📄 মক্কা বিজয়
ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজয়টি হচ্ছে মক্কা বিজয়। এটি ছিল মূলত হুদায়বিয়া সন্ধির ফসল। সম্ভবত আল্লাহ এ বিজয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রটিকে স্পষ্ট বিজয় হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন।
প্রেক্ষাপট: হুদায়বিয়া সন্ধির একটি শর্ত এই ছিল যে, আরবের যে কোন গোত্র ইচ্ছা করলে এ চুক্তিপত্রের যে কোন পক্ষের সাথে মিত্রতা পোষণ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কোন গোত্রের উপর অন্যায়-অত্যাচার করা হলে সংশ্লিষ্ট দলের উপর অন্যায় করা হয়েছে বলে গণ্য হবে। পরবর্তীতে চুক্তির এ ধারা অনুযায়ী মুসলিমদের সাথে যোগ দিয়েছিল বনু খোযায়া গোত্র এবং কুরাইশদের সাথে যোগ দিয়েছিল বনু বকর গোত্র। এ দুটি গোত্র জাহেলী যুগ থেকে পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। একদা এর জের ধরে বনু বকর গোত্রের কিছু লোক বনু খোযায়া গোত্রের উপর আক্রমণ করে অনেককেই হত্যা করে ফেলে। আর এতে কুরাইশরা গোপনে অস্ত্র দিয়ে তাদেরকে সাহায্য করে। অতঃপর এ সংবাদ যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট পৌঁছে তখন তিনি মক্কায় আক্রমণ করাকে আবশ্যক মনে করলেন। কেননা এটি ছিল কুরাইশদের পক্ষ থেকে চুক্তি ভঙ্গের স্পষ্ট নিদর্শন।
আবু সুফিয়ানের মদিনায় আগমন: এ ঘটনার পরপরই কুরাইশরা অনুধাবন করল যে, অঙ্গীকার ভঙ্গ করে তারা সত্যি সত্যিই বড় ধরনের অন্যায় করে ফেলেছে। সুতরাং এর ফলাফল খুব তিক্ত ও ভয়াবহ হতে পারে। ফলে তারা একটি পরামর্শ করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য আবু সুফিয়ানকে মদিনায় প্রেরণ করল।
আবু সুফিয়ান মদিনায় এসে প্রথমে তার কন্যা তথা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন হাবীবা (রাঃ) এর ঘরে গেল। সে যখন বিছানায় বসতে চাইল, তখন হাবীবা (রাঃ) তার থেকে বিছানা গুটিয়ে নিলেন। এটা দেখে আবু সুফিয়ান বলল, হে আমার কন্যা! তুমি কি মনে করছ যে, এই বিছানা আমার জন্য উপযুক্ত নয়, নাকি আমি এই বিছানার উপযুক্ত নই? হাবীবা (রাঃ) বললেন, এটা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিছানা। আর আপনি হচ্ছেন অপবিত্র মুশরিক। এতে আবু সুফিয়ান মুসলিমদের মনোভাব অনেকটাই আঁচ করতে পারল। তারপর সে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে কথাবার্তা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ তার কোন কথারই উত্তর দিলেন না। তারপর সে বিষয়টি নিয়ে একে একে আবু বকর, উমর, আলী (রাঃ) ও ফাতিমা (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণকে অনুরোধ জানাল, কিন্তু প্রত্যেকেই তাকে নিরাশ করে ফিরিয়ে দিলেন। অতঃপর সে আলী (রাঃ) এর পরামর্শ অনুযায়ী মসজিদের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল যে, হে জনগণ! আমি সকলের মাঝে আশ্রয় গ্রহণ করার ঘোষণা করছি। কিন্তু এতে কেউ কোন সাড়া দিলেন না। তারপর সে হতাশ হয়ে মক্কায় ফিরে আসে এবং কুরাইশদেরকে সবকিছু অবহিত করে।
যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি : আলাইছি এদিকে মক্কাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতার সংবাদ আসার তিন দিন পূর্বেই রাসূলুল্লাহ বিষয়টি সম্পর্কে ওহীর মাধ্যমে অবগত হতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি তখন আয়েশা (রাঃ)-কে সফরের প্রস্তুতি নিতে বললেন। কিন্তু তখনও তিনি কাউকে এর মূল উদ্দেশ্যের কথা জানাননি। তারপর যখন মক্কাবাসীদের চুক্তিভঙ্গের সংবাদ এসে পৌঁছল তখন রাসূলুল্লাহ সবাইকে মক্কা আক্রমণ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বললেন এবং বিষয়টি যথাসম্ভব গোপন রাখার নির্দেশ দিলেন। যাতে রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরকে নিয়ে আকস্মিক আক্রমণ করে মক্কাবাসীদেরকে হতভম্ব করে দিতে পারেন।
হাতেব বিন আবু বালতা'আ (রাঃ) এর গোপন চিঠি : আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমগণ যখন খুব গোপনে মক্কা আক্রমণ করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন হাতেব বিন আবু বালতা'আ (রাঃ) নামে এক বদরী সাহাবী এক মহিলার মাধ্যমে মক্কাবাসীদের উদ্দেশ্যে একটি পত্র প্রেরণ করেন। যার মধ্যে রাসূলুল্লাহ কর্তৃক মক্কা আক্রমণের বিষয়টি লিপিবদ্ধ ছিল। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, মুসলিমরা মক্কাবাসীর উপর আক্রমণ করার পর যদি মক্কাবাসীরা ক্ষিপ্ত হয়ে সেখানে অবস্থিত মুহাজিরদের পরিবার বর্গের উপর হামলা চালায়, তাহলে এ সংবাদ জানানোর অসিলায় তারা যেন দয়া পরবশ হয়ে হাতেব বিন আবু বালতা'আ (রাঃ) এর পরিবারের কোন ক্ষতি না করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ বিষয়টি অবিলম্বেই ওহীর মাধ্যমে জেনে গিয়েছিলেন। ফলে তিনি আলী, মিকদাদ, যুবায়ের এবং আবু মুরশেদ গানাভী (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীকে চিঠিটি উদ্ধারের জন্য এই বলে প্রেরণ করেন যে, তোমরা 'খাখ' নামক উদ্যানে গিয়ে একটি হাওদানশীল মহিলাকে দেখতে পাবে, এ মহিলার নিকট কুরাইশদের উদ্দেশ্যে প্রেরিত একটি পত্র আছে, সে পত্রটি তার কাছ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসবে। তখন তারা ঘোড়ার উপর আরোহণ করে খুব দ্রুতগতিতে মহিলাটিকে পাকড়াও করে পত্রটি ফেরত দিতে বলেন। কিন্তু সে পত্রের বিষয়টি অস্বীকার করল। অবশেষে সাহাবীগণের হুমকীর মুখে সে পত্রটি ফেরত দিয়ে দিল।
অতঃপর পত্রটি রাসূলুল্লাহ এর কাছে নিয়ে আসা হলে, তিনি পত্রের বিষয়বস্তু ও প্রেরক-প্রাপক সম্পর্কে অবহিত হলেন। তখন রাসূলুল্লাহ হাতেব বিন আবু বালতা'আ (রাঃ)-কে ডেকে আনার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন এবং এর উদ্দেশ্য খুলে বলেন। এসব কথা শুনে উমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন আমি তার গলা কর্তন করে দেই। কারণ সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং সে মুনাফিক হয়ে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, হে উমর! তুমি কি আলাইহি ওয়াসাল্লাম
জান না যে, সে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে? আর হতে পারে আল্লাহ তা'আলা উক্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কেননা তিনি বলে দিয়েছেন, তোমরা যা চাও তা করো, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এ কথা শুনে উমর (রাঃ) এর চক্ষুদ্বয় অশ্রুসজল হয়ে উঠল। ফলে তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। অতঃপর এ বিষয়টির সমাপ্তি এখানেই ঘটে। তখন আল্লাহ তা'আলা সূরা মুমতাহিনার প্রথম আয়াতটি নাযিল করেন।
মক্কার পথে যাত্রা : দিনটি ছিল ১০ই রমাযান হিজরীর ৮ম বর্ষ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাম সকল প্রস্তুতি শেষে সাহাবীদেরকে নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। সাথে ছিলেন ১০ হাজার সাহাবীদেরকে নিয়ে গঠিত একটি বিশাল সেনাবাহিনী। এ সময় মদিনার প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন আবু রাহাম গিফারী (রাঃ) এর উপর। পথিমধ্যে চাচা আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) এর সাথে দেখা হয়, যিনি ইসলাম গ্রহণ করে স্বপরিবারে হিজরত করে মদিনায় যাচ্ছিলেন। তারপর চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান বিন হারিস এবং ফুফাতো ভাই আবদুল্লাহ বিন উমায়েরের সাথে সাক্ষাৎ হয়। তখন তারা ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিমদের দলে শরীক হয়ে যায়। এ সময় রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীগণ সকলেই রোযাদার ছিলেন। তারপর যখন তাঁরা কাদীদ নামক ঝর্ণার কাছে পৌঁছলেন, তখন রোযা ভঙ্গ করলেন। তারপর তাঁরা মাররাউয যাহরান নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে রাত্রি যাপন করেন।
আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ : মুসলিমগণ মাররাউয যাহরানে শিবির স্থাপন করার পর আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর সাদা খচ্চরের উপর আরোহণ করে বের হলেন। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, মক্কার কোন উপযুক্ত লোক পেলে তার মাধ্যমে মক্কাবাসীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান করা। কিন্তু পথিমধ্যে তিনি আবু সুফিয়ান ও বোদাইল বিন ওয়ারাকার কথোপকথন শুনতে পান। ফলে তিনি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদেরকে রাসূলুল্লাহ এর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানান। এতে আবু সুফিয়ান সাড়া দেয় এবং বোদাইল বিন ওয়ারাকা মক্কায় ফিরে যায়।
তারপর আব্বাস (রাঃ) আবু সুফিয়ানকে বাহনের পেছনে চড়িয়ে রাসূলুল্লাহ এর কাছে নিয়ে আসেন। এ সময় উমর (রাঃ) আব্বাস (রাঃ) এর পেছনে
আবু সুফিয়ানকে দেখতে পেয়ে দ্রুত রাসূলুল্লাহ এর কাছে চলে যান এবং তাকে হত্যা করার অনুমতি চান। তখন আব্বাস (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাঁকে আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু এরপরও উমর (রাঃ) বারবার হত্যা করার জন্য অনুমতি চাইতে লাগলেন। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ উমর (রাঃ)-কে থামিয়ে দিলেন এবং আব্বাস (রাঃ) এর আশ্রয় দান করাটা অনুমোদন করলেন।
পরের দিন সকালে আব্বাস (রাঃ) আবু সুফিয়ানকে রাসূলুল্লাহ এর কাছে নিয়ে যান। তখন তিনি আবু সুফিয়ানকে সামান্য ভর্ৎসনাপূর্বক ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন। অবশেষে সে ইসলাম গ্রহণ করে নেয়।
তারপর আব্বাস (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান সম্মান প্রিয় লোক; সুতরাং তাকে সম্মান প্রদান করুন। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, ঠিক আছে, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ থাকবে এবং যে নিজ ঘরের দরজা ভেতর হতে বন্ধ করে নেবে সে নিরাপদ থাকবে এবং যে মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে সেও নিরাপদ থাকবে।"১০১
মাররাউয যাহরান হতে মক্কার পথে : রাসূলুল্লাহ সকাল সকাল মক্কায় প্রবেশ করার জন্য অগ্রসর হন। এদিকে আব্বাস (রাঃ) আবু সুফিয়ান (রাঃ)-কে মক্কায় পাঠিয়ে দেন। তিনি মক্কায় এসে কুরাইশদেরকে রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকেন এবং সতর্ক করে দেন। কিন্তু এতে তারা তাকে ভৎর্সনা করে। তারপর তিনি তাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ কর্তৃক নিরাপত্তার বিষয়টিও অবহিত করেন। ফলে সকলেই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পলায়ন করতে থাকে।
রাসূলুল্লাহ এর সেনাবিন্যাস : এদিকে রাসূলুল্লাহ যখন ‘যী-তোওয়া' নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন সেনাবিন্যাসের কাজটি সেরে নিলেন। তিনি ডান পাশে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ)-কে নিযুক্ত করলেন এবং তাকে এ নির্দেশ দিলেন যে, নিচু অঞ্চল দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করবে। এ সময় কুরাইশরা যদি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাহলে তাদের সকলকে হত্যা করবে। তারপর সাফা পাহাড়ের উপর আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে। এরপর তিনি বাম পাশে যুবায়ের বিন আওয়াম (রাঃ)-কে নিযুক্ত করেন এবং তাকে মক্কার উপরিভাগ তথা কুদা নামক স্থান দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে নির্দেশ দেন। অতঃপর হাজুন নামক স্থানে গিয়ে রাসূলুল্লাহ এর পতাকা উত্তোলন করে তাঁর জন্য অপেক্ষা করার নির্দেশ দেন।
তারপর রাসূলুল্লাহ পদাতিক বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা আবু উবাইদা (রাঃ)-কে বাতনে ওয়াদির পথ দিয়ে এমনভাবে অগ্রসর হতে নির্দেশ দেন, যাতে তিনি রাসূলুল্লাহ এর পূর্বেই মক্কায় অবতরণ করতে সক্ষম হন।
মক্কায় প্রবেশ : রাসূলুল্লাহ এর নির্দেশনার পরপরই সকলেই নির্ধারিত পথ ধরে অগ্রসর হতে লাগলেন। এ সময় মুসলিম বাহিনী কুরাইশদের পক্ষ থেকে কোন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিলেন না। তবে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) সামান্য বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু বাধাদানকারীরা খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর সাথে টিকতে না পেরে পলায়ন করে। তারপর তিনি মক্কার গলি পথগুলো অতিক্রম করে সাফা পাহাড়ের উপর রাসূলুল্লাহ এর সাথে মিলিত হন। এদিকে যুবায়ের (রাঃ) হাজুন নামক স্থানে পৌঁছে এর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সেখানে পৌঁছলে সকলে মিলে কাবা ঘরের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন।
কাবা ঘরে প্রবেশ ও মূর্তি অপসারণ : অতঃপর রাসূলুল্লাহ চারদিক থেকে সাহাবীগণ দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় মসজিদে হারামে প্রবেশ করেন। তারপর প্রথমে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন এবং কাবা ঘর তাওয়াফ করেন।১০২ এ সময় কাবা ঘরের আশপাশে ও ছাদের উপরে সর্বমোট ৩৬০টি মূর্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ স্বীয় হাতে থাকা একটি ধনুক দিয়ে মূর্তিগুলোর উপর আঘাত করতে করতে সেগুলো ভূপাতিত করে দেন।
তারপর রাসূলুল্লাহ কাবা ঘরের দ্বার রক্ষক উসমান বিন তালহার কাছ থেকে চাবি নিয়ে কাবা ঘরে প্রবেশ করেন। সাথে ছিলেন উসামা ও বেলাল (রাঃ)। তারা কাবা ঘরের ভেতরে ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) এর প্রতিকৃতিসহ দেয়ালে অঙ্কনকৃত আরো অনেক ছবিও দেখতে পান। ফলে তাঁরা সেগুলোকেও ভেঙ্গে চুরমার করে দেন।
কাবা ঘরে নামায আদায় : রাসূলুল্লাহ কাবা ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেন। তারপর তিনি কাবা ঘরের দেয়াল থেকে তিন হাত দূরত্বে এমন অবস্থায় দাঁড়ান যে, বাম পাশে দুটি স্তম্ভ, ডান পাশে একটি স্তম্ভ এবং পেছনে ছিল তিনটি স্তম্ভ। সে সময় কাবা ঘরটি এই ছয়টি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে ছিল।১০০ তারপর রাসূলুল্লাহ সেখানে দুই রাক'আত নামায আদায় করেন। অতঃপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও তাকবীর ধ্বনি দিতে দিতে কাবা ঘরের দরজা খুলে দেন এবং জনগণের সামনে ভাষণ প্রদান করেন। ১০৪
সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা: ভাষণ দানকালের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে কুরাইশগণ! তোমাদের কী ধারণা যে, তোমাদের সাথে কীরূপ আচরণ করা হবে? তখন তারা বলল, আমরা আপনার প্রতি উত্তম ধারণা পোষণ করে থাকি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে তোমরা জেনে রাখো যে, আমি তোমাদের সাথে ঠিক সেরূপ কথাই বলছি, যেমনটি ইউসুফ (আঃ) তার ভাইদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, আজ তোমাদের জন্য কোনই নিন্দা নেই। (আমিও তোমাদেরকে সেরূপই বলছি) যাও- আজ তোমাদের সকলকে মুক্তি দেয়া হলো।
কতিপয় কাফিরকে হত্যার নির্দেশ: তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন বড় বড় কাফিরের রক্ত অনর্থক ঘোষণা করেন এবং বলেন, যদি তাদেরকে কাবা ঘরের পর্দার নিচেও পাওয়া যায়, তবুও তাদেরকে হত্যা করা হবে। তাদের নাম হচ্ছে, ১. আবুল উযযা বিন খাত্তাল। ২. আবদুল্লাহ বিন সা'দ বিন আবু সারাহ। ৩. ইকরামা বিন আবু জাহেল। ৪. হারিস বিন নুফাইল বিন ওয়াহাব। ৫. মাকীস বিন সাবাব। ৬. হাব্বার বিন আসওয়াদ। ৭. ও ৮. ইবনে খাত্তালের দুই দাসী। ৯. সারাহ নামক এক দাসী। অবশেষে এদের মধ্যে সর্বমোট চারজন তথা আবুল উযযা বিন খাত্তাল, মাকীস বিন সাবাব, ইবনে খাত্তালের দুই দাসীর মধ্যে একজন দাসী এবং সারাহ নামক এক দাসীকে হত্যা করা হয় এবং বাকি পাঁচজনকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে একনিষ্ঠ মুসলিম হয়ে যায়। ১০৫
কাবা ঘরের চাবি : কাবা ঘরের চাবির দায়িত্ব পাওয়াটা ছিল অনেক সম্মানের ব্যাপার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা ঘরের দরজা খোলার পর যার হাতে চাবি দিয়েছিলেন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে চাবির দায়িত্ব গ্রহণের আবেদন জানালেন এবং এদিকে আব্বাস (রাঃ)-ও এ দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আবেদন জানালেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এ দায়িত্বের জন্য তাকেই পছন্দ করলেন, যে ইতিপূর্বে দায়িত্ব পালন করে আসছিল এবং তার কাছ থেকে দায়িত্ব কেড়ে নেয়াকে যুলুম মনে করলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ উসমান বিন তালহা (রাঃ)-কে ডেকে তাকেই এ দায়িত্ব প্রদান করলেন
শুকরিয়ার নামায আদায়: তারপর রাসূলুল্লাহ উম্মে হানী বিনতে আবু তালিব (রাঃ) এর ঘরে গমন করে গোসল করেন এবং বিজয়ের শুকরিয়াস্বরূপ সেখানেই দুই রাক'আত নামায আদায় করেন।
কাবা ঘরের ছাদে বেলাল (রাঃ) এর আযান : মক্কায় প্রবেশ করে এসব কাজ করতে থাকাবস্থায় নামাযের সময় হয়ে গিয়েছিল। ফলে রাসূলুল্লাহ বেলাল (রাঃ)-কে কাবা ঘরের ছাদে উঠে আযান দেয়ার নির্দেশ দিলেন। ফলে তিনি তাই করলেন।
মক্কাকে হারাম ঘোষণা: অতঃপর রাসূলুল্লাহ দ্বিতীয় দিন সকলের সামনে আরো একটি ভাষণ দান করলেন। তাতে ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যেদিন আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, সে দিনই মক্কাকে হারাম (নিষিদ্ধ শহর) করে দিয়েছেন। এ কারণে কিয়ামত পর্যন্ত তা হারাম বা পবিত্র থাকবে। যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তার জন্য এটা বৈধ হবে না যে, সে এখানে রক্তপাত ঘটাবে অথবা এখানকার কোন বৃক্ষ কর্তন করবে। কেউ যদি এ কারণে জায়েয মনে করে যে, আল্লাহর রাসূল এখানে যুদ্ধ করেছেন তবে তাকে বলে দাও যে, আল্লাহ স্বয়ং তাঁর রাসূলকে অনুমতি দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা বৈধ করেছিলেন। অতঃপর আজ তার পবিত্রতা অনুরূপভাবে ফিরে এসেছে যেমনটি গতকাল ছিল। এখন এটা অপরিহার্য প্রয়োজন যে, যারা উপস্থিত আছে তারা অনুপস্থিতদের নিকট এই বাণী পৌঁছে দেবে।
অন্য বর্ণনায় আছে, এ সময় তিনি এ কথাও বলেন যে, এখানে কোন গাছ কাটা বৈধ নয়, শিকার তাড়ানো ঠিক নয় এবং পড়ে থাকা কোন জিনিস উঠানোও ঠিক নয়। তবে সেই ব্যক্তি নিতে পারবে, যে সেটা নিয়ে প্রচার করবে। তাছাড়া কোন প্রকার ঘাসও উপড়ানো যাবে না। এ সময় আব্বাস (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইযখির ঘাসের অনুমতি দিন। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, বেশ- ইযখির ঘাসের ব্যাপারে অনুমতি রইল।১০৬
মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে কতিপয় ঘটনা সাল্লাম আলাইহি রাসূলুল্লাহ মক্কায় ১৯ দিন অবস্থান করেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করেছিলেন। যেমন-
উযযা নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করা: সাল্লাম আলাইহি যখন রাসূলুল্লাহ মক্কা বিজয়ের মৌলিক কার্যাবলি ভালোভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে কিছুটা স্বস্তিবোধ করলেন, তখন তিনি ধীরে ধীরে সকল প্রকার শিরককে উচ্ছেদ করার কাজে হাত দেন। এজন্য প্রথমে নির্দেশ দেন উযযা নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করে দেয়ার জন্য, যা ছিল নাখলা নামক স্থানের একটি মন্দিরে অবস্থিত। এ উদ্দেশ্যে তিনি উক্ত মাসের ২৫ তারিখে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর নেতৃত্বে একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। ফলে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) সেটা বিনষ্ট করে রাসূলুল্লাহ এর কাছে ফিরে আসেন । তখন রাসূলুল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কিছু দেখেছিলে? সাল্লাম আলাইহি সাল্লাম আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলাইহি তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ বললেন, তাহলে প্রকৃতপক্ষে তুমি তা ভাঙনি। সুতরাং তুমি আবার যাও এবং তা ভেঙ্গে দাও। তখন খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) আবার গেলেন। তখন তিনি দেখলেন যে, বিক্ষিপ্ত চুলবিশিষ্ট একজন মহিলা তাঁর দিকে তেড়ে আসছে। তখন তিনি তাকে এমনভাবে আঘাত করলেন যে, তার দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। তারপর রাসূলুল্লাহ-কে বিষয়টি জানানো হলে তিনি বললেন, হ্যাঁ- এটাই ছিল উযযা।১০৭
সোয়া নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করা : সাল্লাম আলাইহি এটি ছিল মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে রেহাত নামক স্থানে বনু হুযাইল গোত্রের মধ্যে অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ আমর বিন আস (রাঃ)-কে প্রেরণ করে সেটিকে বিনষ্ট করে দেন। আমর বিন আস (রাঃ) যখন সেই মূর্তিটি ভাঙতে যান, তখন মন্দিরের প্রহরী বলল, তোমরা কী চাও? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে এটা ভাঙ্গার জন্য পাঠিয়েছেন। সে বলল, তোমরা এতে সক্ষম হবে না। তিনি বললেন, কেন? সে বলল, তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হবে। তিনি বললেন, তুমি এখনো বাতিলের উপর রয়েছ? সে কি শুনতে পায়, না দেখতে পায়? এ কথা বলেই আমর বিন আস (রাঃ) মূর্তিটিকে গুঁড়িয়ে দেন। তারপর প্রহরীকে বললেন, এবার তোমার মত কী? সে বলল, আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। আর এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল এ মাসেই।১০৮
মানাত দেবমূর্তি বিনষ্ট করা : এ মাসেই আরো একটি বড় দেবমূর্তি বিনষ্ট করা হয়। সেটি হলো মানাত দেবমূর্তি। এটি ছিল মোশাল্লাল নামক স্থানে। জাহেলী যুগে এটিই ছিল আওস, খাযরাজ, গাসসান এবং অন্যান্য গোত্রের উপাস্য। রাসূলুল্লাহ সা'দ বিন যায়েদ আশহলী (রাঃ) এর নেতৃত্বে ২০ সদস্য বিশিষ্ট একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করে মূর্তিটি বিনষ্ট করে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। এ সময় মুসলিম বাহিনী মূর্তির দিক থেকে একজন উলঙ্গ, কালো ও বিক্ষিপ্ত চুলবিশিষ্ট মহিলাকে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলেন। তখন মন্দিরটির প্রহরী বলেছিল, মানাত! তুমি এই অবাধ্যদের ধ্বংস করো। তখন সা'দ (রাঃ) তাকে তরবারির আঘাতে হত্যা করে ফেলেন এবং মূর্তিটিকেও ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দেন।
টিকাঃ
১০১ সহীহ মুসলিম, হা/১৭৮০; আবু দাউদ, হা/৩০২১; মিশকাত, হা/৬২১০; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৩৩৪১।
১০২ আবু দাউদ, হা/১৮৭৮।
১০০ সহীহ মুসলিম, হা/১৩২৯; সহীহ বুখারী, হা/৫০৫।
১০৪ সহীহ মুসলিম, হা/১৩২৯।
১০৫ নাসাঈ, হা/৪০৬৭; মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/২০০৩; মিশকাত, হা/৩১৮০।
১০৬ সহীহ বুখারী, হা/২৪৩৪; সহীহ মুসলিম, হা/১৩৫৫।
১০৭ যাদুল মা'আদ ৩/৩৬৫; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/১১৫৪৭।
১০৮ তারীখে তাবারী ৩/৬৬; যাদুল মা'আদ ৩/৩৬৫।
📄 মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে কতিপয় ঘটনা
রাসূলুল্লাহ মক্কায় ১৯ দিন অবস্থান করেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করেছিলেন। যেমন-
উযযা নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করা: সাল্লাম আলাইহি যখন রাসূলুল্লাহ মক্কা বিজয়ের মৌলিক কার্যাবলি ভালোভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে কিছুটা স্বস্তিবোধ করলেন, তখন তিনি ধীরে ধীরে সকল প্রকার শিরককে উচ্ছেদ করার কাজে হাত দেন। এজন্য প্রথমে নির্দেশ দেন উযযা নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করে দেয়ার জন্য, যা ছিল নাখলা নামক স্থানের একটি মন্দিরে অবস্থিত। এ উদ্দেশ্যে তিনি উক্ত মাসের ২৫ তারিখে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর নেতৃত্বে একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। ফলে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) সেটা বিনষ্ট করে রাসূলুল্লাহ এর কাছে ফিরে আসেন । তখন রাসূলুল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কিছু দেখেছিলে? সাল্লাম আলাইহি সাল্লাম আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলাইহি তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ বললেন, তাহলে প্রকৃতপক্ষে তুমি তা ভাঙনি। সুতরাং তুমি আবার যাও এবং তা ভেঙ্গে দাও। তখন খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) আবার গেলেন। তখন তিনি দেখলেন যে, বিক্ষিপ্ত চুলবিশিষ্ট একজন মহিলা তাঁর দিকে তেড়ে আসছে। তখন তিনি তাকে এমনভাবে আঘাত করলেন যে, তার দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। তারপর রাসূলুল্লাহ-কে বিষয়টি জানানো হলে তিনি বললেন, হ্যাঁ- এটাই ছিল উযযা।১০৭
সোয়া নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করা : সাল্লাম আলাইহি এটি ছিল মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে রেহাত নামক স্থানে বনু হুযাইল গোত্রের মধ্যে অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ আমর বিন আস (রাঃ)-কে প্রেরণ করে সেটিকে বিনষ্ট করে দেন। আমর বিন আস (রাঃ) যখন সেই মূর্তিটি ভাঙতে যান, তখন মন্দিরের প্রহরী বলল, তোমরা কী চাও? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে এটা ভাঙ্গার জন্য পাঠিয়েছেন। সে বলল, তোমরা এতে সক্ষম হবে না। তিনি বললেন, কেন? সে বলল, তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হবে। তিনি বললেন, তুমি এখনো বাতিলের উপর রয়েছ? সে কি শুনতে পায়, না দেখতে পায়? এ কথা বলেই আমর বিন আস (রাঃ) মূর্তিটিকে গুঁড়িয়ে দেন। তারপর প্রহরীকে বললেন, এবার তোমার মত কী? সে বলল, আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। আর এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল এ মাসেই।১০৮
মানাত দেবমূর্তি বিনষ্ট করা : এ মাসেই আরো একটি বড় দেবমূর্তি বিনষ্ট করা হয়। সেটি হলো মানাত দেবমূর্তি। এটি ছিল মোশাল্লাল নামক স্থানে। জাহেলী যুগে এটিই ছিল আওস, খাযরাজ, গাসসান এবং অন্যান্য গোত্রের উপাস্য। রাসূলুল্লাহ সা'দ বিন যায়েদ আশহলী (রাঃ) এর নেতৃত্বে ২০ সদস্য বিশিষ্ট একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করে মূর্তিটি বিনষ্ট করে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। এ সময় মুসলিম বাহিনী মূর্তির দিক থেকে একজন উলঙ্গ, কালো ও বিক্ষিপ্ত চুলবিশিষ্ট মহিলাকে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলেন। তখন মন্দিরটির প্রহরী বলেছিল, মানাত! তুমি এই অবাধ্যদের ধ্বংস করো। তখন সা'দ (রাঃ) তাকে তরবারির আঘাতে হত্যা করে ফেলেন এবং মূর্তিটিকেও ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দেন।
টিকাঃ
১০৭ যাদুল মা'আদ ৩/৩৬৫; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/১১৫৪৭।
১০৮ তারীখে তাবারী ৩/৬৬; যাদুল মা'আদ ৩/৩৬৫।
📄 হুনাইন এর যুদ্ধ
হুনাইন হচ্ছে যুল মাজায নামক স্থানের সন্নিকটে অবস্থিত একটি উপত্যকার নাম। সেটি ছিল মক্কা থেকে ১০ মাইল দূরে অবস্থিত। মক্কা বিজয়ের পর কাফিরদের সাথে মুসলিমদের সর্বপ্রথম যুদ্ধটি এখানেই সংঘটিত হয়েছিল ।
প্রেক্ষাপট: মক্কা বিজয়ের ফলে মক্কাবাসীসহ আশেপাশের অনেক গোত্রই ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল। কিন্তু কতিপয় ব্যক্তি ও গোত্র বিষয়টি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। এদের মধ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল বনু হাওয়াযিন এবং বনু সাকীফ গোত্র। তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল মুযার, জোশাম, সা'দ বিন বকরের গোত্রসমূহ এবং বনু হেলাল গোত্রের কিছু সংখ্যক লোক। আর তাদের নেতৃত্বে ছিল মালেক বিন আওফ নাসরী ।
কাফিরদের যাত্রা: অবশেষে কাফিররা সকল প্রস্তুতি শেষে মুসলিমদের উপর আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে ৪ হাজার সেনা নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এ সময় তারা তাদের ধনসম্পদ, গবাদি পশু, শিশু ও মহিলাদেরকেও সাথে নিয়ে এসেছিল। যাতে করে তাদের সৈনিকরা নিজেদের পরিবারের তাগিদে প্রবলভাবে যুদ্ধ করে এবং কোন ধরনের পিছুটান না থাকে। তারপর তারা প্রথমে আওতাস নামক উপত্যকায় অবতরণ করে, যা ছিল হুনাইন নামক উপত্যকার পার্শ্বেই অবস্থিত। পরে তারা সেখান থেকে যাত্রা করে হুনাইন নামক স্থানে পৌঁছে।
মুসলিমদের যাত্রা : এদিকে রাসূলুল্লাহ খবর পেয়ে মুসলিমদেরকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বললেন। আর সে সময় তিনি মক্কাতেই ছিলেন। অবশেষে তিনি যখন মুসলিম বাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন, তখন ছিল রাসূলুল্লাহ এর মক্কায় অবস্থানের ১৯তম দিন তথা হিজরী ৮ম বর্ষের শাওয়াল মাসের ৬ষ্ঠ দিন। আর এ অভিযানে তাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ১২ হাজার; অথচ তিনি মাত্র ১৯ দিন পূর্বে ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেছিলেন। এই যুদ্ধের জন্য রাসূলুল্লাহ সাফওয়ান বিন উমাইয়া (রাঃ) এর নিকট থেকে একশত লৌহ বর্ম নিয়েছিলেন এবং আত্তাব বিন আসীদ (রাঃ)-কে মক্কার গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন।
কিছু মুসলিমের আত্ম অহংকার প্রকাশ : ইতিপূর্বে যে কোন যুদ্ধে শত্রু পক্ষের সেনাবাহিনীর তুলনায় মুসলিমদের সেনাবাহিনীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। কিন্তু এ যুদ্ধটি ছিল ব্যতিক্রম। এ যুদ্ধে শত্রুদের সেনাবাহিনীর তুলনায় মুসলিমদের সেনাবাহিনীর সংখ্যা ছিল বেশি। যার কারণে কিছু কিছু মুসলিম আত্মগর্ব করে বলাবলি করছিল যে, আমরা কখনো পরাজিত হব না। কিন্তু এতে রাসূলুল্লাহ ভীষণভাবে মনঃক্ষুণ্ণ ও ব্যথিত হয়েছিলেন। আর আল্লাহ তা'আলাও এর উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছিলেন।
হঠাৎ তীর নিক্ষেপ : অতঃপর মুসলিম বাহিনী যখন হুনাইনে গিয়ে উপস্থিত হলো, তখন ছিল শাওয়াল মাসের ১০ তারিখ। কাফির বাহিনী মুসলিম বাহিনীর পূর্বেই সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু মুসলিমগণ সেটা জানতেন না। ফলে রাসূলুল্লাহ যখন সেনাবিন্যাস করে নিজেদের অবস্থান নিলেন, তখন শত্রু বাহিনী গুপ্তস্থান থেকে তাদের উপর আকস্মিকভাবে তীর নিক্ষেপ করতে শুরু করল। এতে মুসলিমগণ বিক্ষিপ্ত হয়ে পালাতে শুরু করল। অবশেষে দেখা গেল যে, রাসূলুল্লাহ এর সাথে ১২ জন মতান্তরে ৯ বা ১০ কিংবা ১০০ জন থেকে কিছু সংখ্যক কম লোক ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট নেই।
মুসলিম বাহিনীর সমবেত হওয়া : শত্রুবাহিনীর আকস্মিক আক্রমণে মুসলিমগণ যখন এলোমেলোভাবে ছোটাছুটি করছিল, তখনও রাসূলুল্লাহ গুটি কয়েকজন সাহাবীকে সাথে নিয়ে পাহাড়ের মতো অটল রইলেন। এ সময় তিনি একটি খচ্চরের উপর আরোহণ করলেন এবং সেটিকে শত্রুদের দিকে ছুটার জন্য বারবার উত্তেজিত করলেন। কিন্তু আবু সুফিয়ান বিন হারিস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর খচ্চরের লাগাম ধরে টানছিলেন এবং আব্বাস (রাঃ) খচ্চরের রেকাব ধরে তাঁকে থামিয়ে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ মুসলিম বাহিনীর এরূপ অবস্থা দেখে বারবার একত্রিত হওয়ার আহ্বান করছিলেন; কিন্তু অল্প কয়েকজন ব্যতীত কেউই কর্ণপাত করল না। তারপর তিনি লোকদেরকে আহ্বান করার জন্য আব্বাস (রাঃ)-কে নির্দেশ দিলেন। তখন তিনি এ বলে আহ্বান করলেন যে, হে বৃক্ষসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তথা বাই'আতে রিযওয়ানে অংশ গ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গ! তখন এ ডাক শুনে তারা সকলে খুব দ্রুততার সাথে ফিরে আসে। তারপর তিনি আনসারদেরকে আহ্বান করতে থাকলেন, ফলে তারাও খুব দ্রুততার সাথে রাসূলুল্লাহ এর সাথে মিলিত হয়ে গেল।
মাটি নিক্ষেপ: তারপর রাসূলুল্লাহ এক মুষ্ঠি মাটি হাতে নিয়ে শত্রুদের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করলেন। ১০৯ এতে দেখা গেল যে, শত্রুপক্ষের এমন কোন লোক ছিল না, যার চক্ষুর মধ্যে উক্ত মাটির কোন কণা প্রবেশ করেনি। আর মুসলিমগণ এই সুযোগে শত্রুপক্ষের উপর একযোগে আক্রমণ করে বসেন।
শত্রুপক্ষের পলায়ন: মুসলিমদের এ আক্রমণের সাথে সাথেই শত্রুরা যুদ্ধ ক্ষেত্রে আর টিকতে না পেরে পালাতে থাকে। তাদের মধ্যে কিছু লোক চলে যায় নাখলার দিকে এবং কিছু চলে যায় আওতাসের দিকে। রাসূলুল্লাহ উভয় দলের পেছনে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে ধাওয়া করেন। এছাড়াও শত্রুপক্ষের সবচেয়ে বড় দলটি তায়েফের পথে পলায়ন করে। রাসূলুল্লাহ নিজেই সে দলটির পেছনে ধাওয়া করেন।
গনীমতের মাল : যুদ্ধ শেষে মুসলিমগণ অনেক গনীমত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এর মধ্যে যুদ্ধবন্দী ছিল ৬ হাজার, উট ছিল ২০ হাজার, বকরি ছিল ৪০ হাজারের বেশি এবং রৌপ্য ছিল ৪ হাজার উকিয়া (অর্থাৎ এক লক্ষ ষাট হাজার দিরহাম)। রাসূলুল্লাহ সকল সম্পদ একত্রিত করার নির্দেশ দেন। তারপর সেগুলো জিইররানা নামক স্থানে জমা রেখে মাসউদ বিন আমর গিফারী (রাঃ)-কে এর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন। তায়েফ বিজয় করে অবসর না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেগুলো বণ্টন করেননি।
আওতাস অভিযান: আওতাস হচ্ছে হুনাইনের পার্শ্ববর্তী একটি জায়গার নাম। হুনাইন যুদ্ধে পরাজিত হয়ে একদল মুশরিক এখানে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে রাসূলুল্লাহ আবু আমের আল-আশআরী (রাঃ) এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। অতঃপর তারা সেখানে গিয়ে তাদেরকে হটিয়ে দেন। তবে দলনেতা আবু আমের (রাঃ) শহীদ হন। মৃত্যুর সময় তিনি ভাতিজা আবু মূসা আশআরী (রাঃ)-কে তার স্থলাভিষিক্ত করে যান এবং এ অসিয়ত করে যান যে, তিনি যেন রাসূলুল্লাহ-কে তার সালাম পৌঁছে দেন এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার আবেদন করেন। অতঃপর ফিরে এসে এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ -কে সংবাদ দিলে তিনি প্রথমে অযু করলেন। তারপর কিবলামুখী হয়ে দুই হাত তুলে আল্লাহর নিকট দু'আ করলেন।১১০
নাখলা অভিযান : নাখলা হচ্ছে হুনাইনের পার্শ্ববর্তী অন্য একটি জায়গার নাম। হুনাইনের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে এখানেও একটি দল আশ্রয় নিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ব্যাপারে সংবাদ পেয়ে যুবায়ের ইবনে আওয়াম (রাঃ) এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে গিয়ে তাদের উপর আক্রমণ চালান। এতে তাদের সবচেয়ে বয়োবৃদ্ধ ও দূরদর্শী নেতা দুরায়েদ বিন ছিম্মাহ নিহত হয় এবং অন্যরা পালিয়ে যায়।
যুল-কাফফাইন মূর্তি ধ্বংসকরণ : সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুল-কাফফাইন হলো আমর বিন হুমামাহ দাওসী গোত্রে অবস্থিত একটি মূর্তির নাম। রাসূলুল্লাহ হুনাইন বিজয় করে তায়েফের পথে যাত্রাকালে তোফায়েল বিন আমর দাওসী (রাঃ) এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। এ সময় তিনি এ নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন তার সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্য চান এবং তাদেরকে তায়েফে নিয়ে আসেন। অতঃপর তিনি দ্রুত সেখানে গমন করেন এবং যুল-কাফফাইন মূর্তি ধ্বংস করে দেন। তারপর তিনি ৪০০ দ্রুতগামী লোককে নিয়ে তায়েফে চলে আসেন, যেখানে রাসূলুল্লাহ পূর্ব থেকেই অবস্থান নিয়েছিলেন।১১১
তায়েফ অভিযান : রাসূলুল্লাহ হুনাইন থেকে ফেরার পর পরই তায়েফের দিকে মনোনিবেশ করেন। ফলে তিনি কয়েকদিন পরেই খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর নেতৃত্বে ১০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ নিজেও তায়েফের দিকে রওয়ানা হয়ে যান। পথিমধ্যে তিনি লিয়াহ নামক স্থানে অবস্থিত মালেক বিন আওফের একটি দুর্গ ভেঙ্গে ফেলেন। তারপর তিনি তায়েফে গমন করে সেখানকার দুর্গ অবরোধ করেন। অতঃপর সেটি তিনি ৪০ দিন মতান্তরে ১০/১৫/১৮/২০ দিন পর্যন্ত অবরোধ করে রাখেন। এ সময় দুর্গের ভেতর থেকে মাঝে মধ্যে তীর, পাথর ইত্যাদি নিক্ষেপ হচ্ছিল। যার কারণে বেশ কয়েকজন সাহাবীও শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ কামান ব্যবহার করে দুর্গের দেয়ালে ফাটল সৃষ্টি করতে সক্ষম হন। কিন্তু এতেও সেখানে প্রবেশ করা সম্ভব হয়ে উঠল না। তারপর রাসূলুল্লাহ কৌশল হিসেবে তাদের আঙ্গুর গাছসমূহ কেটে দেয়ার নির্দেশ দেন। অধিক সংখ্যক গাছ কেটে দেয়ার পর সাকীফ গোত্র আল্লাহ এবং আত্মীয়তার দোহাই দিয়ে গাছ কাটা বন্ধের জন্য আবেদন করলে রাসূলুল্লাহ তা মঞ্জুর করেন।
অবরোধ চলাকালে রাসূলুল্লাহ এর এক ঘোষক ঘোষণা দেন, যে গোলাম দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের নিকট আত্মসমর্পণ করবে সে মুক্ত বা স্বাধীন বলে বিবেচিত হবে। এর ফলে সর্বমোট ২৩ জন ব্যক্তি দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে মুসলিমদের দলভুক্ত হয়ে যায়।১১২
উল্লেখ্য যে, দুর্গবাসীরা পুরো এক বছরের খাদ্য এবং পানীয় মজুদ করে নিয়েছিল। যার কারণে অবরোধ ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছিল; কিন্তু এতে মুসলিমগণ কোন অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে রাসূলুল্লাহ নওফাল বিন মোয়াবিয়া দোয়েলীর পরামর্শে অবরোধ ছেড়ে দিয়ে ফিরে যান। এ যুদ্ধে ১২ জন সাহাবী শাহাদাত বরণ করেছিলেন এবং ৩ জন কাফির নিহত হয়েছিল।
গনীমতের মাল বণ্টন : জিইররানা নামক স্থানে রাসূলুল্লাহ যেসব গনীমতের সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন, তায়েফ থেকে ফেরার পথে সেখানে গমন করেন। কিন্তু সেগুলো বণ্টন করতে কিছু দিন দেরি করেন- এ আশায় যে, হাওয়াযিন গোত্রের কোন প্রতিনিধি দল এসে আবেদন করবে; ফলে তিনি তা তাদেরকে ফেরত দেবেন। কিন্তু ১০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর যখন তাদের পক্ষ থেকে কেউ আসলো না, তখন তিনি সেগুলো সাহাবীদের মধ্যে বণ্টন করতে আরম্ভ করেন। বণ্টনের ক্ষেত্রে তিনি মু'আল্লাফাতুল কুলুবকে বেশি প্রাধান্য দেন। যার ফলে মক্কার বড় বড় নেতাদেরকে অনেক সম্পদ দান করেন। যেমন- আবু সুফিয়ান এবং তার দুই ছেলে ইয়াযীদ ও মুয়াবিয়া (রাঃ)-কে সর্বমোট ১৮ কেজি রৌপ্য এবং তিনশত উট দান করেন, হাকীম ইবনে হেযামকে ২০০ উট, সাফওয়ান বিন উমাইয়াকে ৩০০ উট দান করেন। এছাড়া ছোট-বড় আরো অনেক নেতাকে ৪০/৫০টি করে উট প্রদান করেন। তারপর অবশিষ্ট সম্পদগুলো যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈনিকদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। ফলে প্রত্যেক সাধারণ সৈনিকের অংশে ৪টি করে উট ও ৪০টি করে বকরি এবং প্রত্যেক অশ্বারোহী সৈনিকের অংশে ১২টি করে উট এবং ১২০টি করে বকরি ভাগে পড়ে।
হাওয়াযিন গোত্রের প্রতিনিধির আগমন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন গনীমতের মাল বণ্টন করে সামান্য অবসর হলেন, তখন হাওয়াযিন গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আগমন করল। তাদের সংখ্যা ছিল ১৪ জন। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে হুনাইন যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত গনীমতের সম্পদ ফেরত দেয়ার আবেদন করেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বন্দী অথবা ধনসম্পত্তি- এ দুটির মধ্যে যে কোন একটি ফেরত নিতে বলেন। ফলে তারা বন্দীদেরকে ফেরত নেয়ার জন্য মনস্থির করে। তারপর রাসূলুল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে উদ্দেশ্য করে প্রদত্ত গনীমতের মধ্যে কেবল বন্দীদেরকে ফেরত দেয়ার নির্দেশ প্রদান করে বলেন- দেখো, এ সকল লোক ইসলাম গ্রহণ করে আমাদের কাছে এসেছে এবং আমি এ উদ্দেশ্যে গনীমতের মাল বণ্টনের ক্ষেত্রে কিছু দিন বিলম্বও করেছিলাম। এখন আমি তাদেরকে অধিকার প্রদান করলাম। তবে তারা অন্য কিছুকেই সন্তানাদির সমতুল্য মনে করেনি। অতএব যার নিকট আটককৃত কোন কিছু রয়েছে এবং সন্তুষ্ট চিত্তে যদি সে তা ফেরত দেয়, তাহলে এটাই হবে সবচেয়ে ভালো ব্যবস্থা। আর কেউ যদি নিজ অধিকার আটকে রাখতে চায়, তা হবে তাদেরই আটককৃত। অতএব তাদেরকে সেসব ফিরিয়ে দেবে। আগামীতে সর্বাগ্রে যে গনীমতের সম্পদ অর্জিত হবে, তার মধ্য থেকে ফেরতদানকারীকে ইনশাআল্লাহ অবশ্যই একটির পরিবর্তে ছয়টি দেয়া হবে। ১১০
এতে সাহাবীগণ সকলেই সম্মতি জ্ঞাপন করলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আটককৃত বন্দীদেরকে তাদের হাতে তুলে দেন এবং এ সময় প্রত্যেক বন্দীকে একটি করে কিবতী চাদর দান করলেন।
উমরা পালন ও মদিনায় প্রত্যাবর্তন : তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকেই উমরা পালনের উদ্দেশ্যে ইহরাম বাঁধলেন এবং উমরা পালন করলেন। তারপর আত্তাব বিন আসীদ (রাঃ)-কে মক্কার গভর্নর নিযুক্ত করে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন।
টিকাঃ
১০৯ সহীহ মুসলিম, হা/১৭৭৭; মিশকাত, হা/৫৮৯১।
১১০ সহীহ বুখারী, হা/৪৩২৩।
১১১ যাদল মা'আদ ৩/৪৩৩-৩৪: মাগাযী ১/৮৭০।
১১২ মুসনাদে আহমাদ, হা/২২২৯।
১১০ সহীহ বুখারী, হা/২৩০৮; আবু দাউদ, হা/২৬৯৩।
📄 তাবুক যুদ্ধ
মক্কা বিজয় ও হুনাইনের যুদ্ধের পর মুসলিমগণ আরব গোত্রে এমন প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে, এরপর থেকে কোন তাগুতী শক্তিই তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না। তবে মুসলিমদের শত্রু রোমানরা প্রায়ই মুসলিমদের উত্যক্ত করে যাচ্ছিল। সে সময় তারাই ছিল বিশ্বের মোড়ল। তারাই ছিল সম্পদ ও সৈন্যের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধশালী। ইতিপূর্বে মুতার যুদ্ধের মাধ্যমে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তারা খুবই অস্থির ছিল। উপরন্তু চারদিকে মুসলিমদের জয়ধ্বনি তাদের শরীরে কাঁটার মতো বিদ্ধ করছিল। তাদের এসব আত্মগর্বমূলক মনোবাসনাই তাদেরকে একটি চূড়ান্ত লড়াইয়ের দিকে ধাবিত করে।
সময় ও পরিস্থিতি : সময়টি ছিল ৯ম হিজরী। এসময় পরিস্থিতিও ছিল খুবই নাজুক। কেননা তখন ছিল গ্রীষ্মকাল, চারদিকে ছিল প্রচণ্ড গরম। অনেক মানুষ খুবই অসচ্ছলতা ও দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে গিয়েছিল। অপরদিকে সেখানকার বাগ-বাগিচার ফলমূলও পরিপক্ক হয়ে গিয়েছিল। ফলে বাগ-বাগিচাগুলোতে অবস্থান করাটা মানুষের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এসব কারণে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য তাদের মানসিক কোন প্রস্তুতিও ছিল না। অপরদিকে এ যুদ্ধের যাত্রাপথও ছিল খুবই দূরের এবং কষ্টের।
মুসলিমদের বিরুদ্ধে রোমান ও গাসসানীদের প্রস্তুতির সংবাদ : পরিস্থিতির এমন নাজুক অবস্থায় মুসলিমদের কাছে প্রায়ই সংবাদ আসতে থাকে যে, রোমান ও গাসসানীরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ফলে রোমান ও গাসসানীদের সীমান্তবর্তী অনেক মুসলিমই তাদের ভয়ে আতঙ্কে থাকতেন এবং তারা সার্বিক পরিস্থিতি রাসূলুল্লাহ-কে জানাতেন। এমন টানটান উত্তেজনায় একদিন 'শাম' দেশ থেকে আগত নাবেক বিন ইসমাঈল বংশের এক কাফেলার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ জানতে পারেন যে, রোমের বাদশাহ হিরাকল মুসলিমদের বিরুদ্ধে ৪০ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী একত্রিত করেছেন। আর তাদের সাথে লাখমা, জোযাম এবং আরো কিছু গোত্রও যোগদান করেছে। তাদের অগ্রবর্তী দলটি বালকা নামক স্থানে পৌঁছে গেছে।
ইলার ঘটনা : তাবুক অভিযানে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে আরো একটি মারাত্মক ঘটনা ঘটেছিল। আর সেটি ঘটেছিল এসব টানটান উত্তেজনার মধ্যেই। ঘটনাটি সম্পর্কে উমর (রাঃ) বলেন, আমি এবং মদিনার উপকণ্ঠে বসবাসকারী সম্প্রদায়ের আমার এক আনসারী প্রতিবেশী উমাইয়া ইবনে যায়েদ; আমরা পালাক্রমে নবী -এর সাথে সাক্ষাৎ করতাম। যখন আমি যেতাম, আমি সারাটা দিন ওহী অবতীর্ণসহ অন্যান্য যা কিছু ঘটত; সব সংবাদ তাকে দিতাম এবং সেও অনুরূপ সংবাদ আমাকে দিত। আমরা (কুরাইশরা) নিজেদের স্ত্রীদের উপর প্রভাবশালী ছিলাম। কিন্তু আমরা যখন আনসারদের মধ্যে আসলাম, তখন দেখতে পেলাম, তাদের স্ত্রীগণই তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। অতঃপর ধীরে ধীরে আমাদের স্ত্রীরাও আনসারদের স্ত্রীগণের রীতিনীতি গ্রহণ করতে লাগল। একদিন আমি আমার স্ত্রীর প্রতি 'নারাজ' হলাম এবং উচ্চৈঃস্বরে তাকে কিছু বললে সেও পাল্টা জবাব দিল। সে আমার মুখে মুখে তর্ক করবে এটা আমি অপছন্দ করলাম। তখন সে বলল, আমি আপনার কথার পাল্টা জবাব দিচ্ছি, তা আপনি অপছন্দ করছেন কেন? আল্লাহর শপথ! নবী -এর স্ত্রীগণ তাঁর কথার প্রত্যুত্তর দিয়ে থাকেন এবং তাদের কেউ কেউ আবার পূর্ণ একটা দিন এমনকি রাত পর্যন্ত তাঁর প্রতি অভিমান করে কাটিয়ে দেন।
এ কথা শুনে আমি ঘাবড়ে গেলাম এবং তাকে বললাম, তোমাদের মাঝে যে এরূপ করেছে তার সর্বনাশ হয়েছে! এরপর আমি পোশাক পরিধান করলাম এবং হাফসার কাছে গিয়ে তার ঘরে প্রবেশ করে তাকে বললাম, হে হাফসা! তোমাদের মধ্যে কেউ কি রাসূলুল্লাহ -কে সারাদিন এমনকি রাত পর্যন্ত অসন্তুষ্ট করে রাখে? সে জবাব দিল, হ্যাঁ! আমি বললাম, সে তো ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত হলো। তোমরা কি বেপরোয়া হয়ে গেছ যে, রাসূলুল্লাহ এর অসন্তুষ্টির কারণে আল্লাহ তাঁর সে স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট হতে পারেন এবং পরিণামে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে? সুতরাং নবী-এর নিকট কোন জিনিস অতিরিক্ত দাবি করো না, তাঁর কথার প্রত্যুত্তর করো না এবং তাঁর সাথে (অভিমান করে) কথা বলা বন্ধ করো না। তোমার যদি কোন কিছুর প্রয়োজন হয়, তবে আমার নিকট চেয়ে নিও এবং স্বীয় প্রতিবেশিনীর অনুকরণে অহঙ্কার করো না। কেননা সে তোমার চেয়ে বেশী রূপবতী এবং রাসূলের নিকট প্রিয়। (এখানে প্রতিবেশিনী দ্বারা আয়েশা (রাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে।)
উমর (রাঃ) আরো বললেন, এ সময় আমাদের মধ্যে গুঞ্জন হতে লাগল যে, (সিরিয়ার) গাসসান সম্প্রদায় আমাদের উপর আক্রমণ চালানোর জন্য তাদের ঘোড়াগুলোকে প্রস্তুত করছে। একদিন আমার আনসার সঙ্গী তার পালার দিন নবী -এর খেদমতে হাজির থেকে রাতে ফিরে এসে আমার দরজায় খুব জোরে আঘাত করল এবং প্রশ্ন করল, আমি ঘরে আছি কি না? আমি ভীত হয়ে তার নিকট বেরিয়ে এলাম। সে বলল, আজ এক সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে গেছে। আমি বললাম, তা কী? গাসসানীরা কি এসে গেছে? সে বলল, না- বরং তার চেয়েও সাংঘাতিক ও ভয়ংকর ঘটনা। রাসূলুল্লাহ আলাইহি তাঁর স্ত্রীগণকে তালাক দিয়েছেন। আমি বললাম, হাফসা তো ধ্বংস হলো এবং ব্যর্থ হলো। এরপর আমি পোশাক পরিধান করলাম এবং ফজরের নামায নবী -এর সাথে আদায় করলাম। নামায শেষে নবী মাচানে আরোহণ করলেন এবং সেখানে একাকী বসে রইলেন। আমি হাফসার নিকট গেলাম, তখন সে কাঁদছিল। আমি প্রশ্ন করলাম, কাঁদছ কেন? আমি কি তোমাকে এ ব্যাপারে আগেই সতর্ক করিনি? রাসূলুল্লাহ আলাইহি কি
তোমাদেরকে তালাক দিয়েছেন? সে বলল, আমি জানি না। তিনি মাচানের উপরে একাকী আছেন। অতঃপর আমি সেখান থেকে বেরিয়ে এসে মিম্বরের নিকট আসলাম যেখানে একদল লোক বসা ছিল এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ কাঁদছিল। আমি তাদের নিকট কিছুক্ষণ বসলাম, কিন্তু আমার অন্তর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অসহ্য হয়ে পড়ছিল। সুতরাং যে মাচানে নবী অবস্থান করছিলেন আমি সেখানে গিয়ে তাঁর গোলামকে বললাম, উমরের জন্য প্রবেশের অনুমতি চাও। সে নবী আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর কাছে গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলার পর ফিরে এসে বলল, আমি নবী -এর সঙ্গে কথা বলেছি এবং আপনার কথা উল্লেখ করেছি, কিন্তু তিনি নিরুত্তর রয়েছেন।
অতঃপর আমি ফিরে আসলাম এবং মিম্বরের নিকট যেখানে একদল লোক বসা ছিল, সেখানে বসলাম। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে অসহ্য করে তুলেছে। তাই আবার এসে গোলামকে বললাম, উমরের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করো। সে গেল এবং ফিরে এসে বলল, আমি তাঁর কাছে আপনার কথা বলেছি, কিন্তু তিনি নিরুত্তর রয়েছেন। আমি আবার ফিরে এসে মিম্বরের নিকট উপবিষ্ট লোকদের সাথে বসলাম। কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে অসহ্য করে তুলল। ফলে আমি আবারও এসে গোলামকে বললাম, উমরের জন্য প্রবেশের অনুমতি চাও। সে গেল এবং ফিরে এসে বলল, আমি আপনার কথা উল্লেখ করেছি, কিন্তু তিনি কোন উত্তর দেননি।
অবশেষে যখন আমি ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি, এমন সময় সে আমাকে ডেকে বলল, নবী আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ এর নিকট প্রবেশ করলাম, তিনি খেজুর পাতার চাটাইয়ের উপরে শুয়ে আছেন এবং তাতে কোন চাদর বিছানো ছিল না। তাঁর শরীরে চাটাইয়ের দাগ স্পষ্ট হয়ে রয়েছে এবং তিনি খেজুর গাছের পাতা ভর্তি একটি বালিশে ভর দিয়ে আছেন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম এবং দাঁড়ানো অবস্থাতেই বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি আপনার স্ত্রীদেরকে তালাক দিয়েছেন? তিনি আমার দিকে চোখ ফিরিয়ে বললেন, না। আমি বললাম, আল্লাহু আকবার!
এরপর আমি দাঁড়ানো অবস্থাতেই পরিবেশ হালকা করার লক্ষ্যে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি মেহেরবানী করে আমার কথার দিকে একটু মনোযোগ দিতেন। আমরা কুরাইশরা নারীদের উপর দাপট খাটাতাম। কিন্তু আমরা মদিনায় আসার পর দেখলাম যে, এখানকার নারীরা পুরুষদের অধীন করে রেখেছে। (এ কথা শুনে) নবী মুচকি হাসলেন। অতঃপর আমি আবার বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি আমার কথা একটু খেয়াল করে শুনতেন। তারপর বললাম, আমি হাফসার নিকট গেলাম এবং তাকে বললাম, তুমি তোমার সঙ্গীনীর (আয়েশার) অনুকরণে অভিমানী হয়ো না।
সে তোমার চেয়ে অধিক রূপবতী এবং নবী এর নিকট অধিক প্রিয়। নবী আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় মুচকি হাসলেন। আমি তাঁকে হাসতে দেখে বসে পড়লাম। এরপর আমি তাঁর ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম। আল্লাহর শপথ! আমি তাঁর ঘরে তিনটি চামড়া ব্যতীত উল্লেখযোগ্য কিছুই দেখতে পেলাম না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি দু'আ করুন, যাতে আল্লাহ আপনার উম্মতকে ধনসম্পদ দান করেন। কেননা পারস্য এবং রোমকদের (যথেষ্ট) পরিমাণের ধনসম্পদ দেয়া হয়েছে। অথচ তারা আল্লাহর ইবাদাত করে না। (এ কথা শুনে) নবী সোজা হয়ে বসলেন, (এতক্ষণে) তিনি ঠেস দিয়ে বসা ছিলেন, অতঃপর বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র! এটা কি তোমার অভিমত? এরা হচ্ছে সেসব লোক, যারা তাদের ভাল কাজের বিনিময় এ দুনিয়ায় পাচ্ছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ক্ষমার জন্য আল্লাহর নিকট দু'আ করুন। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
এভাবে নবী ২৯ দিন পর্যন্ত তাঁর স্ত্রীগণ থেকে পৃথক থাকেন। কেননা ইতিপূর্বে রাসূলুল্লাহ হাফসা (রাঃ)-কে একটি কথা গোপন রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি সে কথা আয়েশা (রাঃ) এর নিকট বলে দেন। অতঃপর যখন আল্লাহ তা'আলা তাঁকে মৃদু ভর্ৎসনা করলেন, তখন তাদের প্রতি রাগের কারণে নবী আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, আমি এক মাসের জন্য তাদের (স্ত্রীগণের) নিকট যাব না। সুতরাং ২৯ দিন হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি সর্বপ্রথম আয়েশার কাছে গেলেন। তখন আয়েশা (রাঃ) তাঁকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কসম করেছেন যে, এক মাসের মধ্যে আমাদের নিকট আসবেন না, কিন্তু এখন ২৯ দিন হয়েছে মাত্র। আমি দিনগুলো এক এক করে হিসাব করে রেখেছি। নবী বলেন, ২৯ দিনেও মাস হয়। বর্ণনাকারী বলেন, ঐ মাসটি ছিল ঊনত্রিশ দিনের। আয়েশা (রাঃ) আরো বলেন, তখন আল্লাহ তা'আলা (নবীর সাথে থাকা বা না থাকার) ইখতিয়ার সম্বলিত আয়াত অবতীর্ণ করলেন এবং তিনি স্ত্রীগণের মধ্যে সর্বপ্রথম আমাকে দিয়েই আরম্ভ করেন। আর আমি নবীকেই গ্রহণ করলাম। অতঃপর তিনি সকল স্ত্রীকেই ইখতিয়ার দিলেন এবং প্রত্যেকেই তাই বলল, যা আয়েশা (রাঃ) বলেছিলেন। ১১৪ সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লাম
মুনাফিকদের চক্রান্ত ও মসজিদে যেরার নির্মাণ: এদিকে মুনাফিকরাও অনবরত তাদের চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছিল। যদিও তারা ভালো করেই জানত যে, তাদের সকল প্রকার চক্রান্ত রাসূলুল্লাহ এর কাছে ব্যর্থ। এরপরও তারা মুসলিমদের এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে নিজেদের চক্রান্ত পরিচালনার জন্য একটি নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ফলে তারা পরিকল্পনা মোতাবেক নামায আদায়ের সহজতার অজুহাত দেখিয়ে তাদের এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি প্রার্থনা করে। আর যেহেতু এ কঠিন পরিস্থিতিতে তাদেরকে নিয়ে পৃথকভাবে ভাবার সময় ছিল না, তাই তিনিও স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদেরকে অনুমতি দিয়ে দেন। অতঃপর তারা মসজিদ নির্মাণ করে উদ্বোধনের জন্য রাসূলুল্লাহ -কে দাওয়াত দিলে তিনি যুদ্ধের অজুহাতে তাদেরকে এড়িয়ে যান।
যুদ্ধের জন্য মুসলিমদের প্রস্তুতি : রাসূলুল্লাহ এসব সংকটময় পরিস্থিতি খুব মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিলেন এবং প্রয়োজন অনুসারে মুসলিমদেরকে নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি যখন চূড়ান্ত রূপ নিচ্ছিল এমনি মুহূর্তে একদিন রাসূলুল্লাহ সাহাবায়ে কেরামকে রোমানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার জন্য পরিপূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করার নির্দেশ দেন এবং মক্কার বিভিন্ন গোত্র ও অধিবাসীদেরকে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সংবাদ প্রেরণ করেন।
এদিকে যেহেতু সে সময়টি ছিল খুবই সংকটময়, ফলে অনেকের কাছেই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য আরোহী পর্যন্তও ছিল না। যার কারণে অনেকেই রাসূলুল্লাহ এর কাছে আরোহী অথবা অস্ত্রের জন্য আবেদন করতেন। অপরদিকে আল্লাহ তা'আলা সাদাকার ফযীলত বর্ণনা করে আয়াত নাযিল করেন। ফলে সাহাবীগণ উৎসাহিত হয়ে সাদাকার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ সামর্থানুযায়ী সর্বোচ্চ পরিমাণ সাদাকা করতে থাকেন। এমনকি মহিলারাও তাদের ব্যবহৃত অলংকার সাদাকা করতে থাকে। এ সময় কেবল উসমান (রাঃ) ১ হাজার স্বর্ণমুদ্রা, ৯০০ উট এবং ১০০ ঘোড়া দান করেছিলেন। ১১৫ উমর (রাঃ) দান করেছিলেন তার সম্পূর্ণ সম্পত্তির অর্ধেক এবং আবু বকর (রাঃ) দান করেছিলেন তার সমস্ত সম্পদ, যদিও তা ছিল পরিমাণে অন্যদের থেকে অনেক কম। ১১৬
এছাড়াও আব্বাস, তালহা, সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস ও মুহাম্মাদ বিন মাসলামা (রাঃ) সহ প্রায় সাহাবীই এ সাদাকায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। এমনকি কোন কোন সাহাবী এক মুদ অথবা দুই মুদ পরিমাণও সম্পদ সাদাকা করেন। সে সময় কেবল মুনাফিকরাই কোন প্রকার দান-সাদাকায় অংশগ্রহণ করেনি; বরং উল্টো তারা দান-সাদাকার কারণে কতক সাহাবীকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছিল।
তাবুকের পথে যাত্রা:
প্রস্তুতি শেষে রাসূলুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা (রাঃ)-কে মদিনার গভর্নর নিযুক্ত করে তাবুকের পথে যাত্রা শুরু করেন। আর নিজ পরিবারের দেখাশোনা করার জন্য আলী (রাঃ)-কে মদিনায় রেখে যান। এ সময় মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। ইতিপূর্বে কোন যুদ্ধে এত বেশি সংখ্যক সৈন্য একত্রিত হয়নি। ব্যাপক প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও যাত্রাপথে মুসলিমগণকে চরম খাদ্য সংকটের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। কোন কোন সময় তাঁদেরকে গাছের পাতা খেয়েও সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল। তাবুকের পথে যাত্রার সময় মুসলিমদেরকে সামুদ জাতির বসবাসের এলাকা দিয়ে গমন করতে হয়েছিল। তখন তাঁরা আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে সে এলাকা অতিক্রম করেছিলেন। ১১৭ যাত্রাপথে রাসূলুল্লাহ যোহর ও আসর এবং মাগরিব ও এশার নামায একত্রে আদায় করেছিলেন। ১১৮
তাবুকের বুকে মুসলিম শিবির :
এভাবে মুসলিমগণ তাবুকে গিয়ে অবতরণ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ আলাইহি সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ প্রদান করেন। এতে মুসলিমগণ নিজেদের সংকটের কথা ভুলে গিয়ে যুদ্ধের জন্য আরো তৎপর হয়ে উঠেন। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ আলাইহি ও তাঁর বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে শত্রু বাহিনীর মনে চরম ভীতি সঞ্চার হয়। ফলে তারা যুদ্ধ করার সাহস হারিয়ে ফেলে এবং বিক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
বিভিন্ন গোত্রের সাথে সন্ধিচুক্তি:
মুসলিম বাহিনীর আগমন এবং রোমান বাহিনীর পিছু হটার কারণে আশেপাশের গোত্রগুলো রোমান শক্তির উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে। ফলে তারা রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর সাথে সন্ধিচুক্তি করার জন্য এগিয়ে আসে। আয়লার গভর্নর ইয়াহনাহ বিন রুবা রাসূলুল্লাহ আলাইহি এর কাছে উপস্থিত হয়ে কর দানের স্বীকৃতি জ্ঞাপন পূর্বক সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করে। জারবা ও আজরুহ এর অধিবাসীরা অনুরূপ চুক্তি সম্পাদন করে এবং রাসূলুল্লাহ এর কাছ থেকে লিখিত প্রমাণপত্র গ্রহণ করে। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর নেতৃত্বে ৪২০ জন সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দুমাতুল জান্দালের শাসক উকাইদকে আটক করে আনেন এবং তার কাছ থেকে নগদ সম্পদ গ্রহণ পূর্বক সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য করেন।
মদিনায় প্রত্যাবর্তন: এভাবে রাসূলুল্লাহ পূর্ণ পঞ্চাশ দিন অতিবাহিত করার পর কোন ধরনের সংঘর্ষ ও রক্তক্ষয় ছাড়াই মদিনার দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। পথিমধ্যে মুনাফিকরা সুযোগ পেয়ে রাসূলুল্লাহ -কে হত্যা করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা করে। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাদের পরিচয় ফাঁস করে দেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ যখন মদিনায় পৌঁছলেন, তখন মহিলা ও কিশোররা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নানা ধরনের কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানান।
উল্লেখ্য যে, এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ এর জীবনের শেষ যুদ্ধ, যাতে তিনি স্বশরীরে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
মসজিদে যেরার ধ্বংসকরণ: রাসূলুল্লাহ যখন সাহাবীদেরকে নিয়ে তাবুক যুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন, তখন মুনাফিকরা তাদের এলাকায় নির্মিত মসজিদে বসে ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তে নেমে পড়ে এবং নিজেদের মধ্যে জোট গঠন করতে শুরু করে। তাদের এহেন কুকর্ম ধূলিসাৎ করে দেয়ার জন্য তাবুক যুদ্ধ থেকে মদিনায় প্রত্যাবর্তনের পথে 'যী আওয়ান' নামক স্থানে পৌঁছলেই আল্লাহ তা'আলা মুনাফিকদের ব্যাপারে নির্দেশনা সম্বলিত আয়াত নাযিল করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন,
وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مَسْجِدًا ضِرَارًا وَكُفْرًا وَتَفْرِيقًا بَيْنَ الْمُؤْمِنِينَ وَارْصَادًا لِمَنْ حَارَبَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ مِنْ قَبْلُ وَلَيَحْلِفُنَّ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا الْحُسْنَى وَاللَّهُ يَشْهَدُ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ - لَا تَقُمْ فِيْهِ أَبَدًا لَمَسْجِدٌ أُسِّسَ عَلَى التَّقْوَى مِنْ أَوَّلِ يَوْمٍ أَحَقُّ أَنْ تَقُوْمَ فِيْهِ فِيْهِ رِجَالٌ يُحِبُّونَ أَنْ يَتَطَهَّرُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُطَهِّرِينَ
যারা (মুসলিমদের) ক্ষতিসাধন, কুফরী ও মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং ইতিপূর্বে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে তার গোপন ঘাঁটিস্বরূপ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে মসজিদ নির্মাণ করেছে, অবশ্যই তারা শপথ করে বলবে যে, আমরা সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই এটা (নির্মাণ) করেছি; (কিন্তু) আল্লাহ সাক্ষী যে, নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী। তুমি কখনো তাতে (সালাতে) দাঁড়িও না; যে মসজিদের ভিত্তি প্রথম দিন হতেই তাকওয়ার উপর স্থাপিত হয়েছে, সেটাই তোমার সালাতের জন্য অধিক যোগ্য। সেখানে এমন লোক রয়েছে, যারা পবিত্রতা অর্জন করতে ভালোবাসে; আর আল্লাহ পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে পছন্দ করেন। (সূরা তওবা- ১০৭, ১০৮)
ফলে রাসূলুল্লাহ সাথে সাথেই কয়েকজন সাহাবীকে দায়িত্ব দিয়ে মদিনায় প্রেরণ করে তাদের নির্মিত সেই মসজিদটি ধূলিসাৎ করে দেন।
পেছনে পড়ে যাওয়া লোকদের শাস্তি:
তাবুক যুদ্ধ ছিল আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে চরম পরীক্ষার একটি যুদ্ধ। যদিও এ যুদ্ধে কোন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয় নাই, তবুও আল্লাহ তা'আলা ঈমানদার ব্যক্তিদেরকে সুস্পষ্টভাবে যাচাই করে নিয়েছিলেন। ফলে যাদের অন্তরে সামান্য কপটতা ছিল, তাদের বিষয়গুলো প্রকাশ পেয়ে গেল। কিন্তু তিনজন সাহাবী এমন ছিলেন যে, তাদের ঈমানের মধ্যে কোন ধরনের ত্রুটি ছিল না, এরপরও সামান্য কারণে তারা পেছনে পড়ে গিয়েছিলেন। ফলে আল্লাহ তা'আলা তাদের তওবা কবুলের ব্যাপারে কিছুটা বিলম্ব করেন। নিম্নে সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী ঘটনাটি বিস্তারিত বর্ণনা করা হলো : কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যতগুলো যুদ্ধ করেছেন, তন্মধ্যে তাবুক ও বদর ছাড়া আর কোনটাতেই আমি অনুপস্থিত থাকিনি। তবে বদর যুদ্ধে যারা পেছনে থেকে গিয়েছিলেন, তাদের কারো উপর আল্লাহর আক্রোশ পতিত হয়নি। বদর যুদ্ধে মূলত রাসূলুল্লাহ এর উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশ কাফিলার পশ্চাদ্ধাবন করা (যুদ্ধের উদ্দেশ্য নয়)। তবে হঠাৎ আল্লাহ তা'আলা মুসলিমদেরকে তাদের শত্রুর মুখোমুখি করে দেন, যাতে করে যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
আর লাইলাতুল আকাবায় (আকাবার রাতে) আমি রাসূলুল্লাহ এর সাথে উপস্থিত ছিলাম। তিনি ইসলামের উপর সুদৃঢ়ভাবে কায়িম থাকার জন্য আমাদের কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করেন। যদিও বদর যুদ্ধ লোকদের কাছে বহুল আলোচিত, তবুও আকাবার রাত আমার কাছে অধিক প্রিয়।
আর তাবুক যুদ্ধে পিছিয়ে থাকার কারণস্বরূপ বলা যায়, এ যুদ্ধের সময় আমি (অন্য সময়ের চেয়ে) বেশি শক্তিশালী ও সচ্ছল অবস্থায় ছিলাম। আল্লাহর কসম! ইতিপূর্বে আমার কাছে কখনো এক সাথে দুটি সওয়ারী ছিল না। অথচ এ যুদ্ধের প্রাক্কালে আমি দুটি সওয়ারীর মালিক হয়ে গিয়েছিলাম। রাসূলুল্লাহ এর নিয়ম ছিল, যখনই তিনি কোন যুদ্ধের সংকল্প করতেন, কখনো পরিষ্কারভাবে সে যুদ্ধের স্থান, এলাকা ও কোন নিদর্শন জানাতেন না (বরং কিছু অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থক শর্ত বলে দিতেন), কিন্তু এ যুদ্ধের সময় ভীষণ গরম ছিল এবং পথ ছিল সুদীর্ঘ। আর স্থানটি ছিল পানি, গাছ-পালা ও লতা-পাতা শূন্য। শত্রুর সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। কাজেই রাসূলুল্লাহ এ যুদ্ধ সম্পর্কে মুসলিমদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন, যাতে তারা ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে। এ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ এর সাথে বিপুল সংখ্যক মুসলিম সেনা অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে কোন কিতাব অথবা রেজিষ্ট্রার খাতা ছিল না, যার মধ্যে সবার নাম লিপিবদ্ধ রাখা হত।
কা'ব (রাঃ) বলেন, এ যুদ্ধ থেকে অনুপস্থিত থাকার ইচ্ছা পোষণ করে এমন একটি লোকও ছিল না। তবে সাথে সাথে তারা এও মনে করত, কেউ যদি এ যুদ্ধে অনুপস্থিত থেকে যায়, তাহলে আল্লাহর ওহী না আসা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ জানতে পারবেন না। এ যুদ্ধের প্রস্তুতি রাসূলুল্লাহ এমন এক সময় শুরু করেন, যখন ফল পেকে গিয়েছিল এবং ছায়ায় বসা আরামদায়ক মনে হত। রাসূলুল্লাহ এবং তাঁর সাথে থাকা মুসলিমগণ ব্যাপকভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
অন্যদিকে আমি প্রতিদিন সকালে তাদের সাথে প্রস্তুতি নেয়ার কথা চিন্তা করতাম। সারাদিন চলে যেত, কিন্তু কিছুই করতাম না। আমি মনে মনে বলতাম, আমি তো যে কোন সময় প্রস্তুত হওয়ার ক্ষমতা রাখি। কাজেই এত তাড়াহুড়া কিসের? এভাবে দিন অতিবাহিত হয়ে চলল।
একদিন সকালে রাসূলুল্লাহ মুসলিমদেরকে নিয়ে রওয়ানা দিলেন। অথচ তখনো কোন প্রকার প্রস্তুতি আমি নেইনি। আমি মনে মনে বললাম, এই তো দু'এক দিনের মধ্যে প্রস্তুতি নিয়ে পথিমধ্যে তাঁদেরকে ধরে ফেলব। তাই তাঁদের রওয়ানা হয়ে যাওয়ার পর দিন সকালে আমি যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে চাইলাম, কিন্তু দিন চলে গেল, আমি প্রস্তুতি নিতে পারলাম না। দিনের পর দিন আমার এ অবস্থা চলতে থাকল। এখন তো সবাই অনেক দূরে চলে গেছে। আমি কতবার ইচ্ছা করলাম যে, বের হয়ে আমি তাঁদেরকে ধরে ফেলি। আহা! যদি এমনটি করতাম, তাহলে কতই না ভালো হত, কিন্তু তা আমার ভাগ্যে ছিল না।
রাসূলুল্লাহ এর চলে যাওয়ার পর আমি যখন শহরের লোকদের মাঝে বের হতাম, তখন পথে-ঘাটে কেবল মুনাফিকদেরকে অথবা দুর্বল হওয়ার কারণে আল্লাহ যাদেরকে অক্ষম করে দিয়েছেন তাদেরকে দেখতে পেতাম। এদের ছাড়া আর কাউকে আমি পথে-ঘাটে দেখতাম না। তখন আমার মনে ভীষণ দুঃখ হত।
এ দিকে রাসূলুল্লাহ পথে কোথাও আমার কথা জিজ্ঞেস করলেন না। তবে তাবুকে পৌঁছে যখন সবাইকে নিয়ে বসলেন, তখন আমার কথা জিজ্ঞেস করে বললেন, কা'ব ইবনে মালিকের কী হলো? বনু সালামার জনৈক ব্যক্তি [আবদুল্লাহ ইবনে আনাস (রাঃ)] বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! নিজের সৌন্দর্যের প্রতি মোহ ও অহংকার তাকে আটকে দিয়েছে। মুয়ায ইবনে জাবাল (রাঃ) বললেন, তুমি তো ভালো কথা বললে না। আল্লাহর কসম! আমরা তার ব্যাপারে ভালো ছাড়া আর কিছুই জানি না। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ চুপ করে রইলেন।
কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, যখন আমি জানতে পারলাম, রাসূলুল্লাহ তাবুক যুদ্ধ হতে (বিজয়ীবেশে) ফিরে আসছেন। তখন আমি মনে মনে চিন্তা করতে লাগলাম, এমন কোন মিথ্যা বাহানা করা যায় কি না, যাতে আমি তাঁর ক্রোধ থেকে বাঁচতে পারি। এ উদ্দেশ্যে আমি পরিবারের বুদ্ধিমান লোকদের পরামর্শ চাইলাম, কিন্তু যখন শুনলাম, রাসূলুল্লাহ মদিনার একেবারে নিকটে এসে গেছেন, তখন আমার মন থেকে মিথ্যা বাহানাবাজি করার চিন্তা একেবারে উড়ে গেল। আমি বিশ্বাস করলাম, মিথ্যা বাহানাবাজি আমাকে তাঁর ক্রোধ থেকে বাঁচাতে পারবে না। কাজেই আমি সত্য কথা বলতে মনস্থ করলাম।
আলাইহি ওয়াসাল্লাম
সান্তায়ার ওয়াসাল্লাম
অতঃপর একদিন সকালে রাসূলুল্লাহ মদিনায় পৌঁছে গেলেন। তাঁর নিয়ম ছিল, যখনই তিনি কোন সফর থেকে ফিরে আসতেন, প্রথমে মসজিদে নববীতে যেতেন। সেখানে দু'রাক'আত নামায পড়তেন, তারপর লোকদের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বসে থাকতেন।
অয়াসাল্লাম
নিজের নিয়মানুসারে যখন তিনি মসজিদে উপস্থিত হয়ে নামায শেষে বসে গেলেন, তখন তাবুক যুদ্ধ থেকে পিছিয়ে থাকা লোকেরা আসতে লাগল, নিজেদের ওজর পেশ করতে লাগল এবং কসম করতে লাগল। এদের সংখ্যা ছিল ৮০ এর চেয়েও কিছু বেশি। রাসূলুল্লাহ তাদের ওজর কবুল করে তাদের কাছ থেকে পুনরায় বাই'আতও নিলেন। তাদের জন্য মাগফিরাতের দু'আ করলেন এবং তাদের মনের গোপন বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করলেন।
আলাইহি
কা'ব বলেন, এ সময় আমি তাঁর কাছে আসলাম। আমি সালাম দিতেই মুচকি হেসে তিনি জবাব দিলেন। তারপর বললেন, আসো আসো! আমি গিয়ে তাঁর সামনে বসে পড়লাম। তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, তোমাকে কিসে পেছনে আটকে রেখেছিল? তুমি সওয়ারী কিনেছিলে? আমি বললাম, আমি অবশ্যই সওয়ারী কিনেছিলাম। তবে আল্লাহর কসম! যদি আমি আপনাকে ছাড়া দুনিয়ার অন্য কোন লোকের সামনে বসতাম, তাহলে তার ক্রোধ থেকে বাঁচার জন্য কোন মিথ্যা ওজর পেশ করে নিজেকে বাঁচিয়ে নিতাম। কেননা কথা বলার ব্যাপারে আমি কম পারদর্শী নই; কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি জানি, আজ যদি আমি মিথ্যা বলে আপনাকে খুশি করে যাই, তাহলে কাল আল্লাহ আপনাকে আমার উপর অসন্তুষ্টি করে দেবেন। আর আজ যদি আমি আপনার সামনে সত্য কথা বলে যাই, তাতে আপনি অসন্তুষ্টি হলেও, আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা লাভের আশা আছে। তাই আমি সত্য কথা বলছি। আল্লাহর কসম! পিছিয়ে থাকার ব্যাপারে আমার কোন ওজর ছিল না। আল্লাহর কসম! আমি যখন আপনাদের থেকে পেছনে থেকে যাই, তখনকার মতো আর কোন সময় আমি ততটা শক্তি সামর্থের অধিকারী ছিলাম না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বললেন, কা'ব সত্য কথাই বলেছে। ঠিক আছে, এখন চলে যাও। দেখি, আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কী ফায়সালা দেন।
আলাইহি
কা'ব বলেন, আমি উঠে পড়লাম। বানু সালামার লোকেরাও আমার সাথে সাথে চলে আসলো। তারা আমাকে বলল, আল্লাহর কসম! আমরা তো এ পর্যন্ত তোমার কোন গুনাহের কথা জানি না। পেছনে থেকে যাওয়া অপরাপর লোকদের মতো তুমিও রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে একটা বাহানা উপস্থাপন করতে পারলে না? তারপর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ইস্তিগফার তোমার গুনাহের জন্য যথেষ্ট হত? আল্লাহর কসম! তারা বার বার আমাকে উসকানি দিতে থাকল। এমনকি এক পর্যায়ে আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে ফিরে আসতে এবং আমার প্রথম কথা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে মনস্থ করলাম।
তারপর আমি তাদেরকে বললাম, আচ্ছা! আমার মতো ভুল স্বীকার করেছে, এমন আর কাউকে কি তোমরা সেখানে দেখেছ? তারা জবাব দিল, হ্যাঁ-দু'জন লোককে আমরা দেখেছি, তারাও তোমার মতোই বলেছে। আর তাদেরকেও ঠিক সে কথাই বলা হয়েছে, যা তোমাকে বলা হয়েছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা তারা কারা? তারা জবাব দিলেন, তারা দু'জন হচ্ছেন মুররাহ ইবনে রাবী 'আল-আমাবী এবং হিলাল ইবনে উমাইয়াহ আল-ওয়াকিফী। তারা আমার কাছে এমন দু'জন লোকের কথা বলল, যারা ছিলেন সৎ এবং বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও আদর্শস্থানীয় ব্যক্তি। তাদের দু'জনের কথা যখন তারা আমাকে শোনাল (তখন আমি মনে মনে স্বস্তি অনুভব করলাম), তারপর আমি চলতে শুরু করলাম।
এদিকে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাবুক যুদ্ধে পেছনে থেকে যাওয়া আমাদের এ তিন জনের সাথে কথাবার্তা বলা সকল মুসলিমের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দিলেন। কাজেই লোকেরা আমাদেরকে এড়িয়ে চলতে লাগল। মনে হচ্ছে তারা যেন আমাদেরকে একেবারেই চেনেন না। অবশেষে আমার এমন মনে হতে লাগল, যেন দুনিয়ার সবকিছু বদলে গেছে। এভাবে আমাদের উপর দিয়ে পঞ্চাশটি রাত অতিবাহিত হয়ে গেল। আমার অন্য ভাই দু'টি তো ঘরেই বসে রইলেন এবং কান্নাকাটি করতে লাগলেন। তবে আমি ছিলাম যুবক ও সাহসী। তাই আমি বাইরে বের হতাম, মুসলিমদের সাথে নামাযে যোগ দিতাম ও বাজারে ঘুরাফেরা করতাম; কিন্তু কেউ আমার সাথে কথা বলতেন না।
আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে আসতাম। তিনি নামাযের পর মজলিসে বসতেন। আমি তাঁকে সালাম দিতাম। আমি মনে মনে বলতাম, আমার সালামের জবাবে তাঁর ঠোঁট নড়ল কি নড়ল না। তারপর আমি তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে নামায পড়তাম। আমি বাঁকা দৃষ্টিতে লুকিয়ে লুকিয়ে তাঁকে দেখতাম। আমি দেখতাম, যখন আমি নামাযে নিমগ্ন থাকি তখন তিনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আমি যখন তাঁর দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন চলে গেল।
এভাবে লোকদের বিমুখতা আমাকে দিশেহারা করে তুলল। তাই একদিন আমার চাচাত ভাই আবু কাতাদার বাগানের দেয়াল টপকে তার কাছে গেলাম। সে ছিল আমার কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। আমি তাকে সালাম দিলাম, কিন্তু আল্লাহর কসম! সে আমার সালামের জবাব দিল না। আমি তাকে বললাম, হে আবু কাতাদা! আল্লাহর দোহাই দিয়ে আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কি জান না, আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসি? সে চুপ করে থাকল। আমি আবার আল্লাহর নামে কসম খেয়ে তাকে এ প্রশ্ন করলাম। এবার সে জবাব দিল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। এ সময় আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। আমার দু'চোখ থেকে অঝোর ধারায় পানি পড়তে থাকল। অতঃপর আমি দেয়াল টপকে ফিরে এলাম।
একদিন আমি মদিনার বাজারে হাঁটছিলাম। তখন সিরিয়ার জনৈক খ্রিস্টান কৃষক মদিনার বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রয় করতে এসেছিল। সে লোকদেরকে জিজ্ঞেস করছিল, কে আমাকে কা'ব ইবনে মালিকের ঠিকানা বলে দিতে পারবে? লোকেরা তাকে ইশারা করে আমাকে দেখিয়ে দিল। অতঃপর সে আমার কাছে এসে গাসসানের রাজা কর্তৃক প্রেরিত একটি চিঠি দিল। চিঠিতে রাজা লিখেছে, আমি জানতে পেরেছি, আপনার নেতা আপনার উপর নির্যাতন চালাচ্ছেন। অথচ আল্লাহ আপনাকে লাঞ্চনা ও অবমাননাকর অবস্থায় রাখেননি। আপনি আমাদের এখানে চলে আসুন, আমরা আপনাকে মর্যাদা ও আরামের সাথে রাখব। চিঠিখানা পড়ে আমি মনে মনে বললাম, এটা আর এক পরীক্ষা। কাজেই পত্রটি আমি তন্দুরের আগুনে নিক্ষেপ করলাম। এভাবে পঞ্চাশদিনের মধ্যে চল্লিশদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। এ সময় রাসূলুল্লাহ এর বার্তাবাহক আমার কাছে এসে বললেন, রাসূলুল্লাহ্ তোমাকে স্ত্রী থেকেও পৃথক হয়ে যাওয়ার আদেশ করেছেন। আমি বললাম, আমি কি তাকে তালাক দেব? তিনি বললেন, না- তুমি তাকে তালাক দেবে না; তবে তার থেকে আলাদা থাকো। তখন আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, তুমি নিজের আত্মীয়দের কাছে চলে যাও। আল্লাহ আমার ব্যাপারে কোন ফায়সালা না দেয়া পর্যন্ত তাদের সাথে অবস্থান করো। এদিকে আমার অন্য দু'জন সাথির কাছেও এ মর্মে বার্তাবাহক পাঠানো হয়।
কা'ব বলেন, হিলাল ইবনে উমাইয়া (রাঃ) এর স্ত্রী (এ খবর পাওয়ার পর) রাসূলুল্লাহ এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! হিলাল ইবনে উমাইয়া অতি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছে। তার কোন খাদেম নেই। যদি আমি তার খেদমত করি ও তার কাজে সহায়তা করি, তাহলে কি কোন ক্ষতি আছে? তিনি জবাব দিলেন, না- কোন ক্ষতি নেই। তবে সে যেন তোমার কাছে না আসে। হিলাল ইবনে উমাইয়ার স্ত্রী বললেন, আল্লাহর কসম! তার মধ্যে এ
ধরনের কোন আকাঙ্ক্ষা-আকর্ষণ নেই। বরং যেদিন থেকে এ ঘটনা ঘটেছে, সেদিন থেকে সে কেঁদেই চলেছে, আজও কাঁদছে।
কা'ব বলেন, আমাকেও আমার পরিবারের কেউ কেউ বলল, তুমি রাসূলুল্লাহ এর কাছে যাও, অনুমতি নিয়ে আসো, যাতে তোমার স্ত্রী তোমার খেদমত করতে পারে, যেমন হিলাল ইবনে উমাইয়ার স্ত্রী স্বামীর খেদমতের অনুমতি নিয়ে এসেছে। আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহ এর কাছ থেকে কোন অনুমতি আনতে যাব না। জানি না, আমি যখন এ ব্যাপারে অনুমতি চাইব, তখন রাসূলুল্লাহ কী বলবেন? কারণ আমি একজন যুবক।
এভাবে আরো দশ রাত অতিবাহিত হয়ে পঞ্চাশতম রাত্রিও অতিবাহিত হয়ে গেল। অতঃপর আমি পরের দিন সকালে ফজরের সালাত আদায় করলাম। তারপর আমি ঘরের সামনে বসে ছিলাম। আমার মনের অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুণ। মনে হচ্ছিল, জীবন ধারণ আমার জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। পৃথিবী যেন তার সমস্ত বিস্তীর্ণতা ও প্রশস্ততা সত্ত্বেও আমার জন্য অত্যন্ত সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। এমন সময় আমি 'সালআ' পাহাড়ের উপর থেকে একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম- কে একজন যেন খুব জোরে চিৎকার করে বলছেন, হে কা'ব ইবনে মালিক! সুসংবাদ গ্রহণ করো। কা'ব বলেন, আমি তখনই আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হলাম। আমি বুঝতে পারলাম, এবার আমার সংকট কেটে গেছে। এদিকে রাসূলুল্লাহ ফজরের নামাযের পর ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, আল্লাহ আমাদের তওবা কবুল করেছেন। কাজেই লোকেরা মুবারকবাদ দেয়ার জন্য আমার কাছে আসতে লাগল। একইভাবে আমার অন্য দু' সাথির কাছেও তারা যেতে লাগল। একজন তো ঘোড়ায় চড়ে এক দৌড়ে আমার কাছে আসলেন। আর আসলাম গোত্রের এক ব্যক্তি দৌড়ে পাহাড়ের উপর উঠলেন। তার কথা অশ্বারোহীর চেয়ে দ্রুততর হল। তার সুসংবাদ শুনে আমি এতই খুশি হয়েছিলাম যে, আমার পোশাক জোড়া খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম।
আল্লাহর কসম! তখন আমার কাছে ঐ পোশাক জোড়া ছাড়া আর কোন পোশাক ছিল না। তারপর আমি এক জোড়া পোশাক ধার করে নিলাম এবং তা পরিধান করে রাসূলুল্লাহ এর সাথে সাক্ষাৎ করতে বের হয়ে পড়লাম। পথে দলে দলে লোকেরা আমার সাথে সাক্ষাৎ করছিল আর তওবা কবুল হওয়ার জন্য মুবারকবাদ দিচ্ছিল। তারা বলছিল, তওবা কবুল করে আল্লাহ যে তোমাকে পুরস্কৃত করেছেন, এজন্য তোমাকে মুবারকবাদ।
কা'ব ইবনে মালিক (রাঃ) বলেন, এভাবে অগ্রসর হয়ে আমি অবশেষে মসজিদে নববীতে প্রবেশ করলাম। সেখানে রাসূলুল্লাহ বসা ছিলেন। তাঁর চারদিকে লোকেরা ঘিরে বসে ছিল। তালহা ইবনে 'উবাইদুল্লাহ (রাঃ) আমাকে দেখে দৌড়ে এসে মুসাফাহা করলেন এবং মুবারকবাদ দিলেন। সাল্লাল্লাহ ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহ
মুহাজিরদের মধ্য থেকে কেউ এভাবে আমাকে মুবারকবাদ দেয়নি। আল্লাহ সাক্ষী, আমি কোন দিন তাঁর ইহসান ভুলব না। কা'ব (রাঃ) বলেন, তারপর আমি রাসূলুল্লাহ-কে সালাম করলাম। তখন খুশিতে তাঁর চেহারা মুবারক উজ্জল হয়ে উঠেছিল। তিনি বললেন, হে কা'ব! আজকের দিনটি তোমার জন্য মুবারক হোক, যা তোমার জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত অতিক্রান্ত দিনগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আমি উত্তরে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এ ক্ষমা আপনার পক্ষ থেকে না মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। তিনি বললেন, না; এ তো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর রাসূলুল্লাহ যখন খুশি হতেন, তখন তাঁর চেহারা মুবারক চাঁদের ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠত। আমরা চেহারা দেখে তাঁর খুশি বুঝতে পারতাম। তারপর আমি রাসূলুল্লাহ এর সামনে বসে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তওবা কবুল হওয়ায় আমার সমস্ত ধনসম্পদ আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথে সাদাকা করে দিতে চাই। রাসূলুল্লাহ বললেন, তোমার সম্পদের কিছু অংশ নিজের জন্য রেখে দাও, তাতে মঙ্গল হবে। আমি বললাম, তাহলে আমি শুধু খাইবারের অংশটুকু আমার জন্য রেখে বাকি সব আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পথে দান করলাম। তারপর বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ এবার সত্য কথা বলার কারণে আমাকে নাজাত দিয়েছেন। এ তওবা কবুল হওয়ার কারণে জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতে আমি সর্বদা সত্য কথাই বলতে থাকব। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আমি জানি না, রাসূলুল্লাহ এর কাছে সত্য কথা বলার কারণে সে দিন থেকে আজ পর্যন্ত আল্লাহ আমার প্রতি যে মেহেরবানী করেছেন, তেমনটি আর কোন মুসলিমের উপর করেছেন কি না। আর রাসূলুল্লাহ এর কাছে সত্য কথা বলার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমি আর কখনো স্বজ্ঞানে মিথ্যা বলিনি। জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলোতে মহান আল্লাহ আমাকে মিথ্যা থেকে বাঁচাবেন বলে আমি আশা রাখি। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলের উপর নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেছেন, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
﴿لَقَدْ تَابَ اللهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِيْنَ وَالْأَنْصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ مِنْ بَعْدِ مَا كَادَ يَزِيغُ قُلُوْبُ فَرِيقٍ مِنْهُمْ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ إِنَّهُ بِهِمْ رَءُوفٌ رَحِيمٌ - وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَّا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
আল্লাহ অনুগ্রহপরায়ণ হলেন নবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা সংকটকালে তার অনুসরণ করেছিল- এমনকি যখন তাদের এক দলের অন্তর বক্র হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পরে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করলেন; নিশ্চয় তিনি তাদের প্রতি দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু। তিনি ক্ষমা করলেন অপর তিনজনকে, যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল; যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্য সেটা সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিসহ হয়ে পড়েছিল। তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি তাদের তওবা কবুল করে নিলেন, যাতে তারা তওবায় স্থির থাকে। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা তাওবা : ১১৭, ১১৮)
আল্লাহর কসম, ইসলাম গ্রহণ করার পর এর চেয়ে বড় আর কোন অনুগ্রহ আমার উপর হতে দেখিনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে সত্য বলার তাওফীক দান করে আমাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা হয়েছে। অন্যথায় অন্যান্য মিথ্যাবাদীদের মতো আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম।
কা'ব বলেন, আমরা তিনজন সে সব লোক থেকে আলাদা, যারা তাদের সাথে (যুদ্ধে) না যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বাহানা পেশ করেছিল, মিথ্যা হলফ করেছিল। রাসূলুল্লাহ তাদের কথা মেনে নিয়ে তাদেরকে বাই'আত করে মাগফিরাতের দু'আ করেছিলেন। কিন্তু আমাদের ব্যাপার তিনি আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহই ফায়সালা দিয়েছেন।
যেমন- আল্লাহ তা'আলা বলেন, সে তিনজন, যারা পেছনে রয়ে গিয়েছিল (আল্লাহ তাদেরকে মাফ করে দিয়েছেন) কিন্তু এ তিনজন ব্যতীত আর যারা জেনে বুঝে জিহাদ থেকে পেছনে রয়ে গিয়েছিল, তাদের কথা এখানে বলা হয়নি, বরং এখানে কেবল আমাদের (তিনজনের) কথাই বলা হয়েছে। আর যারা হলফ করেছিল, ওজর পেশ করেছিল এবং তাদের ওজর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেনে নিয়েছিলেন, তাদের থেকে আমাদের সম্পর্কে ফায়সালা পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল। ১১৯
টিকাঃ
১১৪ সহীহ বুখারী, হা/৫১৯১।
১১৫ মুসনাদে আহমাদ, হা/২০৬৪৯; তিরমিযী, হা/৩৭০১; মিশকাত, হা/৬০৬৪।
১১৬ তিরমিযী, হা/৩৬৭৫; আবু দাউদ, হা/১৬৭৮; মিশকাত, হা/৬০২১।
১১৭ সহীহ বুখারী, হা/৪৪১৯; সহীহ মুসলিম, হা/২৯৮০; মিশকাত, হা/৫১২৫।
১১৮ সহীহ মুসলিম, হা/৭০৫; আবু দাউদ, হা/১২০৮; তিরমিযী, হা/৫৫৩; মিশকাত, হা/১৩৪৪।
১১৯ সহীহ বুখারী, হা/৪৪১৮; সহীহ মুসলিম, হা/২৭৬৯।