📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 দৃষ্টির পর্দা

📄 দৃষ্টির পর্দা


إِنَّ السَّمْعَ وَالبَصَرَ وَالفُؤَادَ كُلُّ أُولَبِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا )

নিশ্চয় কান, চোখ, হৃদয় এর প্রতিটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। [৪]

নারীদের তুলনায় পুরুষদের দৃষ্টিপাতের প্রতি লক্ষ রাখা অধিক জরুরি, কেননা পুরুষদের মাধ্যমেই দৃষ্টির খিয়ানতজনিত গুনাহ অধিক হয়ে থাকে। এ ব্যাপারে রাসূল বলেন, "কোনো পরনারীর প্রতি নজর দেয়া চোখের যিনা, যৌনতা সম্পর্কিত অশ্লীল কথাবার্তা জিহ্বার যিনা, অবৈধ সম্পর্কের কাউকে স্পর্শ করা হচ্ছে হাতের যিনা, ব্যভিচার করার উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে যাওয়া পায়ের যিনা, খারাপ অশ্লীল কথা শোনা কানের যিনা এবং মনের মাধ্যমে কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষা করা মনের যিনা। অতঃপর লজ্জাস্থান এই চাহিদার পূর্ণতা দেয় অথবা অসম্পূর্ণ রেখে দেয়।”[৬]

হাদীসটি থেকে উপলব্ধি করা যায় যে, প্রতিটি যিনার দরজা হচ্ছে দৃষ্টির খিয়ানত। এমনকি দৃষ্টির খিয়ানতকেও যিনা হিসেবেই অবিহিত করা হয়েছে। আল্লাহ কুরআনে বলেন, وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا

আর তোমরা ব্যভিচারের কাছে যেয়ো না, নিশ্চয় তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ [৭]

কবিরা গুনাহসমূহের মাঝে অন্যতম হচ্ছে যিনা। যিনার শাস্তির ব্যাপারে ইসলামে সুস্পষ্ট বিধানও রয়েছে। ৪ জন সাক্ষীর কসম-সহ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে অবিবাহিত ব্যভিচারকারীদের জন্য বেত্রাঘাত ও বিবাহিতদের জন্য রজম তথা পাথর ছুড়ে হত্যা করার বিধান কার্যকর করতে হবে। [৮] বিধানের কঠোরতা থেকে আমরা আঁচ করতে পারি যে, যিনা কতটা গুরুতর পাপ। যদি কেউ তার প্রতিবেশীর স্ত্রীর প্রতি কুদৃষ্টি দেয় এবং যিনার কু-মনোভাব অন্তরে উদিত হয়, তাহলে তা কবিরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। তাই দৃষ্টি সর্বদা সংযত রাখা দরকার। পরনারীর দিকে অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রথমবার দৃষ্টিপাত করে ফেললে এবং তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে ফেললে আল্লাহ তা ক্ষমা করে দেন। তবে দ্বিতীয়বার তাকালে সে ক্ষেত্রে গুনাহ হবে। এ সম্পর্কে নবীজি বলেন, لا تُتبع النَّظْرَةَ النَّظْرَةَ، فَإِنَّ لَكَ الْأُولَى وَلَيْسَتْ لَكَ الْآخِرَةُ

হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে যাওয়ার পর আবার দ্বিতীয়বার তাকিয়ো না। কারণ, (হঠাৎ অনিচ্ছাকৃত পড়ে যাওয়া) প্রথম দৃষ্টির জন্য তোমাকে ক্ষমা করা হবে, কিন্তু দ্বিতীয় দৃষ্টির জন্য ক্ষমা করা হবে না। [৯]

এই হাদীসের অর্থ এই নয় যে, প্রথমবার যতক্ষণ ইচ্ছা তাকিয়ে নেয়া যাবে। এটি সুস্পষ্ট আল্লাহর সাথে ধোঁকাবাজি। আবার অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে খুব দ্রুততার সাথে একটি নজর নিক্ষেপ করে আর ভাবে কেউ দেখেনি। অথচ আল্লাহ অন্তরের খবর খুব ভালোই জানেন।

আল্লাহ এ সম্পর্কে বলেন,

( يَعْلَمُ خَابِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ ) তিনি (আল্লাহ) জানেন চোখের চোরাচাহনি এবং সেইসব বিষয়ও, যা বক্ষদেশ লুকিয়ে রাখে। [১০]

আবু সা'ঈদ খুদরী হতে বর্ণিত, একবার নবী বললেন, “তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাকো।" তারা বলল, "হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের রাস্তায় বসা ব্যতীত গত্যন্তর নেই, আমরা সেখানে কথাবার্তা বলি।” তখন তিনি বললেন, "যদি তোমাদের রাস্তায় মজলিস করা ব্যতীত উপায় না থাকে, তাহলে তোমরা রাস্তার হক আদায় করবে।" তারা জিজ্ঞাসা করল, "হে আল্লাহর রাসূল, রাস্তার হক কী?" তিনি বললেন, "তা হলো চক্ষু অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা। সালামের জবাব দেয়া এবং সৎকাজের নির্দেশ দেয়া আর অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা। "[১১]

দৃষ্টি হেফাযত সম্পর্কে রাসূল আরও বলেন,

اضمنو الي ستا من أنفسكم أضمن لكم الجنة : اصدقوا إذا حدثتم، وأوفوا إذا عاهدتم، وأدوا إذا انتمنتم، واحفظوا فروجكم، وغضوا أبصاركم، وكفوا أيديكم তোমরা আমার জন্য ছয়টি জিনিসের দায়িত্ব নিলে, আমি তোমাদের জান্নাতের দায়িত্ব নেব। যখন কথা বলবে, সত্য বলবে। যখন প্রতিশ্রুতি দেবে তা পুরো করবে। যখন তোমার নিকট আমানত রাখা হবে, তা রক্ষা করবে। আর তোমরা তোমাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করবে, তোমাদের চক্ষুকে অবনত করবে এবং তোমরা তোমাদের হাতকে বিরত রাখবে। [১২]

একবার কুরবানীর দিনে রাসূলুল্লাহ তাঁর চাচাতো ভাই ফাযল ইবনু 'আব্বাস -কে নিজের বাহনের পেছনে বসালেন। সেই সময় কোনো এক সুন্দরী নারী রাসূল -এর নিকট কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে আসলেন। আল্লাহর রাসূল লক্ষ করলেন, তাঁর চাচাতো ভাই ফযল ইবনে আব্বাস মহিলাটির দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। তখন রাসূল তাঁর থুতনি ধরে তাঁর চেহারাকে অন্যদিক ঘুরিয়ে দিলেন।[১৩] হাদীসের এ ঘটনা থেকে আমাদের একটি বিষয়ে শেখার রয়েছে। একজন নারী কেমন পোশাক পরিধান করে আছে সেটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করার পূর্বে নিজের নজর ঠিক করতে হবে।

এ ছাড়া এ ঘটনা থেকে আমরা আরও জানতে পারি, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো পরনারীর দিকে অনবরত দৃষ্টি নিক্ষেপণ করে, তাহলে অন্য কেউ তার দৃষ্টি ভিন্ন দিকে ফিরিয়ে দেবে। সা'ঈদ ইবনু 'আবুল হাসান হাসান-কে বললেন, অনারব মহিলারা তাদের মস্তক ও বক্ষ খোলা রাখে। তিনি জবাবে বললেন, তোমার চোখ ফিরিয়ে রেখো।

দৃষ্টিশক্তি যেমন আল্লাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ামত ঠিক তেমনি এটি আল্লাহর তরফ থেকে কঠিন একটি পরীক্ষাও বটে-যা আমরা অনেকেই অনুধাবন করতে পারি না। অন্ধ মানুষটি আজ দৃষ্টিশক্তির অনুপস্থিতির কারণে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে; অথচ হাশরের দিন হয়তো সেই ব্যক্তিটিই খুশিতে সর্বাধিক আত্মহারা হবে আর রবের কাছে শুকরিয়া আদায় করবে যে, তার রব তাকে কতশত গুনাহ থেকে বাঁচিয়েছেন। অপরদিকে যারা পৃথিবীতে দৃষ্টিমান ছিলেন, দুনিয়ার যাবতীয় সৌন্দর্য যে অবলোকন করেছে, সাথে দৃষ্টির যিনা করেছে তার হালাত সেদিন কেমন হবে! দৃষ্টি হচ্ছে শয়তানের বিষাক্ত তিরগুলোর মাঝে অন্যতম। যেই তির লক্ষ্যভ্রষ্ট খুব কমই হয়। শয়তান খুব সহজেই মানুষকে কুদৃষ্টিপাতের জন্য প্ররোচিত করে ফেলতে পারে। আর এই দৃষ্টির সাথে ব্যক্তির অনেক কিছুই সম্পৃক্ত। যেমন হাদীস থেকে জানা যায় যে, কেউ যদি কোনো নারীর দিকে ভুলবশত প্রথম দৃষ্টি দিয়ে অতঃপর তার দৃষ্টিকে নত করে নেয়, আল্লাহ তার জন্য এমন একটি ইবাদাত চালু করে দেন যার মিষ্টতা সে গ্রহণ করবে।[১৪]

শাইখুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া বলেন, কুদৃষ্টি অত্যন্ত খতরনাক রোগ। এ বিষয়ে আমার নিজেরও অনেক অভিজ্ঞতা আছে। আমার বহু বন্ধু-বান্ধব যিকির ও মুজাহাদার প্রথম দিকে জোশ ও প্রশান্তির ঘোরে থাকে। কিন্তু কুদৃষ্টির কারণে ইবাদাতের প্রশান্তি হারিয়ে ফেলে। পরিণামে তারা ধীরে ধীরে ইবাদাত ছেড়ে দেয়ার দিকে অগ্রসর হয়ে যায়।[১৫]

উদাহরণস্বরূপ, সুস্থ কোনো ব্যক্তি যদি হঠাৎ কোনো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়, দুর্বলতার কারণে সে চলাফেরা করতেও অক্ষম হয়ে পড়ে। কাজের প্রতি সে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তার মন চায় সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকতে। অনুরূপভাবে, কুদৃষ্টির রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিও আধ্যাত্মিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। নেককাজ করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কিংবা কথাটা এভাবেও বলা যেতে পারে যে, আমলের তাওফীক তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়। হয়তো নেককাজের নিয়তও সে করে, কিন্তু কুদৃষ্টির কারণে নিয়তে দুর্বলতা চলে আসে।

ইবাদাত, অন্তরের পরিশুদ্ধতা, ব্যক্তিত্ব সবই যেন দৃষ্টির সুতোয় বাঁধা। যে ক্রমাগত দৃষ্টির খিয়ানত করে চলে তার ইবাদাত, অন্তরের পরিশুদ্ধতা, ইখলাস, ব্যক্তিত্ব একে একে ছেঁড়া সুতোয় তাসবিহর দানার মতো গড়িয়ে পড়ে যায়। যারা দৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করে না, তারা ক্রমশই ইবাদাতের স্বাদ হারাতে থাকে। নেক আমলের প্রতি তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। হৃদয়ের মাঝে একটা গুনাহর আগুনের তাপ তারা অনুভব করতে থাকে। কোনো কিছুতেই তারা শান্তি পায় না। অন্তর কিছু একটা হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। লোভে অন্তর যেন হাঁপাতে থাকা কুকুরের মতো ছুটে বেড়ায়, যা একটা সময় তাদের ব্যক্তিত্বকে নষ্ট করে দেয়। নিজের অন্তরকে এভাবে হত্যা করার পূর্বে তাই ভেবে নেয়া উচিত যে, আমি কী করতে যাচ্ছি, কেন করতে যাচ্ছি, আর এর পরিণামই বা কী?

টিকাঃ
[৪] সূরা বনী ইসরাঈল- ৩৬
[৬] সহীহ বুখারী-৬২৪৩; সহীহ মুসলিম- ২৬৫৭; সহীহ আহমাদ- ৮২২২
[৭] সূরা আল ইসরা- ৩২
[৮] এই বিধান তখন কার্যকরী হবে যখন বেগানা নারী-পুরুষ একে অপরের সাথে সরাসরি যৌন সহবাসে লিপ্ত হবে। সাধারণ স্পর্শ, চুম্বন ইত্যাদির জন্য শাস্তি তুলনামূলক কম।
[৯] জামে তিরমিযী, হাদীস- ২৭৭৭
[১০] সূরা মু'মিন- ১৯
[১১] সহীহ বুখারী- ৬২২৯, ২৩০৩, ২৪৬৫
[১২] মুসনাদে আহমাদ- ২২৭৫৭
[১৩] সহীহ বুখারী- ৬২২৮
[১৪] মুসনাদে আহমাদ- ৫/২৬৪; মিরকাতুল মাফাতীহ শারহে মিশকাতিল মাসাবীহ- ৬/২৬৪, হাদীস- ৩১২৪; মু'জামুল কবীর, ত্ববারানী- ৮, ১০/২৪৬, ২১৪, হাদীস- ৭৮৪২, ১০৩৬২; মুস্তাদরাকে হাকেম- ৪/৩১৪; মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনু তাইমিয়া- ১৫/২৯২ থেকে ২৯৪
[১৫] আপবীতী- ৬/৪১৮

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 লালসার দৃষ্টিতে কোনো পরনারীর দিকে দৃষ্টিপাত করার বিধান

📄 লালসার দৃষ্টিতে কোনো পরনারীর দিকে দৃষ্টিপাত করার বিধান


নিজ স্ত্রী ব্যতীত যেকোনো নারীর দিকে শাহওয়াত ও লালসার দৃষ্টিতে তাকানো কবিরাহ গুনাহ। এবং এটি আল্লাহর নিকট শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আল্লাহ নারী-পুরুষকে তাদের দৃষ্টি অবনত ও লজ্জাস্থান সংযত রাখার ব্যাপারে কুরআনে আদেশ দিয়েছেন যা আমরা ইতিপূর্বে জেনেছি। [১৬]

হযরত বুরাইদা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেন, হে আলী, হঠাৎ কোনো মহিলার ওপর দৃষ্টি পড়ার পর দ্বিতীয়বার ইচ্ছা করে তাকাবে না। কারণ, প্রথমবার অনিচ্ছাকৃতভাবে তাকানো তোমার জন্য মাফ হলেও দ্বিতীয়বার ইচ্ছাকৃত তাকানো মাফ নয়। [১৭] রাসূলুল্লাহ বলেন,

المرأة عورة مستورة فاذا خرجت استشرفها الشيطان

মেয়ে মানুষের সবটাই লজ্জাস্থান (গোপনীয়)। আর সে যখন বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে সুশোভিত করে তোলে।[১৮]

উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মে সালামা বর্ণনা করেন, আমি এবং মাইমূনা রাসূলুল্লাহ -এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। ইতিমধ্যে অন্ধ সাহাবী হযরত ইবনে উম্মে মাকতুম সেখানে আসতে লাগলেন। তখন রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে বললেন, তোমরা তার থেকে পর্দা করো, আড়ালে চলে যাও। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, তিনি তো অন্ধ, আমাদেরকে দেখতে পাচ্ছেন না। রাসূল ইরশাদ করলেন, তোমরাও কি অন্ধ? তোমরা কি তাকে দেখতে পাচ্ছ না?[১৯]

উলামায়ে উম্মতের মাঝে ইমাম ইবনু নুজাইম, আল্লামা আব্দুল্লাহ আল মাওসিলী, ইমাম মুহাম্মাদ মাহমূদ বাবিরতী, আল্লামা আব্দুল গনী আবু তালেব আদ দিমাশক্কি, আল্লামা হাসকাফী সহ প্রমুখ মত দিয়েছেন, স্ত্রী ব্যতীত শাহওয়াতের দৃষ্টিতে অন্য কোনো নারীর দিকে তাকানো হারাম।[২০] ইমাম ইবনুল মুফলিহ সকল অবস্থায় पुरुषদের দৃষ্টি অবনত রাখাকে ওয়াজিব বলেছেন। তবে যদি কোনো বিশেষ শরঈ প্রয়োজনে নারীর দিকে তাকানোর প্রয়োজন পরে, তাহলে তার ব্যাপারে শিথিলতা অবলম্বন করেছেন।[২১]

ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন, الرَّاجِحَ فِي مَذْهَبِ الشَّافِعِي وَأَحْمَد أَنَّ النَّظَرَ إِلَى وَجْهِ الْأَجْنَبِيَّةِ مِنْ غَيْرِ حَاجَةٍ لَا يَجُوزُ وَإِنْ كَانَتْ الشَّهْوَةُ مُنْتَفِيَة .... وَأَمَّا النَّظَرُ لِغَيْرِ حَاجَةٍ إِلَى مَحَلِّ الْفِتْنَةِ فَلَا يَجُوزُ وَمَنْ كَرَّرَ النَّظَرَ إِلَى الْأَمْرَدِ وَنَحْوِهِ أَوْ أَدَامَهُ وَقَالَ : إِنِّي لَا أَنْظُرُ لِشَهْوَةِ: كَذَبَ فِي ذَلِكَ ؛ فَإِنَّهُ إِذَا لَمْ يَكُنْ مَعَهُ دَاعٍ يَحْتَاجُ مَعَهُ إِلَى النَّظَرِ لَمْ يَكُنَّ النَّظَرُ إِلَّا لِمَا يَحْصُلُ فِي الْقَلْبِ مِنَ اللَّذَّةِ بِذَلِكَ

ইমাম শাফেয়ী ও আহমাদ এ-এর মাযহাবের রাজেহ মত হচ্ছে, বিনা কারণে কোনো বেগানা নারীর দিকে তাকানো নাজায়েয... আর যে বারবার কোনো মেয়ের দিকে তাকাবে অথবা অনেকক্ষণ যাবৎ তাকিয়ে এ কথা বলে যে, আমি শাহওয়াতের সাথে তাকাইনি, সে মিথ্যা বলেছে...। [২২]

বোঝা গেল, বিনা কারণে কোনো বেগানা নারীর দিকে তাকানোই জায়েয নেই; লালসা তো দূরের কথা। এবং যে একে (অর্থাৎ লালসার দৃষ্টিতে তাকানোকে) হালাল মনে করবে, সে কুফুরী করবে। [২৩]

টিকাঃ
[১৬] সূরা আন নূর- ৩০ ও ৩১
[১৭] সুনান আবু দাউদ শরীফ- ১/২৯২
[১৮] সুনানে তিরমিযী- ১/২২২, হাদীস- ১১৭৩; সহীহ ইবনু হিব্বান- ৭/৪৪৬, হাদীস- ৫৫৬৯; মিশকাত- ৩১০৯। সনদ সহীহ।
[১৯] সুনান আবু দাউদ শরীফ ২/৫৬৮
[২০] ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়াহ- ৫/৩২৯; বাহরুর রায়েক- ৩/৬৫; আল ইখতিয়ার লিতা'লিলীল মুখতার- ৪/১৬৬, আল ইনায়াহ শরহুল হিদায়াহ- ৪/৬৩, ১৪/২৩০; আল লুবাব শরহুল কিতাব- ১/৪১১; রদ্দুল মুহতার- ৯/৫৩২; হাশিয়ায়ে শিলবী আলাত তাবয়ীন- ১/৯৬; হাশিয়ায়ে ত্বাহত্ববী আলা মারাকিল ফালাহ- ১/৩৩১; রদ্দুল মুহতার- ১/৪০৭; ফাতহুল কাদীর- ৮/৪৬০; তাবঈনুল হাক্বায়েক- ৬/১৭; তুহফাতুল মুলুক, পৃষ্ঠা- ২৩০
[২১] আদাবুশ শারইয়াহ- ১/২২৯
[২২] মাজমুউল ফাতাওয়া- ২১/২০৯
[২৩] আল ইনসাফ, মারদাউই-৮/২৮ থেকে ৩০

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 ইন্টারনেটের অশ্লীল কন্টেন্ট

📄 ইন্টারনেটের অশ্লীল কন্টেন্ট


ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক মহামারি ফিতনা ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছে। রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছে কতশত অন্তর। রাস্তাঘাটে, লোক সমাগমে অন্য নারীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে নজরের খিয়ানত করা পুরুষদের জন্য কিছুটা কঠিন। কেননা এতে লোকচক্ষুর ভয় রয়েছে, লজ্জাশীলতা রয়েছে। কিন্তু যখন সেই পুরুষ নির্জনে অবস্থান করে, সে ধরেই নেয় তাকে আর কেউ দেখছে না। এ দিকে কেবল কয়েকটি ক্লিকের ব্যবধানে যিনা তার দিকে মুখিয়ে থাকে। এই মোহ দমন করতে পারে কয়জন?

আমরা বুঝি, এসব সমাজকে কতটা মন্দভাবে গ্রাস করে নিয়েছে। অনেকে এই চোরাবালির এতটা গভীরে নিজের পা গেড়েছে যে, ফিরে আসাটা তার কাছে অসম্ভব মনে হচ্ছে। তবে আশার বাণী, আল্লাহ কারও ওপর সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন না। অর্থাৎ এ থেকে ফিরে আসতে বেগ পেতে হবে সত্যি, কিন্তু এটি অসম্ভব কিছু না। প্রয়োজন কেবল ঈমানী শক্তি, সবর ও অধিক পরিমাণে দু'আ।

ইবনে কাসীর, ইমাম হাসকাফী, ইমাম ইবনু নুজাইম সহ পূর্ববর্তী অনেক মনীষী গোঁফ-দাড়িবিহীন বালকদের প্রতি অপলক নেত্রে তাকিয়ে থাকাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন এবং অনেক আলেমের মতে এটা হারাম। [২৪] চোখের পর্দা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে ইন্টারনেটে অশ্লীল ছবি বা পর্নোগ্রাফি দেখা কি কখনোই বৈধ হতে পারে? নির্জন অবস্থানে ইন্টারনেটে অশ্লীল বস্তু দেখা কেবল কবিরাহ গুনাহই নয়, এটি ঈমানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আল্লাহ সর্বদৃষ্টিমান, এ কথা তারা মুখে বলে কিন্তু কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে যে, আল্লাহ যে সব দেখেন এর ওপর তাদের বিশ্বাসের ঘাটতি আছে।

হযরত জুনায়েদ বাগদাদী-কে জিজ্ঞাস করা হলো, "হারাম দৃষ্টি থেকে কীভাবে বাঁচা যায়?" জবাবে তিনি বললেন, "হারামের দিকে দৃষ্টিপাত করার আগে সর্বদা মনে রাখবে যে, তোমার রব, তোমাকে যিনি সৃষ্টি করেছে, তোমাকে যিনি লালন-পালন করছেন তিনি তোমার ওপরে দৃষ্টিপাত করে রয়েছেন।”

ইমাম গাযালী বলেন, “দৃষ্টি অন্তরে খটকা তৈরি করে। খটকাটা কল্পনায় রূপ নেয়। কল্পনা জৈবিক তাড়নাকে উসকে দেয়। আর জৈবিক তাড়না ইচ্ছার জন্ম দেয়।” সুতরাং বোঝা গেল পরনারীকে দেখার পরেই ব্যভিচারের ইচ্ছা জাগে। বিরত থাকলে সাধারণত ইচ্ছা জাগে না। প্রতীয়মান হলো যে, ব্যভিচারের প্রথম সিঁড়ির নাম হলো কুদৃষ্টি। প্রবাদ আছে, পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম সফর এক পা ওঠালেই শুরু হয়ে যায়। অনুরূপভাবে কুদৃষ্টির মাধ্যমে শুরু হয় ব্যভিচারের সফর। ঈমানদারের কর্তব্য হলো ব্যভিচারের সুদীর্ঘ পথে প্রথম পা ফেলা থেকে বিরত থাকা।

আমরা সাধারণভাবে চিন্তা করতে পারি, কেউ কি তার বাবা-মায়ের সামনে কখনোই উলঙ্গ হতে পারবে? তাদের সামনে অশ্লীল কাজ অথবা হস্তমৈথুন করতে পারবে? সাধারণত অনেক পাগলও লোকসম্মুখে উলঙ্গ হয় না, নিজেদেরকে বিবস্ত্র করে না। সেদিক থেকে তো আল্লাহ আমাদের মস্তিষ্কের সুস্থতা দিয়েছেন, আমরা চিন্তা করতে পারছি। আমাদের যদি এতটুকু বুঝ থাকে যে, আমরা কস্মিনকালেও আমাদের বাবা-মা কিংবা সাধারণ কোনো মানুষের সামনে উলঙ্গ হতে পারব না; হস্তমৈথুন বা তাদের সামনে পর্নোগ্রাফি দেখা তো ভাবনাতেই আসে না, চিন্তাতেই আসে না। যখন আপাতদৃষ্টিতে কেউ ধারে-কাছে উপস্থিত নেই, সেই ক্ষণেও তো আমাদের রব আমাদেরকে দেখছেন। প্রতিটি মুহূর্তই তো আমরা নজরদারির মধ্যে আছি। তাহলে কেন আমাদের চিন্তায় এত অসারতা? নবী বলেন,

عَنِ النَّبي - صلى الله عليه وسلم أَنَّهُ قَالَ: "لأَعْلَمَنَّ أَفَوَامًا مِنْ أُمَّتِي يَأْتُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِحَسَنَاتٍ أَمْثَالِ جِبَالِ تِهَامَةَ بِيضًا فَيَجْعَلُهَا اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ هَبَاءٌ مَنْثُورًا ". قَالَ ثَوْبَانُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ صِفْهُمْ لَنَا جَلِهِمْ لَنَا أَنْ لَا تَكُونَ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَا نَعْلَمُ. قَالَ: " أَمَا إِنَّهُمْ إِخْوَانُكُمْ وَمِنْ جِلْدَتِكُمْ وَيَأْخُذُونَ مِنَ اللَّيْلِ كَمَا تَأْخُذُونَ وَلَكِنَّهُمْ أَقْوَامُ إِذَا خَلَوْا بِمَحَارِمِ اللَّهِ انْتَهَكُوهَا

আমি আমার উম্মাতের কতক দল সম্পর্কে অবশ্যই জানি যারা কিয়ামতের দিন তিহামার শুভ্র পর্বতমালার সমতুল্য নেক আমলসহ উপস্থিত হবে। আল্লাহ সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবেন। সাওবান বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, তাদের পরিচয় পরিষ্কারভাবে আমাদের নিকট বর্ণনা করুন, যাতে অজ্ঞাতসারে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তিনি বলেন, তারা তোমাদেরই ভ্রাতৃগোষ্ঠী এবং তোমাদের সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা রাতের বেলা তোমাদের মতোই ইবাদাত করবে। কিন্তু তারা এমন লোক যে, একান্ত গোপনে আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ে লিপ্ত হবে। [২৫]

এত এত আমল করে শেষ পর্যন্ত তবুও জাহান্নামের গহ্বরে প্রবেশ করলে এরচেয়ে বড় হতভাগা আর কি কেউ হতে পারে? তাই অবশ্যই এখনই আমাদের নাফসের লাগাম টেনে ধরতে হবে।

টিকাঃ
[২৪] বাহরুর বায়েক- ৩/৬৫; রদ্দুল মুহতার- ৯/৫৩২
[২৫] ইবনে মাজাহ-৪২৪৫

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 লজ্জাস্থানের হিফাযত

📄 লজ্জাস্থানের হিফাযত


রাসূলুল্লাহ বলেন,

مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ

যে ব্যক্তি আমার কাছে এই অঙ্গীকার করবে যে, সে তার দুই চোয়ালের মধ্যস্থিত বস্তু (জিহ্বা) এবং তার দুপায়ের মধ্যস্থিত বস্তুর (গোপনাঙ্গ) জিম্মাদার হবে; আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব। [২৬]

দুনিয়াতে যত ফিতনা, ফাসাদ ও অপকর্ম সংঘটিত হয় তার অধিকাংশই হয়ে থাকে জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের মাধ্যমে। এ দুটোকে যে সংযত করবে, রাসূলুল্লাহ তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "তোমরা আমার জন্য ছয়টি জিনিসের দায়িত্ব নিলে আমি তোমাদের জান্নাতের দায়িত্ব নেব। যখন কথা বলবে, সত্য বলবে। যখন প্রতিশ্রুতি দেবে তা পূরণ করবে, আর যখন তোমার নিকট আমানত রাখা হবে, তা রক্ষা করবে। আর তোমরা তোমাদের লজ্জাস্থানের হেফাযত করবে, তোমাদের চক্ষুকে অবনত করবে এবং তোমরা তোমাদের হাতকে (অশ্লীল কাজ হতে) বিরত রাখবে।”[২৭]

আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, قَالَ سُبِلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ الْجَنَّةَ فَقَالَ تَقْوَى اللهِ وَحُسْنُ الْخُلُقِ وَسُبِلَ عَنْ أَكْثَرِ مَا يُدْخِلُ النَّاسَ النَّارَ فَقَالَ الْفَمُ وَالْفَرْجُ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা কি জানো কোন বস্তু মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করায়? তা হচ্ছে, আল্লাহর ভয় বা তাকওয়া এবং উত্তম চরিত্র। তোমরা কি জানো মানুষকে কোন বস্তু সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করায়? একটি মুখ ও অপরটি লজ্জাস্থান। [২৮]

এই হাদীসে আদর্শ পুরুষের চারটি গুণ তুলে ধরা হয়েছে: (১) তাকওয়া বা আল্লাহভীতি; (২) উত্তম চরিত্র; (৩) জবান নিয়ন্ত্রণ; (৪) লজ্জাস্থানের হেফাযত।

কেউ যদি নিজের মাঝে এই চারটি গুণ গড়ে তুলতে পারে, তাহলে আল্লাহর ইচ্ছায় সে আদর্শ মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে। তার দ্বারা দেশ ও সমাজ উপকৃত হবে। আবাল বৃদ্ধবনিতা সকলে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হলে এবং সবাই তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত হলে তাদের দ্বারা অন্যরা নির্যাতিত হবে না। সবাই শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করবে। আর এই মানুষগুলোর চূড়ান্ত গন্তব্য হবে জান্নাত ইন শা আল্লাহ। অপরদিকে এই চারের অনুপস্থিতি এই পৃথিবীকেই জাহান্নামে পরিণত করতে সক্ষম, যা আমরা ইতিমধ্যে অনুভব করতে পারছি।

টিকাঃ
[২৬] সহীহ বুখারী- ৬৪৭৪
[২৭] মুসনাদে আহমাদ- ২২৭৫৭
[২৮] সুনানে তিরমিযী- ২১৩৫; মিশকাত- ৪৬২১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00