📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 সাফিয়া (রাঃ) এর সাথে বিবাহ

📄 সাফিয়া (রাঃ) এর সাথে বিবাহ


সাফিয়া (রাঃ) ছিলেন ইয়াহুদি নেতা আবুল হুকাইক এর ছেলে কেনান এর স্ত্রী। খায়বারের সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করার কারণে কেনান মুসলিমদের হাতে নিহত হয় এবং সাফিয়া (রাঃ) বন্দী হিসেবে মুসলিমদের হস্তগত হয়। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এসব বন্দীদেরকে গ্রহণ করার ব্যাপারে সাহাবীগণকে ইখতিয়ার প্রদান করেন, তখন দিহইয়াতুল কালবী (রাঃ) সাফিয়া (রাঃ)-কে পছন্দ করেন। কিন্তু অপর এক ব্যক্তির পরামর্শে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের জন্যই রেখে দেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়া (রাঃ) এর কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলে তিনি সাথে সাথেই তা গ্রহণ করে নেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে মুক্তি দিয়ে বিয়ে করে নেন। এ বিয়েতে সাফিয়া (রাঃ)-কে মুক্ত করাটাই ছিল মোহরানার অন্তর্ভুক্ত। তারপর রাসূলুল্লাহ মদিনায় ফেরার পথে 'সাদ্দে সাহবা' নামক স্থানে পৌঁছলে সাফিয়া (রাঃ) এর সাথে বাসর রাত্রি যাপন করেন এবং সকালে ওলিমার কাজ সম্পন্ন করেন।৬

টিকাঃ
৬ সহীহ বুখারী, হা/৪২১১।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 যাতুর রিকা অভিযান

📄 যাতুর রিকা অভিযান


এ অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল হিজরী ৭ম বর্ষের রবিউল আওয়াল মাসে। এটি পরিচালিত হয়েছিল আরবের একদল বেদুঈনদের বিরুদ্ধে, যারা নজদের বালুকাময় প্রান্তরে শিবির স্থাপন করে বসবাস করত এবং প্রায়ই ডাকাতি ও লুটতরাজ করে বেড়াত। কাজেই রাসূলুল্লাহ তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্যই এ অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু এ অভিযানে কোন সংঘর্ষ হয়নি। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। যেমন-
রাসূলুল্লাহ এর উদ্দেশ্যে একজন মুশরিকের অস্ত্র উত্তোলন :
এ সফরের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ এবং সাহাবীগণ খুবই ক্লান্ত হয়ে একটি বাগানে উপনীত হয়ে বিশ্রাম গ্রহণের জন্য অবস্থান নেন। তাঁরা নিজ নিজ গাছের উপর তরবারি ঝুলিয়ে রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। এমন সময় একজন মুশরিক এসে রাসূলুল্লাহ এর তরবারিটি হাতে নিল। এদিকে রাসূলুল্লাহ-ও জাগ্রত হয়ে গেলেন। তখন সে বলল, আপনি আমাকে ভয় করছেন? রাসূলুল্লাহ আলাইহি বললেন, না। সে বলল, আপনাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? রাসূলুল্লাহ আলাইহি বললেন, আল্লাহ। তখন ঐ লোকটির হাত থেকে আচমকা তরবারিটি পড়ে গেল। অতঃপর সেই তরবারিটি রাসূলুল্লাহ নিজের হাতে উঠিয়ে নিলেন এবং তাকে বললেন, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তখন লোকটি বলল, আপনি উত্তম পাকড়াওকারী। তখন রাসূলুল্লাহ আলাইহি বললেন, তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল? তখন লোকটি বলল, আমি অঙ্গীকার করছি যে, আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করব না এবং যারা আপনার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে তাদের সঙ্গেও আমি থাকব না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ আর এ ধরনের উত্তর শুনে তাকে ছেড়ে দিলেন।৭
সালাতরত অবস্থায় তীর বিদ্ধ হওয়া:
উক্ত যুদ্ধ হতে ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ এক জায়গায় এসে তাবু স্থাপন করেন এবং সেখানে রাত কাটাতে ইচ্ছা পোষণ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ঘুমানোর সময় আব্বাদ ইবনে বিশর ও আম্মার ইবনে ইয়াসার (রাঃ)-কে পাহারায় নিয়োজিত করেন। তারপর তারা উভয়ে পাহারা দেয়ার সময়সূচী ভাগ করে নিলেন। আর এতে আব্বাদ (রাঃ) রাত্রির প্রথম অংশে পাহারা দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর সবাই ঘুমিয়ে গেলে তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন।
এদিকে মুসলিমগণ ইতিপূর্বে একজন মুশরিক মহিলাকে বন্দী করে নিয়ে এসেছিল। তখন তার স্বামী প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, সে রাসূলুল্লাহ অথবা সাহাবীগণের মধ্য থেকে কোন একজনের রক্ত প্রবাহিত করবে। সুতরাং এ উদ্দেশ্যে সে মুসলিম বাহিনীর পেছনে বের হয়েছিল এবং সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তারপর যখন সে আব্বাদ (রাঃ)-কে নামাযে দাঁড়াতে দেখল, তখন তার দিকে উদ্দেশ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করল। ফলে সেটা এসে তার পায়ে বিদ্ধ হলো। কিন্তু এতে তিনি নামায ছেড়ে দেননি। অতঃপর তিনি নামায শেষে তার অপর সঙ্গীকে জাগ্রত করে বিষয়টি অবগত করেন। তখন তিনি বললেন, আপনি আমাকে ডাকেননি কেন? তিনি বললেন, আমি একটি সূরা পাঠ করছিলাম, যা শেষ না করা পর্যন্ত বিরত হওয়াটা পছন্দ করছিলাম না। তারপর উক্ত ঘাতক পরিস্থিতি অনুমান করতে পেরে ভয়ে পালিয়ে যায়। ৯৮

টিকাঃ
** সহীহ বুখারী, হা/৪১৩৫।
৯৮ আবু দাউদ, হা/১৯৮।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 উমরাতুল কাযা

📄 উমরাতুল কাযা


উমরাতুল কাযা অর্থ হচ্ছে কাযা উমরা। যেহেতু মুসলিমগণ হিজরী ৬ষ্ঠ বর্ষে উমরা করার উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উক্ত উমরা পরবর্তী বছর তথা হিজরী ৭ম বর্ষে পালন করেছিলেন, তাই এ উমরাকে উমরাতুল কাযা বলা হয়।
মূলত এ উমরাটি ছিল হুদায়বিয়া সন্ধির ফসল। কেননা তাতে একটি শর্ত এই ছিল যে, মুসলিমগণ পরবর্তী বছর উমরা করার জন্য মক্কায় আগমন করবে এবং তিনদিন পর্যন্ত অবস্থান করতে পারবে। আর এ সময় সাথে করে কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসতে পারবে না। এ শর্তানুযায়ী যখন পরবর্তী বছর যিলকদ মাসের চাঁদ দেখা গেল তখন রাসূলুল্লাহ সাহাবীদের প্রত্যেককেই কাযা হিসেবে নিজ নিজ উমরা পালন করার নির্দেশ দিলেন। ফলে হুদায়বিয়া সন্ধিতে অংশগ্রহণকারী জীবিত সকলেই রাসূলুল্লাহ এর সাথে উমরা পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। এছাড়া আরো কিছু সংখ্যক লোক তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল। তাদের সাথে উট ছিল ৬০টি এবং এগুলোর দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন নাজিয়া বিন জুনদুব আসলামী (রাঃ)।
মুসলিমদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা : যদিও হুদায়বিয়া সন্ধির শর্তানুযায়ী এ সময়গুলোতে মুসলিমদের নিরাপত্তা বিধান রাখা হয়েছিল, এরপরও অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য মুসলিমগণ মদিনা থেকে বের হওয়ার সময় সকল ধরনের যুদ্ধাস্ত্র সাথে নিয়ে বের হয়েছিলেন। তারপর ইয়াজেজ নামক উপত্যকায় এসে সেগুলো রাসূলুল্লাহ আওস বিন খাওলী আনসারী (রাঃ) এর নেতৃত্বে ২০০ জন সাহাবীর তত্ত্বাবধানে রেখে দেন। যাতে করে মক্কাবাসীরা যদি চুক্তি ভঙ্গ করে, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া যায়।
মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা: রাসূলুল্লাহ যখন সাহাবীগণকে নিয়ে যুল হুলাইফা পর্যন্ত আসলেন তখন সাহাবীগণকে ইহরাম পরিধান করার নির্দেশ দিলেন। সাহাবীগণ ইহরাম পরিধান করে সেখান থেকেই তালবিয়া পাঠ করতে শুরু করলেন এবং এ অবস্থাতেই মক্কায় প্রবেশ করলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ তাঁর কাসওয়া নামক উটের পিঠে আরোহিত ছিলেন। মুসলিমগণ আত্মরক্ষার জন্য নিয়ে আসা অস্ত্র কোষবদ্ধ অবস্থায় নিজেদের কাঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন ।
উমরার কার্য সম্পাদন : রাসূলুল্লাহ যখন সাহাবীগণকে নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করছিলেন তখন মক্কার মুশরিকরা মুসলিমদের কীর্তিকলাপ অবলোকন করার জন্য কাবা ঘরের উত্তর দিকে অবস্থিত 'কায়াইকায়ান' নামক পাহাড়ে গিয়ে অবস্থান নিয়েছিল। এ সময় তারা একে অপরের সাথে বলাবলি করছিল যে, তোমাদের নিকট একটি দল এসেছে, ইয়াসরিবের অর্থাৎ মদিনার জ্বর যাদেরকে একদম নষ্ট করে দিয়েছে। এসব সমালোচনা শুনে রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণকে কাবা ঘর তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিনটি চক্কর অত্যন্ত দ্রুততার সাথে করার নির্দেশ দিলেন। ফলে সাহাবীগণ তাই করলেন। তখন মুশরিকরা বলতে লাগল- এসকল লোক সম্পর্কে আমরা ধারণা করেছিলাম যে, মদিনার জ্বর এদেরকে নষ্ট করে ফেলেছে। তাতো সঠিক নয়; বরং এরা সাধারণ লোকজন হতেও অধিক শক্তিশালী। তারপর মুসলিমগণ অবশিষ্ট চক্করগুলো স্বাভাবিকভাবে পালন করেন।
রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণকে নিয়ে সাফা-মারওয়া সায়ী করেন এবং মারওয়ার নিকটেই পশুগুলোকে কুরবানী করেন। এরপর তিনি মাথা মুণ্ডন করেন। আর কিছু লোককে ইয়াজেজ নামক স্থানে পাঠিয়ে দেন, যাতে করে সেখানে অস্ত্রশস্ত্রগুলোর পাহারায় নিয়োজিত লোকেরাও উমরা করতে পারে।
মদিনায় প্রত্যাবর্তন:
এভাবে হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি অনুযায়ী যখন তিন দিন অতিবাহিত হয়ে গেল তখন মক্কাবাসীরা আলী (রাঃ) এর নিকট এসে বলল, তোমাদের সঙ্গীকে বলো, তিনি যেন এখান থেকে চলে যান। কারণ সময় অতিক্রম হয়ে গেছে। ফলে রাসূলুল্লাহ মক্কা থেকে বেরিয়ে এসে 'সারফ' নামক স্থানে অবতরণ করলেন। এ সময় হামযা (রাঃ) এর কন্যা “চাচা” বলতে বলতে রাসূলুল্লাহ এর নিকটে এসে গিয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ তাকে জাফর (রাঃ) এর তত্ত্বাবধানে দিয়ে দিলেন। কেননা জাফর (রাঃ) এর স্ত্রী ছিলেন মেয়েটির খালা।
