📄 উহুদ যুদ্ধের পরবর্তী অভিযান
উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের এমন অপ্রত্যাশিত দুরবস্থা তাদের শক্তি-সামর্থ ও প্রভাব বিস্তারের উপর দারুণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বদর যুদ্ধের পর এতদিন পর্যন্ত যারা মুসলিমদের ক্ষতি সাধন করতে কোন সাহস পাচ্ছিল না, এ যুদ্ধের পর তাদের অন্তরে সাহস সৃষ্টি হয়। ফলে তারা মুসলিমদের ক্ষতি করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকত। নিম্নে এমনই কিছু প্রতিক্রিয়া এবং এর বিরুদ্ধে মুসলিমদের অভিযানসমূহ উল্লেখ করা হলো :
১. আবু সালামার অভিযান :
উহুদ যুদ্ধের পর অনেক শত্রুই মুসলিমদের বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। সর্বপ্রথম তাদের বিরুদ্ধাচরণ করে বনু আসাদ বিন খোযায়মা গোত্রের লোকেরা। তাদের মধ্যে তালহা ও সালামা নামক দুই ব্যক্তি তাদের দলবল নিয়ে বনু আসাদ বিন খোযায়মা গোত্রের লোকদেরকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য একত্রিত করতে থাকে। এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ এর কাছে পৌঁছলে তিনি সাথে সাথেই আবু সালামা (রাঃ) এর নেতৃত্বে ১৫০ জন সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। ফলে মুসলিমরা তাদেরকে দ্রুত অতর্কিত আক্রমণ করলে তারা পালিয়ে যায়। তারপর তাদের ফেলে যাওয়া গনীমত নিয়ে মুসলিমগণ মদিনায় ফিরে আসেন। এ অভিযানটি সংঘটিত হয়েছিল হিজরী ৪র্থ বর্ষের মুহাররম মাসে। এর কিছু দিন পরেই আবু সালামা (রাঃ) মৃত্যুবরণ করেন।
২. রাজীর ঘটনা :
এ ঘটনাটি ঘটেছিল হিজরী ৪র্থ বর্ষের সফর মাসে। ঘটনাটি ছিল মুসলিমদের জন্য খুবই বেদনাদায়ক। কেননা এ সময় কিছু মুসলিমকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে হত্যা করা হয়েছিল। এতে রাসূলুল্লাহ খুবই কষ্ট পেয়েছিলেন। ঘটনাটি সহীহ বুখারীতে এভাবে বর্ণিত হয়েছে,
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ আসিম ইবনে সাবিত আনসারী (রাঃ) এর নেতৃত্বে দশজন ব্যক্তির একটি গোয়েন্দাদলকে সংবাদ সংগ্রহের জন্য পাঠালেন। তারা রওয়ানা হয়ে মক্কা এবং উসফানের মাঝামাঝি 'হাদাত' নামক স্থানে পৌঁছলে বনু লিহইয়ান নামক হুযাইল সম্প্রদায়ের একটি শাখা তা জানতে পারে এবং প্রায় দু'শত সুদক্ষ তীরন্দাজের একটি দল তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে পাঠায়। তারা পদচিহ্ন ধরে চলতে থাকে। মদিনা থেকে পথের সম্বল হিসেবে সাহাবীগণ যে খেজুর নিয়ে এসেছিলেন তার উচ্ছিষ্ট দেখতে পেয়ে তারা বলে উঠল, এতো ইয়াসরিবেরই খেজুর দেখছি! অতঃপর তারা উক্ত পদচিহ্ন ধরেই অগ্রসর হতে থাকে।
অতঃপর আসিম এবং তাঁর সাথিগণ তাদেরকে দেখে একটি পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করেন। এমতাবস্থায় বনু লিহইয়ান সম্প্রদায়ের লোকেরা চতুর্দিক থেকে তাদেরকে ঘিরে ফেলে। অতঃপর তারা আসিম এবং তাঁর সাথিদেরকে সম্বোধন করে বলতে থাকে, তোমরা অবতরণ করে আত্মসমর্পণ করো। আমরা অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি যে, তোমাদের একজনকেও আমরা হত্যা করব না। (তা শুনে) গোয়েন্দাদলের নেতা আসিম ইবনে সাবিত (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! কাফিরের প্রদত্ত নিরাপত্তায় কখনো আমি (পাহাড় থেকে) নামব না। এ সময় তিনি প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ! আমাদের পক্ষ থেকে এ সংবাদটি তোমার নবী -কে জানিয়ে দাও।
