📄 বনু মুস্তালিক অভিযান
এ অভিযানটি পরিচালিত হয় হিজরী ৫ম অথবা ৬ষ্ঠ বর্ষের শা'বান মাসে। একদা রাসূলুল্লাহ জানতে পারলেন যে, বনু মুস্তালিকের সরদার হারিস বিন আবু জাররা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য লোকজনকে একত্রিত করছে। তখন রাসূলুল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে একটি বাহিনী নিয়ে সেখানে গমন করেন। এ অভিযানে মুনাফিকদের একটি দলও অংশগ্রহণ করেছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বাহিনী নিয়ে তাদের উপর অতর্কিত হামলা করেন। ফলে তারা পালিয়ে যায়। তারপর রাসূলুল্লাহ তাদের মহিলা ও শিশুদেরকে বন্দী করেন এবং তাদের ধনসম্পদসমূহ গনীমত হিসেবে নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেন।
📄 ইফকের ঘটনা
এ ঘটনাটি ঘটেছিল বনু মুস্তালিক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে। এটি ছিল রাসূলুল্লাহ এর স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) এর বিরুদ্ধে অপবাদ রটানোর ঘটনা, যার মূল হোতা ছিল মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই। ঘটনাটি হাদীসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে,
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর নিয়ম ছিল, যখন তিনি সফরে বের হতেন, তখন লটারীর সাহায্যে মীমাংসা করতেন, তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে কে তাঁর সঙ্গী হবেন। এ যুদ্ধে লটারী করার সময় আমার নাম উঠে। ফলে আমি রাসূলুল্লাহ এর সঙ্গে বের হলাম, এটা ছিল পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরবর্তীকালের ঘটনা।
নিয়ম ছিল এমন যে, চলার সময় আমি আমার নিজের 'হাওদাজে' (পালকীর মতো) বসে যেতাম। যুদ্ধ শেষে ফেরার পথে আমরা মদিনার নিকট পৌঁছলাম এবং কিছু সময় সেখানে অবস্থান করলাম। অতঃপর রাতেই সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ নির্দেশ দিলেন। যখন বাহিনীকে বাড়ি ফেরার নির্দেশ দেয়া হলো, তখন আমি ঘুম থেকে উঠে প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণার্থে সৈন্যদের (ছাউনি) ছেড়ে বাইরে গেলাম। আমি প্রাতঃক্রিয়া সম্পন্ন করে আমার 'হাওদাজে' ফিরে এলাম। কিন্তু আমি দেখলাম আমার 'জাজ আজফা' এর তৈরি গলার হার ছিঁড়ে কোথাও পড়ে গিয়েছে। আমি তা সন্ধান করতে যাওয়ায় পেছনে পরে গেলাম। নিয়ম ছিল এমন যে, চলে যাওয়ার সময় আমি আমার নিজের হাওদাজে বসে যেতাম এবং লোকেরা তা উঠিয়ে উটের পিঠে বসিয়ে দিত। তারা এসে আমার 'হাওদাজ' উঠিয়ে উটের পিঠে বসিয়ে দিল, তারা ধারণা করল যে, আমি তাতে বসা আছি। এ সময় খাদ্যের অভাবের জন্য আমরা মহিলারা ছিলাম বড়ই হালকা এবং কম ওজন বিশিষ্ট। তখন এমনিতেই আমি ছিলাম অল্পবয়স্কা এক বালিকা এবং হালকা। সুতরাং লোকেরা 'হাওদাজ' উঠাবার সময় আমি আছি কি না তা বুঝতেও পারেনি। তারা অজ্ঞাতস্থানে উট হাঁকিয়ে চলে গেল। পরে আমি হার নিয়ে যখন ফিরে এলাম, সেখানে কাউকে পেলাম না। আমি চিন্তা করলাম, যখন কিছু দূর গিয়ে আমাকে পাবে না, তখন তারা আমাকে সন্ধান করতে ফিরে আসবে। অতঃপর আমি নিজ জায়গায় বসে পড়লাম, আমাকে নিদ্রায় পেয়ে বসল এবং আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
এদিকে সাফওয়ান ইবনে মু'আত্তাল আস-সুলাইমী আয-যাকওয়ানী সেনাবাহিনীর পশ্চাতে রয়ে গিয়েছিল। সে রাতের শেষভাগে রওয়ানা দিয়ে সকালবেলা আমার স্থানে এসে পৌঁছল এবং একজন ঘুমন্ত লোককে দেখতে পেল। সে আমার নিকট আসলো এবং আমাকে দেখে চিনতে পারল, কারণ পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার আগে সে আমাকে দেখেছিল। তার “ইন্না- লিল্লা-হি ওয়া ইন্না- ইলাইহি রা-জি'ঊন” উচ্চারণ শুনে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠলাম, যা সে আমাকে চিনতে পেরে (বিস্ময়ের) সাথে বলেছিল। তখন আমি আমার চাদর দিয়ে চেহারা ঢেকে ফেললাম। সে “ইন্না- লিল্লা-হি ওয়া ইন্না- ইলাইহি রাজি'ঊন” ছাড়া একটি শব্দও উচ্চারণ করল না; এমনকি তার উষ্ট্রী এনে আমার নিকট হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দিল ও সম্মুখের দু'পা নুইয়ে দিল এবং আমি তাতে আরোহণ করলাম। তখন সাফওয়ান আমাকে নিয়ে রওয়ানা হলো এবং সে উটের লাগাম ধরে হেঁটে চলল। উট আমাকে বহন করে নিয়ে চলছিল, যতক্ষণ না আমরা সৈন্যদের নিকট গিয়ে পৌঁছলাম, যে সময় তারা দুপুরের প্রচণ্ড গরমের কারণে বিশ্রাম নিচ্ছিল।
আর যারা এ ধরনের অপবাদমূলক ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হতে প্রস্তুত তারা তাতেই লিপ্ত হলো। এ ব্যাপারে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছিল, তন্মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূলই ছিল অগ্রসর। সে ছিল, এ ঘটনার মূল হোতা। এরপর আমরা মদিনায় পৌঁছলাম এবং আমি দীর্ঘ এক মাসের জন্য অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলাম। এ সময় ইফকে অংশগ্রহণকারীরা মিথ্যা অপবাদের সংবাদ জনগণের কাছে রটিয়ে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু আমি এ সবের কিছুই জানতে পারিনি। একটা জিনিস অবশ্য আমার মনে লাগছিল, তা হচ্ছে এই যে, আমার অসুস্থ অবস্থায় সাধারণতঃ রাসূলুল্লাহ যেরকম স্নেহ-ভালোবাসা দেখাতেন, এবারে তিনি আমার প্রতি তেমন মমতা দেখাচ্ছেন না। রাসূলুল্লাহ আমার নিকট আসতেন, সালাম করতেন, অতঃপর জিজ্ঞেস করতেন, “সে এখন কেমন আছে?” এরপরে চলে যেতেন। এতে আমার মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল, কোন কিছু ঘটেছে হয়তো। কিন্তু আমি সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত এ সমস্ত মিথ্যা অপবাদ রটানোর ব্যাপারে কিছুই জানতে পারিনি।
