📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 ইন্টারনেটের অশ্লীল কন্টেন্ট

📄 ইন্টারনেটের অশ্লীল কন্টেন্ট


ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক মহামারি ফিতনা ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছে। রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছে কতশত অন্তর। রাস্তাঘাটে, লোক সমাগমে অন্য নারীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে নজরের খিয়ানত করা পুরুষদের জন্য কিছুটা কঠিন। কেননা এতে লোকচক্ষুর ভয় রয়েছে, লজ্জাশীলতা রয়েছে। কিন্তু যখন সেই পুরুষ নির্জনে অবস্থান করে, সে ধরেই নেয় তাকে আর কেউ দেখছে না। এ দিকে কেবল কয়েকটি ক্লিকের ব্যবধানে যিনা তার দিকে মুখিয়ে থাকে। এই মোহ দমন করতে পারে কয়জন?

আমরা বুঝি, এসব সমাজকে কতটা মন্দভাবে গ্রাস করে নিয়েছে। অনেকে এই চোরাবালির এতটা গভীরে নিজের পা গেড়েছে যে, ফিরে আসাটা তার কাছে অসম্ভব মনে হচ্ছে। তবে আশার বাণী, আল্লাহ কারও ওপর সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন না। অর্থাৎ এ থেকে ফিরে আসতে বেগ পেতে হবে সত্যি, কিন্তু এটি অসম্ভব কিছু না। প্রয়োজন কেবল ঈমানী শক্তি, সবর ও অধিক পরিমাণে দু'আ।

ইবনে কাসীর, ইমাম হাসকাফী, ইমাম ইবনু নুজাইম সহ পূর্ববর্তী অনেক মনীষী গোঁফ-দাড়িবিহীন বালকদের প্রতি অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন এবং অনেক আলেমের মতে এটা হারাম। [২৪] চোখের পর্দা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে ইন্টারনেটে অশ্লীল ছবি বা পর্নোগ্রাফি দেখা কি কখনোই বৈধ হতে পারে? নির্জন অবস্থানে ইন্টারনেটে অশ্লীল বস্তু দেখা কেবল কবিরাহ গুনাহই নয়, এটি ঈমানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আল্লাহ সর্বদৃষ্টিমান, এ কথা তারা মুখে বলে কিন্তু কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে যে, আল্লাহ যে সব দেখেন এর ওপর তাদের বিশ্বাসের ঘাটতি আছে।

হযরত জুনায়েদ বাগদাদী-কে জিজ্ঞাস করা হলো, "হারাম দৃষ্টি থেকে কীভাবে বাঁচা যায়?" জবাবে তিনি বললেন, "হারামের দিকে দৃষ্টিপাত করার আগে সর্বদা মনে রাখবে যে, তোমার রব, তোমাকে যিনি সৃষ্টি করেছে, তোমাকে যিনি লালন-পালন করছেন তিনি তোমার ওপরে দৃষ্টিপাত করে রয়েছেন।”

ইমাম গাযালী বলেন, “দৃষ্টি অন্তরে খটকা তৈরি করে। খটকাটা কল্পনায় রূপ নেয়। কল্পনা জৈবিক তাড়নাকে উসকে দেয়। আর জৈবিক তাড়না ইচ্ছার জন্ম দেয়।” সুতরাং বোঝা গেল পরনারীকে দেখার পরেই ব্যভিচারের ইচ্ছা জাগে। বিরত থাকলে সাধারণত ইচ্ছা জাগে না। প্রতীয়মান হলো যে, ব্যভিচারের প্রথম সিঁড়ির নাম হলো কুদৃষ্টি। প্রবাদ আছে, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম সফর এক পা ওঠালেই শুরু হয়ে যায়। অনুরূপভাবে কুদৃষ্টির মাধ্যমে শুরু হয় ব্যভিচারের সফর। ঈমানদারের কর্তব্য হলো ব্যভিচারের সুদীর্ঘ পথে প্রথম পা ফেলা থেকে বিরত থাকা।

