📄 অনলাইনে পুরুষের পর্দা
বাস্তবিক জগতের বাইরেও সকালে ঘুম থেকে উঠে রাত্রিকালে পুনরায় ঘুমানো পর্যন্ত একটি নতুন জগতে আমরা হাতছানি দিয়ে থাকি প্রতিনিয়ত। অনলাইন জগতের কথা বলা হচ্ছে। পূর্ববর্তী দারসে কীভাবে অনলাইনে পুরুষেরা বিভিন্ন ফিতনা এড়িয়ে চলতে পারে এর প্রায়োগিক ধারণা আমরা পেয়েছি। এই দারসে আমরা এর প্রতি শরঈ দৃষ্টিকোণ নিয়ে আলোচনা করব।
অফলাইন হোক বা আনলাইন, উভয় ক্ষেত্রেই নারী-পুরুষের অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক উভয় পর্দা খুবই জরুরি। অনলাইনের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ পর্দা হচ্ছে, বিপরীত লিঙ্গের কারও প্রোফাইল, পোস্ট, ছবি দেখে তার প্রতি কুচিন্তা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আর বাহ্যিক পর্দা হচ্ছে বিপরীত লিঙ্গের কাউকে সরাসরি ম্যাসেজ করা, তাদের পোস্টে অযথাই কমেন্ট করা, নিজের গোপন বিষয় নিয়ে পোস্ট করে মানুষকে জানানো, অবয়ব বা নারীকে আকর্ষণ করে এমন কোনো কিছুর ছবি পোস্ট করা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা। এসব ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করে চলতে হবে। কোনো নারীর অনলাইন কার্যক্রম দেখে তার প্রতি কুচিন্তা আনা বা কোনো কারণ ছাড়া খাতির জমানোর জন্য তাদেরকে ম্যাসেজ দেয়া আর সরাসরি দেখে কোনো মেয়ের ব্যাপারে কুচিন্তা করা বা সরাসরি তাদের সাথে অযথা কথা বলা একই গুনাহ। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত অনলাইনের জীবনে এসব থেকে সাবধান হওয়া।
📄 সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে ছবি আপলোড
প্রথমত, ছবি সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে দেয়া জায়েয কি না তা জানার আগে আমাদের জানতে হবে, ছবি তোলা জায়েজ কি না! এ নিয়ে উলামায় কেরামগণ বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। কেউ বলেছেন নাজায়েয, কেউ কেউ আবার জায়েয বলেছেন। যারা একে নাজায়েয বলেন তাঁরা বিভিন্ন হাদীস থেকে এর স্বপক্ষে দলিল পেশ করেন। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
كُلُّ مُصَوِّرٍ فِي النَّارِ يُجْعَلُ لَهُ بِكُلِّ صُورَةٍ صَوَّرَهَا نَفْسُ فَيُعَذِّبُهُ فِي جَهَنَّمَ প্রত্যেক ছবি নির্মাতা জাহান্নামে যাবে, তার নির্মিত প্রতিটি ছবির পরিবর্তে একটি করে প্রাণ সৃষ্টি করা হবে, যা তাকে জাহান্নামে শাস্তি দিতে থাকবে। [১]
আব্দুল্লাহ ইবনে উমার থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, إِنَّ الَّذِينَ يَصْنَعُونَ هَذِهِ الصُّوَرَ يُعَذِّبُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ، يُقَالُ لَهُمْ: أَحْبُوا مَا خَلَقْتُمْ যারা এসব ছবি বানায়, কিয়ামতের দিন তাদের শাস্তি দেয়া হবে এবং তাদের উদ্দেশে বলা হবে, যা তোমরা বানিয়েছ তাতে জীবন দাও। [২]
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ القِيَامَةِ المُصَوِّرُونَ যারা ছবি বানাবে, কিয়ামতের দিন তাদের সবচেয়ে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে [৩]
