📄 উম্মে কুলসুম (রাঃ) এর মৃত্যু
উম্মে কুলসুম (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তৃতীয় কন্যা, যিনি রাসূলুল্লাহ এর প্রথম স্ত্রী খাদীজা (রাঃ) এর গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দ্বিতীয় কন্যা রুকাইয়া (রাঃ) এর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উসমান (রাঃ) এর সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পর তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই ব্যথিত হয়েছিলেন।
📄 আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর মৃত্যু
আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল মদিনার মুনাফিকদের নেতা। তার নেতৃত্বে মুনাফিকরা তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেত। সে বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেও অন্তরের মধ্যে কুফরী লুকিয়ে রেখেছিল। মুসলিমদের ক্ষতি সাধন করার জন্য সর্বদা ওঁৎ পেতে থাকত। তবে তার ছেলে আবদুল্লাহ (রাঃ) ছিলেন একজন উত্তম সাহাবী।
তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পর আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মৃত্যুবরণ করলে ছেলে আবদুল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে আবেদন করলেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জামাটি আমার পিতার জন্য দান করুন, এর দ্বারা তাকে কাফন দেব এবং আপনি তার জানাযা পড়াবেন ও তার জন্য ক্ষমা চাইবেন। তখন রাসূলুল্লাহ তাকে নিজের জামাটি দান করলেন এবং বললেন, আমাকে খবর দিলে আমি তার জানাযা পড়াব। তারপর রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে সংবাদ দিলে তিনি জানাযা পড়তে উদ্যোগী হলেন। এমন সময় উমর (রাঃ) তাঁর কাপড় টেনে ধরে বললেন, আল্লাহ তা'আলা কি আপনাকে মুনাফিকদের জানাযা পড়তে বারণ করেননি? উত্তরে তিনি বললেন, জানাযা পড়া বা না পড়া আমার ইচ্ছাধীন (উভয়ই সমান)। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন,
﴿اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ﴾ তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো আর না-ই কর, যদি ৭০ বারও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর তবুও আল্লাহ তা'আলা কখনো তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। (সূরা তাওবা- ৮০)
অতঃপর তিনি তার জানাযার নামায আদায় করলেন এবং ফিরে আসলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন,
وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُمْ مَّاتَ أَبَدًا তাদের কেউ মারা গেলে আপনি আর কখনো তাদের জানাযা পড়বেন না- (সূরা তাওবা- ৮৪)।১২০
টিকাঃ
১২০ সহীহ বুখারী, হা/১২৬৯।
📄 নবম হিজরীর হজ্জ
তাবুক যুদ্ধের পর উক্ত বছরের উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হচ্ছে, হজ্জ পালন করার উদ্দেশ্যে কতিপয় সাহাবীকে মক্কায় প্রেরণ। এদের নেতৃত্ব প্রদানের জন্য রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর (রাঃ)-কে মনোনীত করেন। অতঃপর মুশরিকদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিনামা নিষ্পত্তির নির্দেশনা সম্বলিত সূরা তাওবার কয়েকটি আয়াত নাযিল হলে রাসূলুল্লাহ আলাইহি আলী (রাঃ)-কেও প্রেরণ করেন, যাতে তিনি আবু বকর (রাঃ) এর সাথে মিলিত হন এবং মক্কার মুশরিকদেরকে আল্লাহর নির্দেশনামা জানিয়ে দেন। অতঃপর জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে আলী (রাঃ) জামরা তথা কংকর নিক্ষেপ করার স্থানে দাঁড়িয়ে একটি ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন, অঙ্গীকারকারীদের সকল অঙ্গীকারের বিলুপ্তি ঘোষণা করা হলো এবং এ সকল বিষয় চূড়ান্ত করার জন্য চার মাস সময় দেয়া হলো।
তবে যে মুশরিকরা মুসলিমদের সাথে অঙ্গীকার পালনে কোন প্রকার ত্রুটি করেনি, কিংবা মুসলিমদের বিরুদ্ধে অন্য কাউকেই সাহায্য করেনি, তাদের অঙ্গীকারনামা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বলবৎ রাখা হয়।
এদিকে আবু বকর (রাঃ)-ও একদল সাহাবীদের মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে, আগামীতে কোন মুশরিক কাবা ঘরে হজ্জ করতে পারবে না এবং কোন উলঙ্গ ব্যক্তি কাবা ঘর তাওয়াফ করতে পারবে না। ১২১ এভাবে তারা রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর নির্দেশনা ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে সুষ্ঠভাবে হজ্জব্রত পালন করে নিরাপদে মদিনায় ফিরে আসেন।
টিকাঃ
১২১ সহীহ বুখারী, হা/৪৬৫৬।
📄 দলে দলে ইসলাম গ্রহণ
মূলত মক্কা বিজয়ের পর থেকেই আরবের বিভিন্ন প্রতিনিধি দল এসে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। তবে তাবুক যুদ্ধের পর মানুষের ইসলাম গ্রহণের গতি আরো প্রবল বেগে বৃদ্ধি পায়। কেননা মক্কা বিজয়ের পরেও আরবের যেসব গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেনি, তাদের শেষ ভরসা এই ছিল যে, হয়তোবা মুসলিমগণ রোমানদের হাতে পরাজিত হবে। কেননা সে সময় মুসলিমদের মোকাবেলা করার মতো এই একটিমাত্র শক্তিই বাকি ছিল। কিন্তু তাবুক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যখন রোমানদের শক্তির দুর্বলতা প্রকাশ পেল, তখন মক্কাবাসীদের জন্য ইসলাম গ্রহণ করা ছাড়া অন্য কোন পথই আর অবশিষ্ট রইল না। এ সময় ইসলাম গ্রহণের মধ্যে অন্যতম ছিল বনু আবদুল কাইসের প্রতিনিধি দল, উযরাহ প্রতিনিধি দল, বেলী প্রতিনিধি দল, বনু সাকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দল, হামদান এর প্রতিনিধি দল, বনু ফাযারার প্রতিনিধি দল, নাজরানের প্রতিনিধি দল, 'তাই' এর প্রতিনিধি দল, তোজাইব এর প্রতিনিধি দলসহ আরো অনেকে। এ সময় এত বেশি সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিল যে, যেখানে তাবুক যুদ্ধে সৈন্য সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার, সেখানে বিদায় হজ্জে অংশ নিয়েছিল ১ লক্ষ ২৪ হাজার।