📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 দৃষ্টি-আগুন

📄 দৃষ্টি-আগুন


একজন পুরুষের জন্য পর্দার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে দৃষ্টির হেফাযত। এ সম্পর্কে শরঈ বিধান আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি। ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নজর হেফাযতের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।

একজন পুরুষ যতই সুদর্শন হোক না কেন, তার দিকে দৃষ্টিপাত করলে নারীদের যে সুখাবেগ অনুভূত হবেই এমনটি নয়; সুদর্শনের পাশাপাশি নারী আরও অনেক কিছুর সমন্বয় খোঁজে পুরুষদের মাঝে। তাই নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আপেক্ষিক। একজন পুরুষকে খুব বেশি ভালো লেগে গেলে একজন নারী হয়তো দৃষ্টিপাত করবে। সেটা কিছু মুহূর্তের জন্য, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরক্ষণে তার লাজুক প্রকৃতির কারণে সে চোখ ফিরিয়ে নেবে। আর সেই পুরুষকে নিয়ে তার চিন্তাও ততটা গাঢ় হবে না। অপরদিকে একজন নারীর দিকে দৃষ্টিপাত করলে পুরুষের অন্তরে খুব গভীর আবেগ অনুভূত হয়ে থাকে। তা নারীর সৌন্দর্য, দৈহিক আকর্ষণ, আবেদন, কণ্ঠ, চোখ, চুল ইত্যাদির মাঝে যেকোনো একটির কারণেও হতে পারে। যদি সেই নারীর সৌন্দর্য ততটা না থাকে, তাহলে তার দৈহিক গঠন পুরুষের আকর্ষণের কারণ হবে। যদি সেই নারীর কেবল চুলটা সুন্দর হয়, তাহলে সেটাই পুরুষকে কুপোকাত করার জন্য যথেষ্ট হবে। নারীর দিকে সামান্য দৃষ্টি পুরুষকে অনেক গভীর কুচিন্তায় নিমগ্ন করতে পারে। তাই পুরুষদের চোখের পর্দা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

পাপকর্মের প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা থাকবে তা ঠিক, কিন্তু অপরদিকে মানুষের মাঝে লজ্জাশীলতাও সহজাত। একজন সাধারণ পুরুষ নারীর দিকে তাকাতে লজ্জা পাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কৈশোর থেকেই অন্তরের কুপ্রবৃত্তি তাকে বারবার তাড়না দেবে পরনারীদের দিকে তাকাতে। কারণ তখন বয়সটা আবিষ্কারের। কেউ যদি প্রতিবার দমন করে যেতে পারে, তাহলে একটা সময় তার কাছে সেটা আজীবনের জন্য সহজ হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে ভুলটা হয় অন্তরকে আস্কারা দিয়ে। প্রথমে অন্তরে দ্বিধাবোধ নিয়ে পরনারীর দিকে দৃষ্টিপাত যায়। অতঃপর দ্বিধাবোধ কেটে যায়, একটা সময় তা অভ্যাসে পরিণত হয়। পুরুষদের লজ্জাটা এভাবেই ভাঙে। রাস্তার কোনো মেয়েই তখন দৃষ্টি ফাঁকি দিতে পারে না। যৌবনের উত্তাল ঢেউ যখন পাল তোলা নৌকায় দোলা দেয় তখন দৃষ্টিগোচর হয় নারীদের শরীরের গোপন স্থানগুলো। এরপর নিজের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই হারিয়ে যায়। নিজের দেহের চাহিদা তখন সে নাপাক উপায়ে মেটাতে উদ্যত হয়। নারীদেরকে দেখতে সহজ, কিন্তু ধরতে মানা। অথচ অন্তর আরও আধিক্যের পেছনে ছোটে। এভাবে চক্ষু প্রবেশ করে এক নীল দুনিয়ায়। পর্নোগ্রাফির পরতে পরতে সবক রয়েছে বিকৃত যৌনক্ষুধার। কতশত মানুষ সেই মেকি জগতের কর্মকাণ্ডকে বাস্তবে রূপ দিতে চেয়ে নিজের অন্তরকে হত্যা করেছে সেই সংখ্যা আমাদের কাছে বেমালুম। সেই যে যাত্রা শুরু এক পলক দৃষ্টির খিয়ানত দিয়ে, এরপর আগুনের মাত্রা যেন বেড়েই চলতে থাকে।

চোখের গুনাহ দিয়েই বড় বড় রকমের গুনাহের যাত্রা শুরু। যারা দৃষ্টির খিয়ানতের মতো জঘন্য এই পাপ থেকে ফিরে আসতে পারে না, তারা দাম্পত্য জীবনেও অখুশি হয়। কারণ, যার চোখে দুনিয়ার সুন্দরী নারীরা কারাবন্দী তার চোখে স্ব-স্ত্রী কুৎসিত। এ ছাড়া নজরের খিয়ানত অন্তরকে এমনভাবে মেরে ফেলতে সক্ষম যে একজন মানুষ নিজের মা, বোন, মেয়ের প্রতিও কুদৃষ্টি দিতে কুণ্ঠাবোধ করবে না! আমরা পাশ্চাত্য সমাজের দিকে তাকাতে পারি যে, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা তাদেরকে কী দিয়েছে? সমাজে অবাধে দৃষ্টির খিয়ানত নির্লজ্জ জাতি গড়ে তোলে। পুরুষেরা যখন দেখতে চাইবে, নারীরাও ধীরে ধীরে দেখাতে চাইবে। এ থেকেই সমাজে ধর্ষণ, হত্যার মতো অপকর্মগুলোর সয়লাব হয়। তখন সমাজকে চিড়িয়াখানা বলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 নারী-পুরুষ নির্বুদ্ধিয়া