অতঃপর কাফিররা তাদেরকে তীর নিক্ষেপ করে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থানকারী সাতজনসহ আসিম ইবনে সাবিত (রাঃ)-কেও হত্যা করে ফেলল। অবশিষ্ট তিনজন কাফিরদের প্রদত্ত অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির উপর নির্ভর করে পাহাড় থেকে নেমে আসলেন। এ তিনজন হলেন, খুবাইব আনসারী, ইবনে দাসিনা এবং অপর একজন লোক (সাহাবী)।
তারপর কাফিররা তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করে ধনুকের রশি খুলে তাদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেলল। এটা দেখে তৃতীয় জন বললেন, এটা তো গোড়াতেই বিশ্বাসঘাতকতা। আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না। তাদের নীতিই অনুসরণযোগ্য ছিল যারা শহীদ হয়ে গেছে। কাফিররা তাঁকে সাথে নেয়ার জন্য টানাটানি করতে লাগল। কিন্তু তাতে তিনি রাজি না হওয়ায় তারা তাঁকে হত্যা করে ফেলল এবং খুবাইব ও ইবনে দাসিনা (রাঃ)-কে নিয়ে মক্কায় বিক্রি করে দিল। এ ঘটনা বদর যুদ্ধের পরে হয়েছিল।
খুবাইব (রাঃ) যেহেতু বদর যুদ্ধে হারিস ইবনে আমিরকে হত্যা করেছিলেন এজন্য হারিস ইবনে আমির ইবনে নাওফাল ইবনে আবদে মানাফের সম্প্রদায় (প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য) খুবাইব (রাঃ)-কে ক্রয় করে নিল। সুতরাং খুবাইব (রাঃ) তাদের সম্প্রদায়ে বন্দী হিসেবে থেকে গেলেন। বর্ণনাকারী যুহরী বলেন, আমাকে উবাইদুল্লাহ ইবনে আয়ায জানিয়েছেন যে, হারিসের মেয়ে তাকে জানিয়েছেন, সম্প্রদায়ের সকলেই তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তিনি (খুবাইব) লজ্জাস্থানের লোম পরিষ্কার করার জন্য তার (হারিসের মেয়ের) কাছে একখানা ক্ষুর চাইলে সে তা দিল। হারিসের মেয়ে বলেন, আমার অজ্ঞতার কারণে আমার একটি ছেলে তার নিকট চলে গেলে তিনি তাকে কাছে টেনে নিলেন। আমি দেখলাম তিনি ক্ষুরখানা হাতে রেখে ছেলেটাকে তার উরুর উপর বসিয়ে রেখেছেন। আমি অত্যন্ত ভয় পেলাম, খুবাইব আমার চেহারা দেখেই তা বুঝতে সক্ষম হলেন। তাই তিনি বললেন, তুমি কি ভয় করছ যে, আমি তাকে হত্যা করব? আমি কখনই তা করব না।
হারিসের কন্যা বলেন, আল্লাহর কসম! আমি খুবাইবের চেয়ে ভালো বন্দী আর কাউকে দেখিনি। আল্লাহর কসম! একদিন আমি তাকে লোহার শিকলে বন্দী থাকাবস্থায় আঙ্গুরের ছড়া হাতে নিয়ে খেতে দেখেছি। অথচ মক্কায় সে সময় কোন ফল ছিল না। সুতরাং ওগুলো ছিল আল্লাহর কাছ থেকে খুবাইবের জন্য প্রেরিত রিযিক।
এরপর যখন সবাই তাকে হত্যা করার জন্য হেরেমের বাইরে নিয়ে চলল, তখন খুবাইব তাদেরকে বললেন, আমাকে দু'রাক'আত নামায পড়তে দাও। তারা সুযোগ দিলে তিনি দু'রাক'আত নামায আদায় করে বললেন, যদি তোমরা এ ধারণা করবে বলে আমি মনে না করতাম যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে শংকিত ও অধৈর্য হয়ে পড়েছি, তাহলে আমি নামায আরও দীর্ঘ করতাম। (তারপর তিনি আবেগ উদ্বেলিত হয়ে বললেন) হে আল্লাহ! তুমি এদেরকে এক এক করে গুণে গুণে হত্যা করো! তারপর তিনি বললেন, আমি আল্লাহর রাস্তায় মুসলিম হিসেবে শাহাদাত বরণ করতে তৈরি হচ্ছি। তাই মরণের পর আমি যে পাশেই লুটিয়ে পড়ি না কেন, তাতে আমার কোন আক্ষেপ নেই। আর এ সবকিছু একমাত্র মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যেই বরণ করে নিচ্ছি। তাই তিনি যদি ইচ্ছা করেন, তাহলে দেহের খণ্ডিত প্রতি অংশেই বরকত প্রদান করবেন। এরপর হারিসের ছেলে তাঁকে শহীদ করল। আর এভাবে প্রত্যেক মুসলিম বন্দীর জন্য খুবাইব (রাঃ) দু'রাক'আত নামায আদায়ের সুন্নত (নিয়ম) প্রবর্তন করে গেছেন।