একদা উম্মে মিসতাহ এর সাথে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার জন্য "আল-মানাসি” নামক স্থানে গেলাম। সে সময় পর্যন্ত আমাদের সব ঘরে টয়লেট তৈরি হয়নি। সুতরাং আমি উম্মে মিসতাহ এর সঙ্গে বাইরে গেলাম। সে ছিল আবি রুহম বিন আবদে মানাফের কন্যা। আর তার মা ছিল সাখর বিন আমিরের কন্যা এবং এ ব্যক্তি ছিল আবু বকর (রাঃ) এর খালু। আর তার পুত্র ছিল মিসতাহ ইবনে উসামা। যখন আমরা আমাদের কাজ শেষ করলাম, উম্মে মিসতাহ এবং আমি আমাদের ঘরের নিকট ফিরে এলাম। পথিমধ্যে উম্মে মিসতাহ আঘাত পেলো এবং সহসা তার মুখ হতে বের হলো, মিসতাহ ধ্বংস হোক! তখন আমি তাকে বললাম, তুমি খুব খারাপ কথা উচ্চারণ করলে! তুমি এমন একটি লোককে গালি দিচ্ছ, যে বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছে! সে বলল, হায় কী অচেতন! তুমি কোথায়? তুমি শোননি সে কী বলেছে? আমি বললাম, সে কী বলেছে? তখন সে (উম্মে মিসতাহ) ইফকের ঘটনা রটনাকারীরা যা বলে বেড়াচ্ছে তা খুলে বলল- যা আমার অসুস্থতাকে আরো বৃদ্ধি করল। যখন আমি ঘরে ফিরে এলাম, তখন রাসূলুল্লাহ আমার নিকট আসলেন এবং সালাম করার পর প্রশ্ন করলেন, সে কেমন আছে? আমি বললাম, আপনি কি আমাকে আমার পিতামাতার কাছে যেতে অনুমতি দেবেন? তখন আমি তাদের কাছ থেকে এ সংবাদ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম। রাসূলুল্লাহ আমাকে অনুমতি দিলেন এবং আমি পিতামাতার কাছে চলে গেলাম। অতঃপর বাড়িতে গিয়ে মাকে প্রশ্ন করলাম, আম্মা! লোকেরা এগুলো কী বলাবলি করছে? আমার আম্মা বললেন, কন্যা! এটাকে হালকাভাবে গ্রহণ করো। আল্লাহর কসম! এমন কোন সুন্দরী নারী নেই, যাকে তার স্বামী ভালবাসে না এবং যার অন্য স্ত্রীরা তার খুঁত বের করার চেষ্টা করে না; (এর বিপরীত) ঘটনা খুব কমই (ঘটে)। আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! সত্যই কি লোকেরা এ ব্যাপারে বলাবলি করছে? আমি সেই রাত থেকে সকাল পর্যন্ত কান্নাকাটি করে কাটিয়ে দিলাম। না কখনও আমি কান্না থামাতে পেরেছি, না ঘুমাতে পেরেছি। এমনকি ভোরের সূর্য উদয় হয়েছে এবং তখনও আমি কাঁদছি।
রাসূলুল্লাহ তাঁর স্ত্রীকে তালাক দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য আলী ইবনে আবু তালিব এবং উসামা ইবনে যায়েদকে ডাকলেন। উসামা ইবনে যায়েদ রাসূলুল্লাহ-কে তাঁর স্ত্রীর পবিত্রতা হওয়া সম্পর্কে যা জানেন তাই বললেন এবং তার উপর তাঁর যে ভালোবাসা রয়েছে, তাও উল্লেখ করলেন। উসামা ইবনে যায়েদ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আপনার স্ত্রী এবং তার মধ্যে আমি ভাল ব্যতীত কখনও মন্দ কোন কিছু দেখতে পাইনি। কিন্তু আলী ইবনে আবু তালিব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনার প্রতি কোন পথ সংকীর্ণ করেননি এবং আমাদের সমাজে তিনি ব্যতীত অসংখ্য মহিলা রয়েছে। আর আসল অবস্থা জানতে চাইলে (তার) দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করুন, সে আপনাকে সত্য কথা বলবে। আয়েশা (রাঃ) আরো বলেছেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ বারীরাকে ডাকলেন এবং বললেন, হে বারীরা! তুমি কি কখনও এমন কিছু দেখেছ, যা তোমার মাঝে সন্দেহের সৃষ্টি করতে পারে? বারীরা বলল, আল্লাহর শপথ! যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ (নবী হিসেবে) পাঠিয়েছেন, আমি তার মধ্যে মন্দ কিছু দেখিনি যে, তার ব্যাপারে আপনাকে আপত্তি করা যেতে পারে। তবে দোষ শুধু এতটুকুই দেখেছি যে, সে একটি অল্পবয়স্কা বালিকা মাত্র; সে কখনও কখনও পরিবারের আটার খামির রেখে ঘুমিয়ে পড়ত আর ছাগল এসে তা ভক্ষণ করত।
অতঃপর নবী উঠলেন এবং লোকদের সামনে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, কে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারবে? রাসূলুল্লাহ মিম্বরে বসে থাকাবস্থায় আরো বললেন, হে মুসলিমগণ! তোমাদের মধ্যে কে এমন আছ? যে আমার স্ত্রীর ওপর মিথ্যা অপবাদ রটিয়ে আমাকে কষ্ট দিয়েছে; তার আক্রমণ থেকে আমাকে বাঁচাতে সাহায্য করতে পারবে? আল্লাহর শপথ! আমি আমার স্ত্রীদের মধ্যে ভাল ব্যতীত কিছুই দেখতে পাইনি এবং লোকেরা এমন একটি লোককে (সাফওয়ান ইবনে মু'আত্তালকে) দোষী করেছে, যার সম্পর্কে আমি ভাল ব্যতীত কিছুই জানি না এবং সে কখনও আমার অনুপস্থিতিতে আমার ঘরে আসেনি।
এ কথা শুনে সা'দ ইবনে মুয়ায আল-আনসারী দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শপথ! অপবাদ দানকারী যদি আওস সম্প্রদায়ের লোক হয় তবে তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে এ কষ্ট থেকে আপনাকে নিষ্কৃতি দেব। আর সে যদি আমাদের ভাই খাযরাজ কবীলার লোক হয়, তবে আপনি যা বলবেন তাই করব। এ কথা শুনে সা'দ ইবনে উবাদা দাঁড়িয়ে গেলেন, যিনি ছিলেন খাযরাজ সম্প্রদায়ের প্রধান। তিনি সৎ ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু এ সময় তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের স্বার্থে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি সা'দ ইবনে মুয়ায (রাঃ)-কে বললেন, আল্লাহর শপথ! তুমি মিথ্যা কথা বলেছ, তুমি তাকে হত্যা করবে না এবং তুমি কখনও তাকে হত্যা করতে পারবে না। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে সা'দ ইবনে মুয়ায এর চাচাতো ভাই উসাইদ ইবনে হুযাইর দাঁড়াল এবং সা'দ ইবনে উবাদাকে বলল, তুমি একজন মিথ্যাবাদী! চিরন্তন আল্লাহর শপথ! আমরা নিশ্চয় তাকে হত্যা করব। তুমি মুনাফিক এবং মুনাফিকের পক্ষে কথা বলছ। সুতরাং আওস ও খাযরাজ সম্প্রদায়ের লোকেরা উত্তেজিত হয়ে উঠল, এমনকি তারা পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়ার উপক্রম হলো। অথচ আল্লাহর নবী আলাইহি স্বরাসাল্লাম তখনও মিম্বরের উপর দাঁড়ানো ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাদেরকে শান্ত ওয়াসাল্লাম করার চেষ্টা করলে তারা শান্ত হলো ও চুপ করল।
