📄 ইস্তিবরার পদ্ধতি
উল্লিখিত হাদীসসমূহ থেকে প্রমাণিত হলো, ইস্তিবরা তথা স্বাভাবিক প্রস্রাবের পর অবশিষ্ট প্রস্রাবের ফোঁটা বের করা অত্যন্ত জরুরি। তবে ইস্তিবরার জন্য কোন পন্থা অবলম্বন করা হবে, সে সম্পর্কে কোনো হাদীসে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। অতএব যার জন্য যে পদ্ধতি উপকারী সে সেই পদ্ধতি অবলম্বন করবে। যেমন: হাঁটাহাঁটি, ওঠা-বসা ইত্যাদি। ইস্তিবরার পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে,
طلب البراءة من الخارج بما تعارفه الإنسان من مشي أو تنحنح أو غيرهما إلى أن تنقطع المادة
ইস্তিবরা হলো প্রস্রাব থেকে পবিত্রতা অর্জন করার জন্য প্রত্যেকের অভ্যাস অনুযায়ী হাঁটাহাঁটি, গলা খাঁকারি ইত্যাদি করা যেন প্রস্রাবের কিছুই বাকি না থাকে। [৪০] ইমাম ইবনে আবেদীন এ-ও ইস্তিবরার একই পরিচয় দিয়েছেন। [৪১]
খোলাসা হলো, প্রস্রাবের পর ইস্তিবরা করা আবশ্যক। তবে এর জন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে, তা নির্ধারিত নেই। হাদীস ও আছারে বিভিন্ন পদ্ধতি পাওয়া যায়, সবই মুবাহ। কোনোটাই বিদআত বা শরী'আত-পরিপন্থী নয়।[৪২] একটু সময় নিয়ে, পেটে সামান্য চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তা বের করার চেষ্টা করবে। প্রয়োজনে টয়লেটের ভেতর কিছুটা হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে। তবে অনেকে ৪০ কদম হাঁটাকে জরুরি মনে করে, এমনটি জরুরি নয়। কেউ কেউ আবার মসজিদে বা বাইরে লোকসম্মুখে গোপনাঙ্গ ধরে হাঁটাহাঁটি করে। মুসলিমদের লজ্জাশীল হওয়া উচিত। তাই এসব অবশ্যই পরিহারযোগ্য।
টিকাঃ
[৪০] আল মাওসূআতুল ফিকহিয়্যা আল কুয়েতিয়্যাহ-৪/১১৩
[৪১] রদ্দুল মুহতার- ১/৫৫৮
[৪২] মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা- ৫৮, ১৭০৯; আল আল আওসাত, ইবনুল মুনযির- ১/৩৪৩; হুজ্জাতুল্লাহিল বাগিলগাহ- ১/৩৮; আল মাজমূ'-৩/৩৪
📄 সালাতের মাঝে প্রস্রাবের অবশিষ্ট ফোঁটা বা মযী বের হচ্ছে ধারণা হলে করণীয়
অবিবাহিত-বিবাহিত নির্বিশেষে সকল পুরুষই এই সমস্যায় ভোগেন। অবস্থাভেদে নারীদের মাঝেও এমন সমস্যা দেখা দেয়। সালাতের মাঝে মযী নির্গত হওয়া থেকে বাঁচার একটি সমাধান হতে পারে বিয়ে, যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমনটি হয় শারীরিক চাহিদার কারণে। এ ছাড়া সালাতের মধ্যে রুকু বা সাজদায় যাওয়ার সময় পেটে চাপ পড়ার কারণে কিছু ফোঁটা অবশিষ্ট প্রস্রাব বের হয়ে যায়। সালাতের ঠিক পূর্বমুহূর্তে প্রস্রাব করলে এমনটি হয়ে থাকে, তাই সালাতের পূর্বে কিছু সময় হাতে রেখে নেওয়া উত্তম। তাহলে সালাতের মাঝে প্রস্রাবের ফোঁটা আর বের হবে না বলে আশা করা যায়।
যদি সালাতের মাঝে সে নিশ্চিত বুঝতে পারে যে, তার গোপনাঙ্গ থেকে কোনো কিছু নির্গত হয়েছে, তাহলে এতে সালাত ভঙ্গ হয়ে যাবে; যেহেতু তার ওযু ভেঙে গিয়েছে। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে সালাত ছাড়বে না, যতক্ষণ না সে নিশ্চিত হতে পারে।
যদি তার সালাত এ কারণে ভঙ্গ হয়ে যায়, তাহলে প্রথমে যেই স্থানে প্রস্রাবের ফোঁটা বা মযী লেগেছে সেই স্থানটুকুকে চিহ্নিত করে ধৌত করে ফেলবে। এ ক্ষেত্রে পুরো পোশাক ধৌত করার প্রয়োজন নেই। এরপরে উত্তমরূপে ওযু করে সালাতটি পুনরায় আদায় করতে হবে। [৪৩]
তবে যদি রোগের কারণে ঘন ঘন প্রস্রাব হয় বা বায়ু নিঃসরণ হয় আর এমনটি যদি মাসের মধ্যে ২০ থেকে ২৫ দিনই হতে থাকে এবং চিকিৎসা নেয়ার পরও অবস্থার কোনো পরিবর্তন না হয়, তাহলে তারা মা'যুর হিসেবে গণ্য হবে। সুতরাং সে প্রত্যেক ওয়াক্তে ওযু করে নেবে, পরবর্তী ওয়াক্তের আগ পর্যন্ত সেই ওযু দিয়ে সে সকল আমল করতে পারবে। কিন্তু মাসে অতি নগণ্য সময়ব্যাপী এমনটি হলে এ ক্ষেত্রে তার জন্য এই বিধান নয়। [৪৪]
টিকাঃ
[৪৩] আলমুহীতুল বুরহানী- ১/১৮০; আল বাহরুর রায়েক- ১/৩১; শরহুল মুনইয়া- ১২৪; আদ্দুররুল মুখতার- ১/১৩৪
[৪৪] হাশিয়াতুত তাহত্ববী আলা মারাকিল ফালাহ, পৃষ্ঠা- ১৪৮-১৫১; ফাতওয়ায়ে শামী- ১/৫০৪ ও ৫০৫; মাজমাউল আনহুর- ১/৮৪; ফাতওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ১০/২৬১
📄 স্বপ্নদোষ হলে পবিত্রতার বিধান
ইহতিলাম বা স্বপ্নদোষের মাধ্যমে বীর্য শরীর থেকে বের হয়ে আসা মানবদেহের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। এটি গুনাহর কিছু নয়, তবে স্বপ্নদোষ হলে ব্যক্তি অপবিত্র হয় এবং তার ওপর গোসল ফরয হয়। [৪৫]
যদি কেউ স্বপ্ন দেখে এবং এর ফলে অন্তরে খায়েশও জাগে কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পর কোনো পানি দৃশ্যমান না হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে গোসল ফরয হবে না। তবে পানি বা কাপড়ে দাগ দেখলে গোসল ফরয হবে, স্বপ্নের কথা মনে থাকুক বা না থাকুক।
আম্মাজান আয়েশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি ঘুম থেকে ওঠার পর ভেজা অনুভব করে, কিন্তু তার স্বপ্নের কথা স্মরণ নেই, তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বলেন, “হ্যাঁ, তাকে গোসল করতে হবে।” আর ওই ব্যক্তি, যার স্বপ্নের কথা স্মরণ আছে কিন্তু সে কাপড়ে বা শরীরে কোনো ভেজা পায়নি, তার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “না, তার জন্য গোসল করা জরুরি নয়। [৪৬]
অর্থাৎ, স্বপ্নদোষের ক্ষেত্রে বীর্য দৃশ্যমান হওয়াটাই ধর্তব্য। স্বপ্ন দেখা, না দেখা অথবা দেখেছে কি না মনে না থাকা ধর্তব্য নয়। [৪৭]
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, مَاءَ الرَّجُلِ غَلِيظٌ أَبْيَضُ وَمَاءَ الْمَرْأَةِ رَقِيقُ أَصْفَرُ
"সাধারণত পুরুষের বীর্য হয় গাঢ় ও সাদা এবং স্ত্রীলোকের বীর্য হয় পাতলা ও হলদে।” [৪৮]
অর্থাৎ, ছেলেদের বীর্য গাঢ় ও সাদা হয়। যদি ঘুম থেকে উঠে এ রকম পানি দৃশ্যমান হয়, তাহলে গোসল ফরয হবে।
টিকাঃ
[৪৫] সহীহ বুখারী- ২৮২; সহীহ মুসলিম- ৩১৩
[৪৬] জামে তিরমিযী- ১১৩; সুনানে আবু দাউদ- ২৪০
[৪৭] সহীহ বুখারী- ১৩০, ২৮২; সহীহ মুসলিম- ৩১৩; আল বিনায়াহ শারহুল হিদায়াহ- ১/৩৩১; বাদায়েউস সানায়ে- ১/৩৭; মাওয়াহিবুল জালীল- ১/৪৪৫; আয যাখীরাহ- ১/২৯৫; আল ক্বাবাস ফী শারহি মুয়াত্তা মালেক ইবনু আনাস, ইবনুল আরাবী- ১/১৭২; আল মাজমূ'- ২/১৪৩; আল হাউই আল কাবীর, মাওয়ারদি আশ শাফেঈ- ১/২১৪; কাশশাফুল কিনা- ১/১৪০; আল মুগনী- ১/১৪৮
[৪৮] সহীহ মুসলিম- ৩১১
📄 রোজা অবস্থায় স্বপ্নদোষ
সিয়ামরত অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে স্বাভাবিকভাবে রোজা ভাঙে না। [৪৯] তবে এ ক্ষেত্রে সাথে সাথে পানি দিয়ে ধুয়ে তা ফেলতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব গোসল করে ফেলতে হবে। গোসলে দেরি করা অনুচিত।
তবে কেউ যদি জাগ্রত অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে বীর্যপাত ঘটায় অর্থাৎ হস্তমৈথুনের মাধ্যমে বা কোনো কিছুর সাথে ঘষা দিয়ে বীর্য স্খলন করে, তাহলে তার রোজা ভেঙে যাবে [৫০] এবং তাকে এর কাযাও আদায় করতে হবে। তবে যদি বীর্যপাত না হয়, তাহলে রোজা ভাঙবে না। উল্লেখ্য যে, রোজা রাখা বা রোজা না-রাখা উভয় অবস্থাতেই হস্তমৈথুন ইসলামী শরী'আতের দৃষ্টিতে একটি নাজায়েয ও অত্যন্ত গর্হিত কাজ। তাই এ বদভ্যাস থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য। এই গর্হিত কাজের কারণে আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। [৫১]
উল্লেখ্য যে, যদি কেউ গোপনাঙ্গ স্পর্শ বা কোনো বস্তুর সাথে ঘষা ছাড়া অনিচ্ছাকৃতভাবে কেবল কামভাবের সাথে স্ত্রীর কথা চিন্তা করে বা স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বীর্যপাত ঘটায়, তাহলে রোজা ভাঙবে না। কিন্তু রোজাদার রোজার ফজিলত ও বরকত থেকে বঞ্চিত হবে।
قَالَ جَابِرُ بْنُ زَيْدٍ إِنْ نَظَرَ فَأَمْنَى يُتِمُّ صَوْمَهُ عَنْ عَمْرِو بْنِ هَرِمٍ ، قَالَ : سُبِلَ جَابِرُ بْنُ زَيْدٍ، عَنْ رَجُلٍ نَظَرَ إِلَى امْرَأَتِهِ فِي رَمَضَانَ فَأَمْنَى مِنْ شَهْوَتِهَا، هَلْ يُفْطِرُ؟ قَالَ: لَا ، وَيُتِمَّ صَوْمَهُ)
হজরত জাবের ইবনে যায়েদ -কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীর দিকে কামভাবের সঙ্গে তাকিয়েছে, ফলে তার বীর্যপাত ঘটেছে। তার রোজা কি ভেঙে গেছে? তিনি বললেন, না। সে রোজা পূর্ণ করবে। [৫২]
টিকাঃ
[৪৯] সুনানে কুবরা বায়হাকি- ৪/২৬৪
[৫০] আল বাহরুর রায়েক- ১/৪৭৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/২০৫
[৫১] আলমুহীতুল বুরহানী- ৩/৩৫০; আততাজনীস ওয়াল মাযীদ- ২/৩৭৭; ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/২০৫; আল বাহরুর রায়েক- ১/৪৭৫; ফতোয়ায়ে শামী- ১/১৪২; ফতোয়ায়ে দারুল উলুম- ৬/৪১৭
[৫২] সহীহ বুখারী- ১/২৫৮, হাদীস- ১৯২৮ এর অধীনে ইমাম বুখারী এএ এই হাদীসটি তা'লীক হিসেবে এনেছেন; ফাতহুল বারী- ৪/১৭৯; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা- ৬/২৫৯, হাদীস- ১৪৮০