উল্লেখিত হাদীস ছাড়াও আরও বহু হাদীসগ্রন্থে সহীহ বর্ণনায় এর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। [৪] উল্লিখিত সবগুলো হাদীসই মারফু'। হাদীসগুলো থেকে বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, ছবি অঙ্কন, বানানো অথবা ক্যামেরার মাধ্যমে তোলা নিষেধ। ছবিটি ভাস্কর্য (দেহবিশিষ্ট) অথবা কাগজ, কাপড়, প্লাস্টিক বা অন্য যেকোনো উপায়েই প্রস্তুতকৃত হোক না কেন; এ ক্ষেত্রে হুকুমের কোনো তারতম্য নেই। অর্থাৎ সব ধরনের ছবির ক্ষেত্রেই শরী'আতের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে। যেমন: 'আল মাউসুআতুল ফিকহিয়াতুল কুয়িতিয়্যাহ' গ্রন্থে বলা হয়,
ইমাম্মদের পদা: ৩ يحرم تصوير ذوات الأرواح مطلقا، أي سواء أكان للصورة ظل أو لم يكن وهو مذهب الحنفية والشافعية والحنابلة وتشدد النووي حتى ادعى الإجماع عليه وفي دعوى الإجماع نظر يعلم مما يأتي وقد شكك في صحة الإجماع ابن نجيم
প্রাণ রয়েছে এমন সকল কিছুর ছবি সার্বিকভাবে হারাম। চাই তার ছায়া থাকুক বা না থাকুক। এটা হানাফি, শাফেঈ ও হাম্বালীদের মত। ইমাম নববী এ ক্ষেত্রে খুব বেশি কড়াকড়ি করেছেন। এমনকি এর ওপর ইজমা বা সকল ইমামের ঐকমত্য রয়েছে বলে দাবি করেছেন। কিন্তু তাঁর এই ইজমার দাবির ওপর প্রশ্ন রয়েছে। পরবর্তী আলোচনা থেকে তা জানা যাবে। ইমাম ইবনে নুজাইম উক্ত ইজমা সহীহ হওয়ার ব্যাপারে সংশয় প্রকাশ করেছেন। [৫]
আরবের প্রসিদ্ধ ফিক্হ গবেষণা সংস্থা 'আল লাজনাতুদ দায়িমা'-এর আলেমগণ একটি প্রশ্নের উত্তরে বলেন,
التصوير الفوتوغرافي الشمسي من أنواع التصوير المحرم، فهو والتصوير عن طريق النسيج والصبغ بالألوان والصور المجسمة سواء في الحكم، والاختلاف في وسيلة التصوير و آلته لا يقتضي اختلافا في الحكم
আলোকচিত্র বা ফটোগ্রাফি হারাম ছবির প্রকারভুক্ত। সুতা বা বিভিন্ন রং দ্বারা অঙ্কনকৃত ছবি এবং শরীর-বিশিষ্ট প্রতিকৃতি সবকিছুই হুকুমের ক্ষেত্রে সমান। ছবি তৈরি বা সৃজনের মাধ্যমের ভিন্নতার কারণে হুকুমে কোনো তারতম্য হবে না। [৬]
তবে যারা জায়েয বলেছেন তাদের কেউই অপ্রয়োজনে ছবি তোলা বা সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে ছবি পোস্ট করাকে সুন্নাহ, মুস্তাহাব বা সওয়াবের কাজ বলেননি। উম্মাহর আজ এই বেহাল দশার একটা বড় কারণ হচ্ছে এই যে, আমরা জায়েয এবং নাজায়েয খুঁজি; উত্তম খুঁজি না। বর্তমানে কথায় কথায় ছবি-সেলফি তোলাটা আমাদের একটা ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মনে রাখতে হবে, আমাদের কাজ হচ্ছে সওয়াব জমা করা, জায়েয কাজের পেছনে পড়ে থাকা মু'মিনের সিফাত নয়। তাই এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট বিধানের ওপর আমল করাই আমাদের জন্য উত্তম। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর হুকুম অনুসরণ করার ক্ষেত্রে যত বেশি কঠোরতা অবলম্বন করা যায়, ততই তাকওয়ার জন্য অধিক সহায়ক। ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবি তোলার বিধান নিয়ে বর্তমান আলেমদের ইখতিলাফ রয়েছে। এ কারণে অবৈধ ও অশ্লীল কিংবা যা দেখা নাজায়েজ এমন ছবি মোবাইল ফোনে তুলে রাখা জায়েয অথবা নাজায়েয উভয়ই হতে পারে। যারা ছবি তোলা জায়েয বলেছেন তারা উক্ত ছবি অযথা কাগজে প্রিন্ট করাকে নাজায়েয ও হারাম বলেছেন। তাই ছবি কাগজে প্রিন্ট না করলে অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা আপলোড না করলে গুনাহ হতেও পারে আবার নাও হতেও পারে। কিন্তু মু'মিনদের উচিত নয় এমন অনিশ্চয়তায় থাকা। অর্থাৎ অপ্রয়োজনে ছবি তোলা যদি বর্জন করা যায়, তাহলে তা হবে তাকওয়ার আলামত।