এদিকে আল্লাহ তা'আলা আসিম ইবনে সাবিত (রাঃ) এর শহীদ হওয়ার সময়ের প্রার্থনা কবুল করে নিলেন এবং তাঁর সংবাদ নবী-কে জানিয়ে দিলেন। যেদিন তাঁদেরকে শহীদ করা হয় সেদিনই তিনি সাহাবীদের তা জানালেন। আসিমের শাহাদাতের খবর কুরাইশদের কাছে পৌঁছলে তাদের কিছু লোক তাঁর শাহাদাত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাঁর দেহের কিছু অংশ কেটে আনার উদ্দেশ্যে লোক পাঠাল। কেননা তিনি বদর যুদ্ধের দিন কুরাইশদের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু আসিমের মৃতদেহের চারদিকে মৌমাছির ঝাঁক মেঘমালার মতো ঘিরে রেখে কুরাইশদের পাঠানো ব্যক্তিদের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করল। সুতরাং তারা তাঁর শরীরের কোন অংশই কেটে নিতে পারল না। ৭৫
৩. বিরে মাউনার ঘটনা: রাজীর ঘটনার মাত্র কয়েকদিন পর একই মাসে এ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। এটি ছিল পূর্বের ঘটনা থেকে আরো মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। ঘটনাটি হচ্ছে এই যে, একদা নজদ অঞ্চল থেকে আবু বারায়া আমের বিন মালেক নামক এক ব্যক্তি মদিনায় আগমন করলে রাসূলুল্লাহ তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু সে ইসলাম গ্রহণ না করে রাসূলুল্লাহ-কে আশ্বাস দিয়ে এ কথা বলল যে, যদি আপনি নজদবাসীদেরকে দাওয়াত দেয়ার জন্য কয়েকজন সাহাবীকে প্রেরণ করেন, তাহলে তারা আপনার দাওয়াত গ্রহণ করে নিতে পারে। তারপর রাসূলুল্লাহ তার আশ্রয়ের উপর নির্ভর করে মুনযির বিন আমের (রাঃ)-কে নেতা বানিয়ে ৭০ জন সাহাবীকে তাঁর সাথে প্রেরণ করেন। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন বিজ্ঞ ক্বারী ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবী।
অতঃপর যখন তাঁরা বিরে মাউনার নিকট গিয়ে পৌঁছেন, তখন সেখানে তাঁরা শিবির স্থাপন করেন। এখান থেকে তাঁরা দাওয়াত দিতে গেলে শত্রুবাহিনীর আক্রমণের শিকার হন। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁদেরকেও শত্রুদের সাথে লড়তে হয়। এতে একজন ব্যতীত সকলেই শাহাদাত বরণ করেন। মুসলিমদের মধ্য থেকে কেবল কা'ব বিন যায়েদ (রাঃ)-ই ফিরে আসতে পেরেছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ এ ঘটনাটি জানতে পেরে খুবই মর্মাহত হয়েছিলেন। ফলে তিনি এক মাস পর্যন্ত রাইল, যাকওয়ান, লেহইয়ান এবং উসাইয়া গোত্রের বিরুদ্ধে বদদু'আ করেন। ৭৬
৪. বনু নাযীরের যুদ্ধ :
বনু নাযীর হচ্ছে মদিনায় বসবাসরত একটি ইয়াহুদি সম্প্রদায়। এরা মদিনা সনদের মাধ্যমে বাধ্য হয়ে রাসূলুল্লাহ এর নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে রাসূলুল্লাহ এর সাথে শত্রুতা এদের মনে পুরোপুরিভাবেই বিদ্যমান ছিল। তারা মুসলিমদের একের পর এক বিজয় প্রত্যক্ষ করে খুবই হিংসুক হয়ে উঠে। উপরন্তু তাদের জাতি ভাই বনু কাইনুকাকে বহিষ্কার এবং কাব বিন আশরাফকে হত্যার ফলে আরো উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এরপর যখন উহুদ যুদ্ধে মুসলিমদের সামান্য দুর্বলতা প্রকাশ পায়, তখন তাদের অন্তরের সেসব প্রতিহিংসা আবারো জেগে উঠতে থাকে এবং মুসলিমদের সাথে নানা ধরনের অশোভনীয় আচরণ শুরু করে দেয়। এরই মধ্যে ভুলবশত একজন মুসলিম কর্তৃক তাদের গোত্রের দু'জন লোক নিহত হয়। ফলে একদিন রাসূলুল্লাহ আবু বকর ও উমর (রাঃ) সহ আরো কয়েকজন সাহাবীকে সাথে নিয়ে এদের রক্তপণ প্রদানের ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য তাদের মহল্লায় গমন করেন। আলোচনা শেষে তারা রাসূলুল্লাহ-কে সেখানে বসতে বলে প্রয়োজন পূরণ করার বাহানায় সেখান থেকে চলে যায়। ফলে রাসূলুল্লাহ সেখানকার একটি বাড়ির সাথে গা লাগিয়ে বসে পড়েন এবং তাদের ওয়াদা পূরণের অপেক্ষা করেন।
