📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 পত্রের মাধ্যমে দাওয়াত

📄 পত্রের মাধ্যমে দাওয়াত


এতদিন যাবত তিনি কেবল মক্কা, মদিনা ও এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে বসবাসরত আরবদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেছিলেন। এবার তিনি ইসলামের দাওয়াতকে আরো প্রসারিত করার লক্ষ্যে তখনকার যুগের বড় বড় বাদশাদের কাছে পত্র প্রেরণ করার মাধ্যমে দাওয়াত প্রদান করার জন্য মনস্থির করলেন। এ সময় তাঁকে জানানো হলো যে, রাজা-বাদশাগণ সিল মোহর ছাড়া কোন পত্র গ্রহণ করেন না। ফলে রাসূলুল্লাহ একটি রূপার আংটি তৈরি করিয়ে নেন, যার উপর 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' শব্দগুলো মুদ্রিত ছিল। এটি ছিল তিনটি লাইন বিশিষ্ট। প্রথম লাইনে ছিল 'মুহাম্মাদুন', দ্বিতীয় লাইনে ছিল 'রাসূলুন' এবং তৃতীয় লাইনে ছিল 'আল্লাহ'। প্রথম লাইনটি ছিল সবচেয়ে নিচে, দ্বিতীয় লাইনটি ছিল মধ্যখানে এবং তৃতীয় লাইনটি ছিল সবচেয়ে উপরে। রাসূলুল্লাহ এ পত্রগুলো হিজরী ৭ম বর্ষের মুহাররম মাস থেকেই প্রেরণ করতে শুরু করেন, যা ছিল খায়বার যুদ্ধের বেশ কয়েক দিন পূর্বে। নিম্নে সেসব পত্র প্রেরণের ফলাফলসহ সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হলো :
১. হাবশার সম্রাট নাজ্জাশীর নিকট পত্র প্রেরণ : যখন জাফর (রাঃ) হাবশায় হিজরত করেছিলেন, তখন বাদশা নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর তিনি ৯ম হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ তার গায়েবানা জানাযা আদায় করেন। কিন্তু যিনি তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন, তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। ফলে রাসূলুল্লাহ আমর বিন উমাইয়া যামরী (রাঃ) এর মাধ্যমে তার নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু এরপরও তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন না।
২. মিশরের সম্রাট মোকাওকিসের নিকট পত্র প্রেরণ : ওয়াসাচ্চার সে সময় মিশর ও ইসকান্দার একই সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। তাদের সম্রাট ছিল মোকাওকিস, যার মূল নাম ছিল জোরাইজ বিন মাতা। রাসূলুল্লাহ হাতেব বিন আবু বালতা (রাঃ) এর মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তার নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেন। অতঃপর উক্ত পত্রটি তার হস্তগত হলে, তিনি এ পত্রটির যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করেন। অতঃপর তিনি এর প্রত্যুত্তরে এ মর্মে একটি পত্র লিখেন যে, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ এর প্রতি মহান মোকাওকিস কিবতের পক্ষ হতে। আপনি আমার সালাম গ্রহণ করুন। অতঃপর আপনার পত্র আমার হস্তগত হয়েছে। পত্রে উল্লেখিত আপনার বক্তব্য উপলব্ধি করেছি। এখন যে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে, সে বিষয়ে আমার ধারণা রয়েছে। আমার ধারণা ছিল যে, তিনি শাম রাজ্য থেকে আবির্ভূত হবেন। আমি আপনার প্রেরিত সংবাদ বাহকের নিদর্শনস্বরূপ আপনার খেদমতে দুটো দাসী প্রেরণ করলাম, যারা কিবতীদের মাঝে বড় মর্যাদার অধিকারিণী। অধিকন্তু সামান্য উপঢৌকন হিসেবে আপনার পরিধানের জন্য কিছু পরিচ্ছদ ও বাহন হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি খচ্চর পাঠালাম। অতঃপর আপনার খেদমতে পুনরায় সালাম পেশ করলাম। সম্রাট মোকাওকিস এ বলেই পত্র শেষ করলেন; তিনি রাসূলুল্লাহ এর প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা প্রদর্শন করলেও ইসলাম গ্রহণ করেননি। তার প্রেরিত দাসী দুটির মধ্যে একটির নাম ছিল মারিয়া এবং অপরটির নাম ছিল শিরীন। আর খচ্চরটির নাম ছিল দুলদুল, যা মুয়াবিয়া (রাঃ) এর শাসনকাল পর্যন্ত জীবিত ছিল। অতঃপর উক্ত দাসী দুটির মধ্যে মারিয়ার গর্ভে রাসূলুল্লাহএর পুত্র ইবরাহীম এর জন্ম হয়েছিল। আর শিরীন নামক দাসীকে তিনি আনাস বিন সাবেত আনসারী (রাঃ)-কে দিয়ে দিয়েছিলেন। ১২
৩. পারস্য সম্রাট খসরুর নিকট পত্র প্রেরণ : সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
সে সময় পারস্যের সম্রাটের নাম ছিল কিসরা, যে খসরু নামেই পরিচিত ছিল। সে ছিল খুবই অহংকারী, উদ্ধতপূর্ণ স্বভাবের অধিকারী। রাসূলুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনে হোযাফা সাহমী (রাঃ) এর মাধ্যমে তাকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করে একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। তিনি এই পত্র নিয়ে প্রথমে বাহরাইনের প্রধানের নিকট গমন করেন। তারপর সে তাঁকে জনৈক লোকের মাধ্যমে কিসরার নিকট প্রেরণ করে। অতঃপর যখন তার নিকট পত্রটির প্রথম অংশ "আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে পারস্য সম্রাট কিসরার প্রতি” পাঠ করা হচ্ছিল তখন সে এ মর্মে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে যে, আমার প্রজাদের অন্তর্ভুক্ত একজন নিকৃষ্ট দাস তার নিজ নাম আমার নামের পূর্বে লিখেছে! তারপর সে পত্রটি ছিঁড়ে ফেলে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ এ সংবাদটি অবগত হয়ে তার জন্য বদদু'আ করেছিলেন। ফলে সে কয়েকদিন পরেই পারিবারিক কলহের জের ধরে নিজপুত্র শিরওয়ার হাতে নিহত হয়।
৪. রোমের সম্রাট হিরাকলের নিকট পত্র প্রেরণ : ওয়াসাল্লাম আাসাল্লাম সে সময় রোম সম্রাট ছিল হিরাকল। তার আসল নাম ছিল কায়সার। রাসূলুল্লাহ দিহইয়াতুল কালবী (রাঃ) এর মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তার নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। তিনি যখন পত্র নিয়ে সেখানে পৌঁছলেন, তখন আবু সুফিয়ানসহ কুরাইশদের একটি বণিক দলও সেখানে সফরে গিয়েছিল। ফলে দিহইয়াতুল কালবী (রাঃ) যখন সম্রাট হিরাকলকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন, তখন সে রাসূলুল্লাহ এর ব্যাপারে ভালোভাবে জানার জন্য আবু সুফিয়ানের সে দলটিকে ডেকে পাঠায়- যেহেতু তারা ছিল রাসূলুল্লাহ এর প্রতিবেশী। তারপর সে তাকে রাসূলুল্লাহ এর ব্যাপারে অনেক ধরনের প্রশ্ন করে। ফলে সে প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাকভাবে প্রদান করে। এ সময় হিরাকল উভয় পক্ষের কথা অনুধাবন করার জন্য একজন দুভাষীকে সাথে রেখেছিল। অবশেষে এক পর্যায়ে হিরাকল বলল, তাঁর সম্পর্কে তুমি যা কিছু বলেছ তা যদি সঠিক ও সত্য হয়, তাহলে এ ব্যক্তি খুব শীঘ্রই আমার দুই পদতলের জায়গার অধিকার লাভ করবেন। আমার জানা ছিল, এ নবীর আবির্ভাব ঘটবে। কিন্তু আমার ধারণা ছিল না যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে আসবেন। যদি নিশ্চিত হতাম যে, আমি তাঁর নিকট পৌঁছতে