দ্বিতীয়ত, মু'মিন নারী-পুরুষ অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে। তাই এসব অনর্থক কাজ পরিহার করতে হবে। [৭] আল্লাহ বিশ্বাসীদের গুণাবলি বর্ণনা করে বলেন,
(وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا) যখন তারা অনর্থক বিষয়ের সামনে দিয়ে অতিক্রম করে যায় তখন সম্মানের সাথেই এড়িয়ে চলে। [৮]
রাসুলুল্লাহ বলেন, من حسن إسلام المرء: تركه مالا يعنيه ইসলামের অনুপম দিকসমূহের মাঝে অন্যতম হচ্ছে, কোনো (মুসলিম) ব্যক্তি (যাবতীয়) অনর্থক কাজ পরিহার করবে। [১]
হাদীসটি বিভিন্ন সনদে বেশ ক'জন সাহাবীর থেকে হাসান ও যঈফ সূত্রে রিওয়ায়াত হয়েছে। ইমাম নববী-সহ বেশ কজন মুহাদ্দিস এ হাদীসকে সহীহ ও হাসান বলেছেন। ইমাম ইবনু কাইয়্যিম আল জাওযিয়্যাহ বলেন,
وقد جمع النبي صلى الله عليه وسلم الورع كله في كلمة واحدة، فقال: (من حسن إسلام المرء: تركه مالا يعنيه) ، فهذا يعم الترك لما لا يعني : من الكلام، والنظر، والاستماع، والبطش، والمشي، والفكر، وسائر الحركات الظاهر والباطن، فهذه كلمة شافية في الورع
নবী ﷺ এই একটি কথার মাঝে আল্লাহ-ভীরুতার সকল নির্দেশের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন এ হাদীসটির মাধ্যমে। সুতরাং এখানে অনর্থক কাজ পরিহার করার ব্যাপকতা হচ্ছে— কথায়, নজরে, শ্রবণে, ধরায়, চলায়, চিন্তা করায় ও সকল বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনর্থক কাজ পরিহার করা। আর এসকল বিষয়ই হচ্ছে আল্লাহ-ভীরুতার সাথে সংশ্লিষ্ট। [১০]
সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে ছবি দেয়া নিঃসন্দেহে অযথা ও অনর্থক কাজ। ঈমানদার পুরুষেরা এমন কাজে সময় অপচয় করতে পারে না। এসব বেহুদা অনর্থক কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।
তৃতীয়ত, পুরুষদের ক্ষেত্রে পরনারীর দিকে তাকানো যেমন জায়েয নেই, নারীদের ক্ষেত্রেও তেমনি কোনো পরপুরুষের দিকে তাকানো নাজায়েয। আল্লাহ বলেন, وَقُل لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ আর মু'মিন নারীদেরকে বলো, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করে... [১১]
পর্দা-বিষয়ক এই দীর্ঘ আয়াতের সূচনাভাগেই বলা হচ্ছে, নারীরা যাতে পুরুষদের থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় বা দৃষ্টি অবনত রাখে। এর পূর্বের আয়াতে পুরুষদেরকে দৃষ্টি সংযত রাখার কথা বলা হয়েছে, পুরুষদের সেই বিধানে নারীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু নজর হেফাযতের বিধানটিতে জোর প্রদান করতে উক্ত আয়াতে নারীদের জন্যও পৃথকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। [১২]
ইমাম ইবনু কাসীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, أي: عما حرم الله عليهن من النظر إلى غير أزواجهن، ولهذا ذهب كثير من العلماء إلى أنه لا يجوز للمرأة أن تنظر إلى الرجال الأجانب بشهوة، ولا بغير شهوة أصلاً তারা যাতে তাদের স্বামী ব্যতীত অন্য কোনো পরপুরুষের দিকে দৃষ্টিপাত না করে, কেননা আল্লাহ তাদের জন্য এটি হারাম করেছেন। এই জন্যই অধিকাংশ আলিমদের মতে, কামনা-বাসনায় হোক কিংবা কামনা-বাসনাবিহীন হোক, উভয় অবস্থাতেই নারীদের জন্য বেগানা পুরুষের দিকে তাকানো নাজায়েয। [১৩]
এর পরিপ্রেক্ষিতে জুমহুরদের দলিল হচ্ছে,
