📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে জুয়াইরিয়া (রাঃ) এর বিবাহ

📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে জুয়াইরিয়া (রাঃ) এর বিবাহ


বনু মুস্তালিক অভিযানে মহিলা বন্দীদের মধ্যে জুয়াইরিয়া (রাঃ)-ও ছিলেন। তিনি ছিলেন বনু মুস্তালিকের নেতা হারিসের কন্যা। বণ্টনের সময় তিনি সাবেত বিন কায়েস (রাঃ) এর অংশে পড়েন। অতঃপর তিনি তাঁকে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে মুক্ত হয়ে যাওয়ার শর্তারোপ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে তাকে বিয়ে করেন। এর ফলে মুসলিমগণ বনু মুস্তালিক গোত্রের ১০০ পরিবারের লোকজনকে মুক্ত করে দেন। তারপর তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। এতে প্রচার হয়ে যায় যে, এরা সবাই রাসূলুল্লাহ এর শশুর বংশের লোক।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি

📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি


হিজরী ৬ষ্ঠ বর্ষের যিলকদ মাস। মদিনার সর্বত্রই তখন শান্তি বিরাজ করছিল। আশেপাশে প্রায় সকলেই আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছিল। ফলে অন্যান্য ছোট ছোট শত্রুদের পক্ষে রাসূলুল্লাহ এর বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হওয়ার সাহস ছিল না। তখন মুসলিমগণ যে কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষমতা রাখত। তখনও কুরাইশরা মক্কায় আধিপত্য বিরাজ করে যাচ্ছিল। এমন সময় একদিন রাসূলুল্লাহ স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি সাহাবীদেরকে নিয়ে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করছেন। তিনি তাদেরকে সাথে নিয়ে কাবা ঘর তাওয়াফ করছেন এবং উমরা পালন করছেন। কিছু লোক মাথা মুণ্ডন করছেন এবং কিছু লোক চুল কর্তন করাকেই যথেষ্ট মনে করছেন।
পরের দিন সকালেই স্বপ্নটি রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণকে অবহিত করলেন। তখন তারা খুবই আনন্দিত হলেন। কেননা তারা এটা জানতেন যে, নবীদের স্বপ্নই এক প্রকার ওহী। সুতরাং এ স্বপ্ন থেকে এটা অনুমান করা যায় যে, অচিরেই মুসলিমগণ আল্লাহর রহমতে মক্কায় প্রবেশ করবেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ঠিক তখনই উমরা পালন করার জন্য মক্কায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন।
মক্কা অভিমুখে মুসলিমদের যাত্রা ও কুরাইশদের প্রতিরোধ : এ ঘোষণা দেয়া মাত্রই মদিনা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকেরা রাসূলুল্লাহ এর সাথে মক্কায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। এদিকে রাসূলুল্লাহ -ও পোশাকাদি পরিষ্কার করে প্রস্তুতি নিয়ে নিলেন। অবশেষে তিনি নিজের কাসওয়া নামক উষ্ট্রীর উপর আরোহণ করে মক্কার অভিমুখে যাত্রা শুরু করলেন। এ সময় তাঁর সাথে ছিলেন উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রাঃ) এবং ১৪০০ সাহাবী। এ সময় তাঁরা আত্মরক্ষার জন্য কেবল কোষবদ্ধ তলোয়ার সঙ্গে নিয়েছিলেন। সেই দিনটি ছিল হিজরী ৬ষ্ঠ বর্ষের যিলকদ মাসের ১ তারিখ।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ যুল হুলায়ফা নামক স্থানে গিয়ে কুরবানীর পশুকে হার পরিয়ে দিলেন। তারপর উটের উঁচু জায়গা কেটে চিহ্নিত করে দিলেন এবং সেখানে উমরার উদ্দেশ্যে ইহরাম পরিধান করলেন। তারপর তিনি কুরাইশদের নিকট এক গোয়েন্দাকে প্রেরণ করে জানতে পারলেন যে, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ সংবাদ শুনে রাসূলুল্লাহ সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন এবং এ সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তারা কাবা ঘরের দিকে এগিয়ে যাবেন। পথিমধ্যে কেউ যদি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাহলে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে বাধ্য হবেন।
ফলে রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরকে সাথে নিয়ে কাবা ঘরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন। পথিমধ্যে জানতে পারলেন যে, খালিদ বিন ওয়ালীদ ২০০ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে কুরাউল গামীম নামক স্থানে প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু এরপরও রাসূলুল্লাহ যাত্রা অব্যাহত রাখলেন এবং খালিদ বিন ওয়ালীদের বাহিনীর এত কাছাকাছি চলে আসলেন যে, উভয় দল একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিল। এক পর্যায়ে খালিদ বিন ওয়ালীদ দেখতে পেল যে, মুসলিমরা নামাযের মধ্যে রুকু-সিজদা করছে। সেটা ছিল যোহরের নামায। সুতরাং খালিদ বিন ওয়ালীদ ফন্দি আটল যে, আসরের নামাযের সময় যখন মুসলিমগণ নামাযরত অবস্থায় থাকবে তখন আক্রমণ চালাবে। কিন্তু তার সে আশা আর পূরণ হলো না; কেননা এরই মধ্যে আল্লাহ তা'আলা সালাতুল খাওফের বিধান অবর্তীণ করলেন। ফলে মুসলিমরা আসর নামায থেকেই তা বাস্তবায়ন করা শুরু করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ কৌশল অবলম্বন করে পথ পরিবর্তন করে খালিদ বিন ওয়ালীদের সাথে সংঘর্ষ এড়িয়ে মক্কার পার্শ্ববর্তী এলাকা হুদায়বিয়া নামক স্থানের শেষ প্রান্তে শিবির স্থাপন করেন। এদিকে খালিদ বিন ওয়ালীদ মুসলিমদের উপর আক্রমণ করতে এসে জানতে পারেন যে, মুসলিমদের একটি দল সালাত আদায় করছে; আর আরেকটি দল হুদায়বিয়ার অপর প্রান্তে কা'ব ইবনে লুওয়াই (রাঃ) এর নেতৃত্বে প্রতিরোধ করার জন্য অপেক্ষা করছে। ফলে তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। ৭৯
