📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 শৌর্য চর্চা

📄 শৌর্য চর্চা


পুরুষের কাছে এক মহাসম্পদ হচ্ছে তার পৌরুষ। পৌরুষ বললে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে চওড়া বুক, প্রশস্ত বাহুবিশিষ্ট কোনো সিনেমার নায়ক! সকলে পৌরুষকে সংজ্ঞায়িত করে নিজের চিন্তাধারা থেকে। এককথায় বলতে গেলে, পৌরুষ হলো বুদ্ধিমত্তা। পৌরুষ হচ্ছে আত্মসম্মান বা আভিজাত্য। আর নিঃসন্দেহে দ্বীনচর্চা এবং তাকওয়াই হচ্ছে আভিজাত্যের চূড়ান্ত স্তর। রাসূল বলেন, إِنَّ اللَّهَ يَغَارُ وَإِنَّ الْمُؤْمِنَ يَغَARABIC

আল্লাহ স্বীয় আত্মমর্যাদাবোধ প্রকাশ করেন এবং মু'মিনগণও স্বীয় আত্মমর্যাদাবোধ প্রকাশ করে।[১]

পৌরুষ বলতে পূর্ববর্তীগণ কী বুঝতেন? * উমার বলেন, "তেজ নিয়ে কথা বলা পৌরুষের পরিচয় নয়; বরং যে কথা দিয়ে কথা রাখে এবং কারও সম্মানহানি করে না, সে-ই প্রকৃত পুরুষ।" * ইমাম শাফেঈ বলেন, "পুরুষের চারটি স্তম্ভ রয়েছে: উত্তম চরিত্র, উদারতা, বিনয়ী ও তাকওয়া তথা আল্লাহ-ভীরুতা।" * আইয়ুব আল সাখতিয়ানি বলেন, "একজন পুরুষ ততক্ষণ একজন প্রকৃত পুরুষ হতে পারবে না যতক্ষণ না তার মাঝে দুটি বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটে-ক্ষমার গুণ ও মানুষের ভুলত্রুটি গোপন রাখা অথবা উপেক্ষা করা।"

আহনাফ বিন কায়েস বলেন, "রাগের সময় নিজেকে সামলে রাখা এবং হাতে ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করাই হচ্ছে প্রকৃত পুরুষত্ব।”

এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "যে ব্যক্তি ক্রোধকে সংবরণ করে, অথচ সে কাজ করতে সে সক্ষম, (তার এ সবরের কারণে) কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সকলের সামনে ডেকে বলবেন, তুমি যে হুরকে চাও, পছন্দ করে নিয়ে যাও।”[২]

অর্থাৎ শারীরিক শক্তি অর্জন করা, মাচোম্যান বা আলফাম্যান হওয়ার মাঝে পৌরুষ সীমাবদ্ধ নয়। পুরুষের জন্য শারীরিক শক্তির পাশাপাশি মানসিক শক্তি অর্জনেও দক্ষতা লাভ করতে হবে। মানসিক শক্তি কঠিন অধ্যবসায়, সাধনা ও চর্চার বিষয়। সুদূরদর্শী চিন্তাধারা, বিচক্ষণতা, মধুর ব্যক্তিত্ব, রাগ নিয়ন্ত্রণ, আসক্তি নিয়ন্ত্রণ, অহংকার, লোভ ও হিংসা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলা ইত্যাদি একজন সুপুরুষের বৈশিষ্ট্য। অতিরিক্ত বিনোদন পুরুষের জন্য ক্ষতিকর। সুপুরুষ হতে হলে বিনোদন ও গাম্ভীর্যের মাঝে সমতা বজায় রাখতে হবে। সুপুরুষ হতে হলে নিজের মস্তিষ্ক দিয়ে চিন্তা করতে জানতে হয়। ধার করা মতবাদ বা ধবলধোলাই হওয়া মস্তিষ্ক একজন পুরুষকে দাসে পরিণত করে।

কত পুরুষ পাশ্চাত্যের মতধারার স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে পৌরুষ হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। ইসলামের হুকুম-আহকামের চেয়ে পাশ্চাত্য মতবাদকে অধিক প্রাধান্য দেওয়া পুরুষ-নারী নির্বিশেষে সকলের জন্যই ক্ষতিকর।

উদাহরণস্বরূপ : একটি হাদীস আমরা জানি, পুরুষ স্ত্রীকে বিছানায় আহ্বান করলে সেই ডাকে সাড়া দেয়া স্ত্রীর জন্য বাধ্যতামূলক; তবে উল্লেখযোগ্য কারণ থাকলে বিবেচনাযোগ্য। কেন ইসলাম নারীর ওপর তার স্বামীর ডাকে সাড়া দেয়াকে বাধ্যতামূলক করেছে? যৌনমিলন নারীদের জন্য ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিষয় হলেও স্বামীর জন্য তা প্রয়োজন। অনিচ্ছাকে ইচ্ছায় রূপান্তর করা কঠিন কিছু না। কিন্তু প্রয়োজন মানে প্রয়োজন। একে দমিয়ে রাখার বিকল্প কোনো উপায় নেই। একজন মুসলিম পুরুষের জন্য যৌনচাহিদা পূর্ণ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে তার স্ত্রী। কিন্তু পাশ্চাত্য সমাজ ব্যাপারটিকে বিনোদন হিসেবে দেখে। স্ত্রী তাঁদের কাছে প্রয়োজন না। তাই পর্নোগ্রাফি, হস্তমৈথুন, পতিতাবৃত্তি, পরকীয়া ইত্যাদি উপায়ে বিনোদন নেয় তারা। আমাদের সমাজও কি সেদিকেই যাচ্ছে? আমরা কি ভুলে গিয়েছি যে আমাদের করোটিতেও মস্তিষ্ক আছে?

টিকাঃ
[১] সহীহ মুসলিম- ২৭৬১
[২] সুনান আবু দাউদ- ৪৭০২

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 পুরুষের আরেক নাম দায়িত্ব

📄 পুরুষের আরেক নাম দায়িত্ব


দুনিয়াবি দায়িত্ব : পুরুষদের জীবনে দায়িত্বের অংশটা অবিচ্ছেদ্য। কারণ তার ওপর নির্ভর করে অনেকগুলো জীবন। সেটা পার্থিব প্রয়োজনীয়তা অথবা আখিরাতের সাফল্য উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ঘরের কর্তা যদি অলস প্রকৃতির কারণে উপার্জনে অনীহা প্রকাশ করে, অসুস্থ হয়ে যায় অথবা সংসারবিমুখ হয়ে যায়, তাহলে সেই পরিবারে অভাব-অনটন নেমে আসে। স্ত্রী-বাচ্চাদের মাঝে হাত পাতার স্বভাব দেখা দেয়। বেঁচে থাকার তাগিদে অনেক সময় স্ত্রীকে কর্মের খোঁজ করতে হয়। অনেকে বৃদ্ধ বাবা-মা, ভাই-বোনের খেয়াল রাখে না। দায়িত্ব থেকে গাফেল হওয়ার কারণে পৃথিবীতে তার মাধ্যমে কোনো কল্যাণ সাধিত হয় না।

স্ত্রী-সন্তানের প্রতি দায়িত্ব: দায়িত্বহীনতা কেবল যে দুনিয়াবী বিপর্যয়ের কারণ এমন নয়। পুরুষদের ওপর আল্লাহ দায়িত্বারোপ করেছেন তারা যাতে নিজেদেরকে ও তাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ও আগুন থেকে রক্ষা করে। (يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلَبِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا يَعْصُونَ اللَّهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ) হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো আগুন হতে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম হৃদয় কঠোর স্বভাবের মালাইকা (ফেরেশতা), যারা অমান্য করে না আল্লাহ যা তাদেরকে আদেশ করেন তা; এবং তারা যা করতে আদিষ্ট হয় তা-ই করে। [৩] আল্লাহর রাসূল এমনই কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন পুরুষকে দাইউস বলে আখ্যা দিয়েছেন যারা তাদের পরিবারের বিষয়ে বেখেয়াল থাকে। (الدَّيُّوْتُ الَّذِي يُقِرُّ فِي أَهْلِهِ الْخَبَثَ) তারা দাইউস, যারা এমন বেহায়া যে, তার পরিবারের অশ্লীলতাকে মেনে নেয় [৪] নারীদের উচ্ছন্নে যাওয়ার জন্য দায়ী করা হয়েছে তার স্বামী, বড় ভাই বা কন্যাকে। এখান থেকে প্রমাণিত হয়, পুরুষ যদি তার দ্বীনি দায়িত্ব থেকে গাফেল হয়, তাহলে একই সাথে অনেকগুলো জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাদীস থেকে জানা যায় যে, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি তার দায়িত্বে অবহেলা করলে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না। [৫]

পরিবারের দ্বীন চর্চার ব্যাপারে উদাসীন হওয়া যাবে না। নিজের স্ত্রী-সন্তানদেরকে জরুরি দ্বীনি তা'লীম দেয়া ঘরের কর্তার ওপর ফরয দায়িত্ব। [৬] এ ছাড়া শরী'আহ পুরুষদের হকের বিষয়ে নারীদেরকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এই কথা সত্য। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ পুরুষ স্ত্রী থেকে নিজের হক পাওনা হতে অধিক আদায় করে, কিন্তু তার ওপর স্ত্রীর যে অধিকার রয়েছে তা আদায় করতে রাজি থাকে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের ওপর জুলুম করে থাকে। এটা নিঃসন্দেহে অন্যায় এবং এসবের জন্য আল্লাহ অবশ্যই কঠোর পাকড়াও করবেন।

আত্মীয়স্বজনের প্রতি দায়িত্ব: অনেকে আছেন বাবা-মায়ের সম্মান করে না। তাদের খোঁজ-খবর রাখে না। অথচ পিতা-মাতার সন্তুষ্টি ছাড়া জান্নাতে কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। [৭] এজন্য পিতা-মাতার হকসমূহ সন্তানকে শিক্ষা দেওয়া জরুরি। পিতা- মাতার হায়াতে সাতটি হক এবং মৃত্যুর পরে আরও সাতটি হক রয়েছে। [৮] এসব হকের বিষয়ে কিছু মানুষ খেয়াল রাখে না। আবার অনেক ভাই তাদের বোনদের পাওনা মীরাস আদায় করতে চায় না। অথচ বোনদের পাওনা আদায় করা ভাইদের ওপর ফরয দায়িত্ব। এটা না করলে তাদের রিযিক হারাম-মিশ্রিত হয়ে যায় এবং জান ও মালের বরকত নষ্ট হয়ে যায়। আরও দুঃখজনক কথা হলো, অনেক জালিম পিতাও নিজের মেয়েকে তার প্রাপ্য হক থেকে মাহরুম করতে বা কম দিতে চেষ্টা করে থাকে, অথচ হাদীস অনুযায়ী এটা সরাসরি জাহান্নামে যাওয়ার কারণ। [৯]

কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব : উপার্জনের ক্ষেত্রে পুরুষদের দায়িত্ব রয়েছে যে, সে হালাল উপার্জন করবে এবং তা থেকে তার স্ত্রী-সন্তানের ভরণ-পোষণ নিশ্চিত করবে। কর্মক্ষেত্রে সততা বজায় রাখবে। পর্দার লঙ্ঘন হবে না সে দিকে খেয়াল রাখবে। সে যেই কাজের জন্য আদিষ্ট হয়েছে সেটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করবে। এবং আমানত রক্ষা করবে।

উম্মাহর প্রতি দায়িত্ব : উম্মাহর জন্য একজন পুরুষের কিছু দায়িত্ব নির্ধারিত রয়েছে। যেমন : আর্থিক বা যেকোনোভাবে অন্যকে সাহায্য করা, সামর্থ্য হলে যাকাত প্রদান করা, দা'ওয়াতি কাজে অধিক সময় ব্যয় করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, প্রয়োজন হলে নিজের জীবন দিয়ে হলেও অন্যের জান-মালের হেফাযত করা, ইসলামের ঝান্ডা বুলন্দ রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা ইত্যাদি।

পুরুষ হতে হলে পুরুষদের কিছু সমস্যা হতে বেরিয়ে আসতে হবে। অনেক পুরুষ অলসতাবশত, কর্মব্যস্ততার অজুহাতে বা গাফলতির কারণে ফরযে আইন পরিমাণ ইলমও অর্জন করে না। অথচ শরী'আত এটা ফরয ঘোষণা করেছে এবং এ ব্যাপারে কোনো বাহানা গ্রহণযোগ্য নয়। [১০]

এসব কারণে প্রায়ই দেখা যায় নব্য দ্বীনদার শিক্ষিত লোকেরা কুরআন-হাদীসের বাংলা অনুবাদ ও ব্যাখ্যা পড়ে নিজেকে ইসলামী চিন্তাবিদ মনে করতে শুরু করে। এমনকি হাদীস ও ফিক্বহের অনেক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তথা হক্কানী আলেমদের সাথে তর্কেও লিপ্ত হয়ে যায় অনেকে। এ রকম মানুষদের ব্যাপারে হাদীসে কঠোর ধমকি এসেছে। [১১]

টিকাঃ
[৩] সূরা তাহরীম- ০৬
[৪] মুসনাদে আহমাদ- ৫৩৭২, ৬১১৩
[৫] বুখারী- ৭১৫০, ৭১৫১
[৬] তারগীব ওয়া তারহীব, পৃষ্ঠা- ৩০৪৮
[৭] সুনানে ইবন মাজাহ- ৩৬৬২
[৮] বিস্তারিত জানতে মুফতী মানসুরুল হক সাহেবের আ'মালুস সুন্নাহ নামক কিতাব দ্রষ্টব্য।
[৯] সূরা বাকারা- ১৮৮; মুসনাদে আহমাদ- ২১১৩৯
[১০] সুনানে ইবনে মাজাহ- ২২৪
[১১] সুনানে ইবনে মাজাহ- ২৬০

📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 পুরুষের আকাঙ্ক্ষা

📄 পুরুষের আকাঙ্ক্ষা


আল্লাহ কুরআনে বলেন, زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَالْخَيْلِ الْمُسَوَّمَةِ وَالْأَنْعَامِ وَالْحَرْثِ ذَلِكَ مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاللَّهُ عِندَهُ حُسْنُ الْمَتَابِ মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির আকাঙ্ক্ষা-নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রুপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদি পশু ও শস্যখেতে। এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী। আর আল্লাহ, তাঁর নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল। [১২]

উপর্যুক্ত আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, পুরুষদের সহজাত হচ্ছে সে তার স্ত্রী-সন্তান, ধন-সম্পদ, দামি বাহন ইত্যাদির প্রতি দুর্বল। আয়াতটিতে এই ইঙ্গিতও এসেছে যে, দুনিয়ায় জীবনযাপন করতে হলে এসব বস্তুর প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। অর্থাৎ এসবের প্রতি আকাঙ্ক্ষা থাকা দূষণীয় নয়। তবে সেই আকাঙ্ক্ষা যদি আখিরাতের আকাঙ্ক্ষার চেয়ে অধিক হয়ে যায়, তাহলে সেটা হতে পারে ধ্বংসের কারণ।

রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "দুনিয়া অভিশপ্ত এবং যা কিছু এতে আছে তা অভিশপ্ত। তবে আল্লাহর যিকির বা স্মরণের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়, আলেম ও দ্বীনের জ্ঞান অর্জনকারীগণ অভিশপ্ত নয়।”[১৩] অর্থাৎ যদি এসব বস্তু আল্লাহর স্মরণ ও দ্বীনের খেদমতের কাজে লাগে, তাহলে নিঃসন্দেহে এসব উত্তম। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের জন্য উপযুক্ত বিষয়গুলো পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ বিষয়ে আল্লাহ ﷻ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলেন-

(১) يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ وَأَوْلَادِكُمْ عَدُوٌّ لَّكُمْ فَاحْذَرُوهُمْ وَإِن تَعْفُوا وَتَصْفَحُوا وَتَغْفِرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمُ إِنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَاللَّهُ عِندَهُ أَجْرُ عَظِيمٌ فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ وَاسْمَعُوا وَأَطِيعُوا وَأَنفِقُوا خَيْرًا لِّأَنفُسِكُمْ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ إِن تُقْرِضُوا اللَّهَ قَرْضًا حَسَنًا يُضَاعِفْهُ لَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ شَكُورُ حَلِيمٌ হে মু'মিনগণ, তোমাদের কোনো কোনো স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের শত্রু। অতএব তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকো। যদি মার্জনা করো, উপেক্ষা করো এবং ক্ষমা করো, তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়। তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষাস্বরূপ, আর আল্লাহর কাছে রয়েছে মহাপুরস্কার। অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো, শ্রবণ করো, আনুগত্য করো এবং ব্যয় করো; এটাই তোমাদের জন্যে কল্যাণকর। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম। যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করো, তিনি তোমাদের জন্যে তা দ্বিগুণ করে দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী, সহনশীল। [১৪]

(২) يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ فَأُولَبِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ وَأَنفِقُوا مِن مَّا رَزَقْنَاكُم مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِيَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ فَيَقُولَ رَبِّ لَوْلَا أَخَّرْتَنِي إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُن مِّنَ الصَّالِحِينَ মু'মিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে। যারা এ কারণে গাফেল হয়, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় করো। অন্যথায় সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। [১৫]

(৩) وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ وَأَنَّ اللَّهَ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ) আর জেনে রাখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পরীক্ষা। বস্তুত আল্লাহর নিকট রয়েছে মহাসওয়াব। [১৬]

(8) لَن تَنفَعَكُمْ أَرْحَامُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَفْصِلُ بَيْنَكُمْ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ) তোমাদের স্বজন-পরিজন ও সন্তান-সন্ততি কিয়ামতের দিন কোনো উপকারে আসবে না। তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন। তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখেন [১৭]

সন্তানের ব্যাপারে হাদীসে সর্তকতা এসেছে, "সন্তান হচ্ছে দুঃখ, ভীরুতা, অজ্ঞতা ও কৃপণতার কারণ।”[১৮]

◇ সন্তান আল্লাহর হুকুম অমান্য করলে অথবা পিতা-মাতার অবাধ্য হলে দুঃখ ও হতাশার কারণ হয়।
◇ আল্লাহর রাস্তায় বের হতে নিলে শয়তান ওয়াসওয়াসা দিয়ে অন্তরে সন্তানদের অন্ধকার ভবিষ্যতের ব্যাপারে ভয় পয়দা করতে চেষ্টা করে। অথচ রিযিকের মালিক আল্লাহ।
◇ সন্তান লালন-পালনের জন্য সময় ব্যয় করতে হয়, ফলে নিজের জ্ঞানার্জন ব্যাহত হয়।
◇ সন্তানদের ভবিষ্যতের চিন্তা দান-সদকা থেকে বিরত রাখে, অর্থ-সম্পদ জমিয়ে রাখার প্রবণতা বাড়ে।

এসব আয়াত ও হাদীসে স্ত্রী-সন্তান ও ধনসম্পদের ব্যাপারে পুরুষদেরকে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে, তারা আল্লাহর তরফ থেকে পরীক্ষা তাই তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং ধন-সম্পদ কামাই করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তাদের ভরণ-পোষণ, দেখভাল ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পুরুষেরই। অর্থাৎ যদি এসব দায়িত্ব থেকে কোনো পুরুষ পরিপূর্ণ মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তাকে জিজ্ঞাসিত করবেন। অর্থাৎ, এদিক থেকে বিবেচনা করলেও স্ত্রী-সন্তান পুরুষদের জন্য পরীক্ষা। তাদের হক সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে। এ ছাড়া যদি স্ত্রী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দ্বীনদারিকে প্রাধান্য দেয়া হয়, তাদেরকে সঠিকভাবে নির্দেশনা দেয়া হয় এবং সন্তানাদিকে সঠিক তারবিয়াতের সাথে বড় করা সম্ভব হয়, তাহলে উক্ত পরীক্ষা অবশ্যই নিয়ামত ও বারাকাহর মাধ্যম হবে ইন শা আল্লাহ। রাসূল বলেন, "পুরো দুনিয়া সম্পদ, আর সবচেয়ে দামি সম্পদ হলো নেককার নারী।”[১৯]

মানুষের সব আমল মৃত্যুর পরে বন্ধ হয়ে গেলেও তিনটি আমল থেকে সওয়াব অর্জন চলমান থাকে। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, নেককার সন্তানের দু'আ।[২০]

সম্পদের ক্ষেত্রেও তা-ই। ফাসিকের নিকট যে সম্পদ রয়েছে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাপকর্মেই বিলীন হবে। অপরপক্ষে মু'মিনের নিকট সম্পদ থাকলে তা ভালো খাতে ব্যয় হবে, দান-সদকা বৃদ্ধি পাবে। ফলে মানুষ উপকৃত হবে, যাকাতের মাধ্যমে সমাজের অবকাঠামো উন্নত হবে, মাসজিদ-মাদরাসা আবাদ হবে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে অর্থের জোগান হবে। অনেকে মনে করে নিজের পরিবারের জন্য খরচ করলে তা হয়তো অর্থের অপব্যবহার। অথচ হাদীসে এসেছে, إِذَا أَنْفَقَ الْمُسْلِمُ نَفَقَةً عَلَى أَهْلِهِ وَهُوَ يَحْتَسِبُهَا، كَانَتْ لَهُ صَدَقَةٌ সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করে, তা তার জন্য সাদাকায় পরিগণিত হয়। [২১]

সবচেয়ে উত্তম সদকা হলো পরিবারের জন্য ব্যয় করা। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে মু'মিনদের জন্য সম্পদের পরীক্ষা কী? সম্পদের প্রথম পরীক্ষা হলো এর উপার্জন প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, সম্পদ কি হালালভাবে উপার্জিত হচ্ছে নাকি হারামভাবে। যদি হালালভাবে উপার্জিত হয়ে থাকে তাহলে দ্বিতীয় পরীক্ষা হচ্ছে, সে কোন খাতে ব্যয় করছে এবং ব্যয়ের খাতগুলোর মাঝে ন্যায়তা আছে কি না বা অপব্যয় হচ্ছে কি না। সম্পদ যদি বিলাসিতা বা অহংকারের কারণ হয়, তাহলে निश्चय সেই সম্পদ ধ্বংস ডেকে আনবে।

টিকাঃ
[১২] সূরা আলে ইমরান- ১৪
[১৩] তিরমিযী- ২৩২২; ইবনে মাজাহ- ৪১১১
[১৪] সূরা তাগাবুন- ১৪ থেকে ১৮
[১৫] সূরা মুনাফিকুন- ১ ও ১০
[১৬] সূরা আনফাল- ২৮
[১৭] সূরা মুমতাহিনা- ৩
[১৮] আত তাবরানী, আল কাবীর ২৪/২৪১, সহীহ আল জামী'- ১৯৯০
[১৯] সহীহ মুসলিম- ১৪৬৭; মুসনাদে আহমাদ- ৬৫৬৭; সহীহ ইবনে হিববান- ৪০৩১
[২০] সহীহ মুসলিম- ১৬৩১; মিশকাত- ২০৩
[২১] সহীহ বুখারী- ৪৯৬০

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00