এদিকে তারা সেখান থেকে চলে এসে এক ভয়ানক চক্রান্তে লিপ্ত হয়। তারা রাসূলুল্লাহ ও কয়েকজন সাহাবীকে একা পেয়ে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। ফলে আল্লাহ তা'আলা জিবরাঈল (আঃ) এর মাধ্যমে তাদের বিষয়টি রাসূলুল্লাহ-কে জানিয়ে দেন। তারপর রাসূলুল্লাহ কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ সেখান থেকে উঠে খুব দ্রুত মদিনায় ফিরে আসেন। এদিকে অবশিষ্ট সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ -কে ফিরে আসতে না দেখে তারাও মদিনায় ফেরত এসে রাসূলুল্লাহ এর সাথে মিলিত হন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাদেরকে সবকিছু বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন।
এ ঘটনার পরপরই রাসূলুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন মাসলামা (রাঃ)-কে দিয়ে বনু নাযীরকে এ সংবাদ পাঠান যে, তারা যেন আগামী ১০ দিনের মধ্যে মদিনা থেকে বেরিয়ে অন্যত্র চলে যায়। মুসলিমদের সাথে তারা আর মদিনায় বসবাস করতে পারবে না। এরপর যদি মদিনায় কোন ইয়াহুদিকে পাওয়া যায়, তাহলে তার গ্রীবা কেটে দেয়া হবে। এ নির্দেশের পর থেকে বনু নাযীরের জন্য মদিনা ত্যাগ করা ছাড়া আর কোন উপায় অবশিষ্ট থাকল না। ফলে তারা সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়েও নিচ্ছিল। কিন্তু পরক্ষণেই আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর মিথ্যা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।
এদিকে নির্ধারিত দিন শেষ হয়ে গেলে রাসূলুল্লাহ আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে মদিনার প্রশাসনের দায়িত্ব দিয়ে সাহাবীদেরকে নিয়ে বনু নাযীরের মহল্লায় উপস্থিত হন। এ সময় তারা সকলে তাদের দুর্গে অবস্থান নেয়। ফলে মুসলিম বাহিনী সেই দুর্গ অবরোধ করে ফেলেন। তারপর তারা দুর্গের ভেতর থেকে তীর নিক্ষেপ করতে থাকে এবং আবদুল্লাহ ইবনে উবাই এর প্রতিশ্রুতি পূরণের আশায় বসে থাকে। কিন্তু সে তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। ফলে তারা একেবারেই একা হয়ে যায়।
অবশেষে তারা মুসলিমদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ফলে তারা অবরোধের ৬ষ্ঠ মতান্তরে ১৫ তম দিনে রাসূলুল্লাহ এর নিকট এ আবেদন করে যে, তারা মদিনা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে প্রস্তুত রয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ এতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন এবং এ নির্দেশ দেন যে, অস্ত্রশস্ত্র ছাড়া অন্যান্য যেসব দ্রব্য তারা উটের পিঠে বোঝাই করে নিয়ে যেতে পারবে তা নিয়ে যাবে। পরিবার-পরিজনও তাদের সাথে নিয়ে যেতে পারবে।
এ স্বীকৃতির পর বনু নাযীর গোত্রের লোকেরা অস্ত্র সমর্পণ করে। শর্ত অনুযায়ী উটের পিঠে বোঝাই করে নিয়ে যাওয়ার মতো সম্পদ সাথে নিয়ে মদিনা থেকে বের হয়ে যায়। এ সময় তাদের অধিকাংশই খায়বারের দিকে রওয়ানা হয়, আবার অনেকেই সিরিয়ার দিকে চলে যায়।