সক্ষম হব, তাহলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কষ্ট স্বীকার করতাম। আর যদি তার নিকটবর্তী হতাম, তাহলে তাঁর পদদ্বয় ধৌত করে দিতাম। সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর হিরাকল রাসূলুল্লাহ এর প্রেরিত পত্রটি চেয়ে নিয়ে পাঠ করল। তখন তার রাজ দরবারে বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। অবশেষে হিরাকল দিহইয়াতুল কালবী (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ এর উদ্দেশ্যে কিছু অর্থ ও মূল্যবান পোশাক উপঢৌকন হিসেবে প্রদান করেছিল। এরপরও সে মন্ত্রীসভার প্রভাবে আর ইসলাম গ্রহণ করেনি।
৫. বাহরাইনের গভর্নর মুনযির বিন সাভীরের নিকট পত্র প্রেরণ : আাসাল্লাম সে সময় বাহরাইনের গভর্নর ছিল মুনযির বিন সাভীর। রাসূলুল্লাহ আলা ইবনে হাযরামী (রাঃ) এর মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তার নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। সে পত্রটি ভালোভাবে পাঠ করার পর এর প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ -কে এ মর্মে একটি পত্র প্রেরণ করে যে, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার পত্রটি আমি বাহরাইনবাসীকে পাঠ করে শুনিয়েছিলাম। ফলে কিছু লোক ইসলামের ভালোবাসা এবং পবিত্রতার মনোভাব ব্যক্ত করে তার সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। কিন্তু কিছু লোক বিরূপ মনোভাব ব্যক্ত করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া এ জমিনে ইয়াহুদি এবং অগ্নী উপাসকও রয়েছে। অতএব এ ব্যাপারে আপনার নিজস্ব কর্ম প্রক্রিয়া অবলম্বন করুন। তারপর রাসূলুল্লাহ পরবর্তী নির্দেশনা দিয়ে আরো একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন।
৬. আম্মানের সম্রাটের নিকট পত্র প্রেরণ : সে সময় আম্মানের সম্রাটের নাম ছিল জাইফার। সে ছিল খুবই ক্ষমতালোভী; কিন্তু তার ভাই আবদ ছিল যথেষ্ট নমনীয় ও বুদ্ধিমান। তাদের পিতার নাম ছিল জালান্দি। রাসূলুল্লাহ তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান পূর্বক আমর ইবনে আস (রাঃ) এর মাধ্যমে একটি পত্র প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে গিয়ে সর্বপ্রথম আবদের সাথে দেখা করে তার সাথে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত প্রদান করেন। সে সময় তিনি তাকে অন্যান্য বাদশাদের নিকট পত্র প্রেরণ এবং তাদের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি অবহিত করেন। ফলে এতে তিনি নমনীয়তা প্রদর্শন করেন। তারপর আমর ইবনে আস (রাঃ) সম্রাট জাইফারের নিকট গিয়ে রাসূলুল্লাহ এর পত্রটি হস্তান্তর করেন। ফলে তিনি সেটি গ্রহণ করে ভালোভাবে পাঠ করেন। অতঃপর তারা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনার জন্য বেশ কয়েকদিন সময় নেন। অবশেষে যেদিন আমর ইবনে আস (রাঃ) ফেরত আসবেন, সেদিন তারা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করে নেন এবং তারা এ কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।

টিকাঃ
* সহীহ বুখারী, হা/৫৮৭২-৭৩।
** সহীহ বুখারী, হা/৩১০৬, ৫৮৭৮; মিশকাত, হা/৪৩৮৬।
১০ ইবনে মাজাহ, হা/১৫৩৪; সহীহ বুখারী, হা/১২৪৫; সহীহ মুসলিম, হা/৯৫১।
১১ যাদুল মা'আদ ১/১১৭, ৩/৬০৩।
