📄 স্বপ্নদোষ
স্বপ্নদোষ একটি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের অণ্ডকোষে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৫০০ শুক্রাণু (Sperm) তৈরি হয়। অর্থাৎ কয়েক বিলিয়ন শুক্রাণু পুরুষদের দেহে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে এবং এটি নির্দিষ্ট একটি বয়স পর্যন্ত চলমান প্রক্রিয়া। পুরুষদের দেহ থেকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আনুমানিক ২-৫ মি.লি. বীর্য নিঃসৃত হয়। আর এর প্রতি মি.লি.-তে ২০-১০০ মিলিয়ন পর্যন্ত শুক্রাণু থাকতে পারে। এর কম হলে তা অস্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হয়। চিন্তা করুন, কী পরিমাণ শুক্রাণু আমাদের প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে এবং নিঃসৃত হচ্ছে! স্ত্রীর সাথে মিলিত হওয়ার মাধ্যমে সন্তান লাভের আশা করলে সে ক্ষেত্রে অগণিত শুক্রকীটের মাঝে কেবল একটি মাত্র শুক্রাণুই নিষেক ঘটায়। এই একটি শুক্রাণু অণ্ডকোষে তৈরি হয়ে পরিপক্কতা লাভ করে বাইরে বের হয়ে আসতে ৯০ দিনের মতো সময় নেয়। এই বিলিয়ন বিলিয়ন স্পার্ম ৯০ দিনের এই চক্রের মধ্য দিয়েই পরিণত হয়। আল্লাহ্-এর একটি অন্যতম নিয়ামত এটি।
প্রতিনিয়ত এভাবে শুক্রকীট আমাদের অণ্ডকোষে তৈরি হচ্ছে। যারা বিবাহিত ও স্ত্রীর সাথে মিলিত হতে পারে, তাদের ক্ষেত্রে বীর্যপাতের মাধ্যমে পুরাতন শুক্রাণু বের হয়ে গিয়ে নতুন শুক্রাণুর জন্য জায়গা করে দেয়। কিন্তু যারা অবিবাহিত অথবা যেকোনো কারণে স্ত্রীর সাথে মিলিত হতে পারে না এবং হস্তমৈথুনের মতো ঘৃণ্য কাজে যারা লিপ্ত নয়, তাদের বীর্যপাতের সুযোগ নেই; অথচ নতুন শুক্রাণুকে জায়গা করে দিতে প্রয়োজন খালি স্থানের। তাই শরীরের প্রয়োজনের খাতিরে শুক্রাণুগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বের হয়ে আসে স্বপ্নদোষের মাধ্যমে। এ ব্যাপারটি ভালো করে বোঝাতে অনেকেই এই উদাহরণ দেন, "কোনো বালতি যদি পানি দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে একসময় অতিরিক্ত পানি উপচে পড়তে শুরু করে”।
এ বিষয়ে আমাদের যা কিছু জেনে রাখা প্রয়োজন:
♦ কোনো উত্তেজক স্বপ্ন দেখার কারণে বীর্যপাত ঘটতে পারে। এটি একদমই স্বাভাবিক; যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে স্বপ্ন দেখে থাকে, তাহলে এটি কোনো গুনাহের কাজও নয়। এটি ঘুমের মাধ্যমে হয় যেখানে তার নিজের ওপর নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
♦ সাধারণত স্বপ্নদোষ কোনো সমস্যা নয়। স্বপ্নদোষ কারও বেশি হতে পারে কারও আবার কম হতে পারে। কারও সপ্তাহে একবার হয়, কারও মাসে একবার হয়, কারও তিন মাসে একবার, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রতিদিনই হয়। সাধারণভাবে সপ্তাহে সর্বোচ্চ তিন-চারদিন হওয়াটা তেমন কোনো বিষয় নয়। যদি এমন হয় যে, স্বপ্নদোষ প্রতিদিনই হচ্ছে এবং শারীরবৃত্তীয় সমস্যার কিছু লক্ষণও দেখা যাচ্ছে, তাহলে এটিকে অসুস্থতা বলে গণ্য করা হয়। সে ক্ষেত্রে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