আয়েশা (রাঃ) বলেন, সেদিন আমি দিনভর কাঁদতেই থাকলাম, না আমার চোখের কান্না থামল আর না আমি ঘুমাতে পারলাম। সকালে আমার পিতামাতা আমার কাছে ছিলেন এবং আমি দু'রাত ও দু'দিন একাধারে কোন ঘুম-নিদ্রা ছাড়াই কেঁদেছিলাম। ফলে তারা ভাবলেন যে, অধিক কান্নার ফলে আমার কলিজা ফেটে যাবে। যখন তারা আমার সঙ্গে ছিলেন এবং আমি কাঁদছিলাম, তখন জনৈক আনসারী মহিলা আমার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চাইল। আমি তাকে আসার অনুমতি দিলাম এবং সে বসেই আমার সাথে কান্না জুড়ে দিল। যখন আমি এ অবস্থায় ছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ আমাদের নিকট আসলেন এবং সালাম করে আসন গ্রহণ করলেন।
এ সমস্ত অপবাদ যখন রটাচ্ছিল তখন হতে তিনি কখনও আমার নিকট বসেননি। এ দীর্ঘ এক মাস তিনি অপেক্ষা করেছেন অথচ আমার ব্যাপারে কোন ওহী অবতীর্ণ হয়নি। রাসূলুল্লাহ আমার কাছে বসার পর তাশাহহুদ (কালিমায়ে শাহাদাত) পাঠ করলেন তারপর বললেন, আয়েশা! তোমার সম্পর্কে এরূপ এরূপ কথা আমার নিকট পৌঁছেছে, তুমি যদি নিষ্পাপ হয়ে থাক, তাহলে আশা করি আল্লাহ তোমার নির্দোষিতা প্রকাশ ও প্রমাণ করে দেবেন। আর তুমি যদি বাস্তবিকই কোন পাপে লিপ্ত হয়ে থাক, তাহলে আল্লাহর কাছে মাফ চাও, তওবা করো। কেননা বান্দা যখন নিজের গুনাহ স্বীকার করে তওবা করে, তখন আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন। যখন রাসূলুল্লাহ তাঁর ভাষণ শেষ করলেন, তখন আমার চোখের পানি এমনভাবে শুকিয়ে গেল যেন একফোঁটা পানিও অনুভব করছিলাম না।
আমি আমার আব্বা [আবু বকর (রাঃ)]-কে বললাম, আপনি আমার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ এর কথার উত্তর দিন, যা কিছু তিনি বলেছেন। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি বুঝি না, রাসূল-কে কী উত্তর দেব। তখন আমি বয়সে বালিকা মাত্র এবং আমার কুরআনের জ্ঞানও ছিল অল্প, তবুও আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! আমি জানি আপনারা যখনই এ ঘটনা শুনেছেন, তখনই তা আপনাদের অন্তরে গেঁথে গিয়েছে এবং বিশ্বাস করে বসেছেন। সুতরাং এখন আমি যদি বলি আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং আল্লাহ জানেন যে, আমি নির্দোষ, তবে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন না। আর আমি যদি শুধু শুধুই এমন একটা কথা মেনে নেই, যা আমি আদৌ করিনি এবং আল্লাহ জ্ঞাত আছেন যে, আমি দোষের কোন কাজ করিনি, তবে আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন। এ অবস্থায় ইউসুফ (আঃ)-এর পিতা [ইয়াকূব (আঃ)] এর উদাহরণ ব্যতীত আর কোন উপায় আমি দেখি না। আমার জন্য একমাত্র পূর্ণ ধৈর্যধারণ করাই উপযুক্ত। আপনারা আমার ব্যাপারে যা কিছু বলছেন, সে ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর সাহায্যই কামনা করা উচিত। সাল্লাল্লাহ আাসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আাসাল্লাম সাল্লাল্লাহু
এ কথা বলে আমি অপরদিকে পাশ ফিরে আমার বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম এবং সে সময় আমি জানতাম যে, আমি নির্দোষ এবং আল্লাহ আমার নির্দোষিতা প্রকাশ করে দেবেন। কিন্তু আল্লাহর শপথ! তখন এ ধারণা আমার অন্তরে কখনও আসেনি যে, আল্লাহ আমার স্বপক্ষে ওহী অবতীর্ণ করবেন এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত তিলাওয়াত হতে থাকবে। বরং আমি ধারণা করেছিলাম যে, হয়তো রাসূলুল্লাহ কোন স্বপ্ন দেখবেন, যার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা আমার নির্দোষিতা প্রমাণ করবেন। আল্লাহর শপথ! নবী তাঁর স্থান ত্যাগ করেননি এবং আর কেউ তখনও ঘর ছেড়ে বের হননি; এমন সময় রাসূলুল্লাহ এর কাছে ওহী নাযিল হলো এবং রাসূলুল্লাহ ওহী নাযিলকালীন কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হলেন, যা সর্বদা ওহী নাযিলের সময় হতো। আলাইহি আাসাল্লাম আলাইহি আাসাল্লাম
এমনকি যদিও এ সময়টা ছিল কঠিন শীতকাল, তবুও তাঁর দেহ থেকে মুক্তার মতো ঘামের ফোঁটা টপ টপ করে পড়ছিল। আর এটা ছিল আল্লাহর বাণীর কঠিন বোঝা, যা তাঁর উপর নাযিল হচ্ছিল তার ফল।
যখন রাসূলুল্লাহ এর ওহীকালীন অবস্থা শেষ হলো, তখন তাঁকে উৎফুল্লচিত্ত দেখা গেল। হাসি সহকারে সর্বপ্রথম যে কথাটি তিনি বললেন, তা ছিল এই যে, হে আয়েশা! আল্লাহ তা'আলা তোমার নির্দোষিতার ঘোষণা দিয়েছেন। তখন আমার মা আমাকে বললেন, ওঠো এবং দাঁড়িয়ে তাঁর শুকরিয়া আদায় করো। আমি বললাম, না- আমি দাঁড়িয়ে তাঁর শুকরিয়া আদায় করব না, আল্লাহ ছাড়া আর কারো প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশও করব না। আল্লাহ যা অবতীর্ণ করলেন তা হলো,
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ مَا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ - لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُّبِينٌ - لَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ - وَلَوْلَا فَضْلُ اللهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيْهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ - إِذْ تَلَقَّوْنَهُ بِأَلْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُمْ مَّا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِنْدَ اللهِ عَظِيمٌ - وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَّا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهُذَا سُبْحَانَكَ هُذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ - يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْ تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ - وَيُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ - إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ - وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