১২ যাদুল মা'আদ ৩/৬০৪; হায়ছামী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ হা/৬৭৫১, সনদ সহীহ।
১০ সহীহ বুখারী, হা/৪৪২৪; যাদুল মা'আদ ৩/৬০১।
১৪ সহীহ বুখারী, হা/৭, ৪৫৫৩; সহীহ মুসলিম, হা/১৭৭৩; মিশকাত, হা/৫৮৬১।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 খায়বার অভিযান

📄 খায়বার অভিযান


খায়বার মদিনা হতে আশি অথবা ষাট মাইল উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত একটি জায়গার নাম। এখানে প্রচুর পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। বনু কুরাইযা ও বনু নাযির গোত্রের ইয়াহুদিরা যখন মদিনা থেকে বিতাড়িত হয়, তখন তারা এ অঞ্চলে এসে শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে। এখান থেকে তারা মদিনার মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র পরিচালনা করতে থাকে। মূলত খন্দক ছিল এদের ষড়যন্ত্রের ফল। এদের প্রচেষ্টাতেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে আরবের এতগুলো জাতি একত্রিত হতে পেরেছিল। সুতরাং রাসূলুল্লাহ মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু কুরাইশদের সাথে একটি সমঝোতায় যাওয়ার পর এবার খায়বারের দিকে মনোযোগ দিলেন।
রাসূলুল্লাহ এর খায়বার অভিমুখে যাত্রা ও সৈন্য সংখ্যা : রাসূলুল্লাহ খায়বার বিজয় করার উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে বের হয়েছিলেন হিজরী ৭ম বর্ষের মুহাররম মাসে। এ সময় মুসলিমদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ১৪০০ জন। কেননা রাসূলুল্লাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, এ যুদ্ধে কেবল তারাই অংশগ্রহণ করতে পারবে, যারা প্রকৃতপক্ষেই অংশগ্রহণ করতে চায়। ফলে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য সেসব সাহাবীই নির্বাচিত হলেন, যারা হুদায়বিয়া সন্ধির সময় বাই'আতে রিযওয়ানে অংশ নিয়েছিলেন। আর উক্ত বাই'আতে ১৪০০ জন সাহাবীই অংশগ্রহণ করেছিলেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ খায়বারে প্রবেশ করার জন্য এমন একটি পথ নির্বাচন করেন, যা ছিল খায়বার ও বনু গাতফান গোত্রের মধ্যখানে। এর কারণ হলো, মুসলিম বাহিনী যদি এ পার্শ্ব দিয়ে খায়বারে প্রবেশ করে, তাহলে শত্রুরা পালানোর জন্য আর কোন পথ পাবে না এবং তারা বনু গাতফান গোত্র থেকে কোনরূপ সাহায্যও পাবে না। আর সেই দিকটি ছিল মদিনা থেকে খায়বারে প্রবেশের ঠিক উল্টো দিক তথা সিরিয়ার দিক। কেননা খায়বার ছিল মদিনা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ খুবই গোপনীয়তার সাথে যাত্রা করেছিলেন।
আলী (রাঃ) এর হাতে পতাকা প্রদান : রাসূলুল্লাহ যে রাত্রিতে খায়বারের সীমানায় প্রবেশ করলেন, সেই রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ ঘোষণা করলেন যে, আগামীকাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে পতাকা প্রদান করব, যে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন। ফলে সাহাবীগণ সেই রাত্রিটি এমন অবস্থায় কাটালেন যে, প্রত্যেকেই আশা করছিলেন যেন তার হাতেই পতাকাটা প্রদান করা হবে। অবশেষে পরের দিন সকালে দেখা গেল যে, রাসূলুল্লাহ পতাকা প্রদান করার জন্য আলী (রাঃ)-কে আহ্বান করছেন। সে সময় আলী (রাঃ) এর চোখে পীড়া হয়েছিল; ফলে তিনি সাহাবীদের পেছনে ছিলেন। অতঃপর যখন তাঁকে রাসূলুল্লাহ এর কাছে নিয়ে আসা হলো, তখন রাসূলুল্লাহ তাঁর চোখে মুখের লালা লাগিয়ে সুস্থতার জন্য দু'আ করলেন। ফলে তিনি এমনভাবে আরোগ্য লাভ করলেন, যেন তাঁর চোখে কোন পীড়াই হয়নি। তারপর রাসূলুল্লাহ তাঁর হাতে পতাকা প্রদান করেন।১৫
