📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 খায়বার অভিযান

📄 খায়বার অভিযান


খায়বার মদিনা হতে আশি অথবা ষাট মাইল উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত একটি জায়গার নাম। এখানে প্রচুর পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। বনু কুরাইযা ও বনু নাযির গোত্রের ইয়াহুদিরা যখন মদিনা থেকে বিতাড়িত হয়, তখন তারা এ অঞ্চলে এসে শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে। এখান থেকে তারা মদিনার মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র পরিচালনা করতে থাকে। মূলত খন্দক ছিল এদের ষড়যন্ত্রের ফল। এদের প্রচেষ্টাতেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে আরবের এতগুলো জাতি একত্রিত হতে পেরেছিল। সুতরাং রাসূলুল্লাহ মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু কুরাইশদের সাথে একটি সমঝোতায় যাওয়ার পর এবার খায়বারের দিকে মনোযোগ দিলেন।
রাসূলুল্লাহ এর খায়বার অভিমুখে যাত্রা ও সৈন্য সংখ্যা : রাসূলুল্লাহ খায়বার বিজয় করার উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে বের হয়েছিলেন হিজরী ৭ম বর্ষের মুহাররম মাসে। এ সময় মুসলিমদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ১৪০০ জন। কেননা রাসূলুল্লাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, এ যুদ্ধে কেবল তারাই অংশগ্রহণ করতে পারবে, যারা প্রকৃতপক্ষেই অংশগ্রহণ করতে চায়। ফলে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য সেসব সাহাবীই নির্বাচিত হলেন, যারা হুদায়বিয়া সন্ধির সময় বাই'আতে রিযওয়ানে অংশ নিয়েছিলেন। আর উক্ত বাই'আতে ১৪০০ জন সাহাবীই অংশগ্রহণ করেছিলেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ খায়বারে প্রবেশ করার জন্য এমন একটি পথ নির্বাচন করেন, যা ছিল খায়বার ও বনু গাতফান গোত্রের মধ্যখানে। এর কারণ হলো, মুসলিম বাহিনী যদি এ পার্শ্ব দিয়ে খায়বারে প্রবেশ করে, তাহলে শত্রুরা পালানোর জন্য আর কোন পথ পাবে না এবং তারা বনু গাতফান গোত্র থেকে কোনরূপ সাহায্যও পাবে না। আর সেই দিকটি ছিল মদিনা থেকে খায়বারে প্রবেশের ঠিক উল্টো দিক তথা সিরিয়ার দিক। কেননা খায়বার ছিল মদিনা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ খুবই গোপনীয়তার সাথে যাত্রা করেছিলেন।
আলী (রাঃ) এর হাতে পতাকা প্রদান : রাসূলুল্লাহ যে রাত্রিতে খায়বারের সীমানায় প্রবেশ করলেন, সেই রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ ঘোষণা করলেন যে, আগামীকাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে পতাকা প্রদান করব, যে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন। ফলে সাহাবীগণ সেই রাত্রিটি এমন অবস্থায় কাটালেন যে, প্রত্যেকেই আশা করছিলেন যেন তার হাতেই পতাকাটা প্রদান করা হবে। অবশেষে পরের দিন সকালে দেখা গেল যে, রাসূলুল্লাহ পতাকা প্রদান করার জন্য আলী (রাঃ)-কে আহ্বান করছেন। সে সময় আলী (রাঃ) এর চোখে পীড়া হয়েছিল; ফলে তিনি সাহাবীদের পেছনে ছিলেন। অতঃপর যখন তাঁকে রাসূলুল্লাহ এর কাছে নিয়ে আসা হলো, তখন রাসূলুল্লাহ তাঁর চোখে মুখের লালা লাগিয়ে সুস্থতার জন্য দু'আ করলেন। ফলে তিনি এমনভাবে আরোগ্য লাভ করলেন, যেন তাঁর চোখে কোন পীড়াই হয়নি। তারপর রাসূলুল্লাহ তাঁর হাতে পতাকা প্রদান করেন।১৫
খায়বারে অনুপ্রবেশ : রাসূলুল্লাহ এর নিয়ম ছিল এই যে, যদি তিনি কোন জনবসতিতে আক্রমণ করতে চাইতেন, তখন তিনি ফজর পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন।
