📄 সহশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ
আল্লাহ নারী-পুরুষের মাঝে সৃষ্টিগত ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হিসেবেই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি একটি বিশেষ আকর্ষণ প্রদান করেছেন। নারী ও পুরুষজাতির মাঝে এই পারস্পারিক আকর্ষণ একদমই স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ সৃষ্টির সকল জীব ও ব্যবস্থাপনার মাঝে একটি ভারসাম্য ও সীমারেখা নির্দিষ্ট করেছেন। শরী'আহসম্মত বিবাহ ও শরী'আহ নির্ধারিত মাহরাম ব্যতীত কোনো নারী-পুরুষ একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করা কিংবা উঠবস করা অথবা একে অপরের সাথে অবাধে মেলামেশা হয় এমন পরিবেশে গমন করা মু'মিনদের জায়েয নেই। আল্লাহ বলেন,
( هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا )
তিনি ওই সত্তা, যিনি তোমাদের একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন। এবং এর মাঝ থেকেই তিনি তোমাদের একে অপরের (বৈবাহিক) জোড়া নির্ধারণ করেছেন, যাতে করে সে তার কাছে স্বস্তি পেতে পারে। [১৮]
এই আয়াতে আল্লাহ নারী ও পুরুষকে তার নির্ধারিত সীমারেখার মাঝে অবস্থানের রূপরেখা দেখিয়েছেন। বৈবাহিক সম্পর্ক ও আল্লাহ যাদের সাথে বিবাহ হারাম করেছেন তারা ব্যতীত বেগানা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইসলামে নিষেধ-সেটি হোক শিক্ষাক্ষেত্রে কিংবা কর্মক্ষেত্রে।
( وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ)
আর তোমরা তাঁর (নবী -এর) স্ত্রীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাঁদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। [১৯]
ইমাম কুরতুবী উক্ত আয়াতের আলোচনায় বলেন, এই আয়াতে আল্লাহ রাসূলুল্লাহ -এর স্ত্রীদের কাছে কোনো প্রয়োজনে পর্দার আড়াল থেকে কিছু চাওয়া বা কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করার অনুমতি দিয়েছেন। অন্যান্য সকল মু'মিন নারী-পুরুষেরাও উপরোক্ত হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।[২০] কিন্তু গুনাহে লিপ্ত হবার আশঙ্কা থাকলে এটিও জায়েয নেই। রাসূল ইরশাদ করেন,
وَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ، وَالْأَذْنَانِ زِنَاهُمَا الاسْتِمَاعُ، وَالنِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ وَالْيَدُزِنَاهَا الْبَطْشُ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ
চোখের যিনা হলো-(হারাম) দৃষ্টিপাত। কর্ণদ্বয়ের যিনা হলো-(গাইরে মাহরামের যৌন উদ্দীপক) কথাবার্তা মনোযোগ দিয়ে শোনা। জিহ্বার যিনা হলো-(গাইরে মাহরামের সাথে সুড়সুড়িমূলক) কথোপকথন। হাতের যিনা হলো-(নিজের লজ্জাস্থান বা গাইরে মাহরামকে) ধরা বা স্পর্শকরণ। পায়ের যিনা হলো-(খারাপ উদ্দেশ্যে) চলা। অন্তর চায় এবং কামনা করে আর লজ্জাস্থান তাকে বাস্তবে রূপ দেয় (যদি যিনা করে) অথবা মিথ্যায় পরিণত করে (যদি অন্তরের চাওয়া অনুপাতে যিনা না করে)।[২১]
আর অবাধ মেলামেশায় এই গুনাহসমূহ নিয়ন্ত্রণ করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। আল্লামা খাত্তাবী এ হাদীসের ব্যাখ্যায় 'মা'আলিমুস সুনান' এর ৩য় খণ্ডে লিখেছেন, "দেখা ও কথা বলাকে যিনা বলার কারণ এই যে, দুটোই হচ্ছে প্রকৃত যিনার ভূমিকা পালন করে, অবৈধ দৈহিক সহবাসের পূর্ববর্তী স্তর। কেননা দৃষ্টি হচ্ছে মনের গোপন জগতের উদ্বোধক আর জিহ্বা হচ্ছে বাণী-বাহক, যৌনাঙ্গ হচ্ছে বাস্তবায়নের হাতিয়ার।”
রাসূল আরও বলেছেন,
لا يَخْلُونَ رَجُلُ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
একজন নারীর সাথে একজন পুরুষ একাকী অবস্থান করলে তাদের মধ্যে শয়তান তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে যোগ দেয় (কুমন্ত্রণা প্রদানের উদ্দেশ্যে)। [২২]
আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল বলেন,
لا يخلون رجل بامرأة إلا ومعها ذو محرم، ولا تسافر المرأة إلا مع ذي محرم، فقام رجل فقال: يا رسول الله، إن امرأتي خرجت حاجة، وإني اكتتبت في غزوة كذا وكذا، قال: انطلق فحج مع امرأتك؛
