📘 মুহসিনীন উত্তম পুরুষদের পাঠশালায় > 📄 নম্রতার সবক

📄 নম্রতার সবক


অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করার একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য পুরুষদের মাঝে লক্ষ করা যায়। এর ফলে অধিকাংশ পুরুষের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কিছুটা কম থাকে। অথচ এই রাগই কতশত জীবন নষ্ট করেছে। রাগের মাথায় বেফাঁস মন্তব্যের কারণে কত মানুষের অন্তরে চোট লেগেছে তা গুণে শেষ করা যাবে না। তাই আমাদের নম্রতার অনুশীলন করতে হবে। বিশেষ করে মু'মিন পুরুষদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আপন রবভোলা মানুষগুলোকে সরল পথের সন্ধান দেয়া। আর এই কাজের জন্য প্রয়োজন পড়ে সবর ও নম্রতার। যার মাঝে নম্রতা নেই সে দা'ওয়াহ দিতে গিয়ে তর্কে লিপ্ত হবে। আর তর্ক দ্বীনের কোনো কাজে আসে না। আল্লাহ তাঁর নবী-রাসূলদেরকে ক্ষণে ক্ষণে নম্রতার সবক দিয়েছেন। কুরআনে এসেছে,

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نَفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ )

অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের প্রতি নম্র হয়েছিলে। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা করো এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।[৫৮]

মহান নৈতিকতার অধিকারী নবী মুহাম্মাদ-এর ওপর আল্লাহর কৃত অসংখ্য অনুগ্রহের মাঝে একটি অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে যে, তাঁর মধ্যে যে কোমলতা ও নম্রতা রয়েছে তা আল্লাহর রহমতেরই ফল। আর দ্বীনের প্রচার-প্রসারের জন্য তো এই কোমলতার প্রয়োজন ব্যাপক। নবীজি যদি কোমল ও নরম না হয়ে কঠিন হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তাহলে মানুষ তাঁর কাছে না এসে আরও দূরে সরে যেত।

আবু উমামা আল বাহেলী বলেন, রাসূলুল্লাহ আমার হাত ধরে বললেন, “হে আবু উমামা, মু'মিনদের মাঝে কারও কারও জন্য আমার অন্তর নরম হয়ে যায়।”[৫৯]

মূসা ও হারুন -কে যখন ফিরআউনের নিকট দা'ওয়াহ পৌঁছানোর জন্য আল্লাহ আহ্বান করলেন, তখন আল্লাহ তাঁদেরকে বললেন, فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيْنَا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى তার সঙ্গে তোমরা নম্রভাবে কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা (আল্লাহকে) ভয় করবে। [৬০]

অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর নবীদেরকে আদেশ দিচ্ছেন যাতে তাঁদের দা'ওয়াহ হয় নরম ভাষায়, যাতে তা ফিরআউনের অন্তরে প্রতিক্রিয়া করে এবং দা'ওয়াহ সফল হয়। উপর্যুক্ত আয়াতে দা'ওয়াহ প্রদানকারীদের জন্য বিরাট শিক্ষা রয়েছে। ফিরআউন হচ্ছে সবচেয়ে বড় দাম্ভিক ও অহংকারী। আর মূসা হচ্ছেন আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। তবুও ফিরআউনকে নরম ভাষায় সম্বোধন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।[৬১] এতে বোঝা যাচ্ছে যে, প্রতিপক্ষ যতই অবাধ্য এবং ভ্রান্ত বিশ্বাস বা চিন্তাধারার হোক না কেন, তার সাথেও পথপ্রদর্শনের কর্তব্য পালনকারীদের হিতাকাঙ্ক্ষীর ভঙ্গিতে নম্রভাবে কথাবার্তা বলতে হবে। এরই ফলে সে কিছু চিন্তা ভাবনা করতে বাধ্য হতে পারে এবং তার অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হতে পারে।

ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ

জ্ঞান-বুদ্ধি আর উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তুমি (মানুষকে) তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান জানাও আর তাদের সাথে বিতর্ক করো এমন পন্থায় যা অতি উত্তম। [৬২]

উক্ত আয়াতে আল্লাহ মানুষদেরকে বোঝানোর স্বার্থে বিতর্ক করার অনুমতি দিয়েছেন। তবে শর্ত হলো, তা হতে হবে উত্তম পন্থায়। আর নিঃসন্দেহে দা'ওয়াতের ক্ষেত্রে সেই পন্থাই উত্তম যেই পন্থায় হেঁটেছেন নবী-রাসূলগণ। সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই উত্তম যা তাঁদের ব্যক্তিত্বকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে, যেই ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়ে কতশত মানুষের মিলেছে জান্নাতের দিশা।

টিকাঃ
[৫৮] সূরা আলে ইমরান- ১৫৯
[৫৯] মুসনাদে আহমাদ- ৫২১৭
[৬০] সূরা ত্বহা- ৪৪
[৬১] তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা ত্বহা- ৪৪ এর ব্যাখ্যা
[৬২] সূরা আন নাহাল- ১২৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00