আমরা সাধারণভাবে চিন্তা করতে পারি, কেউ কি তার বাবা-মায়ের সামনে কখনোই উলঙ্গ হতে পারবে? তাদের সামনে অশ্লীল কাজ অথবা হস্তমৈথুন করতে পারবে? সাধারণত অনেক পাগলও লোকসম্মুখে উলঙ্গ হয় না, নিজেদেরকে বিবস্ত্র করে না। সেদিক থেকে তো আল্লাহ আমাদের মস্তিষ্কের সুস্থতা দিয়েছেন, আমরা চিন্তা করতে পারছি। আমাদের যদি এতটুকু বুঝ থাকে যে, আমরা কস্মিনকালেও আমাদের বাবা-মা কিংবা সাধারণ কোনো মানুষের সামনে উলঙ্গ হতে পারব না; হস্তমৈথুন বা তাদের সামনে পর্নোগ্রাফি দেখা তো ভাবনাতেই আসে না, চিন্তাতেই আসে না। যখন আপাতদৃষ্টিতে কেউ ধারে-কাছে উপস্থিত নেই, সেই ক্ষণেও তো আমাদের রব আমাদেরকে দেখছেন। প্রতিটি মুহূর্তই তো আমরা নজরদারির মধ্যে আছি। তাহলে কেন আমাদের চিন্তায় এত অসারতা? নবী বলেন,

عَنِ النَّبي - صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ: "لأَعْلَمَنَّ أَفَوَامًا مِنْ أُمَّتِي يَأْتُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِحَسَنَاتٍ أَمْثَالِ جِبَالِ تِهَامَةَ بِيضًا فَيَجْعَلُهَا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ هَبَاءٌ مَنْثُورًا ". قَالَ ثَوْبَانُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ صِفْهُمْ لَنَا جَلِهِمْ لَنَا أَنْ لَا تَكُونَ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَا نَعْلَمُ. قَالَ: " أَمَا إِنَّهُمْ إِخْوَانُكُمْ وَمِنْ جِلْدَتِكُمْ وَيَأْخُذُونَ مِنَ اللَّيْلِ كَمَا تَأْخُذُونَ وَلَكِنَّهُمْ أَقْوَامُ إِذَا خَلَوْا بِمَحَارِمِ اللَّهِ انْتَهَكُوهَا

আমি আমার উম্মাতের কতক দল সম্পর্কে অবশ্যই জানি যারা কিয়ামতের দিন তিহামার শুভ্র পর্বতমালার সমতুল্য নেক আমলসহ উপস্থিত হবে। আল্লাহ সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবেন। সাওবান বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, তাদের পরিচয় পরিষ্কারভাবে আমাদের নিকট বর্ণনা করুন, যাতে অজ্ঞাতসারে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তিনি বলেন, তারা তোমাদেরই ভ্রাতৃগোষ্ঠী এবং তোমাদের সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা রাতের বেলা তোমাদের মতোই ইবাদাত করবে। কিন্তু তারা এমন লোক যে, একান্ত গোপনে আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ে লিপ্ত হবে। [২৫]

এত এত আমল করে শেষ পর্যন্ত তবুও জাহান্নামের গহ্বরে প্রবেশ করলে এরচেয়ে বড় হতভাগা আর কি কেউ হতে পারে? তাই অবশ্যই এখনই আমাদের নাফসের লাগাম টেনে ধরতে হবে।

টিকাঃ
[২৪] বাহরুর বায়েক- ৩/৬৫; রদ্দুল মুহতার- ৯/৫৩২
[২৫] ইবনে মাজাহ-৪২৪৫

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 লজ্জাস্থানের হিফাযত

📄 লজ্জাস্থানের হিফাযত


রাসূলুল্লাহ বলেন,

مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ

যে ব্যক্তি আমার কাছে এই অঙ্গীকার করবে যে, সে তার দুই চোয়ালের মধ্যস্থিত বস্তু (জিহ্বা) এবং তার দুপায়ের মধ্যস্থিত বস্তুর (গোপনাঙ্গ) জিম্মাদার হবে; আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব। [২৬]

দুনিয়াতে যত ফিতনা, ফাসাদ ও অপকর্ম সংঘটিত হয় তার অধিকাংশই হয়ে থাকে জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের মাধ্যমে। এ দুটোকে যে সংযত করবে, রাসূলুল্লাহ তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "তোমরা আমার জন্য ছয়টি জিনিসের দায়িত্ব নিলে আমি তোমাদের জান্নাতের দায়িত্ব নেব। যখন কথা বলবে, সত্য বলবে। যখন প্রতিশ্রুতি দেবে তা পূরণ করবে, আর যখন তোমার নিকট আমানত রাখা হবে, তা রক্ষা করবে। আর তোমরা তোমাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করবে, তোমাদের চক্ষুকে অবনত করবে এবং তোমরা তোমাদের হাতকে (অশ্লীল কাজ হতে) বিরত রাখবে।”[২৭]

আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, قَالَ سُبِلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ الْجَنَّةَ فَقَالَ تَقْوَى اللهِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ وَسُبِلَ عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ النَّارَ فَقَالَ الْفَمُ وَالْفَرْجُ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা কি জানো কোন বস্তু মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করায়? তা হচ্ছে, আল্লাহর ভয় বা তাকওয়া এবং উত্তম চরিত্র। তোমরা কি জানো মানুষকে কোন বস্তু সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করায়? একটি মুখ ও অপরটি লজ্জাস্থান। [২৮]

এই হাদীসে আদর্শ পুরুষের চারটি গুণ তুলে ধরা হয়েছে: (১) তাকওয়া বা আল্লাহভীতি; (২) উত্তম চরিত্র; (৩) জবান নিয়ন্ত্রণ; (৪) লজ্জাস্থানের হেফাযত।

কেউ যদি নিজের মাঝে এই চারটি গুণ গড়ে তুলতে পারে, তাহলে আল্লাহর ইচ্ছায় সে আদর্শ মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে। তার দ্বারা দেশ ও সমাজ উপকৃত হবে। আবাল বৃদ্ধবনিতা সকলে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হলে এবং সবাই তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত হলে তাদের দ্বারা অন্যরা নির্যাতিত হবে না। সবাই শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করবে। আর এই মানুষগুলোর চূড়ান্ত গন্তব্য হবে জান্নাত ইন শা আল্লাহ। অপরদিকে এই চারের অনুপস্থিতি এই পৃথিবীকেই জাহান্নামে পরিণত করতে সক্ষম, যা আমরা ইতিমধ্যে অনুভব করতে পারছি।

টিকাঃ
[২৬] সহীহ বুখারী- ৬৪৭৪
[২৭] মুসনাদে আহমাদ- ২২৭৫৭
[২৮] সুনানে তিরমিযী- ২১৩৫; মিশকাত- ৪৬২১

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 পুরুষদের সতর

📄 পুরুষদের সতর


পুরুষের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন সতর হচ্ছে, নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত। স্ত্রী ব্যতীত বাকি সকলের সামনে এতটুকু ঢেকে রাখা পুরুষদের জন্য ফরয। এর মানে এই নয় যে, বাকি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে উন্মুক্ত রাখা যাবে। সেগুলোও ঢেকে রাখা জরুরি। এ ছাড়া খালি গায়ে থাকার কারণেও অনেক সময় নাভির নিম্নের স্থান প্রকাশ পেয়ে যেতে পারে, যা কারও দৃষ্টিতে পড়লে কবিরা গুনাহ হবে।

বিশেষ করে সালাতের ক্ষেত্রে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কারণ ব্যতীত তার নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রেখেও বাকি অঙ্গ তথা পেট, পিঠ ইত্যাদি উন্মুক্ত রাখে তাহলে এটি মাকরুহে তাহরীমী হবে। [২৯]

আর সালাতের মধ্যে বাধ্যতামূলক ঢেকে রাখার অঙ্গ তথা নাভি থেকে হাঁটুর এক-চতুর্থাংশ বা এর অধিক ইচ্ছাকৃত খোলামাত্রই নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে। আর যদি অনিচ্ছাকৃত এক-চতুর্থাংশ পরিমাণ খুলে যায়, সে ক্ষেত্রে তিন তাসবিহ পরিমাণ সময় খোলা থাকলে সালাত নষ্ট হয়ে যাবে। [৩০]

উল্লেখ্য, যতটুকু সতর উন্মুক্ত রাখা পুরুষদের জন্য হারাম তা যদি অন্য কোনো পুরুষ উন্মুক্ত রেখে দেয় সেদিকে তাকানোও হারাম। এমনকি অন্য কোনো পুরুষের পোশাকের ওপর দিয়েও গোপনাঙ্গের দিকে তাকানো হারাম। আল্লাহর রাসূল বলেন, لَا يَنْظُرُ الرَّجُلُ إِلَى عَوْرَةِ الرَّجُلِ

কোনো পুরুষ অন্য পুরুষের গুপ্তাঙ্গের দিকে যেন না তাকায়। [৩১]

এর সাথে প্রাসঙ্গিক, বিভিন্ন খেলাধুলার জন্য বিশেষায়িত পোশাক পুরুষদের সতর ঢাকতে পারে না। এতে খেলোয়ারদের নারী-পুরুষ যারাই এসব দেখছে সকলেরই কবিরা গুনাহ হচ্ছে। এ ছাড়াও খেলা দেখা অনর্থক ও নাজায়েয কাজ।

টিকাঃ
[২৯] রদ্দুল মুহতার- ১/৩৭৯; তাবঈনুল হাক্বায়েক- ১/৯৭
[৩০] ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া- ১/১০৬
[৩১] সহীহ মুসলিম-৭৯৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00