أم سلمة حدثته أنها كانت عند رسول الله صلى الله عليه وسلم وميمونة قالت فبينا نحن عنده أقبل ابن أم مكتوم فدخل عليه وذلك بعدما أمرنا بالحجاب فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم احتجبا منه فقلت يا رسول الله أليس هو أعمى لا يبصرنا ولا يعرفنا فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم أفعميا وان أنتما ألستما
تبصرانه
আম্মাজান উম্মে সালামাহ ও মাইমুনা নবীজি-এর নিকট বসা ছিলেন, এমতাবস্থায় অন্ধ সাহাবী ইবনে উম্মে মাকতুম আসলেন। নবীজি বললেন, "তোমরা তার সামনে পর্দা করো (অর্থাৎ পর্দার অন্তরালে চলে যাও, তাকে দেখো না)।” আমি (উম্মে সালামাহ) বললাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, উনি তো অন্ধ! আমাদের তো দেখছেনও না আবার আমাদের চিনেনও না।" নবী বললেন, (সে না হয় দেখছে না কিন্তু) তোমরা কি অন্ধ? তোমরা কি দেখো না?" [১৪]
আল্লাহ বলেন,
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِن وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ)
যখন তোমরা নারীদের নিকট প্রয়োজনীয় কোনো কিছু চাইবে তখন পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের ও তাদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার বিষয় [১৫]
উক্ত কথাগুলো বলার কারণ হচ্ছে, নারীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে ছবি দেয়া যেমন নাজায়েয, পুরুষদের জন্যও একই বিধান। যেই পুরুষেরা সামাজিক যোগাযোগ- মাধ্যমে ছবি দিয়ে থাকেন তাদের কারণে অনেক নারী ফিতনায় পরে যায়, তাদের অন্তর কলুষিত হয় এবং ইনবক্সে যোগাযোগের চেষ্টাও করে। শয়তানের কলাকৌশলের কাছে হেরে অনেকেই হারাম সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে যায়।
আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, কিছু ভাইয়েরা সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে বোনদের ছবি আপলোড করাকে দূষণীয় মনে করে, নিজেদের দৃষ্টি সংযত রাখার ক্ষেত্রে একে ক্ষতিকর মনে করে; অথচ তারাও দেখা যায় নিজেদের ছবি সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে আপলোড করে নারীদের দৃষ্টির পর্দা লঙ্ঘন করছে। এ ছাড়া বদনজরের ভয় তো আছেই। হাদীসে এসেছে, “বদনজর সত্য”।[১৬] সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে নিজের ছবি আপলোড করে নিজের অজান্তেই বজনজরের শিকার হতে পারে যে কেউ।
সুতরাং অনলাইনে ছবি দেয়ার মাধ্যমে আমাদের একই সাথে তিনটি গুনাহ হচ্ছে- নাজায়েয কাজ করা, অনর্থক কাজে লিপ্ত হওয়া এবং নারীদের দৃষ্টির পর্দার লঙ্ঘন করে তাদেরকে গুনাহে লিপ্ত করা।
টিকাঃ
[১] সহীহ বুখারী- ২২২৫, ৫৯৬৩; সহীহ মুসলিম- ৫৬৬২
[২] সহীহ বুখারী- ৫৯৫১
[৩] সহীহ বুখারী- ৫৯৫০
[৪] সহীহ বুখারী- ১৩৪১; সহীহ বুখারী- ২২২৫; সহীহ বুখারী- ৫৬১৮; সহীহ বুখারী-৫৯৬০; সহীহ বুখারী- ৫৯৬২; সহীহ বুখারী- ৬১০৯; সহীহ মুসলিম- ৯৬৯; সহীহ মুসলিম- ২১০৬; সহীহ মুসলিম- ২১১১; সহীহ মুসলিম- ২১১২; সহীহ মুসলিম- ৫৪৩৩; সুনানে তিরমিযী- ১৭৪৯; মুসনাদে আহমদ-(সূত্র) ফাতহুল বারী- ১৭/২৭৯
[৫] আল মাওসুআতুল ফিকহিয়াতুল কুয়িতিয়্যাহ- ১২/১০৫
[৬] আল লাজনাতুত দায়িমা- ১/৬৬৯
[৭] তাকমিলা ফাতহিল মুলহিম- ৪/১৬৪; ফাতওয়ায় রহীমিয়াহ- ৪/১০৬; কিফায়াতুল মুফতী- ৫/৩৮৮; হিদায়া- ৪/৪৫৮; মিশকাত- ২/২৮০; সূরা নূর- ৩০
[৮] সূরা ফুরক্বান- ৭২
