📄 ধোঁয়ার জীবন
প্রেম ও গানবাজনার সাথে মাদক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অধিকাংশ যুবক মাদকের সাথে জড়ায় প্রেমে ব্যর্থ হয়েই। আর গান তাকে প্রভাবিত করে পরোক্ষভাবে, এমনকি অনেক সময় প্রত্যক্ষভাবেও। যারা নিয়মিত মাদক সেবনকারী নয় বরং মাঝে মাঝে আনুষ্ঠানিকতার খাতিরে মাদক সেবন করেছে, তাদের জন্য মাদক থেকে ফিরে আসা কঠিন কিছু না। কিন্তু যারা এতে পুরোপুরি আসক্ত তাদের জন্য কিছুটা কষ্টসাধ্য হতে পারে। গানের প্রতি আসক্তদের জন্য যেমন ধীরে ধীরে আগানো উচিত, মাদকাসক্তদের জন্যেও অনুরূপ। ধীরে ধীরে মাদক থেকে সরে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে ধাপগুলো হতে পারে:
* ভালোভাবে নিয়ত করতে হবে। একটা একটা করে কমিয়ে আনতে হবে, ধীরে-সুস্থে এগিয়ে পুরোপুরিভাবে সরে আসতে হবে। * অবশ্যই আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে সাহায্য চাইতে হবে। * বেশি বেশি তাওবা-ইস্তিগফার করতে হবে। * সৎ লোকদের সাথে চলতে হবে, যাতে লোকলজ্জার কারণে অন্তত মাদক সেবন থেকে বিরত থাকা সম্ভব হয়।
* শরীরে সুন্নাহসম্মত লিবাস আনা প্রয়োজন। এতে লোকলজ্জার কারণে হলেও ধুমপান বা মাদক সেবন থেকে বিরত থাকা সম্ভব হয়। * এসব ক্ষেত্রে রমাদান মাসকে কাজে লাগানো যেতে পারে।
📄 নীল সাগরের ফেনার জীবন
চারদিক এক অশ্লীলতার আঁধারে ছেয়ে গিয়েছে। সমাজে মুসলিম পুরুষদের মাঝে অনেকেই একটা সময় জাহিলিয়াতের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। বড় বড় পাপগুলো ছিল তাদের কাছে মামুলি বিষয়। আল্লাহর ফাযল ও কারমে এমন অনেকেই ইসলামের ছায়াতলে ফিরে আসে। কিন্তু তবুও আগের ভুতুড়ে সেসব স্মৃতি প্রতিনিয়ত তাদেরকে হাতছানি দেয়। মাঝে মাঝে বীরেরা হেরে যায় অন্তরের সাথে এক ঠান্ডা যুদ্ধে। রাজ্যের বিষাদ গ্রাস করে তাকে। বিয়েই যেন একমাত্র সমাধান। কিন্তু যিনা-ব্যভিচার এখন সহজ, বিয়ে হয়ে গিয়েছে কঠিন। যিনা কি কেবল নারী-পুরুষের অবৈধ যৌনক্রিয়াতেই হয়? না! ভোগবাদী সমাজ আজ মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে একটা ভিন্ন জগতের সাথে। সেই জগৎ আমাদের থেকে একটি ক্লিক আর কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানের দূরত্বে। বলছি পর্নোগ্রাফির নীল অন্ধকারের কথা। ওই গহিন সাগরে ডুব লাগিয়ে ফিরে আসতে পারেনি অনেকে। কীভাবে বোঝাই পর্নোগ্রাফির তিরে বিদ্ধ হয়ে কত সাদা পায়রা ভূলুণ্ঠিত হয়েছে! এ নিয়ে লিখলে কয়েক পাতায় শেষ করা কি আদৌ সম্ভব? তাই সামনে একটু বিস্তৃত করেই আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এই বিষয়ে এখানেই মুলতুবি...
📄 মন বুঝে কথা বলা
নারীদের তুলনায় পুরুষদেরকে মানুষের সাথে অধিক সংযোগ স্থাপন করতে হয়। দৈনন্দিন জীবনে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, ঘরে এবং দা'ওয়াতি ময়দানে অনেক মানুষের সাথে উঠবস করতে হয় পুরুষদের। একেকজনের চিন্তাধারা একেক রকম, তাই প্রত্যেকের সাথে কথা বলার সময় কে কোন চিন্তাধারার সে সম্পর্কে ধারণা রাখা এবং মানসিকতা বুঝে কথা বলায় পারদর্শিতা অর্জন করতে হয় পুরুষদের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও সহপাঠী কিংবা কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের সাথে কীভাবে কথাবার্তা বলতে হবে তা জানা জরুরি। যাদের দ্বীনের বুঝ নেই তাদের সাথে কথা বলার সময় নম্রতা ও ভদ্রতা বজায় রাখা দরকার, যাতে এই আচরণে বিমোহিত হয়ে তারা দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অনেক সময় তারা লিবাসের জন্য টিটকারি মেরে অনেক প্রশ্ন করতে পারে। উত্তর দেয়ার একান্ত প্রয়োজন না হলে চুপ থাকাই উত্তম। আর উত্তর দেয়া আবশ্যক হলে হিকমাহ ও বিচক্ষণতার সাথে উত্তর দিতে হবে। যদি আপনি বিচক্ষণতার প্রমাণ দিতে পারেন এবং তাদের তির তাদের দিকেই ফিরিয়ে দিতে পারেন একটা সময় তারা আপনাকে উত্ত্যক্ত করা থেকে বিরত থাকতে শুরু করবে।
দা'ওয়াতি ক্ষেত্রে মাদ'উ বা যাকে দা'ওয়াহ দেয়া হচ্ছে তার অঙ্গভঙ্গি লক্ষ করা এবং তার মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করা অত্যন্ত জরুরি। তাই তাকে আগে কিছুক্ষণ কথা বলতে দেয়া যেতে পারে, এই ফাঁকে তাকে পর্যবেক্ষণ করার যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে। আমরা অনেক সময় একটা ভুল করি, মাদ'উকে আমরা কথার মাধ্যমে আক্রমণ করে বসি। এতে শুধরানো তো দূরের কথা, হিতে বিপরীত হওয়ারই সম্ভাবনা অধিক। কোথায় কোন কথা বলতে হয় না আর. কোথায় কোন কথা বলতে হয় এই বিষয়ে আমাদের সঠিক ধারণা থাকতে হবে।
সর্বোপরি, সবচেয়ে সাবধানে কথা বলা উচিত ঘরের মানুষদের সাথে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটা প্রেক্ষাপট হতে পারে:
* আপনি দ্বীনদার, পরিবার তেমন দ্বীনদার না : কোনো ব্যক্তির মাঝে হঠাৎ পরিবর্তন ঘটলে পরিবারের কাছে অনেক সময় আপন সন্তানকে অচেনা মনে হতে থাকে। এ ছাড়া, শয়তান যখন সদ্য দ্বীনে আসা সেই ব্যক্তিকে কাবু করতে অক্ষম হয় তখন সে তার পরিবারকে প্ররোচিত করে তাকে ভালো কাজ থেকে বিরত রাখতে। অথবা এর বিপরীতে পরিবার তথা বাবা-মায়ের ওপর সে যাতে চড়াও হয়ে যায় সেই চেষ্টা করে। উভয় ক্ষেত্রে শয়তান জয়ী। অধিকাংশ সময় দেখা যায়, আমরা এই দুইয়ের যেকোনো এক ফাঁদে পরে যাই। তাই শয়তানের ফাঁদ চিনতে হবে।
* আপনার বিয়ের প্রয়োজন, পরিবার অবুঝ : সমাজ এতটাই অবুঝ করে দিয়েছে আমাদেরকে যে সত্য, সুন্দর ও সহজাত একটি বিষয়কে আমরা কঠিনভাবে দেখতে শুরু করেছি। ক্ষুধার্ত হলে খাদ্যের প্রয়োজন হয় এটা যেমন স্বাভাবিক, জৈবিক চাহিদা থাকাটাও তেমনি স্বাভাবিক। আল্লাহ ব্যবস্থা রেখেছেন বিয়ের, এটাই সহজ। আর বিপরীতে রয়েছে যিনা, সেটাই বরং কঠিন। কিন্তু বস্তুখোর সমাজ এখানে সফল, তারা সহজাতকে উল্টো করতে সক্ষম হয়েছে! আর আমাদের মা-বাবারাও সেই তালে চলছে। সন্তান তার নিজের বিয়ের ইচ্ছের কথা পরিবারকে জানালে অনেক মা-বাবাই হয় সন্তানকে তিরস্কার করে অথবা 'সময় হলে বিয়ে দেয়া হবে' এই আশ্বাস দিয়ে প্রেম চালিয়ে যেতে বলে!
তাই এই অবস্থায় বিয়ের অত্যন্ত প্রয়োজন হলে এবং বারবার গুনাহে জড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে বাবা-মাকে নাছোড়বান্দার মতো বোঝাতে হবে উত্তম আখলাক বজায় রেখে। কিছু পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়। একমাত্র অভিভাবক আল্লাহ। তাই আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে দু'আ করতে হবে।
* আপনি বিবাহিত, পরিবার দ্বীনদার না : এই পরিস্থিতিতে স্ত্রীর পর্দা রক্ষা, দম্পতির ব্যক্তিগত সময় কাটানো, পরবর্তী প্রজন্মকে দ্বীনি পরিবেশে বড় করাসহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে ঝামেলা পোহাতে হতে পারে। এসবও খুব সবর ও বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিচালনা করতে হবে। এখানে পুরুষের মাথার ওপর অনেক বড় একটা কর্তব্য হচ্ছে মা এবং স্ত্রীর মাঝে ইনসাফ ঠিক রাখা। পরে এই বিষয়ে আমরা আলোচনা পাব।
📄 কিল ইওর টক্সিক ইগো
পুরুষেরা সহজাতগতভাবেই প্রভাব বিস্তার করতে ভালোবাসে। একে তারা নিজেদের জন্য বিজয় মনে করে। যে যত প্রভাববিস্তারকারী সে ততই বিজয়ের প্রত্যাশী। বিজয়ের প্রতি যখন একটা লোভ সৃষ্টি হয় তখন ভেতরে অহমিকা কাজ করে। পরাজয় মেনে নিতে ইচ্ছে করে না। এটাই একটা সময় পুরুষকে আত্মবাদী (egoistic) করে তোলে। পুরুষদের জন্য ইগো অনেক ভয়ানক। বিশেষ করে পরিবারের সাথে এটা অধিক পরিলক্ষিত হয়। পরাজয়ের প্রতি বিরূপ মনোভাব সম্পর্ক ভাঙনের কারণ হয়। অথচ কিছু কিছু বিজয় লুকিয়ে থাকে পরাজয়ের আবডালে। মাঝে মাঝে আপনার স্ত্রী সঠিক ও আপনি ভুল, এই অপছন্দনীয় সত্যটা মেনে নিতে হবে। এজন্য প্রতিটি বিষয়ে নিজেকে নিজের বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে শিখতে হবে। নিজের বিচার নিজেই করুন মহান বিচারকের বিচারের আগে। যখন বুঝবেন আপনি ভুল তখন তা মেনে নিন। আমিত্ব নিজের মাঝে যখন শিকড় ছড়িয়ে দেয় তখন আদল ও ইনসাফ ঠিক রাখা সম্ভব হয় না। আমরা যেহেতু মানুষ, তাই জীবনের পাতায় পাতায় আমাদের কিছু ভুল থাকবেই। সেগুলো কেউ যখন দেখিয়ে দেবে তখন আমরা সাদরে মেনে নেব, দ্বীন আমাদেরকে এটাই শেখায়। নিজের ভুল ঢাকার চেষ্টা বা ভুল জেনেও নিজের পক্ষে একটা যুক্তি দাঁড় করানো এসব একজন সুস্থ অন্তরের মানুষের জন্য মানায় না। নিজের ভুল মেনে নেয়াই বুদ্ধিমানদের কাজ। আর যদি বুঝতে পারেন যে, আপনি সঠিক কিন্তু তা প্রকাশ করলে হিতে বিপরীত হবে, তাহলে চুপ থাকুন। আল্লাহর রাসূল বলেন,
من ترك المراء وهو مبطل بني له بيت في ربض الجنة ومن تركه و هو محق بني له في وسطها و من حسن خلقه بني له في أعلاها
নিজের মত বাতিল হওয়ার কারণে যে ব্যক্তি বিতর্ক পরিত্যাগ করবে তার জন্য জান্নাতের পাদদেশে বাড়ি নির্মাণ করা হবে। আর যে ব্যক্তি নিজের মত সঠিক হওয়া সত্ত্বেও বিতর্ক পরিত্যাগ করবে তার জন্য জান্নাতের মধ্যবর্তী স্থানে বাড়ি নির্মাণ করা হবে। আর যার আচরণ সুন্দর তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে বাড়ি নির্মাণ করা হবে। [১]
নিঃসন্দেহে অহংকার শয়তানের বৈশিষ্ট্য। ইবলিস নিজেকে আদম-এর চেয়ে সেরা দাবি করেছিল, নিজেকে বড় মনে করেছিল। ফলে সে আজ ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নিজেদের বড়ত্ব জাহির করাই ছিল ফেরাউন-নমরুদের ধ্বংসের কারণ। তাই অহংকার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে। কুরআনেই রয়েছে এর সবক:
وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا إِنَّكَ لَن تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَن تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا)
জমিনে গর্বভরে চলাফেরা কোরো না, তুমি কখনোই জমিনকে বিদীর্ণ করতে পারবে না আর উচ্চতায় পর্বতের ন্যায়ও হতে পারবে না। [২]
টিকাঃ
[১] মুনযিরী, আত-তারগীব ১/৭৭; আলবানী, সহীহুত তারগীব ১/১৩২
[২] সূরা বনী ইসরাঈল-৩৭