📄 সবরের পরশমণি
প্রতিটি পদে পদে মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে পরীক্ষা। কিন্তু মু'মিনদের জন্য পরীক্ষার সহোদর সবর। সবরের সাথে মিশে আছে কষ্ট, আর আল্লাহ আশ্বাস দেন, নিশ্চয় কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি। সবরের বীজ নারীদের মাঝে সহজাতিকভাবেই বোনা রয়েছে। কিন্তু পুরুষদের সবর শিখে নিতে হয়। আর যদি কোনো পুরুষ সবর শিখতে না পারে, তাহলে সে নিজের জীবন ও তার পারিপার্শ্বিক মানুষদের জীবন বিষিয়ে তোলে। তাই পুরুষদের জীবনে সবর এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সবরের গুরুত্ব ও পুরস্কার সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলেন, یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ ٱسۡتَعِینُوا۟ بِٱلصَّبۡرِ وَٱلصَّلَوٰةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلصَّـٰبِرِینَ হে মু'মিনগণ, ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [৪৯]
সবর এমন এক মহাসম্পদ যে, দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় সম্পদ এর মোকাবেলায় নগণ্য। যারা ধৈর্যধারণ করে তাদের সাথে আল্লাহ সহায়তা ও সাহায্যের মাধ্যমে থাকেন। [৫০] কুরআনে আর অন্য কোনো আমলকারীর ক্ষেত্রে আল্লাহ এইভাবে শব্দচয়ন করেননি। সবর হচ্ছে সংযম অবলম্বন ও আপন নফসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় সবরের তিনটি শাখা রয়েছে।
* নফসকে হারাম বিষয়াদি থেকে বিরত রাখা, * ইবাদাত ও আনুগত্যে নফসকে বাধ্য করা এবং * যেকোনো বিপদ ও সংকটে ধৈর্যধারণ করা। অর্থাৎ জীবনের পথচলায় যেসব বিপদ- আপদ এসে উপস্থিত হয়, সেগুলোকে আল্লাহ-এর ইচ্ছা বলে মেনে নেয়া এবং এর বিনিময়ে আল্লাহ-এর তরফ থেকে প্রতিদান প্রাপ্তির আশা রাখা। [৫১]
আল্লাহ কুরআনে মুত্তাক্বীনদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, وَٱلصَّـٰبِرِینَ فِی ٱلۡبَأۡسَاۤءِ وَٱلضَّرَّاۤءِ وَحِینَ ٱلۡبَأۡسِ... ...যারা ধৈর্যধারণ করে কষ্ট, দুর্দশায় ও যুদ্ধের সময়ে... [৫২]
আখলাক বা মন-মানসিকতার সুস্থতা সম্পর্কিত বিধি-বিধানের আলোচনায় একমাত্র সবরের উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা, সবরের অর্থ হচ্ছে মন-মানসিকতা তথা নফসকে বশীভূত করে অন্যায়-অনাচার থেকে সর্বোত্তমভাবে সুরক্ষিত রাখা। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে যে, মানুষের হৃদয়বৃত্তিসহ অভ্যন্তরীণ যত আমল রয়েছে সবরই সেসবের প্রাণস্বরূপ। এরই মাধ্যমে সর্বপ্রকার অন্যায় ও কদাচার থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হয়। সবরের মাধ্যমেই আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র ও তাঁর একনিষ্ঠ বান্দা হওয়া যায়।
আল্লাহ বলেন,
وَ اللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ) আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন। [৫৩]
এ ছাড়া আল্লাহ সবরের প্রতিদান সম্পর্কে বলেন,
مَا عِندَكُمْ يَنفَدُ وَ مَا عِندَ اللَّهِ بَاقٍ وَلَنَجْزِيَنَّ الَّذِينَ صَبَرُوا أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ তোমাদের কাছে যা আছে তা নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং আল্লাহর কাছে যা আছে তা স্থায়ী; যারা ধৈর্যধারণ করে আমি নিশ্চয়ই তাদেরকে তারা যে উত্তম কাজ করে তা থেকেও শ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রদান করব। [৫৪]
এখানে সবরের পথ অবলম্বনকারীদের বলতে এমনসব লোকদের বোঝানো হয়েছে যারা আল্লাহর নির্দেশ ও নিষেধ পালন করতে জীবনের যাবতীয় কষ্টকে তুচ্ছজ্ঞান করেছে, কাফেরদের বিরুদ্ধে ধৈর্যের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং এ পথে যত প্রকার কষ্ট ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় তার সবই তারা বরদাশত করে নিয়ে আনুগত্যের ওপর অটল থেকেছে; তাদের জন্যই উত্তম পুরস্কার।[৫৫]
إِنِّي جَزَيْتُهُمُ الْيَوْمَ بِمَا صَبَرُوا أَنَّهُمْ هُمُ الْفَابِرُونَ) আজ আমি তাদেরকে পুরস্কৃত করলাম তাদের ধৈর্যধারণের কারণে, আজ তারাই তো সফলকাম। [৫৬]
পৃথিবীতে বিশ্বাসীদের ধৈর্য-পরীক্ষার একটি পর্যায় এমনও রয়েছে যে, যখন তারা বিশ্বাস ও ঈমানের চাহিদানুসারে সৎকর্ম সম্পাদনা করে, তখন দ্বীনের ব্যাপারে অনভিজ্ঞ ও ঈমানের ব্যাপারে অজ্ঞ লোকেরাও তাদেরকে উপহাসের পাত্র বানায়। এমনকি এসবের কারণে আজকাল অত্যাচারীদের মাধ্যমে অত্যাচারিতও হতে হয়। অনেক দুর্বল ঈমানদার সেসব উপহাস ও ভর্ৎসনার ভয়ে আল্লাহ-এর আদেশকৃত বিধান দিতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। যেমন : দাড়ি রাখা, শরঈ পর্দা করা, বিবাহ-শাদীতে বিধর্মীদের রীতি-নীতি হতে দূরে থাকা ইত্যাদি। সৌভাগ্যের অধিকারী তারাই, যারা কোনোপ্রকার ব্যঙ্গ-বিরূদ্রুপ ও জীবনের ক্ষতির পরোয়া করে না এবং কোনো অবস্থাতেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় না। আল্লাহর প্রিয়পাত্রের একটি গুণ এই যে, তারা কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করে না।[৫৭] আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং তাদেরকে সফলতা দানের মাধ্যমে সম্মানিত করবেন; যেমনটি প্রাগুক্ত আয়াতে ব্যক্ত হয়েছে।
আমাদের মনের মাঝে কিছু সুন্দর ইচ্ছা ঘর বাঁধে। সেগুলো আমরা আমাদের অভিভাবক মহান রব্বুল ইযযাহর কাছেই পেশ করি। কিন্তু আমরা অনেকেই এতে ধৈর্যহারা হয়ে যাই। ফলে দু'আ কবুল হচ্ছে না এই ভাবনার কারণে জীবনে নেমে আসে ঘনঘটা আর এতে জীবন থেকে শোকর উঠে যায়। বিপদের সময়ও সুখে থাকার পরশমণি হচ্ছে সবর। যা নেই তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে যা আছে তা নিয়ে ভাবতে হবে, ওপরে যাদের অবস্থান তাদের দিকে না তাকিয়ে নিচে যারা রয়েছে তাদের দিকে তাকাতে হবে আর এ নিয়ে আল্লাহর শোকর করতে হবে। আল্লাহর শোকরবিহীন জীবনের চেয়ে খড়-খুটো অনেক ভালো। কেননা শোকরবিহীন জীবন আল্লাহর নাফরমানী ও কুফরীর দিকে ধাবিত করে। অর্থাৎ জীবনে সবরের অনুপস্থিতি মানুষকে যে শুধু মহাপুরস্কার থেকেই দূরে রাখবে তা নয়, এটি মানুষকে কুফরের নর্দমায়ও নিয়ে ফেলতে পারে।
টিকাঃ
[৪৯] সূরা বাকারাহ- ১৫৩
[৫০] সিফাতিল্লাহিল ওয়ারিদা ফিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ। এখানে সবরকারীদের সাথে থাকার অর্থ সাহায্য ও সহযোগিতায় তাদের সাথে থাকা।-সা'দী
[৫১] তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা বাকারাহ- ১৫৩ এর ব্যাখ্যা
[৫২] সূরা বাকারাহ- ১৭৭
[৫৩] সূরা আলে ইমরান- ১৪৬
[৫৪] সূরা আন নাহাল- ৯৬
[৫৫] ফাতহুল কাদীর।
[৫৬] সূরা আল মু'মিনুন- ১১১
[৫৭] সূরা মায়িদা- ৫৪
📄 নম্রতার সবক
অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করার একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য পুরুষদের মাঝে লক্ষ করা যায়। এর ফলে অধিকাংশ পুরুষের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কিছুটা কম থাকে। অথচ এই রাগই কতশত জীবন নষ্ট করেছে। রাগের মাথায় বেফাঁস মন্তব্যের কারণে কত মানুষের অন্তরে চোট লেগেছে তা গুণে শেষ করা যাবে না। তাই আমাদের নম্রতার অনুশীলন করতে হবে। বিশেষ করে মু'মিন পুরুষদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আপন রবভোলা মানুষগুলোকে সরল পথের সন্ধান দেয়া। আর এই কাজের জন্য প্রয়োজন পড়ে সবর ও নম্রতার। যার মাঝে নম্রতা নেই সে দা'ওয়াহ দিতে গিয়ে তর্কে লিপ্ত হবে। আর তর্ক দ্বীনের কোনো কাজে আসে না। আল্লাহ তাঁর নবী-রাসূলদেরকে ক্ষণে ক্ষণে নম্রতার সবক দিয়েছেন। কুরআনে এসেছে,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نَفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ )
অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের প্রতি নম্র হয়েছিলে। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা করো এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।[৫৮]
মহান নৈতিকতার অধিকারী নবী মুহাম্মাদ-এর ওপর আল্লাহর কৃত অসংখ্য অনুগ্রহের মাঝে একটি অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে যে, তাঁর মধ্যে যে কোমলতা ও নম্রতা রয়েছে তা আল্লাহর রহমতেরই ফল। আর দ্বীনের প্রচার-প্রসারের জন্য তো এই কোমলতার প্রয়োজন ব্যাপক। নবীজি যদি কোমল ও নরম না হয়ে কঠিন হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তাহলে মানুষ তাঁর কাছে না এসে আরও দূরে সরে যেত।
আবু উমামা আল বাহেলী বলেন, রাসূলুল্লাহ আমার হাত ধরে বললেন, “হে আবু উমামা, মু'মিনদের মাঝে কারও কারও জন্য আমার অন্তর নরম হয়ে যায়।”[৫৯]
মূসা ও হারুন -কে যখন ফিরআউনের নিকট দা'ওয়াহ পৌঁছানোর জন্য আল্লাহ আহ্বান করলেন, তখন আল্লাহ তাঁদেরকে বললেন, فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيْنَا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى তার সঙ্গে তোমরা নম্রভাবে কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা (আল্লাহকে) ভয় করবে। [৬০]
অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর নবীদেরকে আদেশ দিচ্ছেন যাতে তাঁদের দা'ওয়াহ হয় নরম ভাষায়, যাতে তা ফিরআউনের অন্তরে প্রতিক্রিয়া করে এবং দা'ওয়াহ সফল হয়। উপর্যুক্ত আয়াতে দা'ওয়াহ প্রদানকারীদের জন্য বিরাট শিক্ষা রয়েছে। ফিরআউন হচ্ছে সবচেয়ে বড় দাম্ভিক ও অহংকারী। আর মূসা হচ্ছেন আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। তবুও ফিরআউনকে নরম ভাষায় সম্বোধন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।[৬১] এতে বোঝা যাচ্ছে যে, প্রতিপক্ষ যতই অবাধ্য এবং ভ্রান্ত বিশ্বাস বা চিন্তাধারার হোক না কেন, তার সাথেও পথপ্রদর্শনের কর্তব্য পালনকারীদের হিতাকাঙ্ক্ষীর ভঙ্গিতে নম্রভাবে কথাবার্তা বলতে হবে। এরই ফলে সে কিছু চিন্তা ভাবনা করতে বাধ্য হতে পারে এবং তার অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হতে পারে।
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
জ্ঞান-বুদ্ধি আর উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তুমি (মানুষকে) তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান জানাও আর তাদের সাথে বিতর্ক করো এমন পন্থায় যা অতি উত্তম। [৬২]
উক্ত আয়াতে আল্লাহ মানুষদেরকে বোঝানোর স্বার্থে বিতর্ক করার অনুমতি দিয়েছেন। তবে শর্ত হলো, তা হতে হবে উত্তম পন্থায়। আর নিঃসন্দেহে দা'ওয়াতের ক্ষেত্রে সেই পন্থাই উত্তম যেই পন্থায় হেঁটেছেন নবী-রাসূলগণ। সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই উত্তম যা তাঁদের ব্যক্তিত্বকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে, যেই ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়ে কতশত মানুষের মিলেছে জান্নাতের দিশা।
টিকাঃ
[৫৮] সূরা আলে ইমরান- ১৫৯
[৫৯] মুসনাদে আহমাদ- ৫২১৭
[৬০] সূরা ত্বহা- ৪৪
[৬১] তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা ত্বহা- ৪৪ এর ব্যাখ্যা
[৬২] সূরা আন নাহাল- ১২৫