[১] তিরমিযী- ৪/২৩১৭; ইবনু মাজাহ- ২/৩৯৭৬; ইবনু হিব্বান- ১/২২৯; শুয়াবুল ঈমান- ৪/২৫৫; আরবাঈন আস সুগরা- ১৯; মুসনাদে শিহাব- ১/১৯; আল কামেল- ৬/৫৪
[১০] মাদারিজুস সালেকীন- ২/২২
[১১] সূরা আন নূর-৩১
[১২] কুরতুবি, ফাতহুল বারী
[১৩] তাফসীরে ইবনু কাসীর- ৬/৪৫
[১৪] তিরমিযী- ২৭৭৮; আবু দাউদ- ৪১১২; নাসায়ী- ৯১৯৭; ইবনে রাহউইয়াহ- ৪/৮৫,১৬০; আহমাদ- ৬/২৯৬; আবু ইয়ালা- ১২/৩৫৩ হাদীস- ৬৯২২; মুশকিলুল আসার, ত্বহাবী- ১/২৬৫; ইবনে হিব্বান- ১২/৩৮৭-৩৮৯; সুনানে কুবরা, বাইহাক্বী- ৭/৯২; ইবনে আব্দিল বার- ১৯/১৫৫; খত্নীব- ৩/১৮; ইবনে আসাকির- ৫৪/৪৩৫; মিযযী- ২৯/৩১৩; মু'জামুল কাবীর, ত্ববারানী- ২৩/৩০২, হাদীস- ৬৭৮; তাফসীরে ইবনু কাসীর- ৬/৪৫, সূরা নূর- ৩১ এর তাফসীর। সনদটির সার্বিক বিবেচনায় অধিকাংশ মুহাদ্দিসই একে হাসান ও সহীহ বলেছেন। তবে কেউ কেউ সনদে উল্লেখিত নাবহানের কারণে হাদীসটির সনদকে যঈফ বলেছেন।
[১৫] সূরা আহযাব- ৫৩
[১৬] সুনানে ইবনে মাজাহ-৩৫০৬
📄 পুরুষদের মাহরাম
মাহরাম বলা হয় তাদেরকে, যাদের সাথে বিবাহ করা হারাম এবং যাদের সামনে পর্দার শিথিলতা রয়েছে। অপরপক্ষে গায়রে মাহরাম বলা হয় তাদেরকে, যাদের সাথে বিবাহ করা হারাম নয় এবং যাদের সামনে পর্দা করা ফরয। যাদের সামনে পর্দা করা পুরুষদের জন্য আবশ্যক নয় তারা হলো:
১. স্ত্রী: স্ত্রীকে দেখা ও তাকে দেখা দেয়া, তার সামনে নিজের সৌন্দর্য প্রদর্শন করা, তার সাথে ঘনিষ্ঠ সময় কাটানো জায়েয এবং সওয়াবের কাজ। তার সামনে কোনোপ্রকার পর্দা করতে হবে না।
২. মা, দাদি, নানি ও তাদের ঊর্ধ্বতন নারীগণ: আপন মা, সৎ মা এবং দুধ মা মাহরাম। অন্য যেকোনো প্রকারের মা, যেমন: ধর্মীয় মা, পালক মা মাহরাম নন। আর আপন দাদি বা নানি এবং দাদা-দাদি ও নানা-নানির আপন বোন, দুধ বোন, সৎ বোন মাহরাম। তেমনি দাদা-দাদি ও নানা-নানির মা, নানি-দাদি এভাবে যত ওপরেই যাক, সবাই মাহরাম।
৩. শাশুড়ি, আপন দাদি-নানিশাশুড়ি এবং তাদের ঊর্ধ্বতন নারীগণ: আপন শাশুড়ি ও দুধ-শাশুড়ি মাহরাম। তবে সৎ শাশুড়ি, যেমন: শ্বশুরের প্রাক্তন স্ত্রী মাহরাম নন। ঠিক তেমনি, আপন দাদিশাশুড়ি, নানিশাশুড়ি ও দুধ দাদি-নানিশাশুড়ি, মাহরাম। সৎ দাদিশাশুড়ি, সৎ নানিশাশুড়ি, মামিশাশুড়ি, চাচিশাশুড়ি, খালাশাশুড়ি ও ফুপুশাশুড়ি কেউই মাহরাম নন।
৪. কন্যা, পুত্রবধূ, পুত্রের কন্যা, কন্যার কন্যা অধস্তন নারীগণ : আপন কন্যা, দুধ কন্যা ও স্ত্রীর পূর্বের স্বামীর ঔরসজাত কন্যা মাহরাম। কিন্তু পালক কন্যা ও ধর্মীয় কন্যা মাহরাম নন। অপরদিকে আপন পুত্রের কন্যা বা আপন কন্যার কন্যা, সৎ পুত্রের কন্যা বা সৎ কন্যার কন্যা, দুধ পুত্রের কন্যা বা দুধ কন্যার কন্যা ও তাদের অধস্তন নারীরা মাহরামভুক্ত। কিন্তু তাদের পালক কন্যা ও ধর্মীয় কন্যা মাহরাম নন। অনুরূপ আপন পুত্র বা কন্যার পুত্রের স্ত্রী এবং দুধ পুত্র বা দুধ কন্যার পুত্রের স্ত্রী এভাবে যত নিচের দিকে যাক সবাই মাহরামভুক্ত। তবে সৎ পুত্রের স্ত্রী মাহরাম নন।
৫. বোন: আপন বোন, সৎ বোন ও দুধ বোন অর্থাৎ আপন মায়ের দুধ কন্যা, দুধ মায়ের আপন, সৎ, দুধ কন্যা মাহরাম। সৎ মা অথবা সৎ বাবার অন্য ঘরের কন্যা মাহরাম নন। এ ছাড়া চাচাতো, খালাতো, মামাতো, ফুপাতো বোন এবং ভাইয়ের স্ত্রী, স্ত্রীর বোনেরা মাহরাম নন।
৬. ভাতিজি : আপন ভাইয়ের কন্যা, সৎ ভাইয়ের কন্যা, দুধ ভাইয়ের কন্যা মাহরাম।
৭. ভাগনি : আপন বোনের কন্যা, সৎ বোনের কন্যা, দুধ বোনের কন্যা মাহরাম।