যদি দেখতেন যে, সেখানে ফজরের আযান দেয়া হচ্ছে, তাহলে তিনি ফিরে যেতেন। আর যদি দেখতেন যে, সেখানে ফজরের আযান দেয়া হচ্ছে না, তাহলে তিনি আক্রমণ পরিচালনা করতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ খায়বার আক্রমণের সময়ও তাই করলেন। অতঃপর তিনি আলী (রাঃ) এর হাতে পতাকা দিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন। তিনি এমন সময় খায়বারে প্রবেশ করলেন, যখন তারা সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠে কৃষি কাজ করার জন্য মাঠে যাচ্ছিল। হঠাৎ তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দেখতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং এ বলে ছোটাছুটি শুরু করে দেয় যে, আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ তাঁর বাহিনী নিয়ে এসে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহু আকবার, খায়বার ধ্বংস হলো; আল্লাহু আকবার, খায়বার ধ্বংস হলো- যখন আমরা কোন সম্প্রদায়ের নিকট অবতরণ করি, তখন তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়। ফলে তাদের সকাল মন্দ হয়ে যায়।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী একটি জায়গায় শিবির স্থাপন করলেন। অপরদিকে খায়বারবাসীরাও তাদের দুর্গসমূহের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করল। এ যুদ্ধে মুসলিমগণ খায়বারবাসীর উপর বিজয় লাভ করেছিলেন। এতে মুসলিমদের মধ্য হতে শহীদ হয়েছিল ১৬ জন মতান্তরে ১৫, ১৮ অথবা ২৩ জন। অপরপক্ষে ইয়াহুদিদের মধ্য হতে নিহত হয়েছিল ৯৩ জন।
খায়বারের দুর্গসমূহ: সে সময় খায়বারের জনবসতি দুটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। একটি অঞ্চলে ছিল পাঁচটি দুর্গ। সেগুলো হলো- ১. নায়েম দুর্গ ২. সা'আব বিন মুয়ায দুর্গ ৩. জুবাইর দুর্গ ৪. উবাই দুর্গ এবং ৫. নেযার দুর্গ এগুলোর প্রথম তিনটি দুর্গের নিকটবর্তী অঞ্চলকে 'নাতাত' বলা হতো এবং অবশিষ্ট দুটি দুর্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে 'শিক' বলা হতো। আর অপর অঞ্চলে ছিল তিনটি দুর্গ। সেগুলো হলো- ১. কসুম দুর্গ ২. ওয়াতীহ দুর্গ এবং ৩. সালালিম দুর্গ। এ অঞ্চলকে কাতিবা বলা হতো। এছাড়াও উভয় অঞ্চলে আরো কিছু ছোট ছোট দুর্গ ও ঘাঁটি ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ মূল অভিযান পরিচালনা করেছিলেন কেবল প্রথম অঞ্চলের দুর্গগুলোতেই। তারপর তারা মুসলিমদের শক্তি-সামর্থের দিকে লক্ষ্য করে কোন ধরনের যুদ্ধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করে।
খায়বারবাসীদের সাথে সন্ধি : খায়বারবাসীদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ শর্তের ভিত্তিতে সন্ধি করেন যে, ১. দুর্গের মধ্যে যেসকল সৈন্য অবস্থান করছে, তাদেরকে জীবিত ছেড়ে দিতে হবে। ২. তাদের পরিবার-পরিজনকে তাদের সঙ্গে থাকতে দিতে হবে। ৩. পরিবার-পরিজনসহ তাদের খায়বার ছেড়ে বাহিরে চলে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। ৪. তাদের ধন-সম্পদ, যথা- বাগ-বাগিচা, সোনা-দানা, অশ্ব, যুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য লৌহবর্ম ইত্যাদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট সমর্পণ করতে হবে। ৫. কেবল লজ্জা নিবারণ ও জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় সাথে নিয়ে যেতে পারবে।
গনীমতের মালের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত : এ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণ প্রচুর পরিমাণ গনীমত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যেহেতু মদিনা থেকে খায়বারে এসে চাষাবাদ করাটা মুসলিমদের পক্ষে খুবই কষ্টসাধ্য ছিল, ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই জমিগুলো থেকে অর্ধাংশ গ্রহণ করার শর্তে বর্গাচাষ করার জন্য পুনরায় সেই ইয়াহুদিদের কাছেই সমর্পণ করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার থেকে প্রাপ্ত সমস্ত সম্পদকে প্রথমে ৩৬ ভাগে, তারপর প্রতিটি ভাগকে আরো ১০০ ভাগে- সর্বমোট ৩৬০০ ভাগে বিভক্ত করেন। তারপর এর অর্ধেক অংশ তথা ১৮০০ ভাগ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এবং সাহাবীগণের মধ্যে বণ্টন করে দেন এবং অবশিষ্ট অর্ধেক অংশ তথা ১৮০০ ভাগ মুসলিমদের বিভিন্ন সামাজিক প্রয়োজন ও বিপদাপদ মোকাবেলার জন্য রেখে দেন।