যেসকল লোক এ মিথ্যা অপবাদ রচনা করেছে, তারা তোমাদের মধ্যেই কিছু লোক। এ ঘটনাকে নিজেদের জন্য মন্দ মনে করো না, বরং এও তোমাদের জন্য কল্যাণময় হবে। যে লোক এ ব্যাপারে যতটা অংশগ্রহণ করেছে, সে ততটাই পাপ কামাই করেছে। আর যে লোক এ দায়িত্বের বড় অংশ নিজের মাথায় নিয়েছে, তার জন্যও অতি বড় আযাব রয়েছে। তোমরা যে সময় এ কথা শুনতে পেয়েছিলে, সে সময়ই মুমিন পুরুষ ও মুমিন স্ত্রীলোকেরা নিজেদের সম্পর্কে ভাল ধারণা করল না কেন? আর কেনই বা বলে দিল না যে, এ হচ্ছে সুস্পষ্টরূপে মিথ্যা দোষারোপ? সে লোকেরা চারজন সাক্ষী হাজির করল না কেন? এখন যখন তারা সাক্ষী পেশ করল না তখন আল্লাহর কাছে তারাই মিথ্যাবাদী। তোমাদের প্রতি দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর দয়া যদি না হতো, তাহলে যেসব কথাবার্তায় তোমরা জড়িত হয়ে পড়েছিলে, তার প্রতিশোধ হিসেবে বড় আযাব এসে তোমাদেরকে পাকড়াও করত। যখন তোমাদের এক মুখ থেকে অন্য মুখে এ মিথ্যাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলে, আর তোমরা নিজেদের মুখে সেসব কথাই বলে বেড়াচ্ছিলে, যে সম্পর্কে তোমাদের কিছুই জানা ছিল না, তখন তোমরা ওটাকে একটি সাধারণ ব্যাপার মনে করছিলে, অথচ আল্লাহর কাছে এটা ছিল অনেক বড় কথা। এটা শোনা মাত্রই তোমরা কেন বলে দিলে না, এমন কথা মুখে উচ্চারণ করা আমাদের শোভা পায় না। আল্লাহ মহান ও পাক-পবিত্র। এটা তো এক বিরাট মিথ্যা দোষারোপ। আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দেন, ভবিষ্যতে যেন তোমরা এরূপ কাজ আর কখনো না করো যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক। আল্লাহ তোমাদেরকে পরিষ্কার ভাষায় হেদায়াত দিচ্ছেন। আর তিনি বড় বিজ্ঞ এবং সুকৌশলী। যেসব লোক চায় যে, মুমিন লোকদের মধ্যে নির্লজ্জতা বিস্তার লাভ করুক, তারা ইহকাল ও পরকালে কঠিন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। আল্লাহ-ই জানেন, তোমরা জান না। আল্লাহর দয়া যদি তোমাদের প্রতি না থাকতো, তাহলে (যে বিষয়টি তোমাদের মাঝে ছড়ানো হয়েছিল, তা খুবই নিকৃষ্ট দেখাত) আসল কথা এই যে, আল্লাহ তা'আলা বড়ই দয়াবান ও করুণাময়। (সূরা নূর- ১১-২০)
যখন আল্লাহ তা'আলা আমার নির্দোষিতা প্রমাণের জন্য এ সকল আয়াত অবতীর্ণ করলেন তখন আবু বকর সিদ্দীক- যিনি মিসতাহ ইবনে উসামাকে আত্মীয়তার খাতিরে এবং তার দারিদ্রতার কারণে আর্থিক সাহায্য করতেন, তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! মিসতাহ আয়েশা সম্পর্কে যা বলেছে, তার কারণে তাকে ভবিষ্যতে কিছুই দেব না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করলেন,
وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوْا أَلَّا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
তোমাদের মধ্যে যারা অনুগ্রহশীল ও সামর্থবান, তারা যেন শপথ করে না বসে যে, তারা আপন আত্মীয়, গরীব ও আল্লাহর পথে মুহাজির লোকদেরকে সাহায্য করবে না। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা নূর- ২২)
আবু বকর (রাঃ) তৎক্ষণাত বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই চাই যে, আল্লাহ আমাকে মাফ করে দেন।
এ অনুযায়ী তিনি আবার মিসতাহকে দান করা শুরু করলেন, যা আগে তিনি করছিলেন এবং বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো তার এ সাহায্য বন্ধ করব না।
রাসূলুল্লাহ যায়নাব বিনতে জাহশকেও আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন যে, হে যায়নাব! তুমি কী জেনেছ এবং কী দেখেছ? সে জবাব দিল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার চোখ-কানকে (মিথ্যা বলা থেকে) বাঁচিয়ে রাখতে চাই; আমি তাঁর সম্পর্কে ভালো ছাড়া মন্দ কিছু জানি না। আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ এর স্ত্রীগণের মধ্যে যায়নাব আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে পরহেজগারীর কারণে রক্ষা করেন। কিন্তু তাঁর বোন হামনা, তাঁর পক্ষ থেকে লড়াইয়ে লিপ্ত হয় এবং সেও ধ্বংস হয়ে যায়, যেরূপ অন্যান্য অপবাদ রটনাকারীরা ধ্বংস হয়েছিল। ৭৮
টিকাঃ
৭৮ সহীহ বুখারী, হা/৪৭৫০।
📄 রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সাথে জুয়াইরিয়া (রাঃ) এর বিবাহ
বনু মুস্তালিক অভিযানে মহিলা বন্দীদের মধ্যে জুয়াইরিয়া (রাঃ)-ও ছিলেন। তিনি ছিলেন বনু মুস্তালিকের নেতা হারিসের কন্যা। বণ্টনের সময় তিনি সাবেত বিন কায়েস (রাঃ) এর অংশে পড়েন। অতঃপর তিনি তাঁকে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে মুক্ত হয়ে যাওয়ার শর্তারোপ করেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাঁর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে তাকে বিয়ে করেন। এর ফলে মুসলিমগণ বনু মুস্তালিক গোত্রের ১০০ পরিবারের লোকজনকে মুক্ত করে দেন। তারপর তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন। এতে প্রচার হয়ে যায় যে, এরা সবাই রাসূলুল্লাহ এর শশুর বংশের লোক।
📄 হুদায়বিয়ার সন্ধি
হিজরী ৬ষ্ঠ বর্ষের যিলকদ মাস। মদিনার সর্বত্রই তখন শান্তি বিরাজ করছিল। আশেপাশে প্রায় সকলেই আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছিল। ফলে অন্যান্য ছোট ছোট শত্রুদের পক্ষে রাসূলুল্লাহ এর বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হওয়ার সাহস ছিল না। তখন মুসলিমগণ যে কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষমতা রাখত। তখনও কুরাইশরা মক্কায় আধিপত্য বিরাজ করে যাচ্ছিল। এমন সময় একদিন রাসূলুল্লাহ স্বপ্নে দেখলেন যে, তিনি সাহাবীদেরকে নিয়ে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করছেন। তিনি তাদেরকে সাথে নিয়ে কাবা ঘর তাওয়াফ করছেন এবং উমরা পালন করছেন। কিছু লোক মাথা মুণ্ডন করছেন এবং কিছু লোক চুল কর্তন করাকেই যথেষ্ট মনে করছেন।
