📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 আহযাবের যুদ্ধ

📄 আহযাবের যুদ্ধ


'আহযাব' শব্দটি বহুবচন। এর একবচন হচ্ছে 'হিযবুন'। যার অর্থ হচ্ছে বাহিনী বা দল। যেহেতু এ যুদ্ধে বিভিন্ন গোত্রের শত্রু বাহিনী একত্রিত হয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল তাই এটা আহযাবের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এ যুদ্ধের অপর নাম হলো খন্দক বা পরিখা খননের যুদ্ধ।
আহযাবের যুদ্ধ হচ্ছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুরাইশসহ সকল শত্রু বাহিনীর সমন্বিত অভিযান। এ যুদ্ধে মুসলিমদের সকল শত্রু একত্রিত হয়েছিল এবং তারা এর মাধ্যমে মুসলিমদেরকে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল।
এদিকে যেসব ইয়াহুদিরা মদিনা থেকে বহিষ্কৃত হয়ে খায়বার ও অন্যান্য এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল, তারা ক্রমাগতভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুরাইশ, বনু গাতফানসহ অন্যান্য জাতিকে উৎসাহ ও আশ্বস্ত করতে লাগল।
সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ও মদিনার অভিমুখে যাত্রা : এ যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সর্বপ্রথম ঐক্যমত পোষণ করেছিল কুরাইশ ও বনু গাতফান গোত্র। পরবর্তীতে ইয়াহুদিদের প্রচেষ্টায় আরো বড় বড় গোত্র এতে এসে যোগ দেয়। অতঃপর নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী দক্ষিণ দিক থেকে কুরাইশ, কেনানা এবং তেহামায় বসবাসরত দ্বিতীয় হালিফ (চুক্তিবদ্ধ) গোত্রসমূহ মদিনা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যায়। এদের সংখ্যা ছিল ৪০০০ এবং এর সার্বিক দায়িত্বে ছিল আবু সুফিয়ান। এ বাহিনী মাররুয যাহরান গিয়ে পৌঁছলে বনু সোলাইম এসে তাদের সাথে যোগ দেয়। ঐ সময় পূর্বদিক থেকে গাতফানী গোত্রসমূহ ফাযারা, মুররাহ এবং আশজা রওয়ানা হয়। ফাযারার নেতৃত্বে ছিল উয়াইনা বিন হিসন, বনু মুররাহ এর নেতৃত্বে ছিল হারিস বিন আউফ এবং আশজা গোত্রের নেতৃত্বে ছিল মিসআর বিন রাখিলা। তাদের নেতৃত্বে বনু আসাদ এবং অন্যান্য গোত্রের অনেক লোকজনও এসেছিল। এসব গোত্রগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় এবং নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী মদিনার অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিল। যার কারণে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই মদিনার আশেপাশে ১০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনীর সমাবেশ ঘটে।
মুসলিমদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা : এদিকে মুসলিমরাও ছিলেন অত্যন্ত সজাগ ও সচেতন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি চারদিকের অবস্থা খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিলেন। কাজেই কাফিরদের এই বিশাল সম্মিলিত বাহিনী যখন মদিনার অভিমুখে রওয়ানা দেয়ার জন্য সচেষ্ট হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাথে সাথেই গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে যান। ফলে তিনি সাথে সাথেই নেতৃস্থানীয় সাহাবীদের সাথে একটি বৈঠকে একত্রিত হন এবং আগত যুদ্ধ সম্পর্কে পরামর্শ করেন। এমন সময় সালমান ফারসী (রাঃ) একটি অভিনব প্রস্তাব পেশ করেন, যা ইতিপূর্বে আরবের কোন যুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়নি। সুতরাং সকলেই এ ধরনের কৌশল সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ ছিল। প্রস্তাবটি এভাবে উপাস্থাপন করেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! পারস্যে যখন আমাদেরকে অবরোধ করা হতো, তখন আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী স্থান খনন করে নিতাম। সালমান ফারসী (রাঃ) এর এ প্রস্তাবটি উপস্থাপনের সাথে সাথেই রাসূলুল্লাহ তা গ্রহণ করে নেন। অতঃপর এ সভায় তিনি প্রতি ১০ জনের উপর ৪০ হাত পরিখা খনন করার দায়িত্ব অর্পণ করেন। দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথেই সাল্লাল্লাহু আলাইহি মুসলিমগণ অত্যন্ত একনিষ্ঠতার সাথে পরিখা খননের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এমনকি নবী নিজেও এ কাজে স্বশরীরে অংশগ্রহণ করেন। মদিনার উত্তর দিক ছাড়া বাকি তিন দিকই ছিল পাহাড়-পর্বত ও খেজুর বাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত। সুতরাং একমাত্র উত্তর দিক থেকেই শত্রুদের আক্রমণের সম্ভাবনা বেশি। তাই মুসলিমগণ সে দিক দিয়ে পরিখা খনন করে মদিনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেন।