📄 নারী-পুরুষ নির্বুদ্ধিয়া


নারী এবং পুরুষের সহাবস্থানের একমাত্র ইসলাম অনুমোদিত ক্ষেত্র হচ্ছে দাম্পত্য জীবন। ইসলামে বিয়ে-বহির্ভূত অবাধ বিচরণকে শক্তভাবে অসমর্থন করা হয়েছে এবং কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যাতে মানুষ অন্তত শাস্তির ভয়ে সেদিকে পা না বাড়ায়। বর্তমানে দৈহিক স্বাধীনতার যুগে ইসলামের এই বিধান বর্বর মনে হতে পারে। কিন্তু একটু সুদূরদৃষ্টি নিক্ষেপণ করলে বোঝা যায়, সমাজের যত ব্যাধি ও অপকর্ম রয়েছে সবকিছুর পেছনে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে অবাধ যৌনতা দায়ী। বিবাহ-বহির্ভূত গর্ভধারণ, ভ্রূণহত্যা, মাদক, ধর্ষণ, খুন, চুরি-ডাকাতি সব ধরনের অপকর্মের পেছনে কোনো না কোনোভাবে অবাধ যৌনতার রেশ খুঁজে পাওয়া যাবে। এ কারণেই আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের উদ্দেশ্যে ইসলাম নারী-পুরুষের পর্দার লঙ্ঘন ও অবাধ মেলামেশার ব্যাপারে এতটা কঠোর। এই কঠোরতা যদি সমাজে অবলম্বন করা হতো, তাহলে যাবতীয় রাহাজানির কপাট বন্ধ করে দেয়ার জন্য তা যথেষ্ট হতো।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু সমাজের প্রতিটি স্থানে নারী-পুরুষের সমতা রক্ষার নাম করে পর্দার বিধান লঙ্ঘন করা হচ্ছে। ফলে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা বাড়ছে, অবৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠছে, অবৈধ সন্তান জন্ম নিচ্ছে, অসম্মতির কারণে ধর্ষণ করা হচ্ছে, মতের অমিল বা মনোমালিন্যের কারণে হত্যা পর্যন্ত করা হচ্ছে। যেই পাশ্চাত্য সভ্যতাকে আমরা অনুসরণ করে নিজেদের পরিবর্তন করতে চাচ্ছি একবারও কি সেই সমাজের ভঙ্গুর অবস্থার কথা আমরা ভেবেছি? আমেরিকার মতো উন্নত (!) দেশে প্রতি ৭৩ সেকেন্ডে একজন নারী যৌন নিপীড়নের শিকার হয়। [১] প্রতি বছর ৪,৩৩,৬৪৮ জন নারী ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, যার মাঝে প্রায় ১৫% নারী ১২-১৭ বছর বয়সী। [২] সেই দেশে ৩৫% যুগলের বিবাহ-বহির্ভূত সন্তান (অর্থাৎ যাকে বলা হয় জারজ সন্তান) রয়েছে। ১৯৬৮ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ের মাঝে এই হার বেড়েছে দ্বিগুণ। [৩] ভাবুন, হয়তো আজ থেকে কিছু যুগ পর আমেরিকার প্রতিটি মানুষই হবে জারজ। শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই বাস্তব।

সমাজ আমাদেরকে সহশিক্ষা ও নারী-পুরুষের সম্মিলিত কর্মক্ষেত্রের বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে রেখেছে, কিন্তু নিজেদেরকে বাঁচানোর দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই। স্রোতের তালে গা ভাসানো যাবে না। পরনারীর সাথে অবাধে মেলামেশা থেকে নিজের গা বাঁচিয়ে চলতে হবে। এ ক্ষেত্রে নজর হেফাযতের পাশাপাশি জবান হেফাযতও অনেক কার্যকরী। পুরুষদের জন্য কথার পর্দাও বিশেষ রকমের গুরুত্ব বহন করে, যা নিয়ে আজকাল ও রকম আলোচনা হয় না।

• যেসকল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হয় সেসকল স্থান এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে উত্তম। এ ক্ষেত্রে ইসলামের মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেয় এমন প্রতিষ্ঠান সন্ধান করা বাঞ্ছনীয়।
• প্রয়োজন ব্যতীত পরনারীর সাথে অযথাই কথা বলা জায়েয নেই। আল্লাহর রাসূল জবানের হেফাযত করতে আদেশ দিয়েছেন। পরনারীর সাথে অপ্রয়োজনে সুড়সুড়িমূলক কথাবার্তা বলাও জিহ্বার যিনা।

• কথা বলার পরিস্থিতিই যেন সৃষ্টি না হয় সে দিকে লক্ষ রাখতে হবে। অপরপক্ষ থেকে কথা বলতে এলেও কয়েকবার এডিয়ে যেতে হবে। আশা করা যায়, এতে একটা সময় তারা কথা বলার জন্য আর অগ্রসর হবে না।

◇ খুব প্রয়োজন হলে ঠিক ততটুকুই কথা বলা, যতটুকু না হলেই নয়। বাড়তি কথা খরচ না করে গাম্ভীর্য নিয়ে কথা বলা এবং সেই মুহূর্তে নজরকে হেফাযত করে রাখা উচিত।

• কথাবার্তায় যেসকল শব্দ ও বাক্য ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তারপর অন্তরের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা এবং নিজের প্রতি সৎ থাকা দরকার।

• পরনারীর সাথে ব্যক্তিগত কথাবার্তা এড়িয়ে চলা উচিত। ব্যক্তিগত সমস্যা, কষ্ট, শখ, ইচ্ছা ইত্যাদি পরনারীকে বলার মতো কোনো বিষয় নয়। ফিতনার দুয়ার খুলে যাওয়ার অনেক বড় একটি কারণ এটি।

• অবাধ মেলামেশা রয়েছে এমন মার্কেট, অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে গমন পরিহার করা উচিত।

• এমন বিয়ের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রথমে 'ফ্রি-মিক্সিং' এর কুফল সম্পর্কে বোঝানো উচিত। না বুঝলে সেই অনুষ্ঠান পরিহার করতে হবে। পাশাপাশি আত্মীয়তার সম্পর্কও যাতে অটুট থাকে তাই বিয়ের কয়েকদিন আগে গিয়ে তার সাথে ব্যক্তিগতভাবে দেখা সাক্ষাৎ করে তাকে কিছু হাদিয়া বা উপঢৌকন দিয়ে তাকে বলা যে, অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা সম্ভব না। তার সামনেই তার জন্য দোয়া করে আসা যাতে তারা দাম্পত্য জীবনে সুখী হয়।

• যদি কোনো গায়রে মাহরাম দ্বীন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে সে ক্ষেত্রে আমরা নিজেরা তাদের সাথে কথাবার্তা না বলে নিজেদের দ্বীনের বুঝসম্পন্ন বোন, স্ত্রী অথবা এমন কোনো বন্ধু, আত্মীয় বা পরিচিত দ্বীনি ভাইয়ের স্ত্রীর সাথে তাকে কথা বলিয়ে দেয়া যেতে পারে।

• গাইরে মাহরামদেরকে দ্বীনের দাওয়াহ দেয়া অনেক বড় ফিতনাতে রূপান্তরিত হতে পারে। তাই এ থেকে যথাসম্ভব দূরত্ব বজায় রাখাই শ্রেয়।

◇ আত্মীয়দের বাসায় আমন্ত্রণে গেলে গাইরে মাহরামদের সাথে পর্দা রক্ষা করে চলতে হবে। তাদেরকেও নিজেদের বাসায় আমন্ত্রণ করুন এবং তাদের জন্য নারী-পুরুষ আলাদা আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা রাখুন যাতে তাদের বুঝিয়ে দেয়া যায় যে, নারী এবং পুরুষের সহাবস্থান কোনোমতেই কাম্য নয়।

◇ নিজের পর্দার ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করলে অন্যরাও আপনার পর্দা লঙ্ঘন করার সুযোগ পাবে না।

◆ পরিবারের সদস্যদেরকে পর্দার ব্যাপারে বোঝাতে হবে। পরিবারে দাওয়াহর ক্ষেত্রে কথা বা কাজের চেয়ে আচরণ দ্বারা অধিক প্রভাবিত করা যায়। রাগারাগি পরিহার করে তাদের সাথে সুন্দর আচরণ করা উচিত। পরিবারের লোকেরা বিচার করে আবেগ দিয়ে, এই বিষয়টি বুঝতে হবে।

◆ কখনো কোনো জাহেল বন্ধুর হারাম সম্পর্ক বা যেকোনো ধরনের হারাম কর্মকাণ্ডের সাথে নিজেকে জড়িত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে নিজের অন্তরের ওপরেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

• তাদের হারাম কর্মকাণ্ডের গল্প-কাহিনি শোনা থেকেও বিরত থাকতে হবে। কাজটি খারাপ এটা যদি মুখে বলা সম্ভব না হয় বা বলে ফায়দা না হয়, তাহলে অন্তত সেই কাজগুলোর ব্যাপারে না শোনার যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে। আপনি নিজেও করবেন না অন্যকেও প্রশ্রয় দেবেন না, নিজেও শুনবেন না অন্যকেও শুনতে দেবেন না। শয়তান পাপকর্মকে মানুষের দৃষ্টিতে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করে। অনেক সময় এসব কাহিনি শুনে নিজের আফসোস লাগতে পারে যে, তারা তো জীবনে অনেক মজা করছে অথচ আপনি করতে পারছেন না। অথচ আল্লাহ আমাদের চরিত্রকে হেফাযত করেছে এটাই অনেক বড় পাওয়া।

◆ তবে যদি কোনো সমস্যার সমাধান করতে হয়, যেমন: হারাম সম্পর্ক থেকে কাউকে বের করে আনা; সে ক্ষেত্রে অবস্থা বুঝতে এসব কথা শোনা যেতে পারে।

টিকাঃ
[১] https://www.rainn.org/statistics/victims-sexual-violence
[২] Department of Justice, Office of Justice Programs, Bureau of Justice Statistics, National Crime Victimization Survey, 2018 (2019). Note: RAINN applies a 5-year rolling average to adjust for changes in the year-to-year NCVS survey data
[৩] https://www.pewresearch.org/fact-tank/2019/04/11/6-demographic-trends-shaping-the-u-s-and-the-world-in-2019/

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 অনলাইন-জীবন

📄 অনলাইন-জীবন


আমাদের একটি বিষয় বোঝা উচিত যে, বর্তমানে আমাদের জীবন দুটি। বাস্তবিক জীবন আর অনলাইনের জীবন। বাস্তব জীবনে যেমন শরী'আতের বিধিবিধান রয়েছে অনলাইনেও ঠিক তা-ই। কিন্তু আমাদের মাঝে এমন চিন্তাধারা বিকশিত হয়েছে যে, পর্দা যেন কেবল অফলাইনেই, অনলাইনে কোনো পর্দা নেই। অথচ অনলাইনে নারী-পুরুষের পর্দার লঙ্ঘনের স্বরূপ আরও কয়েকগুণ ভয়াবহ হতে পারে।

দ্বীনের বুঝপ্রাপ্ত নারী-পুরুষ স্বাভাবিকভাবেই বিপরীত লিঙ্গের সাথে সরাসরি কথা বলতে বা তাদের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে লজ্জাবোধ করে। কিন্তু অনলাইনের দুনিয়ায় এই লজ্জাটা অনেকটা গায়েব হয়ে যায়। যেহেতু ম্যাসেজিং-এর মাধ্যমে কথা বলাটা সরাসরি কথা বলার চেয়ে সহজ তাই অনেকেই দ্বীনি দা'ওয়াত (!) নিয়ে হানা দেয় বিপরীত লিঙ্গের ইনবক্সে। ব্যাটে-বলে মিলে গেলে আল্লাহর বান্দা-বান্দী শয়তানের ঘটকালিতে ধীরে ধীরে যিনার দিকে ধাবিত হতে থাকে। দ্বীনদার মহলে এমন নজির রয়েছে, ছেলে-মেয়ে উভয়ই পরিপূর্ণ দ্বীনদার, কিন্তু হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে আছে। বিয়ে করার ইচ্ছা থাকলেও নানান কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে মাঝে মাঝেই শয়তানের প্ররোচনায় তাদের মাঝে অবাধে সুড়সুড়িমূলক কথাবার্তা চলে, গোপন প্রেমে লিপ্ত হয়, এমনকি নিজেদের মাঝে গোপন ছবি আদান-প্রদান করে ফেলে! তাই অনলাইন পর্দার ক্ষেত্রেও পুরুষদের সচেতন হওয়া জরুরি, যাতে পবিত্র জীবনগুলো আল্লাহর নাফরমানীতে মুহূর্তে বিষিয়ে না ওঠে।

• সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে পরনারীর পোস্টে লাইক-রিয়েক্ট করা, কমেন্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে। লাইক-কমেন্ট সেই পোস্টদাতা নারীর মনে এক ধরনের আবেগের জন্ম দিতে পারে। ফিতনা হওয়ার জন্য একটি লাইকই যথেষ্ট।
• অনলাইনে দ্বীনি নারীদের প্রোফাইল দেখে অনেক পুরুষ ফিতনায় পড়ে যায়। আসলে সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে কারও প্রোফাইল দেখে সেই ব্যক্তির সম্বন্ধে পুরোপুরি জানা যায় না। এ ছাড়া এটি নিজের অন্তরের জন্যও মন্দ।
• খুব প্রয়োজন ব্যতীত গাইরে মাহরামদের সাথে ইনবক্সে যোগাযোগ করা নিষিদ্ধ। প্রয়োজন হলেও সেটা কতটা গুরুতর তা নিজের সাথে সৎ থেকে যাচাই করতে হবে।
• যোগাযোগের একান্ত প্রয়োজন হলে সেই নারীর মাহরামের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে, অথবা মাহরামের উপস্থিতিতে গ্রুপ চ্যাটে যোগাযোগ করা যেতে পারে। কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে, যাতে তা ইনবক্সে মোড় না নেয়। এসব উপায়ও যদি না থাকে, তাহলে ইনবক্সের বদলে ইমেইল বিকল্প হিসেবে ব্যবহার অধিক নিরাপদ।