মায়মুনা বিনতে হারিস (রাঃ) এর সাথে বিবাহ: রাসূলুল্লাহ উমরা পালনকালেই মায়মুনা বিনতে হারিস (রাঃ)-কে বিবাহ করেন। এজন্য তিনি জাফর বিন আবু তালিব (রাঃ)-কে মক্কায় প্রবেশের পূর্বে মায়মুনা (রাঃ) এর নিকট প্রেরণ করেন। তারপর তিনি এ ব্যাপারে সমস্ত দায়দায়িত্ব আব্বাস (রাঃ) এর নিকট সমর্পণ করেন। কারণ মায়মুনা (রাঃ) এর বোন ছিলেন তারই স্ত্রী। অতঃপর আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর সাথে মায়মুনা (রাঃ) এর বিবাহ সম্পন্ন করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ মক্কা থেকে ফেরার সময় আবু রাফে' (রাঃ)-কে পেছনে রেখে যান; যাতে করে তিনি মায়মুনা (রাঃ)-কে বাহনের মধ্যে চড়িয়ে রাসূলুল্লাহ এর নিকট পৌঁছে দিতে পারেন। ফলে রাসূলুল্লাহ যখন 'সারফ' নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন তিনি মায়মুনা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ এর কাছে পৌঁছে দেন।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 মুতা যুদ্ধ

📄 মুতা যুদ্ধ


মুতা হচ্ছে উরদুন অঞ্চলে বালকা নামক স্থানের নিকটবর্তী একটি জনপদের নাম। সেখান থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস দুই মনজিল ভ্রমণপথের দূরত্বে অবস্থিত। মুতার যুদ্ধ এখানে সংঘটিত হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ এর জীবদ্দশায় এটিই ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এটি সংঘটিত হয়েছিল হিজরী ৮ম বর্ষের জুমাদাল উলা মোতাবেক ৬২৯ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে ।
প্রেক্ষাপট: একদা রাসূলুল্লাহ হারিস ইবনে উমায়ের আযদী (রাঃ) এর মাধ্যমে বসরার শাসকের নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু পথিমধ্যে ততকালীন রোম সম্রাটের 'বালকা' নামক স্থানের গভর্নর শোরাহবিল বিন আমর গাসসানী তাকে বন্দী করে এবং শহীদ করে। অথচ যেকোন রাষ্ট্রীয় দূতকে হত্যা করাটা হচ্ছে মারাত্মক অপরাধ। ফলে তাদের সাথে মুসলিমদের জন্য যুদ্ধ করাটা আবশ্যক হয়ে উঠে।
মুসলিমদের সেনাবাহিনী : রাসূলুল্লাহ এ খবর শোনার পরপরই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন। তারপর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই ৩০০০ সৈন্য প্রস্তুত করে নেন এবং এদের সেনাপতি হিসেবে নিযুক্ত করেন যায়েদ ইবনে হারিসা (রাঃ)-কে। আর এটাই ছিল সবচেয়ে বড় মুসলিম বাহিনী।
রাসূলুল্লাহ এর অসিয়ত : রাসূলুল্লাহ সমস্ত সেনাবাহিনী প্রস্তুত করার পর কয়েকটি অসিয়ত করেন। সেগুলো হলো:
১. (রাসূলুল্লাহ বলেন) যদি যায়েদ ইবনে হারিসাকে শহীদ করা হয়, তাহলে সেনাপতি হবে, জাফর। তারপর সেও যদি শহীদ হয়, তাহলে সেনাপতি হবে আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা।
২. যেখানে হারিস ইবনে উমায়েরকে শহীদ করা হয়েছে, সেখানে উপস্থিত হয়ে সেখানকার অধিবাসীদেরকে প্রথমে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করবে। যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে সেটাই হবে উত্তম। অন্যথায় আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে যাবে।
৩. আল্লাহর সঙ্গে কুফরীকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। সাবধান! অঙ্গীকার ভঙ্গ করো না, আমানতের খিয়ানত করো না। শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ এবং গীর্জায় অবস্থানরত পুরোহিতদের হত্যা করো না। খেজুর কিংবা অন্য কোন বৃক্ষ কর্তন করো না এবং বাড়িঘর দালানকোঠা বিনষ্ট করো না।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ সৈন্যদলের জন্য সাদা পতাকা বেঁধে তা যায়েদ ইবনে হারিসা (রাঃ) এর হাতে তুলে দেন।