কুরাইশদের দূত প্রেরণ : রাসূলুল্লাহ এখানে থাকা অবস্থাতেই কুরাইশরা বারবার দূত পাঠিয়ে মুসলিমদের সংবাদ নিচ্ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বারবার একই প্রস্তাব দিচ্ছিলেন, যাতে করে কোনভাবেই সংঘর্ষ না হয় এবং নিজেদের উদ্দেশ্য সফল হয়। প্রস্তাবটি ছিল এই যে, আমরা এখানে কারো সাথে যুদ্ধ করার জন্য আসিনি। অতীতের যুদ্ধসমূহ কুরাইশদেরকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত ও তছনছ করে ফেলেছে। এতে তাদের ক্ষতিও হয়েছে অনেক। তাই যদি তারা চায়, তাহলে আমি তাদের সাথে একটি সময় নির্ধারণ করব, সে সময় তারা আমার ও বিপক্ষীয় লোকজনের পথ থেকে সরে দাঁড়াবে। এতে বড় আকারের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে। অন্যথায় যদি তারা যুদ্ধ করতে চায়, তাহলে তাদের ঔদ্ধত্যজনিত কৃতকার্যের শাস্তি অবশ্যই ভোগ করতে হবে। আর যুদ্ধই যদি তাদের একমাত্র কাম্য হয়ে থাকে, তবে সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! আমি আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাদের সঙ্গে ঐ সময় পর্যন্ত যুদ্ধ করে যাব, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার শরীরে আত্মা থাকে কিংবা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বীনের ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত ফায়সালা করে না দেন।
রাসূলুল্লাহ এর প্রস্তাব শুনে কুরাইশদের অনেক নেতা-ই নমনীয় হয়ে যায় এবং কুরাইশদেরকে সন্ধিচুক্তি করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু এরপরও কিছু যুবক ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনোভাব দেখিয়ে রাতের অন্ধকারে মুসলিমদের মধ্যে প্রবেশ করে গণ্ডগোল লাগিয়ে যুদ্ধের জন্য উসকে দিতে চেষ্টা করল। কিন্তু তারা মুসলিম শিবিরের প্রহরীদের পরিচালক মুহাম্মাদ বিন মাসলামা (রাঃ) এর হাতে বন্দী হয়ে গেল।
উসমান (রাঃ)-কে দূত হিসেবে কুরাইশদের নিকট প্রেরণ : কুরাইশদের দূত প্রেরণের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ চিন্তা করলেন যে, মুসলিমদের পক্ষ থেকে মক্কায় একটি দূত প্রেরণ করা প্রয়োজন, যাতে সে মক্কাবাসীকে মুসলিমদের উদ্দেশ্যের কথা ভালোভাবে বুঝাতে পারে। অবশেষে রাসূলুল্লাহ উমর (রাঃ) এর পরামর্শে উসমান (রাঃ)-কে দূত হিসেবে নির্বাচন করেন। কেননা উসমান (রাঃ) এর হিজরতের পরও তখন পর্যন্ত মক্কায় তার অনেক আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব রয়ে গিয়েছিল। সুতরাং তিনি যদি তাদের সাথে কথা বলেন, তাহলে হয়তো তারা সহজেই বিষয়টি বুঝতে পারবে।
অতঃপর উসমান (রাঃ) মক্কায় প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ এর নির্দেশনা অনুযায়ী তাদেরকে বুঝাতে লাগলেন। এতে তারাও অনেকটা বিশ্বাস করতে শুরু করছিল। কিন্তু এরপরও তারা মুসলিমদের মনোভাব লক্ষ্য করা এবং 'নিজেদের সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করার জন্য উসমান (রাঃ)-কে আটকে রাখল।
উসমান (রাঃ)-কে হত্যার গুজব এবং বাই'আতে রিযওয়ান : এদিকে মুসলিমদের মধ্যে এ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, উসমান (রাঃ)-কে হত্যা করা হয়েছে। অপরদিকে উসমান (রাঃ) এর ফেরত আসতে দেরি দেখে মুসলিমগণ এ গুজবের প্রতি বিশ্বাস করতে থাকেন। ফলে অনেকেই এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মনে মনে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে গেলেন এবং যুদ্ধের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। মোটকথা মুসলিম শিবিরে এক ধরনের অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এমন সময় রাসূলুল্লাহ নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে সকল সাহাবীকে ডেকে যুদ্ধের জন্য বাই'আত গ্রহণ করলেন। অতঃপর সকলের বাই'আত শেষ হলে তিনি নিজের ডান হাতের উপর বাম হাত রেখে বললেন, এটা হচ্ছে উসমানের হাত। ফলে সকলেই উসমান (রাঃ) ফিরে না আসলে যুদ্ধ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে গেল।৮০
অবশেষে উসমান (রাঃ) প্রত্যাবর্তন করলেন। অতঃপর মুসলিমরা অনেকটাই শান্ত হয়ে গেলেন। এ অঙ্গীকারটি একটি গাছের নিচে সংঘটিত হয়েছিল। মুসলিমদের এ ধরনের মন-মানসিকতায় আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন। যার কারণে এ অঙ্গীকারের নাম রাখা হয়েছিল বাই'আতে রিযওয়ান তথা সন্তুষ্টির অঙ্গীকার। এ বাই'আত গ্রহণের কারণেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন,
لَقَدْ رَضِيَ اللهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا
(হে রাসূল!) আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন, যখন তারা গাছের নিচে তোমার কাছে বাই'আত প্রদান করেছিল। তাদের অন্তরের অবস্থা তিনি জানেন। তাই তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং পুরস্কার হিসেবে নিকটবর্তী বিজয় দান করলেন। (সূরা ফাতহ- ১৮)