◆ যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই ম্যাসেজে বলা, এর বেশি একটি শব্দও ব্যয় না করা। এ ক্ষেত্রে ম্যাসেজে গম্ভীর ভাব বজায় রাখতে হবে।

◆ গাইরে মাহরামদের সাথে প্রয়োজনে ম্যাসেজ করতে হলে ইমোজি, স্টিকার, গিফ এগুলো ব্যবহার করা যাবে না। কেননা এসব ব্যবহারে গাম্ভীর্য ক্ষুণ্ণ হয়। ইমোজি ব্যবহারের মাধ্যমে চেহারার অঙ্গভঙ্গি কল্পনায় আসে, যা পরোক্ষভাবে পর্দার লঙ্ঘন।

◇ বিয়ের কথা চলছে এমন নারী-পুরুষেরা ইনবক্সে কথাবার্তা বলা থেকে খুব সাবধান থাকা উচিত। অনেকেই মনে করেন বিয়ে বা ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে প্রয়োজনীয় এটা-ওটা জেনে নেয়া যেতেই পারে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে ইনবক্স হতে পারে শয়তানের গোপন ফাঁদ। এভাবে শয়তানের মন্থর প্ররোচনায় হালাল সম্পর্ক গড়ার আগেই যাতে হারামে লিপ্ত না হতে হয় তাই সাবধানে থাকা চাই।

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 নীল সমুদ্রের হাতছানি

📄 নীল সমুদ্রের হাতছানি


ইন্টারনেট। একটি বিষজালের নাম। এর ভালোটা নিয়েই কথা বলতে শোনা যায়। আর খারাপটা নিয়ে জিহ্বা চলে খুব কমই। এর খারাপটা সমুদ্রের চেয়েও বিশাল। বলে শেষ করার মতো নয়। 'নাইন্টিস কিড'-গুলো দাড়িয়াবান্দা, মাংসচোর, গোল্লাছুট, ফুটবল, ক্রিকেট খেলে হাঁটু আর কনুইয়ে চোট পেয়ে অভ্যস্ত ছিল। কিছুকাল পর এসে হঠাৎ সবাই যেন পঙ্গু হয়ে গেল। বিকেলগুলো মলিন হয়ে যেতে লাগল। মাঠগুলো ফাঁকা হলো, সেগুলো দখল করে নিলো ধুলো-বালিতে গড়া কংক্রিটে। সময়টা ছিল ডেস্কটপ কম্পিউটরের। যদিও প্রথমদিকে ১০টা বাড়ি খুঁজলে একটা বাড়িতে এই বস্তুটার দেখা মিলত। কিন্তু ঘরে ঘরে পৌঁছতে এর বেশি একটা সময় লাগেনি। সবাই ঘরের কোনায় ঘাপটি মেরে মেতে উঠল সব অন্তঃসারশূন্য গেমস নিয়ে। হাস্যোজ্জ্বল প্রজন্মটার হারিয়ে যাওয়ার ক্রান্তিলগ্ন এই বুঝি শুরু হলো। সমসাময়িক কালে ইন্টারনেট নামক আজিব এক এলিয়েন নেমে এল ফ্লাইং সসারে চড়ে। ঘরে ঘরে ছেয়ে গেল জালের মতো। ডেস্কটপ রূপ নিল ল্যাপটপ-নোটপ্যাডে। ইচ্ছা করলে এটা কম্বলের নিচের অন্ধকার রাজ্যেও নিয়ে যাওয়া যায়। রুমগুলো অন্ধকারে ছেয়ে গেল। কেবল আলো রইল ল্যাপটপের স্ক্রিনে। এরপর আয়তাকার বাক্সটা ক্রমশ ছোট হয়ে এল। হাতে হাতে এল মুঠোফোন। ইন্টারনেট নামক বস্তুটাও ততদিনে অসাধারণ সার্ভিস দিয়ে চলছে। মানুষের বিচরণ শুরু হয়েছে সভ্য থেকে অসভ্যতায়। যুবকের অন্তরে এসে বিঁধছে নীল রাবার বুলেট। যা আঘাত করে, নিস্তেজ করে; একদম মেরে ফেলে না। এসব আয়তাকার স্ক্রিনের মাঝেও হুবহু একটা অসীম সমুদ্র আছে। যার কোনো বেলাভূমি নেই। স্ক্রিনে আবদ্ধ সেই নীল সমুদ্রও ডুবিয়ে নেয় মানুষকে। সেই নীল সমুদ্রেও গভীরতার অনুপাতে অন্ধকার। সে নীল সমুদ্রেরও গর্জন আছে, আটকে রাখার আহ্বান আছে। কেবল তফাত, একটা ছোঁয়া যায়, আরেকটা ছোঁয়া যায় না; কেবল দেখা যায়। পর্নোগ্রাফির সমুদ্রের কথা বলছি। এই নীল ঘুণ পোকার মতো কুড়মুড় করে তিলে তিলে খায় মানুষকে, নীরবে।

এই মরণ ফাঁদের খুলাসা আগেও বহুবার হয়েছে। আবার করতে হচ্ছে, আরও সহস্রবার করতে হবে। এটাও একটা নেশা যা অন্যান্য মাদকের মতোই; বরং অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও ভয়ানক। পর্নোগ্রাফি-নেশার এই যাত্রাটা শুরু হতে পারে এক-দুইটা আইটেম সং দিয়ে কিংবা হলিউড-বলিউডের নায়িকাদের আবেদনময়ী ছবি দিয়ে। আর এর তরি শেষে ঠেকে গিয়ে ভয়ানক সব পর্ন ক্যাটাগরিতে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মজীবী থেকে স্কুলের ছাত্র, মহল্লার চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়া বখাটে থেকে গভীর রাতে রবের সামনে দাঁড়িয়ে ক্রন্দনরত যুবক-সমাজের অধিকাংশকেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিয়েছে অক্টোপাসের মতো। শয়তান মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে 'মই থিউরি' অবলম্বন করে। একটা মানুষকে শয়তান কখনোই সরাসরি শিরক-কুফরীর দা'ওয়াহ দেয় না। শয়তান মানুষের পিছনে ধৈর্যের সাথে কঠোর মেহনত চালায়। সে ধীরে ধীরে আসে, নিচ থেকে শুরু করে। একটা একটা করে মইয়ের ধাপগুলো বেয়ে মস্তিষ্কে উঠে আসে, কজা করে। সফট পর্নের যৌনতা যখন ফিকে হয়ে যায় তখন আঙুলগুলো আজিব সব কী-ওয়ার্ড টাইপ করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। একটা সময় খুঁজতে খুঁজতে এমন কিছু কন্টেন্টও পেয়ে যায় যেই পর্নগুলো সরাসরি আহ্বান করে থাকে শয়তানের পূজা করতে। এভাবে পর্ন-আসক্তি একজনকে সরাসরি শিরকের দিকেও নিয়ে যেতে পারে-যদি না সময়মতো এই আগুন-ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরা যায়।

একটা যুবক পর্নোগ্রাফি আসক্তির কারণে একটা সময়ে মানসিকভাবে কতটা ভেঙে পরে তা এন্টি-পর্নোগ্রাফি গ্রুপে তাদের বিভিন্ন পোস্টগুলো পড়লে বোঝা যায়। এটা এমন এক লজ্জাকর ব্যাধি, যা নিয়ে বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধব, স্ত্রী, ভাই-বোন কারও সাথে আলোচনা করা যায় না, সাহায্য চাওয়া যায় না। তিলে তিলে শেষ হতে হয় মুখ বুজে।

হঠাৎ করেই যেন এই প্রজন্মের মাথার ওপর অশ্লীলতার মেঘ এসে রোদেলা আকাশকে কালো করেছে। বেশি আগে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের বাবা-মায়েদের আমলের কথাই ধরি। তখন কম্পিউটার-মুঠোফোন এসব ছিল না। ছিল না ইন্টারনেট। কই, মানুষের জীবন কি তখন অস্বতঃস্ফূর্ত ছিল? আমাদের বাবারা এই প্রজন্মের যুবকদের মতো শীর্ণকায় ছিল না। তারা একসাথে ৩-৪টা প্রেম করে বেড়ায়নি। মায়েরা ঘরের ভেতরেই থাকত, সুরক্ষিত থাকত। কখনো ঘর থেকে বের হলেও মাথার কাপড় চুল পরিমাণ সরত না। নারীরা সন্ধ্যার পরেও ঘর থেকে বের হবে এটা তো ভাবাও যেত না। তারা কোনো বেগানা পুরুষের সাথে কথা বলবে এটা অসম্ভব ছিল তাদের কাছে। আর এখন? যুবকগুলোর মস্তিষ্ক ঘোলা হওয়ার আছে হাজারও উপকরণ। মেয়েরা খোলামেলা। একজন যুবকের চোখ ছানাবড়া হয়। আবাসিক হোটেলগুলোতে হয় ব্যভিচার। মেয়েগুলোরও হঠাৎ আত্মমর্যাদা কমে গেল, খুব সহজেই পটে যায় তারা। সেই সাথে আছে ক্লিকে ক্লিকে ব্যভিচার। এ থেকে শারীরিক ও মানসিক অশান্তি। মানসিক অশান্তি ধাবিত করতে পারে মাদকের দিকে। এরপর কেউ কেউ ডিপ্রেশনের বড়ি গিলে খেয়ে নিজেকে নিজে হত্যা করে। এত বিরূপ পরিবেশ, তবু পরিবারের মুখে সমাজের গৎবাঁধা নিয়ম, ত্রিশের আগে বিয়ে নেই। এই ত্রিশের আগে কত জীবন সে নষ্ট করবে তার হিসাব কে রাখে? তাহলে ভাবুন তো, সন্তানের পর্নাসক্তি, ব্যভিচার, মাদকাসক্তির জন্য সত্যিকারের দায়ী কে?