খায়বারে অনুপ্রবেশ : রাসূলুল্লাহ এর নিয়ম ছিল এই যে, যদি তিনি কোন জনবসতিতে আক্রমণ করতে চাইতেন, তখন তিনি ফজর পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন।
যদি দেখতেন যে, সেখানে ফজরের আযান দেয়া হচ্ছে, তাহলে তিনি ফিরে যেতেন। আর যদি দেখতেন যে, সেখানে ফজরের আযান দেয়া হচ্ছে না, তাহলে তিনি আক্রমণ পরিচালনা করতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ খায়বার আক্রমণের সময়ও তাই করলেন। অতঃপর তিনি আলী (রাঃ) এর হাতে পতাকা দিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন। তিনি এমন সময় খায়বারে প্রবেশ করলেন, যখন তারা সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠে কৃষি কাজ করার জন্য মাঠে যাচ্ছিল। হঠাৎ তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দেখতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং এ বলে ছোটাছুটি শুরু করে দেয় যে, আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ তাঁর বাহিনী নিয়ে এসে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহু আকবার, খায়বার ধ্বংস হলো; আল্লাহু আকবার, খায়বার ধ্বংস হলো- যখন আমরা কোন সম্প্রদায়ের নিকট অবতরণ করি, তখন তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়। ফলে তাদের সকাল মন্দ হয়ে যায়।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী একটি জায়গায় শিবির স্থাপন করলেন। অপরদিকে খায়বারবাসীরাও তাদের দুর্গসমূহের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করল। এ যুদ্ধে মুসলিমগণ খায়বারবাসীর উপর বিজয় লাভ করেছিলেন। এতে মুসলিমদের মধ্য হতে শহীদ হয়েছিল ১৬ জন মতান্তরে ১৫, ১৮ অথবা ২৩ জন। অপরপক্ষে ইয়াহুদিদের মধ্য হতে নিহত হয়েছিল ৯৩ জন।
খায়বারের দুর্গসমূহ: সে সময় খায়বারের জনবসতি দুটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। একটি অঞ্চলে ছিল পাঁচটি দুর্গ। সেগুলো হলো- ১. নায়েম দুর্গ ২. সা'আব বিন মুয়ায দুর্গ ৩. জুবাইর দুর্গ ৪. উবাই দুর্গ এবং ৫. নেযার দুর্গ এগুলোর প্রথম তিনটি দুর্গের নিকটবর্তী অঞ্চলকে 'নাতাত' বলা হতো এবং অবশিষ্ট দুটি দুর্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে 'শিক' বলা হতো। আর অপর অঞ্চলে ছিল তিনটি দুর্গ। সেগুলো হলো- ১. কসুম দুর্গ ২. ওয়াতীহ দুর্গ এবং ৩. সালালিম দুর্গ। এ অঞ্চলকে কাতিবা বলা হতো। এছাড়াও উভয় অঞ্চলে আরো কিছু ছোট ছোট দুর্গ ও ঘাঁটি ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ মূল অভিযান পরিচালনা করেছিলেন কেবল প্রথম অঞ্চলের দুর্গগুলোতেই। তারপর তারা মুসলিমদের শক্তি-সামর্থের দিকে লক্ষ্য করে কোন ধরনের যুদ্ধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করে।
