📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 ইস্তিবরা কী?

📄 ইস্তিবরা কী?


ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত,

مَرَّ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِحَابِطٍ مِنْ حِيطَانِ مَكَّةَ أَوِ الْمَدِينَةِ سَمِعَ صَوْتَ إِنْسَانَيْنِ يُعَذِّبَانِ فِي قُبُورِهِمَا ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُعَذِّبَانِ وَمَا يُعَذِّبَانِ فِي كَبِيرٍ ، ثُمَّ قَالَ : بَلَى ، كَانَ أَحَدُهُمَا لَا يَسْتَبْرِئُ مِنْ بَوْلِهِ، وَكَانَ الْآخَرُ يَمْشِي ... بِالنَّمِيمَةِ

রাসূলুল্লাহ মদীনার অথবা মক্কার এক বাগান অতিক্রম করলেন। তখন তিনি দুই ব্যক্তির আওয়াজ শুনতে পেলেন যাদের কবরে আযাব চলছিল। রাসূলুল্লাহ বললেন, তাদেরকে আযাব দেওয়া হচ্ছে। (এমন) বড় কোনো কারণে আযাব দেওয়া হচ্ছে না (যা থেকে বাঁচা খুব কঠিন)। এরপর বললেন, হ্যাঁ (তবে বড় গুনাহও বটে)। তাদের একজন প্রস্রাব থেকে 'ইস্তিবরা' করত না, আরেকজন পরনিন্দা করত। [৩৪]

হাদীসটি কয়েকটি শব্দে বর্ণিত হয়েছে- يستبرئ -এর স্থলে সহীহ মুসলিমের এক বর্ণনায় يستتر এবং অন্য বর্ণনায় يستنزه শব্দ এসেছে। ইমাম নববী, হাফেয বদরুদ্দীন আইনী , হাফেয ইবনে হাজার সহ প্রমুখ এই শব্দ তিনটি সম্পর্কে বলেন, يستبرئ শব্দটি সহীহ বুখারী ও হাদীসের অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। এ সব বর্ণনাই সঠিক।[৩৫] 'ইস্তিবরা' এর অর্থ হলো স্বাভাবিক প্রস্রাব বের হওয়ার পর অবশিষ্ট প্রস্রাব বের করা। ইবনুল আসীর, ইমামুল লুগাহ ইবনে মানযূর সহ প্রমুখ এভাবেই ইস্তিবরা-এর অর্থ করেছেন। [৩৬]

ইবনে বাত্তাল সহীহ বুখারীর ভাষ্যগ্রন্থে (لا يستبرئ )একজন প্রস্রাব থেকে ইস্তিবরা করত না) এর ব্যাখ্যায় বলেন,

لا يستفرغ البول جهده بعد فراغه منه، فيخرج منه بعد وضوءه، فيصلي غير مطهر তাদের একজন প্রস্রাব করার পর চেষ্টা করে অবশিষ্ট প্রস্রাব বের করত না। ফলে ওযু করার পর তা (অবশিষ্ট অংশ) বের হয়ে আসত। তখন সে অপবিত্র অবস্থায় সালাত আদায় করত। [৩৭]

সহীহ বুখারীর আরেক ভাষ্যকার আল্লামা কিরমানী এ-ও এর ব্যাখ্যায় একইভাবে বলেন,

لا يستفرغ البول جهده بعد فراغه منه، فيخرج منه بعد وضوءه প্রস্রাব করার পর চেষ্টা করে অবশিষ্ট প্রস্রাব বের করত না। ফলে ওযু করার পর তা বের হতো। [৩৮]

সুতরাং এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়, ইস্তিবরা অত্যন্ত জরুরি। যদিও হানাফী মাযহাবে ইস্তিবরা ও ইস্তিঞ্জার মাসআলা একই। তবুও ইমাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী বলেন,

فيه أن الاستبراء واجب এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইস্তিবরা করা ওয়াজিব। [৩৯]

তাই ইমাম নববী র সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থে এ হাদীসের শিরোনাম দিয়েছেন,

باب الدليل على نجاسة البول ووجوب الاستبراء منه অধ্যায় : প্রস্রাব নাপাক এবং প্রস্রাব থেকে ইস্তিবরা করা ওয়াজিব।

মোটকথা, ইস্তিবরা (বাকি প্রস্রাব থেকে পবিত্রতা অর্জন) করা জরুরি। অন্যথায় পরে প্রস্রাব ঝরে ওযু নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং শরীর ও কাপড় নাপাক হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সালাতের মধ্যে এমনটি হলে সালাত ভঙ্গ হবে।

টিকাঃ
[৩৪] সহীহ বুখারী- ২১৬; সহীহ মুসলিম- ২৯২; সুনানে নাসায়ী- ২০৬৮, ২০৬৯; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা- ১২১৬৪; শরহু মুশকিলিল আসার, তহাবী- ২১০
[৩৫] শরহে মুসলিম- ১/১৪১; শরহু আবী দাউদ, আইনী- ১/৮৩; ফতহুল বারী- ১/৩৭৯; উমদাতুল কারী- ২/৪৭১; শরহে ইবনে মাজাহ, মুগলাতাঈ- ১/১৫৫; আল বদরুল মুনীর- ২/৩৪৬
[৩৬] আননিহায়া ফী গরীবিল হাদীসি ওয়াল আছার- ১/১১২; লিসানুল আরব- ১/৩৬৭
[৩৭] শরহুল বুখারী- ১/৩২৫ (২১৬ নং হাদীসের ব্যাখ্যা)
[৩৮] আল কাওয়াকিবুদ দারারী- ৩/৬৬ (২১৬ নং হাদীসের ব্যাখ্যা)
[৩৯] হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ- ১/৩০৮

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 ইস্তিবরার পদ্ধতি

📄 ইস্তিবরার পদ্ধতি


উল্লিখিত হাদীসসমূহ থেকে প্রমাণিত হলো, ইস্তিবরা তথা স্বাভাবিক প্রস্রাবের পর অবশিষ্ট প্রস্রাবের ফোঁটা বের করা অত্যন্ত জরুরি। তবে ইস্তিবরার জন্য কোন পন্থা অবলম্বন করা হবে, সে সম্পর্কে কোনো হাদীসে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। অতএব যার জন্য যে পদ্ধতি উপকারী সে সেই পদ্ধতি অবলম্বন করবে। যেমন: হাঁটাহাঁটি, ওঠা-বসা ইত্যাদি। ইস্তিবরার পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে,

طلب البراءة من الخارج بما تعارفه الإنسان من مشي أو تنحنح أو غيرهما إلى أن تنقطع المادة

ইস্তিবরা হলো প্রস্রাব থেকে পবিত্রতা অর্জন করার জন্য প্রত্যেকের অভ্যাস অনুযায়ী হাঁটাহাঁটি, গলা খাঁকারি ইত্যাদি করা যেন প্রস্রাবের কিছুই বাকি না থাকে। [৪০] ইমাম ইবনে আবেদীন এ-ও ইস্তিবরার একই পরিচয় দিয়েছেন। [৪১]

খোলাসা হলো, প্রস্রাবের পর ইস্তিবরা করা আবশ্যক। তবে এর জন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে, তা নির্ধারিত নেই। হাদীস ও আছারে বিভিন্ন পদ্ধতি পাওয়া যায়, সবই মুবাহ। কোনোটাই বিদআত বা শরী'আত-পরিপন্থী নয়।[৪২] একটু সময় নিয়ে, পেটে সামান্য চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তা বের করার চেষ্টা করবে। প্রয়োজনে টয়লেটের ভেতর কিছুটা হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে। তবে অনেকে ৪০ কদম হাঁটাকে জরুরি মনে করে, এমনটি জরুরি নয়। কেউ কেউ আবার মসজিদে বা বাইরে লোকসম্মুখে গোপনাঙ্গ ধরে হাঁটাহাঁটি করে। মুসলিমদের লজ্জাশীল হওয়া উচিত। তাই এসব অবশ্যই পরিহারযোগ্য।

টিকাঃ
[৪০] আল মাওসূআতুল ফিকহিয়্যা আল কুয়েতিয়্যাহ-৪/১১৩
[৪১] রদ্দুল মুহতার- ১/৫৫৮
[৪২] মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা- ৫৮, ১৭০৯; আল আল আওসাত, ইবনুল মুনযির- ১/৩৪৩; হুজ্জাতুল্লাহিল বাগিলগাহ- ১/৩৮; আল মাজমূ'-৩/৩৪

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 সালাতের মাঝে প্রস্রাবের অবশিষ্ট ফোঁটা বা মযী বের হচ্ছে ধারণা হলে করণীয়

📄 সালাতের মাঝে প্রস্রাবের অবশিষ্ট ফোঁটা বা মযী বের হচ্ছে ধারণা হলে করণীয়


অবিবাহিত-বিবাহিত নির্বিশেষে সকল পুরুষই এই সমস্যায় ভোগেন। অবস্থাভেদে নারীদের মাঝেও এমন সমস্যা দেখা দেয়। সালাতের মাঝে মযী নির্গত হওয়া থেকে বাঁচার একটি সমাধান হতে পারে বিয়ে, যেহেতু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এমনটি হয় শারীরিক চাহিদার কারণে। এ ছাড়া সালাতের মধ্যে রুকু বা সাজদায় যাওয়ার সময় পেটে চাপ পড়ার কারণে কিছু ফোঁটা অবশিষ্ট প্রস্রাব বের হয়ে যায়। সালাতের ঠিক পূর্বমুহূর্তে প্রস্রাব করলে এমনটি হয়ে থাকে, তাই সালাতের পূর্বে কিছু সময় হাতে রেখে নেওয়া উত্তম। তাহলে সালাতের মাঝে প্রস্রাবের ফোঁটা আর বের হবে না বলে আশা করা যায়।

যদি সালাতের মাঝে সে নিশ্চিত বুঝতে পারে যে, তার গোপনাঙ্গ থেকে কোনো কিছু নির্গত হয়েছে, তাহলে এতে সালাত ভঙ্গ হয়ে যাবে; যেহেতু তার ওযু ভেঙে গিয়েছে। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে সালাত ছাড়বে না, যতক্ষণ না সে নিশ্চিত হতে পারে।

যদি তার সালাত এ কারণে ভঙ্গ হয়ে যায়, তাহলে প্রথমে যেই স্থানে প্রস্রাবের ফোঁটা বা মযী লেগেছে সেই স্থানটুকুকে চিহ্নিত করে ধৌত করে ফেলবে। এ ক্ষেত্রে পুরো পোশাক ধৌত করার প্রয়োজন নেই। এরপরে উত্তমরূপে ওযু করে সালাতটি পুনরায় আদায় করতে হবে। [৪৩]

তবে যদি রোগের কারণে ঘন ঘন প্রস্রাব হয় বা বায়ু নিঃসরণ হয় আর এমনটি যদি মাসের মধ্যে ২০ থেকে ২৫ দিনই হতে থাকে এবং চিকিৎসা নেয়ার পরও অবস্থার কোনো পরিবর্তন না হয়, তাহলে তারা মা'যুর হিসেবে গণ্য হবে। সুতরাং সে প্রত্যেক ওয়াক্তে ওযু করে নেবে, পরবর্তী ওয়াক্তের আগ পর্যন্ত সেই ওযু দিয়ে সে সকল আমল করতে পারবে। কিন্তু মাসে অতি নগণ্য সময়ব্যাপী এমনটি হলে এ ক্ষেত্রে তার জন্য এই বিধান নয়। [৪৪]

টিকাঃ
[৪৩] আলমুহীতুল বুরহানী- ১/১৮০; আল বাহরুর রায়েক- ১/৩১; শরহুল মুনইয়া- ১২৪; আদ্দুররুল মুখতার- ১/১৩৪
[৪৪] হাশিয়াতুত তাহত্ববী আলা মারাকিল ফালাহ, পৃষ্ঠা- ১৪৮-১৫১; ফাতওয়ায়ে শামী- ১/৫০৪ ও ৫০৫; মাজমাউল আনহুর- ১/৮৪; ফাতওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ১০/২৬১

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 স্বপ্নদোষ হলে পবিত্রতার বিধান

📄 স্বপ্নদোষ হলে পবিত্রতার বিধান


ইহতিলাম বা স্বপ্নদোষের মাধ্যমে বীর্য শরীর থেকে বের হয়ে আসা মানবদেহের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। এটি গুনাহর কিছু নয়, তবে স্বপ্নদোষ হলে ব্যক্তি অপবিত্র হয় এবং তার ওপর গোসল ফরয হয়। [৪৫]

যদি কেউ স্বপ্ন দেখে এবং এর ফলে অন্তরে খায়েশও জাগে কিন্তু ঘুম থেকে ওঠার পর কোনো পানি দৃশ্যমান না হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে গোসল ফরয হবে না। তবে পানি বা কাপড়ে দাগ দেখলে গোসল ফরয হবে, স্বপ্নের কথা মনে থাকুক বা না থাকুক।

আম্মাজান আয়েশা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি ঘুম থেকে ওঠার পর ভেজা অনুভব করে, কিন্তু তার স্বপ্নের কথা স্মরণ নেই, তার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বলেন, “হ্যাঁ, তাকে গোসল করতে হবে।” আর ওই ব্যক্তি, যার স্বপ্নের কথা স্মরণ আছে কিন্তু সে কাপড়ে বা শরীরে কোনো ভেজা পায়নি, তার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “না, তার জন্য গোসল করা জরুরি নয়। [৪৬]

অর্থাৎ, স্বপ্নদোষের ক্ষেত্রে বীর্য দৃশ্যমান হওয়াটাই ধর্তব্য। স্বপ্ন দেখা, না দেখা অথবা দেখেছে কি না মনে না থাকা ধর্তব্য নয়। [৪৭]

রাসূলুল্লাহ বলেছেন, مَاءَ الرَّجُلِ غَلِيظٌ أَبْيَضُ وَمَاءَ الْمَرْأَةِ رَقِيقُ أَصْفَرُ

"সাধারণত পুরুষের বীর্য হয় গাঢ় ও সাদা এবং স্ত্রীলোকের বীর্য হয় পাতলা ও হলদে।” [৪৮]

অর্থাৎ, ছেলেদের বীর্য গাঢ় ও সাদা হয়। যদি ঘুম থেকে উঠে এ রকম পানি দৃশ্যমান হয়, তাহলে গোসল ফরয হবে।

টিকাঃ
[৪৫] সহীহ বুখারী- ২৮২; সহীহ মুসলিম- ৩১৩
[৪৬] জামে তিরমিযী- ১১৩; সুনানে আবু দাউদ- ২৪০
[৪৭] সহীহ বুখারী- ১৩০, ২৮২; সহীহ মুসলিম- ৩১৩; আল বিনায়াহ শারহুল হিদায়াহ- ১/৩৩১; বাদায়েউস সানায়ে- ১/৩৭; মাওয়াহিবুল জালীল- ১/৪৪৫; আয যাখীরাহ- ১/২৯৫; আল ক্বাবাস ফী শারহি মুয়াত্তা মালেক ইবনু আনাস, ইবনুল আরাবী- ১/১৭২; আল মাজমূ'- ২/১৪৩; আল হাউই আল কাবীর, মাওয়ারদি আশ শাফেঈ- ১/২১৪; কাশশাফুল কিনা- ১/১৪০; আল মুগনী- ১/১৪৮
[৪৮] সহীহ মুসলিম- ৩১১

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00