📄 জানাবাত অবস্থায় মসজিদে অবস্থান ও তাওয়াফ
জানাবাত অবস্থায় মসজিদে অবস্থান করা বা মসজিদে প্রবেশ করা জায়েয নেই। অনুরূপভাবে তাওয়াফ করাও জায়েয নেই। এ ব্যাপারে সকল ফক্বিহ একমত।[৬৫] আল্লাহ বলেন,
(يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ وَلَا جُنَّبًا إِلَّا عَابِرِي سَبِيلٍ حَتَّى تَغْتَسِلُوا)
হে মু'মিনগণ, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তোমরা সালাতের নিকটবর্তী হোয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা বুঝতে পারো যা তোমরা বলো এবং অপবিত্র অবস্থায়ও না, যতক্ষণ না তোমরা গোসল করো। তবে যদি তোমরা পথ অতিক্রমকারী হও, সে ক্ষেত্রে ভিন্ন বিষয়। [৬৬] অপবিত্র অবস্থাতেও সালাতের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছেন আল্লাহ। আর এ ক্ষেত্রে 'মাহাল্লুস সলাহ' তথা সালাতের স্থান ও মসজিদের নিকটবর্তী হতেও নিষেধ করা হচ্ছে।[৬৭] এ ছাড়াও জাসরাহ বিনতু দিজাজাহ-এর সূত্রে বর্ণিত,
سَمِعْتُ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا تَقُولُ : جَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَوُجُوهُ بُيُوتِ أَصْحَابِهِ شَارِعَةٌ فِي الْمَسْجِدِ، فَقَالَ: «وَجِهُوا هَذِهِ الْبُيُوتَ عَنِ الْمَسْجِدِ ثُمَّ دَخَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَلَمْ يَصْنَعِ الْقَوْمُ شَيْئًا رَجَاءَ أَنْ تَنْزِلَ فِيهِمْ رُخْصَةٌ فَخَرَجَ إِلَيْهِمْ بَعْدُ فَقَالَ: «وَجِهُوا هَذِهِ الْبُيُوتَ عَنِ الْمَسْجِدِ، فَإِنِّي لَا أُحِلُّ الْمَسْجِدَ لِحَابِضٍ وَلَا جُنُبٍ
আমি আয়িশা -কে বলতে শুনেছি, একদা রাসূলুল্লাহ ﷺ এসে দেখলেন, সাহাবাদের ঘরের দরজা মসজিদের দিকে ফেরানো (কেননা, তারা মসজিদের ভেতর দিয়েই যাতায়াত করতেন)। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, এসব ঘরের দরজা মসজিদ হতে অন্যদিকে ফিরিয়ে নাও। নবী ﷺ পুনরায় এসে দেখলেন, লোকেরা কিছুই করেননি এ প্রত্যাশায় যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ব্যাপারে কোনো অনুমতি নাযিল হয় কি না। অতঃপর নবী ﷺ বের হয়ে তাদের আবারও বললেন, এসব ঘরের দরজা মসজিদ হতে অন্যদিকে ফিরিয়ে নাও। কারণ, ঋতুমতী মহিলা ও নাপাক ব্যক্তির জন্য মসজিদে যাতায়াত আমি হালাল মনে করি না। [৬৮]
এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ আম্মাজান আয়িশা -কে হায়েয অবস্থায় তাওয়াফ করতে নিষেধ করেছেন মর্মে সহীহ বুখারী ও মুসলিমসহ বেশ কিছু গ্রন্থে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যার ভিত্তিতে সকল ফক্বিহ এ ব্যাপারেও একমত পোষণ করেন যে, জুনুব ও হায়েয-নেফাস অবস্থায় তাওয়াফ করা জায়েয নেই।
টিকাঃ
[৬৫] তাবঈনুল হাকায়েক, যাইলাঈ (হাশিয়াতুশ শিলবী সহ)- ১/৫৬; ফাতহুল কাদীর- ৩/৫২; আল ইনায়া শারহুল হিদায়াহ, বাবারতী- ১/১৬৫; মিনাহুল জালীল, আলীশ- ১/১৩১; আল মুদাওয়ানাতুল কুবরা, সাহনুন- ১/১৩৭; আশ শারহুল কাবীর (হাশিয়াতুদ দাসুকী সহ)- ১/১৩৮; বিদায়াতুল মুজতাহিদ- ১/৩৪৩; আয যাখীরাহ- ১/৩১৪, ৩/২৩৮; আল মাজমূ'- ২/১৫৬,১৬০: কিতাবুল উম্ম- ২/১৯৬; রওদ্বাতুত ত্বলেবীন- ১/৮৫; আল ইনসাফ- ৪/১৬; আল মুগনী- ১/১০৭, ১৯৭; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত- ১/৮২; কাশশাফুল কিনা- ১/১৪৮; ফাতাওয়া কুবরা, ইবনু তাইমিয়া- ২/১৪৮-১৪৯
[৬৬] সূরা নিসা- ৪৩
[৬৭] তাফসীরে ইবনু কাসীর- ২/৩০৮; মাজাল্লাতুল বুহুসিল ইসলামিয়াহ-৭৯/২৩৮
[৬৮] সুনানে আবী দাউদ- ২৩২; সহীহ ইবনু খুযাইমাহ- ১৩২৭; সুনানে বাইহাক্বী- ৪৪৯৫- ইবনুল মুলাক্কিন এ তাঁর 'তুহফাতুল মুহতাজ' (১/২০৯)-এ একে সহীহ ও হাসান বলেছেন।
📄 লোমকর্তন
মানবদেহের বিভিন্ন স্থানে চুল বা পশম গজায়। কিছু চুল বা পশম প্রয়োজনীয় এবং মানব সৌন্দর্য বৃদ্ধির সহায়ক। অপরদিকে দেহের কিছু পশম রয়েছে যা অবাঞ্ছিত। এগুলোর মধ্যে কোনটি কর্তন করতে হবে ও কোনটি কর্তন করা যাবে না এ বিষয়ে আমাদের সুষ্ঠু ধারণা থাকা দরকার।
◇ ভ্রু, চোখের পাপড়ি, দাড়ি ভ্রু, চোখের পাপড়ি, দাড়ি এসব চেহারার সৌন্দর্য এবং মানবীয় সহজাত। এসব কেটে ফেলা নাজায়েয।
• মাথার চুল, হাত, পা, বুক ও শরীরের অন্যান্য পশম প্রয়োজনের ক্ষেত্রে কেটে ছোট করা বা একদম চেঁছে ফেলা জায়েয আছে।
◆ গোঁফ আল্লাহর রাসূল ﷺ গোঁফ ছোট করতে বলেছেন। অর্থাৎ, সুন্নাহ হচ্ছে গোঁফ কাঁচি বা এ-জাতীয় যন্ত্রের সাহায্যে এমনভাবে ছাঁটা যাতে গোঁফের কিছু অংশ রয়ে যায়। গোঁফ পুরোপুরি কেটে বা চেঁছে ফেলা অনুচিত।
• বগলের লোম হাদীসে বগলের লোম উপরে ফেলার বিষয়ে এসেছে। তবে এটি অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য হতে পারে। তাই বগলের লোম কেটে ফেললেও হবে।
• নাভির নিচের অবাঞ্ছিত লোম পায়ের পাতার ওপর ভর করে বসা অবস্থায় নাভি থেকে চার-পাঁচ আঙুল পরিমাণ নিচে যে ভাঁজ বা রেখা দেখা যায় সেখান থেকেই গোপনাঙ্গের অবাঞ্ছিত লোমের সীমানা শুরু। ওই ভাঁজ থেকে শুরু করে দুই উরুর সংযোগস্থল পর্যন্ত ডান-বামের লোম, গোপনাঙ্গের চারপাশের লোম, অণ্ডকোষে ও মলদ্বার পর্যন্ত উদ্গত হওয়া লোম এবং প্রয়োজনে মলদ্বারের আশপাশের লোম অবাঞ্ছিত লোমের অন্তর্ভুক্ত।
অবাঞ্ছিত লোম ৪০ দিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও পরিষ্কার না করা মাকরুহ তাহরীমী। [৬৯] ৪০ দিন অতিবাহিত হলেও সালাত আদায় হয়ে যায়; তবে এটি গুনাহর কারণ হবে।
সাহাবী আনাস থেকে বর্ণিত, وَقُتَ لَنَا فِي قَصِّ الشَّارِبِ، وَتَقْلِيمِ الْأَظْفَارِ، وَنَتْفِ الْإِبِطِ، وَحَلْقِ الْعَانَةِ، أَنْ لَا نَتْرُكَ أَكْثَرَ مِنْ أَرْبَعِينَ يَوْماً গোঁফ ছোট রাখা, নখ কাটা, বগলের লোম উপড়িয়ে ফেলা এবং নাভির নিচের লোম চেঁছে ফেলার জন্যে আমাদেরকে সর্বোচ্চ সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল যেন, আমরা চল্লিশ দিনের অধিক সময় বিলম্ব না করি। [৭০]
তবে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার নাভির নিচের লোমকর্তন করা মুস্তাহাব, বিশেষ করে জুমু'আর দিন।
টিকাঃ
[৬৯] সহীহ মুসলিম- ১/১২১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ৫/৩৫৭; ফাতাওয়া হক্কানিয়া- ২/৪৬৫; ফাতাওয়ায়ে মাদানিয়া- ৩/৪৮১
[৭০] সহীহ মুসলিম- ২৫৮
📄 লোম পরিষ্কার করার ইসলামসম্মত উপায়
আসল উদ্দেশ্য যেহেতু লোম পরিষ্কার করা তাই যেসব উপায় গ্রহণের মাধ্যমে লোম পরিষ্কার হবে, সেসকল উপায়ই গ্রহণ করা জায়েয আছে। সুতরাং রেজার, ব্লেড, ক্ষুর, কাঁচি, ক্রিম, পাউডার সবই ব্যবহার করা জায়েয। অবশ্য পুরুষের জন্য এ ক্ষেত্রে ব্লেড বা ক্ষুর ব্যবহার করাই উত্তম। [৭১]
অনেক সময় লোম পরিষ্কারের পর এর চিহ্ন টয়লেটে রয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে এই চিহ্ন অর্থাৎ লোম যদি গায়রে মাহরাম কারও চোখে পড়ে, এমনকি ময়লার ঝুড়িতেও যদি দেখে ফেলে, তাহলে গুনাহ হবে। গোপনাঙ্গের লোম শরীরে থাকাকালীন কোনো গায়রে মাহরামকে দেখানো যেমন গুনাহ, তেমনি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরও এর একই বিধান। তাই এ ক্ষেত্রে সর্বোত্তম হচ্ছে টয়লেটে ফ্ল্যাশ করে দেয়া, পুড়িয়ে ফেলা বা মাটিতে পুঁতে ফেলা-যাতে কারও নজরে তা না পরে। ব্লেড, ক্ষুর বা কাঁচিতেও অনেক সময় লোম লেগে থাকে। এসব ব্যাপারে সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।
টিকাঃ
[৭১] কিতাবুল ফিকহ আ'লাল মাযাহিবিল আরবাআ'- ২/৪৫; আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা কুয়েতিয়্যাহ- ৩/২১৬-২১৭, মরদূকে লেবাস আউর বালুকে শরঈ আহকাম- ৮১