টিকাঃ
* সহীহ বুখারী, হা/৩৭০১, ৪২১০।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 সাফিয়া (রাঃ) এর সাথে বিবাহ

📄 সাফিয়া (রাঃ) এর সাথে বিবাহ


সাফিয়া (রাঃ) ছিলেন ইয়াহুদি নেতা আবুল হুকাইক এর ছেলে কেনান এর স্ত্রী। খায়বারের সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করার কারণে কেনান মুসলিমদের হাতে নিহত হয় এবং সাফিয়া (রাঃ) বন্দী হিসেবে মুসলিমদের হস্তগত হয়। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এসব বন্দীদেরকে গ্রহণ করার ব্যাপারে সাহাবীগণকে ইখতিয়ার প্রদান করেন, তখন দিহইয়াতুল কালবী (রাঃ) সাফিয়া (রাঃ)-কে পছন্দ করেন। কিন্তু অপর এক ব্যক্তির পরামর্শে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের জন্যই রেখে দেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়া (রাঃ) এর কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলে তিনি সাথে সাথেই তা গ্রহণ করে নেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে মুক্তি দিয়ে বিয়ে করে নেন। এ বিয়েতে সাফিয়া (রাঃ)-কে মুক্ত করাটাই ছিল মোহরানার অন্তর্ভুক্ত। তারপর রাসূলুল্লাহ মদিনায় ফেরার পথে 'সাদ্দে সাহবা' নামক স্থানে পৌঁছলে সাফিয়া (রাঃ) এর সাথে বাসর রাত্রি যাপন করেন এবং সকালে ওলিমার কাজ সম্পন্ন করেন।৬

টিকাঃ
৬ সহীহ বুখারী, হা/৪২১১।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 যাতুর রিকা অভিযান

📄 যাতুর রিকা অভিযান


এ অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল হিজরী ৭ম বর্ষের রবিউল আওয়াল মাসে। এটি পরিচালিত হয়েছিল আরবের একদল বেদুঈনদের বিরুদ্ধে, যারা নজদের বালুকাময় প্রান্তরে শিবির স্থাপন করে বসবাস করত এবং প্রায়ই ডাকাতি ও লুটতরাজ করে বেড়াত। কাজেই রাসূলুল্লাহ তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্যই এ অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু এ অভিযানে কোন সংঘর্ষ হয়নি। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। যেমন-
রাসূলুল্লাহ এর উদ্দেশ্যে একজন মুশরিকের অস্ত্র উত্তোলন :
এ সফরের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ এবং সাহাবীগণ খুবই ক্লান্ত হয়ে একটি বাগানে উপনীত হয়ে বিশ্রাম গ্রহণের জন্য অবস্থান নেন। তাঁরা নিজ নিজ গাছের উপর তরবারি ঝুলিয়ে রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। এমন সময় একজন মুশরিক এসে রাসূলুল্লাহ এর তরবারিটি হাতে নিল। এদিকে রাসূলুল্লাহ-ও জাগ্রত হয়ে গেলেন। তখন সে বলল, আপনি আমাকে ভয় করছেন? রাসূলুল্লাহ আলাইহি বললেন, না। সে বলল, আপনাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? রাসূলুল্লাহ আলাইহি বললেন, আল্লাহ। তখন ঐ লোকটির হাত থেকে আচমকা তরবারিটি পড়ে গেল। অতঃপর সেই তরবারিটি রাসূলুল্লাহ নিজের হাতে উঠিয়ে নিলেন এবং তাকে বললেন, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তখন লোকটি বলল, আপনি উত্তম পাকড়াওকারী। তখন রাসূলুল্লাহ আলাইহি বললেন, তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল? তখন লোকটি বলল, আমি অঙ্গীকার করছি যে, আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করব না এবং যারা আপনার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে তাদের সঙ্গেও আমি থাকব না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ আর এ ধরনের উত্তর শুনে তাকে ছেড়ে দিলেন।৭
সালাতরত অবস্থায় তীর বিদ্ধ হওয়া:
উক্ত যুদ্ধ হতে ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ এক জায়গায় এসে তাবু স্থাপন করেন এবং সেখানে রাত কাটাতে ইচ্ছা পোষণ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ঘুমানোর সময় আব্বাদ ইবনে বিশর ও আম্মার ইবনে ইয়াসার (রাঃ)-কে পাহারায় নিয়োজিত করেন। তারপর তারা উভয়ে পাহারা দেয়ার সময়সূচী ভাগ করে নিলেন। আর এতে আব্বাদ (রাঃ) রাত্রির প্রথম অংশে পাহারা দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর সবাই ঘুমিয়ে গেলে তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন।
এদিকে মুসলিমগণ ইতিপূর্বে একজন মুশরিক মহিলাকে বন্দী করে নিয়ে এসেছিল। তখন তার স্বামী প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, সে রাসূলুল্লাহ অথবা সাহাবীগণের মধ্য থেকে কোন একজনের রক্ত প্রবাহিত করবে। সুতরাং এ উদ্দেশ্যে সে মুসলিম বাহিনীর পেছনে বের হয়েছিল এবং সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তারপর যখন সে আব্বাদ (রাঃ)-কে নামাযে দাঁড়াতে দেখল, তখন তার দিকে উদ্দেশ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করল। ফলে সেটা এসে তার পায়ে বিদ্ধ হলো। কিন্তু এতে তিনি নামায ছেড়ে দেননি। অতঃপর তিনি নামায শেষে তার অপর সঙ্গীকে জাগ্রত করে বিষয়টি অবগত করেন। তখন তিনি বললেন, আপনি আমাকে ডাকেননি কেন? তিনি বললেন, আমি একটি সূরা পাঠ করছিলাম, যা শেষ না করা পর্যন্ত বিরত হওয়াটা পছন্দ করছিলাম না। তারপর উক্ত ঘাতক পরিস্থিতি অনুমান করতে পেরে ভয়ে পালিয়ে যায়। ৯৮

টিকাঃ
** সহীহ বুখারী, হা/৪১৩৫।
৯৮ আবু দাউদ, হা/১৯৮।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 উমরাতুল কাযা

📄 উমরাতুল কাযা


উমরাতুল কাযা অর্থ হচ্ছে কাযা উমরা। যেহেতু মুসলিমগণ হিজরী ৬ষ্ঠ বর্ষে উমরা করার উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উক্ত উমরা পরবর্তী বছর তথা হিজরী ৭ম বর্ষে পালন করেছিলেন, তাই এ উমরাকে উমরাতুল কাযা বলা হয়।
মূলত এ উমরাটি ছিল হুদায়বিয়া সন্ধির ফসল। কেননা তাতে একটি শর্ত এই ছিল যে, মুসলিমগণ পরবর্তী বছর উমরা করার জন্য মক্কায় আগমন করবে এবং তিনদিন পর্যন্ত অবস্থান করতে পারবে। আর এ সময় সাথে করে কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া আর কিছুই নিয়ে আসতে পারবে না। এ শর্তানুযায়ী যখন পরবর্তী বছর যিলকদ মাসের চাঁদ দেখা গেল তখন রাসূলুল্লাহ সাহাবীদের প্রত্যেককেই কাযা হিসেবে নিজ নিজ উমরা পালন করার নির্দেশ দিলেন। ফলে হুদায়বিয়া সন্ধিতে অংশগ্রহণকারী জীবিত সকলেই রাসূলুল্লাহ এর সাথে উমরা পালনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। এছাড়া আরো কিছু সংখ্যক লোক তাদের সাথে যোগ দিয়েছিল। তাদের সাথে উট ছিল ৬০টি এবং এগুলোর দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন নাজিয়া বিন জুনদুব আসলামী (রাঃ)।
মুসলিমদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা : যদিও হুদায়বিয়া সন্ধির শর্তানুযায়ী এ সময়গুলোতে মুসলিমদের নিরাপত্তা বিধান রাখা হয়েছিল, এরপরও অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য মুসলিমগণ মদিনা থেকে বের হওয়ার সময় সকল ধরনের যুদ্ধাস্ত্র সাথে নিয়ে বের হয়েছিলেন। তারপর ইয়াজেজ নামক উপত্যকায় এসে সেগুলো রাসূলুল্লাহ আওস বিন খাওলী আনসারী (রাঃ) এর নেতৃত্বে ২০০ জন সাহাবীর তত্ত্বাবধানে রেখে দেন। যাতে করে মক্কাবাসীরা যদি চুক্তি ভঙ্গ করে, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া যায়।
মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা: রাসূলুল্লাহ যখন সাহাবীগণকে নিয়ে যুল হুলাইফা পর্যন্ত আসলেন তখন সাহাবীগণকে ইহরাম পরিধান করার নির্দেশ দিলেন। সাহাবীগণ ইহরাম পরিধান করে সেখান থেকেই তালবিয়া পাঠ করতে শুরু করলেন এবং এ অবস্থাতেই মক্কায় প্রবেশ করলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ তাঁর কাসওয়া নামক উটের পিঠে আরোহিত ছিলেন। মুসলিমগণ আত্মরক্ষার জন্য নিয়ে আসা অস্ত্র কোষবদ্ধ অবস্থায় নিজেদের কাঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন ।