মানুষের ক্ষুধা আছে। আর ক্ষুধা লাগলে মানুষ খাদ্য গ্রহণ করবেই। বৈধ উপায় না থাকলে সে চুরি, ডাকাতি করবে এটাই স্বাভাবিক। পরিবার যখন সন্তানের বৈধ উপায় বন্ধ করে দিচ্ছে তখন সন্তান অবৈধ পথে যাবেই।

পর্নোগ্রাফি হারাম। যে ইসলামের ব্যাপারে অন্তত ন্যূনতম জ্ঞান রাখে সেও এর খারাপ প্রভাবের ব্যাপারে জানে। এমনকি যারা অন্যান্য ধর্মাবলম্বী আছে তারাও এর কুপ্রভাব সম্পর্কে সম্যক অবগত। তাই যে করেই হোক এই পাপ থেকে নিজেকে ছুটিয়ে আনতেই হবে। হাশরের দিন বাবা-মা, পরিবার, পরিবেশ ইত্যাদির দোষ দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। নিজের পাপের ভার নিজেকেই বহন করতে হবে। তাই এখনই ফিরে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো:

• যারা জীবনে কখনোই পর্নোগ্রাফি দেখেননি তারা যে এর বিষাক্ত থাবা থেকে মুক্ত হয়ে গিয়েছে এমনটি নয়। তাই ঢিল দিলে চলবে না, সর্বদা তাকওয়ার পোশাক পরিধান করে থাকতে হবে। শয়তানের গোপন ফাঁদগুলোর ব্যাপারে খুব ভালোভাবে নজর রাখতে হবে, জানতে হবে কীভাবে শয়তান ফাঁদে ফেলতে উদ্যত হয়।
• যারা মাঝে মাঝে পর্ন দেখে থাকে তারা যদি এই মুহূর্তেই এ থেকে ফিরে না আসে তাহলে ভবিষ্যতে তার জন্য খুব ভয়ানক আসক্তি অপেক্ষা করছে। তাই এখনই আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে পরিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে।
• যারা পুরোপুরিভাবে পর্নাসক্ত এবং কোনোভাবেই এ থেকে বের হতে পারছেন না, তারা মোটেও হতাশ হবেন না। নিশ্চয় হতাশা শয়তানের তরফ থেকে। আমরা অনেকেই আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে যাই, অথচ আমাদের জন্য আল্লাহ সহজ করে দিয়েছেন। যতবার আমরা গুনাহ করব এরপরই নিজের ভুল বুঝে যদি তাওবা করে নিই তাহলেই আল্লাহ মাফ করে দেবেন। এটা আল্লাহ -এরই ওয়াদা।

◆ আমাদের শুধু এতটুকু নিশ্চিত করতে হবে, আমরা যাতে গুনাহগার অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ না করি। যতবার গুনাহ করব সাথে সাথেই তাওবা করে ফেলব। হয়তো মনে শয়তান ওয়াসওয়াসা দেবে, আপনার মনে হবে যে আপনি কিছুদিন পর আবার গুনাহে লিপ্ত হবেন। এ রকম চিন্তা ঝেড়ে তাওবা করুন, আল্লাহর কাছে ভুলের জন্য কান্নাকাটি করুন যাতে এই গুনাহে আবার না জড়িয়ে যান।

• জীবনটাকে একটা যুদ্ধ হিসেবে নিতে হবে, যেখানে শয়তান হচ্ছে সবচেয়ে বড় শত্রু। মানুষ কখনো যুদ্ধে আজীবনের জন্য বিজিত থাকে না, মাঝে মাঝে তাকে হারতেও হতে পারে। শয়তানের কাছে আমরা যদি মাঝে মাঝে হেরে যাই তবুও বিচলিত হব না। তাকওয়ার ওপর স্থির থাকব, নিশ্চিত করব যাতে শয়তানের চেয়ে নিজের বিজয়ের সংখ্যাটা অধিক হয়।
• গুনাহ হয়ে গেলে সেদিনের আমল সাধারণ দিনের চেয়ে বাড়িয়ে দেবো। নফল সালাত, তিলাওয়াত, দান-সদকা বাড়িয়ে দেবো। শয়তান একদিক থেকে হারিয়ে দিলে আমরা এভাবে শয়তানকে আরেক দিক থেকে হারিয়ে দিতে পারি।

♦ নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেব। পূর্বের বার ঠিক কী কারণে পদস্খলন হয়েছিল তা অনুধাবন করতে হবে এবং পরবর্তী সময় থেকে সেই বিষয়ে শক্ত নজরদারি রাখতে হবে।