মাহরাম পুরুষ ছাড়া যেন কোনো নারী কোনো পুরুষের সাথে নির্জনে মিলিত না হয় এবং মাহরাম ছাড়া কোনো নারী যেন একা সফর না করে। এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল , আমি তো অমুক অমুক যুদ্ধে নিজের নাম লিখিয়ে নিয়েছি আর আমার স্ত্রী (একা) হজ্জের সফরে বের হয়েছে।” নবী বললেন, “এখান থেকে উঠো এবং তোমার স্ত্রীর সাথে গিয়ে হজ্জ করো।” [২৩]
হাদীসে আরও এসেছে,
لأَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْسِ رَجُلٍ بِمِخْيَطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَ امْرَأَةٌ لَا تَحِلُّ لَهُ
কোনো ব্যক্তির মাথায় লৌহ পেরেক ঢুকে যাওয়া কোনো নারীকে অবৈধভাবে স্পর্শ করার চেয়ে উত্তম। [২৪]
আ'তা ইবনু আবী রবাহ বলেন,
لو انتمنت على بيت مال لكنت أميناً، ولا آمن نفسي على أمة شوهاء
যদি আমাকে বাইতুল মালের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, আমি অবশ্যই বিশ্বস্ত থাকতে পারব। কিন্তু আমি আমার নিজের নফসকে (প্রবৃত্তিকে) কোনো কুৎসিত দাসীর নিকটও নিরাপদ ও বিশ্বস্ত মনে করি না! [২৫]
অপরদিকে পুরুষের মতো নারীদের ক্ষেত্রেও গাইরে মাহরাম পুরুষদের দিকে তাকানো জায়েয নেই, যা আমরা পূর্বেও জেনেছি। সহশিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে ও যেসব কর্মস্থলে নারী-পুরুষ একত্র হয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানে একে অপরের সাথে অবাধ মেলামেশা, দৃষ্টিপাত, কথাবার্তা এমনকি ভয়ানক যিনার মাধ্যমে শরী'আহ লঙ্ঘন কোনো না কোনোভাবে হয়েই যায়। মোদ্দাকথা হলো, এমন পরিবেশে শরী'আতের বিধান পালন সম্ভবপর হয় না। সুতরাং সহশিক্ষা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইসলামী শরী'আহ কখনোই সমর্থন করে না।
উপরন্তু আল্লাহর বিধানের বিপরীতে সমাজব্যবস্থা আজ পর্দার এমন লঙ্ঘন করায় সমাজে যুবক-যুবতিদের মাঝে যেমন নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে তেমনি সমাজে বেড়েছে অবৈধ সন্তানের হিড়িক। আর এই বেপর্দার অভিশাপ আজকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বহন করতে হচ্ছে। অবৈধ যৌনাচার, অশ্লীলতা, অবৈধ উপার্জন, খুন, ধর্ষণসহ বহুবিধ অপরাধের মূল কারণ হচ্ছে এই বেপর্দা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা।
সর্বোপরি বোঝা গেল নারী-পুরুষের মেলামেশা হয় এমন কর্মক্ষেত্রে চাকরি করা বা সহশিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা জায়েয নেই। এ ক্ষেত্রে উচিত হবে এমন কোনো কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোঁজ করা যেখানে পর্দার লঙ্ঘন হবে না।
তবু যদি কোনোমতেই এমন প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে একজন পুরুষ জীবিকা নির্বাহের তাগিদে যতটুকু ছাড় না দিলেই নয় ততটুকু ছাড় দিয়ে এবং অন্তরে হারামের প্রতি ঘৃণা রেখে উক্ত প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা বা চাকরি করবে। সেই সাথে আল্লাহর কাছে সর্বদা নিজের অপারগতার জন্য মাফ চাওয়া ও অবস্থার পরিবর্তন করে দেয়ার জন্য অধিক পরিমাণে দু'আ করে যেতে হবে। সেই সাথে রিযিকের বিকল্প মাধ্যম খুঁজতে হবে।
টিকাঃ
[১৮] সূরা আ'রাফ- ১৮৯
[১৯] সূরা আহযাব- ৫৩
[২০] তাফসীরে কুরতুবী- ১৪/২২৭
[২১] সহীহ বুখারী- ৬২৪৩; সহীহ মুসলিম- ২৬৫৭; মুসনাদে আহমাদ- ৮২২২; ৮৯৩২
[২২] জামে তিরমিযী- ৪/৪৬৫, হাদীস- ২১৬৫; সুনানে নাসায়ী- ৫/৩৮৭ হাদীস- ১২১৯; সহীহ ইবনু হিব্বান- ১০, ১৫/৪৩৬, ১২২, হাদীস- ৪৫৭৬, ৬৭২৮; মুসনাদে আহমাদ- ৩/৪৪৬, হাদীস- ১৫৭৩৪; আদ দ্বিয়া ফিল আহাদীসিল মুখতারাহ- ১/১৯১ ও ১৯২, হাদীস-৯৬
[২৩] সহীহ বুখারী- ৩/১০৯৪, হাদীস- ২৮৪৪; সহীহ মুসলিম- ২/৯৭৮, হাদীস- ১৩৪১
[২৪] আস সিলসিলাতুস সহীহাহ- ২২৬
[২৫] সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, যাহাবী- ৯/৯৬; হিলইয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াইম তরজমা- ২৪৪