পরের দিন সকালেই স্বপ্নটি রাসূলুল্লাহ সাহাবীগণকে অবহিত করলেন। তখন তারা খুবই আনন্দিত হলেন। কেননা তারা এটা জানতেন যে, নবীদের স্বপ্নই এক প্রকার ওহী। সুতরাং এ স্বপ্ন থেকে এটা অনুমান করা যায় যে, অচিরেই মুসলিমগণ আল্লাহর রহমতে মক্কায় প্রবেশ করবেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ঠিক তখনই উমরা পালন করার জন্য মক্কায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন।
মক্কা অভিমুখে মুসলিমদের যাত্রা ও কুরাইশদের প্রতিরোধ : এ ঘোষণা দেয়া মাত্রই মদিনা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকেরা রাসূলুল্লাহ এর সাথে মক্কায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। এদিকে রাসূলুল্লাহ -ও পোশাকাদি পরিষ্কার করে প্রস্তুতি নিয়ে নিলেন। অবশেষে তিনি নিজের কাসওয়া নামক উষ্ট্রীর উপর আরোহণ করে মক্কার অভিমুখে যাত্রা শুরু করলেন। এ সময় তাঁর সাথে ছিলেন উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রাঃ) এবং ১৪০০ সাহাবী। এ সময় তাঁরা আত্মরক্ষার জন্য কেবল কোষবদ্ধ তলোয়ার সঙ্গে নিয়েছিলেন। সেই দিনটি ছিল হিজরী ৬ষ্ঠ বর্ষের যিলকদ মাসের ১ তারিখ।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ যুল হুলায়ফা নামক স্থানে গিয়ে কুরবানীর পশুকে হার পরিয়ে দিলেন। তারপর উটের উঁচু জায়গা কেটে চিহ্নিত করে দিলেন এবং সেখানে উমরার উদ্দেশ্যে ইহরাম পরিধান করলেন। তারপর তিনি কুরাইশদের নিকট এক গোয়েন্দাকে প্রেরণ করে জানতে পারলেন যে, তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ সংবাদ শুনে রাসূলুল্লাহ সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন এবং এ সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তারা কাবা ঘরের দিকে এগিয়ে যাবেন। পথিমধ্যে কেউ যদি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাহলে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে বাধ্য হবেন।
ফলে রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরকে সাথে নিয়ে কাবা ঘরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলেন। পথিমধ্যে জানতে পারলেন যে, খালিদ বিন ওয়ালীদ ২০০ অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে কুরাউল গামীম নামক স্থানে প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু এরপরও রাসূলুল্লাহ যাত্রা অব্যাহত রাখলেন এবং খালিদ বিন ওয়ালীদের বাহিনীর এত কাছাকাছি চলে আসলেন যে, উভয় দল একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিল। এক পর্যায়ে খালিদ বিন ওয়ালীদ দেখতে পেল যে, মুসলিমরা নামাযের মধ্যে রুকু-সিজদা করছে। সেটা ছিল যোহরের নামায। সুতরাং খালিদ বিন ওয়ালীদ ফন্দি আটল যে, আসরের নামাযের সময় যখন মুসলিমগণ নামাযরত অবস্থায় থাকবে তখন আক্রমণ চালাবে। কিন্তু তার সে আশা আর পূরণ হলো না; কেননা এরই মধ্যে আল্লাহ তা'আলা সালাতুল খাওফের বিধান অবর্তীণ করলেন। ফলে মুসলিমরা আসর নামায থেকেই তা বাস্তবায়ন করা শুরু করলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ কৌশল অবলম্বন করে পথ পরিবর্তন করে খালিদ বিন ওয়ালীদের সাথে সংঘর্ষ এড়িয়ে মক্কার পার্শ্ববর্তী এলাকা হুদায়বিয়া নামক স্থানের শেষ প্রান্তে শিবির স্থাপন করেন। এদিকে খালিদ বিন ওয়ালীদ মুসলিমদের উপর আক্রমণ করতে এসে জানতে পারেন যে, মুসলিমদের একটি দল সালাত আদায় করছে; আর আরেকটি দল হুদায়বিয়ার অপর প্রান্তে কা'ব ইবনে লুওয়াই (রাঃ) এর নেতৃত্বে প্রতিরোধ করার জন্য অপেক্ষা করছে। ফলে তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। ৭৯
কুরাইশদের দূত প্রেরণ : রাসূলুল্লাহ এখানে থাকা অবস্থাতেই কুরাইশরা বারবার দূত পাঠিয়ে মুসলিমদের সংবাদ নিচ্ছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ তাদেরকে বারবার একই প্রস্তাব দিচ্ছিলেন, যাতে করে কোনভাবেই সংঘর্ষ না হয় এবং নিজেদের উদ্দেশ্য সফল হয়। প্রস্তাবটি ছিল এই যে, আমরা এখানে কারো সাথে যুদ্ধ করার জন্য আসিনি। অতীতের যুদ্ধসমূহ কুরাইশদেরকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত ও তছনছ করে ফেলেছে। এতে তাদের ক্ষতিও হয়েছে অনেক। তাই যদি তারা চায়, তাহলে আমি তাদের সাথে একটি সময় নির্ধারণ করব, সে সময় তারা আমার ও বিপক্ষীয় লোকজনের পথ থেকে সরে দাঁড়াবে। এতে বড় আকারের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হবে। অন্যথায় যদি তারা যুদ্ধ করতে চায়, তাহলে তাদের ঔদ্ধত্যজনিত কৃতকার্যের শাস্তি অবশ্যই ভোগ করতে হবে। আর যুদ্ধই যদি তাদের একমাত্র কাম্য হয়ে থাকে, তবে সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! আমি আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তাদের সঙ্গে ঐ সময় পর্যন্ত যুদ্ধ করে যাব, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার শরীরে আত্মা থাকে কিংবা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তা'আলা স্বীয় দ্বীনের ব্যাপারে একটা চূড়ান্ত ফায়সালা করে না দেন।
রাসূলুল্লাহ এর প্রস্তাব শুনে কুরাইশদের অনেক নেতা-ই নমনীয় হয়ে যায় এবং কুরাইশদেরকে সন্ধিচুক্তি করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু এরপরও কিছু যুবক ঔদ্ধত্যপূর্ণ মনোভাব দেখিয়ে রাতের অন্ধকারে মুসলিমদের মধ্যে প্রবেশ করে গণ্ডগোল লাগিয়ে যুদ্ধের জন্য উসকে দিতে চেষ্টা করল। কিন্তু তারা মুসলিম শিবিরের প্রহরীদের পরিচালক মুহাম্মাদ বিন মাসলামা (রাঃ) এর হাতে বন্দী হয়ে গেল।
উসমান (রাঃ)-কে দূত হিসেবে কুরাইশদের নিকট প্রেরণ : কুরাইশদের দূত প্রেরণের এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ চিন্তা করলেন যে, মুসলিমদের পক্ষ থেকে মক্কায় একটি দূত প্রেরণ করা প্রয়োজন, যাতে সে মক্কাবাসীকে মুসলিমদের উদ্দেশ্যের কথা ভালোভাবে বুঝাতে পারে। অবশেষে রাসূলুল্লাহ উমর (রাঃ) এর পরামর্শে উসমান (রাঃ)-কে দূত হিসেবে নির্বাচন করেন। কেননা উসমান (রাঃ) এর হিজরতের পরও তখন পর্যন্ত মক্কায় তার অনেক আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব রয়ে গিয়েছিল। সুতরাং তিনি যদি তাদের সাথে কথা বলেন, তাহলে হয়তো তারা সহজেই বিষয়টি বুঝতে পারবে।
