📄 আত্মশুদ্ধির স্বরূপ
দ্বীনের খুঁটি পাকাপোক্ত করতে ফিক্বহ-মাসআলা জানতে হবে তা ঠিক, কিন্তু এখানেই দ্বীন শেষ নয়। সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত আমাদের দৈহিক বা আর্থিক আমল। এসব আমলে গলদ থাকলে তা দেখা যায়, বোঝা যায়। তাই শুধরে নেয়াটাও তুলনামূলক সহজ। কিন্তু মানবজীবনের এক মূল্যবান বস্তু হচ্ছে তার অন্তর। আমাদের যাপিত জীবন আজ অনেকটা চর্মচক্ষু-নির্ভর। দৃশ্যমান আমলে আমাদের অনেক শ্রম। কিন্তু অদৃশ্য অন্তরটা যে ক্লিষ্ট, অপরিষ্কার ও মুমূর্ষুপ্রায় হয়ে আছে সেদিকে আমাদের ভ্রূক্ষেপ নেই।
পারিবারিকভাবে দ্বীনদার অথবা জাহেলিয়াত থেকে ফিরে আসা দ্বীনদার, মাদ্রাসাপডুয়া দ্বীনদার অথবা সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার ভাগাড় থেকে উঠে আসা দ্বীনদার; প্রত্যেকেরই অন্তরের পরিশুদ্ধতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে এর বিশেষ প্রয়োজন আসলে সাধারণ শিক্ষিত জাহেলিয়াত-ফেরত দ্বীনদার পুরুষদেরই অধিক। বাঁধভাঙা ও বাঁধনহারা জীবন ছেড়ে যারা আল্লাহর রজ্জু দিয়ে নিজেকে বেঁধে নিতে চায় তাদের পথচলার শুরুর দিকটা হয় কষ্টের। পূর্ব-জীবনের বদভ্যাস ও আসক্তি তার সরল পথের পাশে দাঁড়িয়ে হাতছানি দেয়। পদস্খলন হয় কখনো, কখনো অশ্রুসিক্ত হয় দুচোখ। এ এক মহাযুদ্ধ প্রতিটি পুরুষের জন্য।
আল্লাহ নারীদেরকে অন্তরের দিক থেকে অনেকটাই পবিত্র রেখেছেন পুরুষদের তুলনায়। নারীদের আল্লাহ অপবিত্রতা দিয়েছেন শরীরে। পক্ষান্তরে অন্তরের অপবিত্রতা পুরুষদের রয়েছে অধিক পরিমাণে। পুরুষদের মাঝে আদব, সবর, নম্রতা ইত্যাদির তুলনামূলক বেশি ঘাটতি দেখা যায়। অপরদিকে আসক্তি, আত্মপরতা, রাগ, হতাশা ইত্যাদি পুরুষদের মাঝেই অধিক। তাই আত্মশুদ্ধির সব ক'টা পুরুষদেরই অধিক প্রয়োজন।
📄 ইলমের আদব
গোটা ইসলামই হচ্ছে আদব। জীবনের প্রতিটি স্তরের প্রতিটি কাজে ইসলাম আদব শিক্ষা দেয়। কিন্তু আমাদের মাঝে এর বড়ই অভাব দেখা দিয়েছে আজকাল। আমলের আদবের সাথে সাথে ইলমের আদবও ধীরে ধীরে বিলীন হতে শুরু করেছে আমাদের মাঝ থেকে। ইলমের গুরুত্ব ব্যাপক। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ
প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ইলম অর্জন করা ফরয। [১]
হাদীসে আরও এসেছে,
مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِهْهُ فِي الدِّينِ
আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে তিনি দ্বীনের ফিকহী জ্ঞান প্রদান করেন। [২]
تَجِدُونَ النَّاسَ مَعَادِنَ خِيَارُهُمْ فِي الْجَاهِلِيَّةِ خِيَارُهُمْ فِي الْإِسْلَامِ إِذَا فَقِهُوا
তোমরা মানুষকে পাবে গুপ্তধনের মতো। তাদের মধ্যে যারা জাহেলিয়াতে উত্তম তারা ইসলামেও উত্তম, যখন তারা দ্বীন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করে। [৩]
যেই ইলম অর্জনের এত গুরুত্ব, সেই ইলম শিক্ষার পূর্বে সালাফগণ আদব শিখে নিতেন। আলী রা. বলেন,
قوله تعالى: ﴿ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا لم قال: أدبوهم وعلموهم
আল্লাহ বলেছেন, "হে ঈমানদারগণ, নিজে ও নিজের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।” অর্থাৎ, তোমরা তাদের আদব ও ইলম শিক্ষা দাও। [৪]
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ -এর নিকট লোকেরা দূর-দূরান্ত থেকে সফর করে আসতেন আর তাঁর চাল-চলন, আচার-আচরণ ও শিষ্টাচার দেখতেন এবং তাঁর সাদৃশ্য অবলম্বন করতেন (অর্থাৎ, অনুকরণ করতেন)।[৫] ইমাম আবু হানীফা বলেন,
الحكايات عن العلماء أحب إلي من كثير من الفقه؛ لأنها آداب القوم وأخلاقهم আলেমদের হেকায়াত (ঘটনাবলি) শ্রবণ করা আমার কাছে ফিকহ চর্চা করা হতে অধিক প্রিয়। কেননা, তা আহলে ইলমদের আদব ও আখলাক সম্পর্কে জ্ঞান দান করে।[৬]
ইমাম সুফিয়ান আস সাওরী বলেন,
كانو الا يخرجون أبناءهم لطلب العلم حتى يتأدبوا ويتعبدواعشرين سنة وعنه أيضًا: (كان الرجل إذا أراد أن يكتب الحديث تأدب و تعبد قبل ذلك بعشرين سنة) তারা (আমাদের পূর্ববর্তী সালাফরা নিজেদের অর্থাৎ তাবেঈ ও তাবে তাবেঈরা) নিজেদের সন্তানদেরকে ২০ বৎসর সময়কাল পর্যন্ত আদব ও ইবাদাত শিখাতেন এরপর ইলম অন্বেষণের জন্য অন্য কোথাও পাঠাতেন।[৭]
ইমাম খত্বীব বাগদাদী নিজ সনদে ইমাম মালেক থেকে বর্ণনা করেছেন, (প্রখ্যাত তাবেঈ) ইমাম ইবনু সীরীন বলেন, তাঁরা (আমাদের পূর্ববর্তী আলেমগণ, তথা- তাবেঈ ও সাহাবায়ে কেরাম) ইলম শিক্ষার মতোই ভদ্রতা ও শিষ্টাচার শিখতেন। তিনি আরও বলেন, একদা এক ব্যক্তিকে ইমাম ইবনু সীরীন কাসেম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবী বকর-এর নিকট প্রেরণ করলেন এটি দেখার জন্য যে, তিনি কীরূপ আদব ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী![৮]
স্বয়ং ইমাম মালেক বলেন,
كانت أمي تعممني وتقول لي: اذهب إلى ربيعة فتعلم من أدبه قبل علمه আমার মা আমাকে পাগড়ি পরিধান করাতেন এবং বলতেন, (ইমাম) রবীয়াহর নিকট যাও, এরপর তাঁর থেকে তাঁর ইলম শিক্ষার আগে তাঁর আদব শিখে নাও।[৯]
তাঁরই ছাত্র ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু ওয়াহহাব বলেন,
ما نقلنا (أي: ما تعلمنا ) من أدب مالك أكثر مما تعلمنا من علمه আমরা মালেকের ইলম অপেক্ষায় তার আদব সবচেয়ে বেশি শিখেছি। [১০]
ইমাম মালেক এক কুরাইশী যুবককে লক্ষ্য করে বলেন, يا بن أخي، تعلم الأدب قبل أن تتعلم العلم হে আমার ভাতিজা, ইলম শেখার পূর্বে আদব শিখে নাও। [১১]
ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক বলেন, طلبت الأدب ثلاثين سنة، وطلبت العلم عشرين سنة، وكانوا يطلبون الأدب قبل العلم আমি ত্রিশ বছর ধরে আদব শিখেছি আর বিশ বছর ধরে ইলম শিখেছি এবং সালাফে সালেহীনগণ ইলম শেখার আগে আদবই শিখতেন। [১২]
ইমাম ইবনুল মুবারক আরও বলেন, قال لي مخلد بن الحسين: نحن إلى قليل من الأدب أحوج منا إلى كثير من العلم আমাকে মুখাল্লাদ ইবনুল হুসাইন বলেছেন, অনেক বেশি ইলম অর্জন করার তুলনায় আমরা সামান্য কিছু আদব শেখার অধিকতর মুখাপেক্ষী। [১৩]
ইমাম ইবনুল জাওযী বলেন, كاد الأدب يكون ثلثي العلم আদব হচ্ছে ইলমের এক-তৃতীয়াংশ। [১৪]
ইমাম খতীব আল বাগদাদী নিজ সনদে ইবরাহীম ইবনু হাবীব ইবনু শাহীদ থেকে বর্ণনা করেন, "আমার বাবা আমাকে বলেছেন, হে আমার পুত্র, তুমি আলেম-উলামা ও ফুকাহার নিকট যাও, তাদের থেকে ইলম শিক্ষা করো। এবং তাদের আদব, আখলাক, সচ্চরিত্র গ্রহণ করো। কেননা, এটা আমার নিকট বেশি পরিমাণে হাদীস শ্রবণ করা থেকে ও অধিকতর প্রিয়।”[১৫]
আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনু মুহাম্মাদ আল আনবারী বলেন, علم بلا أدب كنار بلا حطب، وأدب بلا علم كجسم بلا روح আদব-বিহীন ইলমের তুলনা লাকড়ির কাষ্ঠ-বিহীন অগ্নির মতো। আর ইলম-বিহীন আদব রুহ-বিহীন শরীরের মতো! [১৬]
ইমাম হাসান আল-বসরী বলেন, كان الرجل ليخرج في أدب نفسه السنتين ثم السنتين এক ব্যক্তি কেবল আদব শেখার জন্য দুই বছর তারপর আবার দুই বছর সফর করেছেন। [১৭]
সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ বলেন, نظر عبيد الله بن عمر : إلى أصحاب الحديث وزحامهم فقال (شنتم العلم و ذهبتم بنوره، لو أدركنا وإياكم عمر بن الخطاب لأوجعنا ضربا) একদা উবাইদুল্লাহ ইবনু উমার আসহাবুল হাদীসদের প্রচুর উপচে পড়া ভিড় দেখে বললেন, তোমরা ইলমের জন্য এত ভিড় করেছ অথচ এর নূর তথা আলো থেকে দূরে চলে গিয়েছ (অর্থাৎ, এর আদব থেকে বঞ্চিত হয়েছ)। যদি আমাদের ও তোমাদেরকে উমার ইবনুল খাত্ত্বাব পেতেন, তাহলে কঠিনভাবে পেটাতেন! [১৮]
হাসান ইবনু ইসমাইল তাঁর বাবা থেকে বর্ণনা করেন, ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল ১৬৯-এর মজলিসে পাঁচ হাজারেরও অধিক সংখ্যক লোক সমবেত হতেন। এর মাঝে পাঁচশ এরও কম সংখ্যক তাঁর থেকে (ইলমে হাদীস ও ইলমে ফিক্বহ) লিখতেন আর বাকি সবাই তাঁর থেকে উত্তম আদব ও বৈশিষ্ট্য শিখতেন। [১৯]
আবু বকর আল মুতত্বউই বলেন, আমি ইমাম আবু আব্দিল্লাহ আহমাদ ইবনু হাম্বল -এর নিকট ১২ বছর যাবৎ যাতায়াত করেছি। তিনি তাঁর সন্তানদের মুসনাদে আহমাদ পড়ে শোনাতেন। তবে এ পর্যন্ত আমি তাঁর থেকে একটা হাদীসও লিখিনি। আমি তো তাঁর আদব, আখলাক ও সচ্চরিত্রের দিকে খেয়াল করতাম! [২০]
এভাবেই আদব-আখলাকের দিক থেকে সবাইকে ছাড়িয়ে যাওয়া এক সোনালি প্রজন্ম গড়ে উঠেছিল একটা সময়। আজকে তাদের সাথে আমাদের তুলনা করে দেখা উচিত যে, আদবের দিক থেকে আমরা কতটাই-না পিছিয়ে!
কিছু বিষয় ইলমের আদবের অন্তর্ভুক্ত। যেমন: * ইলমের সাথে সম্পৃক্ত বস্তুকে সম্মান
ইমাম আল ক্বাযী ইয়ায মালেকী মাযহাবের প্রখ্যাত ফক্কিহ, তাঁর কিতাবে ২১] এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ইমাম মালেক যখন হাদীসের দারসে বসতেন তখন তিনি গোসল করে, সুগন্ধি মাখিয়ে আসতেন। রাস্তায় কখনো হাদীস বলতেন না। চলতে চলতে হাদীস বলতেন না। উঁচু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মসনদে বসে কথা বলতেন তিনি। হাদীস পড়ানোর ক্ষেত্রে এক অপরূপ শান ছিল তাঁর। অথচ আজ আমরা রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে কুরআন-হাদীস বলছি, এ নিয়ে ঝগড়া করছি। কারণ কুরআন-হাদীসের প্রতি আমরা আমাদের অন্তরে সেই রকম মুহাব্বাত-ভালোবাসা জন্ম দিতে পারিনি।
অনেকেই হয়তো ভাববে যে, তাঁরা তো পূর্ববর্তী, রাসূল-এর কাছাকাছি সময়ের মানুষ। তাই তাদের অন্তরে ইসলামের জন্য ভালোবাসা বেশি। অথচ সমসাময়িক ইসলামী ব্যক্তিদের দিকে দৃষ্টিপাত করলেও আমরা সেই সময়ের মানুষদের প্রতিবিম্ব লক্ষ করতে পারব। শাইখুল হাদীস যাকারিয়া কান্ধলভী মৃত্যুবরণ করেছেন ১৯৯৯ সালে। তিনিও হাদীসের দারসে বসার পূর্বে পরিপাটি হয়ে সুন্দরভাবে তৈরি হতেন। আল্লামা ইউনুস জৈনপুরী যাকারিয়া কান্ধলভী -এর ছাত্র ছিলেন। ইউনুস জৈনপুরী সাহারানপুর মাদ্রাসায় সুদীর্ঘ ৪০ বছর যাবৎ বুখারী শরীফ পড়িয়েছেন। ভারত উপমহাদেশে তাকে বলা হয় 'মুহাদ্দিসুল আসর'। আরবের অনেক গণ্যমান্য আলেমগণও তাঁর থেকে হাদীসের শিক্ষা নিয়েছেন, এজন্য তাকে 'মুহাদ্দিসুল কাবীর'-ও বলা হয়ে থাকে। তিনি আমাদের কাছে এ কথা বর্ণনা করেন, সুগন্ধি অনুভব করলে আমরা বুঝতাম যে, শাইখ এখন হাদীসের দারসের জন্য বের হয়েছেন।
ইলমের প্রতিটি বস্তুকে সম্মান করতে হবে, তাহলে ইলম সেই ব্যক্তিকে ধরা দেবে।
আমরা জানি কেবল কুরআনই ওযুর সাথে ধরতে হয়, বাকি কিতাব ওযুবিহীন ধরা যায়।
তবে সেসব কিতাব ধরা ও পড়ার ক্ষেত্রে ওযু রাখা ইলমের আদবের অন্তর্ভুক্ত। ইলমের সাথে সম্পৃক্ত একটি ভাঙা কলমও সম্মানিত।
* লিপিবদ্ধ করার গুরুত্ব ত্বালিবুল ইলমদের জন্য 'কুররাসাতুল ফাওয়ায়িদ' তথা নোট খাতার গুরুত্ব কতটুকু তা বোঝাতে ইলমপিপাসু কোনো সালাফ বলেছেন (অনেকে বলে থাকেন এটি ইমাম শাফেঈর বক্তব্য),
العلم صيد و الكتابة قيده قيد صيودك بالحبال الواثقة فمن الحماقة أن تصيد غزالة وتردها بين الخلائق طالقة
ইলম হচ্ছে শিকার আর লিখে রাখা হচ্ছে বেড়ি! সুতরাং তুমি তোমার শিকারকে শক্ত রশি ও শিকল দিয়ে বেঁধে রাখো, কেননা যারা মূর্খ তারা দুনিয়ার লোকদের সামনে হরিণ শিকার করে এবং তা অবমুক্ত ও স্বাধীন ছেড়ে দেয়। (ফলে তা যেকোনো মুহূর্তেই চুরি হয়ে যেতে পারে।)
অর্থাৎ, ইলম হলো শিকারের ন্যায়। অথবা আকাশে পাখা মেলতে উৎসুক চঞ্চল পাখির মতো, আর খাতা-কলমে তা লিপিবদ্ধ করে নেয়া হলো সেই পাখির পায়ে বেড়ি পরানোর মতো। ইলম যেখানেই পাওয়া যাবে তা শিকার করতে হবে আর শিকার করে তা নিজের হস্তগত ও মালিকানায় আনার জন্য সংরক্ষণমূলক বেড়ি পরিয়ে দেবে। ইলমকে ধরে রাখতে হলে একে খাতা-কলমে লিপিবদ্ধ করে নেয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।
সালাফদের জীবনচরিত দেখলে বোঝা যায় যে, এমন কোনো সালাফ ছিলেন না যারা যা কিছু শিখতেন তা লিপিবদ্ধ করে রাখতেন না। ইমাম আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী ইলমী বা শিক্ষণীয় বিষয় পেলেই নোট করে রাখতেন। তাঁর এহেন কিছু নোটের মাধ্যমে 'সইদুল খ-ত্বির' নামক স্বতন্ত্র একটি কিতাব অস্তিত্বমান হয়েছে, যা থেকে আহলে ইলমরা আজও অবধি ফায়দা হাসিল করছেন। আল্লামা বদরুদ্দীন যারকাশী -এর 'খবায়া ফি যাওয়াইয়া' কিতাবটিও এভাবেই সংকলিত হয়েছে। ইমাম আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী-এর ছাত্রদের কৃত নোট আজ তিরমিযী শরীফের অনবদ্য শরাহ তথা ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসেবে খ্যাত 'আরফুশ শাযী' নামক কিতাবে রূপ পেয়েছে। এ ছাড়াও 'কাশকূল' সহ সালাফদের বহু উপকারী ইলমী কিতাব আছে যা তাদের নোটের ফসল!
* উস্তাযের সাথে সর্বোত্তম ব্যবহার
দ্বীনের ইলম যেখান-সেখান থেকে আহরণ করা যায় না। কেননা, তা কোথা থেকে অর্জন করা হচ্ছে এর ওপরই নির্ভর করে আমলের বিশুদ্ধতা। তাই ইলম শেখার পূর্বে উস্তায সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা নিয়ে নিতে হবে, তাঁর সম্পর্কে ভালো-মন্দ জেনে নিতে হবে।
বর্তমানে কে কত উঁচুমানের আলেম, উস্তায বা ভালো লেখক তা নির্ধারিত হয় সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে তাঁর কোন পোস্টে কী পরিমাণ লাইক-কমেন্ট-শেয়ার রয়েছে সেটার ভিত্তিতে। বাস্তবিক জীবনের চাইতে অলীক আর মেকির অনলাইন জীবনকে অধিক প্রাধান্য দেয়াই এর মূল কারণ। যোগ্যতাসম্পন্ন আলেম কে তা আলেমরাই নির্ধারণ করে দেবে, সাধারণ মানুষরা না। আর তা হবে ইলমের গভীরতার ভিত্তিতে, 'সোশ্যাল মিডিয়া এক্টিভিটি' এর কোনো ভিত্তি নয়।
দ্বীনি ইলম ও এর সাথে সম্পৃক্ত প্রতিটি বস্তুরও মর্যাদা রয়েছে। তাহলে যার থেকে দ্বীনের শিক্ষা নেয়া হচ্ছে তাঁর কেমন মর্যাদা হতে পারে? তাই উস্তাযের কাছ থেকে ইলম গ্রহণের সময় সর্বাধিক সম্মান প্রদর্শন করতে হবে। উস্তাযের দারসে বসার সময় ওযু অবস্থায় ভদ্রতার সাথে হাঁটুর ওপর ভর করে বসা উত্তম। তাঁর প্রতিটি কথায় পরিপূর্ণ মনোযোগী হতে হবে। তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর নাম উল্লেখের সময়ও যথার্থ সম্মান প্রদর্শন বাঞ্ছনীয়। যদি তাঁর কোনো ভুল হয়েছে বলে আপনার মনে হয়, তাহলে তাঁকেই প্রথমে গোপনে ও ভদ্রতার সাথে অবহিত করা উচিত; মাইকে মাইকে ঘোষণার পূর্বে!
আমাদের উপমহাদেশের দ্বীনদার মানুষদের জন্য বাস্তবিক জীবনে ইলম অর্জনের পেছনে সময় দেয়াটা এখন দুরূহ বিষয়। পুঁজিবাদী সমাজ এভাবেই আমাদের পায়ে বেড়ি পরিয়েছে। তবুও ইলমের তৃষ্ণায় তৃষ্ণার্থ মানুষগুলো সোহবতের আশায় ভিড় করছে অনলাইনভিত্তিক দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারে। এ ক্ষেত্রে বোঝা জরুরি যে, অনলাইনে দ্বীন শিক্ষা সরাসরি দ্বীন শিক্ষার প্রতিস্থাপক নয়; বরং এটি ঠেকায় কাজ চালানোর মতো। আর অনলাইন দারসের ক্ষেত্রেও উস্তাযদের প্রতি ততটাই সম্মান প্রদর্শন করা উচিত যতটা সরাসরি ইলম শিক্ষার ক্ষেত্রে করা হতো। এ ক্ষেত্রে বয়স, বংশ-মর্যাদা, সামাজিক অবস্থানও গণ্য হবে না। কুরআনে এসেছে,
قَالَ لَهُ مُوسَىٰ هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَىٰ أَن تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًا
মূসা তাকে বলল, আমি কি এ শর্তে আপনার অনুসরণ করব যে, আপনি আমাকে সেই জ্ঞান থেকে শিক্ষা দেবেন যে (বিশেষ) জ্ঞান আপনাকে শেখানো হয়েছে? [২২]
এই আয়াতে মূসা আল্লাহর শীর্ষস্থানীয় নবী ও রাসূল হওয়া সত্ত্বেও খিযির এ-এর কাছে সবিনয় প্রার্থনা করে বলছিলেন যে, তিনি খিযির এ-এর কাছে জ্ঞান অর্জনের জন্য তাঁর সাহচর্য কামনা করছেন। এ থেকে বোঝা গেল যে, ছাত্রকে অবশ্যই উস্তাযের সাথে আদব রক্ষা করতে হবে। [২৩]
* ইলমের জন্য সফর রাসূলুল্লাহ বলেন,
يَحْمِلُ هَذَا الْعِلْمَ مِنْ كُلِّ خَلَفٍ عُدُولُهُ، يَنْفُونَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِينَ، وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِينَ، وَتَأْوِيلَ الْجَاهِلِينَ
দ্বীনের এই ইলম প্রত্যেক পরবর্তী নিষ্ঠাবানরা বহন করবে। তারা সীমালঙ্ঘনকারীদের তাহরীফ (বিকৃতি) থেকে, বাতিলপন্থীদের জালিয়াতি থেকে এবং মূর্খদের তাবীল (অপব্যাখ্যা) থেকে দ্বীনের এই ইলমকে রক্ষা করবে। [২৪]
দ্বীনের এই ইলম হাসিল করা যেমন তেমন বিষয় নয়। এর যেমন বিশেষ ফাজায়েল রয়েছে তেমনিভাবে উক্ত ফজিলত হাসিল করতে হলে প্রয়োজন রয়েছে অদম্য উচ্ছ্বাস, আগ্রহ ও মেহনতের।
ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাসীর বলেন,
ميراث العلم خير من الذهب والنفس الصالحة خير من اللؤلؤ ولا يستطاع العلم براحة الجسد
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ইলম স্বর্ণ (সম্পত্তি) পাওয়া হতে অধিক উত্তম ও বিশুদ্ধ নাফস (অন্তর) মণি-মুক্তা থেকে অধিক উত্তম, আর ইলম শরীরের আরাম-আয়েশের মাধ্যমে হাসিল করা সম্ভব হয় না। [২৫]
এই অমূল্য রত্ন সমতুল্য ইলম হাসিল করতে গিয়ে আমাদের সালাফুস সালেহীন ও আকাবীরিনে উম্মাহ নিরলসভাবে বহুমুখী তৎপরতা অবলম্বন করেছেন। তার মাঝে অন্যতম হচ্ছে 'রিহলাহ' তথা ইলমের অভিমুখে যাত্রা ও সফর।
অনেকেই এই যাত্রা ও সফরে ইলম হাসিল করতে গিয়ে বিয়ে পর্যন্ত করতে সুযোগ পাননি। কেউ-বা মীরাস থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তি এই মহৎ কাজেই ব্যয় করে নিজে উজার হয়ে উম্মাহকে ধনী বানিয়ে গিয়েছেন। ইমাম ইবরাহীম ইবনু আদহাম বলেন, إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَرْفَعُ الْبَلَاءَ عَنْ هَذِهِ الْأُمَّةِ بِرِحْلَةِ أَصْحَابِ الْحَدِيثِ؛ নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহাদ্দিসদের রিহলাহর (তথা হাদীস অন্বেষণের যাত্রার) ওয়াসিলায় এই উম্মতের বিভিন্ন বালা-মুসিবত দূর করে দিয়েছেন। [২৬]
সালাফদের থেকে এমন প্রমাণ নেই যে, বড় আলেম হয়েছেন অথচ ইলমের জন্য সফর করেননি। এমনকি মহান রব্বুল আলামীনও তাঁর কতিপয় প্রিয়তম নবীদেরকে ইলমের জন্য সফর করিয়েছেন আর কুরআনে এর তাৎপর্য বোঝাতে গিয়ে ইলমী সফরের হুকুমও দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, (قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ بَدَأَ الْخَلْقَ) বলুন, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং সৃষ্টির সূচনা পর্যবেক্ষণ করো। [২৭]
অর্থাৎ হে নবী, তাদের বলে দিন তারা যাতে ভ্রমণ করে এবং পর্যবেক্ষণ করে যে, কীভাবে বিভিন্ন প্রজাতি, গঠানাকৃতি, বৈচিত্র্যময় ভাষা-বর্ণ এবং স্বভাবের সৃষ্টি ও সূচনা হয়। তারা যেন এই ভ্রমণ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে যে, কীভাবে আমি পূর্বে গত হওয়া বহু জাতি-গোষ্ঠীর, ঘর-বাড়ি ও সভ্যতা-সংস্কৃতি ধ্বংস করেছি। যেন তারা আল্লাহ-এর ক্ষমতার পূর্ণতা উপলব্ধি করতে পারে। [২৮]
এই কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইলমের জন্য সফরের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, মহান রবের যাত ও সিফাত তথা সত্তা ও গুণাবলির পূর্ণ পরিচয় হাসিল করা। আল্লাহ আরও বলেন,
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلُ )
হে নবী বলুন, তোমরা জমিনে ভ্রমণ করো এবং দেখো, তোমাদের পূর্বের জাতিদের কী পরিণতি হয়েছিল। [২৯]
এ ছাড়া সূরা নামলের ৬৯ নং আয়াতে 'মুজরিম' তথা অপরাধীদের পরিণতি অবলোকন করার জন্য আহ্বান করা হয়েছে। মহান আল্লাহ আরও বলেন,
فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ)
প্রত্যেক দল থেকে কেন একটি বিশেষ দল বের হয় না যারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান (তথা ফিক্বহ) শিক্ষা করবে, যেন তাদের সম্প্রদায়কে ভীতি প্রদর্শন করতে পারে, যখন তাদের কাছে তারা ফিরে আসবে। যাতে করে তারা (আল্লাহর হক্কের ব্যাপারে) সতর্ক থাকে। [৩০]
ইমাম খতীব আল বাগদাদী এ আয়াতের প্রসঙ্গে বলেন,
فهذا في كل من رحل في طلب العلم والفقه, ورجع به إلى من وراءه فعلمه إياه
মূলত এটি প্রত্যেক ওই ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, যে ইলম ও ফিক্বহ অর্জনের জন্য সফর করে। অতঃপর তারা যাদের রেখে গিয়েছিল তাদেরকে যাতে ফিরে এসে ইলম শিক্ষা দিতে পারে। [৩১]
আল্লাহ নবী মূসা -কেও ইলমের জন্য সফর করিয়েছেন। বনী ইসরাইলের এক ব্যক্তি মূসা -এর কাছে এসে জিজ্ঞাস করল, আপনার চেয়েও কি বেশি ইলমের অধিকারী কেউ আছেন (এ যামানায়)? মূসা বললেন, না কেউ নেই। অতঃপর আল্লাহ তাঁর নিকট ওয়াহী প্রেরণ করে এই সংবাদ দিলেন, “হে মূসা, আমার বান্দা খিযির, যে তোমার চেয়েও বেশি জানেন। এটি শুনে মূসা তাঁর নিকট পৌঁছানোর পথ জানতে চাইলেন। অতঃপর আল্লাহ তাঁর জন্যে একটি মাছ নিদর্শন হিসেবে নির্ধারণ করলেন এবং মূসা-কে বলা হলো, এই মাছ যেখানে হারিয়ে যাবে সেখানেই ফিরে যাবে। তবেই তার দেখা মিলবে। [৩২]
ইমাম বুখারী এ তাঁর কিতাবের একটি অধ্যায়ে এই হাদীসটি অন্তর্ভুক্ত করেছেন যার শিরোনাম হচ্ছে,
باب ما ذكر في ذهاب موسى في البحر إلى الخضر عليهما السلام অধ্যায় : খিযির-এর সাক্ষাতে মূসা -এর সমুদ্র অভিমুখে যাত্রা। [৩৩]
ইমাম ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেন, ইমাম বুখারী এই অধ্যায় রচনা করেছেন ইলম অন্বেষণে আসন্ন কষ্ট-ক্লেশ সাদরে গ্রহণ করতে উৎসাহ প্রদানের উদ্দেশ্যে। কেননা, যে ইলমের ব্যাপারে ঈর্ষা করে (অর্থাৎ ইলম হাসিল করতে আগ্রহী হয়) তাকে তা অর্জনে কষ্ট-ক্লেশ অতিক্রম করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। [৩৪]
ইলমী রিহলাহর অক্লান্ত পরিশ্রমে আগ্রহী নবী মূসার হিম্মত ও উদ্যমকে আল্লাহ এভাবে উপস্থাপন করেন,
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِفَتَنَهُ لَا أَبْرَحُ حَتَّى أَبْلُغَ مَجْمَعَ الْبَحْرَيْنِ أَوْ أَمْضِيَ حُقُبًا) যখন মূসা তাঁর (সফরসঙ্গী) যুবককে বললেন, দুই সমুদ্রের সংগমস্থলে না পৌঁছা পর্যন্ত আমি (ইলমী সফর) চালিয়েই যাব, নতুবা (এভাবেই) আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব। [৩৫]
যখন মূসা খিযির-কে পেয়ে গেলেন তখন বললেন,
هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَى أَن تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْداً ) আমি কি এই শর্তে আপনার অনুসরণ করতে পারি, যাতে (আল্লাহর পক্ষ থেকে) আপনাকে সঠিক পথের যেই শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে তা আপনি আমাকে শেখাবেন? [৩৬]
নিজ উস্তাযের সাথে বিনয় দেখানো ও তার অনুমতি নিয়ে তার কাছ থেকে ইলম শিক্ষা করা, এটিও ইলমের অন্যতম একটি আদব বা শিষ্টাচার; চাই উস্তায বয়সে যতই ছোট হোক না কেন। কেননা, মূসা সম্মান ও মর্যাদা সার্বিক দিক থেকে খিযির অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতৎসত্ত্বেও তিনি তাঁর কাছ থেকে ইলম নিতে আগ্রহ ও বিনয় প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেছেন।
ইলমের জন্য যাত্রার ফজিলতে আল্লাহর রাসূল থেকে হাসান সনদে বর্ণিত রয়েছে, مَنْ سَلَكَ طريقا يلتَمِسُ فِيهِ علمًا، سَهَّلَ اللهُ لَهُ طَرِيقًا إلى الجنَّةِ، وَإِنَّ المَلائِكَةَ لتَضِعُ أجنحتها لطالب العلم رضا بما يصنع و إنَّ العالم ليستغفِرُ لَهُ مَن فِي السَّمواتِ ومن في الأرض، حتى الحيتان في الماء،
ইলম হাসিলের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাতের পথ সুগম করে দেন এবং ফেরেশতারা উক্ত ত্বালিবে ইলমের যাত্রাপথে তাদের এই মহৎ কাজের খুশিতে (অন্য বর্ণনায়, সম্মানে) নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেন, আর এই প্রকৃতির আলেমদের জন্য আসমান ও জমিনের সবকিছু, এমনকি পানির মাছ পর্যন্তও ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে। [৩৭]
মাত্র একটি হাদীস ত্বলবের জন্যও সালাফগণ অভিযাত্রায় নামতেন। আব্দুল্লাহ ইবনু উনাইস থেকে বর্ণিত, মাত্র একটি হাদীস সরাসরি তার কাছ থেকে শ্রবণ করার উদ্দেশ্যে সাহাবী জাবের ইবনু আব্দিল্লাহ শামের পানে দীর্ঘ এক মাসের পথ অতিক্রম করেন এবং সফরের বাহন হিসেবে উট ক্রয়সহ পাথেয় জোগাড় করেন এই ভয়ে যে, উক্ত হাদীস শ্রবণের পূর্বে দুজনের কোনো একজন হয়তো জীবিত নাও থাকতে পারেন! [৩৮]
ইমাম আহমাদ ১০টি হাদীস শ্রবণের উদ্দেশ্যে বাগদাদের দারুস সালাম থেকে ইয়ামানের সানাআ' পর্যন্ত পথ অতিক্রম করেন। [৩১] হজরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব বলেন, والله الذي لا إله إلا هو إني كنت أرحل الأيام الطوال الحديث واحد
আল্লাহর কসম, যিনি ছাড়া কোনোইলাহ নেই, আমি একটি হাদীস শ্রবণের জন্যে দীর্ঘদিনের পথ অতিক্রম করেছি। [৪০]
বর্ণিত আছে যে, হাসান আল-বসরী কা'ব ইবনু আজুরাহর নিকট একটি মাসআলা জানার জন্য বসরা থেকে কূফা পর্যন্ত সুদূর পথ পাড়ি দিয়েছেন। [৪১]
প্রখ্যাত তাবেঈ আবুল আ'লিয়া বলেন, كنا نسمع الرواية عن أصحاب رسول الله ﷺ بالبصرة فلم نرض حتى ركبنا إلى المدينة فسمعناها من أفواههم
আমরা (তাবেঈরা) বসরায় সাহাবাদের থেকে বর্ণিত হাদীস শুনতাম, কিন্তু তাতেই তুষ্ট থাকতাম না যতক্ষণ না মদীনায় গিয়ে শোনার জন্য বাহনে আরোহণ করতাম। অতঃপর তাদের মুখ থেকে সরাসরি হাদীস শুনে নিতাম [৪২]
খত্বীব আল বাগদাদী ইমাম উবাইদুল্লাহ ইবনু আদী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমার নিকট আলী থেকে বর্ণিত একটি হাদীস পৌঁছল। আমি আশঙ্কা করলাম যে, তিনি মৃত্যুবরণ করলে এই হাদীস অন্য কারও কাছে পাব না। সুতরাং আমি ইরাক্কের পথে রিহলাহ শুরু করলাম। [৪৩]
ইমাম আহমাদ বলেন, আমি ইলম ও সুন্নাহ ত্বলবের উদ্দেশ্যে সীমান্তে, সমুদ্রতীরে, পূর্ব, পশ্চিমে, জাযায়ের, মক্কা, মদীনা, হিজায, ইয়ামান, ইরাকের সকল এলাকা, হাওরান, পারস্য, খুরাসান, এমনকি পাহাড় ও বিভিন্ন কোনায় কোনায় গিয়েছি। [৪৪]
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল দুনিয়ার কোনায় কোনায় চক্কর লাগিয়ে ইলম হাসিল করার পর সর্বস্ব হারিয়ে অতঃপর বলেন, لو كانت عندي خمسون در هما كنت قد خرجت إلى الري إلى جرير بن عبد الحميد فخرج بعض أصحابنا ولم يمكني الخروج لأنه لم يكن عندي شيء
ইশ! যদি আমার কাছে ৫০ দিরহাম থাকত, তাহলে আমি 'রায়' অঞ্চলের জারীর ইবনু আব্দিল হুমাইদের নিকট যেতাম। আমার কিছু সাথিরাও সেখানে গিয়েছেন। কিন্তু যাত্রাপথের খরচ বহন করার মতো আমার কিছু না থাকায় তা আমার জন্য সম্ভব হয়ে ওঠেনি। [৪৫]
ইমাম মিসআর ইবনু কিদাম বলেন, আমরা আবু হানীফার সাথে ইলমে হাদীস অন্বেষণের প্রতিযোগিতায় বের হলাম। অতঃপর আবু হানীফা আমাদের চেয়ে বেশি অন্বেষণ করে ফেললেন। আমরা 'যুহদ' হাসিলের জন্যে বের হলাম এতেও তিনি আমাদের থেকে এগিয়ে গেলেন। এরপর আমরা তার সাথে ফিকহের জ্ঞান অন্বেষণে বের হলাম, এর ফলাফল কী তার ব্যাপারে আর কী বলব! তোমরা তো নিজ চোখেই দেখছ (অর্থাৎ তিনি ফক্কিহকুল শিরোমণি হয়ে গিয়েছেন!)। [৪৬]
ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন থেকে বর্ণিত, أربعة لا يؤنس منهم رشد: حارس الدرب، ومنادي القاضي، وابن المحدث، ورجل يكتب في بلده ولا يرحل في طلب الحديث যে ব্যক্তি কেবল নিজ শহরেই ইলমে হাদীস অর্জন করে লিখে রাখে কিন্তু ইলমের জন্যে রিহলাহ ইখতিয়ার করে না, তার মাঝে কোনো কল্যাণ নেই [৪৭]
এজন্যই ইমাম ইবনুস সালাহ ত্বালিবুল ইলমদেরকে ইলমের আদব হিসেবে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন যে, নিজ অঞ্চলের সুপ্রসিদ্ধ ও মর্যাদাশীল আলেমদের থেকে ইলম অর্জন করার পরও ভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে ইলম অর্জন করতে। [৪৮]
টিকাঃ
[১] ইবন মাজাহ- ২২৪; ইবন আবদিল বার, জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহি- ২৫, ২৬
[২] সহীহ বুখারী- ৭১; সহীহ মুসলিম- ১০৩৭
[৩] সহীহ বুখারী- ৩৪৯৩; সহীহ মুসলিম- ২৫২৬
[৪] (সূরা তাহরীম- ৬) মুস্তাদরাক আল হাকেম- ২/৪৯৪। এর সনদকে ইমাম হাকেম সহীহ বলেছেন আর ইমাম যাহাবী তা সমর্থন করেছেন। আল মাদখাল, বাইহাক্বী- ৩ ৭২; আদাবুশ শারইয়াহ, ইবনু মুফলিহ- ৩/৫২২ (মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বাইরুত। শাইখ শুয়াইব আরনাউত্ব ও উমার আল কইয়্যামের তাহকীক।)
[৫] গরীবুল হাদীস, কাসেম ইবনু সালাম- ১/৩৮৪
[৬] আল ই'লান বিত তাওবীখ, সাধাবী, পৃষ্ঠা- ২০; সলাহুল উম্মাহ ফী উলুয়িল হিম্মাহ- ৭/৩৩২
[৭] হিলইয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াইম- ৬/৩১৬
[৮] আল জামে লি আখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামে- ১/৭৯, (মাকতাবাতুল মারিফ, রিয়াদ। তাহক্বীক- মাহমুদ ত্বহহান)
[৯] তারতিবুল মাদারেক, কাযী ইয়ায- ১/১৩০
[১০] সিয়ারু আলামিন নুবালা- ৮/১১৩
[১১] হিলইয়াতুল আওলিয়া, আবু নুয়াইম- ৬/৩৩০
[১২] গায়াতুন নিহায়া ফী ত্ববাকাতিল কুররা, ইবনুল জাযরী- ১/১৯৮
[১৩] আল জামে লি আখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামে- ১/৮০, (মাকতাবাতুল মা'রিফ, রিয়াদ। তাহক্বীক- মাহমুদ ত্বহহান); মাদারিজুস সালেকীন, ইবনু কায়্যিম আল জাওযিয়্যাহ- ২/৩৫৬ (দারুল কিতাবিল আরাবী, বাইরুত। তাহকীক- মু'তাসিম বিল্লাহ বাগদাদী)
[১৪] সিফাতুস সফওয়াহ, ইবনুল জাওযী- ২/৩০০। (দারুল হাদীস, কায়রো।)
[১৫] আল জামে লি আখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামে- ১/৮০ (মাকতাবাতুল মারিফ, রিয়াদ। তাহক্বীক- মাহমুদ ত্বহহান)
[১৬] আল জামে লি আখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামে- ১/৮০ (মাকতাবাতুল মা'আরিফ, রিয়াদ। তাহক্বীক- মাহমুদ ত্বহহান): আদাবুল ইমলা ওয়াল ইসতিমলা, সামআনী, পৃষ্ঠা- ২
[১৭] তাযকিরাতুস সামে ওয়াল মুতাকাল্লিম, ইবনু জামাআহ, পৃষ্ঠা- ৪; ফাসলুল খিত্বাব ফিয যুহদি ওয়ার রক্কায়িকি ওয়াল আদাব- ৯/২৮৪
[১৮] শারাফু আসহাবিল হাদীস, বাগদাদী, পৃষ্ঠা- ১২৩
[১৯] আল ইলাল ওয়া মা'রিফাতুর রিজাল, আহমাদ- ১/৫৮; মানাকিবে আহমাদ, ইবনুল জাওযী, পৃষ্ঠা- ২১০; সিয়ারু আলামিন নুবালা- ১১/৩১৭; শারহু মুনতাহাল ইরাদাত, বুহুতী- ১/৯
[২০] মানাক্কিবে আহমাদ, ইবনুল জাওযী, পৃষ্ঠা- ২১০; সিয়ারু আলামিন নুবালা- ১১/৩১৭
[২১] আশ শিফা বিতা'রিফি হুরুকিল মুসত্বাফা- ২/২৯০ ও ২৯২
[২২] সূরা কাহাফ- ৬৬
[২৩] ইবনে কাসীর, সূরা কাহাফের ৬৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যা
[২৪] আল বিদউ' ওয়ান নাহইউ আ'নহা, ইবনু ওয়াদ্দাহ- ১/২৫ ও ২৬; মুসনাদে বাযযার- ১৬/২৪৭; শরহু মুশকিলিল আছার, ত্বহাবি- ১০/১৭ হাদীস- ৩৮৮৪; আশ শরীয়াহ, আজুরী- ১, ২; মুসনাদুশ শামীয়্যীন, তাবরানি- ১/৩৪৪, হাদীস- ৫৯৯; আল ইবানাতুল কুবরা, ইবনু বাবুাহ- ১/৯৮ হাদীস- ৩৩; আল ফাওয়ায়েদ, তামাম ইবনু মুহাম্মাদ- ১/৩৫০, হাদীস- ৮৯১; সুনানুল কুবরা, বাইহাক্বী- ১০/৩৫৩-৩৫৪, হাদীস- ২০৯১১-১২; মাজমাউয যাওয়ায়েদ- ১/১৪০, হাদীস- ৬০১। ওপরোল্লেখিত হাদীসটি বিভিন্ন রাবী থেকে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তবে হাদিসটির সবগুলো সনদই সমালোচিত। তা সত্ত্বেও একাধিক সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় এবং কোনো কোনো সনদের রাবী যঈফে ইয়াসির হওয়ায় এটি একটি সলেহ ও হাসান সনদ। এ ছাড়াও এর মূল মতনের পক্ষে বুখারী-মুসলিমে একাধিক সহীহ হাদীস মুতাবে' হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে।
[২৫] তারীখু বাগদাদ- ১১/৩৭৫; তাদরীবুর রাবী, সূয়ুত্বী (শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামাহর তাহক্বীক)- ২/৩১৩
[২৬] আর রিহলাতু ফী ত্বলাবিল হাদীস, বাগদাদী, পৃষ্ঠা- ৮৯, রকম- ১৫; শারাফু আসহাবিল হাদীস; মুকাদ্দামাতু ইবনিস সালাহ- ২৩৪; তাদরীবুর রাবী- ২/১২০
[২৭] সূরা আনকাবুত- ২০
[২৮] তাফসীরে কুরত্ববী- ১৩/৩১০
[২৯] সূরা রুম- ৪২
[৩০] সূরা তাওবাহ- ১২২
[৩১] আর রিহলাতু ফী ত্বলাবিল হাদীস, বাগদাদী পৃষ্ঠা- ৮৯, রকম- ১০
[৩২] সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইলম- ১/২৬ ও ২৭, হাদীস- ৭৮
[৩৩] সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইলম- ১/২৬
[৩৪] ফাতহুল বারী- ১/১৬৮
[৩৫] সূরা আল কাহাফ-৬০
[৩৬] সূরা কাহাফ- ৬৬
[৩৭] সুনানে আবু দাউদ- ৩৬৪১; সুনানে তিরমিযী- ২৬৮২; মুসনাদে আহমাদ- ২৭১১৫; সুনানে ইবনে মাজাহ- ২২৩। হাদীসটি বিভিন্ন শব্দে বিভিন্ন সনদে হাসান সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
[৩৮] আর রিহলাতু ফী ত্বলাবিল হাদীস- ১০৯ থেকে ১১১; আদাবুল মুফরাদ, বুখারী; তা'লীকে বুখারী- ১/১৪০, হাদীস- ৭৪; মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে আবু ইয়ালা; মুসনাদে শামিয়ীন, ত্ববারানী; মুকাদ্দামায়ে ইবনুস সালাহ। সনদ সালেহ।
[৩৯] আল মিসকু ওয়াল আম্বার ফী খুত্বাবিল মিম্বার, ড. আয়েদ্ব আল কারনী- ৪৩১
[৪০] আল মিসকু ওয়াল আম্বার ফী খুত্বাবিল মিম্বার, ড. আয়েদ্ব আল কারনী- ৪৩১; ফাতহুল বারী- ১/১৫৯
[৪১] আর রিহলাতু ফী ত্বলাবিল হাদীস, পৃষ্ঠা- ১৪৩
[৪২] আল জামে' লি আখলাক্কির রাউই- ২/২২৬
[৪৩] ফাতহুল বারী- ১/১৫৯
[৪৪] ত্ববাকাতে হানাবিলাহ- ১/৪৭; আদাবুশ শরইয়াহ- ২/৪৮
[৪৫] আল জামে' লি আখলাকির রাউই- ২/২৩৫
[৪৬] মানাকেবে আবু হানীফা, যাহাবী, পৃষ্ঠা- ৪০; আখবারু আবী হানীফাহ, সইমারী; জামেউল মাসানীদ ওয়াস সুনান (মুকাদ্দিমা)- ৪২
[৪৭] মুকাদ্দামায়ে ইবনুল সালাহ, পৃষ্ঠা- ২৩৪
[৪৮] মুক্কাদ্দামায়ে ইবনুল সালাহ, পৃষ্ঠা- ২৩৪
📄 সবরের পরশমণি
প্রতিটি পদে পদে মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে পরীক্ষা। কিন্তু মু'মিনদের জন্য পরীক্ষার সহোদর সবর। সবরের সাথে মিশে আছে কষ্ট, আর আল্লাহ আশ্বাস দেন, নিশ্চয় কষ্টের সাথে রয়েছে স্বস্তি। সবরের বীজ নারীদের মাঝে সহজাতিকভাবেই বোনা রয়েছে। কিন্তু পুরুষদের সবর শিখে নিতে হয়। আর যদি কোনো পুরুষ সবর শিখতে না পারে, তাহলে সে নিজের জীবন ও তার পারিপার্শ্বিক মানুষদের জীবন বিষিয়ে তোলে। তাই পুরুষদের জীবনে সবর এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
সবরের গুরুত্ব ও পুরস্কার সম্পর্কে আল্লাহ কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলেন, یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ ٱسۡتَعِینُوا۟ بِٱلصَّبۡرِ وَٱلصَّلَوٰةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلصَّـٰبِرِینَ হে মু'মিনগণ, ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন। [৪৯]
সবর এমন এক মহাসম্পদ যে, দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় সম্পদ এর মোকাবেলায় নগণ্য। যারা ধৈর্যধারণ করে তাদের সাথে আল্লাহ সহায়তা ও সাহায্যের মাধ্যমে থাকেন। [৫০] কুরআনে আর অন্য কোনো আমলকারীর ক্ষেত্রে আল্লাহ এইভাবে শব্দচয়ন করেননি। সবর হচ্ছে সংযম অবলম্বন ও আপন নফসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ লাভ। কুরআন ও হাদীসের পরিভাষায় সবরের তিনটি শাখা রয়েছে।
* নফসকে হারাম বিষয়াদি থেকে বিরত রাখা, * ইবাদাত ও আনুগত্যে নফসকে বাধ্য করা এবং * যেকোনো বিপদ ও সংকটে ধৈর্যধারণ করা। অর্থাৎ জীবনের পথচলায় যেসব বিপদ- আপদ এসে উপস্থিত হয়, সেগুলোকে আল্লাহ-এর ইচ্ছা বলে মেনে নেয়া এবং এর বিনিময়ে আল্লাহ-এর তরফ থেকে প্রতিদান প্রাপ্তির আশা রাখা। [৫১]
আল্লাহ কুরআনে মুত্তাক্বীনদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, وَٱلصَّـٰبِرِینَ فِی ٱلۡبَأۡسَاۤءِ وَٱلضَّرَّاۤءِ وَحِینَ ٱلۡبَأۡسِ... ...যারা ধৈর্যধারণ করে কষ্ট, দুর্দশায় ও যুদ্ধের সময়ে... [৫২]
আখলাক বা মন-মানসিকতার সুস্থতা সম্পর্কিত বিধি-বিধানের আলোচনায় একমাত্র সবরের উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা, সবরের অর্থ হচ্ছে মন-মানসিকতা তথা নফসকে বশীভূত করে অন্যায়-অনাচার থেকে সর্বোত্তমভাবে সুরক্ষিত রাখা। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে যে, মানুষের হৃদয়বৃত্তিসহ অভ্যন্তরীণ যত আমল রয়েছে সবরই সেসবের প্রাণস্বরূপ। এরই মাধ্যমে সর্বপ্রকার অন্যায় ও কদাচার থেকে মুক্তি পাওয়া সহজ হয়। সবরের মাধ্যমেই আল্লাহর ভালোবাসার পাত্র ও তাঁর একনিষ্ঠ বান্দা হওয়া যায়।
আল্লাহ বলেন,
وَ اللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ) আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন। [৫৩]
এ ছাড়া আল্লাহ সবরের প্রতিদান সম্পর্কে বলেন,
مَا عِندَكُمْ يَنفَدُ وَ مَا عِندَ اللَّهِ بَاقٍ وَلَنَجْزِيَنَّ الَّذِينَ صَبَرُوا أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ তোমাদের কাছে যা আছে তা নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং আল্লাহর কাছে যা আছে তা স্থায়ী; যারা ধৈর্যধারণ করে আমি নিশ্চয়ই তাদেরকে তারা যে উত্তম কাজ করে তা থেকেও শ্রেষ্ঠ পুরস্কার প্রদান করব। [৫৪]
এখানে সবরের পথ অবলম্বনকারীদের বলতে এমনসব লোকদের বোঝানো হয়েছে যারা আল্লাহর নির্দেশ ও নিষেধ পালন করতে জীবনের যাবতীয় কষ্টকে তুচ্ছজ্ঞান করেছে, কাফেরদের বিরুদ্ধে ধৈর্যের সাথে যুদ্ধ করেছে এবং এ পথে যত প্রকার কষ্ট ও ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় তার সবই তারা বরদাশত করে নিয়ে আনুগত্যের ওপর অটল থেকেছে; তাদের জন্যই উত্তম পুরস্কার।[৫৫]
إِنِّي جَزَيْتُهُمُ الْيَوْمَ بِمَا صَبَرُوا أَنَّهُمْ هُمُ الْفَابِرُونَ) আজ আমি তাদেরকে পুরস্কৃত করলাম তাদের ধৈর্যধারণের কারণে, আজ তারাই তো সফলকাম। [৫৬]
পৃথিবীতে বিশ্বাসীদের ধৈর্য-পরীক্ষার একটি পর্যায় এমনও রয়েছে যে, যখন তারা বিশ্বাস ও ঈমানের চাহিদানুসারে সৎকর্ম সম্পাদনা করে, তখন দ্বীনের ব্যাপারে অনভিজ্ঞ ও ঈমানের ব্যাপারে অজ্ঞ লোকেরাও তাদেরকে উপহাসের পাত্র বানায়। এমনকি এসবের কারণে আজকাল অত্যাচারীদের মাধ্যমে অত্যাচারিতও হতে হয়। অনেক দুর্বল ঈমানদার সেসব উপহাস ও ভর্ৎসনার ভয়ে আল্লাহ-এর আদেশকৃত বিধান দিতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। যেমন : দাড়ি রাখা, শরঈ পর্দা করা, বিবাহ-শাদীতে বিধর্মীদের রীতি-নীতি হতে দূরে থাকা ইত্যাদি। সৌভাগ্যের অধিকারী তারাই, যারা কোনোপ্রকার ব্যঙ্গ-বিরূদ্রুপ ও জীবনের ক্ষতির পরোয়া করে না এবং কোনো অবস্থাতেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় না। আল্লাহর প্রিয়পাত্রের একটি গুণ এই যে, তারা কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করে না।[৫৭] আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদেরকে উত্তম প্রতিদান দেবেন এবং তাদেরকে সফলতা দানের মাধ্যমে সম্মানিত করবেন; যেমনটি প্রাগুক্ত আয়াতে ব্যক্ত হয়েছে।
আমাদের মনের মাঝে কিছু সুন্দর ইচ্ছা ঘর বাঁধে। সেগুলো আমরা আমাদের অভিভাবক মহান রব্বুল ইযযাহর কাছেই পেশ করি। কিন্তু আমরা অনেকেই এতে ধৈর্যহারা হয়ে যাই। ফলে দু'আ কবুল হচ্ছে না এই ভাবনার কারণে জীবনে নেমে আসে ঘনঘটা আর এতে জীবন থেকে শোকর উঠে যায়। বিপদের সময়ও সুখে থাকার পরশমণি হচ্ছে সবর। যা নেই তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে যা আছে তা নিয়ে ভাবতে হবে, ওপরে যাদের অবস্থান তাদের দিকে না তাকিয়ে নিচে যারা রয়েছে তাদের দিকে তাকাতে হবে আর এ নিয়ে আল্লাহর শোকর করতে হবে। আল্লাহর শোকরবিহীন জীবনের চেয়ে খড়-খুটো অনেক ভালো। কেননা শোকরবিহীন জীবন আল্লাহর নাফরমানী ও কুফরীর দিকে ধাবিত করে। অর্থাৎ জীবনে সবরের অনুপস্থিতি মানুষকে যে শুধু মহাপুরস্কার থেকেই দূরে রাখবে তা নয়, এটি মানুষকে কুফরের নর্দমায়ও নিয়ে ফেলতে পারে।
টিকাঃ
[৪৯] সূরা বাকারাহ- ১৫৩
[৫০] সিফাতিল্লাহিল ওয়ারিদা ফিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ। এখানে সবরকারীদের সাথে থাকার অর্থ সাহায্য ও সহযোগিতায় তাদের সাথে থাকা।-সা'দী
[৫১] তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা বাকারাহ- ১৫৩ এর ব্যাখ্যা
[৫২] সূরা বাকারাহ- ১৭৭
[৫৩] সূরা আলে ইমরান- ১৪৬
[৫৪] সূরা আন নাহাল- ৯৬
[৫৫] ফাতহুল কাদীর।
[৫৬] সূরা আল মু'মিনুন- ১১১
[৫৭] সূরা মায়িদা- ৫৪
📄 নম্রতার সবক
অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করার একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য পুরুষদের মাঝে লক্ষ করা যায়। এর ফলে অধিকাংশ পুরুষের রাগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কিছুটা কম থাকে। অথচ এই রাগই কতশত জীবন নষ্ট করেছে। রাগের মাথায় বেফাঁস মন্তব্যের কারণে কত মানুষের অন্তরে চোট লেগেছে তা গুণে শেষ করা যাবে না। তাই আমাদের নম্রতার অনুশীলন করতে হবে। বিশেষ করে মু'মিন পুরুষদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো আপন রবভোলা মানুষগুলোকে সরল পথের সন্ধান দেয়া। আর এই কাজের জন্য প্রয়োজন পড়ে সবর ও নম্রতার। যার মাঝে নম্রতা নেই সে দা'ওয়াহ দিতে গিয়ে তর্কে লিপ্ত হবে। আর তর্ক দ্বীনের কোনো কাজে আসে না। আল্লাহ তাঁর নবী-রাসূলদেরকে ক্ষণে ক্ষণে নম্রতার সবক দিয়েছেন। কুরআনে এসেছে,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نَفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ )
অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণে তুমি তাদের প্রতি নম্র হয়েছিলে। আর যদি তুমি কঠোর স্বভাবের, কঠিন হৃদয়সম্পন্ন হতে তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা করো এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।[৫৮]
মহান নৈতিকতার অধিকারী নবী মুহাম্মাদ-এর ওপর আল্লাহর কৃত অসংখ্য অনুগ্রহের মাঝে একটি অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে যে, তাঁর মধ্যে যে কোমলতা ও নম্রতা রয়েছে তা আল্লাহর রহমতেরই ফল। আর দ্বীনের প্রচার-প্রসারের জন্য তো এই কোমলতার প্রয়োজন ব্যাপক। নবীজি যদি কোমল ও নরম না হয়ে কঠিন হৃদয়ের অধিকারী হতেন, তাহলে মানুষ তাঁর কাছে না এসে আরও দূরে সরে যেত।
আবু উমামা আল বাহেলী বলেন, রাসূলুল্লাহ আমার হাত ধরে বললেন, “হে আবু উমামা, মু'মিনদের মাঝে কারও কারও জন্য আমার অন্তর নরম হয়ে যায়।”[৫৯]
মূসা ও হারুন -কে যখন ফিরআউনের নিকট দা'ওয়াহ পৌঁছানোর জন্য আল্লাহ আহ্বান করলেন, তখন আল্লাহ তাঁদেরকে বললেন, فَقُولَا لَهُ قَوْلًا لَيْنَا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى তার সঙ্গে তোমরা নম্রভাবে কথা বলবে, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা (আল্লাহকে) ভয় করবে। [৬০]
অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর নবীদেরকে আদেশ দিচ্ছেন যাতে তাঁদের দা'ওয়াহ হয় নরম ভাষায়, যাতে তা ফিরআউনের অন্তরে প্রতিক্রিয়া করে এবং দা'ওয়াহ সফল হয়। উপর্যুক্ত আয়াতে দা'ওয়াহ প্রদানকারীদের জন্য বিরাট শিক্ষা রয়েছে। ফিরআউন হচ্ছে সবচেয়ে বড় দাম্ভিক ও অহংকারী। আর মূসা হচ্ছেন আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। তবুও ফিরআউনকে নরম ভাষায় সম্বোধন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।[৬১] এতে বোঝা যাচ্ছে যে, প্রতিপক্ষ যতই অবাধ্য এবং ভ্রান্ত বিশ্বাস বা চিন্তাধারার হোক না কেন, তার সাথেও পথপ্রদর্শনের কর্তব্য পালনকারীদের হিতাকাঙ্ক্ষীর ভঙ্গিতে নম্রভাবে কথাবার্তা বলতে হবে। এরই ফলে সে কিছু চিন্তা ভাবনা করতে বাধ্য হতে পারে এবং তার অন্তরে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি হতে পারে।
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
জ্ঞান-বুদ্ধি আর উত্তম উপদেশের মাধ্যমে তুমি (মানুষকে) তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান জানাও আর তাদের সাথে বিতর্ক করো এমন পন্থায় যা অতি উত্তম। [৬২]
উক্ত আয়াতে আল্লাহ মানুষদেরকে বোঝানোর স্বার্থে বিতর্ক করার অনুমতি দিয়েছেন। তবে শর্ত হলো, তা হতে হবে উত্তম পন্থায়। আর নিঃসন্দেহে দা'ওয়াতের ক্ষেত্রে সেই পন্থাই উত্তম যেই পন্থায় হেঁটেছেন নবী-রাসূলগণ। সেই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই উত্তম যা তাঁদের ব্যক্তিত্বকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে, যেই ব্যক্তিত্বে আকৃষ্ট হয়ে কতশত মানুষের মিলেছে জান্নাতের দিশা।
টিকাঃ
[৫৮] সূরা আলে ইমরান- ১৫৯
[৫৯] মুসনাদে আহমাদ- ৫২১৭
[৬০] সূরা ত্বহা- ৪৪
[৬১] তাফসীরে ইবনে কাসীর, সূরা ত্বহা- ৪৪ এর ব্যাখ্যা
[৬২] সূরা আন নাহাল- ১২৫