৮. ফুপু: আপন ফুপু, সৎ ফুপু ও দুধ ফুপু অর্থাৎ আপন পিতার দুধ বোন, দুধ পিতার আপন বোন মাহরাম। কিন্তু চাচি, সৎ বাবার বোন মাহরাম নন।
৯. খালা : আপন খালা, সৎ খালা ও দুধ খালা অর্থাৎ আপন মায়ের দুধ বোন, দুধ মায়ের আপন বোন মাহরাম। তবে মামি, সৎ মায়ের বোন মাহরাম নন।
১০. নাবালিকা: এমন অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকা যার মাঝে পুরুষদের প্রতি কোনো আকর্ষণ নেই এমন মেয়ের দিকে সাধারণভাবে তাকানো, স্বাভাবিক আদর করার উদ্দেশ্যে ছোঁয়াতে কোনো সমস্যা নেই।
১১. অন্যান্য পুরুষ: পুরুষদের সামনে পুরুষদেরকে দৃষ্টির পর্দা করতে হবে না। অর্থাৎ, একজন পুরুষ অপর পুরুষদের সতর ব্যতীত সকল স্থানে তাকাতে পারবে, স্পর্শ করতে পারবে, কথা বলতে পারবে। [১৭]
ওপরে বর্ণিত মাহরামের তালিকা ব্যতীত পৃথিবীর সকল নারীই পুরুষদের জন্য এবং সকল পুরুষই নারীদের জন্য গাইরে মাহরাম।
মাহরাম চার্ট
সাদা নানা/নানীর বোন দাদী সৎ ফুফু সৎ বাবা চাচি দুধ বলা আপন মা আপন বাবা দুধ বাবা সৎ বাবা কাজিন আমি স্ত্রী স্ত্রীর পূর্বের স্বামীর মেয়ে স্ত্রীর পূর্ণের স্বামী সৎ মেয়ে বোনের মেয়ে ভাইয়ের মেয়ে মেয়ে ছেলে ছেলের স্ত্রী সৎ বাবার মেয়ে দাদী/নানী শাশুড়ি শাশুড়ি ফুয়/খালা শাশুড়ি পলিকা শালক শালকের স্ত্রী নাতী নাত বউ
টিকাঃ
[১৭] সূরা নূর- ৩১; সহীহ বুখারী- ২৬৪৫; সুনানে তিরমিযী- ১১৪৬; সহীহ বুখারী (শরহে কসতল্লানী সহ)- ৯/১৫০; ফাতহুল বারী- ১/১৩৮; সহীহ মুসলিম বি শারহিন নাবাবি- ১০/২২; তুহফাতুল আহওয়াযী- ৪/২৫৪; তাফসীরে রাযী- ২৩/২০৬; তাফসীরে কুরতুবী- ১২/২৩২, ২৩৩; তাফসীরে আলুসী- ১৮/১৪৩; ফাতহুল বায়ান ফি মাকাসিদ আল-কুরআন- ৬/৩৫২; আহকামুল কুরআন- ৩/৩১৭; তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন- ২/২৫৬-৩৬১; তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন- ৬/৪০১-৪০৫; তাফসীরে মাযহারী- ২/২৫৪-২৬১ ও ৬/৪৯৭-৫০২; শরহ মুসলিম, নববী- ৯/১০৫; উমদাতুল কারী- ৭/১২৮; বাদায়েউস সানায়ে- ২/৩০০, ৫/৬৭ থেকে ৯৯; রদ্দুল মুহতার ২/৪৬৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/২১৯: তাবয়ীনল হাকায়েক- ২/২৪৩; তাফসীরে রুহুল মাআনী- ৪/২৫২; আলবাহরুর রায়েক- ৩/৯৩
📄 সহশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ
আল্লাহ নারী-পুরুষের মাঝে সৃষ্টিগত ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হিসেবেই বিপরীত লিঙ্গের প্রতি একটি বিশেষ আকর্ষণ প্রদান করেছেন। নারী ও পুরুষজাতির মাঝে এই পারস্পারিক আকর্ষণ একদমই স্বাভাবিক। কিন্তু আল্লাহ সৃষ্টির সকল জীব ও ব্যবস্থাপনার মাঝে একটি ভারসাম্য ও সীমারেখা নির্দিষ্ট করেছেন। শরী'আহসম্মত বিবাহ ও শরী'আহ নির্ধারিত মাহরাম ব্যতীত কোনো নারী-পুরুষ একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করা কিংবা উঠবস করা অথবা একে অপরের সাথে অবাধে মেলামেশা হয় এমন পরিবেশে গমন করা মু'মিনদের জায়েয নেই। আল্লাহ বলেন,
( هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا )
তিনি ওই সত্তা, যিনি তোমাদের একটি প্রাণ থেকে সৃষ্টি করেছেন। এবং এর মাঝ থেকেই তিনি তোমাদের একে অপরের (বৈবাহিক) জোড়া নির্ধারণ করেছেন, যাতে করে সে তার কাছে স্বস্তি পেতে পারে। [১৮]