♦ অধিক স্বপ্নদোষের কারণে কোনো শারীরিক সমস্যা পরিলক্ষিত হলে এ ক্ষেত্রে ভালো পুষ্টিকর খাবার খাওয়াই সমাধান হতে পারে।
♦ অধিকহারে স্বপ্নদোষ হওয়া জ্বীনের আসরের লক্ষণ বলে অভিহিত করে থাকেন অনেকে। এমনটি হলেই যে জ্বীনের আসর এমন ভাবা ঠিক নয়। তবে এর পাশাপাশি অন্য কোনো লক্ষণ পেলে সে ক্ষেত্রে রুকইয়াহ করা যেতে পারে বা আলেমের শরণাপন্ন হয়ে ব্যাপারগুলোর সমাধান করে নেয়া যেতে পারে।
♦ স্বপ্নদোষজনিত যেসব মাসআলা রয়েছে তা ভালো করে জেনে নেয়া উচিত। কীভাবে ফরয গোসল করতে হয়, কীভাবে কাপড় পরিষ্কার করতে হয় ইত্যাদি, যা আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি। অনেক সময় ইসলামের জ্ঞানের অভাবে অনেকে শুচিবায়ু রোগ, ওসিডি ও ওয়াসওয়াসায় ভোগেন।
📄 প্রস্রাব
পুরুষদের প্রস্রাবের রাস্তার গঠন ও পদ্ধতি নারীদের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। পুরুষদের প্রস্রাবের নালি হয় আঁকা-বাঁকা। এই নালিতে মোট ৩টি বাঁক রয়েছে। প্রস্রাব এই বাঁকগুলো অতিক্রম করে দেহ থেকে বের হয়ে আসে। এই গঠনের কারণে পবিত্রতা অর্জনের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা পুরুষদের দেখা দেয়। এ ছাড়া পুরুষদের প্রস্রাবজনিত আরও কিছু মেডিকেল বিষয় রয়েছে যা আমাদের জেনে রাখা জরুরি:
♦ একজন পুরুষের উচিত নিজের বিষয়ে যথার্থ জ্ঞান রাখা। তার জানতে হবে যে, তার প্রস্রাব কতক্ষণ সময় নিয়ে সম্পন্ন হয়, নিজের ক্ষেত্রে কীভাবে সর্বোচ্চ পবিত্রতা নিশ্চিত করা যায়, কোন কোন সময় এবং কী কী কারণে প্রসাবের নালি দিয়ে প্রসাব বের হয়ে আসে ইত্যাদি। এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে পারলে প্রস্রাবজনিত অনেকগুলো সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে আশা করা যায়।
• স্বাভাবিক নিয়মে প্রস্রাব করার পর যখন ব্যক্তির মনে হবে যে, তার প্রস্রাব সম্পন্ন হয়েছে তখন সে পানি দিয়ে নিজেকে পবিত্র করে নেবে। পুরুষের প্রস্রাবের নালি যেহেতু কিছুটা বাঁকানো, তাই এ ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করলে কিছু মূত্র ভেতরে অবশিষ্ট থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে যা পরবর্তী সময় হাঁটা-চলা বা সালাতের রুকু-সাজদার সময় পেটে চাপ পড়ার কারণে বের হয়ে আসতে পারে। তাই মূত্রত্যাগের সময় ধৈর্য ধরে সময় নেয়া উচিত। কিন্তু এর মানে দীর্ঘক্ষণ ধরে টয়লেটে বসে থাকতে হবে, জোর-জবরদস্তি করে বা অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে সবকিছু বের করে ফেলতে হবে এমনটি নয়। এভাবে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ শারীরিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
• পুরুষদের মূত্রনালিতে দুইটি বন্ধনী (sphincter) রয়েছে। একটি অভ্যন্তরীণ (Entarnal), অপরটি বাহ্যিক (Extarnal)। ভেতরেরটা আমাদের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়, কিন্তু বাইরেরটা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। এ কারণেই পুরুষদের অনেকেই খুব সহজেই প্রস্রাব চেপে রাখতে পারেন। তবে বিনা প্রয়োজনে এমনটি করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
• মলমূত্র-জনিত নাপাকী থেকে যেই পদ্ধতিতে পবিত্রতা অর্জন করতে হয়, সেভাবেই আমরা পবিত্রতা অর্জন করব। এর চেয়ে বাড়াবাড়ি করতে যাব না। কেননা, এসব পরবর্তীকালে Obsessive-compulsive disorder (OCD) নামক মানসিক রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
* ফ্রিকোয়েন্সি আর্জেন্সি : (১) প্রস্রাব করার পরও আরও প্রস্রাব হবে মনে হওয়া, (২) প্রস্রাব হওয়ার সময় ব্যথা হওয়া, (৩) প্রস্রাব সম্পন্ন হওয়ার পরও ফোঁটা ফোঁটা বের হওয়া এবং এটি প্রায় প্রতিনিয়ত হওয়া, (৪) ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া। উপর্যুক্ত উপসর্গগুলোর ক্ষেত্রে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে।
📄 পায়খানা
পুরুষ ও নারীর মূত্রনালির গঠনের মাঝে যেমন ভিন্নতা রয়েছে, পায়খানার রাস্তায় সে রকম কোনো ভিন্নতা নেই। এ ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় যে বিষয়গুলো সকলের জেনে রাখা উচিত:
• মলত্যাগের সময় লো প্যান (নিচু কমোড) ব্যবহার করা উচিত। এটি অধিক স্বাস্থ্যসম্মত। কেননা লো প্যান টয়লেটে যেভাবে হাঁটু উঁচু করে বসা হয় এভাবে বসলে পায়ুনালি সোজা হয়ে থাকে। তাই খুব সহজেই মল বের হয়ে আসতে পারে। উঁচু কমোডে বসলে পায়ুনালিটি সোজা থাকে না।
• হাই কমোডে সামনের দিকে ঝুঁকে, পেছনে হেলান দিয়ে অথবা সোজা হয়ে যেভাবেই বসা হোক না কেন, সব ক্ষেত্রে পায়খানার নালির অবস্থান একই রকম থাকে। এজন্যে কোষ্ঠকাঠিন্যে আক্রান্ত রোগীর যথাসম্ভব হাই কমোড এড়িয়ে চলা উচিত।
• তবে হাঁটু বা কোমরে সমস্যা থাকলে ভিন্ন কথা, সে ক্ষেত্রে উঁচু কমোড ব্যবহার করা যেতে পারে।
• অবশ্যই মলত্যাগের পর ভালো করে পায়ুপথ পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। ভালোমতো পরিষ্কার না রাখার কারণে অনেকেই রক্তক্ষরণ বা অর্শ, গেজ, ফিস্টুলা, ক্যান্সারের মতো পায়ুজনিত বিভিন্ন রোগে ভোগেন।
• ধৌত করার সময় সাবান পরিহার করা উচিত, কেননা তা উক্ত স্থানের ত্বকের স্বাভাবিক প্রকৃতি পরিবর্তন করে ফেলে।
• মলমূত্র ত্যাগের পর ভালো করে হাত ধুয়ে নিতে হবে। অন্যথায় বিভিন্ন রোগের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
📄 অধিক মযী নিঃসরণ
মযী হচ্ছে বীর্যপাতের পূর্বে নিঃসৃত হওয়া এক ধরনের তরল পদার্থ। এটি স্বচ্ছ, বীর্যের মতো সাদা রঙের নয়। এতে শুক্রাণু থাকতে পারে, কিন্তু সাধারণত থাকে না। এটি বের হলে উত্তেজনা কমে না, বরং বেড়ে যায়; অপরদিকে বীর্য বের হলে উত্তেজনা কমে যায়। এই তরল পদার্থটির কাজ হচ্ছে, এটি শুক্রাণুর আগমনের পথকে সুগম করে। মযী নিঃসরণের ব্যাপারটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। স্ত্রীর সাথে চুম্বন বা স্পর্শের কারণে অথবা অনুচিতভাবে অশ্লীল কিছু দেখা বা চিন্তা করার কারণে মযী বের হয়ে থাকে। কিন্তু এসব ব্যতীতও যদি প্রতিনিয়ত মযী বের হয় তবে সেটি অস্বাভাবিক। খুব বেশি পরিমাণে যখন-তখন মযী বের হলে সে ব্যক্তিকে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার (urologist/skin- venerologist)-এর কাছ থেকে সম্পূর্ণ তথ্য প্রদানসহ পরামর্শ নেয়া উচিত।