তারপর রাসূলুল্লাহ সকল প্রস্তুতি পর্ব শেষ করে ৩০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন এবং সাল'আ পর্বতকে পেছনে রেখে শিবির স্থাপন করলেন। আর তাঁদের সামনেই ছিল পরিখা তথা খন্দক, যা শত্রুবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
সম্মিলিত বাহিনীর গতি রোধ: মুসলিমগণ একটানা কয়েক দিন কঠোর পরিশ্রম করে কাফির সৈন্যদল মদিনায় প্রবেশ করার পূর্বেই পরিখা খননের কাজ শেষ করেন। ফলে যখন সম্মিলিত বাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে একত্রিত হয়ে মদিনার দিকে অগ্রসর হলো, তখন তারা এসব পরিখার সম্মুখীন হয়ে হতভম্ব হয়ে যায়। কেননা এটি ভেদ করা তাদের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। এতে মুশরিকদের ক্রোধ কেবল বৃদ্ধিই পেতে থাকে এবং এটা পার হওয়ার জন্য তারা প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকে। আর মুসলিম বাহিনীও সর্বদা প্রস্তুত ছিলেন, যাতে শত্রুবাহিনী কোনভাবেই এর নিকটবর্তী না হতে পারে। এজন্য তাঁরা মাঝে মাঝে তীর নিক্ষেপ করছিলেন।
অবশেষে সম্মিলিত বাহিনী মদিনাবাসীকে কেবল অবরোধ করে রাখতেই বাধ্য হয়। কিন্তু পরক্ষণেই এ ধরনের অনির্দিষ্টকালের অবরোধের কারণে তাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। ফলে অনেকের কাছে যুদ্ধের স্পৃহা হ্রাস পেতে থাকে।
আল্লাহর সাহায্য : অবশেষে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে মুসলিমদের উপর সাহায্য অবতীর্ণ হয়। প্রথমে তিনি মুশরিকদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করে দেন এবং তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেন। তারপর তাদের উপর উত্তপ্ত বায়ুর তুফান প্রেরণ করেন। যার কারণে তাদের তাবু উপড়ে যায়, তাদের পাত্রসমূহ উল্টে যায় এবং তাদের শিবির তছনছ হয়ে যায়। উপরন্তু আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের একটি দল প্রেরণ করে তাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে দেন। ফলে তারা প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হয়।
ফলাফল : এ যুদ্ধে মুসলিমরা কোন প্রকার ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই জয় লাভ করেন। এরপর থেকে মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পায় এবং আরবে রাসূলুল্লাহ এর আধিপত্য প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন, এখন থেকে আমরা ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব, ওরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। আমরাই ওদের দিকে সৈন্য পরিচালনা করব। ৭৭ আর বাস্তবেও তাই হয়েছিল।
উল্লেখ্য যে, এ যুদ্ধটি হিজরী ৫ম বর্ষের শাওয়াল মাস থেকে যিলকদ মাস পর্যন্ত প্রায় এক মাস স্থায়ী ছিল।

টিকাঃ
৭৭ সহীহ বুখারী, হা/৪১১০; মিশকাত, হা/৫৮৭৯।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 বনু কুরাইযার যুদ্ধ

📄 বনু কুরাইযার যুদ্ধ


বনু কুরাইযা ছিল মদিনায় বসবাসরত তিনটি ইয়াহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বশেষ সম্প্রদায়। মদিনায় বসবাস করার কারণে খন্দকের যুদ্ধেও তাদেরকে কিছু দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু তারা সেসব দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করে শত্রুবাহিনীদেরকেই সহযোগিতা করে এবং মুসলিম বাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। এতে আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর খুবই অসন্তুষ্ট হন।