এই আয়াতে আল্লাহ নারী ও পুরুষকে তার নির্ধারিত সীমারেখার মাঝে অবস্থানের রূপরেখা দেখিয়েছেন। বৈবাহিক সম্পর্ক ও আল্লাহ যাদের সাথে বিবাহ হারাম করেছেন তারা ব্যতীত বেগানা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইসলামে নিষেধ-সেটি হোক শিক্ষাক্ষেত্রে কিংবা কর্মক্ষেত্রে।
( وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ)
আর তোমরা তাঁর (নবী -এর) স্ত্রীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাঁদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। [১৯]
ইমাম কুরতুবী উক্ত আয়াতের আলোচনায় বলেন, এই আয়াতে আল্লাহ রাসূলুল্লাহ -এর স্ত্রীদের কাছে কোনো প্রয়োজনে পর্দার আড়াল থেকে কিছু চাওয়া বা কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করার অনুমতি দিয়েছেন। অন্যান্য সকল মু'মিন নারী-পুরুষেরাও উপরোক্ত হুকুমের অন্তর্ভুক্ত।[২০] কিন্তু গুনাহে লিপ্ত হবার আশঙ্কা থাকলে এটিও জায়েয নেই। রাসূল ইরশাদ করেন,
وَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ، وَالْأَذْنَانِ زِنَاهُمَا الاسْتِمَاعُ، وَالنِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ وَالْيَدُزِنَاهَا الْبَطْشُ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ
চোখের যিনা হলো-(হারাম) দৃষ্টিপাত। কর্ণদ্বয়ের যিনা হলো-(গাইরে মাহরামের যৌন উদ্দীপক) কথাবার্তা মনোযোগ দিয়ে শোনা। জিহ্বার যিনা হলো-(গাইরে মাহরামের সাথে সুড়সুড়িমূলক) কথোপকথন। হাতের যিনা হলো-(নিজের লজ্জাস্থান বা গাইরে মাহরামকে) ধরা বা স্পর্শকরণ। পায়ের যিনা হলো-(খারাপ উদ্দেশ্যে) চলা। অন্তর চায় এবং কামনা করে আর লজ্জাস্থান তাকে বাস্তবে রূপ দেয় (যদি যিনা করে) অথবা মিথ্যায় পরিণত করে (যদি অন্তরের চাওয়া অনুপাতে যিনা না করে)।[২১]
আর অবাধ মেলামেশায় এই গুনাহসমূহ নিয়ন্ত্রণ করা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। আল্লামা খাত্তাবী এ হাদীসের ব্যাখ্যায় 'মা'আলিমুস সুনান' এর ৩য় খণ্ডে লিখেছেন, "দেখা ও কথা বলাকে যিনা বলার কারণ এই যে, দুটোই হচ্ছে প্রকৃত যিনার ভূমিকা পালন করে, অবৈধ দৈহিক সহবাসের পূর্ববর্তী স্তর। কেননা দৃষ্টি হচ্ছে মনের গোপন জগতের উদ্বোধক আর জিহ্বা হচ্ছে বাণী-বাহক, যৌনাঙ্গ হচ্ছে বাস্তবায়নের হাতিয়ার।”
রাসূল আরও বলেছেন,
لا يَخْلُونَ رَجُلُ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
একজন নারীর সাথে একজন পুরুষ একাকী অবস্থান করলে তাদের মধ্যে শয়তান তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে যোগ দেয় (কুমন্ত্রণা প্রদানের উদ্দেশ্যে)। [২২]
আরেক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল বলেন,
لا يخلون رجل بامرأة إلا ومعها ذو محرم، ولا تسافر المرأة إلا مع ذي محرم، فقام رجل فقال: يا رسول الله، إن امرأتي خرجت حاجة، وإني اكتتبت في غزوة كذا وكذا، قال: انطلق فحج مع امرأتك؛
মাহরাম পুরুষ ছাড়া যেন কোনো নারী কোনো পুরুষের সাথে নির্জনে মিলিত না হয় এবং মাহরাম ছাড়া কোনো নারী যেন একা সফর না করে। এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল , আমি তো অমুক অমুক যুদ্ধে নিজের নাম লিখিয়ে নিয়েছি আর আমার স্ত্রী (একা) হজ্জের সফরে বের হয়েছে।” নবী বললেন, “এখান থেকে উঠো এবং তোমার স্ত্রীর সাথে গিয়ে হজ্জ করো।” [২৩]
হাদীসে আরও এসেছে,
لأَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْسِ رَجُلٍ بِمِخْيَطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَ امْرَأَةٌ لَا تَحِلُّ لَهُ