অতঃপর তারা চলে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ তাদের অস্ত্রশস্ত্র, জমিজমা ও বাড়িঘর নিজ অধিকারভুক্ত করে নেন। অস্ত্রশস্ত্রের মধ্যে ছিল ৫০টি লৌহবর্ম, ৫০টি শিরস্ত্রাণ এবং ৩৪০টি তরবারি। এ ঘটনাটি ঘটেছিল হিজরী ৪র্থ বর্ষের রবিউল আওয়াল মাস মোতাবেক ৬২৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে।
৫. দ্বিতীয় বদর যুদ্ধ : উহুদ যুদ্ধের দিন কোন চূড়ান্ত ফলাফল না নিয়ে যখন আবু সুফিয়ান তার বাহিনী নিয়ে ফিরে যাচ্ছিল তখন সে পুনরায় বদরের প্রান্তরে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছিল, আগামী বছর বদরে আবার যুদ্ধ করার প্রতিজ্ঞা থাকল। তখন রাসূলুল্লাহ একজন সাহাবীকে বললেন, তুমি তাকে বলে দাও যে, ঠিক আছে। এখন আমাদের ও তোমাদের মাঝে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে গেল।
অতঃপর উহুদ যুদ্ধের এ প্রতিজ্ঞাকে সামনে রেখেই উভয় পক্ষ প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। এ লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ হিজরী ৪র্থ বর্ষের শা'বান মাস মোতাবেক ৬২৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে মদিনার দায়িত্ব আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রাঃ) এর উপর ন্যস্ত করে ১৫০০ সাহাবী নিয়ে আবারো বদর অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। সে সময় তাঁদের মধ্যে ৫০ জন অশ্বারোহীও ছিলেন। অপরপক্ষে আবু সুফিয়ান ৫০ জন অশ্বারোহীসহ ২০০০ মুশরিক সৈন্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে। অতঃপর তারা 'মাররুয যাহরান' নামক স্থানে পৌঁছে 'মাজিন্নাহ' নামক প্রসিদ্ধ ঝর্ণার নিকট শিবির স্থাপন করে। সেখানে পৌঁছার পর থেকে আবু সুফিয়ানসহ বাহিনীর অধিকাংশ লোক তাদের মনোবল হারিয়ে ফেলতে থাকে। অবশেষে তারা নিরুৎসাহিত হয়ে আর অগ্রসর না হয়ে মক্কায় ফিরে আসে।
এদিকে রাসূলুল্লাহ বদর প্রান্তরে পৌঁছে শত্রুবাহিনীর জন্য আট দিন অপেক্ষা করে মদিনায় ফিরে আসেন।
টিকাঃ
৭৫ সহীহ বুখারী, হা/৩০৪৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৯১৫।
৭৬ সহীহ বুখারী, হা/৪৫৬০; সহীহ মুসলিম, হা/৬৯৫; আবু দাউদ, হা/১৪৪২; নাসাঈ, হা/১০৭৩।
📄 আহযাবের যুদ্ধ
'আহযাব' শব্দটি বহুবচন। এর একবচন হচ্ছে 'হিযবুন'। যার অর্থ হচ্ছে বাহিনী বা দল। যেহেতু এ যুদ্ধে বিভিন্ন গোত্রের শত্রু বাহিনী একত্রিত হয়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল তাই এটা আহযাবের যুদ্ধ নামে পরিচিত। এ যুদ্ধের অপর নাম হলো খন্দক বা পরিখা খননের যুদ্ধ।
আহযাবের যুদ্ধ হচ্ছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুরাইশসহ সকল শত্রু বাহিনীর সমন্বিত অভিযান। এ যুদ্ধে মুসলিমদের সকল শত্রু একত্রিত হয়েছিল এবং তারা এর মাধ্যমে মুসলিমদেরকে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল।
এদিকে যেসব ইয়াহুদিরা মদিনা থেকে বহিষ্কৃত হয়ে খায়বার ও অন্যান্য এলাকায় বসতি স্থাপন করেছিল, তারা ক্রমাগতভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুরাইশ, বনু গাতফানসহ অন্যান্য জাতিকে উৎসাহ ও আশ্বস্ত করতে লাগল।