আক্রমণের নির্দেশ : রাসূলুল্লাহ খন্দক যুদ্ধ থেকে সবেমাত্র প্রত্যাবর্তন করে উম্মে সালামা (রাঃ) এর গৃহে গোসল করছিলেন। তখন জিবরাঈল (আঃ) এসে বললেন, আপনি কি অস্ত্রশস্ত্র খুলে রেখে দিয়েছেন? উঠুন এবং সাহাবীদেরকে নিয়ে বনু কুরাইযার অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকুন। আমি সবার আগে গিয়ে তাদের অন্তরে ভয় সৃষ্টি করে দেব।
বনু কুরাইযা আক্রমণ : জিবরাঈল (আঃ) যখন রাসূলুল্লাহ -কে এসব কথা বলছিলেন, তখন ছিল যোহরের সময়। রাসূলুল্লাহ এসব কথা শোনার পর একদল সাহাবীকে বনু কুরাইযায় গিয়ে আসরের নামায পড়ার নির্দেশ দেন এবং আসরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ উম্মে মাকতুম (রাঃ)-কে মদিনার দায়িত্ব দিয়ে বনু কুরাইযার দিকে রওয়ানা হয়ে যান। এদিকে রাসূলুল্লাহ এর যাত্রার সংবাদ পেয়ে অন্যান্য মুসলিমগণ যোগ দিতে থাকেন। অতঃপর তাঁরা যখন বনু কুরাইযার মহল্লায় প্রবেশ করলেন তখন বনু কুরাইযার লোকেরা নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য তাদের দুর্গে প্রবেশ করে।
বনু কুরাইযার আত্মসমর্পণ : বনু কুরাইযার লোকেরা যখন দেখল যে, তারা চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে গেছে এবং প্রায় ২৫ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে, তখন আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোন পথ খুঁজে পেল না। এদিকে যখন আলী (রাঃ) তাদের দুর্গের দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ঘোষণা করেন, তখন তারা দিশেহারা হয়ে নিজেদের অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে এবং রাসূলুল্লাহ এর সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার প্রতিজ্ঞা করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাদের পুরুষদেরকে বন্দী করে ফেলেন এবং মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধদেরকে পৃথকভাবে রাখেন।
সা'দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) এর ফায়সালা: বনু কুরাইযার এহেন পরিণতির কথা চিন্তা করে আনসারদের মধ্য থেকে আউস গোত্রের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ -কে তাদের সাথে ইনসাফ করার জন্য আবেদন জানিয়েছিল। ফলে রাসূলুল্লাহ সা'দ ইবনে মুয়ায (রাঃ)-কে তাদের বিচারক মানার জন্য প্রস্তাব দেন। তখন তারা সবাই এতে রাজি হয়ে গেল। এতে তারা মনে করেছিল যে, হয়তোবা তাদের উপর শাস্তি কিছুটা হালকা করা হবে।
সে সময় সা'দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) খন্দক যুদ্ধে সামান্য আহত হওয়ার কারণে মদিনায় অবস্থান করছিলেন। রাসূলুল্লাহ এর এ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর তাকে ডেকে পাঠানো হয়। তারপর তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে এ নির্দেশ দেন যে, পুরুষদের হত্যা করা হোক, মহিলা ও শিশুদেরকে বন্দী করা হোক এবং তাদের সম্পদসমূহ বণ্টন করে দেয়া হোক।
এ রায় শোনার পরপরই রাসূলুল্লাহ বললেন, তুমি তাদের ব্যাপারে ঠিক সেই বিচারই করেছ, যেমনটি আল্লাহ তা'আলা সাত আসমানের উপর থেকে করে দিয়েছেন। অতঃপর বনু কুরাইযার উপর এ রায়টি বাস্তবায়ন করা হয়।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 বনু মুস্তালিক অভিযান

📄 বনু মুস্তালিক অভিযান


এ অভিযানটি পরিচালিত হয় হিজরী ৫ম অথবা ৬ষ্ঠ বর্ষের শা'বান মাসে। একদা রাসূলুল্লাহ জানতে পারলেন যে, বনু মুস্তালিকের সরদার হারিস বিন আবু জাররা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য লোকজনকে একত্রিত করছে। তখন রাসূলুল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে একটি বাহিনী নিয়ে সেখানে গমন করেন। এ অভিযানে মুনাফিকদের একটি দলও অংশগ্রহণ করেছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বাহিনী নিয়ে তাদের উপর অতর্কিত হামলা করেন। ফলে তারা পালিয়ে যায়। তারপর রাসূলুল্লাহ তাদের মহিলা ও শিশুদেরকে বন্দী করেন এবং তাদের ধনসম্পদসমূহ গনীমত হিসেবে নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেন।

📘 মুহাম্মদ সা সম্পর্কে ভুল ধারনা ও তার জীবনী > 📄 ইফকের ঘটনা

📄 ইফকের ঘটনা