উমরার কার্য সম্পাদন : রাসূলুল্লাহ যখন সাহাবীগণকে নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করছিলেন তখন মক্কার মুশরিকরা মুসলিমদের কীর্তিকলাপ অবলোকন করার জন্য কাবা ঘরের উত্তর দিকে অবস্থিত 'কায়াইকায়ান' নামক পাহাড়ে গিয়ে অবস্থান নিয়েছিল। এ সময় তারা একে অপরের সাথে বলাবলি করছিল যে, তোমাদের নিকট একটি দল এসেছে, ইয়াসরিবের অর্থাৎ মদিনার জ্বর যাদেরকে একদম নষ্ট করে দিয়েছে। এসব সমালোচনা শুনে রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণকে কাবা ঘর তাওয়াফ করার সময় প্রথম তিনটি চক্কর অত্যন্ত দ্রুততার সাথে করার নির্দেশ দিলেন। ফলে সাহাবীগণ তাই করলেন। তখন মুশরিকরা বলতে লাগল- এসকল লোক সম্পর্কে আমরা ধারণা করেছিলাম যে, মদিনার জ্বর এদেরকে নষ্ট করে ফেলেছে। তাতো সঠিক নয়; বরং এরা সাধারণ লোকজন হতেও অধিক শক্তিশালী। তারপর মুসলিমগণ অবশিষ্ট চক্করগুলো স্বাভাবিকভাবে পালন করেন।
রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণকে নিয়ে সাফা-মারওয়া সায়ী করেন এবং মারওয়ার নিকটেই পশুগুলোকে কুরবানী করেন। এরপর তিনি মাথা মুণ্ডন করেন। আর কিছু লোককে ইয়াজেজ নামক স্থানে পাঠিয়ে দেন, যাতে করে সেখানে অস্ত্রশস্ত্রগুলোর পাহারায় নিয়োজিত লোকেরাও উমরা করতে পারে।
মদিনায় প্রত্যাবর্তন:
এভাবে হুদায়বিয়ার সন্ধিচুক্তি অনুযায়ী যখন তিন দিন অতিবাহিত হয়ে গেল তখন মক্কাবাসীরা আলী (রাঃ) এর নিকট এসে বলল, তোমাদের সঙ্গীকে বলো, তিনি যেন এখান থেকে চলে যান। কারণ সময় অতিক্রম হয়ে গেছে। ফলে রাসূলুল্লাহ মক্কা থেকে বেরিয়ে এসে 'সারফ' নামক স্থানে অবতরণ করলেন। এ সময় হামযা (রাঃ) এর কন্যা “চাচা” বলতে বলতে রাসূলুল্লাহ এর নিকটে এসে গিয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ তাকে জাফর (রাঃ) এর তত্ত্বাবধানে দিয়ে দিলেন। কেননা জাফর (রাঃ) এর স্ত্রী ছিলেন মেয়েটির খালা।
মায়মুনা বিনতে হারিস (রাঃ) এর সাথে বিবাহ: রাসূলুল্লাহ উমরা পালনকালেই মায়মুনা বিনতে হারিস (রাঃ)-কে বিবাহ করেন। এজন্য তিনি জাফর বিন আবু তালিব (রাঃ)-কে মক্কায় প্রবেশের পূর্বে মায়মুনা (রাঃ) এর নিকট প্রেরণ করেন। তারপর তিনি এ ব্যাপারে সমস্ত দায়দায়িত্ব আব্বাস (রাঃ) এর নিকট সমর্পণ করেন। কারণ মায়মুনা (রাঃ) এর বোন ছিলেন তারই স্ত্রী। অতঃপর আব্বাস (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর সাথে মায়মুনা (রাঃ) এর বিবাহ সম্পন্ন করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ মক্কা থেকে ফেরার সময় আবু রাফে' (রাঃ)-কে পেছনে রেখে যান; যাতে করে তিনি মায়মুনা (রাঃ)-কে বাহনের মধ্যে চড়িয়ে রাসূলুল্লাহ এর নিকট পৌঁছে দিতে পারেন। ফলে রাসূলুল্লাহ যখন 'সারফ' নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন তিনি মায়মুনা (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ এর কাছে পৌঁছে দেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00