সম্মিলিত বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ও মদিনার অভিমুখে যাত্রা : এ যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সর্বপ্রথম ঐক্যমত পোষণ করেছিল কুরাইশ ও বনু গাতফান গোত্র। পরবর্তীতে ইয়াহুদিদের প্রচেষ্টায় আরো বড় বড় গোত্র এতে এসে যোগ দেয়। অতঃপর নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী দক্ষিণ দিক থেকে কুরাইশ, কেনানা এবং তেহামায় বসবাসরত দ্বিতীয় হালিফ (চুক্তিবদ্ধ) গোত্রসমূহ মদিনা অভিমুখে রওয়ানা হয়ে যায়। এদের সংখ্যা ছিল ৪০০০ এবং এর সার্বিক দায়িত্বে ছিল আবু সুফিয়ান। এ বাহিনী মাররুয যাহরান গিয়ে পৌঁছলে বনু সোলাইম এসে তাদের সাথে যোগ দেয়। ঐ সময় পূর্বদিক থেকে গাতফানী গোত্রসমূহ ফাযারা, মুররাহ এবং আশজা রওয়ানা হয়। ফাযারার নেতৃত্বে ছিল উয়াইনা বিন হিসন, বনু মুররাহ এর নেতৃত্বে ছিল হারিস বিন আউফ এবং আশজা গোত্রের নেতৃত্বে ছিল মিসআর বিন রাখিলা। তাদের নেতৃত্বে বনু আসাদ এবং অন্যান্য গোত্রের অনেক লোকজনও এসেছিল। এসব গোত্রগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় এবং নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী মদিনার অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছিল। যার কারণে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই মদিনার আশেপাশে ১০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনীর সমাবেশ ঘটে।
মুসলিমদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা : এদিকে মুসলিমরাও ছিলেন অত্যন্ত সজাগ ও সচেতন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি চারদিকের অবস্থা খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিলেন। কাজেই কাফিরদের এই বিশাল সম্মিলিত বাহিনী যখন মদিনার অভিমুখে রওয়ানা দেয়ার জন্য সচেষ্ট হলো, তখন রাসূলুল্লাহ সাথে সাথেই গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে যান। ফলে তিনি সাথে সাথেই নেতৃস্থানীয় সাহাবীদের সাথে একটি বৈঠকে একত্রিত হন এবং আগত যুদ্ধ সম্পর্কে পরামর্শ করেন। এমন সময় সালমান ফারসী (রাঃ) একটি অভিনব প্রস্তাব পেশ করেন, যা ইতিপূর্বে আরবের কোন যুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়নি। সুতরাং সকলেই এ ধরনের কৌশল সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ ছিল। প্রস্তাবটি এভাবে উপাস্থাপন করেন যে, হে আল্লাহর রাসূল! পারস্যে যখন আমাদেরকে অবরোধ করা হতো, তখন আমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী স্থান খনন করে নিতাম। সালমান ফারসী (রাঃ) এর এ প্রস্তাবটি উপস্থাপনের সাথে সাথেই রাসূলুল্লাহ তা গ্রহণ করে নেন। অতঃপর এ সভায় তিনি প্রতি ১০ জনের উপর ৪০ হাত পরিখা খনন করার দায়িত্ব অর্পণ করেন। দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথেই সাল্লাল্লাহু আলাইহি মুসলিমগণ অত্যন্ত একনিষ্ঠতার সাথে পরিখা খননের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এমনকি নবী নিজেও এ কাজে স্বশরীরে অংশগ্রহণ করেন। মদিনার উত্তর দিক ছাড়া বাকি তিন দিকই ছিল পাহাড়-পর্বত ও খেজুর বাগান দ্বারা পরিবেষ্টিত। সুতরাং একমাত্র উত্তর দিক থেকেই শত্রুদের আক্রমণের সম্ভাবনা বেশি। তাই মুসলিমগণ সে দিক দিয়ে পরিখা খনন করে মদিনার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেন।
তারপর রাসূলুল্লাহ সকল প্রস্তুতি পর্ব শেষ করে ৩০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন এবং সাল'আ পর্বতকে পেছনে রেখে শিবির স্থাপন করলেন। আর তাঁদের সামনেই ছিল পরিখা তথা খন্দক, যা শত্রুবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