রোমানদের সৈন্য সংখ্যা: মুসলিমগণ যখন উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে মায়ান নামক স্থানে পৌঁছেন তখন সংবাদ পান যে, রোমান সম্রাট হিরাকল বালকা নামক অঞ্চলের মাআব নামক স্থানে এক লক্ষ সৈন্য নিয়ে অবস্থান করছে। এছাড়া লাখম, জোযমা, বিলকিন ও বোহরা এবং বালা নামক গোত্রগুলো থেকে অতিরিক্ত এক লক্ষাধিক সৈন্য তাদের পতাকাতলে সমবেত হয়েছে।
মুসলিমদের পরামর্শ সভা : মদিনা থেকে বের হওয়ার পর মুসলিমগণ এটা কখনো চিন্তাও করেনি যে, তাদেরকে এত বড় বাহিনীর সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং তারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ব্যাপারে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়লেন; এমনকি অনেকেই পরামর্শ দিলেন যে, শত্রুবাহিনীর সৈন্য সংখ্যা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ-কে জানানো হোক এবং পরবর্তী নির্দেশনা অনুসরণ করা হোক। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) যুদ্ধ করার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন এবং সকলকে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। অবশেষে তার এ সিদ্ধান্তকে সকলেই মেনে নেন।
রোমানদের উপর মুসলিম বাহিনীর আক্রমণ : মুসলিম বাহিনী মায়ান নামক স্থানে দুই দিন অতিবাহিত করার পর শত্রুদের উপর আক্রমণ করেন এবং বালকা নামক জায়গার 'মাশারেফ' নামক বসতিতে রোমান সৈন্যদের সম্মুখীন হন। এরপর শত্রু সৈন্য আরো নিকটবর্তী হলে মুসলিমগণ মুতা নামক স্থানের দিকে অগ্রসর হয়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। অতঃপর সৈন্যদের শৃংখলা বিন্যাস করা হয়। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ আরম্ভ হয়।
মুসলিম সেনাপতিদের শাহাদাত বরণ : সাল্লাল্লাহ রাসূলুল্লাহ এর অসিয়ত অনুযায়ী মুসলিম বাহিনীর পক্ষে সর্বপ্রথম পতাকা ধারণ করেন যায়েদ ইবনে হারিসা (রাঃ)। তিনি অত্যন্ত উদ্দীপনা ও সাহসিকতার সাথে শত্রুদের উপর আঘাত হানতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি একটি বর্শাবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়ে যান।
তারপর জাফর (রাঃ) মুসলিম বাহিনীর পতাকা তুলে নেন এবং তিনিও পূর্ণ উদ্যমে যুদ্ধ শুরু করেন। এক পর্যায়ে প্রথমে তার ডান হাতটি কাটা যায়, কিছুক্ষণ পর তার বাম হাতটিও কাটা যায়। এরপর তিনি উভয় হাতের বাকি অংশ দ্বারা মুসলিম বাহিনীর পতাকা ধরে রাখার চেষ্টা করেন। অবশেষে শত্রু বাহিনীর এক সৈন্য তাকে এমনভাবে আঘাত হানে যে, তার সমস্ত শরীর দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। আর এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে 'তাইয়ার যুল জানাহাইন' তথা দুই বাহুবিশিষ্ট উড়ন্ত পাখি উপাধিতে ভূষিত করেন। কেননা তিনি এর বিনিময়ে জান্নাতে দুটি পাখা প্রাপ্ত হবেন, যা দিয়ে তিনি জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াতে পারবেন।
সাল্লাল্লাহ তারপর মুসলিম বাহিনীর পতাকা তুলে নেন তৃতীয় ও রাসূলুল্লাহ এর অসিয়তের শেষ সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ)। তিনিও পতাকা নিয়ে নিজের ঘোড়ায় আরোহণ করে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন এবং প্রাণপণ যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন।
খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর দায়িত্ব গ্রহণ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে যখন কর্তৃক নির্ধারিত তিনজন সেনাপতিই শাহাদাত বরণ করেন, ঠিক সে সময় বনু আজলান গোত্রের সাবেত বিন আরকাম (রাঃ) নামক এক সাহাবী লাফ দিয়ে ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ধরে বললেন, হে মুসলিম ভাইগণ! আমাদের মধ্য হতে কোন একজনকে সেনাপতি নির্বাচন করুন।
সাহাবীগণ বললেন, আপনিই এই দায়িত্ব পালন করুন। এ কথা শুনে তিনি বললেন, এই দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর সাহাবীগণ খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ)-কে সেনাপতি নির্বাচন করেন। এদিকে রাসূলুল্লাহ ওহীর মাধ্যমে যুদ্ধের যাবতীয় সংবাদ অবগত হচ্ছিলেন এবং সেগুলো মদিনায় অবস্থিত সাহাবীগণকেও অবহিত করছিলেন।
খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) এর কৌশল : খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) ছিলেন খুবই বিচক্ষণ মেধার অধিকারী। তিনি সেনাপতির দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথেই যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করে ফেলেন। তিনি প্রথমে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অটল থাকেন; কিন্তু পরের দিন পেছনের বাহিনীকে আগে এবং আগের বাহিনীকে পেছনে নিয়ে আসেন। তারপর ডানের বাহিনীকে বামে এবং বামের বাহিনীকে ডানে নিয়ে আসেন। এতে রোমানরা ভয় পেল যে, মুসলিমগণ হয়তো পেছন দিক থেকে সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছে। অতঃপর খালিদ বিন ওয়ালীদ (রাঃ) ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীকে পেছনের দিকে নিতে থাকেন। তখন রোমানরা মনে করল যে, এটা হয়তো মুসলিমদের নতুন কোন কৌশল। ফলে তারা আর মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ না করে ফিরে যায়। এদিকে খালিদ (রাঃ)-ও মুসলিম বাহিনী নিয়ে মদিনায় চলে আসেন।
ফলাফল : যেহেতু এ যুদ্ধে উভয়ই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে গিয়েছিল। সুতরাং এতে কোন পক্ষেরই চূড়ান্ত বিজয় অর্জন হয়নি। তবে সার্বিক দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে মুসলিমদের বিজয়ের পাল্লাটাই ভারি দেখা যায়। কেননা মুসলিমরা কৌশল অবলম্বন করার ফলে রোমানবাহিনী ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে গিয়েছিল। আবার তারা দুই লক্ষ সেনা বিশিষ্ট বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে মাত্র তিন হাজার সেনা বিশিষ্ট এত ছোট বাহিনী নিয়েই পাহাড়ের মতো অটল থেকে মোকাবেলা করতে পেরেছিল, যা ছিল কল্পনাতীত এবং অসম্ভব বীরত্বের পরিচয়। তাছাড়া এ যুদ্ধে মুসলিমদের মধ্য হতে শহীদ হয়েছিলেন মাত্র ১২ জন; অপরপক্ষে রোমানদের মধ্য হতে নিহত হয়েছিল অসংখ্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00