• নিঃসন্দেহে এই ফিতনা থেকে বাঁচতে বিয়েই শ্রেষ্ঠ সমাধান। কিন্তু অনেকের ধারণা থাকে কেবল দৈহিক চাহিদা পূরণই বিয়ের উদ্দেশ্য। অথচ দায়িত্ব, খুনসুটি, ভালোবাসা, রাগারাগি, অভিমান, মতবিরোধ, একে অপরকে সহ্য করা, মানিয়ে নেয়া, ঝগড়ার সময় একজন উত্তেজিত হলে অপরজন চুপ হয়ে যাওয়া; এসব কিছুর মিশেলে বৈবাহিক জীবন গঠিত। তাই বিয়ের পূর্বে ভালোমতো প্রস্তুতি গ্রহণ করে তবেই এ জীবনে পা রাখা উচিত। না হলে বিয়ের পরেও এই বদভ্যাস থেকে যেতে পারে। পদে পদে ভুল করার কারণে জীবনের প্রতি হতাশা চলে আসতে পারে।
• যারা জীবনের কিছু পর্যায় পর্নোগ্রাফি দেখে পার করেছে তারা নিজেদের বৈবাহিক জীবনে মিলিত হওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ফ্যান্টাসিতে ভোগে—যেগুলো মূলত দূষিত পর্নোগ্রাফি দ্বারা অনুপ্রাণিত। এমন ফ্যান্টাসি বৈবাহিক জীবনের জন্য অনুত্তম এবং ইসলামেও তা নিষিদ্ধ। যেমন: পশ্চাৎদেশে মিলিত হওয়া আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন।[৪] কিন্তু পাশ্চাত্য সমাজ পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে তাদের যৌন সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণার বদলে আকর্ষণ তৈরি করায়। সিনেমা, বিজ্ঞাপন ইত্যাদির মাধ্যমে বিকৃত যৌনাচারকে উসকে দেয়। তারা এসবকে স্বাস্থ্যকর প্রমাণ করতে মেডিকেল দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করে। বিলিয়ন ডলারের ব্যবসাকে তারা এভাবেই লোকদৃষ্টিতে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে। অনেক মুসলিমও তাদের মিথ্যাচার দ্বারা প্রভাবিত হয় এবং ভাবতে থাকে, অস্বাস্থ্যকর না হলে ইসলাম কেন একে হারাম বলল? অথচ আল্লাহর বিধান বিজ্ঞান বা মেডিকেলের ওপর নির্ভর করে না।

◇ দৈহিক মিলনকে পর্নোগ্রাফিতে যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় সেটা খুবই কৃত্রিম। একে যে রকম বিনোদন বা মজা হিসেবে দেখানো হয় বাস্তব জীবনে কিন্তু এ রকম না। পর্নোগ্রাফিতে একজন নারীকে ভোগ্যবস্তু হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয় এবং সেখানে নারীদেরকেও খুব কামুক এবং আবেদনময়ী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ বাস্তবে একজন ভদ্র মেয়ে হয় লাজুক প্রকৃতির। পর্নাসক্ত পুরুষ যখন তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় তখন তার মন-মগজে পর্নোগ্রাফির দৃশ্যগুলো ফুটে ওঠে এবং নিজের স্ত্রীর প্রতিই তার একপ্রকার হতাশা চলে আসে। এমনকি নাটক-সিনেমাতে প্রেম-ভালোবাসাকে যেভাবে ফুটিয়ে তোলা হয় বৈবাহিক জীবনে সে রকম কিছু না হওয়ার কারণে অনেক নারী-পুরুষই হতাশায় ভোগে। পর্নোগ্রাফি, অশ্লীল মুভি, নাটক-সিনেমা, বইপত্র এগুলোতে যেই প্রেম-ভালোবাসার কাহিনি ফুটে উঠে তা মাথা থেকে আজই ঝেড়ে ফেলতে হবে। প্রকৃত জীবনে এসব কৃত্রিম বস্তুর কোনো স্থান নেই।

◇ সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে এন্টি-পর্নোগ্রাফি গ্রুপগুলোতে যুক্ত হয়ে থাকা, ভালো মানুষদের সাথে চলা, পরিপূর্ণ সুন্নতী লেবাস ধারণ করা, যোগ্য আলেমদের সোহবতে থাকা-এসবই হতে পারে পর্নোগ্রাফির বিরুদ্ধে কঠিন হাতিয়ার। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে এবং এই সমস্যা থেকে নিজেকে বের করে আনতে 'মুক্ত বাতাসের খোঁজে' বইটি খুবই উপকারী হবে ইন শা আল্লাহ।

◇ তাওবাহর ক্ষেত্রে এর তিনটি শর্ত মাথায় রাখা উচিত: * পাপ পুরোপুরিভাবে ছেড়ে দিতে হবে; * পাপের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হতে হবে; * ওই পাপ দ্বিতীয়বার না করার সিদ্ধান্ত নিতে হবে ও দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। তাওবার ওপর অটল ও অবিচল থাকতে হবে। [৫]

এই শর্তগুলো পূরণ না করলে তাওবা বিশুদ্ধ হবে না। উল্লেখ্য যে, গুনাহ হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তাওবা করা জরুরি। তাওবা করতে বিলম্ব করাও একটি গুনাহ। [৬]

টিকাঃ
[৪] সুনানে আবু দাউদ- ২১৬২, ৩৯০৪; সুনানে তিরমিযী- ১১৬৫
[৫] সূরা তাহরীম- ৮; সূরা ত্বহা- ৮২; সূরা ফুরকান- ৭০
[৬] সূরা নিসা- ১৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00