সন্ধিচুক্তি প্রণয়ন : অবশেষে কুরাইশরা যখন পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করল, তখন তারা আর দেরি না করে সোহাইল বিন আমরকে সন্ধিচুক্তি করার জন্য রাসূলুল্লাহ এর কাছে প্রেরণ করল। ফলে সে রাসূলুল্লাহ এর সাথে দীর্ঘক্ষণ আলাপ-আলোচনা করে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সন্ধিচুক্তি প্রণয়ন করল। সন্ধির ধারাসমূহ এই ছিল যে, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১. রাসূলুল্লাহ এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই সাহাবীদেরকে নিয়ে মদিনায় ফেরত যাবেন। অতঃপর তারা আগামী বছর মক্কায় আগমন করবেন এবং সেখানে তিন দিন পর্যন্ত অবস্থান করবেন। এ সময় তারা সঙ্গে করে সফরের প্রয়োজনীয় অস্ত্র নিয়ে আসতে পারবেন। তবে তরবারি সবসময় কোষবদ্ধ রাখবেন। এতে তাদের আগমনে কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হবে না।৮১
২. এ চুক্তিপত্র দশ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হবে। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ থাকবে।৮২
৩. আরবের যে কোন গোত্র ইচ্ছা করলে এ চুক্তিপত্রের যে কোন পক্ষের সাথে মিত্রতা পোষণ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কোন গোত্রের উপর অন্যায়-অত্যাচার করা হলে সংশ্লিষ্ট দলের উপর অন্যায় করা হয়েছে বলে গণ্য হবে।৮৩
৪. কুরাইশদের কোন লোক অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া অর্থাৎ পালিয়ে মুসলিমদের দলে যোগদান করলে তাকে ফেরত পাঠাতে হবে। কিন্তু মুসলিমদের কোন লোক যদি আশ্রয় লাভ করার উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে মক্কায় গমন করে তাহলে তারা তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে না।৮৪
৫. সন্ধি চলাকালীন সময়ে মক্কার বণিকগণ নির্বিঘ্নে মদিনার পথ ধরে সিরিয়া, মিশর প্রভৃতি দেশে বাণিজ্য করতে পারবে। আলাইহি আসাল্লাম এ সন্ধিপত্রটি রাসূলুল্লাহ আলী (রাঃ)-কে লিখতে বলেছিলেন। তিনি এ মর্মে লিখতে বলেছিলেন যে, লিখো- বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। তখন সোহাইল বলল, রহমান বলতে কী বুঝায়, আমরা তা জানি না। সুতরাং আপনি লিখুন যে, বিসমিকা আল্লাহুম্মা অর্থাৎ হে আল্লাহ! তোমার নামে। তখন রাসূলুল্লাহ আলী (রাঃ)-কে সেরূপ লিখতে আদেশ করলে তিনি তাই করলেন। তারপর এ কথা লিখতে আদেশ করলেন যে, এগুলো হচ্ছে সেসব কথা, যার উপর ভিত্তি করে আল্লাহর রাসূল সন্ধি করলেন। তখন সোহাইল বলল, আমরা যদি জানতাম যে, আপনি আল্লাহর রাসূল, তাহলে আপনাকে আল্লাহর ঘর থেকে বিরত রাখার কোন কারণই আমাদের ছিল না এবং আপনার বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধও করতাম না। সুতরাং আপনি লিখুন যে, মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ এর পক্ষ থেকে। তখন রাসূলুল্লাহ আলী (রাঃ)-কে আল্লাহর রাসূল কথাটি মুছে দিতে বললেন। কিন্তু আলী (রাঃ) কিছুতেই এ ব্যাপারটি মেনে নিতে পারছিলেন না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ আলী (রাঃ) এর মানসিক অবস্থা অনুধাবন করে নিজের হাতেই সেটা মুছে দেন। তারপর সম্পূর্ণ চুক্তিটি লিপিবদ্ধ করা হয়।
আবু জান্দাল (রাঃ) এর প্রত্যাবর্তন:
তখনও সন্ধিপত্রের কাজ শেষ হয়নি এবং কোন পক্ষই তাতে স্বাক্ষরও করেনি, এমন সময় সোহাইলের পুত্র আবু জান্দাল (রাঃ) শিকল পরিহিত অবস্থায় হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে সেখানে এসে উপস্থিত হন। উল্লেখ্য যে, আবু জান্দাল (রাঃ) ইতিপূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন; ফলে তার পিতা সোহাইল তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিল। কিন্তু যখনই তিনি রাসূলুল্লাহ সাহাবীদের আগমনের বার্তা শুনলেন তখনই তিনি যে কোন উপায়ে হোক শিকল ভেঙ্গে তাদের কাছে ছুটে আসেন এবং মুসলিমদের দলে শামিল হয়ে যান। তখন সোহাইল বলল, এ আবু জান্দালই হচ্ছে প্রথম ব্যক্তি, যার সম্পর্কে আপনার সঙ্গে মত বিনিময় করেছি যে, আপনি তাকে ফেরত দেবেন। তখন রাসূলুল্লাহ সোহাইলকে অনেক কিছু বলে আবু জান্দালকে ফেরত দিতে বললেন, কিন্তু সে কিছুতেই তা মেনে নিল না। অতঃপর সোহাইল আবু জান্দাল (রাঃ)-কে চপেটাঘাত করে এবং তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ আবু জান্দালকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, হে আবু জান্দাল! ধৈর্যধারণ করো এবং এটাকে সওয়াব লাভের উপায় হিসেবে গ্রহণ করো। আল্লাহ তা'আলা তোমার এবং তোমার মতো দুর্বল ও নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য প্রশস্ত আশ্রয়স্থল তৈরি করে রেখেছেন। আমরা কুরাইশদের সঙ্গে সন্ধি করেছি এবং আমরা পরস্পরের নিকট অঙ্গীকারাদ্ধ হয়েছি। এ কারণে আমরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারব না। তাই আবু জান্দাল (রাঃ) পিতার সাথে মক্কাতেই থেকে গেলেন।
সাহাবীদের প্রতিক্রিয়া:
সাহাবীগণ উক্ত সন্ধিচুক্তির কিছু কিছু দফা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। কেননা সেগুলো ছিল একেবারেই মুসলিম স্বার্থ বিরোধী। ফলে সকলেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। উপরন্তু আবু জান্দাল (রাঃ)-কে মুশরিকদের হাতে ফেরত প্রদান করাটা তাদেরকে আরো ব্যথিত করে তুলেছিল। এ পর্যায়ে উমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নই এবং তারা বাতিলের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের নিহত ব্যক্তিরা কি জান্নাতী নয় এবং তাদের নিহত ব্যক্তিরা জাহান্নামী নয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন উমর (রাঃ) বললেন, তাহলে কেন আমরা দ্বীনের ব্যাপারে ছাড় দেব এবং ফিরে যাব? অথচ আল্লাহ তা'আলা এখনো আমাদের ও তাদের মধ্যে কোনরূপ ফায়সালা করেননি? তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, হে ইবনে খাত্তাব! আমি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ তা'আলা কখনো আমাকে ধ্বংস করবেন না।
উমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর কাছ থেকে এ ধরনের কথা শুনেও আশ্বস্ত হতে পারছিলেন না। তাই তিনি এসব প্রশ্ন আবু বকর (রাঃ) এর কাছে গিয়ে বললেন। কিন্তু তিনিও রাসূলুল্লাহ এর মতো উত্তর প্রদান করলেন।৮৬ এভাবেই সাহাবীগণ এ চুক্তির প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে তারা এ সন্ধির মর্ম ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন।
কুরবানী ও মাথা মুণ্ডন : অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরকে নিজ নিজ পশু সেখানেই কুরবানী দিতে বললেন; কিন্তু সাহাবীগণ এতই ব্যথিত হয়েছিলেন যে, তারা রাসূলুল্লাহ এর কথা পর্যন্ত কর্ণপাত করতে পারছিলেন না। তারপর রাসূলুল্লাহ তিন বার পর্যন্ত নির্দেশ করেন, কিন্তু এতেও কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। অবশেষে রাসূলুল্লাহ উম্মে সালামা (রাঃ) এর সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তখন তিনি পরামর্শ দেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি চান যে, সকলে নিজ নিজ পশু কুরবানী করে মাথা মুণ্ডন করুক, তাহলে আর কাউকে কিছু না বলে নিজ পশু যবেহ করুন এবং হাজ্জাম (নাপিত)-কে ডেকে মাথা মুণ্ডন করে নিন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তা-ই করলেন। ফলে সাহাবীগণও এটা দেখে রাসূলুল্লাহ এর অনুসরণ করতে লাগলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সকলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
হিজরতকারী মহিলাদের ফেরত প্রদানে অস্বীকৃতি : এ সফর শেষ করে রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরকে নিয়ে মদিনায় চলে আসেন। এর কিছু দিন পর একদল মহিলা মুহাজির মদিনায় চলে আসেন। তখন তাদের অভিভাবকরা উক্ত সন্ধিপত্র অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ এর কাছে তাদেরকে ফেরত দেয়ার দাবি জানালে তিনি তাদেরকে ফেরত দিতে অস্বীকার করেন এবং এ যুক্তি প্রদান করেন যে, মহিলারা এ সন্ধিচুক্তির আওতার বাইরে। সুতরাং তাদেরকে ফেরত দিতে আমরা বাধ্য নই। ফলে তারা খালি হাতেই মক্কায় ফেরত যায়। এ সময় আল্লাহ তা'আলা সূরা মুমতাহিনা এর ১০ নং আয়াত নাযিল করে ঘোষণা করেন যে, মুসলিম মহিলাদের জন্য কাফিররা হালাল নয়। এসব আয়াত নাযিল হওয়ার পরপরই উমর (রাঃ) তার দুই জন মুশরিক স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন, যারা তখনও মক্কায় অবস্থান করছিল। ৮৭
স্পষ্ট বিজয় :
এ সন্ধিপত্রের শর্তসমূহ বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থ বিরোধী মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল মুসলিমদের জন্য সোনার হরিণ। কেননা এ সন্ধিপত্রের মধ্যে লুকায়িত ছিল মুসলিমদের সুস্পষ্ট বিজয়। এ সন্ধিচুক্তির মাধ্যমে কুরাইশদের চরম মূর্খতার প্রকাশ ঘটেছিল, যা একটু গভীর দৃষ্টি দিয়ে লক্ষ্য করলেই অনুধাবন করা যায়।
উক্ত সন্ধিচুক্তির প্রথম ও দ্বিতীয় দফার শর্তসমূহের কারণে রাসূলুল্লাহ ও মুসলিমগণ দীর্ঘ দিনের যুদ্ধবিগ্রহের বিষাত্মক অবস্থা থেকে কিছু প্রশান্তি লাভ করার সুযোগ পান। তাছাড়া এ কারণে মক্কার আশেপাশে নির্বিঘ্নে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করার সুযোগও লাভ হয়। কেননা এতদিন কুরাইশদের তৎপরতার কারণে সে অঞ্চলগুলোতে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। সুতরাং এখন যদি মুসলিমরা দাওয়াত প্রদান করে তাহলে এতে কুরাইশরা কোনরূপ মাথা ঘামাতে পারবে না।
উক্ত সন্ধিচুক্তির তৃতীয় দফার শর্তসমূহের কারণে মুসলিমদের বিস্তার লাভ করার সুযোগ হয়। এতদিন যারা কুরাইশদের প্রভাবের কারণে ইসলামে প্রবেশ করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিলেন অথবা যারা ইসলামকে গভীরভাবে অনুধাবন করার প্রয়াস পাচ্ছিলেন না, তারা খুব সহজেই ইসলামকে ভালোভাবে অনুধাবন করার সুযোগ লাভ করেন। সুতরাং যারা ইসলামকে অনুধাবন করে ইসলাম গ্রহণ করেন, তারা নিজ নিজ অবস্থানে থেকেই ইসলামের দাওয়াত প্রদান করতে থাকেন। ফলে ইসলাম আরো দ্রুত বিস্তার লাভ করে। অবশেষে দেখা যায় যে, সন্ধিচুক্তির পর মক্কা বিজয় পর্যন্ত এতো বেশি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন যে, তাদের সংখ্যা ১০ হাজারে পৌঁছে গিয়েছিল।
উক্ত সন্ধিচুক্তির চতুর্থ দফাটি বাহ্যিকভাবে একেবারেই মুসলিমদের স্বার্থ বিরোধী মনে হচ্ছিল। কিন্তু এর মধ্যে নিহিত ছিল আরো বড় তাৎপর্য। কেননা এটা নিশ্চিত ছিল যে, কোন মুসলিম কখনো মক্কায় যাবে না; বরং মক্কার কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে মদিনায় চলে আসার চেষ্টা করবে। আর যদি কেউ মক্কায় যায়, তাহলে সে মূলত মুশরিক অথবা মুনাফিক ছাড়া আর কেউ নয়, যাকে ইসলামের কোনই প্রয়োজন নেই। সুতরাং সে যদি চলে যায়, তাহলে এতে কারো কিছু যায়-আসে না; বরং এতে ইসলামের আরো উপকার সাধন হবে।
অতএব সর্বদিক থেকে বিচার-বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, প্রকৃতপক্ষেই এতে মুসলিমদের কল্যাণ নিহিত ছিল। যার কারণে এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা নিজেই ঘোষণা দেন যে,
إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا
(হে রাসূল!) নিশ্চয় আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি। (সূরা ফাতহ- ১) মূলত এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরই সাহাবীগণ অন্তরে সান্ত্বনা অনুভব করেছিলেন।