কোনো ব্যক্তির মাথায় লৌহ পেরেক ঢুকে যাওয়া কোনো নারীকে অবৈধভাবে স্পর্শ করার চেয়ে উত্তম। [২৪]
আ'তা ইবনু আবী রবাহ বলেন,
لو انتمنت على بيت مال لكنت أميناً، ولا آمن نفسي على أمة شوهاء
যদি আমাকে বাইতুল মালের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, আমি অবশ্যই বিশ্বস্ত থাকতে পারব। কিন্তু আমি আমার নিজের নফসকে (প্রবৃত্তিকে) কোনো কুৎসিত দাসীর নিকটও নিরাপদ ও বিশ্বস্ত মনে করি না! [২৫]
অপরদিকে পুরুষের মতো নারীদের ক্ষেত্রেও গাইরে মাহরাম পুরুষদের দিকে তাকানো জায়েয নেই, যা আমরা পূর্বেও জেনেছি। সহশিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে ও যেসব কর্মস্থলে নারী-পুরুষ একত্র হয়ে কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানে একে অপরের সাথে অবাধ মেলামেশা, দৃষ্টিপাত, কথাবার্তা এমনকি ভয়ানক যিনার মাধ্যমে শরী'আহ লঙ্ঘন কোনো না কোনোভাবে হয়েই যায়। মোদ্দাকথা হলো, এমন পরিবেশে শরী'আতের বিধান পালন সম্ভবপর হয় না। সুতরাং সহশিক্ষা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইসলামী শরী'আহ কখনোই সমর্থন করে না।
উপরন্তু আল্লাহর বিধানের বিপরীতে সমাজব্যবস্থা আজ পর্দার এমন লঙ্ঘন করায় সমাজে যুবক-যুবতিদের মাঝে যেমন নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে তেমনি সমাজে বেড়েছে অবৈধ সন্তানের হিড়িক। আর এই বেপর্দার অভিশাপ আজকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বহন করতে হচ্ছে। অবৈধ যৌনাচার, অশ্লীলতা, অবৈধ উপার্জন, খুন, ধর্ষণসহ বহুবিধ অপরাধের মূল কারণ হচ্ছে এই বেপর্দা ও নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা।
সর্বোপরি বোঝা গেল নারী-পুরুষের মেলামেশা হয় এমন কর্মক্ষেত্রে চাকরি করা বা সহশিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা জায়েয নেই। এ ক্ষেত্রে উচিত হবে এমন কোনো কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোঁজ করা যেখানে পর্দার লঙ্ঘন হবে না।
তবু যদি কোনোমতেই এমন প্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে একজন পুরুষ জীবিকা নির্বাহের তাগিদে যতটুকু ছাড় না দিলেই নয় ততটুকু ছাড় দিয়ে এবং অন্তরে হারামের প্রতি ঘৃণা রেখে উক্ত প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা বা চাকরি করবে। সেই সাথে আল্লাহর কাছে সর্বদা নিজের অপারগতার জন্য মাফ চাওয়া ও অবস্থার পরিবর্তন করে দেয়ার জন্য অধিক পরিমাণে দু'আ করে যেতে হবে। সেই সাথে রিযিকের বিকল্প মাধ্যম খুঁজতে হবে।
টিকাঃ
[১৮] সূরা আ'রাফ- ১৮৯
[১৯] সূরা আহযাব- ৫৩
[২০] তাফসীরে কুরতুবী- ১৪/২২৭
[২১] সহীহ বুখারী- ৬২৪৩; সহীহ মুসলিম- ২৬৫৭; মুসনাদে আহমাদ- ৮২২২; ৮৯৩২
[২২] জামে তিরমিযী- ৪/৪৬৫, হাদীস- ২১৬৫; সুনানে নাসায়ী- ৫/৩৮৭ হাদীস- ১২১৯; সহীহ ইবনু হিব্বান- ১০, ১৫/৪৩৬, ১২২, হাদীস- ৪৫৭৬, ৬৭২৮; মুসনাদে আহমাদ- ৩/৪৪৬, হাদীস- ১৫৭৩৪; আদ দ্বিয়া ফিল আহাদীসিল মুখতারাহ- ১/১৯১ ও ১৯২, হাদীস-৯৬
[২৩] সহীহ বুখারী- ৩/১০৯৪, হাদীস- ২৮৪৪; সহীহ মুসলিম- ২/৯৭৮, হাদীস- ১৩৪১
[২৪] আস সিলসিলাতুস সহীহাহ- ২২৬
[২৫] সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, যাহাবী- ৯/৯৬; হিলইয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াইম তরজমা- ২৪৪