📄 ধারাবাহিকভাবে ফরয গোসল
* প্রথমেই স্বপ্নদোষের কারণে নির্গত বীর্য বা দৈহিক মিলনজনিত নাপাকী ধুয়ে নিতে হবে। এরপর ফরয গোসলের নিয়মানুযায়ী গোসল করবে।
* ফরয গোসলের জন্য মনে মনে নিয়ত করবে।
* প্রথমে দুই হাত কব্জি পর্যন্ত ৩ বার ধুয়ে নেবে।
* এরপর ডানহাতে পানি নিয়ে বামহাত দিয়ে লজ্জাস্থান এবং তার আশপাশ ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। শরীরের অন্য কোনো জায়গায় নাপাকী লেগে থাকলে সেটাও ধুয়ে নেবে।
* এবার বাম হাতকে ভালো করে ধৌত করবে।
* তারপর 'বিসমিল্লাহ' বলে ওযু করবে, অর্থাৎ 'বিসমিল্লাহ' বলে ডান হাতে পানি নিয়ে উভয় হাতের কব্জি পর্যন্ত তিনবার ধোয়া, তিনবার কুলি করা, তিনবার নাকে পানি দেয়া ও নাক ঝাড়া, কপালের শুরু হতে দুই কানের লতি ও থুতনির নিচ পর্যন্ত ধোয়া। যেসকল পুরুষের ঘন দাড়ি এবং গাল ও থুতনি দৃশ্যমান হয় না, তারা হাতে এক অঞ্জলি পানি নিয়ে দাড়ি খিলাল করে নিলেই যথেষ্ট হবে। আর যাদের দাড়ি পাতলা এবং গাল ও থুতনি দৃশ্যমান হয় তারা ভালোমতো রগড়ে নেবে যাতে পানি গাল ও থুতনি পর্যন্ত পৌঁছে। এরপর প্রথমে ডান হাত ও পরে বাম হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধোয়া, আঙুলে আংটি থাকলে তা নেড়ে-চেড়ে উক্ত স্থান ভিজিয়ে নেওয়া, অতঃপর সম্পূর্ণ মাথা মাসেহ করা। কেবল দুই পা ধোয়া থেকে বিরত থাকবে।
* অতঃপর প্রথমে মাথায় তিনবার (৩ অঞ্জলি) পানি ঢেলে ভালোভাবে খিলাল করে চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছাতে হবে। এবার সমস্ত শরীর ধোয়ার জন্য প্রথমে ৩ বার ডানে তার পরে ৩ বার বামে পানি ঢেলে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে, যেন শরীরের কোনো অংশ বা কোনো লোমও শুকনো না থাকে। গোসল এমনভাবে করতে হবে যাতে বগল, দেহের খাঁজ, নাভি ও কানের ছিদ্র পর্যন্ত পানি দ্বারা ভিজে যায়। অতঃপর আবার সমস্ত শরীরে পানি ঢালবে।
* সবার শেষে একটু অন্য জায়গায় সরে গিয়ে দুই পা ৩ বার ভালোভাবে ধুয়ে নেবে।
মনে রাখতে হবে: » নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই উলঙ্গ হয়ে গোসল করা মাকরুহ, তবে এটি হারাম নয়। আর গোসল বা ওযুর পরে হাঁটুর ওপরে কাপড় উঠে গেলেও ওযু ভাঙে না।[৩৮]
» উলঙ্গ হয়ে গোসল করা অবস্থায় কিবলার দিকে মুখ-পিঠ করা মাকরুহে তানযীহী। তাই এমতাবস্থায় উত্তর-দক্ষিণ হয়ে গোসল করা উচিত। আর যদি সতর ঢেকে গোসল করা হয়, তাহলে যেকোনো দিকে মুখ-পিঠ করা যাবে।[৩৯]
» যেখানে পুরুষের সতর অনুধাবন হওয়ার সুযোগ থাকে সেখানে গোসল না করা, বরং একাকী এবং সতর প্রকাশ যেন না পায় এমন স্থানে গোসল করা উচিত। নারী হোক কিংবা পুরুষ, সকলকে রাসূলুল্লাহ ﷺ পর্দার সহিত গোসল করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু যদি কোনো পুরুষের গোসল ওয়াজিব হয় এবং এমন মুহূর্তে পর্দার ব্যবস্থা না থাকে অর্থাৎ অনেক পুরুষের উপস্থিতিতেই গোসল করতে হবে, সে ক্ষেত্রে সেভাবেই গোসল করবে।[৪০]
» ফজর গোসলের ক্ষেত্রে সমস্ত শরীরে ভালোভাবে পানি পৌঁছাতে হবে। এমনকি নাভির ভেতর এবং যৌনাঙ্গের অগ্রভাগ আঙুল দিয়ে ভালো করে মলতে হবে, যাতে বাহ্যিক অঙ্গে চুল পরিমাণ স্থানও শুকনো না থাকে। অন্যথায় ফরয গোসল শুদ্ধ হবে না। মাথার ত্বক ও পুরুষদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ চুল, দাড়ি ভালোভাবে ভিজতে হবে।[৪১]
» রং, আঠা, সুপার গ্লু ইত্যাদি যা কিছু শরীরের কোনো অঙ্গে পানি পৌঁছার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়, ফরয গোসলের পূর্বে তা উঠিয়ে নেয়া জরুরি। কেননা, শরীরের প্রতিটি স্থানে পানি পৌঁছানো বাধ্যতামূলক। অন্যথায় গোসল শুদ্ধ হবে না।[৪২]
• এই নিয়মে গোসলের পর নতুন করে আর ওযুর দরকার নেই, যদি ওযু না ভাঙে। ওযু করার পর কোনো ইবাদাত না করে ওযু না ভাঙা সত্ত্বেও পুনরায় ওযু করা মাকরুহ। কেননা, হযরত আয়েশা বলেন, “নবী মুহাম্মাদ ফরয গোসলের পর আর ওযু করতেন না।”[৪৩]
• উঁচু স্থানে বসে গোসল করা, যাতে পানি নিচে গড়িয়ে যায় ও গায়ে ছিটা না লাগে। তবে বসে ও দাঁড়িয়ে উভয় অবস্থায় গোসল করা জায়েয আছে। [৪৪] এ ছাড়া রাসূল পরিষ্কার ও লোকসমাগম-বিহীন স্থানে গোসল করতেন। তিনি এক মুদ্দ (৬২৫ গ্রাম) পানি দিয়ে ওযু এবং অনধিক পাঁচ মুদ্দ (৩১২৫ গ্রাম) বা প্রায় সোয়া তিন লিটার পানি দিয়ে গোসল করতেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনো বস্তু অপচয় করা ঠিক নয়। এ ছাড়া গোসলের ক্ষেত্রে অধিক সময় নেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। [৪৫]
• নাপাক কাপড় পরিধান অবস্থাতেই গোসল করার ক্ষেত্রে যদি যথেষ্ট পরিমাণ পানি কাপড়ের ওপর ঢেলে কাপড় এমনভাবে কচলে ধুয়ে নেওয়া হয়, যার ফলে কাপড় থেকে নাপাকী দূর হয়ে গিয়েছে এ ব্যাপারে প্রবল ধারণা করা যায়, তাহলে এর দ্বারা কাপড়টি পাক হয়ে যাবে। আর দৃশ্যমান কোনো নাপাকী থাকলে কচলে ধুয়ে ওই নাপাকী দূর করে নিলেই কাপড় পাক হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, শরীর বা কাপড়ের কোনো অংশে নাপাকী লেগে থাকলে তা গোসলের আগেই পৃথকভাবে ধুয়ে পবিত্র করে নেওয়া উচিত। অন্তর্বাস পরিহিত অবস্থায় গোসল করলে যদি কাপড়ের নিচে পানি পৌঁছে যায় এবং শরীরের ঢাকা অংশও ধুয়ে ফেলা যায়, তাহলে গোসল সহীহ হবে। [৪৬]
• ওযু করার সময় ওযুর পাত্রে যদি হালকা দু-এক ফোঁটা ওযুর পানি পড়ে, তা দিয়ে বাকি ওযু হয়ে যাবে। কিন্তু কুলি করার সময় কুলির পানি যদি পাত্রে পড়ে, মুখ ধোয়ার সময় সেই পানির বেশির ভাগই যদি পাত্রে পড়ে যায়, তাহলে সেই পানি ফেলে দিয়ে নতুন পানি দিয়ে ওযু করতে হবে।
• জানাবাত অবস্থায় গোসল না করেই খাদ্যগ্রহণের ইচ্ছা করলে অন্তত ওযু করে নেয়া উচিত। এ ছাড়া অপবিত্র অবস্থায় বেশিক্ষণ অবস্থান না করে যত দ্রুত সম্ভব গোসল করে নেওয়াই উত্তম।
বিভিন্ন রোগের কারণে অনেকের দাঁতে এমনভাবে ক্যাপ লাগানো হয়ে থাকে, যার দরুন কুলি করলে দাঁতে পানি পৌঁছে না এবং তা খুললেও ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এ ক্ষেত্রে গোসলের সময় তা খোলা জরুরি নয়। আর যদি এমন কিছু লাগানো থাকে যা সহজে খোলা যায় এবং খুললে কোনো সমস্যাও নেই, তাহলে খুলে ভেতরে পানি পৌঁছানো জরুরি। [৪৭]
গোসলখানা বা বাথরুমে বাতি অথবা আলোর ব্যবস্থা করে নিতে হবে। [৪৮]
বর্তমান প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে সম্মিলিত পায়খানা ও গোসলখানায় গোসল করা সহীহ বিবেচনা করা হয়, যদি তা পবিত্র থাকে এবং নাপাকীর ছিটা আসার সম্ভাবনা না থাকে। কিন্তু যদি সন্দেহজনক হয়, তাহলে গোসলের পূর্বে প্রথমে পানি ঢেলে মেঝে থেকে নাপাকী দূর করে নেবে। [৪৯]
টিকাঃ
[৩৮] সুনানে তিরমিযী- ২৭৬৯; সুনানে আবী দাউদ- ৪০১৭; সুনানে ইবনি মাজাহ- ১/৬১৭, হাদীস- ১৯২০; মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩, ৪, ৭৯, ৯৭; সহীহ ইবনু হিব্বান- ২৩৩৩; মু'জামুল কাবীর, ত্ববারানী- ১৮৮১; মুসনাদে আবী ইয়ালা- ৭৪৬০, ৭৪৭৯; শারহে মা'আনীউল আসার, ত্বহাবী- ১/৫৩। ইমাম বুসরী, ইমাম ইবনু হাজার এ ও ইমাম হাকেম এর সনদকে সহীহ বলেছেন। আর ইমাম হাকেমের বক্তব্যকে ইমাম যাহাবী সমর্থন করেছেন। (মিসবাহুয যুজাজাহ- ১/১৩৪; ফাতহুল বারী- ১/৩৮৫,৩৮৬; মুস্তাদরাকে হাকেম- ৪/১৭৯)। এ ছাড়াও এই বর্ণনার অনেক শাহেদ রয়েছে। গোসলখানায় যদি কোনো পর্দাহীনতা না হয়, তাহলে উলঙ্গ হয়ে গোসল করা জায়েয রয়েছে। তবে এটা না করাই উত্তম। কেননা, শয়তান তখন ধোঁকা দেয়। তাই এটা নিন্দনীয় কাজ। (ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ৪/৩৮৭)। এ বিষয়ে কেউ কেউ মুসা -এর বিবস্ত্র হয়ে গোসল করার ঘটনাও প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। (দেখুন: সহীহ বুখারী- ৩৪০৪)।
[৩৯] আগলাতুল আওয়াম, পৃষ্ঠা- ২৯
[৪০] ফাতাওয়ায়ে দারুল উলুম- ২/১৬৯
[৪১] বাদায়েউস সানায়ে- ১/৩৪; রদ্দুল মুহতার- ১/১৪২; শরহে মুখতাসারুত ত্বহাবী- ১/৫১০
[৪২] ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/১৩
[৪৩] সুনানে তিরমিযী- ১০৩, মিশকাত- ৪০৯
[৪৪] ইমদাদুল ফাতায়া- ১/৩৬
[৪৫] সহীহ বুখারী- ২৫৮; সহীহ মুসলিম- ৩২৮; বাদায়েউস সানায়ে- ১/৩৪; বাদায়েউস সানায়ে- ১/৩৪-৩৫; রদ্দুল মুহতার- ১/৯৪; আপকে মাসায়েল আওর উনকা হাল্ল- ২/৮১
[৪৬] আপকে মাসায়েল আওর উনকা হাল্ল- ২/৮১
[৪৭] রদ্দুল মুহতার- ১/১৫৪; আহসানুল ফাতাওয়া- ২/৩২
[৪৮] ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া- ১০/২০২
[৪৯] আপকে মাসায়েল আওর উনকা হাল্ল- ২/৫৩