📄 তাবুক যুদ্ধ
মক্কা বিজয় ও হুনাইনের যুদ্ধের পর মুসলিমগণ আরব গোত্রে এমন প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে, এরপর থেকে কোন তাগুতী শক্তিই তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না। তবে মুসলিমদের শত্রু রোমানরা প্রায়ই মুসলিমদের উত্যক্ত করে যাচ্ছিল। সে সময় তারাই ছিল বিশ্বের মোড়ল। তারাই ছিল সম্পদ ও সৈন্যের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধশালী। ইতিপূর্বে মুতার যুদ্ধের মাধ্যমে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তারা খুবই অস্থির ছিল। উপরন্তু চারদিকে মুসলিমদের জয়ধ্বনি তাদের শরীরে কাঁটার মতো বিদ্ধ করছিল। তাদের এসব আত্মগর্বমূলক মনোবাসনাই তাদেরকে একটি চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিকে ধাবিত করে।
সময় ও পরিস্থিতি : সময়টি ছিল ৯ম হিজরী। এসময় পরিস্থিতিও ছিল খুবই নাজুক। কেননা তখন ছিল গ্রীষ্মকাল, চারদিকে ছিল প্রচণ্ড গরম। অনেক মানুষ খুবই অসচ্ছলতা ও দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে গিয়েছিল। অপরদিকে সেখানকার বাগ-বাগিচার ফলমূলও পরিপক্ক হয়ে গিয়েছিল। ফলে বাগ-বাগিচাগুলোতে অবস্থান করাটা মানুষের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এসব কারণে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তাদের মানসিক কোন প্রস্তুতিও ছিল না। অপরদিকে এ যুদ্ধের যাত্রাপথও ছিল খুবই দূরের এবং কষ্টের।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে রোমান ও গাসসানীদের প্রস্তুতির সংবাদ : পরিস্থিতির এমন নাজুক অবস্থায় মুসলিমদের কাছে প্রায়ই সংবাদ আসতে থাকে যে, রোমান ও গাসসানীরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ফলে রোমান ও গাসসানীদের সীমান্তবর্তী অনেক মুসলিমই তাদের ভয়ে আতঙ্কে থাকতেন এবং তারা সার্বিক পরিস্থিতি রাসূলুল্লাহ-কে জানাতেন। এমন টানটান উত্তেজনায় একদিন 'শাম' দেশ থেকে আগত নাবেক বিন ইসমাঈল বংশের এক কাফেলার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ জানতে পারেন যে, রোমের বাদশাহ হিরাকল মুসলিমদের বিরুদ্ধে ৪০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী একত্রিত করেছেন। আর তাদের সাথে লাখমা, জোযাম এবং আরো কিছু গোত্রও যোগদান করেছে। তাদের অগ্রবর্তী দলটি বালকা নামক স্থানে পৌঁছে গেছে।
ইলার ঘটনা : তাবুক অভিযানে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে আরো একটি মারাত্মক ঘটনা ঘটেছিল। আর সেটি ঘটেছিল এসব টানটান উত্তেজনার মধ্যেই। ঘটনাটি সম্পর্কে উমর (রাঃ) বলেন, আমি এবং মদিনার উপকণ্ঠে বসবাসকারী সম্প্রদায়ের আমার এক আনসারী প্রতিবেশী উমাইয়া ইবনে যায়েদ; আমরা পালাক্রমে নবী -এর সাথে সাক্ষাৎ করতাম। যখন আমি যেতাম, আমি সারাটা দিন ওহী অবতীর্ণসহ অন্যান্য যা কিছু ঘটত; সব সংবাদ তাকে দিতাম এবং সেও অনুরূপ সংবাদ আমাকে দিত। আমরা (কুরাইশরা) নিজেদের স্ত্রীদের উপর প্রভাবশালী ছিলাম। কিন্তু আমরা যখন আনসারদের মধ্যে আসলাম, তখন দেখতে পেলাম, তাদের স্ত্রীগণই তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। অতঃপর ধীরে ধীরে আমাদের স্ত্রীরাও আনসারদের স্ত্রীগণের রীতিনীতি গ্রহণ করতে লাগল। একদিন আমি আমার স্ত্রীর প্রতি 'নারাজ' হলাম এবং উচ্চৈঃস্বরে তাকে কিছু বললে সেও পাল্টা জবাব দিল। সে আমার মুখে মুখে তর্ক করবে এটা আমি অপছন্দ করলাম। তখন সে বলল, আমি আপনার কথার পাল্টা জবাব দিচ্ছি, তা আপনি অপছন্দ করছেন কেন? আল্লাহর শপথ! নবী -এর স্ত্রীগণ তাঁর কথার প্রত্যুত্তর দিয়ে থাকেন এবং তাদের কেউ কেউ আবার পূর্ণ একটা দিন এমনকি রাত পর্যন্ত তাঁর প্রতি অভিমান করে কাটিয়ে দেন।
এ কথা শুনে আমি ঘাবড়ে গেলাম এবং তাকে বললাম, তোমাদের মাঝে যে এরূপ করেছে তার সর্বনাশ হয়েছে! এরপর আমি পোশাক পরিধান করলাম এবং হাফসার কাছে গিয়ে তার ঘরে প্রবেশ করে তাকে বললাম, হে হাফসা! তোমাদের মধ্যে কেউ কি রাসূলুল্লাহ -কে সারাদিন এমনকি রাত পর্যন্ত অসন্তুষ্ট করে রাখে? সে জবাব দিল, হ্যাঁ! আমি বললাম, সে তো ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হলো। তোমরা কি বেপরোয়া হয়ে গেছ যে, রাসূলুল্লাহ এর অসন্তুষ্টির কারণে আল্লাহ তাঁর সে স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট হতে পারেন এবং পরিণামে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে? সুতরাং নবী-এর নিকট কোন জিনিস অতিরিক্ত দাবি করো না, তাঁর কথার প্রত্যুত্তর করো না এবং তাঁর সাথে (অভিমান করে) কথা বলা বন্ধ করো না। তোমার যদি কোন কিছুর প্রয়োজন হয়, তবে আমার নিকট চেয়ে নিও এবং স্বীয় প্রতিবেশিনীর অনুকরণে অহঙ্কার করো না। কেননা সে তোমার চেয়ে বেশী রূপবতী এবং রাসূলের নিকট প্রিয়। (এখানে প্রতিবেশিনী দ্বারা আয়েশা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে।)
উমর (রাঃ) আরো বললেন, এ সময় আমাদের মধ্যে গুঞ্জন হতে লাগল যে, (সিরিয়ার) গাসসান সম্প্রদায় আমাদের উপর আক্রমণ চালানোর জন্য তাদের ঘোড়াগুলোকে প্রস্তুত করছে। একদিন আমার আনসার সঙ্গী তার পালার দিন নবী -এর খেদমতে হাজির থেকে রাতে ফিরে এসে আমার দরজায় খুব জোরে আঘাত করল এবং প্রশ্ন করল, আমি ঘরে আছি কি না? আমি ভীত হয়ে তার নিকট বেরিয়ে এলাম। সে বলল, আজ এক সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে। আমি বললাম, তা কী? গাসসানীরা কি এসে গেছে? সে বলল, না- বরং তার চেয়েও সাংঘাতিক ও ভয়ংকর ঘটনা। রাসূলুল্লাহ আলাইহি তাঁর স্ত্রীগণকে তালাক দিয়েছেন। আমি বললাম, হাফসা তো ধ্বংস হলো এবং ব্যর্থ হলো। এরপর আমি পোশাক পরিধান করলাম এবং ফজরের নামায নবী -এর সাথে আদায় করলাম। নামায শেষে নবী মাচানে আরোহণ করলেন এবং সেখানে একাকী বসে রইলেন। আমি হাফসার নিকট গেলাম, তখন সে কাঁদছিল। আমি প্রশ্ন করলাম, কাঁদছ কেন? আমি কি তোমাকে এ ব্যাপারে আগেই সতর্ক করিনি? রাসূলুল্লাহ আলাইহি কি
তোমাদেরকে তালাক দিয়েছেন? সে বলল, আমি জানি না। তিনি মাচানের উপরে একাকী আছেন। অতঃপর আমি সেখান থেকে বেরিয়ে এসে মিম্বরের নিকট আসলাম যেখানে একদল লোক বসা ছিল এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ কাঁদছিল। আমি তাদের নিকট কিছুক্ষণ বসলাম, কিন্তু আমার অন্তর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অসহ্য হয়ে পড়ছিল। সুতরাং যে মাচানে নবী অবস্থান করছিলেন আমি সেখানে গিয়ে তাঁর গোলামকে বললাম, উমরের জন্য প্রবেশের অনুমতি চাও। সে নবী আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর কাছে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলার পর ফিরে এসে বলল, আমি নবী -এর সঙ্গে কথা বলেছি এবং আপনার কথা উল্লেখ করেছি, কিন্তু তিনি নিরুত্তর রয়েছেন।
অতঃপর আমি ফিরে আসলাম এবং মিম্বরের নিকট যেখানে একদল লোক বসা ছিল, সেখানে বসলাম। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে অসহ্য করে তুলেছে। তাই আবার এসে গোলামকে বললাম, উমরের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করো। সে গেল এবং ফিরে এসে বলল, আমি তাঁর কাছে আপনার কথা বলেছি, কিন্তু তিনি নিরুত্তর রয়েছেন। আমি আবার ফিরে এসে মিম্বরের নিকট উপবিষ্ট লোকদের সাথে বসলাম। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে অসহ্য করে তুলল। ফলে আমি আবারও এসে গোলামকে বললাম, উমরের জন্য প্রবেশের অনুমতি চাও। সে গেল এবং ফিরে এসে বলল, আমি আপনার কথা উল্লেখ করেছি, কিন্তু তিনি কোন উত্তর দেননি।
অবশেষে যখন আমি ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি, এমন সময় সে আমাকে ডেকে বলল, নবী আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ এর নিকট প্রবেশ করলাম, তিনি খেজুর পাতার চাটাইয়ের উপরে শুয়ে আছেন এবং তাতে কোন চাদর বিছানো ছিল না। তাঁর শরীরে চাটাইয়ের দাগ স্পষ্ট হয়ে রয়েছে এবং তিনি খেজুর গাছের পাতা ভর্তি একটি বালিশে ভর দিয়ে আছেন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম এবং দাঁড়ানো অবস্থাতেই বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আপনার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়েছেন? তিনি আমার দিকে চোখ ফিরিয়ে বললেন, না। আমি বললাম, আল্লাহু আকবার!
এরপর আমি দাঁড়ানো অবস্থাতেই পরিবেশ হালকা করার লক্ষ্যে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি মেহেরবানী করে আমার কথার দিকে একটু মনোযোগ দিতেন। আমরা কুরাইশরা নারীদের উপর দাপট খাটাতাম। কিন্তু আমরা মদিনায় আসার পর দেখলাম যে, এখানকার নারীরা পুরুষদের অধীন করে রেখেছে। (এ কথা শুনে) নবী মুচকি হাসলেন। অতঃপর আমি আবার বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি আমার কথা একটু খেয়াল করে শুনতেন। তারপর বললাম, আমি হাফসার নিকট গেলাম এবং তাকে বললাম, তুমি তোমার সঙ্গীনীর (আয়েশার) অনুকরণে অভিমানী হয়ো না।
সে তোমার চেয়ে অধিক রূপবতী এবং নবী এর নিকট অধিক প্রিয়। নবী আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় মুচকি হাসলেন। আমি তাঁকে হাসতে দেখে বসে পড়লাম। এরপর আমি তাঁর ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম। আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর ঘরে তিনটি চামড়া ব্যতীত উল্লেখযোগ্য কিছুই দেখতে পেলাম না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি দু'আ করুন, যাতে আল্লাহ আপনার উম্মতকে ধনসম্পদ দান করেন। কেননা পারস্য এবং রোমকদের (যথেষ্ট) পরিমাণের ধনসম্পদ দেয়া হয়েছে। অথচ তারা আল্লাহর ইবাদাত করে না। (এ কথা শুনে) নবী সোজা হয়ে বসলেন, (এতক্ষণে) তিনি ঠেস দিয়ে বসা ছিলেন, অতঃপর বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র! এটা কি তোমার অভিমত? এরা হচ্ছে সেসব লোক, যারা তাদের ভাল কাজের বিনিময় এ দুনিয়ায় পাচ্ছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ক্ষমার জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করুন। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এভাবে নবী ২৯ দিন পর্যন্ত তাঁর স্ত্রীগণ থেকে পৃথক থাকেন। কেননা ইতিপূর্বে রাসূলুল্লাহ হাফসা (রাঃ)-কে একটি কথা গোপন রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি সে কথা আয়েশা (রাঃ) এর নিকট বলে দেন। অতঃপর যখন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে মৃদু ভর্ৎসনা করলেন, তখন তাদের প্রতি রাগের কারণে নবী আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, আমি এক মাসের জন্য তাদের (স্ত্রীগণের) নিকট যাব না। সুতরাং ২৯ দিন হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সর্বপ্রথম আয়েশার কাছে গেলেন। তখন আয়েশা (রাঃ) তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কসম করেছেন যে, এক মাসের মধ্যে আমাদের নিকট আসবেন না, কিন্তু এখন ২৯ দিন হয়েছে মাত্র। আমি দিনগুলো এক এক করে হিসাব করে রেখেছি। নবী বলেন, ২৯ দিনেও মাস হয়। বর্ণনাকারী বলেন, ঐ মাসটি ছিল ঊনত্রিশ দিনের। আয়েশা (রাঃ) আরো বলেন, তখন আল্লাহ তা'আলা (নবীর সাথে থাকা বা না থাকার) ইখতিয়ার সম্বলিত আয়াত অবতীর্ণ করলেন এবং তিনি স্ত্রীগণের মধ্যে সর্বপ্রথম আমাকে দিয়েই আরম্ভ করেন। আর আমি নবীকেই গ্রহণ করলাম। অতঃপর তিনি সকল স্ত্রীকেই ইখতিয়ার দিলেন এবং প্রত্যেকেই তাই বলল, যা আয়েশা (রাঃ) বলেছিলেন। ১১৪ সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লাম
মুনাফিকদের চক্রান্ত ও মসজিদে যেরার নির্মাণ: এদিকে মুনাফিকরাও অনবরত তাদের চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছিল। যদিও তারা ভালো করেই জানত যে, তাদের সকল প্রকার চক্রান্ত রাসূলুল্লাহ এর কাছে ব্যর্থ। এরপরও তারা মুসলিমদের এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে নিজেদের চক্রান্ত পরিচালনার জন্য একটি নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ফলে তারা পরিকল্পনা মোতাবেক নামায আদায়ের সহজতার অজুহাত দেখিয়ে তাদের এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি প্রার্থনা করে। আর যেহেতু এ কঠিন পরিস্থিতিতে তাদেরকে নিয়ে পৃথকভাবে ভাবার সময় ছিল না, তাই তিনিও স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদেরকে অনুমতি দিয়ে দেন। অতঃপর তারা মসজিদ নির্মাণ করে উদ্বোধনের জন্য রাসূলুল্লাহ -কে দাওয়াত দিলে তিনি যুদ্ধের অজুহাতে তাদেরকে এড়িয়ে যান।
যুদ্ধের জন্য মুসলিমদের প্রস্তুতি : রাসূলুল্লাহ এসব সংকটময় পরিস্থিতি খুব মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিলেন এবং প্রয়োজন অনুসারে মুসলিমদেরকে নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি যখন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছিল এমনি মুহূর্তে একদিন রাসূলুল্লাহ সাহাবায়ে কেরামকে রোমানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করার নির্দেশ দেন এবং মক্কার বিভিন্ন গোত্র ও অধিবাসীদেরকে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সংবাদ প্রেরণ করেন।
এদিকে যেহেতু সে সময়টি ছিল খুবই সংকটময়, ফলে অনেকের কাছেই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য আরোহী পর্যন্তও ছিল না। যার কারণে অনেকেই রাসূলুল্লাহ এর কাছে আরোহী অথবা অস্ত্রের জন্য আবেদন করতেন। অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা সাদাকার ফযীলত বর্ণনা করে আয়াত নাযিল করেন। ফলে সাহাবীগণ উৎসাহিত হয়ে সাদাকার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ সামর্থানুযায়ী সর্বোচ্চ পরিমাণ সাদাকা করতে থাকেন। এমনকি মহিলারাও তাদের ব্যবহৃত অলংকার সাদাকা করতে থাকে। এ সময় কেবল উসমান (রাঃ) ১ হাজার স্বর্ণমুদ্রা, ৯০০ উট এবং ১০০ ঘোড়া দান করেছিলেন। ১১৫ উমর (রাঃ) দান করেছিলেন তার সম্পূর্ণ সম্পত্তির অর্ধেক এবং আবু বকর (রাঃ) দান করেছিলেন তার সমস্ত সম্পদ, যদিও তা ছিল পরিমাণে অন্যদের থেকে অনেক কম। ১১৬
এছাড়াও আব্বাস, তালহা, সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস ও মুহাম্মাদ বিন মাসলামা (রাঃ) সহ প্রায় সাহাবীই এ সাদাকায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমনকি কোন কোন সাহাবী এক মুদ অথবা দুই মুদ পরিমাণও সম্পদ সাদাকা করেন। সে সময় কেবল মুনাফিকরাই কোন প্রকার দান-সাদাকায় অংশগ্রহণ করেনি; বরং উল্টো তারা দান-সাদাকার কারণে কতক সাহাবীকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছিল।
তাবুকের পথে যাত্রা:
প্রস্তুতি শেষে রাসূলুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা (রাঃ)-কে মদিনার গভর্নর নিযুক্ত করে তাবুকের পথে যাত্রা শুরু করেন। আর নিজ পরিবারের দেখাশোনা করার জন্য আলী (রাঃ)-কে মদিনায় রেখে যান। এ সময় মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। ইতিপূর্বে কোন যুদ্ধে এত বেশি সংখ্যক সৈন্য একত্রিত হয়নি। ব্যাপক প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও যাত্রাপথে মুসলিমগণকে চরম খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কোন কোন সময় তাঁদেরকে গাছের পাতা খেয়েও সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। তাবুকের পথে যাত্রার সময় মুসলিমদেরকে সামুদ জাতির বসবাসের এলাকা দিয়ে গমন করতে হয়েছিল। তখন তাঁরা আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে সে এলাকা অতিক্রম করেছিলেন। ১১৭ যাত্রাপথে রাসূলুল্লাহ যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশার নামায একত্রে আদায় করেছিলেন। ১১৮
তাবুকের বুকে মুসলিম শিবির :
এভাবে মুসলিমগণ তাবুকে গিয়ে অবতরণ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ আলাইহি সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন। এতে মুসলিমগণ নিজেদের সংকটের কথা ভুলে গিয়ে যুদ্ধের জন্য আরো তৎপর হয়ে উঠেন। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ আলাইহি ও তাঁর বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে শত্রু বাহিনীর মনে চরম ভীতি সঞ্চার হয়। ফলে তারা যুদ্ধ করার সাহস হারিয়ে ফেলে এবং বিক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
বিভিন্ন গোত্রের সাথে সন্ধিচুক্তি:
মুসলিম বাহিনীর আগমন এবং রোমান বাহিনীর পিছু হটার কারণে আশেপাশের গোত্রগুলো রোমান শক্তির উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। ফলে তারা রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর সাথে সন্ধিচুক্তি করার জন্য এগিয়ে আসে। আয়লার গভর্নর ইয়াহনাহ বিন রুবা রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর কাছে উপস্থিত হয়ে কর দানের স্বীকৃতি জ্ঞাপন পূর্বক সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করে। জারবা ও আজরুহ এর অধিবাসীরা অনুরূপ চুক্তি সম্পাদন করে এবং রাসূলুল্লাহ এর কাছ থেকে লিখিত প্রমাণপত্র গ্রহণ করে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর নেতৃত্বে ৪২০ জন সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দুমাতুল জান্দালের শাসক উকাইদকে আটক করে আনেন এবং তার কাছ থেকে নগদ সম্পদ গ্রহণ পূর্বক সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য করেন।
মদিনায় প্রত্যাবর্তন: এভাবে রাসূলুল্লাহ পূর্ণ পঞ্চাশ দিন অতিবাহিত করার পর কোন ধরনের সংঘর্ষ ও রক্তক্ষয় ছাড়াই মদিনার দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। পথিমধ্যে মুনাফিকরা সুযোগ পেয়ে রাসূলুল্লাহ -কে হত্যা করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা করে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের পরিচয় ফাঁস করে দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ যখন মদিনায় পৌঁছলেন, তখন মহিলা ও কিশোররা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নানা ধরনের কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানান।
উল্লেখ্য যে, এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ এর জীবনের শেষ যুদ্ধ, যাতে তিনি স্বশরীরে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
মসজিদে যেরার ধ্বংসকরণ: রাসূলুল্লাহ যখন সাহাবীদেরকে নিয়ে তাবুক যুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন, তখন মুনাফিকরা তাদের এলাকায় নির্মিত মসজিদে বসে ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তে নেমে পড়ে এবং নিজেদের মধ্যে জোট গঠন করতে শুরু করে। তাদের এহেন কুকর্ম ধূলিসাৎ করে দেয়ার জন্য তাবুক যুদ্ধ থেকে মদিনায় প্রত্যাবর্তনের পথে 'যী আওয়ান' নামক স্থানে পৌঁছলেই আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের ব্যাপারে নির্দেশনা সম্বলিত আয়াত নাযিল করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَارْصَادًا لِمَنْ حَارَبَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ مِنْ قَبْلُ وَلَيَحْلِفُنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ - لَا تَقُمْ فِيْهِ أَبَدًا لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُوْمَ فِيْهِ فِيْهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَهِّرِينَ
যারা (মুসলিমদের) ক্ষতিসাধন, কুফরী ও মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ইতিপূর্বে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে তার গোপন ঘাঁটিস্বরূপ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে মসজিদ নির্মাণ করেছে, অবশ্যই তারা শপথ করে বলবে যে, আমরা সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই এটা (নির্মাণ) করেছি; (কিন্তু) আল্লাহ সাক্ষী যে, নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী। তুমি কখনো তাতে (সালাতে) দাঁড়িও না; যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন হতেই তাকওয়ার উপর স্থাপিত হয়েছে, সেটাই তোমার সালাতের জন্য অধিক যোগ্য। সেখানে এমন লোক রয়েছে, যারা পবিত্রতা অর্জন করতে ভালোবাসে; আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে পছন্দ করেন। (সূরা তওবা- ১০৭, ১০৮)
ফলে রাসূলুল্লাহ সাথে সাথেই কয়েকজন সাহাবীকে দায়িত্ব দিয়ে মদিনায় প্রেরণ করে তাদের নির্মিত সেই মসজিদটি ধূলিসাৎ করে দেন।
পেছনে পড়ে যাওয়া লোকদের শাস্তি:
তাবুক যুদ্ধ ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে চরম পরীক্ষার একটি যুদ্ধ। যদিও এ যুদ্ধে কোন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয় নাই, তবুও আল্লাহ তা'আলা ঈমানদার ব্যক্তিদেরকে সুস্পষ্টভাবে যাচাই করে নিয়েছিলেন। ফলে যাদের অন্তরে সামান্য কপটতা ছিল, তাদের বিষয়গুলো প্রকাশ পেয়ে গেল। কিন্তু তিনজন সাহাবী এমন ছিলেন যে, তাদের ঈমানের মধ্যে কোন ধরনের ত্রুটি ছিল না, এরপরও সামান্য কারণে তারা পেছনে পড়ে গিয়েছিলেন। ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদের তওবা কবুলের ব্যাপারে কিছুটা বিলম্ব করেন। নিম্নে সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনাটি বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো : কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যতগুলো যুদ্ধ করেছেন, তন্মধ্যে তাবুক ও বদর ছাড়া আর কোনটাতেই আমি অনুপস্থিত থাকিনি। তবে বদর যুদ্ধে যারা পেছনে থেকে গিয়েছিলেন, তাদের কারো উপর আল্লাহর আক্রোশ পতিত হয়নি। বদর যুদ্ধে মূলত রাসূলুল্লাহ এর উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশ কাফিলার পশ্চাদ্ধাবন করা (যুদ্ধের উদ্দেশ্য নয়)। তবে হঠাৎ আল্লাহ তা'আলা মুসলিমদেরকে তাদের শত্রুর মুখোমুখি করে দেন, যাতে করে যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
আর লাইলাতুল আকাবায় (আকাবার রাতে) আমি রাসূলুল্লাহ এর সাথে উপস্থিত ছিলাম। তিনি ইসলামের উপর সুদৃঢ়ভাবে কায়িম থাকার জন্য আমাদের কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করেন। যদিও বদর যুদ্ধ লোকদের কাছে বহুল আলোচিত, তবুও আকাবার রাত আমার কাছে অধিক প্রিয়।
আর তাবুক যুদ্ধে পিছিয়ে থাকার কারণস্বরূপ বলা যায়, এ যুদ্ধের সময় আমি (অন্য সময়ের চেয়ে) বেশি শক্তিশালী ও সচ্ছল অবস্থায় ছিলাম। আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে আমার কাছে কখনো এক সাথে দুটি সওয়ারী ছিল না। অথচ এ যুদ্ধের প্রাক্কালে আমি দুটি সওয়ারীর মালিক হয়ে গিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ এর নিয়ম ছিল, যখনই তিনি কোন যুদ্ধের সংকল্প করতেন, কখনো পরিষ্কারভাবে সে যুদ্ধের স্থান, এলাকা ও কোন নিদর্শন জানাতেন না (বরং কিছু অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থক শর্ত বলে দিতেন), কিন্তু এ যুদ্ধের সময় ভীষণ গরম ছিল এবং পথ ছিল সুদীর্ঘ। আর স্থানটি ছিল পানি, গাছ-পালা ও লতা-পাতা শূন্য। শত্রুর সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। কাজেই রাসূলুল্লাহ এ যুদ্ধ সম্পর্কে মুসলিমদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন, যাতে তারা ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে। এ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ এর সাথে বিপুল সংখ্যক মুসলিম সেনা অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে কোন কিতাব অথবা রেজিষ্ট্রার খাতা ছিল না, যার মধ্যে সবার নাম লিপিবদ্ধ রাখা হত।
কা'ব (রাঃ) বলেন, এ যুদ্ধ থেকে অনুপস্থিত থাকার ইচ্ছা পোষণ করে এমন একটি লোকও ছিল না। তবে সাথে সাথে তারা এও মনে করত, কেউ যদি এ যুদ্ধে অনুপস্থিত থেকে যায়, তাহলে আল্লাহর ওহী না আসা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ জানতে পারবেন না। এ যুদ্ধের প্রস্তুতি রাসূলুল্লাহ এমন এক সময় শুরু করেন, যখন ফল পেকে গিয়েছিল এবং ছায়ায় বসা আরামদায়ক মনে হত। রাসূলুল্লাহ এবং তাঁর সাথে থাকা মুসলিমগণ ব্যাপকভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
অন্যদিকে আমি প্রতিদিন সকালে তাদের সাথে প্রস্তুতি নেয়ার কথা চিন্তা করতাম। সারাদিন চলে যেত, কিন্তু কিছুই করতাম না। আমি মনে মনে বলতাম, আমি তো যে কোন সময় প্রস্তুত হওয়ার ক্ষমতা রাখি। কাজেই এত তাড়াহুড়া কিসের? এভাবে দিন অতিবাহিত হয়ে চলল।
একদিন সকালে রাসূলুল্লাহ মুসলিমদেরকে নিয়ে রওয়ানা দিলেন। অথচ তখনো কোন প্রকার প্রস্তুতি আমি নেইনি। আমি মনে মনে বললাম, এই তো দু'এক দিনের মধ্যে প্রস্তুতি নিয়ে পথিমধ্যে তাঁদেরকে ধরে ফেলব। তাই তাঁদের রওয়ানা হয়ে যাওয়ার পর দিন সকালে আমি যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে চাইলাম, কিন্তু দিন চলে গেল, আমি প্রস্তুতি নিতে পারলাম না। দিনের পর দিন আমার এ অবস্থা চলতে থাকল। এখন তো সবাই অনেক দূরে চলে গেছে। আমি কতবার ইচ্ছা করলাম যে, বের হয়ে আমি তাঁদেরকে ধরে ফেলি। আহা! যদি এমনটি করতাম, তাহলে কতই না ভালো হত, কিন্তু তা আমার ভাগ্যে ছিল না।
রাসূলুল্লাহ এর চলে যাওয়ার পর আমি যখন শহরের লোকদের মাঝে বের হতাম, তখন পথে-ঘাটে কেবল মুনাফিকদেরকে অথবা দুর্বল হওয়ার কারণে আল্লাহ যাদেরকে অক্ষম করে দিয়েছেন তাদেরকে দেখতে পেতাম। এদের ছাড়া আর কাউকে আমি পথে-ঘাটে দেখতাম না। তখন আমার মনে ভীষণ দুঃখ হত।
এ দিকে রাসূলুল্লাহ পথে কোথাও আমার কথা জিজ্ঞেস করলেন না। তবে তাবুকে পৌঁছে যখন সবাইকে নিয়ে বসলেন, তখন আমার কথা জিজ্ঞেস করে বললেন, কা'ব ইবনে মালিকের কী হলো? বনু সালামার জনৈক ব্যক্তি [আবদুল্লাহ ইবনে আনাস (রাঃ)] বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! নিজের সৌন্দর্যের প্রতি মোহ ও অহংকার তাকে আটকে দিয়েছে। মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) বললেন, তুমি তো ভালো কথা বললে না। আল্লাহর কসম! আমরা তার ব্যাপারে ভালো ছাড়া আর কিছুই জানি না। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ চুপ করে রইলেন।
কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, যখন আমি জানতে পারলাম, রাসূলুল্লাহ তাবুক যুদ্ধ হতে (বিজয়ীবেশে) ফিরে আসছেন। তখন আমি মনে মনে চিন্তা করতে লাগলাম, এমন কোন মিথ্যা বাহানা করা যায় কি না, যাতে আমি তাঁর ক্রোধ থেকে বাঁচতে পারি। এ উদ্দেশ্যে আমি পরিবারের বুদ্ধিমান লোকদের পরামর্শ চাইলাম, কিন্তু যখন শুনলাম, রাসূলুল্লাহ মদিনার একেবারে নিকটে এসে গেছেন, তখন আমার মন থেকে মিথ্যা বাহানাবাজি করার চিন্তা একেবারে উড়ে গেল। আমি বিশ্বাস করলাম, মিথ্যা বাহানাবাজি আমাকে তাঁর ক্রোধ থেকে বাঁচাতে পারবে না। কাজেই আমি সত্য কথা বলতে মনস্থ করলাম।
আলাইহি ওয়াসাল্লাম
সান্তায়ার ওয়াসাল্লাম
অতঃপর একদিন সকালে রাসূলুল্লাহ মদিনায় পৌঁছে গেলেন। তাঁর নিয়ম ছিল, যখনই তিনি কোন সফর থেকে ফিরে আসতেন, প্রথমে মসজিদে নববীতে যেতেন। সেখানে দু'রাক'আত নামায পড়তেন, তারপর লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বসে থাকতেন।
অয়াসাল্লাম
নিজের নিয়মানুসারে যখন তিনি মসজিদে উপস্থিত হয়ে নামায শেষে বসে গেলেন, তখন তাবুক যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকা লোকেরা আসতে লাগল, নিজেদের ওজর পেশ করতে লাগল এবং কসম করতে লাগল। এদের সংখ্যা ছিল ৮০ এর চেয়েও কিছু বেশি। রাসূলুল্লাহ তাদের ওজর কবুল করে তাদের কাছ থেকে পুনরায় বাই'আতও নিলেন। তাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করলেন এবং তাদের মনের গোপন বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করলেন।
আলাইহি
কা'ব বলেন, এ সময় আমি তাঁর কাছে আসলাম। আমি সালাম দিতেই মুচকি হেসে তিনি জবাব দিলেন। তারপর বললেন, আসো আসো! আমি গিয়ে তাঁর সামনে বসে পড়লাম। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, তোমাকে কিসে পেছনে আটকে রেখেছিল? তুমি সওয়ারী কিনেছিলে? আমি বললাম, আমি অবশ্যই সওয়ারী কিনেছিলাম। তবে আল্লাহর কসম! যদি আমি আপনাকে ছাড়া দুনিয়ার অন্য কোন লোকের সামনে বসতাম, তাহলে তার ক্রোধ থেকে বাঁচার জন্য কোন মিথ্যা ওজর পেশ করে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতাম। কেননা কথা বলার ব্যাপারে আমি কম পারদর্শী নই; কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি জানি, আজ যদি আমি মিথ্যা বলে আপনাকে খুশি করে যাই, তাহলে কাল আল্লাহ আপনাকে আমার উপর অসন্তুষ্টি করে দেবেন। আর আজ যদি আমি আপনার সামনে সত্য কথা বলে যাই, তাতে আপনি অসন্তুষ্টি হলেও, আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা লাভের আশা আছে। তাই আমি সত্য কথা বলছি। আল্লাহর কসম! পিছিয়ে থাকার ব্যাপারে আমার কোন ওজর ছিল না। আল্লাহর কসম! আমি যখন আপনাদের থেকে পেছনে থেকে যাই, তখনকার মতো আর কোন সময় আমি ততটা শক্তি সামর্থের অধিকারী ছিলাম না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বললেন, কা'ব সত্য কথাই বলেছে। ঠিক আছে, এখন চলে যাও। দেখি, আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কী ফায়সালা দেন।
আলাইহি
কা'ব বলেন, আমি উঠে পড়লাম। বানু সালামার লোকেরাও আমার সাথে সাথে চলে আসলো। তারা আমাকে বলল, আল্লাহর কসম! আমরা তো এ পর্যন্ত তোমার কোন গুনাহের কথা জানি না। পেছনে থেকে যাওয়া অপরাপর লোকদের মতো তুমিও রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে একটা বাহানা উপস্থাপন করতে পারলে না? তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ইস্তিগফার তোমার গুনাহের জন্য যথেষ্ট হত? আল্লাহর কসম! তারা বার বার আমাকে উসকানি দিতে থাকল। এমনকি এক পর্যায়ে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে ফিরে আসতে এবং আমার প্রথম কথা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে মনস্থ করলাম।
তারপর আমি তাদেরকে বললাম, আচ্ছা! আমার মতো ভুল স্বীকার করেছে, এমন আর কাউকে কি তোমরা সেখানে দেখেছ? তারা জবাব দিল, হ্যাঁ-দু'জন লোককে আমরা দেখেছি, তারাও তোমার মতোই বলেছে। আর তাদেরকেও ঠিক সে কথাই বলা হয়েছে, যা তোমাকে বলা হয়েছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা তারা কারা? তারা জবাব দিলেন, তারা দু'জন হচ্ছেন মুররাহ ইবনে রাবী 'আল-আমাবী এবং হিলাল ইবনে উমাইয়াহ আল-ওয়াকিফী। তারা আমার কাছে এমন দু'জন লোকের কথা বলল, যারা ছিলেন সৎ এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও আদর্শস্থানীয় ব্যক্তি। তাদের দু'জনের কথা যখন তারা আমাকে শোনাল (তখন আমি মনে মনে স্বস্তি অনুভব করলাম), তারপর আমি চলতে শুরু করলাম।
এদিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাবুক যুদ্ধে পেছনে থেকে যাওয়া আমাদের এ তিন জনের সাথে কথাবার্তা বলা সকল মুসলিমের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিলেন। কাজেই লোকেরা আমাদেরকে এড়িয়ে চলতে লাগল। মনে হচ্ছে তারা যেন আমাদেরকে একেবারেই চেনেন না। অবশেষে আমার এমন মনে হতে লাগল, যেন দুনিয়ার সবকিছু বদলে গেছে। এভাবে আমাদের উপর দিয়ে পঞ্চাশটি রাত অতিবাহিত হয়ে গেল। আমার অন্য ভাই দু'টি তো ঘরেই বসে রইলেন এবং কান্নাকাটি করতে লাগলেন। তবে আমি ছিলাম যুবক ও সাহসী। তাই আমি বাইরে বের হতাম, মুসলিমদের সাথে নামাযে যোগ দিতাম ও বাজারে ঘুরাফেরা করতাম; কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলতেন না।
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে আসতাম। তিনি নামাযের পর মজলিসে বসতেন। আমি তাঁকে সালাম দিতাম। আমি মনে মনে বলতাম, আমার সালামের জবাবে তাঁর ঠোঁট নড়ল কি নড়ল না। তারপর আমি তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে নামায পড়তাম। আমি বাঁকা দৃষ্টিতে লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁকে দেখতাম। আমি দেখতাম, যখন আমি নামাযে নিমগ্ন থাকি তখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আমি যখন তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন চলে গেল।
এভাবে লোকদের বিমুখতা আমাকে দিশেহারা করে তুলল। তাই একদিন আমার চাচাত ভাই আবু কাতাদার বাগানের দেয়াল টপকে তার কাছে গেলাম। সে ছিল আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। আমি তাকে সালাম দিলাম, কিন্তু আল্লাহর কসম! সে আমার সালামের জবাব দিল না। আমি তাকে বললাম, হে আবু কাতাদা! আল্লাহর দোহাই দিয়ে আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কি জান না, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসি? সে চুপ করে থাকল। আমি আবার আল্লাহর নামে কসম খেয়ে তাকে এ প্রশ্ন করলাম। এবার সে জবাব দিল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। এ সময় আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। আমার দু'চোখ থেকে অঝোর ধারায় পানি পড়তে থাকল। অতঃপর আমি দেয়াল টপকে ফিরে এলাম।
একদিন আমি মদিনার বাজারে হাঁটছিলাম। তখন সিরিয়ার জনৈক খ্রিস্টান কৃষক মদিনার বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রয় করতে এসেছিল। সে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করছিল, কে আমাকে কা'ব ইবনে মালিকের ঠিকানা বলে দিতে পারবে? লোকেরা তাকে ইশারা করে আমাকে দেখিয়ে দিল। অতঃপর সে আমার কাছে এসে গাসসানের রাজা কর্তৃক প্রেরিত একটি চিঠি দিল। চিঠিতে রাজা লিখেছে, আমি জানতে পেরেছি, আপনার নেতা আপনার উপর নির্যাতন চালাচ্ছেন। অথচ আল্লাহ আপনাকে লাঞ্চনা ও অবমাননাকর অবস্থায় রাখেননি। আপনি আমাদের এখানে চলে আসুন, আমরা আপনাকে মর্যাদা ও আরামের সাথে রাখব। চিঠিখানা পড়ে আমি মনে মনে বললাম, এটা আর এক পরীক্ষা। কাজেই পত্রটি আমি তন্দুরের আগুনে নিক্ষেপ করলাম। এভাবে পঞ্চাশদিনের মধ্যে চল্লিশদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। এ সময় রাসূলুল্লাহ এর বার্তাবাহক আমার কাছে এসে বললেন, রাসূলুল্লাহ্ তোমাকে স্ত্রী থেকেও পৃথক হয়ে যাওয়ার আদেশ করেছেন। আমি বললাম, আমি কি তাকে তালাক দেব? তিনি বললেন, না- তুমি তাকে তালাক দেবে না; তবে তার থেকে আলাদা থাকো। তখন আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি নিজের আত্মীয়দের কাছে চলে যাও। আল্লাহ আমার ব্যাপারে কোন ফায়সালা না দেয়া পর্যন্ত তাদের সাথে অবস্থান করো। এদিকে আমার অন্য দু'জন সাথির কাছেও এ মর্মে বার্তাবাহক পাঠানো হয়।
কা'ব বলেন, হিলাল ইবনে উমাইয়া (রাঃ) এর স্ত্রী (এ খবর পাওয়ার পর) রাসূলুল্লাহ এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! হিলাল ইবনে উমাইয়া অতি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছে। তার কোন খাদেম নেই। যদি আমি তার খেদমত করি ও তার কাজে সহায়তা করি, তাহলে কি কোন ক্ষতি আছে? তিনি জবাব দিলেন, না- কোন ক্ষতি নেই। তবে সে যেন তোমার কাছে না আসে। হিলাল ইবনে উমাইয়ার স্ত্রী বললেন, আল্লাহর কসম! তার মধ্যে এ
ধরনের কোন আকাঙ্ক্ষা-আকর্ষণ নেই। বরং যেদিন থেকে এ ঘটনা ঘটেছে, সেদিন থেকে সে কেঁদেই চলেছে, আজও কাঁদছে।
কা'ব বলেন, আমাকেও আমার পরিবারের কেউ কেউ বলল, তুমি রাসূলুল্লাহ এর কাছে যাও, অনুমতি নিয়ে আসো, যাতে তোমার স্ত্রী তোমার খেদমত করতে পারে, যেমন হিলাল ইবনে উমাইয়ার স্ত্রী স্বামীর খেদমতের অনুমতি নিয়ে এসেছে। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহ এর কাছ থেকে কোন অনুমতি আনতে যাব না। জানি না, আমি যখন এ ব্যাপারে অনুমতি চাইব, তখন রাসূলুল্লাহ কী বলবেন? কারণ আমি একজন যুবক।
এভাবে আরো দশ রাত অতিবাহিত হয়ে পঞ্চাশতম রাত্রিও অতিবাহিত হয়ে গেল। অতঃপর আমি পরের দিন সকালে ফজরের সালাত আদায় করলাম। তারপর আমি ঘরের সামনে বসে ছিলাম। আমার মনের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। মনে হচ্ছিল, জীবন ধারণ আমার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। পৃথিবী যেন তার সমস্ত বিস্তীর্ণতা ও প্রশস্ততা সত্ত্বেও আমার জন্য অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এমন সময় আমি 'সালআ' পাহাড়ের উপর থেকে একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম- কে একজন যেন খুব জোরে চিৎকার করে বলছেন, হে কা'ব ইবনে মালিক! সুসংবাদ গ্রহণ করো। কা'ব বলেন, আমি তখনই আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হলাম। আমি বুঝতে পারলাম, এবার আমার সংকট কেটে গেছে। এদিকে রাসূলুল্লাহ ফজরের নামাযের পর ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, আল্লাহ আমাদের তওবা কবুল করেছেন। কাজেই লোকেরা মুবারকবাদ দেয়ার জন্য আমার কাছে আসতে লাগল। একইভাবে আমার অন্য দু' সাথির কাছেও তারা যেতে লাগল। একজন তো ঘোড়ায় চড়ে এক দৌড়ে আমার কাছে আসলেন। আর আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তি দৌড়ে পাহাড়ের উপর উঠলেন। তার কথা অশ্বারোহীর চেয়ে দ্রুততর হল। তার সুসংবাদ শুনে আমি এতই খুশি হয়েছিলাম যে, আমার পোশাক জোড়া খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম।
আল্লাহর কসম! তখন আমার কাছে ঐ পোশাক জোড়া ছাড়া আর কোন পোশাক ছিল না। তারপর আমি এক জোড়া পোশাক ধার করে নিলাম এবং তা পরিধান করে রাসূলুল্লাহ এর সাথে সাক্ষাৎ করতে বের হয়ে পড়লাম। পথে দলে দলে লোকেরা আমার সাথে সাক্ষাৎ করছিল আর তওবা কবুল হওয়ার জন্য মুবারকবাদ দিচ্ছিল। তারা বলছিল, তওবা কবুল করে আল্লাহ যে তোমাকে পুরস্কৃত করেছেন, এজন্য তোমাকে মুবারকবাদ।
কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, এভাবে অগ্রসর হয়ে আমি অবশেষে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলাম। সেখানে রাসূলুল্লাহ বসা ছিলেন। তাঁর চারদিকে লোকেরা ঘিরে বসে ছিল। তালহা ইবনে 'উবাইদুল্লাহ (রাঃ) আমাকে দেখে দৌড়ে এসে মুসাফাহা করলেন এবং মুবারকবাদ দিলেন। সাল্লাল্লাহ ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহ
মুহাজিরদের মধ্য থেকে কেউ এভাবে আমাকে মুবারকবাদ দেয়নি। আল্লাহ সাক্ষী, আমি কোন দিন তাঁর ইহসান ভুলব না। কা'ব (রাঃ) বলেন, তারপর আমি রাসূলুল্লাহ-কে সালাম করলাম। তখন খুশিতে তাঁর চেহারা মুবারক উজ্জল হয়ে উঠেছিল। তিনি বললেন, হে কা'ব! আজকের দিনটি তোমার জন্য মুবারক হোক, যা তোমার জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত অতিক্রান্ত দিনগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আমি উত্তরে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এ ক্ষমা আপনার পক্ষ থেকে না মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। তিনি বললেন, না; এ তো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর রাসূলুল্লাহ যখন খুশি হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠত। আমরা চেহারা দেখে তাঁর খুশি বুঝতে পারতাম। তারপর আমি রাসূলুল্লাহ এর সামনে বসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তওবা কবুল হওয়ায় আমার সমস্ত ধনসম্পদ আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথে সাদাকা করে দিতে চাই। রাসূলুল্লাহ বললেন, তোমার সম্পদের কিছু অংশ নিজের জন্য রেখে দাও, তাতে মঙ্গল হবে। আমি বললাম, তাহলে আমি শুধু খাইবারের অংশটুকু আমার জন্য রেখে বাকি সব আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথে দান করলাম। তারপর বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ এবার সত্য কথা বলার কারণে আমাকে নাজাত দিয়েছেন। এ তওবা কবুল হওয়ার কারণে জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতে আমি সর্বদা সত্য কথাই বলতে থাকব। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আমি জানি না, রাসূলুল্লাহ এর কাছে সত্য কথা বলার কারণে সে দিন থেকে আজ পর্যন্ত আল্লাহ আমার প্রতি যে মেহেরবানী করেছেন, তেমনটি আর কোন মুসলিমের উপর করেছেন কি না। আর রাসূলুল্লাহ এর কাছে সত্য কথা বলার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি আর কখনো স্বজ্ঞানে মিথ্যা বলিনি। জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতে মহান আল্লাহ আমাকে মিথ্যা থেকে বাঁচাবেন বলে আমি আশা রাখি। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের উপর নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেছেন, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
﴿لَقَدْ تَابَ اللهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِيْنَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوْبُ فَرِيقٍ مِنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَحِيمٌ - وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَّا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
আল্লাহ অনুগ্রহপরায়ণ হলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা সংকটকালে তার অনুসরণ করেছিল- এমনকি যখন তাদের এক দলের অন্তর বক্র হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পরে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করলেন; নিশ্চয় তিনি তাদের প্রতি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিনজনকে, যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল; যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সেটা সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিসহ হয়ে পড়েছিল। তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি তাদের তওবা কবুল করে নিলেন, যাতে তারা তওবায় স্থির থাকে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা তাওবা : ১১৭, ১১৮)
আল্লাহর কসম, ইসলাম গ্রহণ করার পর এর চেয়ে বড় আর কোন অনুগ্রহ আমার উপর হতে দেখিনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে সত্য বলার তাওফীক দান করে আমাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে। অন্যথায় অন্যান্য মিথ্যাবাদীদের মতো আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম।
কা'ব বলেন, আমরা তিনজন সে সব লোক থেকে আলাদা, যারা তাদের সাথে (যুদ্ধে) না যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বাহানা পেশ করেছিল, মিথ্যা হলফ করেছিল। রাসূলুল্লাহ তাদের কথা মেনে নিয়ে তাদেরকে বাই'আত করে মাগফিরাতের দু'আ করেছিলেন। কিন্তু আমাদের ব্যাপার তিনি আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহই ফায়সালা দিয়েছেন।
যেমন- আল্লাহ তা'আলা বলেন, সে তিনজন, যারা পেছনে রয়ে গিয়েছিল (আল্লাহ তাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন) কিন্তু এ তিনজন ব্যতীত আর যারা জেনে বুঝে জিহাদ থেকে পেছনে রয়ে গিয়েছিল, তাদের কথা এখানে বলা হয়নি, বরং এখানে কেবল আমাদের (তিনজনের) কথাই বলা হয়েছে। আর যারা হলফ করেছিল, ওজর পেশ করেছিল এবং তাদের ওজর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেনে নিয়েছিলেন, তাদের থেকে আমাদের সম্পর্কে ফায়সালা পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল। ১১৯
টিকাঃ
১১৪ সহীহ বুখারী, হা/৫১৯১।
১১৫ মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৬৪৯; তিরমিযী, হা/৩৭০১; মিশকাত, হা/৬০৬৪।
১১৬ তিরমিযী, হা/৩৬৭৫; আবু দাউদ, হা/১৬৭৮; মিশকাত, হা/৬০২১।
১১৭ সহীহ বুখারী, হা/৪৪১৯; সহীহ মুসলিম, হা/২৯৮০; মিশকাত, হা/৫১২৫।
১১৮ সহীহ মুসলিম, হা/৭০৫; আবু দাউদ, হা/১২০৮; তিরমিযী, হা/৫৫৩; মিশকাত, হা/১৩৪৪।
১১৯ সহীহ বুখারী, হা/৪৪১৮; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৯।
📄 উম্মে কুলসুম (রাঃ) এর মৃত্যু
উম্মে কুলসুম (রাঃ) ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তৃতীয় কন্যা, যিনি রাসূলুল্লাহ এর প্রথম স্ত্রী খাদীজা (রাঃ) এর গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। দ্বিতীয় কন্যা রুকাইয়া (রাঃ) এর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উসমান (রাঃ) এর সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পর তিনিও মৃত্যুবরণ করেন। এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই ব্যথিত হয়েছিলেন।
📄 আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর মৃত্যু
আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল মদিনার মুনাফিকদের নেতা। তার নেতৃত্বে মুনাফিকরা তাদের যাবতীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেত। সে বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেও অন্তরের মধ্যে কুফরী লুকিয়ে রেখেছিল। মুসলিমদের ক্ষতি সাধন করার জন্য সর্বদা ওঁৎ পেতে থাকত। তবে তার ছেলে আবদুল্লাহ (রাঃ) ছিলেন একজন উত্তম সাহাবী।
তাবুক যুদ্ধ থেকে ফেরার পর আবদুল্লাহ ইবনে উবাই মৃত্যুবরণ করলে ছেলে আবদুল্লাহ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে আবেদন করলেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার জামাটি আমার পিতার জন্য দান করুন, এর দ্বারা তাকে কাফন দেব এবং আপনি তার জানাযা পড়াবেন ও তার জন্য ক্ষমা চাইবেন। তখন রাসূলুল্লাহ তাকে নিজের জামাটি দান করলেন এবং বললেন, আমাকে খবর দিলে আমি তার জানাযা পড়াব। তারপর রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে সংবাদ দিলে তিনি জানাযা পড়তে উদ্যোগী হলেন। এমন সময় উমর (রাঃ) তাঁর কাপড় টেনে ধরে বললেন, আল্লাহ তা'আলা কি আপনাকে মুনাফিকদের জানাযা পড়তে বারণ করেননি? উত্তরে তিনি বললেন, জানাযা পড়া বা না পড়া আমার ইচ্ছাধীন (উভয়ই সমান)। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করেন,
﴿اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ﴾ তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো আর না-ই কর, যদি ৭০ বারও তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর তবুও আল্লাহ তা'আলা কখনো তাদেরকে ক্ষমা করবেন না। (সূরা তাওবা- ৮০)
অতঃপর তিনি তার জানাযার নামায আদায় করলেন এবং ফিরে আসলেন। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন,
وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُمْ مَّاتَ أَبَدًا তাদের কেউ মারা গেলে আপনি আর কখনো তাদের জানাযা পড়বেন না- (সূরা তাওবা- ৮৪)।১২০
টিকাঃ
১২০ সহীহ বুখারী, হা/১২৬৯।
📄 নবম হিজরীর হজ্জ
তাবুক যুদ্ধের পর উক্ত বছরের উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা হচ্ছে, হজ্জ পালন করার উদ্দেশ্যে কতিপয় সাহাবীকে মক্কায় প্রেরণ। এদের নেতৃত্ব প্রদানের জন্য রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর (রাঃ)-কে মনোনীত করেন। অতঃপর মুশরিকদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিনামা নিষ্পত্তির নির্দেশনা সম্বলিত সূরা তাওবার কয়েকটি আয়াত নাযিল হলে রাসূলুল্লাহ আলাইহি আলী (রাঃ)-কেও প্রেরণ করেন, যাতে তিনি আবু বকর (রাঃ) এর সাথে মিলিত হন এবং মক্কার মুশরিকদেরকে আল্লাহর নির্দেশনামা জানিয়ে দেন। অতঃপর জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখে আলী (রাঃ) জামরা তথা কংকর নিক্ষেপ করার স্থানে দাঁড়িয়ে একটি ভাষণ প্রদান করেন। তিনি বলেন, অঙ্গীকারকারীদের সকল অঙ্গীকারের বিলুপ্তি ঘোষণা করা হলো এবং এ সকল বিষয় চূড়ান্ত করার জন্য চার মাস সময় দেয়া হলো।
তবে যে মুশরিকরা মুসলিমদের সাথে অঙ্গীকার পালনে কোন প্রকার ত্রুটি করেনি, কিংবা মুসলিমদের বিরুদ্ধে অন্য কাউকেই সাহায্য করেনি, তাদের অঙ্গীকারনামা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বলবৎ রাখা হয়।
এদিকে আবু বকর (রাঃ)-ও একদল সাহাবীদের মাধ্যমে ঘোষণা করেন যে, আগামীতে কোন মুশরিক কাবা ঘরে হজ্জ করতে পারবে না এবং কোন উলঙ্গ ব্যক্তি কাবা ঘর তাওয়াফ করতে পারবে না। ১২১ এভাবে তারা রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর নির্দেশনা ঘোষণা করার মধ্য দিয়ে সুষ্ঠভাবে হজ্জব্রত পালন করে নিরাপদে মদিনায় ফিরে আসেন।
টিকাঃ
১২১ সহীহ বুখারী, হা/৪৬৫৬।