এ ঘটনাটি ঘটেছিল বনু মুস্তালিক যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে। এটি ছিল রাসূলুল্লাহ এর স্ত্রী আয়েশা (রাঃ) এর বিরুদ্ধে অপবাদ রটানোর ঘটনা, যার মূল হোতা ছিল মুনাফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই। ঘটনাটি হাদীসে এভাবে বর্ণিত হয়েছে যে,
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর নিয়ম ছিল, যখন তিনি সফরে বের হতেন, তখন লটারীর সাহায্যে মীমাংসা করতেন, তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে কে তাঁর সঙ্গী হবেন। এ যুদ্ধে লটারী করার সময় আমার নাম উঠে। ফলে আমি রাসূলুল্লাহ এর সঙ্গে বের হলাম, এটা ছিল পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরবর্তীকালের ঘটনা।
নিয়ম ছিল এমন যে, চলার সময় আমি আমার নিজের 'হাওদাজে' (পালকীর মতো) বসে যেতাম। যুদ্ধ শেষে ফেরার পথে আমরা মদিনার নিকট পৌঁছলাম এবং কিছু সময় সেখানে অবস্থান করলাম। অতঃপর রাতেই সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ নির্দেশ দিলেন। যখন বাহিনীকে বাড়ি ফেরার নির্দেশ দেয়া হলো, তখন আমি ঘুম থেকে উঠে প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণার্থে সৈন্যদের (ছাউনি) ছেড়ে বাইরে গেলাম। আমি প্রাতঃক্রিয়া সম্পন্ন করে আমার 'হাওদাজে' ফিরে এলাম। কিন্তু আমি দেখলাম আমার 'জাজ আজফা' এর তৈরি গলার হার ছিঁড়ে কোথাও পড়ে গিয়েছে। আমি তা সন্ধান করতে যাওয়ায় পেছনে পরে গেলাম। নিয়ম ছিল এমন যে, চলে যাওয়ার সময় আমি আমার নিজের হাওদাজে বসে যেতাম এবং লোকেরা তা উঠিয়ে উটের পিঠে বসিয়ে দিত। তারা এসে আমার 'হাওদাজ' উঠিয়ে উটের পিঠে বসিয়ে দিল, তারা ধারণা করল যে, আমি তাতে বসা আছি। এ সময় খাদ্যের অভাবের জন্য আমরা মহিলারা ছিলাম বড়ই হালকা এবং কম ওজন বিশিষ্ট। তখন এমনিতেই আমি ছিলাম অল্পবয়স্কা এক বালিকা এবং হালকা। সুতরাং লোকেরা 'হাওদাজ' উঠাবার সময় আমি আছি কি না তা বুঝতেও পারেনি। তারা অজ্ঞাতস্থানে উট হাঁকিয়ে চলে গেল। পরে আমি হার নিয়ে যখন ফিরে এলাম, সেখানে কাউকে পেলাম না। আমি চিন্তা করলাম, যখন কিছু দূর গিয়ে আমাকে পাবে না, তখন তারা আমাকে সন্ধান করতে ফিরে আসবে। অতঃপর আমি নিজ জায়গায় বসে পড়লাম, আমাকে নিদ্রায় পেয়ে বসল এবং আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
এদিকে সাফওয়ান ইবনে মু'আত্তাল আস-সুলাইমী আয-যাকওয়ানী সেনাবাহিনীর পশ্চাতে রয়ে গিয়েছিল। সে রাতের শেষভাগে রওয়ানা দিয়ে সকালবেলা আমার স্থানে এসে পৌঁছল এবং একজন ঘুমন্ত লোককে দেখতে পেল। সে আমার নিকট আসলো এবং আমাকে দেখে চিনতে পারল, কারণ পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার আগে সে আমাকে দেখেছিল। তার “ইন্না- লিল্লা-হি ওয়া ইন্না- ইলাইহি রা-জি'ঊন” উচ্চারণ শুনে আমি ঘুম থেকে জেগে উঠলাম, যা সে আমাকে চিনতে পেরে (বিস্ময়ের) সাথে বলেছিল। তখন আমি আমার চাদর দিয়ে চেহারা ঢেকে ফেললাম। সে “ইন্না- লিল্লা-হি ওয়া ইন্না- ইলাইহি রাজি'ঊন” ছাড়া একটি শব্দও উচ্চারণ করল না; এমনকি তার উষ্ট্রী এনে আমার নিকট হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দিল ও সম্মুখের দু'পা নুইয়ে দিল এবং আমি তাতে আরোহণ করলাম। তখন সাফওয়ান আমাকে নিয়ে রওয়ানা হলো এবং সে উটের লাগাম ধরে হেঁটে চলল। উট আমাকে বহন করে নিয়ে চলছিল, যতক্ষণ না আমরা সৈন্যদের নিকট গিয়ে পৌঁছলাম, যে সময় তারা দুপুরের প্রচণ্ড গরমের কারণে বিশ্রাম নিচ্ছিল।
আর যারা এ ধরনের অপবাদমূলক ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হতে প্রস্তুত তারা তাতেই লিপ্ত হলো। এ ব্যাপারে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছিল, তন্মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূলই ছিল অগ্রসর। সে ছিল, এ ঘটনার মূল হোতা। এরপর আমরা মদিনায় পৌঁছলাম এবং আমি দীর্ঘ এক মাসের জন্য অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলাম। এ সময় ইফকে অংশগ্রহণকারীরা মিথ্যা অপবাদের সংবাদ জনগণের কাছে রটিয়ে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু আমি এ সবের কিছুই জানতে পারিনি। একটা জিনিস অবশ্য আমার মনে লাগছিল, তা হচ্ছে এই যে, আমার অসুস্থ অবস্থায় সাধারণতঃ রাসূলুল্লাহ যেরকম স্নেহ-ভালোবাসা দেখাতেন, এবারে তিনি আমার প্রতি তেমন মমতা দেখাচ্ছেন না। রাসূলুল্লাহ আমার নিকট আসতেন, সালাম করতেন, অতঃপর জিজ্ঞেস করতেন, “সে এখন কেমন আছে?” এরপরে চলে যেতেন। এতে আমার মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল, কোন কিছু ঘটেছে হয়তো। কিন্তু আমি সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত এ সমস্ত মিথ্যা অপবাদ রটানোর ব্যাপারে কিছুই জানতে পারিনি।
একদা উম্মে মিসতাহ এর সাথে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার জন্য "আল-মানাসি” নামক স্থানে গেলাম। সে সময় পর্যন্ত আমাদের সব ঘরে টয়লেট তৈরি হয়নি। সুতরাং আমি উম্মে মিসতাহ এর সঙ্গে বাইরে গেলাম। সে ছিল আবি রুহম বিন আবদে মানাফের কন্যা। আর তার মা ছিল সাখর বিন আমিরের কন্যা এবং এ ব্যক্তি ছিল আবু বকর (রাঃ) এর খালু। আর তার পুত্র ছিল মিসতাহ ইবনে উসামা। যখন আমরা আমাদের কাজ শেষ করলাম, উম্মে মিসতাহ এবং আমি আমাদের ঘরের নিকট ফিরে এলাম। পথিমধ্যে উম্মে মিসতাহ আঘাত পেলো এবং সহসা তার মুখ হতে বের হলো, মিসতাহ ধ্বংস হোক! তখন আমি তাকে বললাম, তুমি খুব খারাপ কথা উচ্চারণ করলে! তুমি এমন একটি লোককে গালি দিচ্ছ, যে বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছে! সে বলল, হায় কী অচেতন! তুমি কোথায়? তুমি শোননি সে কী বলেছে? আমি বললাম, সে কী বলেছে? তখন সে (উম্মে মিসতাহ) ইফকের ঘটনা রটনাকারীরা যা বলে বেড়াচ্ছে তা খুলে বলল- যা আমার অসুস্থতাকে আরো বৃদ্ধি করল। যখন আমি ঘরে ফিরে এলাম, তখন রাসূলুল্লাহ আমার নিকট আসলেন এবং সালাম করার পর প্রশ্ন করলেন, সে কেমন আছে? আমি বললাম, আপনি কি আমাকে আমার পিতামাতার কাছে যেতে অনুমতি দেবেন? তখন আমি তাদের কাছ থেকে এ সংবাদ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম। রাসূলুল্লাহ আমাকে অনুমতি দিলেন এবং আমি পিতামাতার কাছে চলে গেলাম। অতঃপর বাড়িতে গিয়ে মাকে প্রশ্ন করলাম, আম্মা! লোকেরা এগুলো কী বলাবলি করছে? আমার আম্মা বললেন, কন্যা! এটাকে হালকাভাবে গ্রহণ করো। আল্লাহর কসম! এমন কোন সুন্দরী নারী নেই, যাকে তার স্বামী ভালবাসে না এবং যার অন্য স্ত্রীরা তার খুঁত বের করার চেষ্টা করে না; (এর বিপরীত) ঘটনা খুব কমই (ঘটে)। আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! সত্যই কি লোকেরা এ ব্যাপারে বলাবলি করছে? আমি সেই রাত থেকে সকাল পর্যন্ত কান্নাকাটি করে কাটিয়ে দিলাম। না কখনও আমি কান্না থামাতে পেরেছি, না ঘুমাতে পেরেছি। এমনকি ভোরের সূর্য উদয় হয়েছে এবং তখনও আমি কাঁদছি।
রাসূলুল্লাহ তাঁর স্ত্রীকে তালাক দেয়ার ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য আলী ইবনে আবু তালিব এবং উসামা ইবনে যায়েদকে ডাকলেন। উসামা ইবনে যায়েদ রাসূলুল্লাহ-কে তাঁর স্ত্রীর পবিত্রতা হওয়া সম্পর্কে যা জানেন তাই বললেন এবং তার উপর তাঁর যে ভালোবাসা রয়েছে, তাও উল্লেখ করলেন। উসামা ইবনে যায়েদ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সে আপনার স্ত্রী এবং তার মধ্যে আমি ভাল ব্যতীত কখনও মন্দ কোন কিছু দেখতে পাইনি। কিন্তু আলী ইবনে আবু তালিব বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনার প্রতি কোন পথ সংকীর্ণ করেননি এবং আমাদের সমাজে তিনি ব্যতীত অসংখ্য মহিলা রয়েছে। আর আসল অবস্থা জানতে চাইলে (তার) দাসীকে ডেকে জিজ্ঞেস করুন, সে আপনাকে সত্য কথা বলবে। আয়েশা (রাঃ) আরো বলেছেন, অতঃপর রাসূলুল্লাহ বারীরাকে ডাকলেন এবং বললেন, হে বারীরা! তুমি কি কখনও এমন কিছু দেখেছ, যা তোমার মাঝে সন্দেহের সৃষ্টি করতে পারে? বারীরা বলল, আল্লাহর শপথ! যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ (নবী হিসেবে) পাঠিয়েছেন, আমি তার মধ্যে মন্দ কিছু দেখিনি যে, তার ব্যাপারে আপনাকে আপত্তি করা যেতে পারে। তবে দোষ শুধু এতটুকুই দেখেছি যে, সে একটি অল্পবয়স্কা বালিকা মাত্র; সে কখনও কখনও পরিবারের আটার খামির রেখে ঘুমিয়ে পড়ত আর ছাগল এসে তা ভক্ষণ করত।
অতঃপর নবী উঠলেন এবং লোকদের সামনে ভাষণ দিলেন এবং বললেন, কে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালূলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে পারবে? রাসূলুল্লাহ মিম্বরে বসে থাকাবস্থায় আরো বললেন, হে মুসলিমগণ! তোমাদের মধ্যে কে এমন আছ? যে আমার স্ত্রীর ওপর মিথ্যা অপবাদ রটিয়ে আমাকে কষ্ট দিয়েছে; তার আক্রমণ থেকে আমাকে বাঁচাতে সাহায্য করতে পারবে? আল্লাহর শপথ! আমি আমার স্ত্রীদের মধ্যে ভাল ব্যতীত কিছুই দেখতে পাইনি এবং লোকেরা এমন একটি লোককে (সাফওয়ান ইবনে মু'আত্তালকে) দোষী করেছে, যার সম্পর্কে আমি ভাল ব্যতীত কিছুই জানি না এবং সে কখনও আমার অনুপস্থিতিতে আমার ঘরে আসেনি।
এ কথা শুনে সা'দ ইবনে মুয়ায আল-আনসারী দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর শপথ! অপবাদ দানকারী যদি আওস সম্প্রদায়ের লোক হয় তবে তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে এ কষ্ট থেকে আপনাকে নিষ্কৃতি দেব। আর সে যদি আমাদের ভাই খাযরাজ কবীলার লোক হয়, তবে আপনি যা বলবেন তাই করব। এ কথা শুনে সা'দ ইবনে উবাদা দাঁড়িয়ে গেলেন, যিনি ছিলেন খাযরাজ সম্প্রদায়ের প্রধান। তিনি সৎ ব্যক্তি ছিলেন, কিন্তু এ সময় তিনি স্বীয় সম্প্রদায়ের স্বার্থে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি সা'দ ইবনে মুয়ায (রাঃ)-কে বললেন, আল্লাহর শপথ! তুমি মিথ্যা কথা বলেছ, তুমি তাকে হত্যা করবে না এবং তুমি কখনও তাকে হত্যা করতে পারবে না। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে সা'দ ইবনে মুয়ায এর চাচাতো ভাই উসাইদ ইবনে হুযাইর দাঁড়াল এবং সা'দ ইবনে উবাদাকে বলল, তুমি একজন মিথ্যাবাদী! চিরন্তন আল্লাহর শপথ! আমরা নিশ্চয় তাকে হত্যা করব। তুমি মুনাফিক এবং মুনাফিকের পক্ষে কথা বলছ। সুতরাং আওস ও খাযরাজ সম্প্রদায়ের লোকেরা উত্তেজিত হয়ে উঠল, এমনকি তারা পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হওয়ার উপক্রম হলো। অথচ আল্লাহর নবী আলাইহি স্বরাসাল্লাম তখনও মিম্বরের উপর দাঁড়ানো ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাদেরকে শান্ত ওয়াসাল্লাম করার চেষ্টা করলে তারা শান্ত হলো ও চুপ করল।
আয়েশা (রাঃ) বলেন, সেদিন আমি দিনভর কাঁদতেই থাকলাম, না আমার চোখের কান্না থামল আর না আমি ঘুমাতে পারলাম। সকালে আমার পিতামাতা আমার কাছে ছিলেন এবং আমি দু'রাত ও দু'দিন একাধারে কোন ঘুম-নিদ্রা ছাড়াই কেঁদেছিলাম। ফলে তারা ভাবলেন যে, অধিক কান্নার ফলে আমার কলিজা ফেটে যাবে। যখন তারা আমার সঙ্গে ছিলেন এবং আমি কাঁদছিলাম, তখন জনৈক আনসারী মহিলা আমার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি চাইল। আমি তাকে আসার অনুমতি দিলাম এবং সে বসেই আমার সাথে কান্না জুড়ে দিল। যখন আমি এ অবস্থায় ছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ আমাদের নিকট আসলেন এবং সালাম করে আসন গ্রহণ করলেন।
এ সমস্ত অপবাদ যখন রটাচ্ছিল তখন হতে তিনি কখনও আমার নিকট বসেননি। এ দীর্ঘ এক মাস তিনি অপেক্ষা করেছেন অথচ আমার ব্যাপারে কোন ওহী অবতীর্ণ হয়নি। রাসূলুল্লাহ আমার কাছে বসার পর তাশাহহুদ (কালিমায়ে শাহাদাত) পাঠ করলেন তারপর বললেন, আয়েশা! তোমার সম্পর্কে এরূপ এরূপ কথা আমার নিকট পৌঁছেছে, তুমি যদি নিষ্পাপ হয়ে থাক, তাহলে আশা করি আল্লাহ তোমার নির্দোষিতা প্রকাশ ও প্রমাণ করে দেবেন। আর তুমি যদি বাস্তবিকই কোন পাপে লিপ্ত হয়ে থাক, তাহলে আল্লাহর কাছে মাফ চাও, তওবা করো। কেননা বান্দা যখন নিজের গুনাহ স্বীকার করে তওবা করে, তখন আল্লাহ তাকে মাফ করে দেন। যখন রাসূলুল্লাহ তাঁর ভাষণ শেষ করলেন, তখন আমার চোখের পানি এমনভাবে শুকিয়ে গেল যেন একফোঁটা পানিও অনুভব করছিলাম না।
আমি আমার আব্বা [আবু বকর (রাঃ)]-কে বললাম, আপনি আমার পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ এর কথার উত্তর দিন, যা কিছু তিনি বলেছেন। তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি বুঝি না, রাসূল-কে কী উত্তর দেব। তখন আমি বয়সে বালিকা মাত্র এবং আমার কুরআনের জ্ঞানও ছিল অল্প, তবুও আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! আমি জানি আপনারা যখনই এ ঘটনা শুনেছেন, তখনই তা আপনাদের অন্তরে গেঁথে গিয়েছে এবং বিশ্বাস করে বসেছেন। সুতরাং এখন আমি যদি বলি আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং আল্লাহ জানেন যে, আমি নির্দোষ, তবে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন না। আর আমি যদি শুধু শুধুই এমন একটা কথা মেনে নেই, যা আমি আদৌ করিনি এবং আল্লাহ জ্ঞাত আছেন যে, আমি দোষের কোন কাজ করিনি, তবে আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন। এ অবস্থায় ইউসুফ (আঃ)-এর পিতা [ইয়াকূব (আঃ)] এর উদাহরণ ব্যতীত আর কোন উপায় আমি দেখি না। আমার জন্য একমাত্র পূর্ণ ধৈর্যধারণ করাই উপযুক্ত। আপনারা আমার ব্যাপারে যা কিছু বলছেন, সে ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর সাহায্যই কামনা করা উচিত। সাল্লাল্লাহ আাসাল্লাম সাল্লাল্লাহু আাসাল্লাম সাল্লাল্লাহু
এ কথা বলে আমি অপরদিকে পাশ ফিরে আমার বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম এবং সে সময় আমি জানতাম যে, আমি নির্দোষ এবং আল্লাহ আমার নির্দোষিতা প্রকাশ করে দেবেন। কিন্তু আল্লাহর শপথ! তখন এ ধারণা আমার অন্তরে কখনও আসেনি যে, আল্লাহ আমার স্বপক্ষে ওহী অবতীর্ণ করবেন এবং তা কিয়ামত পর্যন্ত তিলাওয়াত হতে থাকবে। বরং আমি ধারণা করেছিলাম যে, হয়তো রাসূলুল্লাহ কোন স্বপ্ন দেখবেন, যার মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলা আমার নির্দোষিতা প্রমাণ করবেন। আল্লাহর শপথ! নবী তাঁর স্থান ত্যাগ করেননি এবং আর কেউ তখনও ঘর ছেড়ে বের হননি; এমন সময় রাসূলুল্লাহ এর কাছে ওহী নাযিল হলো এবং রাসূলুল্লাহ ওহী নাযিলকালীন কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হলেন, যা সর্বদা ওহী নাযিলের সময় হতো। আলাইহি আাসাল্লাম আলাইহি আাসাল্লাম
এমনকি যদিও এ সময়টা ছিল কঠিন শীতকাল, তবুও তাঁর দেহ থেকে মুক্তার মতো ঘামের ফোঁটা টপ টপ করে পড়ছিল। আর এটা ছিল আল্লাহর বাণীর কঠিন বোঝা, যা তাঁর উপর নাযিল হচ্ছিল তার ফল।
যখন রাসূলুল্লাহ এর ওহীকালীন অবস্থা শেষ হলো, তখন তাঁকে উৎফুল্লচিত্ত দেখা গেল। হাসি সহকারে সর্বপ্রথম যে কথাটি তিনি বললেন, তা ছিল এই যে, হে আয়েশা! আল্লাহ তা'আলা তোমার নির্দোষিতার ঘোষণা দিয়েছেন। তখন আমার মা আমাকে বললেন, ওঠো এবং দাঁড়িয়ে তাঁর শুকরিয়া আদায় করো। আমি বললাম, না- আমি দাঁড়িয়ে তাঁর শুকরিয়া আদায় করব না, আল্লাহ ছাড়া আর কারো প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশও করব না। আল্লাহ যা অবতীর্ণ করলেন তা হলো,
إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَّكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ مَا اكْتَسَبَ مِنَ الْإِثْمِ وَالَّذِي تَوَلَّى كِبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ - لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا وَقَالُوا هَذَا إِفْكٌ مُّبِينٌ - لَوْلَا جَاءُوا عَلَيْهِ بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَإِذْ لَمْ يَأْتُوا بِالشُّهَدَاءِ فَأُولَئِكَ عِنْدَ اللَّهِ هُمُ الْكَاذِبُونَ - وَلَوْلَا فَضْلُ اللهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ لَمَسَّكُمْ فِي مَا أَفَضْتُمْ فِيْهِ عَذَابٌ عَظِيمٌ - إِذْ تَلَقَّوْنَهُ بِأَلْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُمْ مَّا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيِّنًا وَهُوَ عِنْدَ اللهِ عَظِيمٌ - وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَّا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهُذَا سُبْحَانَكَ هُذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ - يَعِظُكُمُ اللَّهُ أَنْ تَعُودُوا لِمِثْلِهِ أَبَدًا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ - وَيُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ - إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ - وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ وَأَنَّ اللَّهَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
যেসকল লোক এ মিথ্যা অপবাদ রচনা করেছে, তারা তোমাদের মধ্যেই কিছু লোক। এ ঘটনাকে নিজেদের জন্য মন্দ মনে করো না, বরং এও তোমাদের জন্য কল্যাণময় হবে। যে লোক এ ব্যাপারে যতটা অংশগ্রহণ করেছে, সে ততটাই পাপ কামাই করেছে। আর যে লোক এ দায়িত্বের বড় অংশ নিজের মাথায় নিয়েছে, তার জন্যও অতি বড় আযাব রয়েছে। তোমরা যে সময় এ কথা শুনতে পেয়েছিলে, সে সময়ই মুমিন পুরুষ ও মুমিন স্ত্রীলোকেরা নিজেদের সম্পর্কে ভাল ধারণা করল না কেন? আর কেনই বা বলে দিল না যে, এ হচ্ছে সুস্পষ্টরূপে মিথ্যা দোষারোপ? সে লোকেরা চারজন সাক্ষী হাজির করল না কেন? এখন যখন তারা সাক্ষী পেশ করল না তখন আল্লাহর কাছে তারাই মিথ্যাবাদী। তোমাদের প্রতি দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহর দয়া যদি না হতো, তাহলে যেসব কথাবার্তায় তোমরা জড়িত হয়ে পড়েছিলে, তার প্রতিশোধ হিসেবে বড় আযাব এসে তোমাদেরকে পাকড়াও করত। যখন তোমাদের এক মুখ থেকে অন্য মুখে এ মিথ্যাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলে, আর তোমরা নিজেদের মুখে সেসব কথাই বলে বেড়াচ্ছিলে, যে সম্পর্কে তোমাদের কিছুই জানা ছিল না, তখন তোমরা ওটাকে একটি সাধারণ ব্যাপার মনে করছিলে, অথচ আল্লাহর কাছে এটা ছিল অনেক বড় কথা। এটা শোনা মাত্রই তোমরা কেন বলে দিলে না, এমন কথা মুখে উচ্চারণ করা আমাদের শোভা পায় না। আল্লাহ মহান ও পাক-পবিত্র। এটা তো এক বিরাট মিথ্যা দোষারোপ। আল্লাহ তোমাদেরকে উপদেশ দেন, ভবিষ্যতে যেন তোমরা এরূপ কাজ আর কখনো না করো যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক। আল্লাহ তোমাদেরকে পরিষ্কার ভাষায় হেদায়াত দিচ্ছেন। আর তিনি বড় বিজ্ঞ এবং সুকৌশলী। যেসব লোক চায় যে, মুমিন লোকদের মধ্যে নির্লজ্জতা বিস্তার লাভ করুক, তারা ইহকাল ও পরকালে কঠিন শাস্তি পাওয়ার যোগ্য। আল্লাহ-ই জানেন, তোমরা জান না। আল্লাহর দয়া যদি তোমাদের প্রতি না থাকতো, তাহলে (যে বিষয়টি তোমাদের মাঝে ছড়ানো হয়েছিল, তা খুবই নিকৃষ্ট দেখাত) আসল কথা এই যে, আল্লাহ তা'আলা বড়ই দয়াবান ও করুণাময়। (সূরা নূর- ১১-২০)
যখন আল্লাহ তা'আলা আমার নির্দোষিতা প্রমাণের জন্য এ সকল আয়াত অবতীর্ণ করলেন তখন আবু বকর সিদ্দীক- যিনি মিসতাহ ইবনে উসামাকে আত্মীয়তার খাতিরে এবং তার দারিদ্রতার কারণে আর্থিক সাহায্য করতেন, তিনি বললেন, আল্লাহর শপথ! মিসতাহ আয়েশা সম্পর্কে যা বলেছে, তার কারণে তাকে ভবিষ্যতে কিছুই দেব না। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করলেন,
وَلَا يَأْتَلِ أُولُو الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أُولِي الْقُرْبَى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ اللهِ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوْا أَلَّا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
তোমাদের মধ্যে যারা অনুগ্রহশীল ও সামর্থবান, তারা যেন শপথ করে না বসে যে, তারা আপন আত্মীয়, গরীব ও আল্লাহর পথে মুহাজির লোকদেরকে সাহায্য করবে না। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু। (সূরা নূর- ২২)
আবু বকর (রাঃ) তৎক্ষণাত বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই চাই যে, আল্লাহ আমাকে মাফ করে দেন।
এ অনুযায়ী তিনি আবার মিসতাহকে দান করা শুরু করলেন, যা আগে তিনি করছিলেন এবং বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনো তার এ সাহায্য বন্ধ করব না।
রাসূলুল্লাহ যায়নাব বিনতে জাহশকেও আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন যে, হে যায়নাব! তুমি কী জেনেছ এবং কী দেখেছ? সে জবাব দিল, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আমার চোখ-কানকে (মিথ্যা বলা থেকে) বাঁচিয়ে রাখতে চাই; আমি তাঁর সম্পর্কে ভালো ছাড়া মন্দ কিছু জানি না। আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ এর স্ত্রীগণের মধ্যে যায়নাব আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে পরহেজগারীর কারণে রক্ষা করেন। কিন্তু তাঁর বোন হামনা, তাঁর পক্ষ থেকে লড়াইয়ে লিপ্ত হয় এবং সেও ধ্বংস হয়ে যায়, যেরূপ অন্যান্য অপবাদ রটনাকারীরা ধ্বংস হয়েছিল। ৭৮

টিকাঃ
৭৮ সহীহ বুখারী, হা/৪৭৫০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00