অতঃপর উসমান (রাঃ) মক্কায় প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ এর নির্দেশনা অনুযায়ী তাদেরকে বুঝাতে লাগলেন। এতে তারাও অনেকটা বিশ্বাস করতে শুরু করছিল। কিন্তু এরপরও তারা মুসলিমদের মনোভাব লক্ষ্য করা এবং 'নিজেদের সিদ্ধান্ত পাকাপোক্ত করার জন্য উসমান (রাঃ)-কে আটকে রাখল।
উসমান (রাঃ)-কে হত্যার গুজব এবং বাই'আতে রিযওয়ান : এদিকে মুসলিমদের মধ্যে এ গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, উসমান (রাঃ)-কে হত্যা করা হয়েছে। অপরদিকে উসমান (রাঃ) এর ফেরত আসতে দেরি দেখে মুসলিমগণ এ গুজবের প্রতি বিশ্বাস করতে থাকেন। ফলে অনেকেই এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মনে মনে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে গেলেন এবং যুদ্ধের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। মোটকথা মুসলিম শিবিরে এক ধরনের অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এমন সময় রাসূলুল্লাহ নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে সকল সাহাবীকে ডেকে যুদ্ধের জন্য বাই'আত গ্রহণ করলেন। অতঃপর সকলের বাই'আত শেষ হলে তিনি নিজের ডান হাতের উপর বাম হাত রেখে বললেন, এটা হচ্ছে উসমানের হাত। ফলে সকলেই উসমান (রাঃ) ফিরে না আসলে যুদ্ধ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে গেল।৮০
অবশেষে উসমান (রাঃ) প্রত্যাবর্তন করলেন। অতঃপর মুসলিমরা অনেকটাই শান্ত হয়ে গেলেন। এ অঙ্গীকারটি একটি গাছের নিচে সংঘটিত হয়েছিল। মুসলিমদের এ ধরনের মন-মানসিকতায় আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন। যার কারণে এ অঙ্গীকারের নাম রাখা হয়েছিল বাই'আতে রিযওয়ান তথা সন্তুষ্টির অঙ্গীকার। এ বাই'আত গ্রহণের কারণেই আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন,
لَقَدْ رَضِيَ اللهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ فَعَلِمَ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَنْزَلَ السَّكِينَةَ عَلَيْهِمْ وَأَثَابَهُمْ فَتْحًا قَرِيبًا
(হে রাসূল!) আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেলেন, যখন তারা গাছের নিচে তোমার কাছে বাই'আত প্রদান করেছিল। তাদের অন্তরের অবস্থা তিনি জানেন। তাই তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং পুরস্কার হিসেবে নিকটবর্তী বিজয় দান করলেন। (সূরা ফাতহ- ১৮)
সন্ধিচুক্তি প্রণয়ন : অবশেষে কুরাইশরা যখন পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করল, তখন তারা আর দেরি না করে সোহাইল বিন আমরকে সন্ধিচুক্তি করার জন্য রাসূলুল্লাহ এর কাছে প্রেরণ করল। ফলে সে রাসূলুল্লাহ এর সাথে দীর্ঘক্ষণ আলাপ-আলোচনা করে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সন্ধিচুক্তি প্রণয়ন করল। সন্ধির ধারাসমূহ এই ছিল যে, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১. রাসূলুল্লাহ এ বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই সাহাবীদেরকে নিয়ে মদিনায় ফেরত যাবেন। অতঃপর তারা আগামী বছর মক্কায় আগমন করবেন এবং সেখানে তিন দিন পর্যন্ত অবস্থান করবেন। এ সময় তারা সঙ্গে করে সফরের প্রয়োজনীয় অস্ত্র নিয়ে আসতে পারবেন। তবে তরবারি সবসময় কোষবদ্ধ রাখবেন। এতে তাদের আগমনে কোন প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হবে না।৮১
২. এ চুক্তিপত্র দশ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হবে। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ থাকবে।৮২
৩. আরবের যে কোন গোত্র ইচ্ছা করলে এ চুক্তিপত্রের যে কোন পক্ষের সাথে মিত্রতা পোষণ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে কোন গোত্রের উপর অন্যায়-অত্যাচার করা হলে সংশ্লিষ্ট দলের উপর অন্যায় করা হয়েছে বলে গণ্য হবে।৮৩
৪. কুরাইশদের কোন লোক অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া অর্থাৎ পালিয়ে মুসলিমদের দলে যোগদান করলে তাকে ফেরত পাঠাতে হবে। কিন্তু মুসলিমদের কোন লোক যদি আশ্রয় লাভ করার উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে মক্কায় গমন করে তাহলে তারা তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে না।৮৪
৫. সন্ধি চলাকালীন সময়ে মক্কার বণিকগণ নির্বিঘ্নে মদিনার পথ ধরে সিরিয়া, মিশর প্রভৃতি দেশে বাণিজ্য করতে পারবে। আলাইহি আসাল্লাম এ সন্ধিপত্রটি রাসূলুল্লাহ আলী (রাঃ)-কে লিখতে বলেছিলেন। তিনি এ মর্মে লিখতে বলেছিলেন যে, লিখো- বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। তখন সোহাইল বলল, রহমান বলতে কী বুঝায়, আমরা তা জানি না। সুতরাং আপনি লিখুন যে, বিসমিকা আল্লাহুম্মা অর্থাৎ হে আল্লাহ! তোমার নামে। তখন রাসূলুল্লাহ আলী (রাঃ)-কে সেরূপ লিখতে আদেশ করলে তিনি তাই করলেন। তারপর এ কথা লিখতে আদেশ করলেন যে, এগুলো হচ্ছে সেসব কথা, যার উপর ভিত্তি করে আল্লাহর রাসূল সন্ধি করলেন। তখন সোহাইল বলল, আমরা যদি জানতাম যে, আপনি আল্লাহর রাসূল, তাহলে আপনাকে আল্লাহর ঘর থেকে বিরত রাখার কোন কারণই আমাদের ছিল না এবং আপনার বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধও করতাম না। সুতরাং আপনি লিখুন যে, মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ এর পক্ষ থেকে। তখন রাসূলুল্লাহ আলী (রাঃ)-কে আল্লাহর রাসূল কথাটি মুছে দিতে বললেন। কিন্তু আলী (রাঃ) কিছুতেই এ ব্যাপারটি মেনে নিতে পারছিলেন না। অতঃপর রাসূলুল্লাহ আলী (রাঃ) এর মানসিক অবস্থা অনুধাবন করে নিজের হাতেই সেটা মুছে দেন। তারপর সম্পূর্ণ চুক্তিটি লিপিবদ্ধ করা হয়।
আবু জান্দাল (রাঃ) এর প্রত্যাবর্তন:
তখনও সন্ধিপত্রের কাজ শেষ হয়নি এবং কোন পক্ষই তাতে স্বাক্ষরও করেনি, এমন সময় সোহাইলের পুত্র আবু জান্দাল (রাঃ) শিকল পরিহিত অবস্থায় হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে সেখানে এসে উপস্থিত হন। উল্লেখ্য যে, আবু জান্দাল (রাঃ) ইতিপূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন; ফলে তার পিতা সোহাইল তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছিল। কিন্তু যখনই তিনি রাসূলুল্লাহ সাহাবীদের আগমনের বার্তা শুনলেন তখনই তিনি যে কোন উপায়ে হোক শিকল ভেঙ্গে তাদের কাছে ছুটে আসেন এবং মুসলিমদের দলে শামিল হয়ে যান। তখন সোহাইল বলল, এ আবু জান্দালই হচ্ছে প্রথম ব্যক্তি, যার সম্পর্কে আপনার সঙ্গে মত বিনিময় করেছি যে, আপনি তাকে ফেরত দেবেন। তখন রাসূলুল্লাহ সোহাইলকে অনেক কিছু বলে আবু জান্দালকে ফেরত দিতে বললেন, কিন্তু সে কিছুতেই তা মেনে নিল না। অতঃপর সোহাইল আবু জান্দাল (রাঃ)-কে চপেটাঘাত করে এবং তাকে জোর করে ধরে নিয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ আবু জান্দালকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, হে আবু জান্দাল! ধৈর্যধারণ করো এবং এটাকে সওয়াব লাভের উপায় হিসেবে গ্রহণ করো। আল্লাহ তা'আলা তোমার এবং তোমার মতো দুর্বল ও নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য প্রশস্ত আশ্রয়স্থল তৈরি করে রেখেছেন। আমরা কুরাইশদের সঙ্গে সন্ধি করেছি এবং আমরা পরস্পরের নিকট অঙ্গীকারাদ্ধ হয়েছি। এ কারণে আমরা অঙ্গীকার ভঙ্গ করতে পারব না। তাই আবু জান্দাল (রাঃ) পিতার সাথে মক্কাতেই থেকে গেলেন।
সাহাবীদের প্রতিক্রিয়া:
সাহাবীগণ উক্ত সন্ধিচুক্তির কিছু কিছু দফা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। কেননা সেগুলো ছিল একেবারেই মুসলিম স্বার্থ বিরোধী। ফলে সকলেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। উপরন্তু আবু জান্দাল (রাঃ)-কে মুশরিকদের হাতে ফেরত প্রদান করাটা তাদেরকে আরো ব্যথিত করে তুলেছিল। এ পর্যায়ে উমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নই এবং তারা বাতিলের উপর প্রতিষ্ঠিত নয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের নিহত ব্যক্তিরা কি জান্নাতী নয় এবং তাদের নিহত ব্যক্তিরা জাহান্নামী নয়? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন উমর (রাঃ) বললেন, তাহলে কেন আমরা দ্বীনের ব্যাপারে ছাড় দেব এবং ফিরে যাব? অথচ আল্লাহ তা'আলা এখনো আমাদের ও তাদের মধ্যে কোনরূপ ফায়সালা করেননি? তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, হে ইবনে খাত্তাব! আমি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ তা'আলা কখনো আমাকে ধ্বংস করবেন না।
উমর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর কাছ থেকে এ ধরনের কথা শুনেও আশ্বস্ত হতে পারছিলেন না। তাই তিনি এসব প্রশ্ন আবু বকর (রাঃ) এর কাছে গিয়ে বললেন। কিন্তু তিনিও রাসূলুল্লাহ এর মতো উত্তর প্রদান করলেন।৮৬ এভাবেই সাহাবীগণ এ চুক্তির প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে তারা এ সন্ধির মর্ম ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন।
কুরবানী ও মাথা মুণ্ডন : অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরকে নিজ নিজ পশু সেখানেই কুরবানী দিতে বললেন; কিন্তু সাহাবীগণ এতই ব্যথিত হয়েছিলেন যে, তারা রাসূলুল্লাহ এর কথা পর্যন্ত কর্ণপাত করতে পারছিলেন না। তারপর রাসূলুল্লাহ তিন বার পর্যন্ত নির্দেশ করেন, কিন্তু এতেও কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। অবশেষে রাসূলুল্লাহ উম্মে সালামা (রাঃ) এর সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। তখন তিনি পরামর্শ দেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি যদি চান যে, সকলে নিজ নিজ পশু কুরবানী করে মাথা মুণ্ডন করুক, তাহলে আর কাউকে কিছু না বলে নিজ পশু যবেহ করুন এবং হাজ্জাম (নাপিত)-কে ডেকে মাথা মুণ্ডন করে নিন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তা-ই করলেন। ফলে সাহাবীগণও এটা দেখে রাসূলুল্লাহ এর অনুসরণ করতে লাগলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সকলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলেন।
হিজরতকারী মহিলাদের ফেরত প্রদানে অস্বীকৃতি : এ সফর শেষ করে রাসূলুল্লাহ সাহাবীদেরকে নিয়ে মদিনায় চলে আসেন। এর কিছু দিন পর একদল মহিলা মুহাজির মদিনায় চলে আসেন। তখন তাদের অভিভাবকরা উক্ত সন্ধিপত্র অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ এর কাছে তাদেরকে ফেরত দেয়ার দাবি জানালে তিনি তাদেরকে ফেরত দিতে অস্বীকার করেন এবং এ যুক্তি প্রদান করেন যে, মহিলারা এ সন্ধিচুক্তির আওতার বাইরে। সুতরাং তাদেরকে ফেরত দিতে আমরা বাধ্য নই। ফলে তারা খালি হাতেই মক্কায় ফেরত যায়। এ সময় আল্লাহ তা'আলা সূরা মুমতাহিনা এর ১০ নং আয়াত নাযিল করে ঘোষণা করেন যে, মুসলিম মহিলাদের জন্য কাফিররা হালাল নয়। এসব আয়াত নাযিল হওয়ার পরপরই উমর (রাঃ) তার দুই জন মুশরিক স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দেন, যারা তখনও মক্কায় অবস্থান করছিল। ৮৭
স্পষ্ট বিজয় :
এ সন্ধিপত্রের শর্তসমূহ বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থ বিরোধী মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল মুসলিমদের জন্য সোনার হরিণ। কেননা এ সন্ধিপত্রের মধ্যে লুকায়িত ছিল মুসলিমদের সুস্পষ্ট বিজয়। এ সন্ধিচুক্তির মাধ্যমে কুরাইশদের চরম মূর্খতার প্রকাশ ঘটেছিল, যা একটু গভীর দৃষ্টি দিয়ে লক্ষ্য করলেই অনুধাবন করা যায়।
