে পালন করতে চাই।
* আমার পরিবার আমার পর্দার ব্যাপারে উদাসীন। আমার মনে হয়, বিয়ে হলে একজন গাইরতবিশিষ্ট দ্বীনি জীবনসঙ্গী পেলে আরও ভালোমতো পর্দা করতে পারব।
এ রকমই আরও অনেক মন্তব্যে ব্যথিত হতে হয়েছে আমাদেরকে। আমরা চাই পুরুষেরাও বুঝুক দ্বীনি বোনদের কথা, তাদের সংগ্রামের আর ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা。