📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 উমরাতুল কাযা

📄 উমরাতুল কাযা


উমরাতুল কাযা অর্থ হচ্ছে কাযা উমরা। যেহেতু মুসলিমগণ হিজরী ৬ষ্ঠ বর্ষে উমরা করার উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উক্ত উমরা পরবর্তী বছর তথা হিজরী ৭ম বর্ষে পালন করেছিলেন, তাই এ উমরাকে উমরাতুল কাযা বলা হয়।
মূলত এ উমরাটি ছিল হুদায়বিয়া সন্ধির ফসল। কেননা তাতে একটি শর্ত এই ছিল যে, মুসলিমগণ পরবর্তী বছর উমরা করার জন্য মক্কায় আগমন করবে এবং তিনদিন পর্যন্ত অবস্থান করতে পারবে। আর এ সময় সাথে করে কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসতে পারবে না। এ শর্তানুযায়ী যখন পরবর্তী বছর যিলকদ মাসের চাঁদ দেখা গেল তখন রাসূলুল্লাহ সাহাবীদের প্রত্যেককেই কাযা হিসেবে নিজ নিজ উমরা পালন করার নির্দেশ দিলেন। ফলে হুদায়বিয়া সন্ধিতে অংশগ্রহণকারী জীবিত সকলেই রাসূলুল্লাহ এর সাথে উমরা পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। এছাড়া আরো কিছু সংখ্যক লোক তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল। তাদের সাথে উট ছিল ৬০টি এবং এগুলোর দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন নাজিয়া বিন জুনদুব আসলামী (রাঃ)।
মুসলিমদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা : যদিও হুদায়বিয়া সন্ধির শর্তানুযায়ী এ সময়গুলোতে মুসলিমদের নিরাপত্তা বিধান রাখা হয়েছিল, এরপরও অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য মুসলিমগণ মদিনা থেকে বের হওয়ার সময় সকল ধরনের যুদ্ধাস্ত্র সাথে নিয়ে বের হয়েছিলেন। তারপর ইয়াজেজ নামক উপত্যকায় এসে সেগুলো রাসূলুল্লাহ আওস বিন খাওলী আনসারী (রাঃ) এর নেতৃত্বে ২০০ জন সাহাবীর তত্ত্বাবধানে রেখে দেন। যাতে করে মক্কাবাসীরা যদি চুক্তি ভঙ্গ করে, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া যায়।
মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা: রাসূলুল্লাহ যখন সাহাবীগণকে নিয়ে যুল হুলাইফা পর্যন্ত আসলেন তখন সাহাবীগণকে ইহরাম পরিধান করার নির্দেশ দিলেন। সাহাবীগণ ইহরাম পরিধান করে সেখান থেকেই তালবিয়া পাঠ করতে শুরু করলেন এবং এ অবস্থাতেই মক্কায় প্রবেশ করলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ তাঁর কাসওয়া নামক উটের পিঠে আরোহিত ছিলেন। মুসলিমগণ আত্মরক্ষার জন্য নিয়ে আসা অস্ত্র কোষবদ্ধ অবস্থায় নিজেদের কাঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন ।
উমরার কার্য সম্পাদন : রাসূলুল্লাহ যখন সাহাবীগণকে নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করছিলেন তখন মক্কার মুশরিকরা মুসলিমদের কীর্তিকলাপ অবলোকন করার জন্য কাবা ঘরের উত্তর দিকে অবস্থিত 'কায়াইকায়ান' নামক পাহাড়ে গিয়ে অবস্থান নিয়েছিল। এ সময় তারা একে অপরের সাথে বলাবলি করছিল যে, তোমাদের নিকট একটি দল এসেছে, ইয়াসরিবের অর্থাৎ মদিনার জ্বর যাদেরকে একদম নষ্ট করে দিয়েছে। এসব সমালোচনা শুনে রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণকে কাবা ঘর তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিনটি চক্কর অত্যন্ত দ্রুততার সাথে করার নির্দেশ দিলেন। ফলে সাহাবীগণ তাই করলেন। তখন মুশরিকরা বলতে লাগল- এসকল লোক সম্পর্কে আমরা ধারণা করেছিলাম যে, মদিনার জ্বর এদেরকে নষ্ট করে ফেলেছে। তাতো সঠিক নয়; বরং এরা সাধারণ লোকজন হতেও অধিক শক্তিশালী। তারপর মুসলিমগণ অবশিষ্ট চক্করগুলো স্বাভাবিকভাবে পালন করেন।
রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণকে নিয়ে সাফা-মারওয়া সায়ী করেন এবং মারওয়ার নিকটেই পশুগুলোকে কুরবানী করেন। এরপর তিনি মাথা মুণ্ডন করেন। আর কিছু লোককে ইয়াজেজ নামক স্থানে পাঠিয়ে দেন, যাতে করে সেখানে অস্ত্রশস্ত্রগুলোর পাহারায় নিয়োজিত লোকেরাও উমরা করতে পারে।
মদিনায় প্রত্যাবর্তন:
এভাবে হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি অনুযায়ী যখন তিন দিন অতিবাহিত হয়ে গেল তখন মক্কাবাসীরা আলী (রাঃ) এর নিকট এসে বলল, তোমাদের সঙ্গীকে বলো, তিনি যেন এখান থেকে চলে যান। কারণ সময় অতিক্রম হয়ে গেছে। ফলে রাসূলুল্লাহ মক্কা থেকে বেরিয়ে এসে 'সারফ' নামক স্থানে অবতরণ করলেন। এ সময় হামযা (রাঃ) এর কন্যা “চাচা” বলতে বলতে রাসূলুল্লাহ এর নিকটে এসে গিয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ তাকে জাফর (রাঃ) এর তত্ত্বাবধানে দিয়ে দিলেন। কেননা জাফর (রাঃ) এর স্ত্রী ছিলেন মেয়েটির খালা।
মায়মুনা বিনতে হারিস (রাঃ) এর সাথে বিবাহ: রাসূলুল্লাহ উমরা পালনকালেই মায়মুনা বিনতে হারিস (রাঃ)-কে বিবাহ করেন। এজন্য তিনি জাফর বিন আবু তালিব (রাঃ)-কে মক্কায় প্রবেশের পূর্বে মায়মুনা (রাঃ) এর নিকট প্রেরণ করেন। তারপর তিনি এ ব্যাপারে সমস্ত দায়দায়িত্ব আব্বাস (রাঃ) এর নিকট সমর্পণ করেন। কারণ মায়মুনা (রাঃ) এর বোন ছিলেন তারই স্ত্রী। অতঃপর আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর সাথে মায়মুনা (রাঃ) এর বিবাহ সম্পন্ন করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ মক্কা থেকে ফেরার সময় আবু রাফে' (রাঃ)-কে পেছনে রেখে যান; যাতে করে তিনি মায়মুনা (রাঃ)-কে বাহনের মধ্যে চড়িয়ে রাসূলুল্লাহ এর নিকট পৌঁছে দিতে পারেন। ফলে রাসূলুল্লাহ যখন 'সারফ' নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন তিনি মায়মুনা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ এর কাছে পৌঁছে দেন।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 মুতা যুদ্ধ

📄 মুতা যুদ্ধ


মুতা হচ্ছে উরদুন অঞ্চলে বালকা নামক স্থানের নিকটবর্তী একটি জনপদের নাম। সেখান থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস দুই মনজিল ভ্রমণপথের দূরত্বে অবস্থিত। মুতার যুদ্ধ এখানে সংঘটিত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ এর জীবদ্দশায় এটিই ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এটি সংঘটিত হয়েছিল হিজরী ৮ম বর্ষের জুমাদাল উলা মোতাবেক ৬২৯ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ।
প্রেক্ষাপট: একদা রাসূলুল্লাহ হারিস ইবনে উমায়ের আযদী (রাঃ) এর মাধ্যমে বসরার শাসকের নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু পথিমধ্যে ততকালীন রোম সম্রাটের 'বালকা' নামক স্থানের গভর্নর শোরাহবিল বিন আমর গাসসানী তাকে বন্দী করে এবং শহীদ করে। অথচ যেকোন রাষ্ট্রীয় দূতকে হত্যা করাটা হচ্ছে মারাত্মক অপরাধ। ফলে তাদের সাথে মুসলিমদের জন্য যুদ্ধ করাটা আবশ্যক হয়ে উঠে।
মুসলিমদের সেনাবাহিনী : রাসূলুল্লাহ এ খবর শোনার পরপরই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। তারপর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই ৩০০০ সৈন্য প্রস্তুত করে নেন এবং এদের সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেন যায়েদ ইবনে হারিসা (রাঃ)-কে। আর এটাই ছিল সবচেয়ে বড় মুসলিম বাহিনী।
রাসূলুল্লাহ এর অসিয়ত : রাসূলুল্লাহ সমস্ত সেনাবাহিনী প্রস্তুত করার পর কয়েকটি অসিয়ত করেন। সেগুলো হলো:
১. (রাসূলুল্লাহ বলেন) যদি যায়েদ ইবনে হারিসাকে শহীদ করা হয়, তাহলে সেনাপতি হবে, জাফর। তারপর সেও যদি শহীদ হয়, তাহলে সেনাপতি হবে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা।
২. যেখানে হারিস ইবনে উমায়েরকে শহীদ করা হয়েছে, সেখানে উপস্থিত হয়ে সেখানকার অধিবাসীদেরকে প্রথমে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করবে। যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে সেটাই হবে উত্তম। অন্যথায় আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যাবে।
৩. আল্লাহর সঙ্গে কুফরীকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। সাবধান! অঙ্গীকার ভঙ্গ করো না, আমানতের খিয়ানত করো না। শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ এবং গীর্জায় অবস্থানরত পুরোহিতদের হত্যা করো না। খেজুর কিংবা অন্য কোন বৃক্ষ কর্তন করো না এবং বাড়িঘর দালানকোঠা বিনষ্ট করো না।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সৈন্যদলের জন্য সাদা পতাকা বেঁধে তা যায়েদ ইবনে হারিসা (রাঃ) এর হাতে তুলে দেন।
রোমানদের সৈন্য সংখ্যা: মুসলিমগণ যখন উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে মায়ান নামক স্থানে পৌঁছেন তখন সংবাদ পান যে, রোমান সম্রাট হিরাকল বালকা নামক অঞ্চলের মাআব নামক স্থানে এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে অবস্থান করছে। এছাড়া লাখম, জোযমা, বিলকিন ও বোহরা এবং বালা নামক গোত্রগুলো থেকে অতিরিক্ত এক লক্ষাধিক সৈন্য তাদের পতাকাতলে সমবেত হয়েছে।
মুসলিমদের পরামর্শ সভা : মদিনা থেকে বের হওয়ার পর মুসলিমগণ এটা কখনো চিন্তাও করেনি যে, তাদেরকে এত বড় বাহিনীর সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন; এমনকি অনেকেই পরামর্শ দিলেন যে, শত্রুবাহিনীর সৈন্য সংখ্যা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ-কে জানানো হোক এবং পরবর্তী নির্দেশনা অনুসরণ করা হোক। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) যুদ্ধ করার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন এবং সকলকে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। অবশেষে তার এ সিদ্ধান্তকে সকলেই মেনে নেন।
রোমানদের উপর মুসলিম বাহিনীর আক্রমণ : মুসলিম বাহিনী মায়ান নামক স্থানে দুই দিন অতিবাহিত করার পর শত্রুদের উপর আক্রমণ করেন এবং বালকা নামক জায়গার 'মাশারেফ' নামক বসতিতে রোমান সৈন্যদের সম্মুখীন হন। এরপর শত্রু সৈন্য আরো নিকটবর্তী হলে মুসলিমগণ মুতা নামক স্থানের দিকে অগ্রসর হয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। অতঃপর সৈন্যদের শৃংখলা বিন্যাস করা হয়। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হয়।
মুসলিম সেনাপতিদের শাহাদাত বরণ : সাল্লাল্লাহ রাসূলুল্লাহ এর অসিয়ত অনুযায়ী মুসলিম বাহিনীর পক্ষে সর্বপ্রথম পতাকা ধারণ করেন যায়েদ ইবনে হারিসা (রাঃ)। তিনি অত্যন্ত উদ্দীপনা ও সাহসিকতার সাথে শত্রুদের উপর আঘাত হানতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি একটি বর্শাবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়ে যান।
তারপর জাফর (রাঃ) মুসলিম বাহিনীর পতাকা তুলে নেন এবং তিনিও পূর্ণ উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করেন। এক পর্যায়ে প্রথমে তার ডান হাতটি কাটা যায়, কিছুক্ষণ পর তার বাম হাতটিও কাটা যায়। এরপর তিনি উভয় হাতের বাকি অংশ দ্বারা মুসলিম বাহিনীর পতাকা ধরে রাখার চেষ্টা করেন। অবশেষে শত্রু বাহিনীর এক সৈন্য তাকে এমনভাবে আঘাত হানে যে, তার সমস্ত শরীর দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। আর এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে 'তাইয়ার যুল জানাহাইন' তথা দুই বাহুবিশিষ্ট উড়ন্ত পাখি উপাধিতে ভূষিত করেন। কেননা তিনি এর বিনিময়ে জান্নাতে দুটি পাখা প্রাপ্ত হবেন, যা দিয়ে তিনি জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াতে পারবেন।
সাল্লাল্লাহ তারপর মুসলিম বাহিনীর পতাকা তুলে নেন তৃতীয় ও রাসূলুল্লাহ এর অসিয়তের শেষ সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)। তিনিও পতাকা নিয়ে নিজের ঘোড়ায় আরোহণ করে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন এবং প্রাণপণ যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন।
খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর দায়িত্ব গ্রহণ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে যখন কর্তৃক নির্ধারিত তিনজন সেনাপতিই শাহাদাত বরণ করেন, ঠিক সে সময় বনু আজলান গোত্রের সাবেত বিন আরকাম (রাঃ) নামক এক সাহাবী লাফ দিয়ে ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ধরে বললেন, হে মুসলিম ভাইগণ! আমাদের মধ্য হতে কোন একজনকে সেনাপতি নির্বাচন করুন।
সাহাবীগণ বললেন, আপনিই এই দায়িত্ব পালন করুন। এ কথা শুনে তিনি বললেন, এই দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর সাহাবীগণ খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ)-কে সেনাপতি নির্বাচন করেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ ওহীর মাধ্যমে যুদ্ধের যাবতীয় সংবাদ অবগত হচ্ছিলেন এবং সেগুলো মদিনায় অবস্থিত সাহাবীগণকেও অবহিত করছিলেন।
খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর কৌশল : খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) ছিলেন খুবই বিচক্ষণ মেধার অধিকারী। তিনি সেনাপতির দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথেই যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করে ফেলেন। তিনি প্রথমে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অটল থাকেন; কিন্তু পরের দিন পেছনের বাহিনীকে আগে এবং আগের বাহিনীকে পেছনে নিয়ে আসেন। তারপর ডানের বাহিনীকে বামে এবং বামের বাহিনীকে ডানে নিয়ে আসেন। এতে রোমানরা ভয় পেল যে, মুসলিমগণ হয়তো পেছন দিক থেকে সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছে। অতঃপর খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীকে পেছনের দিকে নিতে থাকেন। তখন রোমানরা মনে করল যে, এটা হয়তো মুসলিমদের নতুন কোন কৌশল। ফলে তারা আর মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ না করে ফিরে যায়। এদিকে খালিদ (রাঃ)-ও মুসলিম বাহিনী নিয়ে মদিনায় চলে আসেন।
ফলাফল : যেহেতু এ যুদ্ধে উভয়ই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে গিয়েছিল। সুতরাং এতে কোন পক্ষেরই চূড়ান্ত বিজয় অর্জন হয়নি। তবে সার্বিক দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে মুসলিমদের বিজয়ের পাল্লাটাই ভারি দেখা যায়। কেননা মুসলিমরা কৌশল অবলম্বন করার ফলে রোমানবাহিনী ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে গিয়েছিল। আবার তারা দুই লক্ষ সেনা বিশিষ্ট বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে মাত্র তিন হাজার সেনা বিশিষ্ট এত ছোট বাহিনী নিয়েই পাহাড়ের মতো অটল থেকে মোকাবেলা করতে পেরেছিল, যা ছিল কল্পনাতীত এবং অসম্ভব বীরত্বের পরিচয়। তাছাড়া এ যুদ্ধে মুসলিমদের মধ্য হতে শহীদ হয়েছিলেন মাত্র ১২ জন; অপরপক্ষে রোমানদের মধ্য হতে নিহত হয়েছিল অসংখ্য।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 মক্কা বিজয়

📄 মক্কা বিজয়


ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজয়টি হচ্ছে মক্কা বিজয়। এটি ছিল মূলত হুদায়বিয়া সন্ধির ফসল। সম্ভবত আল্লাহ এ বিজয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে হুদায়বিয়ার সন্ধিপত্রটিকে স্পষ্ট বিজয় হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন।
প্রেক্ষাপট: হুদায়বিয়া সন্ধির একটি শর্ত এই ছিল যে, আরবের যে কোন গোত্র ইচ্ছা করলে এ চুক্তিপত্রের যে কোন পক্ষের সাথে মিত্রতা পোষণ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কোন গোত্রের উপর অন্যায়-অত্যাচার করা হলে সংশ্লিষ্ট দলের উপর অন্যায় করা হয়েছে বলে গণ্য হবে। পরবর্তীতে চুক্তির এ ধারা অনুযায়ী মুসলিমদের সাথে যোগ দিয়েছিল বনু খোযায়া গোত্র এবং কুরাইশদের সাথে যোগ দিয়েছিল বনু বকর গোত্র। এ দুটি গোত্র জাহেলী যুগ থেকে পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিল। একদা এর জের ধরে বনু বকর গোত্রের কিছু লোক বনু খোযায়া গোত্রের উপর আক্রমণ করে অনেককেই হত্যা করে ফেলে। আর এতে কুরাইশরা গোপনে অস্ত্র দিয়ে তাদেরকে সাহায্য করে। অতঃপর এ সংবাদ যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট পৌঁছে তখন তিনি মক্কায় আক্রমণ করাকে আবশ্যক মনে করলেন। কেননা এটি ছিল কুরাইশদের পক্ষ থেকে চুক্তি ভঙ্গের স্পষ্ট নিদর্শন।
আবু সুফিয়ানের মদিনায় আগমন: এ ঘটনার পরপরই কুরাইশরা অনুধাবন করল যে, অঙ্গীকার ভঙ্গ করে তারা সত্যি সত্যিই বড় ধরনের অন্যায় করে ফেলেছে। সুতরাং এর ফলাফল খুব তিক্ত ও ভয়াবহ হতে পারে। ফলে তারা একটি পরামর্শ করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য আবু সুফিয়ানকে মদিনায় প্রেরণ করল।
আবু সুফিয়ান মদিনায় এসে প্রথমে তার কন্যা তথা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন হাবীবা (রাঃ) এর ঘরে গেল। সে যখন বিছানায় বসতে চাইল, তখন হাবীবা (রাঃ) তার থেকে বিছানা গুটিয়ে নিলেন। এটা দেখে আবু সুফিয়ান বলল, হে আমার কন্যা! তুমি কি মনে করছ যে, এই বিছানা আমার জন্য উপযুক্ত নয়, নাকি আমি এই বিছানার উপযুক্ত নই? হাবীবা (রাঃ) বললেন, এটা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিছানা। আর আপনি হচ্ছেন অপবিত্র মুশরিক। এতে আবু সুফিয়ান মুসলিমদের মনোভাব অনেকটাই আঁচ করতে পারল। তারপর সে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে কথাবার্তা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ তার কোন কথারই উত্তর দিলেন না। তারপর সে বিষয়টি নিয়ে একে একে আবু বকর, উমর, আলী (রাঃ) ও ফাতিমা (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীগণকে অনুরোধ জানাল, কিন্তু প্রত্যেকেই তাকে নিরাশ করে ফিরিয়ে দিলেন। অতঃপর সে আলী (রাঃ) এর পরামর্শ অনুযায়ী মসজিদের মধ্যে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করল যে, হে জনগণ! আমি সকলের মাঝে আশ্রয় গ্রহণ করার ঘোষণা করছি। কিন্তু এতে কেউ কোন সাড়া দিলেন না। তারপর সে হতাশ হয়ে মক্কায় ফিরে আসে এবং কুরাইশদেরকে সবকিছু অবহিত করে।
যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি : আলাইছি এদিকে মক্কাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতার সংবাদ আসার তিন দিন পূর্বেই রাসূলুল্লাহ বিষয়টি সম্পর্কে ওহীর মাধ্যমে অবগত হতে পেরেছিলেন। ফলে তিনি তখন আয়েশা (রাঃ)-কে সফরের প্রস্তুতি নিতে বললেন। কিন্তু তখনও তিনি কাউকে এর মূল উদ্দেশ্যের কথা জানাননি। তারপর যখন মক্কাবাসীদের চুক্তিভঙ্গের সংবাদ এসে পৌঁছল তখন রাসূলুল্লাহ সবাইকে মক্কা আক্রমণ করার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে বললেন এবং বিষয়টি যথাসম্ভব গোপন রাখার নির্দেশ দিলেন। যাতে রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরকে নিয়ে আকস্মিক আক্রমণ করে মক্কাবাসীদেরকে হতভম্ব করে দিতে পারেন।
হাতেব বিন আবু বালতা'আ (রাঃ) এর গোপন চিঠি : আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমগণ যখন খুব গোপনে মক্কা আক্রমণ করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন হাতেব বিন আবু বালতা'আ (রাঃ) নামে এক বদরী সাহাবী এক মহিলার মাধ্যমে মক্কাবাসীদের উদ্দেশ্যে একটি পত্র প্রেরণ করেন। যার মধ্যে রাসূলুল্লাহ কর্তৃক মক্কা আক্রমণের বিষয়টি লিপিবদ্ধ ছিল। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, মুসলিমরা মক্কাবাসীর উপর আক্রমণ করার পর যদি মক্কাবাসীরা ক্ষিপ্ত হয়ে সেখানে অবস্থিত মুহাজিরদের পরিবার বর্গের উপর হামলা চালায়, তাহলে এ সংবাদ জানানোর অসিলায় তারা যেন দয়া পরবশ হয়ে হাতেব বিন আবু বালতা'আ (রাঃ) এর পরিবারের কোন ক্ষতি না করে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ বিষয়টি অবিলম্বেই ওহীর মাধ্যমে জেনে গিয়েছিলেন। ফলে তিনি আলী, মিকদাদ, যুবায়ের এবং আবু মুরশেদ গানাভী (রাঃ) প্রমুখ সাহাবীকে চিঠিটি উদ্ধারের জন্য এই বলে প্রেরণ করেন যে, তোমরা 'খাখ' নামক উদ্যানে গিয়ে একটি হাওদানশীল মহিলাকে দেখতে পাবে, এ মহিলার নিকট কুরাইশদের উদ্দেশ্যে প্রেরিত একটি পত্র আছে, সে পত্রটি তার কাছ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসবে। তখন তারা ঘোড়ার উপর আরোহণ করে খুব দ্রুতগতিতে মহিলাটিকে পাকড়াও করে পত্রটি ফেরত দিতে বলেন। কিন্তু সে পত্রের বিষয়টি অস্বীকার করল। অবশেষে সাহাবীগণের হুমকীর মুখে সে পত্রটি ফেরত দিয়ে দিল।
অতঃপর পত্রটি রাসূলুল্লাহ এর কাছে নিয়ে আসা হলে, তিনি পত্রের বিষয়বস্তু ও প্রেরক-প্রাপক সম্পর্কে অবহিত হলেন। তখন রাসূলুল্লাহ হাতেব বিন আবু বালতা'আ (রাঃ)-কে ডেকে আনার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন এবং এর উদ্দেশ্য খুলে বলেন। এসব কথা শুনে উমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে অনুমতি দিন আমি তার গলা কর্তন করে দেই। কারণ সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং সে মুনাফিক হয়ে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, হে উমর! তুমি কি আলাইহি ওয়াসাল্লাম
জান না যে, সে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে? আর হতে পারে আল্লাহ তা'আলা উক্ত যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কেননা তিনি বলে দিয়েছেন, তোমরা যা চাও তা করো, আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এ কথা শুনে উমর (রাঃ) এর চক্ষুদ্বয় অশ্রুসজল হয়ে উঠল। ফলে তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। অতঃপর এ বিষয়টির সমাপ্তি এখানেই ঘটে। তখন আল্লাহ তা'আলা সূরা মুমতাহিনার প্রথম আয়াতটি নাযিল করেন।
মক্কার পথে যাত্রা : দিনটি ছিল ১০ই রমাযান হিজরীর ৮ম বর্ষ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাম সকল প্রস্তুতি শেষে সাহাবীদেরকে নিয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। সাথে ছিলেন ১০ হাজার সাহাবীদেরকে নিয়ে গঠিত একটি বিশাল সেনাবাহিনী। এ সময় মদিনার প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন আবু রাহাম গিফারী (রাঃ) এর উপর। পথিমধ্যে চাচা আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব (রাঃ) এর সাথে দেখা হয়, যিনি ইসলাম গ্রহণ করে স্বপরিবারে হিজরত করে মদিনায় যাচ্ছিলেন। তারপর চাচাতো ভাই আবু সুফিয়ান বিন হারিস এবং ফুফাতো ভাই আবদুল্লাহ বিন উমায়েরের সাথে সাক্ষাৎ হয়। তখন তারা ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিমদের দলে শরীক হয়ে যায়। এ সময় রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীগণ সকলেই রোযাদার ছিলেন। তারপর যখন তাঁরা কাদীদ নামক ঝর্ণার কাছে পৌঁছলেন, তখন রোযা ভঙ্গ করলেন। তারপর তাঁরা মাররাউয যাহরান নামক স্থানে শিবির স্থাপন করে রাত্রি যাপন করেন।
আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণ : মুসলিমগণ মাররাউয যাহরানে শিবির স্থাপন করার পর আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর সাদা খচ্চরের উপর আরোহণ করে বের হলেন। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, মক্কার কোন উপযুক্ত লোক পেলে তার মাধ্যমে মক্কাবাসীকে আত্মসমর্পণের আহ্বান করা। কিন্তু পথিমধ্যে তিনি আবু সুফিয়ান ও বোদাইল বিন ওয়ারাকার কথোপকথন শুনতে পান। ফলে তিনি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তাদেরকে রাসূলুল্লাহ এর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার আহ্বান জানান। এতে আবু সুফিয়ান সাড়া দেয় এবং বোদাইল বিন ওয়ারাকা মক্কায় ফিরে যায়।
তারপর আব্বাস (রাঃ) আবু সুফিয়ানকে বাহনের পেছনে চড়িয়ে রাসূলুল্লাহ এর কাছে নিয়ে আসেন। এ সময় উমর (রাঃ) আব্বাস (রাঃ) এর পেছনে
আবু সুফিয়ানকে দেখতে পেয়ে দ্রুত রাসূলুল্লাহ এর কাছে চলে যান এবং তাকে হত্যা করার অনুমতি চান। তখন আব্বাস (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাঁকে আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু এরপরও উমর (রাঃ) বারবার হত্যা করার জন্য অনুমতি চাইতে লাগলেন। এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ উমর (রাঃ)-কে থামিয়ে দিলেন এবং আব্বাস (রাঃ) এর আশ্রয় দান করাটা অনুমোদন করলেন।
পরের দিন সকালে আব্বাস (রাঃ) আবু সুফিয়ানকে রাসূলুল্লাহ এর কাছে নিয়ে যান। তখন তিনি আবু সুফিয়ানকে সামান্য ভর্ৎসনাপূর্বক ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেন। অবশেষে সে ইসলাম গ্রহণ করে নেয়।
তারপর আব্বাস (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান সম্মান প্রিয় লোক; সুতরাং তাকে সম্মান প্রদান করুন। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, ঠিক আছে, যে ব্যক্তি আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ থাকবে এবং যে নিজ ঘরের দরজা ভেতর হতে বন্ধ করে নেবে সে নিরাপদ থাকবে এবং যে মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে সেও নিরাপদ থাকবে।"১০১
মাররাউয যাহরান হতে মক্কার পথে : রাসূলুল্লাহ সকাল সকাল মক্কায় প্রবেশ করার জন্য অগ্রসর হন। এদিকে আব্বাস (রাঃ) আবু সুফিয়ান (রাঃ)-কে মক্কায় পাঠিয়ে দেন। তিনি মক্কায় এসে কুরাইশদেরকে রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীদের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকেন এবং সতর্ক করে দেন। কিন্তু এতে তারা তাকে ভৎর্সনা করে। তারপর তিনি তাদের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ কর্তৃক নিরাপত্তার বিষয়টিও অবহিত করেন। ফলে সকলেই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পলায়ন করতে থাকে।
রাসূলুল্লাহ এর সেনাবিন্যাস : এদিকে রাসূলুল্লাহ যখন ‘যী-তোওয়া' নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন সেনাবিন্যাসের কাজটি সেরে নিলেন। তিনি ডান পাশে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ)-কে নিযুক্ত করলেন এবং তাকে এ নির্দেশ দিলেন যে, নিচু অঞ্চল দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করবে। এ সময় কুরাইশরা যদি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাহলে তাদের সকলকে হত্যা করবে। তারপর সাফা পাহাড়ের উপর আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে। এরপর তিনি বাম পাশে যুবায়ের বিন আওয়াম (রাঃ)-কে নিযুক্ত করেন এবং তাকে মক্কার উপরিভাগ তথা কুদা নামক স্থান দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে নির্দেশ দেন। অতঃপর হাজুন নামক স্থানে গিয়ে রাসূলুল্লাহ এর পতাকা উত্তোলন করে তাঁর জন্য অপেক্ষা করার নির্দেশ দেন।
তারপর রাসূলুল্লাহ পদাতিক বাহিনীর নেতৃত্বে থাকা আবু উবাইদা (রাঃ)-কে বাতনে ওয়াদির পথ দিয়ে এমনভাবে অগ্রসর হতে নির্দেশ দেন, যাতে তিনি রাসূলুল্লাহ এর পূর্বেই মক্কায় অবতরণ করতে সক্ষম হন।
মক্কায় প্রবেশ : রাসূলুল্লাহ এর নির্দেশনার পরপরই সকলেই নির্ধারিত পথ ধরে অগ্রসর হতে লাগলেন। এ সময় মুসলিম বাহিনী কুরাইশদের পক্ষ থেকে কোন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিলেন না। তবে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) সামান্য বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু বাধাদানকারীরা খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর সাথে টিকতে না পেরে পলায়ন করে। তারপর তিনি মক্কার গলি পথগুলো অতিক্রম করে সাফা পাহাড়ের উপর রাসূলুল্লাহ এর সাথে মিলিত হন। এদিকে যুবায়ের (রাঃ) হাজুন নামক স্থানে পৌঁছে এর জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সেখানে পৌঁছলে সকলে মিলে কাবা ঘরের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন।
কাবা ঘরে প্রবেশ ও মূর্তি অপসারণ : অতঃপর রাসূলুল্লাহ চারদিক থেকে সাহাবীগণ দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় মসজিদে হারামে প্রবেশ করেন। তারপর প্রথমে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন এবং কাবা ঘর তাওয়াফ করেন।১০২ এ সময় কাবা ঘরের আশপাশে ও ছাদের উপরে সর্বমোট ৩৬০টি মূর্তি ছিল। রাসূলুল্লাহ স্বীয় হাতে থাকা একটি ধনুক দিয়ে মূর্তিগুলোর উপর আঘাত করতে করতে সেগুলো ভূপাতিত করে দেন।
তারপর রাসূলুল্লাহ কাবা ঘরের দ্বার রক্ষক উসমান বিন তালহার কাছ থেকে চাবি নিয়ে কাবা ঘরে প্রবেশ করেন। সাথে ছিলেন উসামা ও বেলাল (রাঃ)। তারা কাবা ঘরের ভেতরে ইবরাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) এর প্রতিকৃতিসহ দেয়ালে অঙ্কনকৃত আরো অনেক ছবিও দেখতে পান। ফলে তাঁরা সেগুলোকেও ভেঙ্গে চুরমার করে দেন।
কাবা ঘরে নামায আদায় : রাসূলুল্লাহ কাবা ঘরে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেন। তারপর তিনি কাবা ঘরের দেয়াল থেকে তিন হাত দূরত্বে এমন অবস্থায় দাঁড়ান যে, বাম পাশে দুটি স্তম্ভ, ডান পাশে একটি স্তম্ভ এবং পেছনে ছিল তিনটি স্তম্ভ। সে সময় কাবা ঘরটি এই ছয়টি স্তম্ভের উপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে ছিল।১০০ তারপর রাসূলুল্লাহ সেখানে দুই রাক'আত নামায আদায় করেন। অতঃপর তিনি আল্লাহর প্রশংসা ও তাকবীর ধ্বনি দিতে দিতে কাবা ঘরের দরজা খুলে দেন এবং জনগণের সামনে ভাষণ প্রদান করেন। ১০৪
সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা: ভাষণ দানকালের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হে কুরাইশগণ! তোমাদের কী ধারণা যে, তোমাদের সাথে কীরূপ আচরণ করা হবে? তখন তারা বলল, আমরা আপনার প্রতি উত্তম ধারণা পোষণ করে থাকি। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে তোমরা জেনে রাখো যে, আমি তোমাদের সাথে ঠিক সেরূপ কথাই বলছি, যেমনটি ইউসুফ (আঃ) তার ভাইদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, আজ তোমাদের জন্য কোনই নিন্দা নেই। (আমিও তোমাদেরকে সেরূপই বলছি) যাও- আজ তোমাদের সকলকে মুক্তি দেয়া হলো।
কতিপয় কাফিরকে হত্যার নির্দেশ: তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কয়েকজন বড় বড় কাফিরের রক্ত অনর্থক ঘোষণা করেন এবং বলেন, যদি তাদেরকে কাবা ঘরের পর্দার নিচেও পাওয়া যায়, তবুও তাদেরকে হত্যা করা হবে। তাদের নাম হচ্ছে, ১. আবুল উযযা বিন খাত্তাল। ২. আবদুল্লাহ বিন সা'দ বিন আবু সারাহ। ৩. ইকরামা বিন আবু জাহেল। ৪. হারিস বিন নুফাইল বিন ওয়াহাব। ৫. মাকীস বিন সাবাব। ৬. হাব্বার বিন আসওয়াদ। ৭. ও ৮. ইবনে খাত্তালের দুই দাসী। ৯. সারাহ নামক এক দাসী। অবশেষে এদের মধ্যে সর্বমোট চারজন তথা আবুল উযযা বিন খাত্তাল, মাকীস বিন সাবাব, ইবনে খাত্তালের দুই দাসীর মধ্যে একজন দাসী এবং সারাহ নামক এক দাসীকে হত্যা করা হয় এবং বাকি পাঁচজনকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে একনিষ্ঠ মুসলিম হয়ে যায়। ১০৫
কাবা ঘরের চাবি : কাবা ঘরের চাবির দায়িত্ব পাওয়াটা ছিল অনেক সম্মানের ব্যাপার। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা ঘরের দরজা খোলার পর যার হাতে চাবি দিয়েছিলেন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে চাবির দায়িত্ব গ্রহণের আবেদন জানালেন এবং এদিকে আব্বাস (রাঃ)-ও এ দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আবেদন জানালেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা এ দায়িত্বের জন্য তাকেই পছন্দ করলেন, যে ইতিপূর্বে দায়িত্ব পালন করে আসছিল এবং তার কাছ থেকে দায়িত্ব কেড়ে নেয়াকে যুলুম মনে করলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ উসমান বিন তালহা (রাঃ)-কে ডেকে তাকেই এ দায়িত্ব প্রদান করলেন
শুকরিয়ার নামায আদায়: তারপর রাসূলুল্লাহ উম্মে হানী বিনতে আবু তালিব (রাঃ) এর ঘরে গমন করে গোসল করেন এবং বিজয়ের শুকরিয়াস্বরূপ সেখানেই দুই রাক'আত নামায আদায় করেন।
কাবা ঘরের ছাদে বেলাল (রাঃ) এর আযান : মক্কায় প্রবেশ করে এসব কাজ করতে থাকাবস্থায় নামাযের সময় হয়ে গিয়েছিল। ফলে রাসূলুল্লাহ বেলাল (রাঃ)-কে কাবা ঘরের ছাদে উঠে আযান দেয়ার নির্দেশ দিলেন। ফলে তিনি তাই করলেন।
মক্কাকে হারাম ঘোষণা: অতঃপর রাসূলুল্লাহ দ্বিতীয় দিন সকলের সামনে আরো একটি ভাষণ দান করলেন। তাতে ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহ তা'আলা যেদিন আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, সে দিনই মক্কাকে হারাম (নিষিদ্ধ শহর) করে দিয়েছেন। এ কারণে কিয়ামত পর্যন্ত তা হারাম বা পবিত্র থাকবে। যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তার জন্য এটা বৈধ হবে না যে, সে এখানে রক্তপাত ঘটাবে অথবা এখানকার কোন বৃক্ষ কর্তন করবে। কেউ যদি এ কারণে জায়েয মনে করে যে, আল্লাহর রাসূল এখানে যুদ্ধ করেছেন তবে তাকে বলে দাও যে, আল্লাহ স্বয়ং তাঁর রাসূলকে অনুমতি দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা বৈধ করেছিলেন। অতঃপর আজ তার পবিত্রতা অনুরূপভাবে ফিরে এসেছে যেমনটি গতকাল ছিল। এখন এটা অপরিহার্য প্রয়োজন যে, যারা উপস্থিত আছে তারা অনুপস্থিতদের নিকট এই বাণী পৌঁছে দেবে।
অন্য বর্ণনায় আছে, এ সময় তিনি এ কথাও বলেন যে, এখানে কোন গাছ কাটা বৈধ নয়, শিকার তাড়ানো ঠিক নয় এবং পড়ে থাকা কোন জিনিস উঠানোও ঠিক নয়। তবে সেই ব্যক্তি নিতে পারবে, যে সেটা নিয়ে প্রচার করবে। তাছাড়া কোন প্রকার ঘাসও উপড়ানো যাবে না। এ সময় আব্বাস (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইযখির ঘাসের অনুমতি দিন। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, বেশ- ইযখির ঘাসের ব্যাপারে অনুমতি রইল।১০৬
মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে কতিপয় ঘটনা সাল্লাম আলাইহি রাসূলুল্লাহ মক্কায় ১৯ দিন অবস্থান করেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করেছিলেন। যেমন-
উযযা নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করা: সাল্লাম আলাইহি যখন রাসূলুল্লাহ মক্কা বিজয়ের মৌলিক কার্যাবলি ভালোভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে কিছুটা স্বস্তিবোধ করলেন, তখন তিনি ধীরে ধীরে সকল প্রকার শিরককে উচ্ছেদ করার কাজে হাত দেন। এজন্য প্রথমে নির্দেশ দেন উযযা নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করে দেয়ার জন্য, যা ছিল নাখলা নামক স্থানের একটি মন্দিরে অবস্থিত। এ উদ্দেশ্যে তিনি উক্ত মাসের ২৫ তারিখে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর নেতৃত্বে একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। ফলে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) সেটা বিনষ্ট করে রাসূলুল্লাহ এর কাছে ফিরে আসেন । তখন রাসূলুল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কিছু দেখেছিলে? সাল্লাম আলাইহি সাল্লাম আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলাইহি তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ বললেন, তাহলে প্রকৃতপক্ষে তুমি তা ভাঙনি। সুতরাং তুমি আবার যাও এবং তা ভেঙ্গে দাও। তখন খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) আবার গেলেন। তখন তিনি দেখলেন যে, বিক্ষিপ্ত চুলবিশিষ্ট একজন মহিলা তাঁর দিকে তেড়ে আসছে। তখন তিনি তাকে এমনভাবে আঘাত করলেন যে, তার দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। তারপর রাসূলুল্লাহ-কে বিষয়টি জানানো হলে তিনি বললেন, হ্যাঁ- এটাই ছিল উযযা।১০৭
সোয়া নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করা : সাল্লাম আলাইহি এটি ছিল মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে রেহাত নামক স্থানে বনু হুযাইল গোত্রের মধ্যে অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ আমর বিন আস (রাঃ)-কে প্রেরণ করে সেটিকে বিনষ্ট করে দেন। আমর বিন আস (রাঃ) যখন সেই মূর্তিটি ভাঙতে যান, তখন মন্দিরের প্রহরী বলল, তোমরা কী চাও? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে এটা ভাঙ্গার জন্য পাঠিয়েছেন। সে বলল, তোমরা এতে সক্ষম হবে না। তিনি বললেন, কেন? সে বলল, তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হবে। তিনি বললেন, তুমি এখনো বাতিলের উপর রয়েছ? সে কি শুনতে পায়, না দেখতে পায়? এ কথা বলেই আমর বিন আস (রাঃ) মূর্তিটিকে গুঁড়িয়ে দেন। তারপর প্রহরীকে বললেন, এবার তোমার মত কী? সে বলল, আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। আর এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল এ মাসেই।১০৮
মানাত দেবমূর্তি বিনষ্ট করা : এ মাসেই আরো একটি বড় দেবমূর্তি বিনষ্ট করা হয়। সেটি হলো মানাত দেবমূর্তি। এটি ছিল মোশাল্লাল নামক স্থানে। জাহেলী যুগে এটিই ছিল আওস, খাযরাজ, গাসসান এবং অন্যান্য গোত্রের উপাস্য। রাসূলুল্লাহ সা'দ বিন যায়েদ আশহলী (রাঃ) এর নেতৃত্বে ২০ সদস্য বিশিষ্ট একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করে মূর্তিটি বিনষ্ট করে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। এ সময় মুসলিম বাহিনী মূর্তির দিক থেকে একজন উলঙ্গ, কালো ও বিক্ষিপ্ত চুলবিশিষ্ট মহিলাকে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলেন। তখন মন্দিরটির প্রহরী বলেছিল, মানাত! তুমি এই অবাধ্যদের ধ্বংস করো। তখন সা'দ (রাঃ) তাকে তরবারির আঘাতে হত্যা করে ফেলেন এবং মূর্তিটিকেও ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দেন।

টিকাঃ
১০১ সহীহ মুসলিম, হা/১৭৮০; আবু দাউদ, হা/৩০২১; মিশকাত, হা/৬২১০; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৩৩৪১।
১০২ আবু দাউদ, হা/১৮৭৮।
১০০ সহীহ মুসলিম, হা/১৩২৯; সহীহ বুখারী, হা/৫০৫।
১০৪ সহীহ মুসলিম, হা/১৩২৯।
১০৫ নাসাঈ, হা/৪০৬৭; মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/২০০৩; মিশকাত, হা/৩১৮০।
১০৬ সহীহ বুখারী, হা/২৪৩৪; সহীহ মুসলিম, হা/১৩৫৫।
১০৭ যাদুল মা'আদ ৩/৩৬৫; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/১১৫৪৭।
১০৮ তারীখে তাবারী ৩/৬৬; যাদুল মা'আদ ৩/৩৬৫।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে কতিপয় ঘটনা

📄 মক্কায় অবস্থানকালীন সময়ে কতিপয় ঘটনা


রাসূলুল্লাহ মক্কায় ১৯ দিন অবস্থান করেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ বিশেষ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করেছিলেন। যেমন-
উযযা নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করা: সাল্লাম আলাইহি যখন রাসূলুল্লাহ মক্কা বিজয়ের মৌলিক কার্যাবলি ভালোভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে কিছুটা স্বস্তিবোধ করলেন, তখন তিনি ধীরে ধীরে সকল প্রকার শিরককে উচ্ছেদ করার কাজে হাত দেন। এজন্য প্রথমে নির্দেশ দেন উযযা নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করে দেয়ার জন্য, যা ছিল নাখলা নামক স্থানের একটি মন্দিরে অবস্থিত। এ উদ্দেশ্যে তিনি উক্ত মাসের ২৫ তারিখে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর নেতৃত্বে একটি সেনাদল প্রেরণ করেন। ফলে খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) সেটা বিনষ্ট করে রাসূলুল্লাহ এর কাছে ফিরে আসেন । তখন রাসূলুল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি কিছু দেখেছিলে? সাল্লাম আলাইহি সাল্লাম আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলাইহি তিনি বললেন, না। রাসূলুল্লাহ বললেন, তাহলে প্রকৃতপক্ষে তুমি তা ভাঙনি। সুতরাং তুমি আবার যাও এবং তা ভেঙ্গে দাও। তখন খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) আবার গেলেন। তখন তিনি দেখলেন যে, বিক্ষিপ্ত চুলবিশিষ্ট একজন মহিলা তাঁর দিকে তেড়ে আসছে। তখন তিনি তাকে এমনভাবে আঘাত করলেন যে, তার দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। তারপর রাসূলুল্লাহ-কে বিষয়টি জানানো হলে তিনি বললেন, হ্যাঁ- এটাই ছিল উযযা।১০৭
সোয়া নামক দেবমূর্তি বিনষ্ট করা : সাল্লাম আলাইহি এটি ছিল মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে রেহাত নামক স্থানে বনু হুযাইল গোত্রের মধ্যে অবস্থিত। রাসূলুল্লাহ আমর বিন আস (রাঃ)-কে প্রেরণ করে সেটিকে বিনষ্ট করে দেন। আমর বিন আস (রাঃ) যখন সেই মূর্তিটি ভাঙতে যান, তখন মন্দিরের প্রহরী বলল, তোমরা কী চাও? তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ আমাদেরকে এটা ভাঙ্গার জন্য পাঠিয়েছেন। সে বলল, তোমরা এতে সক্ষম হবে না। তিনি বললেন, কেন? সে বলল, তোমরা বাধাপ্রাপ্ত হবে। তিনি বললেন, তুমি এখনো বাতিলের উপর রয়েছ? সে কি শুনতে পায়, না দেখতে পায়? এ কথা বলেই আমর বিন আস (রাঃ) মূর্তিটিকে গুঁড়িয়ে দেন। তারপর প্রহরীকে বললেন, এবার তোমার মত কী? সে বলল, আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। আর এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল এ মাসেই।১০৮
মানাত দেবমূর্তি বিনষ্ট করা : এ মাসেই আরো একটি বড় দেবমূর্তি বিনষ্ট করা হয়। সেটি হলো মানাত দেবমূর্তি। এটি ছিল মোশাল্লাল নামক স্থানে। জাহেলী যুগে এটিই ছিল আওস, খাযরাজ, গাসসান এবং অন্যান্য গোত্রের উপাস্য। রাসূলুল্লাহ সা'দ বিন যায়েদ আশহলী (রাঃ) এর নেতৃত্বে ২০ সদস্য বিশিষ্ট একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করে মূর্তিটি বিনষ্ট করে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। এ সময় মুসলিম বাহিনী মূর্তির দিক থেকে একজন উলঙ্গ, কালো ও বিক্ষিপ্ত চুলবিশিষ্ট মহিলাকে বেরিয়ে আসতে দেখেছিলেন। তখন মন্দিরটির প্রহরী বলেছিল, মানাত! তুমি এই অবাধ্যদের ধ্বংস করো। তখন সা'দ (রাঃ) তাকে তরবারির আঘাতে হত্যা করে ফেলেন এবং মূর্তিটিকেও ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে দেন।

টিকাঃ
১০৭ যাদুল মা'আদ ৩/৩৬৫; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/১১৫৪৭।
১০৮ তারীখে তাবারী ৩/৬৬; যাদুল মা'আদ ৩/৩৬৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00