খায়বারবাসীদের সাথে সন্ধি : খায়বারবাসীদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ শর্তের ভিত্তিতে সন্ধি করেন যে, ১. দুর্গের মধ্যে যেসকল সৈন্য অবস্থান করছে, তাদেরকে জীবিত ছেড়ে দিতে হবে। ২. তাদের পরিবার-পরিজনকে তাদের সঙ্গে থাকতে দিতে হবে। ৩. পরিবার-পরিজনসহ তাদের খায়বার ছেড়ে বাহিরে চলে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। ৪. তাদের ধন-সম্পদ, যথা- বাগ-বাগিচা, সোনা-দানা, অশ্ব, যুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য লৌহবর্ম ইত্যাদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট সমর্পণ করতে হবে। ৫. কেবল লজ্জা নিবারণ ও জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় সাথে নিয়ে যেতে পারবে।
গনীমতের মালের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত : এ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণ প্রচুর পরিমাণ গনীমত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যেহেতু মদিনা থেকে খায়বারে এসে চাষাবাদ করাটা মুসলিমদের পক্ষে খুবই কষ্টসাধ্য ছিল, ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই জমিগুলো থেকে অর্ধাংশ গ্রহণ করার শর্তে বর্গাচাষ করার জন্য পুনরায় সেই ইয়াহুদিদের কাছেই সমর্পণ করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার থেকে প্রাপ্ত সমস্ত সম্পদকে প্রথমে ৩৬ ভাগে, তারপর প্রতিটি ভাগকে আরো ১০০ ভাগে- সর্বমোট ৩৬০০ ভাগে বিভক্ত করেন। তারপর এর অর্ধেক অংশ তথা ১৮০০ ভাগ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এবং সাহাবীগণের মধ্যে বণ্টন করে দেন এবং অবশিষ্ট অর্ধেক অংশ তথা ১৮০০ ভাগ মুসলিমদের বিভিন্ন সামাজিক প্রয়োজন ও বিপদাপদ মোকাবেলার জন্য রেখে দেন।

টিকাঃ
* সহীহ বুখারী, হা/৩৭০১, ৪২১০।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 সাফিয়া (রাঃ) এর সাথে বিবাহ

📄 সাফিয়া (রাঃ) এর সাথে বিবাহ


সাফিয়া (রাঃ) ছিলেন ইয়াহুদি নেতা আবুল হুকাইক এর ছেলে কেনান এর স্ত্রী। খায়বারের সন্ধি চুক্তি ভঙ্গ করার কারণে কেনান মুসলিমদের হাতে নিহত হয় এবং সাফিয়া (রাঃ) বন্দী হিসেবে মুসলিমদের হস্তগত হয়। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এসব বন্দীদেরকে গ্রহণ করার ব্যাপারে সাহাবীগণকে ইখতিয়ার প্রদান করেন, তখন দিহইয়াতুল কালবী (রাঃ) সাফিয়া (রাঃ)-কে পছন্দ করেন। কিন্তু অপর এক ব্যক্তির পরামর্শে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজের জন্যই রেখে দেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফিয়া (রাঃ) এর কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলে তিনি সাথে সাথেই তা গ্রহণ করে নেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে মুক্তি দিয়ে বিয়ে করে নেন। এ বিয়েতে সাফিয়া (রাঃ)-কে মুক্ত করাটাই ছিল মোহরানার অন্তর্ভুক্ত। তারপর রাসূলুল্লাহ মদিনায় ফেরার পথে 'সাদ্দে সাহবা' নামক স্থানে পৌঁছলে সাফিয়া (রাঃ) এর সাথে বাসর রাত্রি যাপন করেন এবং সকালে ওলিমার কাজ সম্পন্ন করেন।৬

টিকাঃ
৬ সহীহ বুখারী, হা/৪২১১।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 যাতুর রিকা অভিযান

📄 যাতুর রিকা অভিযান


এ অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল হিজরী ৭ম বর্ষের রবিউল আওয়াল মাসে। এটি পরিচালিত হয়েছিল আরবের একদল বেদুঈনদের বিরুদ্ধে, যারা নজদের বালুকাময় প্রান্তরে শিবির স্থাপন করে বসবাস করত এবং প্রায়ই ডাকাতি ও লুটতরাজ করে বেড়াত। কাজেই রাসূলুল্লাহ তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্যই এ অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু এ অভিযানে কোন সংঘর্ষ হয়নি। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। যেমন-