মক্কা থেকে পলাতক সাহাবীদের কর্মকাণ্ড : উক্ত সন্ধিচুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোন সাহাবীই মক্কা থেকে পালিয়ে এসে মদিনায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে আশ্রয় গ্রহণ করত না। এমনকি যদি কোন সাহাবী মুশরিকদের নির্যাতনে জর্জরিত হয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে আশ্রয় গ্রহণ করতেন, তবুও তিনি তাকে মক্কাবাসীদের হাতে তুলে দিতেন। এমনই এক সাহাবী ছিলেন আবুল বাসীর (রাঃ)। তিনি ছিলেন মক্কাবাসীদের মিত্র সাকীফ গোত্রের লোক। তিনি যখন মুশরিকদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মদিনায় পলায়ন করে চলে আসেন, তখন কুরাইশদের পক্ষ হতে দুই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে সন্ধির শর্তানুযায়ী তাকে ফেরত দিতে বলে। ফলে তিনি তাকে তাদের হাতে সোপর্দ করেন। অতঃপর তারা যখন তাকে নিয়ে যুল হুলাইফা নামক স্থানে অবতরণ করে, তখন তিনি কৌশলে তাদের কাছ থেকে তরবারি নিয়ে একজনকে হত্যা করে ফেলেন এবং অপর ব্যক্তি পালিয়ে মদিনায় চলে আসে। অতঃপর সে ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলে দেয়। এমন সময় আবুল বাসির সেখানে উপস্থিত হন। বাসীর (রাঃ) যখন বুঝতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আবারও তাকে মক্কাবাসীদের হাতে তুলে দেবেন, তখন তিনি সেখান থেকে পলায়ন করে সমুদ্রের উপকূলে অবস্থান নেন। এদিকে আবু জান্দাল (রাঃ)-ও মক্কা থেকে পলায়ন করে আবুল বাসীর (রাঃ) এর সাথে যোগ দেন।
এরপর থেকে যিনিই মক্কা থেকে পলায়ন করতেন, তিনিই তাদের সাথে যোগ দিতেন। এতে ধীরে ধীরে সেখানে বেশ কয়েকজন একত্রিত হয়ে গেলেন। সেখান দিয়ে কুরাইশদের যে কোন বাণিজ্য কাফেলা গেলেই তারা তাদেরকে মারধর করে মালপত্রগুলো নিয়ে নিতেন। এভাবে যখন কুরাইশরা বারবার এ ধরনের আক্রমণের শিকার হতে থাকল, তখন তারা অতিষ্ঠ হয়ে নিজেরাই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে “মক্কা থেকে মদিনায় পলাতক ব্যক্তিকে ফেরত দিতে হবে” মর্মে শর্তটি উঠিয়ে নেয় এবং তাদেরকে মদিনায় ফেরত নেয়ার অনুরোধ জানায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদেরকে ডেকে এনে মদিনায় আশ্রয় প্রদান করেন।
কুরাইশ ভ্রাতৃবৃন্দের ইসলাম গ্রহণ : এ সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের পর থেকেই অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। বিশেষ করে হিজরী ৭ম বর্ষের প্রথম দিকে মক্কার বিশেষ ব্যক্তিত্ব আমর বিন আস, খালিদ বিন ওয়ালীদ এবং উসমান বিন তালহা (রাঃ) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। যখন এরা ইসলাম গ্রহণ করার জন্য মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেন, তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, মক্কা তার কলিজার টুকরোদেরকে আমাদের নিকট সমর্পণ করে দিয়েছে।

টিকাঃ
৭৯ আবু দাউদ, হা/১২৩৬।
৮০ সহীহ মুসলিম, হা/১৮৫৬; সহীহ বুখারী, হা/৪১৫৪; মিশকাত, হা/৬২১৯।
৮১ সহীহ বুখারী, হা/২৭৩১; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৪৮৭২। আলাইহি ওরাসাল্লাম
৮২ মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৯৩০; আবু দাউদ, হা/২৭৬৬; মিশকাত, হা/৪০৪৬।
৮৩ মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৯৩০।
৮৪ সহীহ বুখারী, হা/২৭৩১-৩২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৯৩০।
৮৫ মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৯৩০।
৮৬ সহীহ বুখারী, হা/৩১৮২; সহীহ মুসলিম, হা/১৭৮৫।
৮৭ সহীহ বুখারী, হা/২৭৩৩।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 পত্রের মাধ্যমে দাওয়াত

📄 পত্রের মাধ্যমে দাওয়াত


এতদিন যাবত তিনি কেবল মক্কা, মদিনা ও এর আশেপাশের এলাকাগুলোতে বসবাসরত আরবদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেছিলেন। এবার তিনি ইসলামের দাওয়াতকে আরো প্রসারিত করার লক্ষ্যে তখনকার যুগের বড় বড় বাদশাদের কাছে পত্র প্রেরণ করার মাধ্যমে দাওয়াত প্রদান করার জন্য মনস্থির করলেন। এ সময় তাঁকে জানানো হলো যে, রাজা-বাদশাগণ সিল মোহর ছাড়া কোন পত্র গ্রহণ করেন না। ফলে রাসূলুল্লাহ একটি রূপার আংটি তৈরি করিয়ে নেন, যার উপর 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' শব্দগুলো মুদ্রিত ছিল। এটি ছিল তিনটি লাইন বিশিষ্ট। প্রথম লাইনে ছিল 'মুহাম্মাদুন', দ্বিতীয় লাইনে ছিল 'রাসূলুন' এবং তৃতীয় লাইনে ছিল 'আল্লাহ'। প্রথম লাইনটি ছিল সবচেয়ে নিচে, দ্বিতীয় লাইনটি ছিল মধ্যখানে এবং তৃতীয় লাইনটি ছিল সবচেয়ে উপরে। রাসূলুল্লাহ এ পত্রগুলো হিজরী ৭ম বর্ষের মুহাররম মাস থেকেই প্রেরণ করতে শুরু করেন, যা ছিল খায়বার যুদ্ধের বেশ কয়েক দিন পূর্বে। নিম্নে সেসব পত্র প্রেরণের ফলাফলসহ সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়া হলো :
১. হাবশার সম্রাট নাজ্জাশীর নিকট পত্র প্রেরণ : যখন জাফর (রাঃ) হাবশায় হিজরত করেছিলেন, তখন বাদশা নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর তিনি ৯ম হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ তার গায়েবানা জানাযা আদায় করেন। কিন্তু যিনি তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন, তিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। ফলে রাসূলুল্লাহ আমর বিন উমাইয়া যামরী (রাঃ) এর মাধ্যমে তার নিকট পত্র প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু এরপরও তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন না।
২. মিশরের সম্রাট মোকাওকিসের নিকট পত্র প্রেরণ : ওয়াসাচ্চার সে সময় মিশর ও ইসকান্দার একই সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। তাদের সম্রাট ছিল মোকাওকিস, যার মূল নাম ছিল জোরাইজ বিন মাতা। রাসূলুল্লাহ হাতেব বিন আবু বালতা (রাঃ) এর মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তার নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেন। অতঃপর উক্ত পত্রটি তার হস্তগত হলে, তিনি এ পত্রটির যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করেন। অতঃপর তিনি এর প্রত্যুত্তরে এ মর্মে একটি পত্র লিখেন যে, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম। মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ এর প্রতি মহান মোকাওকিস কিবতের পক্ষ হতে। আপনি আমার সালাম গ্রহণ করুন। অতঃপর আপনার পত্র আমার হস্তগত হয়েছে। পত্রে উল্লেখিত আপনার বক্তব্য উপলব্ধি করেছি। এখন যে একজন নবীর আবির্ভাব ঘটবে, সে বিষয়ে আমার ধারণা রয়েছে। আমার ধারণা ছিল যে, তিনি শাম রাজ্য থেকে আবির্ভূত হবেন। আমি আপনার প্রেরিত সংবাদ বাহকের নিদর্শনস্বরূপ আপনার খেদমতে দুটো দাসী প্রেরণ করলাম, যারা কিবতীদের মাঝে বড় মর্যাদার অধিকারিণী। অধিকন্তু সামান্য উপঢৌকন হিসেবে আপনার পরিধানের জন্য কিছু পরিচ্ছদ ও বাহন হিসেবে ব্যবহারের জন্য একটি খচ্চর পাঠালাম। অতঃপর আপনার খেদমতে পুনরায় সালাম পেশ করলাম। সম্রাট মোকাওকিস এ বলেই পত্র শেষ করলেন; তিনি রাসূলুল্লাহ এর প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা প্রদর্শন করলেও ইসলাম গ্রহণ করেননি। তার প্রেরিত দাসী দুটির মধ্যে একটির নাম ছিল মারিয়া এবং অপরটির নাম ছিল শিরীন। আর খচ্চরটির নাম ছিল দুলদুল, যা মুয়াবিয়া (রাঃ) এর শাসনকাল পর্যন্ত জীবিত ছিল। অতঃপর উক্ত দাসী দুটির মধ্যে মারিয়ার গর্ভে রাসূলুল্লাহএর পুত্র ইবরাহীম এর জন্ম হয়েছিল। আর শিরীন নামক দাসীকে তিনি আনাস বিন সাবেত আনসারী (রাঃ)-কে দিয়ে দিয়েছিলেন। ১২
৩. পারস্য সম্রাট খসরুর নিকট পত্র প্রেরণ : সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
সে সময় পারস্যের সম্রাটের নাম ছিল কিসরা, যে খসরু নামেই পরিচিত ছিল। সে ছিল খুবই অহংকারী, উদ্ধতপূর্ণ স্বভাবের অধিকারী। রাসূলুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনে হোযাফা সাহমী (রাঃ) এর মাধ্যমে তাকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করে একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। তিনি এই পত্র নিয়ে প্রথমে বাহরাইনের প্রধানের নিকট গমন করেন। তারপর সে তাঁকে জনৈক লোকের মাধ্যমে কিসরার নিকট প্রেরণ করে। অতঃপর যখন তার নিকট পত্রটির প্রথম অংশ "আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে পারস্য সম্রাট কিসরার প্রতি” পাঠ করা হচ্ছিল তখন সে এ মর্মে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে যে, আমার প্রজাদের অন্তর্ভুক্ত একজন নিকৃষ্ট দাস তার নিজ নাম আমার নামের পূর্বে লিখেছে! তারপর সে পত্রটি ছিঁড়ে ফেলে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ এ সংবাদটি অবগত হয়ে তার জন্য বদদু'আ করেছিলেন। ফলে সে কয়েকদিন পরেই পারিবারিক কলহের জের ধরে নিজপুত্র শিরওয়ার হাতে নিহত হয়।
৪. রোমের সম্রাট হিরাকলের নিকট পত্র প্রেরণ : ওয়াসাল্লাম আাসাল্লাম সে সময় রোম সম্রাট ছিল হিরাকল। তার আসল নাম ছিল কায়সার। রাসূলুল্লাহ দিহইয়াতুল কালবী (রাঃ) এর মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তার নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। তিনি যখন পত্র নিয়ে সেখানে পৌঁছলেন, তখন আবু সুফিয়ানসহ কুরাইশদের একটি বণিক দলও সেখানে সফরে গিয়েছিল। ফলে দিহইয়াতুল কালবী (রাঃ) যখন সম্রাট হিরাকলকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন, তখন সে রাসূলুল্লাহ এর ব্যাপারে ভালোভাবে জানার জন্য আবু সুফিয়ানের সে দলটিকে ডেকে পাঠায়- যেহেতু তারা ছিল রাসূলুল্লাহ এর প্রতিবেশী। তারপর সে তাকে রাসূলুল্লাহ এর ব্যাপারে অনেক ধরনের প্রশ্ন করে। ফলে সে প্রত্যেকটি প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাকভাবে প্রদান করে। এ সময় হিরাকল উভয় পক্ষের কথা অনুধাবন করার জন্য একজন দুভাষীকে সাথে রেখেছিল। অবশেষে এক পর্যায়ে হিরাকল বলল, তাঁর সম্পর্কে তুমি যা কিছু বলেছ তা যদি সঠিক ও সত্য হয়, তাহলে এ ব্যক্তি খুব শীঘ্রই আমার দুই পদতলের জায়গার অধিকার লাভ করবেন। আমার জানা ছিল, এ নবীর আবির্ভাব ঘটবে। কিন্তু আমার ধারণা ছিল না যে, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে আসবেন। যদি নিশ্চিত হতাম যে, আমি তাঁর নিকট পৌঁছতে সক্ষম হব, তাহলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য কষ্ট স্বীকার করতাম। আর যদি তার নিকটবর্তী হতাম, তাহলে তাঁর পদদ্বয় ধৌত করে দিতাম। সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরপর হিরাকল রাসূলুল্লাহ এর প্রেরিত পত্রটি চেয়ে নিয়ে পাঠ করল। তখন তার রাজ দরবারে বিশৃঙ্খলা দেখা দিল। অবশেষে হিরাকল দিহইয়াতুল কালবী (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ এর উদ্দেশ্যে কিছু অর্থ ও মূল্যবান পোশাক উপঢৌকন হিসেবে প্রদান করেছিল। এরপরও সে মন্ত্রীসভার প্রভাবে আর ইসলাম গ্রহণ করেনি।
৫. বাহরাইনের গভর্নর মুনযির বিন সাভীরের নিকট পত্র প্রেরণ : আাসাল্লাম সে সময় বাহরাইনের গভর্নর ছিল মুনযির বিন সাভীর। রাসূলুল্লাহ আলা ইবনে হাযরামী (রাঃ) এর মাধ্যমে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তার নিকট একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। সে পত্রটি ভালোভাবে পাঠ করার পর এর প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ -কে এ মর্মে একটি পত্র প্রেরণ করে যে, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার পত্রটি আমি বাহরাইনবাসীকে পাঠ করে শুনিয়েছিলাম। ফলে কিছু লোক ইসলামের ভালোবাসা এবং পবিত্রতার মনোভাব ব্যক্ত করে তার সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেছে। কিন্তু কিছু লোক বিরূপ মনোভাব ব্যক্ত করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া এ জমিনে ইয়াহুদি এবং অগ্নী উপাসকও রয়েছে। অতএব এ ব্যাপারে আপনার নিজস্ব কর্ম প্রক্রিয়া অবলম্বন করুন। তারপর রাসূলুল্লাহ পরবর্তী নির্দেশনা দিয়ে আরো একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন।
৬. আম্মানের সম্রাটের নিকট পত্র প্রেরণ : সে সময় আম্মানের সম্রাটের নাম ছিল জাইফার। সে ছিল খুবই ক্ষমতালোভী; কিন্তু তার ভাই আবদ ছিল যথেষ্ট নমনীয় ও বুদ্ধিমান। তাদের পিতার নাম ছিল জালান্দি। রাসূলুল্লাহ তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান পূর্বক আমর ইবনে আস (রাঃ) এর মাধ্যমে একটি পত্র প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে গিয়ে সর্বপ্রথম আবদের সাথে দেখা করে তার সাথে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত প্রদান করেন। সে সময় তিনি তাকে অন্যান্য বাদশাদের নিকট পত্র প্রেরণ এবং তাদের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি অবহিত করেন। ফলে এতে তিনি নমনীয়তা প্রদর্শন করেন। তারপর আমর ইবনে আস (রাঃ) সম্রাট জাইফারের নিকট গিয়ে রাসূলুল্লাহ এর পত্রটি হস্তান্তর করেন। ফলে তিনি সেটি গ্রহণ করে ভালোভাবে পাঠ করেন। অতঃপর তারা বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনার জন্য বেশ কয়েকদিন সময় নেন। অবশেষে যেদিন আমর ইবনে আস (রাঃ) ফেরত আসবেন, সেদিন তারা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করে নেন এবং তারা এ কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন।

টিকাঃ
* সহীহ বুখারী, হা/৫৮৭২-৭৩।
** সহীহ বুখারী, হা/৩১০৬, ৫৮৭৮; মিশকাত, হা/৪৩৮৬।
১০ ইবনে মাজাহ, হা/১৫৩৪; সহীহ বুখারী, হা/১২৪৫; সহীহ মুসলিম, হা/৯৫১।
১১ যাদুল মা'আদ ১/১১৭, ৩/৬০৩।
১২ যাদুল মা'আদ ৩/৬০৪; হায়ছামী, মাজমাউয যাওয়ায়েদ হা/৬৭৫১, সনদ সহীহ।
১০ সহীহ বুখারী, হা/৪৪২৪; যাদুল মা'আদ ৩/৬০১।
১৪ সহীহ বুখারী, হা/৭, ৪৫৫৩; সহীহ মুসলিম, হা/১৭৭৩; মিশকাত, হা/৫৮৬১।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 খায়বার অভিযান

📄 খায়বার অভিযান


খায়বার মদিনা হতে আশি অথবা ষাট মাইল উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত একটি জায়গার নাম। এখানে প্রচুর পরিমাণ কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। বনু কুরাইযা ও বনু নাযির গোত্রের ইয়াহুদিরা যখন মদিনা থেকে বিতাড়িত হয়, তখন তারা এ অঞ্চলে এসে শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে। এখান থেকে তারা মদিনার মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র পরিচালনা করতে থাকে। মূলত খন্দক ছিল এদের ষড়যন্ত্রের ফল। এদের প্রচেষ্টাতেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে আরবের এতগুলো জাতি একত্রিত হতে পেরেছিল। সুতরাং রাসূলুল্লাহ মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু কুরাইশদের সাথে একটি সমঝোতায় যাওয়ার পর এবার খায়বারের দিকে মনোযোগ দিলেন।
রাসূলুল্লাহ এর খায়বার অভিমুখে যাত্রা ও সৈন্য সংখ্যা : রাসূলুল্লাহ খায়বার বিজয় করার উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে বের হয়েছিলেন হিজরী ৭ম বর্ষের মুহাররম মাসে। এ সময় মুসলিমদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ১৪০০ জন। কেননা রাসূলুল্লাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, এ যুদ্ধে কেবল তারাই অংশগ্রহণ করতে পারবে, যারা প্রকৃতপক্ষেই অংশগ্রহণ করতে চায়। ফলে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য সেসব সাহাবীই নির্বাচিত হলেন, যারা হুদায়বিয়া সন্ধির সময় বাই'আতে রিযওয়ানে অংশ নিয়েছিলেন। আর উক্ত বাই'আতে ১৪০০ জন সাহাবীই অংশগ্রহণ করেছিলেন।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ খায়বারে প্রবেশ করার জন্য এমন একটি পথ নির্বাচন করেন, যা ছিল খায়বার ও বনু গাতফান গোত্রের মধ্যখানে। এর কারণ হলো, মুসলিম বাহিনী যদি এ পার্শ্ব দিয়ে খায়বারে প্রবেশ করে, তাহলে শত্রুরা পালানোর জন্য আর কোন পথ পাবে না এবং তারা বনু গাতফান গোত্র থেকে কোনরূপ সাহায্যও পাবে না। আর সেই দিকটি ছিল মদিনা থেকে খায়বারে প্রবেশের ঠিক উল্টো দিক তথা সিরিয়ার দিক। কেননা খায়বার ছিল মদিনা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ খুবই গোপনীয়তার সাথে যাত্রা করেছিলেন।
আলী (রাঃ) এর হাতে পতাকা প্রদান : রাসূলুল্লাহ যে রাত্রিতে খায়বারের সীমানায় প্রবেশ করলেন, সেই রাত্রিতে রাসূলুল্লাহ ঘোষণা করলেন যে, আগামীকাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে পতাকা প্রদান করব, যে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালোবাসেন। ফলে সাহাবীগণ সেই রাত্রিটি এমন অবস্থায় কাটালেন যে, প্রত্যেকেই আশা করছিলেন যেন তার হাতেই পতাকাটা প্রদান করা হবে। অবশেষে পরের দিন সকালে দেখা গেল যে, রাসূলুল্লাহ পতাকা প্রদান করার জন্য আলী (রাঃ)-কে আহ্বান করছেন। সে সময় আলী (রাঃ) এর চোখে পীড়া হয়েছিল; ফলে তিনি সাহাবীদের পেছনে ছিলেন। অতঃপর যখন তাঁকে রাসূলুল্লাহ এর কাছে নিয়ে আসা হলো, তখন রাসূলুল্লাহ তাঁর চোখে মুখের লালা লাগিয়ে সুস্থতার জন্য দু'আ করলেন। ফলে তিনি এমনভাবে আরোগ্য লাভ করলেন, যেন তাঁর চোখে কোন পীড়াই হয়নি। তারপর রাসূলুল্লাহ তাঁর হাতে পতাকা প্রদান করেন।১৫
খায়বারে অনুপ্রবেশ : রাসূলুল্লাহ এর নিয়ম ছিল এই যে, যদি তিনি কোন জনবসতিতে আক্রমণ করতে চাইতেন, তখন তিনি ফজর পর্যন্ত অপেক্ষা করতেন।
যদি দেখতেন যে, সেখানে ফজরের আযান দেয়া হচ্ছে, তাহলে তিনি ফিরে যেতেন। আর যদি দেখতেন যে, সেখানে ফজরের আযান দেয়া হচ্ছে না, তাহলে তিনি আক্রমণ পরিচালনা করতেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ খায়বার আক্রমণের সময়ও তাই করলেন। অতঃপর তিনি আলী (রাঃ) এর হাতে পতাকা দিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন। তিনি এমন সময় খায়বারে প্রবেশ করলেন, যখন তারা সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠে কৃষি কাজ করার জন্য মাঠে যাচ্ছিল। হঠাৎ তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে দেখতে পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং এ বলে ছোটাছুটি শুরু করে দেয় যে, আল্লাহর কসম! মুহাম্মাদ তাঁর বাহিনী নিয়ে এসে গেছে। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহু আকবার, খায়বার ধ্বংস হলো; আল্লাহু আকবার, খায়বার ধ্বংস হলো- যখন আমরা কোন সম্প্রদায়ের নিকট অবতরণ করি, তখন তাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়। ফলে তাদের সকাল মন্দ হয়ে যায়।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী একটি জায়গায় শিবির স্থাপন করলেন। অপরদিকে খায়বারবাসীরাও তাদের দুর্গসমূহের মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করল। এ যুদ্ধে মুসলিমগণ খায়বারবাসীর উপর বিজয় লাভ করেছিলেন। এতে মুসলিমদের মধ্য হতে শহীদ হয়েছিল ১৬ জন মতান্তরে ১৫, ১৮ অথবা ২৩ জন। অপরপক্ষে ইয়াহুদিদের মধ্য হতে নিহত হয়েছিল ৯৩ জন।
খায়বারের দুর্গসমূহ: সে সময় খায়বারের জনবসতি দুটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। একটি অঞ্চলে ছিল পাঁচটি দুর্গ। সেগুলো হলো- ১. নায়েম দুর্গ ২. সা'আব বিন মুয়ায দুর্গ ৩. জুবাইর দুর্গ ৪. উবাই দুর্গ এবং ৫. নেযার দুর্গ এগুলোর প্রথম তিনটি দুর্গের নিকটবর্তী অঞ্চলকে 'নাতাত' বলা হতো এবং অবশিষ্ট দুটি দুর্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলকে 'শিক' বলা হতো। আর অপর অঞ্চলে ছিল তিনটি দুর্গ। সেগুলো হলো- ১. কসুম দুর্গ ২. ওয়াতীহ দুর্গ এবং ৩. সালালিম দুর্গ। এ অঞ্চলকে কাতিবা বলা হতো। এছাড়াও উভয় অঞ্চলে আরো কিছু ছোট ছোট দুর্গ ও ঘাঁটি ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ মূল অভিযান পরিচালনা করেছিলেন কেবল প্রথম অঞ্চলের দুর্গগুলোতেই। তারপর তারা মুসলিমদের শক্তি-সামর্থের দিকে লক্ষ্য করে কোন ধরনের যুদ্ধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করে।
খায়বারবাসীদের সাথে সন্ধি : খায়বারবাসীদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ শর্তের ভিত্তিতে সন্ধি করেন যে, ১. দুর্গের মধ্যে যেসকল সৈন্য অবস্থান করছে, তাদেরকে জীবিত ছেড়ে দিতে হবে। ২. তাদের পরিবার-পরিজনকে তাদের সঙ্গে থাকতে দিতে হবে। ৩. পরিবার-পরিজনসহ তাদের খায়বার ছেড়ে বাহিরে চলে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। ৪. তাদের ধন-সম্পদ, যথা- বাগ-বাগিচা, সোনা-দানা, অশ্ব, যুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য লৌহবর্ম ইত্যাদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট সমর্পণ করতে হবে। ৫. কেবল লজ্জা নিবারণ ও জীবন ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় সাথে নিয়ে যেতে পারবে।
গনীমতের মালের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত : এ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণ প্রচুর পরিমাণ গনীমত প্রাপ্ত হয়েছিলেন। যেহেতু মদিনা থেকে খায়বারে এসে চাষাবাদ করাটা মুসলিমদের পক্ষে খুবই কষ্টসাধ্য ছিল, ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই জমিগুলো থেকে অর্ধাংশ গ্রহণ করার শর্তে বর্গাচাষ করার জন্য পুনরায় সেই ইয়াহুদিদের কাছেই সমর্পণ করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বার থেকে প্রাপ্ত সমস্ত সম্পদকে প্রথমে ৩৬ ভাগে, তারপর প্রতিটি ভাগকে আরো ১০০ ভাগে- সর্বমোট ৩৬০০ ভাগে বিভক্ত করেন। তারপর এর অর্ধেক অংশ তথা ১৮০০ ভাগ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এবং সাহাবীগণের মধ্যে বণ্টন করে দেন এবং অবশিষ্ট অর্ধেক অংশ তথা ১৮০০ ভাগ মুসলিমদের বিভিন্ন সামাজিক প্রয়োজন ও বিপদাপদ মোকাবেলার জন্য রেখে দেন।

টিকাঃ
* সহীহ বুখারী, হা/৩৭০১, ৪২১০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00