উক্ত সন্ধিচুক্তির প্রথম ও দ্বিতীয় দফার শর্তসমূহের কারণে রাসূলুল্লাহ ও মুসলিমগণ দীর্ঘ দিনের যুদ্ধবিগ্রহের বিষাত্মক অবস্থা থেকে কিছু প্রশান্তি লাভ করার সুযোগ পান। তাছাড়া এ কারণে মক্কার আশেপাশে নির্বিঘ্নে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করার সুযোগও লাভ হয়। কেননা এতদিন কুরাইশদের তৎপরতার কারণে সে অঞ্চলগুলোতে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয়ে উঠছিল না। সুতরাং এখন যদি মুসলিমরা দাওয়াত প্রদান করে তাহলে এতে কুরাইশরা কোনরূপ মাথা ঘামাতে পারবে না।
উক্ত সন্ধিচুক্তির তৃতীয় দফার শর্তসমূহের কারণে মুসলিমদের বিস্তার লাভ করার সুযোগ হয়। এতদিন যারা কুরাইশদের প্রভাবের কারণে ইসলামে প্রবেশ করতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিলেন অথবা যারা ইসলামকে গভীরভাবে অনুধাবন করার প্রয়াস পাচ্ছিলেন না, তারা খুব সহজেই ইসলামকে ভালোভাবে অনুধাবন করার সুযোগ লাভ করেন। সুতরাং যারা ইসলামকে অনুধাবন করে ইসলাম গ্রহণ করেন, তারা নিজ নিজ অবস্থানে থেকেই ইসলামের দাওয়াত প্রদান করতে থাকেন। ফলে ইসলাম আরো দ্রুত বিস্তার লাভ করে। অবশেষে দেখা যায় যে, সন্ধিচুক্তির পর মক্কা বিজয় পর্যন্ত এতো বেশি মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন যে, তাদের সংখ্যা ১০ হাজারে পৌঁছে গিয়েছিল।
উক্ত সন্ধিচুক্তির চতুর্থ দফাটি বাহ্যিকভাবে একেবারেই মুসলিমদের স্বার্থ বিরোধী মনে হচ্ছিল। কিন্তু এর মধ্যে নিহিত ছিল আরো বড় তাৎপর্য। কেননা এটা নিশ্চিত ছিল যে, কোন মুসলিম কখনো মক্কায় যাবে না; বরং মক্কার কোন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করলে মদিনায় চলে আসার চেষ্টা করবে। আর যদি কেউ মক্কায় যায়, তাহলে সে মূলত মুশরিক অথবা মুনাফিক ছাড়া আর কেউ নয়, যাকে ইসলামের কোনই প্রয়োজন নেই। সুতরাং সে যদি চলে যায়, তাহলে এতে কারো কিছু যায়-আসে না; বরং এতে ইসলামের আরো উপকার সাধন হবে।
অতএব সর্বদিক থেকে বিচার-বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, প্রকৃতপক্ষেই এতে মুসলিমদের কল্যাণ নিহিত ছিল। যার কারণে এ ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা নিজেই ঘোষণা দেন যে,
إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُبِينًا
(হে রাসূল!) নিশ্চয় আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি। (সূরা ফাতহ- ১) মূলত এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরই সাহাবীগণ অন্তরে সান্ত্বনা অনুভব করেছিলেন।
মক্কা থেকে পলাতক সাহাবীদের কর্মকাণ্ড : উক্ত সন্ধিচুক্তির শর্ত অনুযায়ী কোন সাহাবীই মক্কা থেকে পালিয়ে এসে মদিনায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে আশ্রয় গ্রহণ করত না। এমনকি যদি কোন সাহাবী মুশরিকদের নির্যাতনে জর্জরিত হয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে এসে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে আশ্রয় গ্রহণ করতেন, তবুও তিনি তাকে মক্কাবাসীদের হাতে তুলে দিতেন। এমনই এক সাহাবী ছিলেন আবুল বাসীর (রাঃ)। তিনি ছিলেন মক্কাবাসীদের মিত্র সাকীফ গোত্রের লোক। তিনি যখন মুশরিকদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে মদিনায় পলায়ন করে চলে আসেন, তখন কুরাইশদের পক্ষ হতে দুই ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে সন্ধির শর্তানুযায়ী তাকে ফেরত দিতে বলে। ফলে তিনি তাকে তাদের হাতে সোপর্দ করেন। অতঃপর তারা যখন তাকে নিয়ে যুল হুলাইফা নামক স্থানে অবতরণ করে, তখন তিনি কৌশলে তাদের কাছ থেকে তরবারি নিয়ে একজনকে হত্যা করে ফেলেন এবং অপর ব্যক্তি পালিয়ে মদিনায় চলে আসে। অতঃপর সে ঘটনাটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলে দেয়। এমন সময় আবুল বাসির সেখানে উপস্থিত হন। বাসীর (রাঃ) যখন বুঝতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ আবারও তাকে মক্কাবাসীদের হাতে তুলে দেবেন, তখন তিনি সেখান থেকে পলায়ন করে সমুদ্রের উপকূলে অবস্থান নেন। এদিকে আবু জান্দাল (রাঃ)-ও মক্কা থেকে পলায়ন করে আবুল বাসীর (রাঃ) এর সাথে যোগ দেন।
এরপর থেকে যিনিই মক্কা থেকে পলায়ন করতেন, তিনিই তাদের সাথে যোগ দিতেন। এতে ধীরে ধীরে সেখানে বেশ কয়েকজন একত্রিত হয়ে গেলেন। সেখান দিয়ে কুরাইশদের যে কোন বাণিজ্য কাফেলা গেলেই তারা তাদেরকে মারধর করে মালপত্রগুলো নিয়ে নিতেন। এভাবে যখন কুরাইশরা বারবার এ ধরনের আক্রমণের শিকার হতে থাকল, তখন তারা অতিষ্ঠ হয়ে নিজেরাই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে এসে “মক্কা থেকে মদিনায় পলাতক ব্যক্তিকে ফেরত দিতে হবে” মর্মে শর্তটি উঠিয়ে নেয় এবং তাদেরকে মদিনায় ফেরত নেয়ার অনুরোধ জানায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদেরকে ডেকে এনে মদিনায় আশ্রয় প্রদান করেন।
কুরাইশ ভ্রাতৃবৃন্দের ইসলাম গ্রহণ : এ সন্ধিচুক্তি সম্পাদনের পর থেকেই অনেক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। বিশেষ করে হিজরী ৭ম বর্ষের প্রথম দিকে মক্কার বিশেষ ব্যক্তিত্ব আমর বিন আস, খালিদ বিন ওয়ালীদ এবং উসমান বিন তালহা (রাঃ) ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। যখন এরা ইসলাম গ্রহণ করার জন্য মসজিদে নববীতে প্রবেশ করেন, তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, মক্কা তার কলিজার টুকরোদেরকে আমাদের নিকট সমর্পণ করে দিয়েছে।
টিকাঃ
৭৯ আবু দাউদ, হা/১২৩৬।
৮০ সহীহ মুসলিম, হা/১৮৫৬; সহীহ বুখারী, হা/৪১৫৪; মিশকাত, হা/৬২১৯।
৮১ সহীহ বুখারী, হা/২৭৩১; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৪৮৭২। আলাইহি ওরাসাল্লাম
৮২ মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৯৩০; আবু দাউদ, হা/২৭৬৬; মিশকাত, হা/৪০৪৬।
৮৩ মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৯৩০।
৮৪ সহীহ বুখারী, হা/২৭৩১-৩২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৯৩০।
৮৫ মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৯৩০।
৮৬ সহীহ বুখারী, হা/৩১৮২; সহীহ মুসলিম, হা/১৭৮৫।
৮৭ সহীহ বুখারী, হা/২৭৩৩।