রাসূলুল্লাহ এর উদ্দেশ্যে একজন মুশরিকের অস্ত্র উত্তোলন :
এ সফরের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ এবং সাহাবীগণ খুবই ক্লান্ত হয়ে একটি বাগানে উপনীত হয়ে বিশ্রাম গ্রহণের জন্য অবস্থান নেন। তাঁরা নিজ নিজ গাছের উপর তরবারি ঝুলিয়ে রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। এমন সময় একজন মুশরিক এসে রাসূলুল্লাহ এর তরবারিটি হাতে নিল। এদিকে রাসূলুল্লাহ-ও জাগ্রত হয়ে গেলেন। তখন সে বলল, আপনি আমাকে ভয় করছেন? রাসূলুল্লাহ আলাইহি বললেন, না। সে বলল, আপনাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? রাসূলুল্লাহ আলাইহি বললেন, আল্লাহ। তখন ঐ লোকটির হাত থেকে আচমকা তরবারিটি পড়ে গেল। অতঃপর সেই তরবারিটি রাসূলুল্লাহ নিজের হাতে উঠিয়ে নিলেন এবং তাকে বললেন, এখন তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে? তখন লোকটি বলল, আপনি উত্তম পাকড়াওকারী। তখন রাসূলুল্লাহ আলাইহি বললেন, তুমি কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল? তখন লোকটি বলল, আমি অঙ্গীকার করছি যে, আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করব না এবং যারা আপনার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে তাদের সঙ্গেও আমি থাকব না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ আর এ ধরনের উত্তর শুনে তাকে ছেড়ে দিলেন।৭
সালাতরত অবস্থায় তীর বিদ্ধ হওয়া:
উক্ত যুদ্ধ হতে ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ এক জায়গায় এসে তাবু স্থাপন করেন এবং সেখানে রাত কাটাতে ইচ্ছা পোষণ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ঘুমানোর সময় আব্বাদ ইবনে বিশর ও আম্মার ইবনে ইয়াসার (রাঃ)-কে পাহারায় নিয়োজিত করেন। তারপর তারা উভয়ে পাহারা দেয়ার সময়সূচী ভাগ করে নিলেন। আর এতে আব্বাদ (রাঃ) রাত্রির প্রথম অংশে পাহারা দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর সবাই ঘুমিয়ে গেলে তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন।
এদিকে মুসলিমগণ ইতিপূর্বে একজন মুশরিক মহিলাকে বন্দী করে নিয়ে এসেছিল। তখন তার স্বামী প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, সে রাসূলুল্লাহ অথবা সাহাবীগণের মধ্য থেকে কোন একজনের রক্ত প্রবাহিত করবে। সুতরাং এ উদ্দেশ্যে সে মুসলিম বাহিনীর পেছনে বের হয়েছিল এবং সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। তারপর যখন সে আব্বাদ (রাঃ)-কে নামাযে দাঁড়াতে দেখল, তখন তার দিকে উদ্দেশ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করল। ফলে সেটা এসে তার পায়ে বিদ্ধ হলো। কিন্তু এতে তিনি নামায ছেড়ে দেননি। অতঃপর তিনি নামায শেষে তার অপর সঙ্গীকে জাগ্রত করে বিষয়টি অবগত করেন। তখন তিনি বললেন, আপনি আমাকে ডাকেননি কেন? তিনি বললেন, আমি একটি সূরা পাঠ করছিলাম, যা শেষ না করা পর্যন্ত বিরত হওয়াটা পছন্দ করছিলাম না। তারপর উক্ত ঘাতক পরিস্থিতি অনুমান করতে পেরে ভয়ে পালিয়ে যায়। ৯৮

টিকাঃ
** সহীহ বুখারী, হা/৪১৩৫।
৯৮ আবু দাউদ, হা/১৯৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00