সম্মিলিত বাহিনীর গতি রোধ: মুসলিমগণ একটানা কয়েক দিন কঠোর পরিশ্রম করে কাফির সৈন্যদল মদিনায় প্রবেশ করার পূর্বেই পরিখা খননের কাজ শেষ করেন। ফলে যখন সম্মিলিত বাহিনী বিভিন্ন দিক থেকে একত্রিত হয়ে মদিনার দিকে অগ্রসর হলো, তখন তারা এসব পরিখার সম্মুখীন হয়ে হতভম্ব হয়ে যায়। কেননা এটি ভেদ করা তাদের পক্ষে কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। এতে মুশরিকদের ক্রোধ কেবল বৃদ্ধিই পেতে থাকে এবং এটা পার হওয়ার জন্য তারা প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকে। আর মুসলিম বাহিনীও সর্বদা প্রস্তুত ছিলেন, যাতে শত্রুবাহিনী কোনভাবেই এর নিকটবর্তী না হতে পারে। এজন্য তাঁরা মাঝে মাঝে তীর নিক্ষেপ করছিলেন।
অবশেষে সম্মিলিত বাহিনী মদিনাবাসীকে কেবল অবরোধ করে রাখতেই বাধ্য হয়। কিন্তু পরক্ষণেই এ ধরনের অনির্দিষ্টকালের অবরোধের কারণে তাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। ফলে অনেকের কাছে যুদ্ধের স্পৃহা হ্রাস পেতে থাকে।
আল্লাহর সাহায্য : অবশেষে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ হতে মুসলিমদের উপর সাহায্য অবতীর্ণ হয়। প্রথমে তিনি মুশরিকদের ঐক্যে ফাটল সৃষ্টি করে দেন এবং তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেন। তারপর তাদের উপর উত্তপ্ত বায়ুর তুফান প্রেরণ করেন। যার কারণে তাদের তাবু উপড়ে যায়, তাদের পাত্রসমূহ উল্টে যায় এবং তাদের শিবির তছনছ হয়ে যায়। উপরন্তু আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদের একটি দল প্রেরণ করে তাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে দেন। ফলে তারা প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হয়।
ফলাফল : এ যুদ্ধে মুসলিমরা কোন প্রকার ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই জয় লাভ করেন। এরপর থেকে মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস আরো বৃদ্ধি পায় এবং আরবে রাসূলুল্লাহ এর আধিপত্য প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ বলেছিলেন, এখন থেকে আমরা ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব, ওরা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। আমরাই ওদের দিকে সৈন্য পরিচালনা করব। ৭৭ আর বাস্তবেও তাই হয়েছিল।
উল্লেখ্য যে, এ যুদ্ধটি হিজরী ৫ম বর্ষের শাওয়াল মাস থেকে যিলকদ মাস পর্যন্ত প্রায় এক মাস স্থায়ী ছিল।
টিকাঃ
৭৭ সহীহ বুখারী, হা/৪১১০; মিশকাত, হা/৫৮৭৯।
📄 বনু কুরাইযার যুদ্ধ
বনু কুরাইযা ছিল মদিনায় বসবাসরত তিনটি ইয়াহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বশেষ সম্প্রদায়। মদিনায় বসবাস করার কারণে খন্দকের যুদ্ধেও তাদেরকে কিছু দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু তারা সেসব দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করে শত্রুবাহিনীদেরকেই সহযোগিতা করে এবং মুসলিম বাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। এতে আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর খুবই অসন্তুষ্ট হন।
আক্রমণের নির্দেশ : রাসূলুল্লাহ খন্দক যুদ্ধ থেকে সবেমাত্র প্রত্যাবর্তন করে উম্মে সালামা (রাঃ) এর গৃহে গোসল করছিলেন। তখন জিবরাঈল (আঃ) এসে বললেন, আপনি কি অস্ত্রশস্ত্র খুলে রেখে দিয়েছেন? উঠুন এবং সাহাবীদেরকে নিয়ে বনু কুরাইযার অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকুন। আমি সবার আগে গিয়ে তাদের অন্তরে ভয় সৃষ্টি করে দেব।
বনু কুরাইযা আক্রমণ : জিবরাঈল (আঃ) যখন রাসূলুল্লাহ -কে এসব কথা বলছিলেন, তখন ছিল যোহরের সময়। রাসূলুল্লাহ এসব কথা শোনার পর একদল সাহাবীকে বনু কুরাইযায় গিয়ে আসরের নামায পড়ার নির্দেশ দেন এবং আসরের নামাযের পর রাসূলুল্লাহ উম্মে মাকতুম (রাঃ)-কে মদিনার দায়িত্ব দিয়ে বনু কুরাইযার দিকে রওয়ানা হয়ে যান। এদিকে রাসূলুল্লাহ এর যাত্রার সংবাদ পেয়ে অন্যান্য মুসলিমগণ যোগ দিতে থাকেন। অতঃপর তাঁরা যখন বনু কুরাইযার মহল্লায় প্রবেশ করলেন তখন বনু কুরাইযার লোকেরা নিজেদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য তাদের দুর্গে প্রবেশ করে।
বনু কুরাইযার আত্মসমর্পণ : বনু কুরাইযার লোকেরা যখন দেখল যে, তারা চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে গেছে এবং প্রায় ২৫ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে, তখন আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোন পথ খুঁজে পেল না। এদিকে যখন আলী (রাঃ) তাদের দুর্গের দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ঘোষণা করেন, তখন তারা দিশেহারা হয়ে নিজেদের অস্ত্র ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করে এবং রাসূলুল্লাহ এর সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার প্রতিজ্ঞা করে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ তাদের পুরুষদেরকে বন্দী করে ফেলেন এবং মহিলা, শিশু ও বৃদ্ধদেরকে পৃথকভাবে রাখেন।
সা'দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) এর ফায়সালা: বনু কুরাইযার এহেন পরিণতির কথা চিন্তা করে আনসারদের মধ্য থেকে আউস গোত্রের কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ রাসূলুল্লাহ -কে তাদের সাথে ইনসাফ করার জন্য আবেদন জানিয়েছিল। ফলে রাসূলুল্লাহ সা'দ ইবনে মুয়ায (রাঃ)-কে তাদের বিচারক মানার জন্য প্রস্তাব দেন। তখন তারা সবাই এতে রাজি হয়ে গেল। এতে তারা মনে করেছিল যে, হয়তোবা তাদের উপর শাস্তি কিছুটা হালকা করা হবে।
সে সময় সা'দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) খন্দক যুদ্ধে সামান্য আহত হওয়ার কারণে মদিনায় অবস্থান করছিলেন। রাসূলুল্লাহ এর এ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর তাকে ডেকে পাঠানো হয়। তারপর তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে এ নির্দেশ দেন যে, পুরুষদের হত্যা করা হোক, মহিলা ও শিশুদেরকে বন্দী করা হোক এবং তাদের সম্পদসমূহ বণ্টন করে দেয়া হোক।
এ রায় শোনার পরপরই রাসূলুল্লাহ বললেন, তুমি তাদের ব্যাপারে ঠিক সেই বিচারই করেছ, যেমনটি আল্লাহ তা'আলা সাত আসমানের উপর থেকে করে দিয়েছেন। অতঃপর বনু কুরাইযার উপর এ রায়টি বাস্তবায়ন করা হয়।
📄 বনু মুস্তালিক অভিযান
এ অভিযানটি পরিচালিত হয় হিজরী ৫ম অথবা ৬ষ্ঠ বর্ষের শা'বান মাসে। একদা রাসূলুল্লাহ জানতে পারলেন যে, বনু মুস্তালিকের সরদার হারিস বিন আবু জাররা মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য লোকজনকে একত্রিত করছে। তখন রাসূলুল্লাহ বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে একটি বাহিনী নিয়ে সেখানে গমন করেন। এ অভিযানে মুনাফিকদের একটি দলও অংশগ্রহণ করেছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ বাহিনী নিয়ে তাদের উপর অতর্কিত হামলা করেন। ফলে তারা পালিয়ে যায়। তারপর রাসূলুল্লাহ তাদের মহিলা ও শিশুদেরকে বন্দী করেন এবং তাদের ধনসম্পদসমূহ গনীমত হিসেবে নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেন।